Chainsaw Man [মাঙ্গা রিভিউ] — Shifat Mohiuddin

Chainsaw Man

জনরা: অ্যাকশন, ডার্ক ফ্যান্টাসি

১৬ বছরের অনাথ কিশোর দেনজি। সদ্য সে নিজের একটা কিডনি বারো লাখ ইয়েনে, একটি চোখ তিন লাখ ইয়েনে আর নিজের একটি অণ্ডকোষ বিক্রি করেছে এক লাখেরও কম ইয়েনে। গাছ কেটে সে কষ্টেসৃষ্টে আরো হাজার ষাটেক ইয়েন যোগাড় করেছে। তারপরেও ইয়াকুজার কাছে তার ঋণ শোধ করা বাকী আছে আরো তিন কোটি আশি লাখ চল্লিশ ইয়েনের মতো। অযোগ্য বাবা মরে গিয়ে তার ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে গেছে এই ভার। প্রিয়জন বলতে তার আছে শুধু পোষা কুকুর পোচিতা যে আসলে একটা চেইন-স সদৃশ ডেভিল।
তো পোচিতাকে নিয়ে ঋণ শোধের জন্য ডেভিল হান্ট করে দেনজি। জীবনের সব মৌলিক চাহিদা থেকে বলতে গেলে বঞ্চিতই দেনজি। স্কুলে যায় নি সে কখনো, থাকে একটা নড়বড়ে ঘরে, যা পায় তাই খায়। বুক ভরে তার স্বপ্ন একটা সুন্দর জীবনযাপন করার, হয়তোবা সুন্দরী কোন এক মেয়ের সঙ্গও পাওয়ার আশা করে দেনজি।

বিন্দু বিন্দু শিশির দিয়ে দীঘি পূর্ণ করার আশা রাখা দেনজিকে একদিন তার ইয়াকুজা বস ডেকে নেয় বিশেষ কাজে। এক পরিত্যক্ত ফ্যাক্টরিতে নিয়ে যাওয়া দেনজিকে ডেভিল হান্ট করার জন্য। সেখানে ইয়াকুজার সাঙ্গপাঙ্গরা পোচিতাসহ তাকে টুকরো টুকরো করে কেটে ময়লার ড্রামে ভরে রাখে। আসলে ইয়াকুজারা সবাই এক ম্যানিপুলেটিং ডেভিলের আদেশ মানছিল এতক্ষণ। বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হওয়া দেনজি অবচেতন মনে পোষা কুকুর পোচিতার সাথে চুক্তি করে, সে নিজের পুরো দেহ দান করবে পোচিতাকে বিনিময়ে পোচিতা তাকে দেবে স্বাভাবিক মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণের সুযোগ।

লাইফ লাইন পেয়ে দেনজি আবির্ভূত হয় চেইন-স ম্যান হিসেবে। চেইন-সর নির্মম আঘাতে সে কেটে টুকরো টুকরো করে ডেভিল আর তার চেলাপেলাদের। সরকারি ডেভিল হান্টাররা ঘটনাস্থলে এসে রক্ত-মাংসের স্তুপের মাঝে দেনজিকে আবিষ্কার করে। উচ্চতর অফিসার মাকিমার নজরে পড়ে যায় দেনজি আর মাকিমা তাকে সরকারি ডেভিল হান্টারদের দলে যোগদানের প্রস্তাব দেয়। বিনিময়ে তিনবেলা খাবার আর একটা শোয়ার জায়গার প্রস্তাব পেয়ে খুশীমনে রাজি হয়ে যায় দেনজি।

তো চেইন-স ম্যানের কাহিনী শুরু এখানেই। মাঙ্গাটা ২০১৯ সাল থেকে উইকলি শোউনেন জাম্পে প্রকাশিত হয়ে আসছে। এ পর্যন্ত বের হয়েছে ৭২ চ্যাপ্টার। বেশ জনপ্রিয়তা কুড়িয়েছে এর মাঝে। Mangaplus এ টপ টেনে থাকে প্রতি সপ্তাহেই।

চেইন-স ম্যান মাঙ্গাটার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ সম্ভবত এর আন-অর্থোডক্স অ্যাপ্রোচ। মাঙ্গাটা আসলেই শোউনেন জাম্পে কিভাবে এত ভালভাবে ছাপানো হচ্ছে সেটা আসলে চিন্তার বিষয়। জাম্পে সাধারণত এত ব্রুটাল আর grotesque আর্টের মাঙ্গা সহজে দেখা যায় না। শোউনেন হিসেবে ধরলে এর স্টোরি, ক্যারেকটার ডিজাইন, আর্টস্টাইল আর সংলাপ সবই অত্যন্ত প্রথাবিরোধী। পুরো মাঙ্গাটাতেই গোছানো জিনিস খুঁজে পেলাম না তেমন, সবকিছুই প্রচণ্ড রকমের অগোছালো। যেন কেউ চেইন-স দিয়েই এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিয়েছে মাঙ্গাটাকে আগাগোড়া।

চেইন-স ম্যানের ক্যারেকটারগুলো চরম ব্যতিক্রম। শোউনেন মাঙ্গার নিয়মিত বৈশিষ্ট্য যে বন্ধুত্বের জয়গান তার ছিটেফোঁটাও নেই ক্যারেকটারগুলোর মাঝে। ক্যারেকটারগুলো এমন একটা দুনিয়ায় বসবাস করে যেখানে যেকোন মুহূর্তে জীবন চলে যেতে পারে ডেভিলের হাতে। তার প্রভাবে ক্যারেকটারগুলো হয়ে উঠেছে প্রচণ্ড আত্মকেন্দ্রীক, নিষ্ঠুর আর বাস্তববাদী। দিনে এনে দিনে খেতে খেতে ক্যারেকটারগুলো মানুষ মানুষের জন্য এই প্রবাদটা যেন সবাই ভুলেই গেছে। আর মাঙ্গাকাও যেন এই জিনিসটা লুকানোর কোন চেষ্টাই করেন নি। পাবলিক ডেভিল হান্টাররা বেশিরভাগই জনগণের সেবার জন্য কাজে যোগ দেয় নি। বেশীরভাগই ডেভিলদের হাতে কোন না কোনভাবে ক্ষতির স্বীকার তাই প্রতিশোধস্পৃহাই তাদের কাজে লেগে থাকার মোটিভেশন। হিরোইজমের ছিটেফোঁটাও নেই তাদের মাঝে। মানুষও তাদের অত মহান কিছু মনে করে না। এই বৈশিষ্ট্যটা মাঙ্গাটার ডার্ক ফ্যান্টাসি হওয়ার পেছনে মূখ্য ভূমিকা পালন করেছে যে জিনিসটা Shueisha এর অন্য দুই মাঙ্গা হিরো অ্যাকাডেমিয়া আর ওয়ান পাঞ্চ ম্যান সযত্নে পরিহার করেছে। ক্যারেকটারগুলো মারাও যায় ধুপধাপ, এমনকি টেরও পাওয়া যায় না কখন কে মারা গেল। বেঁচে থাকা মানুষগুলোও মারা যাওয়া মানুষগুলো নিয়ে অত চিন্তিত না। বিশাল একটা ম্যাসাকারের মাধ্যমে বড় একটা পেইজ শেষ হয়ে গেলে দেখা যায় পরের পেইজেই সবাই দৈনন্দিন জীবনযাপন করছে, যেন সবকিছু সয়ে গেছে তাদের। এই জায়গাটাতে মাঙ্গাকা তাতসুকি ফুজিমোতোকে রীতিমত ‘uncensored’ বলবো আমি।

মাঙ্গার শ্রেষ্ঠ দিক নিঃসন্দেহে এর brutal, gritty, grotesque আর্টস্টাইল। কালো কালির অত্যধিক ব্যবহারের কারণে প্যানেলগুলো আরো ভয়াবহ রকমের ভায়োলেন্ট হয়ে উঠে। বিশেষ করে কিছুটা মানুষের মত দেখতে (হিউমনয়েড) ডেভিলগুলার আর্টগুলো সবচেয়ে ভয়াবহ। দেনজির প্রতিটা ট্রান্সফরমেশন গায়ে কাঁটা দেয়। এনিমে আসবে নিঃসন্দেহে তবে এই gory পরিবেশটা কিভাবে স্টুডিও ধরে রাখবে সেটা একটা দেখার মত বিষয়। অ্যাকশন প্যানেলগুলো সব দুর্দান্ত আর প্রচণ্ড ফাস্ট-পেসড। ইউসুকে মুরাতার আঁকার সাথে মিল পাওয়া যায়, তবে মুরাতার মত অত ডিটেইলড না। ক্যারেকটারগুলোর ভয়ার্ত, আতংকিত আর নিষ্ঠুর ভাবলেশহীন চাহনি মাঙ্গাটাতে হরর এলিমেন্টের আমদানী করেছে সুন্দরভাবে।

তারমানে মাঙ্গাতে কমেডি নেই এমন না। দেনজির জীবন-দর্শনটাই একটা বিশাল কমেডি। বিশেষ করে ভয়ংকর ভয়ংকর কাজ করার পেছনে তার হাস্যকর স্বার্থসিদ্ধিগুলো সবচেয়ে মজার। বিস্তারিত বলে পাঠকদের মজা নষ্ট করতে চাচ্ছি না এখানে। তবে বেশীরভাগ কমেডিগুলাই কেমন জানি অস্বস্তিকর। এচ্চি কিছু ম্যাটেরিয়াল দেয়া হয়েছে তবে সেগুলাও সস্তা বিনোদনের যোগান দেয় না। বিন্দুমাত্র কামভাব জাগায় নি এচ্চি সিচুয়েশনগুলা। বরং বয়ঃসন্ধিকালের অস্বস্তিকর মানসিক টানাপোড়েন উঠে এসেছে আকু নো হানার মতো। পাওয়ার আর দেনজির এক বাথটাবে শুয়ে সময় পার করার দৃশ্যটা ভিন্ন এক অনুভূতির জন্ম দিয়েছে। এই সাইকোলজিকাল দিকগুলো মাঙ্গাটাকে বেশ মৌলিক করে তুলেছে আমার মতে। শোউনেন জাম্পের পাতায় এমন জিনিস দেখতে পাবো ভাবি নি।

সব মিলিয়ে বিধ্বংসী এক অভিজ্ঞতা উপহার দিয়েছে আমাকে চেইন-স ম্যান আমাকে। দুইদিনেই পড়ে ফেলেছি সবগুলা চ্যাপ্টার। আস্তে আস্তে ওয়ার্ল্ড-বিল্ডিংও হচ্ছে মাঙ্গাটাতে। গান ডেভিলই সম্ভবত সিরিজের মেইন ভিলেন, দারুণ একটা মিথ গড়ে উঠেছে তাকে ঘিরে। সবাই কেন চেইন-সর হার্ট শিকার করতে চাইছে তাও একটা দারুণ সাসপেন্স জন্ম দিয়েছে। সব মিলিয়ে প্রথাবিরোধী এই মাঙ্গার সাফল্য কামনা করছি, আশা করি জাম্পের টপ ফাইভে উঠে আসবে সামনে। (যেহেতু Kimetsu no yaiba শেষ ও The Promised Neverland শেষের দিকে)

Sakib’s Hidden Gems – Episode #11

আনিমে: Fune wo Amu (The Great Passage)

জানরা: স্লাইস অফ লাইফ, জোসেই, ড্রামা
এপিসোড সংখ্যা: ১১
 
আজ আলোচনা করব একটি বাহুল্যবর্জিত ও ধীরলয়ের রিল্যাক্সিং আনিমে নিয়ে। গল্পের প্রধান চরিত্র মাজিমে – যে কিনা প্রথমে কাজ করত গেনবু পাবলিশিং কোম্পানির সেলসম্যান হিসাবে। কিন্তু কিছুটা অন্তর্মুখী প্রকৃতির হওয়ার কারণে সে এই কাজে সুবিধা করছিল না। মানুষের সাথে ভাবের আদান-প্রদানে দক্ষতা আনবার চেষ্টায় সে বেশি বেশি বই পড়ে, নতুন শব্দ শেখে, আর তার অর্থ জেনে রাখে। এখন ভাগ্যের ফেরে সে গেনবু কোম্পানির ডিকশনারি পাবলিশিং ডিপার্টমেন্টের একজনের চোখে পড়ে য়ায় এবং ওনার সুপারিশে ওখানে বদলি হয়। শেষমেষ এই ডিপার্টমেন্টে সে একদম তার মনের মতো কাজ পায়। এরপর এই ডিপার্টমেন্টের লোকজনদের নিয়ে নতুন একটি ডিকশনারি একদম শুরু থেকে বানানো নিয়েই কাহিনী এগোতে থাকে।
এই আনিমেটি বেশ সংক্ষিপ্ত পরিসরের হওয়ায় কোনরকম তাড়াহুড়ো নেই। আনিমেটি সবসময় টপিকের মধ্যেই থেকেছে। তার পরেও সংক্ষিপ্ত পরিসরে খুব সুন্দর একটি রোমান্স আছে, বেশ কিছু লাইফ লেসন আছে। মাজিমে ছাড়াও অন্যান্য চরিত্রগুলিকে একান্ত আপন বোধ হয়। ভিজুয়াল আর সাউন্ডট্র্যাক খুব ভালো, ওপেনিং আর এন্ডিং গানদুটোও ভালো।
এই আনিমের মতো এমন শান্ত-স্নিগ্ধ পরিবেশের মধ্যেও মোটামুটি সিরিয়াস ও ম্যাচিওর থীম আমি পাইনি খুব একটা। তাই আমার অত্যন্ত প্রিয় এটি।
ধীরলয়ের রিল্যাক্সিং আনিমে দেখতে আপত্তি না থাকলে অবশ্যই এটি দেখবেন।
 

তাতামি গ্যালাক্সিতে কিয়োটো — Fahim Bin Selim

তাতামি গ্যালাক্সি দেখতে গেলে প্রিয় চরিত্র খুঁজতে বেগ পেতে হবে না। ওয়াতাশি আর আকাশি তো প্রত্যাশিতই। ওয়াতাশির দুই বছরের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের টানাপোড়েনে আমরা পরিচিত হই ওযু, আর হিগুচি-সেনসেই, বা তাদের সাথে জুড়ে যাওয়া জৌগাসাকি আর হানুকির সাথে। একেক পর্বে একেক জনের সাথে কাটাই। তাদের সাথে পরিচিত হই দূর বা কাছ থেকে, নিজের চোখে আর মানুষের বর্ণনায়, ভিন্ন দৃষ্টিকোণ নিয়ে। শুধু পর্দায় থাকা কোন ছবি না, সম্পূর্ণ গভীরতা নিয়ে;স্ব স্ব আকাঙ্ক্ষা আর হতাশা থাকা, ভালো আর খারাপের মিশেলে, ত্রিমাত্রিক মানুষ হিসেবে। এমনকি স্বল্প সময়ে পর্দায় থাকলেও সবসময়ই নেকো রামেন বিক্রেতা, জ্যোতিষী বৃদ্ধা কিংবা কোহিনাতার উপস্থিতিও অনুভব করা যায়। তবে এই সবগুলো চরিত্রকে একসাথে জুড়ে আনার ক্ষেত্রে যেটার অবদান, অ্যানিমের মূল উপন্যাসের লেখক তোমিহিকো মোরিমির বাকি কাজেও(যেমন- উচুতেন কাযোকু) যেটার প্রভাব লক্ষণীয়, সেটা কোনো রক্তমাংসের মানুষও না – সব ঘটন আর অঘটনের মঞ্চ, একই সাথে আধুনিক আর পুরাণের জাপান যেখানে একত্রিত হয়, সেই কিয়োটো শহর!

কিয়োটোর একাংশ

ওয়াতাশির সাড়ে চার তাতামির ঘরটার কথাই চিন্তা করা যাক, এর অবস্থান শিমোগামো ইউসুইসৌ বোর্ডিং হাউজে। ওয়াতাশি যেটার তুলনা করে হংকং এর কোওলুন ওয়ালড সিটির সাথে। ১৯৯৩-এ ধ্বংসের আগে কোওলুন ওয়ালড সিটি তো ছিলো এরকম এক ঘিঞ্জি এলাকাই – আলো-বাতাসের প্রবেশ এখানে সীমিত, রঙচটা আর নোটিশ-বিজ্ঞাপনে ঢাকা দেওয়াল, আগোছালো আধোয়া জামাকাপড়ের স্তুপ, এবং তার মাঝে পরজীবী বিড়াল, তেলাপোকা আর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদের বসবাস।

এইযান দেমাচিইয়ানাগি স্টেশন

 

ওয়াতাশির ঘরের জানালার কাঁপন আর ভেসে আসা শব্দে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিয়ে যায় এইযান দেমাচিইয়ানাগি স্টেশনের আগত আর বিদায়ী ট্রেনেরা। কামো নদীর পূর্ব পাড়ের এইযান দেমাচিইয়ানাগি স্টেশনের নাম হয়েছে এপাশে ইয়ানাগি আর পশ্চিমে দেমাচি এলাকার নাম জুড়ে দিয়ে। এই স্টেশনের ভূতলে চলে কেইহান রেলওয়ে; বয়স আর অবস্থানে তার উচ্চাসনে এইযান ইলেকট্রিক রেলওয়ে। ১৯২৫ সালে বসানো এই এইযান ইলেক্ট্রিক রেলওয়ের যাত্রাপথ অবশ্য কেবল কিয়োটোর সাকিও ওয়ার্ডের ভিতরেই বিদ্যমান; দেমাচিইয়ানাগি থেকে উত্তরে গিয়ে তাকারাগাইকেতে দুইভাগে ভাগ হয়ে – পূর্বে ইয়াসে-হেইযানগুচি আর পশ্চিমে কুরামা স্টেশন – সর্বসাকুল্যে ১৪.৫ কিলোমিটার এর মধ্যে। ট্রেনেদের আনাগোনাও তাই খুব নিয়মিত।

শিমোগামো ইউসুইসৌ বোর্ডিং হাউজের আরেক বাসিন্দা আট বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ে পরে থাকা হিগুচি। কখনো বাড়ির পাশের রাস্তায়, কখনো বা দেমাচিইয়ানাগি স্টেশন থেকে ১০ মিনিটের হাঁটা দুরত্বে শিমোগামো মন্দিরের পাশের তাদাসু নো মোরিতে হাজির হয় রহস্যময় নেকো-রামেনের ফেরি; সেখানে সাক্ষাৎ মিলে তার। হিগুচি নিজের পরিচয় দেয় কামো তাকেৎসুনোমি হিসেবে, এই শিমোগামো মন্দিরের দেবতা। তাদাসু নো মোরি, শিমোগামো মন্দির আর কিছুটা উত্তরে তার যুগল কামিগামো মন্দিরের সাথে কিয়োটোর সম্পর্ক তো হাজার বছরের।

শিমোগামো মন্দির

 

সহস্রবর্ষী এক আদিবনের অবশেষ হিসেবে পরে আছে এই তাদাসু নো মোরি। মধ্যযুগ আর মেইজিকালের অনুশাসনের সময় এর আকৃতি কমে এলেও, কিয়োটোর সব যুদ্ধ আর ধ্বংসযজ্ঞের শিকার এবং সাক্ষী হিসেবে মানবহস্তের সাহায্য ছাড়াই বারবার পুনোরুত্থান ঘটেছে তার। এই বনের ভেতরেই ষষ্ঠ শতাব্দীতে শিমোগামো মন্দিরের সূচনা, তারও কিছুকাল পর কামিগামো মন্দিরের। এমনকি কিয়োটোও তো তখনো জাপানের প্রাচীন রাজধানী হয়ে ওঠেনি! শিমোগামো মন্দিরে এসে মানুষ অর্চনা করে দুজনের – তামাইয়োরি-হিমে আর তার পিতা দেবতা তাকেৎসুনোমির। তামাইয়োরি-হিমে আর আগুন-ও-বিদ্যুতের দেবতা হোনোইকাযুচি-নো-মিকোতোর ভালোবাসার ফসল কামো ওয়াকাইকাযুচির জন্য বিদ্যমান কামিগামো মন্দির। তামাইয়োরি-হিমে আর হোনোইকাযুচি-নো-মিকোতোর মিলনের এই পুরাকথার রেশ ধরেই রোজ পাণিপ্রার্থীদের আগমন শিমোগামো মন্দিরে।

তাদাসু নো মোরি
 
ভালোবাসার লাল বন্ধন জোড়া লাগাতে এমনকি অযাচিত সম্পর্কের বিচ্ছেদ ঘটাতে হলেও হাজির হওয়া যায় ইয়াসুই কনপিরাগু মন্দিরে, যার অবস্থান কিছুটা দক্ষিণে হিগাশিইয়ামা ওয়ার্ডের গিওন কর্ণারে। অন্যান্য মন্দিরে যেখানে এমা আকৃতির ফলকে নিজের মনোবাসনা লিখে ঝুলিয়ে দিতে হয়, সেখানে এই মন্দিরে আছে এমা আকৃতির বিশাল আকারের একটি এনমুসুবি(সম্পর্ক জোড়া লাগানো) পাথরই। সাদা কাগজে নিজের বাসনা লিখে এই পাথরের ভেতরে গর্ত দিয়ে একবার ঢুকে আবার বেরোতে হয়, তারপর আরো হাজার হাজার কাগজের পাশে নিজেরটা জুড়ে দিতে হয় পাথরের গায়ে, দেবতার প্রতি আবেদন হিসেবে। এই মন্দিরের মূল উৎসব হয় অক্টোবরে, শুকি কনপিরা তাইসাই(বৃহৎ কনপিরা শরৎ উৎসব)। এর এক উল্লেখযোগ্য অংশ হলো মিকোশি নামক কাঠের তৈরি নৌকা-সদৃশ বহনীয় মন্দির নিয়ে শহরের রাস্তাগুলো প্রদক্ষিণ করা।
 
 
ইয়াসুই কনপিরাগু মন্দির

 

এই কনপিরাগু আর শিমোগামো আর কামিগামোর, সর্বজাপানেরই দেবতাদের তাদের মন্দিরগুলোতে অবশ্য পাওয়া যাবে না দশম চন্দ্রমাসে, যেটাকে বলা হয় কান্নাযুকি(দেবতাশূন্য মাস)। দেবতারা তাদের ভক্ত আর উপাসকদের সকল ইচ্ছা-আকাঙ্খা-কামনা-বাসনা-আর্জি নিয়ে হাজির হয় ইযুমো শহরের ইযুমো-তাইশা মন্দিরে। পরবর্তী বছরের জন্ম-মৃত্যু আর বিয়ের ভাগ্য লিখন নিয়ে দেবতাদের সম্মেলন বসে সেখানে। সে শহরের অবশ্য এই মাসেরই নাম আবার কামিআরিযুকি(দেবতাদের মাস)। সম্পর্ক জুড়তে চাইলে এটাই তো সময়!

কিন্তু বারবার যে ভজকট পাকিয়ে ফেলে ওয়াতাশি! আকাশির সাথে কচ্ছপ-মাজনী খুঁজতে ঘুরে বেড়ায় কাওয়ারামাচিতে। শিমানামি বাইকরেস চলার মাঝে তাদের দেখা হয় কেয়াগে ঢালের পাশের রাস্তায়। আবার কখনো ওযুর ফাঁদে পরে, কখনো বা সত্যি সত্যিই চেরী সাইকেল ক্লিনার কর্পসের নেতা হিসেবে এখানেই ধরা পরে যায় আকাশির হাতে। মজার ব্যাপার হলো কেয়াগে ঢাল ঘুরতে যাওয়ার শ্রেষ্ঠ সময় হলো বসন্তকাল, যখন এই ৫৮২ মিটার দীর্ঘ আর উপর থেকে নিচে ৩৬ মিটার উঁচু ঢাল দিয়ে হেঁটে গেলে দেখা মিলবে সারি বেধে দাঁড়িয়ে থাকা গাছের ডালে ডালে ফুটতে থাকা চেরী ফুলের। ঢালটির উপর দিয়ে চলে গেছে রেললাইন, যাতে করে একসময় নিচে বিওয়া হ্রদের ক্যানেল থেকে উপরে কেয়াগে স্টেশন পর্যন্ত জলযান উঠানো নামানোর হতো। সেই পানিপথ অনেক কাল যাবত বন্ধ দেখেই কিনা বার্ডম্যান সঙ্ঘের উড়োজাহাজ চুরি করে নিয়ে যাওয়ার কাজে চেরী সাইকেল ক্লিনার্স কর্প সেটা ব্যবহার করা শুরু করলো! ঢাল বেয়ে নামতে নামতে উড্ডয়ন হলো ওয়াতাশির…তারপরই তো আবার পানিতে মুখ থুবড়ে পড়া।

কেয়াগে ঢাল
 
দুই বছরের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে একের পর এক ভুল সিদ্ধান্তে দগ্ধ ওয়াতাশিকে তাই বারবার ফিরে আসতে দেখি কিয়ামাচি সরণিতে। এক পাশে তাকাসে আর আরেক পাশে কামো নদীকে আলাদা করে রেখেছে এ সড়কটিই। তবে তার সকল সমস্যার সমাধানটাও বাতলে দেয় জ্যোতিষী বৃদ্ধা।
কিয়ামাচি সড়ক

 

কামো ওওহাশি ব্রিজ ও কামোগাওয়া ডেল্টা
 
চোখের সামনে দুলতে থাকা সুযোগটা হাত বাড়িয়ে নিতে হবে। তারপর পদক্ষেপ নিয়ে নদীকে পাশে রেখে সামনে এগিয়ে গেলেই তো হয়। সেখানেই তো – এই যে দেমাচিইয়ানাগির পাশেই কামোগাওয়া ডেল্টা; সাকিও ওয়ার্ড আর কামিগিয়ো ওয়ার্ডের মেলবন্ধন করতে এখানেই কোন এমার মত ঝুলে আছে কামো ওওহাশি ব্রিজ। হিগুচির গান কিংবা জীবন সম্পর্কিত গভীর বয়ান শুনতে হলে এখানেই ফিরে আসতে হবে চক্র পূরণ করে। গোজান উৎসবের রাতে পাঁচ-পাহাড়ে জ্বলা অগ্নি প্রতীক দেখতে শহরের মানুষজনও হামলে পড়বে এখানেই। আর নিচ দিয়ে কামো নদী বইতে বইতে তাদাসু নো মোরিকে সাক্ষী হিসেবে রেখে মিলিত হবে তাকাসে নদীর সাথে, তাকেৎসুনোমির আশীর্বাদেই কি?
হাতে মোচিগুমান নিয়ে আকাশির সাথে সাক্ষাতের জন্যও তো তাই আসা চাই এখানেই।
 

Sakib’s Hidden Gems – Episode #10

আনিমে: Gallery Fake

জানরা: সেইনেন
এপিসোড সংখ্যা: ৩৭
 
গল্পের কাহিনী আবর্তিত হয় নিউ ইয়র্ক মেট্রোপলিটান আর্ট মিউজিয়ামের সাবেক কিউরেটর ফুজিতাকে কেন্দ্র করে। পেইন্টিং সম্পর্কে এত ওয়াকিবহাল লোক আর খুঁজে পাওয়া ভার। এখন সে জাপানে “গ্যালারি ফেইক” নামে একটি আর্ট গ্যালারির মালিক। এই গ্যালারিতে সে বিখ্যাত সব চিত্রকর্মের নকল বিক্রি করে কম দামে, কিন্তু তার আড়ালে সে নাকি আসল চিত্রকর্মও উঁচুদরে বিক্রি করে থাকে। এপিসোডিক আনিমেটিতে সে তার আর্ট সম্পর্কে অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে আর্ট নিয়ে চোরাকারবারিদের হাটে হাঁড়ি ভেঙে দেয় আর জেনুইন চিত্রকর্মটি খুঁজে বের করে।
এই আনিমের স্ট্রেংথ তার অনন্য গল্প ও সেটিংএ। আর্ট নিয়ে এত তথ্যবহুল আনিমে আর দ্বিতীয়টি নেই। এখনকার সময়ে আর্ট নিয়ে যে একটি বিশাল ও জটিল বাণিজ্য গড়ে উঠেছে, তার স্বরূপ আপনি এই আনিমেতে জানতে পারবেন। ভিজুয়াল, এনিমেশন, আর সাউন্ড মোটামুটি।
কিছুটা পুরনো ধাঁচের এপিসোডিক আনিমেটি অন্য কিছুর ফাঁকে ধীরেসুস্থে দেখলে ভালো লাগবে আশা করি।
 

Sakib’s Hidden Gems – Episode #09

আনিমে: Whistle!

জানরা: স্পোর্টস, শৌনেন
এপিসোড সংখ্যা: ৩৯
 
ফুটবল নিয়ে যে কয়েকটি আনিমে দেখেছি, তাদের মধ্যে এইটা আমার কাছে সবচেয়ে রিয়ালিস্টিক ও সবার সেরা মনে হয়েছে। গল্পের নায়ক কাজামাতসুরি। জন্ম থেকেই ওর ফুটবলের প্রতি আগ্রহ। মিডল স্কুলে থাকতে সে বেশ শক্তিশালী ফুটবল টিমওয়ালা এক স্কুলে ভর্তি হয়। কিন্তু মূলত উচ্চতা কম হওয়ার কারণে ও কখনও দলে জায়গা পায়নি, আর রেগুলার প্র্যাকটিসেরও সুযোগ পায়নি। তাই বাধ্য হয়ে সে স্কুল পরিবর্তন করে। তারপর এই দুর্বল টিম নিয়েই সে এগিয়ে চলে।
 
 
কাজামাতসুরিকে আপনার ভালো লাগবেই। ও অত্যন্ত পসিটিভ মাইন্ডেড ও হাসিখুশি চরিত্র। ও নিজের সীমাবদ্ধতা সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল এবং তা কাটিয়ে উঠতে বদ্ধপরিকর। তাছাড়া আনিমেটার ক্যারাকটার ডেভেলপমেন্ট খুব ভালো, পার্শ্ব চরিত্রদেরও বেশ আপন মনে হয়। ম্যাচগুলি রিয়ালিস্টিক হলেও বেশ জমাটি। ভিজুয়াল খারাপ না। বেশ কিছু মন ভালো করা মিউজিক আছে। আর এপিসোডের শেষে ফুটবল নিয়ে ছোটখাট টিপস থাকে, ঐটাও খুব ভালো লাগে।
রিয়ালিস্টিক স্পোর্টস আনিমে ফ্যানদের অবশ্যই আনিমেটি দেখতে বলব।

Sakib’s Hidden Gems – Episode #08

আনিমে: Nejimaki Seirei Senki: Tenkyou no Alderamin (Alderamin on the Sky)

জানরা: একশন, অ্যাডভেঞ্চার, ফ্যান্টাসি, মিলিটারি
এপিসোড সংখ্যা: ১৩
 
এই আনিমেটি ম্যাডহাউজ স্টুডিওর আরেকটি দারুণ সৃষ্টি। গল্পের নায়ক ইক্তা, যে খুবই অলস কিন্তু মাথায় বুদ্ধি রাখে আর কিছুটা প্লেবয় টাইপের। সে, তার ছোটবেলার বান্ধবী ইয়াতোরি আর পথে জুটে যাওয়া আরও কিছু বন্ধুবান্ধব কিছুটা ভাগ্যের ফেরে আর কিছুটা নিজেদের ইচ্ছাতেই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। যুদ্ধ চলতে থাকে ইক্তাদের দেশ কাজভারনা সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কিওকার।
 
 
গল্পটি মিলিটারি আনিমে হিসেবে বেশ উপভোগ্য। গল্পে পাবেন মিলিটারি স্ট্রাটেজিস্ট হিসেবে ইক্তার বুদ্ধির ঝিলিক। গল্পে ফ্যান্টাসি আর মিলিটারির সংমিশ্রণ আছে – সৈন্যরা যুদ্ধক্ষেত্রে স্পিরিট বা একরকম যাদুকরী জীবের সাহায্য নেয়। এক দুইটা খন্ডযুদ্ধ আর একটি বড় যুদ্ধ পাবেন আনিমেটিতে। ভিজুয়াল খুবই চমকপ্রদ, ক্যারাকটার ডিজাইন মনকাড়া, মিউজিক ভালই, ওপেনিং গানটা স্কিপ করা কঠিন – এইসব দিক দিয়ে ম্যাডহাউজ কার্পণ্য করেনি।
আনিমেটি মূলত ম্যাডহাউজ স্টুডিওর আরেকটি অ্যাডাপটেসন – যেইটা মাঝপথে শেষ হয়ে গেছে আর পরের সিজনের কোন খবর নেই। আমি নেট ঘেঁটে যা পেলাম তাতে এইটার পরের সিজনের কোন আশা নেই বললেই চলে। তাই এটা আগে থেকেই জেনে রাখুন আর আনিমেটা এঞ্জয় করুন।

Sakib’s Hidden Gems – Episode #07

আনিমে: Lupin III (Lupin the Third)

জানরা: একশন, কমেডি, সেইনেন, অ্যাডভেঞ্চার
এপিসোড সংখ্যা: অনেক (হেঁহেঁ)
MAL লিঙ্ক: https://myanimelist.net/anime/1412/Lupin_III [শুধু অরিজিনালটা দিলাম, আরও আছে]
 
আজ আলোচনা করছি একটি ক্লাসিক আনিমে সম্পর্কে, যেটি সত্যিকার অর্থেই আজও পুরনো হয়নি। আনিমের কেন্দ্রীয় চরিত্র বিশিষ্ট চোর আরসেনে লুপান। সে রীতিমত আগে থেকে ঘোষণা দিয়ে চুরি করায় এক্সপার্ট। অসাধারণ বুদ্ধি ও ছদ্মবেশ ধরার কৌশলে সে প্রতিবার পুলিস ও গোয়েন্দাদের কলা দেখিয়ে কাজ হাসিল করে নেয়। তার আছে এক অসামান্য গুণ, সে অন্য মানুষদের আকৃষ্ট করে ওর Charisma দিয়ে। তাই ওর সঙ্গ নেয় কুইক ড্রতে পারদর্শী জিগেন, সামুরাই গোএমন, ও অনিন্দ্যসুন্দরী সিডাকট্রেস মিনে ফুজিকো। কখনও একলা, আবার কখনও বা এদের সাহায্যে লুপান তার কাজ হাসিল করে। আনিমেটি মূলত এপিসোডিক।
 
 
 
এই আনিমেতে যেই পুরনো দিনের ছোঁয়া পাওয়া যায়, তা বেশিরভাগ আনিমেতেই পাওয়া যায়না। হায়াও মিয়াজাকির মত বিখ্যাত লোক এই আনিমের কয়েকটি এপিসোড ডাইরেক্ট করেছেন। অসাধারণ Jazz মিউজিকের ব্যবহার হয়েছে এইখানে। হাল্কা কামোত্তেজনার স্বাদও আছে, অ্যাডভেঞ্চার এর থ্রিলও আছে। আনিমেটাতে আইডিয়া একদম ঠাসা। যেমনঃ একটি এপিসোডে লুপান একটি টাকশালে ঢুকে টাকা ছাপিয়ে আনে (জি ভাই, মানি হাইস্ট সিরিজের আগের কথা এইটা)। আনিমেটা কিন্তু আস্তে আস্তে দেখার জিনিস। যেহেতু এপিসোডিক আনিমে, তাই যখন মুড আসবে তখন দেখবেন।
লুপান ফ্র্যানচাইজটা বিশাল। একেকটা সিরিজের আরটস্টাইল ভিন্ন ভিন্ন। যারা শুরু করতে চায়, তাদের অনেকেই বুঝে উঠতে পারে না কোত্থেকে শুরু করা। তাদের আমি বলব “The Castle of Cagliostro” মুভিটা আগে দেখতে। এইটা মিয়াজাকির করা, জিবুরির বানানো ফিল্মগুলির মত ভাইব পাবেন। এইটা ভালো লাগলে “The Woman Called Fujiko Mine” দেখতে পারেন [নুডিটি আছে কিন্তু]। তারপর দেখুন তিনটি সিকুয়েল মুভি। প্রথমটির নাম Jigen Daisuke no Bohyou। এইগুলো দেখে যদি ভালো লাগে, কেবল তবেই অন্যান্যগুলি দেখা যেতে পারে। তবে আমি পরামর্শ দিব https://www.animenewsnetwork.com/feature/2016-01-22/lupin-the-third-where-to-start-and-what-worth-watching/.97834 এবং https://www.animenewsnetwork.com/feature/2016-01-27/lupin-the-third-the-complete-guide-to-films-tv-specials-and-ovas/.98031 গাইডগুলি ফলো করতে।

Violet Evergarden [রিভিউ] — Loknath Dhar

I want to know what ‘I love you’ means.
– Violet Evergarden.
 
মানুষ – অদ্ভুত, জটিল একটা প্রাণী। সহজ, সরল আবেগগুলোকে কি জটিল করেই না উপস্থাপন করে! মাঝে মাঝে মনে হয়, সকল অসুন্দর আর সুন্দর -এর জন্ম এই সহজ আর জটিলতার মাঝে। আমার মনে পড়লো, একদিন ছোটভাইয়ের সাথে আমার রেগে যাওয়ার কথা, কোন একটা কারণে রেগে গিয়ে ফোনে বললাম, আবারও ফোন করলে তোর খবর আছে। রাতে আবিষ্কার করলাম, গাধাটায় সত্যি সত্যিই আর ফোন দেয় নি – ভয়ে হোক অথবা আমার কথা মেনে নিয়ে। অথচ আমি মানুষ, হয়তো ফোন দিয়ে ‘ভুল হয়ে গেছে’ বললেই কপট রাগে আমি বলতাম, হইছে, পড়তে যা। ফোনটা রেখে হয়তো একটু হেসে ব্যস্ত হয়ে পড়তাম নিজের পৃথিবীতে। মানুষের শব্দই সবকিছু না। শব্দের বাইরেও বলার মত বিশাল পৃথিবী থাকে। মানুষ সবকিছু বুঝে উঠতে পারেও না। যেমন আমি, আমি বুঝি না পৃথিবীর অনেককিছুই। এই বিশাল, না বোঝার পৃথিবীতে আমার একলা একলা লাগে। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরি, গল্পগুলো দেখি। মাঝে মাঝে বৃষ্টি নামে, মাঝে মাঝে অসহ্য রোদ। ক্লান্ত বিকেলের পরে যে সন্ধ্যেগুলো বাতাস বয়ে নিয়ে আসে একটা ফিসফিসানি, একটু চোখ মেলে তাকানোর; তাতে সজোরে শ্বাস নিয়ে আমি বোঝার চেষ্টা করি, সমগ্র অস্তিত্বটাকে হাচড়ে পাঁচড়ে আঁকড়ে ধরে, বেঁচে থাকাটা আসলে কি? ঠিক যেমন, ভায়োলেটের যাত্রার মত, আমি তোমাকে ভালোবাসি – এর অর্থ কি?
 
 
অজস্র প্রশ্নে জর্জরিত পৃথিবীতে মানুষ সেই আদিকাল থেকেই খুঁজে বেড়াচ্ছে নিজের স্বত্তাকে অনুভব করার, বুঝে ওঠার; আমাদের অস্তিত্বের সাথেই, একেবারে পাশেই বসে থাকা প্রেম, এই ভালোবাসার অনুসন্ধান করে নি, এমন মানুষ পাওয়া দুষ্কর হতেও পারে। হয়তো বুঝে, হয়তো না বুঝে তবু সন্ধান করেছে সবাইই। তবুও, শব্দ সবকিছু বলে না, কথার বাইরেই কথা থাকে, থাকে আস্ত একটা পৃথিবী, ভালোবাসি তো মোটে ভাষার একটা শব্দ, একটা অনুভূতিকে নির্দেশ করে কিন্তু এই অনুভূতিটা কি? এই ছোট্ট শব্দটার বিস্তৃতি কতটুকু? এই শব্দটার সত্যিকারের অর্থ কি? প্রিয় ভায়োলেটের সাথে হাঁটতে হাঁটতে বিষণ্ণ, পরিচিত পৃথিবীতে ফিরে গিয়েছি অসাধারণ, অন্য পৃথিবী থেকে উঠে আসা সুরগুলোর সাথে, প্রিয় ভায়োলেট, তোমার উত্তর কি? একটা বিষণ্ণ কিন্তু অদ্ভুত সুন্দর একটা হাসি!
 
হয়ত‌ো ওটাই ভালোবাসা?
ছোট্ট, বিষণ্ণ হাসি কত গল্প ধারণ করতে পারে, ভাবা আছে?
 
গল্পঃ বিশ্বযুদ্ধের পটভূমি থেকে উঠে আসা গল্পের চরিত্র ভায়োলেট আবিষ্কার করে নতুন, একটা সম্পূর্ণ অপরিচিত পৃথিবী যেখানে সে আক্ষরিক অর্থেই একা। যুদ্ধে ভায়োলেট ছিলো খুনে একটা অস্ত্রের প্রতীক, যে শুধু খুন করতেই জানে, অন্য কোন অনুভূতির সাথে সে পরিচিত নয়। সে যুদ্ধের পৃথিবীতে তার একটাই মানুষ ছিলো, মেজর গিলবার্ট, যার অর্ডারে সে করতে পারতো না এমনকিছু নেই। যুদ্ধে মেজর গিলবার্ট মারা যাবার ঠিক আগে ভায়োলেটকে অর্ডার দিয়ে যায় বাঁচতে এবং, এবং, অনুভূতির এই জটিল, অপরিচিত পৃথিবীতে ভায়োলেটকে উপহার দিয়ে যায় তিনটি শব্দ, আমি তোমাকে ভালোবাসি।
 
আমি তোমাকে ভালোবাসি – এর অর্থ কি, ভায়োলেট?
 
আমি তোমাকে ভালোবাসি – এর অর্থ খুঁজতেই শুরু হয় ভায়োলেটের গল্প, যুদ্ধের পর যুদ্ধাবশেষের উপর গড়ে ওঠা নতুন একটা পৃথিবীতে। শুরু হয় এক ভ্রমণ, ভালোবাসার অর্থ খোঁজা যার মূল লক্ষ্য। অটো মেমোরি ডল হিসেবে জীবন শুুরু করে সে, যার কাজ হলো প্রিয়জনকে চিঠি লেখা। চিঠি লেখার মাধ্যমে মানুষের এই অসহ্যকর, অসহনীয় জটিল অথচ সহজ আর সুন্দর অনুভূতিকে তুলে আনা। সম্পূর্ণ অপরিচিত পৃথিবীতে ভায়োলেট তিনটি শব্দের অর্থ কি খুঁজে পাবে?
 
অনুভূতিকে বুঝতে হলে ছুঁতে হয় অন্যকে, আঙুলের, হাতের স্পর্শে নয় – খেয়াল করতে হয় মানুষটাকে; শব্দের সাথে সাথে খেয়াল করতে হয় চোখ, গলার কম্পন, হেঁটে চলে যাবার ভঙ্গি। শুনতে হয় তার গল্প, নিজেকে খুলে দিতে হয় তার কাছে, তার চোখ দিয়ে দেখা পৃথিবীটাকে গড়ে নিতে হয় নিজের ভেতর, তার জীবনের চরিত্রগুলোকে বুঝতে হয় তার চোখ দিয়ে, নিজের অনুভূতির অনেকটা অংশ বরাদ্দ দিতে হয় সেই পৃথিবীটার কাছে। মানুষ এমনই জটিল, এমনই সুন্দর!
 
ভালোবাসা কি শুধুই একটা শব্দ? বেঁচে থাকার কারণ, এগিয়ে যাবার কারণ, সুখ, দুঃখ, ব্যথা, হাসি, কান্নার কারণ – কত রহস্য ধারণ করে একট শব্দ? শব্দটা আসলে কি?
 
ভায়োলেটের উত্তর খুঁজে পাওয়ার সাথে সাথে উত্তর খুঁজে পাক সেই সকল মানুষ, যারা এই সুন্দর শব্দটার কাছে এসে বসেছে, বুঝতে চেয়েছে তার গতিপ্রকৃতি। উত্তর হোক যার যার নিজের মত, যতটা সুন্দর মানুষ হয়।
 
অসাধারণ এনিমেশন, চমৎকার গল্প (একটু ধীরগতির), চমৎকার সাউন্ডট্র্যাক আর অজস্র ব্যথা আর কান্নায় মোড়ানো এবং প্রবল বৃষ্টির পর দিনশেষে মেঘের আড়াল হতে বেরিয়ে আসা মিষ্টি রোদের মতন ছোট্ট একটু হাসি – এটা হচ্ছে আনিমে, ভায়োলেট এভারগার্ডেন।
 
সাজেশনঃ ভায়োলেট এভারগার্ডেনে অবর্ণনীয় একটা সৌন্দর্য আঁকা হইছে পুরোটা গল্প জুড়ে, যা বুঝতে হলে দেখতে হবে, বুঝিয়ে বলার কোন ভাষা নাই। আমার কাছে, ভায়োলেট এভারগার্ডেন একটা ক্লাস। এস্থেটিক কিছু একটা।
 
সংক্ষেপেঃ
  • Anime : Violet Evergarden
  • Type : Series
  • Genre : Slice of life, Drama, Fantasy
  • Studio : Kyoto animation
ব্যক্তিগত রেটিংঃ ৯/১০
 
(বিঃদ্রঃ -০১: আনিমের ভেতর প্রিয় অনেক কথা আছে, অনেক দৃশ্যের ব্যক্তিগত গল্প আছে। বলতে গেলেই স্পয়লার হয়ে যাবে। সামলে রাখা পুরোটাই। দেখতে দেখতে উপলব্ধি হোক। উপলব্ধিতে ছুঁইতে পারলে পৃথিবী আরও সুন্দর হোক। এই আনিমের স্পয়লার দেয়া মারাত্মক অপরাধ। কারণ, অনুভূতির মুখোমুখি দাঁড়ানো হোক নিজ থেকেই। চোখ জুড়ে কান্না আসুক, ঠোঁটে আসুক মিষ্টি একটু হাসি।
 
বিঃদ্রঃ -০২: কথাটা ইউটিউবের কমেন্ট থেকে পাওয়া; যারা আনিমেটা দেখেছেন, তারা কি উপলব্ধি করেছেন, শুরুর গানটা ভায়োলেটের, মেজর গিলবার্টের প্রতি?)

Ride Your Wave [মুভি রিভিউ] — Shifat Mohiuddin

ইচ্ছেপূরণ বা wish-fulfillment একটা ইতিবাচক জিনিস হিসেবেই বিবেচিত আমাদের কাছে। দিনশেষে সবকিছু ভালভাবে মিটে গেলেই আমরা খুশী, মিটে না গেলেও সবকিছু মিটে যাওয়ার সুখস্বপ্ন নিয়ে থাকতে আমরা ভালোবাসি। কিন্তু লেবু বেশী চিপলে যেমন তিতে হয়ে যায় তেমনি অতিরিক্ত উইশ-ফুলফিলমেন্ট বাস্তবতাকে ততোধিক বিকৃত করে ফেলে। এনিমে ইন্ডাস্ট্রির একটা বড় আকারের কাজ এই দোষে দুষ্ট। তারপরেও এনিমে ইন্ডাস্ট্রিতে এ ধরণের গল্পের চাহিদা প্রচুর। প্রথমেই সমালোচনা করছি মানে এ নয় যে আমি এ ঘরানার গল্প নিতান্তই অপছন্দ করি। Clannad এই বৈশিষ্ট্যের পরাকাষ্ঠা হওয়ার পরেও আমার সেরা দশ এনিমের তালিকায় অনায়াসে জায়গা করে নেয়।

তবে Ride Your Wave নিয়ে শুরুতেই কেন আমার এত নেতিবাচক ভূমিকা! দোষটা আসলে সরাসরি এনিমে মুভিটার ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া যায় না। দোষ দিলে দিতে হবে আমার এক্সপেক্টেশনকে! মাসায়াকি ইউয়াসা আর Science Saru এর কাছ থেকে আমার প্রত্যাশা বরাবরই প্রবল থাকে। ইউয়াসার কাজকে ক্ষুদ্র পরিসরে মাপা দুরূহ কাজ। সংক্ষেপে বলতে গেলে তার কাজের ব্রিলিয়ান্সটা লুকিয়ে আছে অদ্ভুতুড়ে জিনিস উপহার দেয়ার মধ্যে। জাদুবাস্তবতাও তার কাজের আরেকটা বড় উপাদান। এহেন ইউয়াসা যখন দু-বছর পরে (The Night is Short, Walk on Girl এর মুক্তির পর) এমন generic একটা মুভি বানিয়ে ফেলেন তখন নেতিবাচক পোস্ট দেয়া ছাড়া উপায় থাকে না।

Ride Your Wave মুভিটা যাবতীয় জেনেরিক দোষে দুষ্ট। ঘটনাক্রমে নায়ক-নায়িকার দেখা হয়ে গেল, তারপর তারা কিছু সময় কাটানোর পর কাছাকাছি হওয়া শুরু করলো, একে-অপরের অনুপ্রেরণা হিসেবে আবির্ভূত হল; এরকম কয়েকটা কমন থিম নিয়েই মুভির শুরুটা। তাও প্রথম ত্রিশ মিনিট আমি মুভিটাকে কিছুটা মাফ করে দিতাম কারণ নায়ক-নায়িকার মিষ্টি মিষ্টি সময় কাটানোটা ভালই লাগছিল। চরম ইউটোপিয়ান একটা পরিবেশে তখন দুজনে বাঁধা পড়ে, বল্গাহীন ভাবে তারা জীবনকে যৌবনের নিরীখে উপভোগ করছিল। একটা ভাল দিক ছিলো, মিনাতো আর হিনাকো দুজনেই ছিল হাইস্কুল পেরোনো মানুষ, তাই তাদের অন্তরঙ্গ মুহূর্তগুলো ছিল সাধারণ এনিমের চেয়ে বেশী সাহসী। এখানে উইশ-ফুলফিলমেন্ট থেরাপি কাজ করছিল আমার উপর। দৈনন্দিন জীবনের যাঁতাকলে নিত্য পিষ্ট আমার কাছে দুই তরুণ-তরুণীর আগলছাড়া রোমান্টিসিজম ভাল লাগবে অবশ্যই।

ভাল না লাগার মাত্রাটা বাড়ে যখন গল্পের তাগিদে মিনাতো মারা যায়। মৃত্যূটা বীরোচিত ছিল তবে নিঃসন্দেহে বলা যায় কোন গভীরতা বহন করছিল না। ২০১৮ সালে বের হওয়া I wanna eat your pancreas মুভিতেও একই ঘটনা ঘটতে দেখেছি। এরপরেও ভেবেছিলাম মুভিটা সম্ভবত প্রিয় মানুষ হারানোর বেদনার উপর আলোকপাত করবে হিনাকোর দৃষ্টিকোণ থেকে। তাও হলো না! আকাশ থেকে আনা হলো সুপারন্যাচারাল ম্যাটেরিয়াল, আমাকে পুরো বোকা বানিয়ে মুভিটা দেখালো যে পানির মধ্যে মিনাতোর অস্তিত্ব নিতান্ত হিনাকোর হ্যালুসিনেশন নয় বরং বাস্তব! তারপর আবার ‘দেখা পেয়েও ছোঁয়া হলো না’ ঘরানার জেনেরিক জিনিসের আমদানী। অথচ বোকা আমি Shape of Water এর গন্ধ খোঁজার চেষ্টা করছিলাম তখন ফিল্মে! (অট্টহাসির আওয়াজ হবে)
শেষমেষ ফিল্মটা আমাকে শতভাগ বেকুব আর হতাশ বানিয়ে হিনাকোর সিঙ্গেল থাকা দেখিয়ে শেষ হলো।

তারমানে এমন না যে মুভিটাতে ভাল কোন উপাদান নেই। অ্যানিমেশন মনকাড়া, সার্ফিংয়ের জায়গাগুলা অপূর্ব। ইউয়াসার ট্রেডমার্ক ফ্লুইড অ্যানিমেশন আছে জায়গায় জায়গায়। ক্যারেকটার ডিজাইন সুন্দর, রোমান্টিক জায়গাগুলোতে হিনাকো আর মিনাতোকে খুবই সুন্দর লাগছিল। কিন্তু ঐযে style over substance বলে একটা কথা আছে না, তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ এই মুভিটা। আর ওএসটির কথা বলতে গেলে আরেক নাটকের অবতারণা করতে হয়! পুরো মুভিতে একটা মাত্র গান বারবার ব্যবহার করা হয়েছে যে জিনিসটা আমার কাছে পরে বিষপানের মত মনে হচ্ছিল। এমন বলবো না যে Generations from Exile Tribe এর গাওয়া ‘Brand New Story’ গানটা খারাপ, বরংচ বেশ ভাল একটা গানই এটা নিজ জনরার মনে করি। তবে বারবার একই গান ব্যবহার করাটা খুব বাজে লাগছিল, কেন একই গ্রুপকে দিয়েই আরো দু-তিনটা গান গাইয়ে মুভিতে ব্যবহার করা হলো না তা এখনও বোধগম্য হলো না। এই প্রথমবারের মত ইউয়াসা আমাকে পুরোপুরি হতাশ করতে সমর্থ হলেন!

সারাংশ:
সাধারণ মুভি হিসেবে উপভোগ্য
মাসায়াকি ইউয়াসা মুভি হিসেবে চরম হতাশাজনক

I Want to Eat Your Pancreas [মুভি রিভিউ] — Loknath Dhar

যদি আপনাকে বলা হয়, আপনি আর দুই কি তিনমাস বেঁচে থাকবেন এই পৃথিবীতে, আপনি তখন কী করবেন? ঘরে বসে থেকে অজস্র চিন্তায় সময় নষ্ট করবেন নাকি আরও চমৎকার বেঁচে থাকার চেষ্টা করবেন, ঘর থেকে বেরিয়ে পড়বেন ক্ষুদ্র জীবনের ছোট্ট বাকেটলিস্টটার কিছু ইচ্ছে পূরণ করতে? ওয়েল, আমার মত অনেকেই দ্বিতীয় অপশনটা খপ করে ধরে নিবে। কিন্তু ধরেবেঁধে নিয়ম দিলেই আপনার কেন সেই ইচ্ছেটা পূরণ করতে হবে? আপনি তো আগামীকালও মারা যেতে পারেন ঘর বসে থেকেই, কিছু জেনে বুঝে ওঠার আগেই। তাহলে প্রতিদিন যে চমৎকার বেঁচে থাকার চেষ্টা করছেন না, নিজের ছোট্ট বাকেটলিস্টটার প্রতিটি অপশনে টিক দিচ্ছেন না, this was a life worth living কথাটা ভাবার আগেই যদি হারিয়ে ফেলেন সমস্ত অস্তিত্ব, তখন কেমন হবে? এখন, যদি উত্তর হয়, কারণ সাধারণ জীবনে আমাদের কিছু দায়িত্ব থাকে, সময় ও সুযোগ হয়ে উঠবে না অনেক ক্ষেত্রেই, দুইয়ে দুইয়ে চার হয় না, তাহলে বলুন, দুটি মৃত্যুর ভেতরে আসলে পার্থক্য কি খুব বেশি? জন্মিলে মরিতে হয় – এর চেয়ে সত্য যেমন নাই, তাহলে মৃত্যুটা নিশ্চয়তার জালে আটকা পড়ে গেছে অনেক আগেই; বেঁচে থাকার লিমিটটা জানা যদি হয়েও যায়, তবুও কেন তাকে আলাদা চোখে দেখতে হবে? আগামীকাল আপনি মারা যাবেন সম্ভাবনার সাথে এটা সত্য এই যে, একদিন না একদিন আপনি মারা যাবেনই; তাহলে দুই কি তিনমাস পরে যে মৃত্যুটাকে বরণ করতে যাচ্ছে, তার সাথে আপনার তো তেমন পার্থক্য নেই। তার জন্য মন খারাপ না করে, তাকে করুণার চোখে না দেখে বরং তার সাথে জীবনটাকে, নিজের সময়টাকে একটু মিলিয়ে নিজের স্বাভাবিক জীবনের মত তার জীবনকে স্বাভাবিক উপহার দিলে যে সৌন্দর্যের রচনা হয়, সে সৌন্দর্যের মতন সৌন্দর্য কমই আছে পৃথিবীতে, অনুভব করতে পারেন?
 
এমন অদ্ভুত নামের মুভিটাতে এই চিন্তার দেখা মিলেছে এবং মুভিটা সত্যিকার অর্থেই জানতে চেয়েছে, তার গল্পের মাঝে, আপনার কাছে, প্রিয় দর্শক, বেঁচে থাকাটা আপনার কাছে কি?
 
এবং মুভির উত্তরটা পেতে হলে আপনাকে নিজেরই দেখতে হবে।
 
 
প্যানক্রিয়াস নামের সাথে যদি পরিচয় না থাকে, অদ্ভুত নামটা দেখে ভাববেন না, হাতে তৈরি মিষ্টি, লোভনীয় কোনো খাবার, সাধারণ অর্থে প্যানক্রিয়া হইলো মানুষের দেহের পাচকতন্ত্রের একটা অঙ্গ, যা খাবার হজমে সহায়তা করে এবং মানুষকে তার দৈনন্দিন কাজ করার ক্ষমতাকে চালু রাখার জন্য শক্তি প্রদান করে (ডাক্তারদের হাই!)। ওয়েট ওয়েট, এইটা ক্যানিবালিজম নিয়ে কোনো মুভিও না, মুভিতে শুধু একটুখানি প্যানক্রিয়া খাওয়ার ইচ্ছেই প্রকাশ করছে কারণ জাপানিজ এক প্রবাদ বা বিশ্বাস অনুযায়ী, আপনার কোনো দেহের কোনো অংশে যদি কোনো সমস্যা থাকে এবং প্রিয়জনের সেই অংশটা যদি আপনি খান, তাহলে আপনার সেই বডি পার্টটা সুস্থ হয়ে যাবে।
 
সাকুরা, গল্পের মূল চরিত্র প্যানক্রিয়াটিক ডিজিজে ভুগছে এবং শ্রীঘ্রই সে মারা যাবে। তারই ক্লাসের নামহীন এক ক্লাসমেইট হাসপাতালে একদিন তার ডায়রি আবিষ্কার করে এবং ডায়রিতে চোখ বুলিয়ে সে জানতে পারে, কিছুদিন পরেই সাকুরা মারা যাচ্ছে। সাকুরার কাছে জানতে পারে, ক্লাসের একমাত্র সেই জানলো এই তথ্যটা এবং ক্লাসমেইট বি লাইক, হু কেয়ারস। চললাম।
 
জীবন তাদের কাছে কি, বেঁচে থাকাটা কি সেটাই গল্পে উঠে এসেছে একদম শেষ মূহুর্ত পর্যন্ত।
আই মিন, মার্ভেল ইউনিভার্সের মত ক্রেডিটের শেষেও গল্প রাখা আছে। দেখিয়েন।
 
মুভিটা প্রেডিক্টেবল। মুভির ডিরেক্টরও জানতেন, তাই শুরুতেই তিনি স্পয়লার খাইয়ে দিয়েছেন, লেখা পড়ে সেটাও আপনি বুঝতে পারছেন সহজেই। এই ধরনের মুভিতে উঠে আসার কথা যে যে বিষয়গুলো – কমবেশি সবই উঠে এসেছে এবং আপনি যদি ভাবেন, প্রেডিক্টেবল মুভিটা দেখে লাভ কি – ওয়েল, প্রেডিক্টেবল, তবুও সুন্দর। অনেক সুন্দর! এক্সট্রোভার্ট আর ইন্ট্রোভার্ট দুই প্রোটাগনিস্ট জীবনকে কিভাবে নিচ্ছে, নিতে যাচ্ছে – দেখতে দেখতে মন খারাপ হয়তো হবে আবার ভালোও লাগবে ভীষণ। মানুষ হিসেবে আমরা অন্য মানুষের কাছে কি চাই? সুন্দর কিছু স্মৃতি? হ্যাঁ, আর বুকের গভীরে কোথাও লুকিয়ে থাকা ছোট্ট একটা ইচ্ছে, আমাকে একটু মনে রাখুক।
 
আপনি কেন বাঁচবেন জানেন? কারণ, আপনি মারা যাওয়ার সাথে সাথেই আপনাকে ছেড়ে চলে যাওয়া মানুষগুলোর স্মৃতি আপনার সাথে সাথেই শেষ হয়ে যাবে। আর এই স্মৃতিগুলো ইউনিক কারণ মানুষ হিসেবে আপনি নিজেই ইউনিক, আপনার মতন মানুষ পৃথিবীতে আর একটাও নাই, আপনার চোখ দিয়ে দেখা সেই মানুষগুলোর ছবি আর কারো চোখে দেখা নাই। তাই হয়তো মানুষ বাঁচে, তাই হয়তো বাঁচতে হয়। আনিমের কিছু শক্ত ভিত্তির ভেতর এই অনুভূতিটা অন্যতম একটা উপাদান এবং এই মুভিতেও এই ভাইভটা উঠে এসেছে শক্তভাবেই।
 
চমৎকার এনিমেশনের সাথে মানানসই ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের সাথে, নরম, আরামদায়ক অথচ ব্যথাতুর উপস্থাপনার প্রেডিক্টেবল এই মুভিটা দেখা শেষ করে একটু ব্যথাই লেগেছে – প্রিয় মানুষগুলো চলে গেলেও ব্যথা বুকে নিয়ে মুখে হাসি রেখে বেঁচে থাকা জীবনটা এত সুন্দর, এত সুন্দর! সেই সৌন্দর্যটা অনুভব করে নিতে হয় কিন্তু চোখে দেখা যায় না কেন? এত অদ্ভুত সৌন্দর্যের কোনো মানে হয়?
 
সাজেশনঃ আবারও বলছি, প্রেডিক্টেবল মুভি। কিন্তু দেখে আশা করি মনে হবে না, সময় নষ্ট করেছি।
 
সংক্ষেপেঃ
  • Anime : I want to eat your pancreas.
  • Type : Movie
  • Genre : Drama
  • Director : Shin’ichirō Ushijima
  • Studio : Studio VLON
ব্যক্তিগত রেটিংঃ ৮/১০