Honey and Clover [Reaction] — Shifat Mohiuddin

Honey and Clover 1

(প্রচুর স্পয়লারযুক্ত পোস্ট, আসলে পুরো পোস্টটাই স্পয়লার। তাই এনিমে যারা দেখেননি তাদের না পড়ার অনুরোধ রইলো)

“বাথবিহীন ছয় তাতামির একটি রুম, কলেজ থেকে দশ মিনিটের হাঁটা দূরত্ব। পঁচিশ বছরের পুরনো বাসা, ভাড়া ৩৮০০০ ইয়েন। দেয়ালগুলো যথেষ্ট পুরু নয় এবং শব্দনিরোধকও নয়। বাসিন্দারা সবাই ছাত্র। পূর্বমুখী হওয়ার কারণে সূর্যের আলোও ভাল পাওয়া যায়। আর্ট কলেজে ভর্তির সুবাদে গতবছর থেকে আমি টোকিওর বাসিন্দা। ক্যাম্পাসের চারদিকটা অনেক খোলা জায়গা দিয়ে ঘেরা থাকায় আমি যারপরনাই অবাক হয়েছি। আরও অবাক হয়েছি আমার নিজের হাতের রান্নার বাজে স্বাদ দেখে। অবাক হয়েছি পাবলিক বাথহাউসের উচ্চমূল্য দেখে এবং গাদা গাদা হোমওয়ার্কের স্তূপ দেখে। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় এসব এখন আমার নিত্য জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।”

*

আর্ট কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র তাকেমতো ইউতার জীবনের সারসংক্ষেপ হয়তো এটাই। জীবন নিয়ে শূন্য প্রত্যাশাধারী এই সদ্য কৈশোরত্তীর্ণ এই যুবক কিছু একটা খুঁজে পাওয়ার জন্য ভর্তি হয় স্থাপত্যবিদ্যা বিভাগে। কিন্তু সেই মানে আর খুঁজে পাওয়া হয়ে উঠে না। তাকেমতো মনে করে সে প্রতিভাহীন। মধ্যবিত্ত সন্তান হওয়ার কারণে কোন ধরণের বিশাল সাহায্যও তার পেছনে নেই। গ্র‍্যাজুয়েট হয়ে বের হওয়ার পরে নিজের পায়ে দাঁড়াবে এই প্রত্যাশাই তাকেমতোর মফঃস্বলবাসী বাবা-মার।

*

তাকেমতো কিন্তু আবার পিতৃহীন। শীর্ণকায় তাকেমতোর পিতা ছিলেন অনুপ্রেরণাদায়ী। তাকেমতোর শৈশব তাই পিতার স্নেহের ছায়াতলেই কেটে যায়। কিন্তু হাসপাতালে দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকা তাকেমতোর পিতা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তাকেমতোর হাত ধরা অবস্থাতেই। চলে যাওয়ার আগে এগিয়ে যাওয়ার শেষ উপদেশ দিয়ে যান নিজ সন্তানকে। তাকেমতো তাই মাঝেমাঝেই সাইকেলে চড়া অবস্থায় চিন্তা করে সে পেছন দিকে না তাকিয়ে প্যাডাল ঘুরিয়ে কতটুকু আগাতে পারবে। তাকেমতোর মানসপটে তাই বারবার চলে আসে বিকেলের সোনালী আলোতে ঘুরতে থাকা সাইকেলের চাকা। মানসপটে এই দৃশ্য আসার সাথে সাথে তাকেমতো এগিয়ে যেতে না পারার আফসোসে নিমজ্জিত হয়।

*

মেসে থাকা আপারক্লাসম্যান মোরিতা শিনোবু এক রহস্যময় মানুষ। সেই সাথে সে প্রতিভাধরও বটে। ভাষ্কর্য বিভাগের ছাত্র মোরিতা পড়াশুনায় চরম অমনোযোগী। ঠিকঠাকমত প্রথম ক্লাসে উপস্থিত না থাকা এবং গ্র‍্যাজুয়েট থিসিস জমা দেওয়াতে গাফিলতি করায় চার বছরের কোর্স করতে তার আজ সাত বছর লাগছে। এ বছরও তার পাস করা নিয়ে শিক্ষক-সহপাঠী সবাই সন্দিহান। হুটহাট করে উধাও হয়ে যাওয়া এই মানুষটিকে ঘুম থেকে জাগানোর সাধ্য কারোর নেই। প্রতিবার নিরুদ্দেশ অবস্থা থেকে ফিরে আসার পর আশ্চর্যজনকভাবে তার পকেটে মোটা অংকের টাকার অস্তিত্ব পাওয়া যায়। নিজের চারপাশের মানুষদের নিয়ে আবার ভালই সচেতন এই খেয়ালী মানুষটি। কিন্তু এই সচেতনতার বিন্দুমাত্রও খাবার শেয়ার করার সময় বরাদ্দ থাকে না!

*

তাকেমতোর পাশের রুমে থাকা আরেক আপারক্লাসম্যান তাকুমি মায়ামা। চতুর্থ বর্ষের ছাত্র মায়ামা ঠান্ডা মাথার অধিকারী। তাদের আরেক শুভাকাঙ্ক্ষী হল মৃৎশিল্পের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী আয়ুমি ইয়ামাদা। মেস থেকে অনতিদূরে বসবাস করেন চিত্রকলার অধ্যাপক হানামতো শুজি। ঘনিষ্ঠতার কারণে তার বাসায় নিয়মিত যাতায়াত তাকেমতো-মায়ামা-আয়ুমিদের। মোরিতাও খুব প্রিয়পাত্র হানামতো-সানের। একদিন হানামতো-সান তার কাজিনের মেয়ে হাগুমি হানামতোর সাথে সবার পরিচয় করিয়ে দেন। আসল বয়সের চেয়ে দেখতে কয়েক বছর কম মনে হওয়া হাগু-চানের সাথে সবার ঘনিষ্ঠতা হতে সময় লাগে না। ঘটনাস্থলেই তাকেমতোর চেহারায় সদ্য প্রেমে পড়ার চিহ্ন দেখতে পায় মায়ামা। তৈলচিত্রের প্রথম বর্ষের এই ছাত্রীর চেহারা যেন তার মানসপটে তৈলচিত্রের মতই স্থায়ী হয়ে যায়।

তাকেমতো যেন তার অন্যান্য অপ্রস্তুত গুণাবলীর মতে প্রেম প্রকাশেও সদ্য অপ্রস্তুত। তবে আমতা আমতা করে সবার আগে হাগু-চানের সাথে বন্ধুত্ব করে ফেলে সেই সবার আগে। ঘটনাস্থলে তখনই আগমন মোরিতা-সানের। মোরিতার জোরালো আবেদনের কাছে তাকেমতো যেন খড়কুটো মাত্র। আর এখানেই যেন তাকেমতোর থেকে মোরিতার স্বতন্ত্রতা। তাকেমতো যেখানে নিজের পছন্দের কথা বলতে অপারগ মোরিতা সেখানে প্রথম থেকেই স্বতঃস্ফূর্ত। প্রথম থেকেই সে হাগু-চানের সাথে আচরণ করতে থাকে নিজের ইচ্ছেমত। হাগু-চানকে বহুদিনের পরিচিত মানুষের মত সাজাতে থাকে ইচ্ছেমত। ফলে তাকেমতো বিরতিহীনভাবে নিজের ক্ষমতাহীনতা উপলদ্ধি করতে থাকে। সে না পারে মোরিতা সানের মত ৩২০০০ ইয়েনের একজোড়া জুতো উপহার দিতে, না পেরে উঠে এক টুকরো কাঠ থেকে মনে রাখার মত একটা শিল্পকর্ম বানিয়ে হাগু-চানকে দিতে। তাকেমতো বুঝতে পারে তার না আছে অগাধ প্রতিভা, না আছে অর্থনৈতিক প্রাচুর্য। অথচ এই দুটো জিনিসই থাকা মোরিতা-সানের প্রবল উপস্থিতি তাকেমতোর মনে সেই পুরনো প্রশ্নের অবতারণা ঘটায়, “ব্যর্থ প্রেমের কি কোন অর্থ আছে বাস্তবে”।

Honey and Clover 2
*

তাকেমতোর মানসপটে ফিরে আসে আবার সেই সাইকেলের চাকার ছবি। অস্বস্তি কাটানোর জন্য তাকেমতো মফঃস্বলে তার বাড়িতে ফিরে আসে। তাকেমতো তার শৈশবের স্মৃতিচারণ করতে থাকে। এর মধ্যে হুট করে তাকেমতোর সৎ পিতা এই মৌনাবস্থা ভেঙ্গে দেয়। তাকেমতো তার এই পিতাটির মধ্যে মৃত পিতার উপস্থিতি বিন্দুমাত্র অনুভব করে না। শীর্ণকায় দেহের বদলে এই লোকটি যথেষ্ট শক্তসামর্থ্য, তার পিতার স্বল্পভাষীতার তুলনায় এই লোক যথেষ্ট বাচাল। আড্ডা-গল্পের মাধ্যমে তাকেমতোকে জিইয়ে রাখার চেষ্টা করেন ভদ্রলোক। এত কিছুর পরও বিচলিত তাকেমতোর মনে একটি ঋণাত্মক মনোভাব এসেই যায়, “হাহ, এবার আমার মা একজন শক্তিশালী জীবনসঙ্গীকেই বেছে নিয়েছেন। আগের মত ভুল তিনি আর করেন নি।”

*

এদিকে কেটে যায় দু-দুটো বছর। হানামতো সানের তত্ত্বাবধানে হাগু-চানের প্রতিভার পূর্ণ বিকাশ ঘটে। তাকেমতো শেষ বর্ষে পদার্পণ করে। নিজের সামর্থ্য নিয়ে এখনো সন্দীহান সে। মোরিতা-সান এক জরুরী কাজ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যায়। কিছুটা হলেও স্বস্তি আসে তাকেমতোর মনে। হাগু-চানের ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুযোগ বাড়ে তাতে। হাগু-চানের প্রতিভা আর শিল্পের প্রতি একনিষ্ঠতা দেখে চমকিত হয় তাকেমতো। নিজের গ্র‍্যাজুয়েট থিসিস নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে তাকেমতো। কিন্তু লক্ষ্যহীন সে ঘোড়াকে ছোটাতে গিয়ে ব্যর্থ হয় তাকেমতো। শিক্ষকদের আন্তরিকতার পরও নিজের তৈরি ‘কৈশোরের মিনার’ নামক স্থাপনাকে তাকেমতো নিজের হাতেই গুড়িয়ে দেয়! অস্তিত্ব সংকটে ভোগা তাকেমতো পুনরায় থিসিস জমার ডেডলাইন পূরণ করতে চাইলে শরীর তাতে আর সায় দেয় না। তাকেমতোকে ভর্তি হতে হয় হাসপাতালে আর অন্যদিকে মোরিতা আমেরিকা থেকে অস্কার নিয়ে চলে আসে! আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার জন্য তাকেমতো তাই কাউকে কিছু না জানিয়েই ঘর ছাড়ে। সাইকেলে প্যাডেল মারতে মারতে তাকেমতো জাপানের একের পর এক এলাকা প্রদক্ষিণ করতে থাকে। অনেক সময়ই বিশুদ্ধ পানির মত প্রয়োজনীয় জিনিস সংগ্রহ করার জন্য তাকেমতোকে বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের কাছে অনুরোধ করতে হয়। অনেকে অবশ্য সন্দেহের চাওনি দেয়, তবে বেশিরভাগ মানুষের কাছেই তাকেমতো পায় আন্তরিক ভালবাসা। এক দোকানি মহিলা তো তাকেমতোকে দুপুরের খাবার খাইয়েই তবে ছাড়ে। ব্রিজের গোড়া, পার্কের বেঞ্চ ইত্যাদি হয়ে উঠে তাকেমতোর রাত কাটাবার জায়গা। নদীর তীরে কাপড় শুকাতে দেওয়া ভবঘুরে তাকেমতোর মনে সরল উপলদ্ধি জাগে “হয়তো জাপানে জায়গার অভাব নেই তবে বসবাসের মত ভাল জায়গা কমই আছে।”

*

ক্লান্ত-শ্রান্ত তাকেমতোর সাইকেল একপর্যায়ে মহাসড়কের মাঝপথেই ভেঙ্গে পড়ে। সাইকেল ঠেলে ক্লান্ত তাকেমতো একপর্যায়ে এক শিন্তো মন্দিরের সামনেই ঘুমিয়ে পড়ে। কিছুক্ষণ পরে শ্রমিক শ্রেণির মানুষের কোলাহলে তার ঘুম ভেঙ্গে যায়। তাকেমতো পরিচিত হয়ে একদল চিরন্তন ভবঘুরে মানুষের সাথে যারা ঘুরে ঘুরে জাপানের বিভিন্ন বৌদ্ধ আর শিন্তো মন্দিরগুলোর সংষ্কারের কাজ করে। দিনে ৪২০০ ইয়েনের বদলে তাকেমতো কাজ জুটিয়ে নেয় এই দলের সাথে। আর্কিটেকচারের ছাত্র হওয়ায় তাকেমতোর মনে কিছুটা হলেও আকাঙ্ক্ষা ছিল নির্মাণকাজে দক্ষতা দেখানোর ব্যাপারে। কিন্তু সেই আশায় গুড়ে বালি, তাকেমতোর প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশুনা তেমন কোন কাজে আসে না তাদের। তাই তাকেমতো দায়িত্ব নেয় রান্নাঘরের। তাকেমতোর হাতের রান্নায় যেন অমৃত খুঁজে পায় নির্মাণশ্রমিকরা। বিশেষ করে বৃদ্ধ লোকগুলার আবেগ তো অতিরিক্ত বেশি ছিল! ফলে কিছুদিনের মধ্যেই তাকেমতো সবার আপন হয়ে যায়। দশদিনের চুক্তিতে কাজ নেওয়া তাকেমতো তাই কোন ফাঁকে চৌদ্দদিন কাটিয়ে ফেলেছে তা উপলদ্ধিই করতে পারে না। পাওনা পঞ্চাশ হাজার ইয়েন নিয়ে সাইকেল মেরামত করতে চাইলে সহৃদয় ম্যানেজার তাকেমতোকে সেই টাকাসহ একটা নতুন সাইকেলই দিয়ে দেন। তিনি টাকা ফেরত নিতে চান না বরং তাকেমতোকে অনুরোধ করেন ভ্রমণ শেষে যেন তাকেমতো যেন তাদের দলের সাথে দেখা করে যায়। একগুচ্ছ ভাল লাগা অনুভূতিকে সম্বল করে তাকেমতো তার উত্তরমুখী যাত্রা আবার শুরু করে। প্যাডাল মারতে মারতে তাকেমতো উপলদ্ধি করে যে, তার মানসপটে থাকা চলতে থাকা সাইকেলের চাকার চিত্র যেন এই চিরভবঘুরে দলেরই প্রতিচ্ছবি। সেখানেই তাকেমতো তার আজীবনের গন্তব্য খুঁজে পায়।
প্যাডাল মারতে মারতে তাকেমতো এক পর্যায়ে জাপানের উত্তর দিকের একেবারে শেষ পয়েন্টে এসে হাজির হয়। সামনে এগুনোর আর জায়গা তাই আর রইলো না, প্যাডেল মেরে কতটুকু যাওয়া সম্ভব তারও যাচাই হয়ে গেল। সুদূর টোকিও থেকে হোক্কাইডো প্রদেশ পর্যন্ত সাইকেল চালিয়ে আসা তাকেমতো এক অদ্ভুত প্রশান্তি নিয়ে বাড়ির পথে প্যাডাল মারতে থাকে। সঙ্গী হল একরাশ বর্ণীল অভিজ্ঞতা এবং কষ্টার্জিত পরিণতবোধ। তাকেমতো তাই আর সেই আগের অগোছানো তরুণ রইলো না।

*

বাড়ি ফেরত তাকেমতোকে পেয়ে সবাই উল্লাসে মাতোয়ারা। মোরিতা সানের অত্যাচারের দিন শেষ, তাকেমতো এখন তার সাথে সমানে পাল্লা দেয়। হাগু-চান মুগ্ধ নতুন এই তাকেমতোকে দেখে। তাকেমতো ব্যস্ত হয়ে পড়ে তার গ্র‍্যাডুয়েট থিসিস নিয়ে। এক বছর পড়াশুনা পিছিয়ে যাওয়া তাকেমতো যত দ্রুত সম্ভব পড়াশুনা শেষ করে কর্মক্ষেত্রে যোগদান করতে চায়। অন্যদিকে মোরিতা-সান পৃথিবীর অষ্টমাশ্চর্য ঘটিয়ে ফেলেন! দীর্ঘ আট বছর পর অবশেষে তিনি পাস করেই ফেলেন তাও আবার থিসিস জমার ডেডলাইন শেষ হওয়ার বিশ মিনিট আগে! ঘটনার আকস্মিকতায় মোরিতার শিক্ষক, ভাষ্কর্য বিভাগের ইমিরেটাস অধ্যাপক তাঙ্গে-সেনসেই প্রায় স্ট্রোক করে বসেন। ভূপাতিত হওয়া অধ্যাপকের সেবায় যখন সবাই নিয়োজিত মোরিতার মুখে তখন স্মিত হাসি। অধ্যাপক তখন শিক্ষক সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে দারুণ এক আবেগী উক্তি করেন, “আসলে আমরা শিক্ষকরা অনেক দুর্ভাগা। যত কিছুই করি না কেন আমরা, ছাত্ররা একদিন ঠিকই পাশ করে বেরিয়ে যায়। একবার পাশ করে গেলেই হল, কবে যে তাদের সাথে আমাদের আর দেখা হবে তার কোন ঠিকঠিকানা থাকে না।”

*

তাকেমতোর গ্র‍্যাজুয়েট থিসিস শেষের পর্যায়ে, মোরিতা-সান নিখোঁজ এইদিকে। আসে প্রত্যাশিত সামার ফেস্টিভাল আর তাকেমতো নিজের ভালোবাসার কথা সরাসরি স্বীকার করে হাগু-চানের কাছে। বলতে গেলে প্রত্যাখ্যাতই হয় তাকেমতো কিন্তু দুঃখ পায় না সে। বরং বুকের উপর থেকে একটা বিশাল ভার নেমে যায় তাকেমতোর। তাকেমতো জানতো ঘটনাটা এভাবেই ঘটবে, সে প্রত্যাখ্যাতই হবে। কিন্তু অব্যক্ত ভালোবাসার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়ার স্বস্তি তাকেমতোর কাজে নতুন উদ্যম যোগায়। তাকেমতো আর কাপুরুষ রইলো না।

চারদিকে যখন সবকিছু সহজ-সরল গতিতে চলমান তখনই দুর্ঘটনার আবির্ভাব। হাগু-চানের উপর বিশাল বড় কাঁচের পাত আছড়ে পড়ে তুমুল বাতাসের কারণে। থিসিসের যত্ন-আত্তিতে ব্যস্ত তাকেমতো তাই খবর পায় কিছুটা বিলম্বে। ঘটনাস্থলে পৌছে তাই রক্তমাখা কাঁচ ছাড়া কিছুই খুঁজে পায় না তাকেমতো। আতংকের শিহরণ ছড়িয়ে পড়ে তাকেমতোর সারাদেহে। অন্যদিকে হানামতো সেন্সেই তখন হাগু-চানকে নিয়ে হাসপাতালে। হাগু-চানের ডানহাতের আঙুলগুলো সাময়িকভাবে অবশ হয়ে যায়। একজন্য শিল্পীর জন্য হাতের চেয়ে মূল্যবান কিছু হতে পারে না, তাই হাগু-চান সুস্থতার জন্য যেকোন ধরণের চিকিৎসাপদ্ধতির আশ্রয় নিতে রাজী। হানামতো সেনসেই তাই রিহ্যাবের সময় সারাদিন পাশে থাকেন হাগু-চানের। তাকেমতোর থিসিসের কথা মনে করিয়ে তাকে তিনি তাড়িয়ে দেন শিক্ষকসুলভ আচরণ দেখিয়ে। প্রিয় মানুষের আপদকালীন সময়ে পাশে থাকার তাড়না বোধ করে সদাঅপ্রস্তুত তাকেমতো। বাসায় ফেরার সময় ফুলের দোকানে চোখ পড়ে তাকেমতোর। রোগীকে ফুল উপহার দেওয়ার রীতির কথা মনে পড়ে যায় তাকেমতো। কিন্তু ফুলের দাম দেখে হতাশ হয় তাকেমতো। একেকটা ফুলের দামই ৩০০ ইয়েন, তিনটা ফুল কিনতেই ১০০০ ইয়েন চলে যায়। একতোড়া ফুল কিনতে কত লাগতে পেরে ভেবে তাকেমতো দীর্ঘশ্বাস ফেলে। আর্থিক সমস্যা থাকায় তাকেমতো ভাবে মানসিক সাহায্য দিয়েই সেই হাগু-চানের প্রতি দায়িত্ব পালন করবে। কিন্তু এক পর্যায়ে এই ক্ষেত্রেও বাঁধার সম্মুখীন হতে হয় তাকেমতোকে। কমপক্ষে দুই মাস রিহ্যাবে থাকতে হবে হাগু-চানকে আর তাকেমতোরও গ্র‍্যাজুয়েশনের দিন ঘনিয়ে এসেছে। পড়াশুনায় অতিরিক্ত মনযোগ দেয়ার সাথে সাথে এপ্রিল মাসে তাকে নতুন কর্মক্ষেত্রেও যোগদান করতে হবে। তাকেমতোর মস্তিষ্কে ভেসে উঠে তার বাবা-মার ছবি যারা কিনা স্বভাবতই তাকেমতোর গ্র‍্যাজুয়েশনের পর স্বাবলম্বী তাকেমতোকে প্রত্যাশা করছেন। অন্যদিকে ভেসে উঠে শয্যাশায়ী হাগু-চানের ভয়ার্ত চেহারার ছবি। কাজে যোগদান করা মানেই হাগু-চানের কাছ থেকে দীর্ঘ সময়ের জন্য আলাদা হয়ে যাওয়া। এইরকম বহুমাত্রিক সমস্যায় ভোগা তাকেমতো এক সময় হাগু-চানের পাশে থাকার কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়।

*

তখনই দৃশ্যপটে মোরিতা-সানের আগমন। এক বিকেলে হুট করে হাগু-চানকে নিয়ে মোরিতার অন্তর্ধান। চিন্তিত হানামতো সেন্সেইকে আশ্বস্ত করে তাকেমতো। আবেগঘন এক রাত্রি যাপনের পর হাগু-চান ভালবাসার উপরে হয়তো শিল্পপ্রেমকেই বেছে নেয়। হানামতো সেন্সেই তাই আজীবন হাগু-চানের পাশে থাকার সিদ্ধান্ত নেয়। তাকেমতোর মত তাই মোরিতাও হয় প্রত্যাখ্যাত। নদীর তীরে দুইজনের মধ্যে হয়ে যায় তাই তীব্র বাদানুবাদ। তাকেমতো যেন ব্যর্থ প্রেমের ভার চাপিয়ে দিতে চায় মোরিতার উপরেও, মোরিতা আবার এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে চায় না। এক পর্যায়ে দুইজনেই বুঝতে পারে যে তারা একই গোয়ালের গরু এবং হাঁপাতে হাঁপাতে ক্লান্ত হয়ে শুয়ে থাকা অবস্থায় সন্ধি করে নেয়।

*

সময় গড়িয়ে যায় এবং এক পর্যায়ে তাকেমতোর কর্মক্ষেত্রে যোগ দেওয়ার সময় ঘনিয়ে আসে। এক আবেগঘন পার্টির মাধ্যমে যাত্রার আগের রাতে তাকেমতো সকলের কাছ থেকে বিদায় নেয়। সকালে ট্রেনে চেপে বসে তাকেমতো। বগিতে অন্য কোন যাত্রীর অস্তিত্ব না দেখে তাকেমতো দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তখনই স্টেশনে হাগু-চানের ছোট্ট দেহের অবয়ব দেখা যায়। তাকেমতো দৌড়ে ট্রেনের দরজার কাছে পৌছে। হাগু-চান একটা বেন্তো বক্স ধরিয়ে দেয় তাকেমতোর হাতে। অনেক কিছু বলতে চায় হাগু-চান কিন্তু অটোমেটেড দরজার লক হয়ে যাওয়ার শব্দে হাগু-চানের অব্যক্ত অনুভূতি ঢাকা পড়ে যায়। প্ল্যাটফর্মের গোড়া পর্যন্ত হাগু-চান দৌড়ে এসে তাকেমতোকে হাত নেড়ে বিদায় জানায়। এই পাগলামির কোন অর্থ খুঁজে না পেয়ে তাকেমতো স্মিত হাসি হেসে বেন্তো বক্সটা খুলতে থাকে। একগাদা পাউরুটি দেখে তাকেমতো অবাক হয়। উপরের পাউরুটিটা সরানোর পর তাকেমতো নিচের স্তরে মধু মাখানো দেখে আনমনে হেসে উঠে। কিন্তু ভাল করে লক্ষ্য করার পরে তাকেমতো পাউরুটির মধ্যে একটা ফোর-লিফড ক্লোভার দেখতে পায়। একটার পর একটা পাউরুটি উল্টানোর পর তাকেমতো একটা করে মধুমাখানো ফোর-লিফ ক্লোভারের দেখা পায়। আনমনা সেই হাসি রূপ নেয় আবেগের কান্নায়। হাগু-চানের ভালবাসার নিদর্শন সেই পাউরুটি হাতে নিয়ে কান্নাজর্জরিত তাকেমতো সেই মুহূর্তেই ব্যর্থ প্রেমের স্বার্থকতা খুঁজে পায়। জন লেননের সেই উক্তিটাই হয়তো তখন নেপথ্যে বাজতে থাকে,
“The Time you enjoyed wasting, is not wasted”.

*

আমাদের জীবনটা হয়তো এই হানি আর ক্লোভারের মতোই। মধুর প্রলেপ দেয়া সুখকর অনুভূতির সমান্তরালে আমাদের জীবনে আগাছাময় ভুলে যেতে চাওয়া মুহূর্তও আসে। মাত্র ৩৬ পর্বের এনিমেটাতে রীতিমতো কাব্যিকভাবে সাত-আটটি প্রধান চরিত্রের মধু-আগাছাময় জীবনগাথা পরিবেশন করা হয়েছে। এক তাকেমতো-হাগু-মোরিতার ত্রিভুজ সম্পর্ককে নিয়েই এত বকবক করতে হয়েছে! মায়ামা-আয়ুমি-নোমিয়া, মায়ামা-রিকা, রিকা-হানামোতো-হারাদা, মোরিতা ভাতৃদ্বয়ের ব্যাপারে কিছু বলতে গেলে একেবারে থিসিস পেপার নিয়ে বসা লাগবে। মাঙ্গাকা উমিনো চিকাকে মন থেকে আন্তরিক অভিনন্দন এত নাটকীয়, ভালোবাসাপূর্ণ একটি জগতের সাথে দর্শকদের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য। এনিমেজীবনের অন্যতম সেরা একটা এনিমে দেখে শেষ করে ফেললাম।

Giovanni no Shima (Giovanni’s Island) [মুভি রিকমেন্ডেশন] — Md Anik Hossain

Giovanni's Island

১৫ আগস্ট, ১৯৪৫

দুই দুটো পারমাণবিক বোমার আঘাতে অবশেষে হার মানল যুদ্ধবাজ জাপানি সাম্রাজ্য। স্থানীয় সময় দুপুরের দিকে বেতার ভাষণে সম্রাট হিরোহিতো ঘোষণা দিলেন আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত। সমগ্র সূর্যদয়ের দেশজুড়ে নেমে আসে শোকের মাতম। তা থেকে বাদ যায়নি ছোট্ট দ্বীপ শিকোতান। অবশ্য যুদ্ধে সরাসরি দ্বীপটি আক্রান্ত হয়নি। বাহ্যিকভাবে অক্ষতই ছিল। সে দ্বীপের প্রধান নিরাপত্তারক্ষীর দুই সন্তান জুনপেই এবং কান্তা। মা মরা জুনপেই এবং কান্তার ডাক নাম ছাড়াও আরেকটা করে ভালো নাম আছে। Giovanni ও Campanella… ওদের মায়ের দেয়া নাম। নাম দুটো বিখ্যাত Night on the Galactic Railroad বই থেকে নেয়া। ওর মায়ের প্রচন্ড পছন্দের বই ছিল এটা। তো সদা হাস্যোজ্জ্বল জুনপেই ও কান্তাই এর দিনকাল ভালোই চলছিল…চলমান বিশ্বযুদ্ধের মধ্যেও। কিন্তু যুদ্ধ শেষ হতেই তাদের জীবন যায় চিরদিনের জন্য বদলে। জাপানের আত্মসমর্পণ ঘোষণার কিছুদিন পরেই হঠাত্‍ একদিন দ্বীপে একটা অপরিচিত যুদ্ধজাহাজ আসে। খেয়াল করে দেখা গেল , এটাতো প্রতিবেশী সোভিয়েত ইউনিয়নের জাহাজ। কিছু বুঝে উঠার আগেই স্রোতের মতো অসংখ্য সোভিয়েত সৈন্য ওদের দ্বীপে নেমে আসল। এবং দখল করে নিল দ্বীপটিকে বিনা বাঁধায়। অতঃপর শাখারিন প্রশাসনের অন্তর্ভুক্ত করে সোভিয়েত ইউনিয়নে যুক্ত করে দ্বীপটিকে। কিন্তু দ্বীপটিতে শুধু ভিনদেশী সৈন্য নয়, তাদের পরিবারেরাও আসে। তাদের মাঝে সোভিয়েত কমান্ডারের মেয়ে Tanya.
রাশিয়ান ও জাপানি। ভিন্ন সংস্কৃতি, ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন জীবনাচরণ। কিন্তু একই মানবিক অনুভূতি। একে অপরের শত্রু হবার পরেও ভাব হয়ে যায় জুনপেই ও তানিয়ার মাঝে। গভীর থেকে গভীরতর হতে থাকে তাদের বন্ধুত্ব। বন্ধুত্ব থেকেই ছোটো মানুষের মিষ্টি মধুর ভালোবাসা ভালো লাগায় রূপ নিতে থাকে এক পর্যায়ে। একদিকে দখলদার বহিরাগতদের রাজত্ব, অপরদিকে যুদ্ধে হারা দ্বীপবাসীদের দূঃখ দুর্দশা। আরেকদিকে আমাদের ছোট্ট জুনপেই কান্তাই ও তানিয়ার নির্ভেজাল বন্ধন। কোন দিকে যাবে তাদের জীবন? তাদের এই সম্পর্ক কতদূর গড়াবে? তাদের শেষ নিয়তি কী হবে?

উত্তর দিবে ঘটনার বহু বহু বছর পরে প্রৌঢ়ত্বে পৌছানো জুনপেই আর তার প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষিকা। যারা ফিরে যাবে সেই অতীতের দিনগুলোতে। সেই আলো অন্ধকারাচ্ছন্ন অতীতে নিয়ে যাবেন আমাদের। তাদের ভাষাতেই আমাদের কাছে তুলে ধরবেন সেই স্মৃতিগুলো।

ইতিহাস ও ফ্যান্টাসি-ফিকশন এর মিশেলে একটি চমত্‍কার, একটি অনবদ্য সৃষ্টি বলেই আমার বিশ্বাস এটি।
একটা আবেগপ্রবণ সুন্দর সময় কাটানোর জন্য অবশ্যয়ই দেখুন জাপানি এনিমে মুভি “Giovanni no Shima (Giovanni’s Island)”.

যারা Grave of the Fireflies মুভিটি দেখেছেন এবং পছন্দ করেছেন তাদের জন্য Highly recommended. যদিও GotF এর তুলনায় হয়ত একটু কম আবেগতাড়িত হবেন। তবে দেখে খুব ভালো লাগবে বলেই আশা করি।

Devilman: Crybaby-এর সবচাইতে হৃদয়বিদারক দৃশ্যগুলির একটি, Baton Passing দৃশ্যের ব্যাখ্যা — Tahsin Faruque Aninda

Miki_Makimura_(Crybaby)_ddf0e9c2-08cc-4236-8ff8-aff5e6d82d34

[Spoiler Warning: যেহেতু আনিমের সবচাইতে বড় স্পয়লারের একটি এটি, তাই আনিমে শেষ করে লেখাটি পড়ার অনুরোধ রইলো।]

আনিমেটির একদম শেষ পর্বে আর্মাগেডন ধরণের এক বড় ফাইট দেখতে পাই আমরা। স্যাটান আর ডেভিলদের দলের বিপক্ষে আকিরা আর ডেভিলম্যানের দল। এই বড় ফাইটের মাঝখানে খুব আর্টিস্টিকভাবে একটি দৃশ্য যোগ করা হয়েছেঃ ব্যাটোন পাস করার দৃশ্য। হঠাৎ এরকম ফাইটের সময়ে মিকি, মিকো, আকিরা আর রিয়োর মধ্যে ব্যাটোন পাস করার দৃশ্যের মানে কী!? এই শেষ ফাইটগুলিতে তো আকিরা বাদে বাকি কেউ ছিলও না, তাহলে? আসলে, এই দৃশ্যটার একটা বেশ বড় অর্থ রয়েছে।

আনিমেটির মূল থিম কী, জানেন?

ভালবাসা।

হ্যাঁ, আকিরার ডেভিলম্যান হয়ে ডেভিলদের সাথে মারামারি, তারপর কাহিনী এক দিক থেকে গড়াতে গড়াতে আরেকদিকে চলে যাওয়া, এত সবকিছু মূলে আসলে একটি মূল ব্যাপার ছিল, তা হল – ভালবাসা। কীভাবে, বুঝতে পারছেন না? চিন্তা নেই, সেটি বুঝানোই এই লেখাটির উদ্দেশ্য।

আর হ্যাঁ, আনিমের মূল থিম ভালবাসা – এইটা আমার নিজের বানানো কথা না। মূল গল্পের মাঙ্গাকা আর ডিরেক্টর দুইজনেই এই কথা বলেছে। আমার পোস্টের উদ্দেশ্য সেটা সবার জন্যে সোজা ভাষায় তুলে ধরা।

মিকো ব্যাটোনটা মিকিকে পাস করে, মিকি সেটা আকিরাকে পাস করে, আকিরা সেটা রিয়োকে দিতে যায়, কিন্তু রিয়ো অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে বা একদম ইগ্নোর করে। ব্যাটোন আর পাস করা হয় না। বেশ অনেকবার এই দৃশ্যটি দেখি আমরা, তাও এমন সময়ে যখন আকিরা আর স্যাটান মারামারি করতে থাকে, দুনিয়া ধ্বংস হতে থাকে। হঠাৎ এরকম মুহুর্তে ব্যাটোন পাস করা কেন? আসলে ব্যাটোন পাস – এই আইডিয়াটা পুরা সিরিজ জুড়েই ছিল কিন্তু। যেমন এই দৃশ্যেও একবার দেখতে পাই আমরাঃ

tumblr_p25ocfLs0u1tg8peeo1_500

এবার আসি আসল প্রসঙ্গে। মিকোকে দিয়েই শুরু করা যাক।

৯ম পর্বের এক পর্যায়ে মিকো তার ভালবাসার কথা মিকিকে বলতে পারে অবশেষে, যার কিছুক্ষণের পরেই মিকো মারা যায়। মিকো তাই মিকিকে ভালবাসার ব্যাটোন পাস করে দিল। শেষ পর্বের ব্যাটোন পাসের সিরিয়ালে প্রথমেই তাই দেখতে পাই মিকো মিকিকে ব্যাটনটা দিল।

এরপর ৯ম পর্বের শেষে মিকি মারা যাবার আগে আকিরার প্রতি তার আস্থা আর ভালবাসা পৌঁছে দেয়। মৃত্যুর মুহুর্তে কল্পনার দৃশ্যে সেটা দেখতে পায় সেই ব্যাপারটা। আকিরা শেষ মুহুর্তে হলেও তাকে বাঁচাবে, সেই বিশ্বাস মিকির ছিল, এমনকি মারা যাবার সময়েও আকিরার প্রতি তার টান বুঝা যায়। মিকি আর অন্য সবার ছিন্নবিচ্ছিন্ন মৃতদেহ দেখে আকিরার কষ্ট পাওয়াটা খুবই ইমোশনাল এক দৃশ্য ছিল। মিকো আর মিকি, ছোটকালের দুই বন্ধুর পৌঁছে দেওয়া ভালবাসা আর তাদের করুণ মৃত্যু তাকে মানসিকভাবে ভেঙ্গে ফেল। ব্যাটোন পাসের সিরিয়ালে দ্বিতীয় ক্রমে মিকোর পৌঁছে দেওয়া ব্যাটোন মিকির হাত থেকে আকিরার কাছে চলে যায় এ জন্যে।

শেষ যুদ্ধে আকিরা রিয়োর প্রতি এতদিনের ভালবাসা আর ঘৃণার এক অদ্ভুত মিশ্রণে পড়ে সব অনুভূতি একের পর এক ঘুষির আকারে পৌঁছে দেয়। রিয়োর বিট্রে করা আকিরা মন থেকে মেনে নিতে পারে নি — শুধু এই কারণে না যে পৃথিবীর এই অবস্থা হয়েছে বলে। বরং তার সবচাইতে কাছের বন্ধু তাকে বিট্রে করেছে। সেই দুঃখ তো আছেই, আর রয়েছে আকিরার সব চেনাজানা মানুষ, এবং পুরা পৃথিবীরই করুণ পরিণতি!

ঐ সময়ে প্রত্যেকটা ঘুষির সময়ে ব্যাটোন পাস দেখানো হয়। স্যাটানকে একটা করে ঘুষি মারে, আর পরের দৃশ্যেই আকিরা রিয়োকে ব্যাটোন পাস করার চেষ্টা করে। স্যাটান ফিরতি আঘাত দেয়, আর রিয়ো সেই ব্যাটোন ফেলে দেয়। মানুষদের প্রতি আকিরার ভালবাসা জিনিসটা রিয়ো ঠিকমত বুঝে না, তাই বারবার আকিরার পাস করা ব্যাটোন রিয়োর কাছে পৌছার আগেই নিচে পড়ে যায়।

যুদ্ধের শেষে আকিরার মৃত্যু হয়, আর তখন রিয়ো বুঝতে পারে তার ভুলটা। গড কেন ডিমনদের ধ্বংস করবে এই রাগের কারণে স্যাটান নিজেই যে মানুষদের ধ্বংস করতে গিয়ে হিপোক্রিসি করলো সেটা সব মানুষ আর আকিরা মারা যাবার পর বুঝতে পারলো। আর আকিরাকে হারানোর পর বুঝতে পারে আকিরার প্রতি তার ভালবাসার ব্যাপারটা। বুঝতে পারে কত বড় ভুল হয়েছে। আকিরার পাস করা ব্যাটোন অবশেষে রিয়োর কাছে পৌঁছে। কিন্তু ততক্ষণে অনেক, অনেক দেরী হয়ে যায়! একমাত্র কাছের বন্ধু, একমাত্র ভালবাসার মানুষটাকে নিজ হাতে মেরে ফেলে স্যাটান নিজেই পরাজিত হয়ে যায়।

মিকোর সেই এগিয়ে দেওয়া ভালবাসার ব্যাটোন মিকির হাত ধরে আকিরার কাছ হয়ে রিয়োর হাতে পৌঁছে যায় অবশেষে। আর সেই সাথে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যায়।

BLAME! [মাঙ্গা রিভিউ] — Rumman Raihan

BLAME 1

“May be on Earth.
May be in the future.”

পৃথিবী।

দিগন্তহীন, চির-প্রসারিত, কঙ্ক্রিটের তৈরি একটা জগত। সেখানে মেশিন, রোবট, সাইবর্গ আর অসংখ্য অমানবিক সব সত্ত্বা মিলে তৈরি করেছে এক ভয়াবহ ভবিষ্যতের দুঃস্বপ্ন। প্রকাণ্ড, বিস্তৃত ও বহুতল এই ডিস্টোপিয়ান পৃথিবীতে কিলি হেঁটে যায় অজানা গন্তব্যে। নেট টার্মিনাল জিন খুঁজে পাবার আশায়।

তার হাতে আছে একটা বিরল শক্তিশালী গান – গ্রাভিটেশনাল বিম এমিটার।
সে হেঁটে যায়।
ভঙ্গুর মেগাস্ট্রাকচারের আনাচে কানাচে হয়তো সে খোঁজ পাবে কোনো লুকানো সভ্যতার, আর বেরিয়ে আসবে পুরনো পৃথিবীর আদিম রহস্য।

BLAME 2

মাঙ্গাঃ BLAME!
জনরাঃ Science Fiction, Action, Psychological, Seinen, Cyberpunk, Mystery, Horror
মাঙ্গাকাঃ Tsutomu Nihei
চ্যাপ্টারঃ ৬৬
স্ট্যাটাসঃ Completed.
পাবলিশডঃ Nov 25, 1996 to Jul 25, 2003

হার্ডকোর সাইফাই গল্পের ফ্যানদের জন্য মাস্ট রিড একটা মাঙ্গা। খুব কম ডায়লগ, আর প্রচুর অ্যাকশন প্যানেলের উপর নির্ভর করে আঁকা এই মাঙ্গাটা পড়ার সময় অনেকটা গোলকধাঁধায় পরে যেতে পারেন। তবে তাতে বরং পড়ার মজা বাড়বে বৈকি।

মাঙ্গাটিতে অনেক পিওর সাইবারপাঙ্ক কনসেপ্টের পরিচয় পাবেন। যেমন গল্পের একটা মূল কল্পিত বিষয় বস্তু, নেট টার্মিনাল জিন হচ্ছে একজন সম্পূর্ণ মানুষের জিনোম। কোনো সাইবর্গের জিন নয়, ইনজিনিয়ার্ড সাব-স্পিসিস মানুষদের জিন নয়। এই নেট টার্মিনাল জিন হল নেট-স্ফেয়ারের দরজা খোলার চাবি।

আরেকটা আকর্ষণীয় দিক হচ্ছে এই গল্পের দুনিয়ার প্রত্যেকটা স্তরের পরিবেশ খুব ডিস্টিঙ্কট। আরকিটেকচার নিয়ে পড়াশোনা করা সুতোমু নিহেই তাঁর মাঙ্গার প্যানেলে প্যানেলে মেগাস্ট্রাকচারের স্পেইস আর স্কেল তৈরি করতে যে তাঁর সবটুকু দিয়েছেন তা দেখলেই বোঝা যায়। আর সেই স্তর গুলোতে বাস করা মানুষ, সাইবর্গ আর রোবট গুলোর ডিজাইনগুলো নিতান্তই বিস্ময়কর।

BLAME 3

নেটফ্লিক্সের মুভি অ্যানিমেটা একটা ছোট আর্কের উপর বেইজ করে যা অ্যাডাপ্টেশন করেছে, তাতে আমি আশাহত হয়েছিলাম। কারণ মূলত সিজিআইয়ের কারণে এই জগতটার অরগানিক, গোথিক আর সাররিয়েল আবহটা একদম হারিয়ে গেছে। সাউন্ডট্র্যাক আর ক্যারেক্টার ডিজাইনেও অনেক ত্রুটি ছিল। যদি এই মাস্টারপিস এবং বেশ জটিল সায়েন্স ফিকশনটা সত্যিকার অর্থে উপভোগ করতে চান তাহলে মাঙ্গাটা পড়ার জন্যে সাজেস্ট করবো।

আর, আরেকটা কথা। BLAME! দিয়ে কারো উপর দোষারোপ করা বুঝায়নি। BLAME! মানে Gravitational beam emitter gun এর আওয়াজ, ব্লাম!

BLAME 5

The Legend of the Legendary Heroes [রিভিউ] — Mobashirul Haque

The Legend of the Legendary Heroes

আনিমের কাহিনির শুরু বেশ সাধারণ, নায়ক Ryner Lute আর নায়িকা Ferris তাদের রাজ্যের রাজা Sion Astal এর নির্দেশে খুঁজে বেড়াচ্ছে প্রাচীন কালের hero relics. তবে কাহিনির মোড় ঘুরতে শুরু করে কিছু পর থেকেই।
শুরু থেকেই আনিমের মূল কেন্দ্র ছিল এর চরিত্র গুলো। প্রথমেই Roland রাজ্যের রাজা Sion Astal; সবাই শান্তিতে থাকতে পারে এমন রাজ্য গড়ার জন্য সে সবকিছু করতে প্রস্তুত। দেশের জনগণও hero king হিসেবে তাকে ভালবাসে। কিন্তু সে জানে এরকম আদর্শ রাজ্য তৈরির জন্য তাকে কিছু নির্মম কাজও করতে হবে। আবার নায়ক Ryner, alpha stigma এর অধিকারী, সাধারণ মানুষ যেটাকে ধ্বংসের প্রতীক বলে ভয় পায়, Ryner নিজেও জানে সে নিজের ক্ষমতার নিয়ন্ত্রন হারিয়ে ফেললে তা কি ভয়ঙ্কর হতে পারে। প্রত্যেক চরিত্রের মধ্যেই রয়েছে এমন আদর্শগত দ্বন্দ্ব। প্রত্যেক চরিত্রই নিজের আদর্শর ভিত্তিতে এগিয়ে যায়, এজন্য শেষ পর্যন্ত anime টাতে কোন ভিলেইন ছিল না। সাধারণ শৌনেন আনিমের মত light না করে একটু dark থিম করেছে, যা ভালো লেগেছে।

আনিমেটার মূল সমস্যা ছিল এর উপস্থাপনায়। চরিত্র গুলোর backstory দেখানো হয়েছে খুব ছাড়াছাড়া ভাবে, কোন ঘটনার পর কোনটা সেটা বুঝা কষ্টসাধ্য। আনিমেতে মূল চরিত্র গুলো বাদ দিয়ে বাকিদের দিকে সেইভাবে মনোযোগ দেওয়া হয় নি, সেই চরিত্র গুলো অসাধারণ ছিল। মূল চরিত্রদেরও তাদের কাজের চেয়ে তাদের চিন্তাভাবনা আর পারস্পরিক সম্পর্ক বেশি দেখানো হয়েছে। ফলে একদিকে যেমন মনে হয়েছে, ধুম করে কিছু একটা হয়ে গেল। সেইসাথে সিংহাসন রাজনীতি (খানিক টা game of thrones vibe, দেখলে বুঝতে পারবেন, কোন ঘটনার জন্য বলছি :p) প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে যুদ্ধ কে ভালভাবে ফুটাতে পারে নি, যা করতে পারলে anime টা আরও ভাল হতে পারত। আর সবচেয়ে বড় কথা anime টার কাহিনি শেষ করে নি।

Soundtrack গুলো আমার ভালো লেগেছে।

যদি fantasy, magic, medieval era based কাহিনি ভালো লাগে,মনে হয় এই anime ভালো লাগবে। আমার কাছে plot অসাধারণ লেগেছে,শুধু execute করতে পারে নি।

Gurren Lagann [রিভিউ] — Md Asiful Haque

Gurren Lagann 1

অনেকে বলেন এই সিরিজটা আসলে দুইটা আলাদা সিরিজের ম্যাশাপ হয়ে গেসে; টাইমস্কিপের আগে এবং পরে।

আমার কাছে আসলে এইটা ‘তিনটা’ আলাদা সিরিজ মনে হইসে।

১) প্রথম ১৫ (/১৬) এপি – ৭ বছর টাইমস্কিপের আগের সময়টা। You got your average mecha series. খুব বেশি চমক নাই (Well except the one at around epi 6/7; যেইটার স্পয়লার মোটামুটি দেখা শুরুর পরেই পেয়ে গেসিলাম); লিটারেলি “মেশিনে মেশিনে ঠুয়াঠুয়ি” চলসে। হাল্কা ছোট একটা লাভ ট্রায়াংগেল আর লিরন সহ কিছু ক্যারেকটার ইন্ট্রডিউস হইল এই সময়ে; প্লাস একটা মেজর এবং অনেকগুলা মাইনর ফাইট। ইন্ট্রোডাকটরি পার্ট হিসেবে খারাপ না; কিন্তু পুরো জিনিসটা আরো অনেএএএএক কম এপির ভিতরে নিয়ে আসা যেত সম্ভবত।
এই পার্টের রেটিংঃ ৫

Gurren Lagann 2

২) পরের ৮(/৯) এপি; চন্দ্রের পতন ঠেকানো পর্যন্ত। এই সিরিজ দেখার আগে যেই ইনফোটা সবচেয়ে ইম্পর্ট্যান্ট ছিল সেটা হল – এই সিরিজের মেকাররাই Kill la kill বানাইসে। যেটা দেখার জন্য অপেক্ষা করতেসিলাম সেইটা আসলো এই সময়ে – cheesy over the top ফাইটিং (আগের পার্টের ফাইটও যথেষ্ট over the top ছিল; বাট পুরোপুরি ‘impressive’ লাগে নাই যেমনটা এই পার্টে লাগসে) এর সাথে পলিটিকাল ক্রাইসিস, ম্যাসিভ ক্যারেকটার ডেভেলেপমেন্ট; এবং বেশ কিছুটা টুইস্ট। This part was simply awesome.
এই পার্টের রেটিংঃ ৯

৩) শেষ ৩(/৪) এপি; আউটার স্পেসে গিয়ে টাইম, ডাইমেনশন অতীত ভবিষ্যৎ স্পাইরাল এন্টি-স্পাইরাল গুলায়ে খাওয়া পার্ট (১০ আর ১১ ডাইমেনশনে গিয়ে -১০ অতীত আর +৫ ভবিষ্যৎ রেঞ্জে মিসাইল দিয়ে দুই ডাইমেনশন ওয়ালা এন্টি স্পাইরালদের সাথে কিছু মানুষ কুতকুত খেলে আসছে)। The animation of these episodes was simply outstanding and breathtaking; কিন্তু আমার কাছে চন্দ্রপতন ঠেকায়ে দেওয়ার পরেই স্টোরি থামায়ে দিলে বেটার লাগতো; দুই তিন এপিতে “হাগার হাগার” info dump ব্যাপারটা ভাল্লাগে নাই। “শেষ হইয়াও হইল না শেষ” – এই ধরণের কিছু দেখাইলে আমি পার্সোনালি প্রেফার করতাম। Still; this part was quite good, too; specially animation and all the stuffs.
এই পার্টের রেটিংঃ ৭

সো ওভারঅল রেটিংঃ ৬.৪ (প্রায়) 

Gurren Lagann 4

ক্যারেকটারদের মধ্যে প্রথমে Yoko কে ফ্যানসার্ভিস হিসেবে দেখানো হলেও পরের দিকে গিয়ে তার চমৎকার ডেভেলপমেন্ট ভাল লাগসে। তবে লাস্টের দিকে চুড়ান্ত ক্লাইম্যাক্সের মধ্য দিয়ে এর ফ্ল্যাশব্যাক খুবই পেইনফুল একটা এপিসোড ছিল। এছাড়া সবচেয়ে বেশি ভাল লাগসে রসিউ চরিত্রটাকে; একটা আইডিওলোজির ম্যানিফেস্টেশন ছিল এই চরিত্র দিয়ে। সাথে লিরনকেও বেশ ভাল লাগসে।

এবং সবচেয়ে পেইন লাগসে নিয়াকে। I understand “সবার মন জয় করতে পারে এমন গুডি গুডি ফিল একটা ক্যারেকটার” দেখানোর চেষ্টা ছিল এবং দরকারও ছিল হয়ত; but she was simply irritating in every possible way.

ওভারঅল সিরিজের সাউন্ডট্র্যাক খুবই পছন্দ হইসে; প্লাস রাইট টাইমে সেইগুলার রাইট ইউজ; আর এনিমেশন তো বললামই।

At the end; পুরা সিরিজের ইন্টেনশনই ছিল সব লজিকের এগেইন্সটে গিয়ে পিওর একশন দেখানো; এবং শেষদিকে গিয়ে সেটা পুরোপুরিই করতে পেরেছে (সাথে কিছু বেশিও করসে )।

If you are a mecha fan unlike me; you will just love it.

And if you are not; chances are you will find at least the last 10-12 episodes quite fascinating and interesting.

Gurren Lagann 3

Shakugan no Shana [রিভিউ] — Shifat Mohiuddin

Shakugan no Shana 1

এনিমে: Shakugan no Shana
পর্ব: ৭২ + specials
সিজন: তিন (২৪+২৪+২৪)
স্টুডিও: J.C. Stuff
জনরা: ফ্যান্টাসি, অ্যাকশন, সুপারন্যাচারাল

লাইট নভেল থেকে বানানো এনিমেগুলা খুবই দুর্ভাগা হয়। অ্যানিমেটররা বার-তের পর্বের একটা সিজন বানিয়ে সেটাকে নভেলের বিক্রি বানানোর টোটকা হিসেবে বাজারে ছেড়ে দেন। এরপর ফ্যানদের শত আবদার-আকুতি তাদের কানে ঢোকে না।
তো শাকুগান নো শানা এনিমেটার নাম কালেভদ্রে গ্রুপে দেখেছিলাম। সবাই পজিটিভ মন্তব্যই করতো এনিমেটা নিয়ে কিন্তু আগ্রহ খুঁজে পাই নি দেখার।

দেখার আগ্রহ এক মুহূর্তে বেড়ে যায় যখন জানতে পারি এনিমেটা তার সোর্স ম্যাটেরিয়াল অর্থাৎ এলএনকে পুরোপুরি অ্যাডাপ্ট করেছে। এলএনের পুরো এনিমে হওয়া জিনিসটা অমাবস্যার চাঁদের মত। এ পর্যন্ত মাত্র দুটো সিরিজ পেয়েছি এই গোত্রের: Durarara! ও Golden Time. পরে দেখি সিজন তিনটা, পর্বও অনেক, ৭২টা! এই বাণিজ্যের যুগে তো এমন জিনিস দেখা যায় না! তাই দেরী না করে দেখা শুরু করে দেই।

প্লট: শানার শুরুটা একেবারেই মার্কামারা। হাইস্কুল পড়ুয়া কিশোর সাকাই ইউজির জীবন ঠিকঠাক মতই চলছিল। একগাদা বন্ধু, ঢাল বেয়ে প্রতিদিন স্কুলে যাওয়া, বাসায় ফিরে আসা এইতো। কিন্তু একদিন হুট করে ইউজি নিজেকে এক বিশাল অতিপ্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে আবিষ্কার করে। ব্যস্ত রাস্তা দিয়ে বাসায় ফেরার সময় ইউজি একদিন দেখতে পায় তার চারপাশের সব মানুষ স্থির হয়ে গেছে। দুঃস্বপ্নের মত সে দেখতে পায় তার চারপাশের সব মানুষকে কিছু দানব খেয়ে ফেলছে। ইউজি দৌড়ে পালাতে গেলে সে একটা দানবের নজরে পড়ে যায় এবং পাকড়াও হয়। দানবের দাঁত আর সে যখন কয়েক ফুট দূরে তখন কালো একটা অবয়ব দৌড়ে এসে তাকে রক্ষা করে। ধীরস্থির হওয়ার পর ইউজি দেখতে পায় অবয়বটা তার সমবয়সী একটা লালচুলো মেয়ের। মেয়েটার হাতে ইয়া লম্বা এক কাতানা ও গলায় একটা লকেট। লকেট থেকে আবার কণ্ঠস্বরও ভেসে আসছে একটা!

শীঘ্রই ইউজি জানতে পারে সে হাজার বছর ধরে লুকিয়ে থাকা এক সত্য জানতে পেরেছে। দানবগুলোকে তোমগারা বলা হয় যারা Guze নামের এক প্যারালাল ইউনিভার্সের বাসিন্দা। তারা তাদের খিদে মেটানোর জন্য এই দুনিয়াতে এসে মানুষের আত্মা খেয়ে যায়। আর এই তোমোগারাদের ঠেকানোর জন্য আছে মেয়েটির মত আরো অনেক যোদ্ধা। এই যোদ্ধাদের Flame Haze বলে। ফ্লেইম হেইজ, তোমোগারাদের মেরে পৃথিবীর ভারসাম্য বজায় রাখে। কাতানাওয়ালা মেয়েটি নিজেকে Red Hot Eyed Burning Haired Shana বলে পরিচয় দেয়।

ইউজি আরো জানতে পারে তার মধ্যে একটি বিশেষ অস্ত্র আছে যার কারণে দলে দলে তোমোগারা তার পেছনে ছুটে আসতে পারে। তোমোগারারা পৃথিবীতে আসলেই Fuzetsu নামের এক ধরণের জাদু প্র‍য়োগ করে। যার ফলে গুজে ও পৃথিবীর মধ্যে একটা মাঝামাঝি জায়গার উদ্ভব হয়। সাধারণ মানুষ ফুজেতসুর মধ্যে চলাফেরা করতে পারে না তাই শিকার করা সহজ হয়। ইউজি ফুজেতসুর মধ্যেও নড়তে পেরেছিল সেই বিশেষ জিনিসের জন্যই। শানা জানায় ইউজি একজন মিস্টেস (Mistes). আস্তে আস্তে শানা ও ফ্লেইম হেইজদের দুনিয়ার মধ্যে ইউজি জড়িয়ে পড়তে থাকে। অন্যান্য ফ্লেইম হেইজ ও তোমোগারাদের মধ্যের দ্বন্দ্বে ইউজি ও শানার ভূমিকা নিয়েই এনিমেটার কাহিনী।

Shakugan no Shana 2

আসলে এত ছোট সিনোপসিস দিয়ে শানার কাহিনী বোঝানো সম্ভব নয়। ছাব্বিশ ভলিউমের লাইট নভেলকে এনিমে বানানো হয়েছে তাই গল্পের গভীরতা অনেক বেশী। পুরো নারুতো সিরিজের কাহিনী যেমন স্পয়লার ছাড়া বোঝানো সম্ভব নয়, শানার ব্যাপারেও তা প্রযোজ্য।

শাকুগান নো শানার মধ্যে একসাথে স্লাইস অফ লাইফ ও ফ্যান্টাসি, দুই এলিমেন্টের চর্চাই করা হয়েছে। প্রথম দিকে দুটো জিনিস ভালমত খাপ খাচ্ছিল না কেন জানি। খুব গতানুগতিক মনে হচ্ছিল এনিমেটা। ইউজিকে মনে হচ্ছিল বোকাসোকা, ভোলাভালা টাইপের গতানুগতিক এলএন নায়কগুলোর মত। শানাকেও সুন্দেরে গোছের মাথা গরম পিচ্চি ছাড়া আর কিছু মনে হচ্ছিল না। খারাপ ইমপ্রেশনটা বাড়ানোর জন্য এনিমেটার ক্যারেকটার আর্টও দায়ী। সবার চেহারা এত বাবু মার্কা যে বিশ্বাসই হচ্ছিল না এই দুনিয়াতে প্রতিনিয়ত মানুষের আত্মা দানবদের পেটে যাচ্ছে।

এনিমেটার উন্নতি ঘটে নতুন নতুন চরিত্র আসার পরে। প্রথম ভিলেন হান্টার ফ্রিয়াগনের সাথে লড়াই পর্যন্ত এনিমেটা দেখে নিয়মিত হাই তুলছিলাম সত্য বলতে। নয়া ফ্লেইম হেইজরা আসার পরে সিরিজটার রস বাড়ে। তাদের বর্ণনায় আস্তে আস্তে গুজে ও পৃথিবীর মেকানিজম উঠে আসে দর্শকদের সামনে। সুন্দরী কিন্তু নিয়ন্ত্রণহীন ফ্লেইম হেইজ মারজরী দো আর শানার অভিভাবিকা উইলহেলমিনা কারমেলের আগমনের পরে সিরিজটা প্রাণ পায়। নতুন নতুন ভিলেনরাও আসতে শুরু করে। এক ফাঁকে শানার ব্যাকস্টোরিও দেখানো হয়। তাই এক পর্যায়ে হাই তোলা বন্ধ করে মনযোগ দিয়ে এনিমেটা দেখা শুরু করি।

শাকুগান নো শানার যেসব গুণাবলি আমার চোখে পড়েছে তা পয়েন্ট আকারে নিচে উল্লেখ করছি:

১. রহস্য ও অজানাকে লুকিয়ে রাখা। এই জায়গায় এনিমেটা খুবই সার্থক। তিন সিজন জুড়ে যখনই ভেবেছি আর কিছু নিশ্চয়ই বাকী নেই, তখনই নতুন একটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছে এনিমের গল্পটা।

২. পাওয়ার সিস্টেমের কোন বালাই না থাকা। বিষয়টা নেতিবাচক হলেও শাকুগান নো শানার ব্যাপারে খুবই কাজে দিয়েছে। এনিমেটাতে ফাইট সিনের অভাব নেই কিন্তু কোনটাতেই আগে থেকে বলা যায় নি অমুকের চেয়ে অমুক বেশী শক্তিশালী। তুরুপের তাস বের করা চলতেই থাকে কিন্তু দুই পক্ষই এত পাওয়ারফুল যে সমস্যা হয় না তেমন কোন। লেভেল আপ নামের কিছুই নেই এনিমেটাতে কারণ তোমোগারা ও ফ্লেইম হেইজদের বয়স কয়েকশো বছর। তাই তাদের ক্ষমতার কৌশলগত ব্যবহারটাই ছিল মুখ্য।

৩. ভিলেনদের বিল্ডআপ জিনিসটা শানাতে দুর্দান্ত হয়েছে। সাধারণত ফ্যান্টাসি এনিমেতে প্রথমে ছোট ছোট তারপর শেষে একেবারে ভিলেন অর্গাইনাইজেশনের রাঘব বোয়ালদের সাথে লড়াই শুরু হয়ে যায়। ফলে দেখা যায় প্রত্যাশা জাগিয়েও রাঘব বোয়ালরা দর্শকদের অনুভূতির জায়গাটায় স্থায়ী হয়ে থাকতে পারেন না। শানাতে মেইন ভিলেনরা একেবারে শুরুর দিকেই ধর্না দিয়ে যায়। তারপর বারবার তাদের আগমন ঘটতেই থাকে। কোনবারেই তাদের অনেক শক্তিশালী আবার একেবারে দুর্বল দেখানো হয় নি। ফলে তাদের ক্ষমতা নিয়ে একটা দুশ্চিন্তা গড়ে উঠলেও দর্শকরা নিশ্চিত হতে পারেন এই ভেবে যে তাদের হারানো সম্ভব।

৪. শানাতে ফ্লেইম হেইজ ও তোমোগারাদের মধ্যে খণ্ড যুদ্ধ প্রচুর হলেও লেখক আমাদের বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছিলেন যে কোন লড়াইই বিচ্ছিন্ন নয়। দৃশ্যপটের আড়ালে যে বিশাল কোন পরিকল্পনার বাস্তবায়ন ভিলেনরা করে যাচ্ছে তা বোঝা যাচ্ছিল। প্রতিটা লড়াইয়েই ভিলেনদের গুপ্ত উদ্দেশ্য ছিল তাই যতবারই তারা হেরে যাক না কেন তাদের বৃহৎ পরিকল্পনা ভণ্ডুল হয় নি। পরে এর ব্যাপকতা টের পাওয়া যায় থার্ড সিজনে।

৫. শাকুগান নো শানা ঐ ধরণের এনিমের অন্তর্গত যার গল্প সময়ের সাথে সাথে ভাল হতে থাকে। বর্তমান সময়ের লম্বা এনিমেগুলা ভয়াবহ ভাবে এই গুণবর্জিত। সেকেন্ড সিজনে কাহিনীটা বেশ জমজমাট হয়ে যায়। তারপরেও সমাপ্তিটা বেশ ম্যাড়মেড়ে লাগছিল। বন্ধু তখন মুখ চেপে হেসে খালি বলেছিল থার্ড সিজনের প্রথম পর্ব দেখে তাকে একটু জানাতে। দেখে তো পুরো মাথা ঘুরে যাওয়ার মত অবস্থা। পুরো এনিমের প্রেক্ষাপটই বদলে গিয়েছিল। কে ভিলেন কে নায়ক তা ঠাহর করা কঠিন হয়ে গিয়েছিল। সাধারণ একটা গল্প যে in universe build up এর কারণে অসাধারণ হতে পারে তা টের পেলাম।

৬. আর সবচেয়ে ভাল লাগা ব্যাপার হল শেষ ভিলেনের দুর্দান্ত ফিলোসফি। বেশী কথা বললে স্পয়লার হয়ে যাবে তাই এতটুকুই বলে রাখি, মাদারা উচিহার সাথে বেশ মিল আছে ভিলেনের। মিলটা আদর্শিক ও ক্ষমতা দুই জায়গাতেই আছে। এন্ডিংটাই একেবারে সলিড, সন্তুষ্টি নিয়েই শেষ করতে পেরেছে। নারুতো শিপ্পুডেনের সমাপ্তিটা এরকম সন্তোষজনক করতে পারলে মন্দ হতো না।

Shakugan no Shana 3

অ্যানিমেশন নিয়ে কিছু আলোচনা করা যাক। ফুজেতসুর সময় একটা নির্দিষ্ট রঙের প্রাধান্য থাকে বলে অপার্থিব ভাবটা খুব ভালভাবে ফুটে উঠে দুই দুনিয়ার সংঘর্ষের সময়। পুরো এনিমের বাজেট আসলে ফাইট সিনের পেছনেই খরচ করা হয়েছে বোঝা যায়। বেশীরভাগ অ্যাকশনই শূণ্যে তাই কোরিওগ্রাফির বালাই ছিল না। থার্ড সিজনে প্রচুর সিজি ছিল। খারাপ লাগে নি যদিও তবে গড অফ ডেস্ট্রাকশনের মূল বডির অ্যানিমেশন জঘন্য ছিল। সেইরেই-দেনকে এমন ভাবে সাজিয়েছিল যে মনে হচ্ছে সাইন্স ফিকশন কোন এনিমে দেখছি। প্রতিটা ফ্লেইম হেইজের ব্যাটল গিয়ারে পরিবর্তিত হওয়ার জায়গাগুলা খুব ডিটেইলে বানানো হয়েছে। বিশেষ করে শানার অগ্নিবর্ণ চুলের ফুলকি ছড়ানো দেখার মত ছিল।
অন্যদিকে সব বাজেট এইদিকে নিমগ্ন হওয়ায় বাসাবাড়ি ও হাইস্কুলের অ্যানিমেশনগুলা একেবারেই মার্কামারা ছিল। পিচ্চি পিচ্চি ক্যারেকটার ডিজাইন দেখে বিপুল বিরক্ত হয়েছি।

চরিত্রদের ব্যাপারে বলতে গেলে লিখে শেষ করা যাবে না। ভিলেন এবং নায়ক, উভয় দিকেই বিশাল সংখ্যাওয়ালা কুশীলব ছিল। এমনিতে শানা আর ইউজিকে সবারই ভাল লাগার কথা। থার্ড সিজনে দুজনের মানসিক পরিপক্বতার প্রদর্শনী খুব উপভোগ করেছি। ইয়োশিদা কাজুমিকে প্রথম দিকে বিরক্তিকর লাগলেও পরে ভালই লেগেছে। মারজরি সান আর মার্কোশিয়াসের রসায়ন চমৎকার ছিল। ইউজির বন্ধুদেরও ভাল লেগেছে। তবে আসল ওয়াইফু ছিল উইলহেলমিনা কারমেল, তার প্রেমে বিভোড় ছিলাম পুরো সিরিজটা দেখার সময়। (অবশ্যই কারণ, একজন অনুগত ব্যাটল মেইডের চেয়ে ভাল আর কিছু হতে পারে না। )
ভিলেনদের মধ্যে বেশী ভাল লেগেছে বেল-পেওল আর সাবরাককে। সাবরাক একেবারে আসল অ্যান্টি-হিরো ছিল। ওর ব্যাকস্টোরিটা আরো দেখাতে পারতো।
আর অবশ্যই ফাইনাল ভিলেন, তাকে ভাল না লেগে উপায় নেই। Seeking Researcher, Dandalion সেই বিনোদনের একটা চরিত্র ছিল। ডমিনোওওও বলে যে কি চিল্লাচিল্লিগুলা করতো। 

মিউজিক ডিরেক্টর Kow Otani. ভদ্রলোকের কাজ দেখেছিলাম এর আগে Another এ। শানাতেও বেশ কিছু ভৌতিক টেনশন জাগানিয়া ট্র‍্যাক আছে। তবে তার ব্যাটল থিমগুলাই ভাল লেগেছে বেশী। পুরনো পুরনো ভাব ছিল সাউন্ডট্র‍্যাকগুলাতে। ভায়োলিন ভিত্তিক মিউজিক ছিল বেশী। থার্ড সিজনে choir মিউজিকের আমদানি ঘটানোয় বলতে পারি এনিমের সাথে সাথে এর ওএসটিরও ক্রমাগত উন্নতি হয়েছে।

ওপেনিং-এন্ডিং ছিল একগাদা। সবচেয়ে ভাল লেগেছে থার্ড সিজনের ফার্স্ট ওপেনিং Light My Fire. গানের বিটের তালে তালে শানার দৌড়ানোর দৃশ্যটা চমৎকার ছিল।

সব মিলিয়ে ফ্যান্টাসি এনিমে হিসেবে শাকুগান নো শানা বেশ ভাল একটা অভিজ্ঞতা দিয়ে গেল। হাইস্কুলপড়ুয়া একগাদা চরিত্র, নায়ককে নিয়ে মেয়েদের মধ্যে টানাটানি ইত্যাদি নেতিবাচক দিক থাকলেও আস্তে আস্তে কাহিনীর জোরে সব অতিক্রম করে ভাল একটা অভিজ্ঞতা উপহার দিয়েছে। ফ্লেইম হেইজ হওয়ার কারণে ভালবাসার মত একটি মানবিক অনুভূতি শানার অজানা ছিল। এটি আবিষ্কার করতে গিয়ে অনেক ক্লিশে দৃশ্যের অবতারণা হয়েছিল এনিমেটার প্রথম দিকে। অথচ শেষে ইউজি আর শানার আলিঙ্গনের দৃশ্য দেখে বুঝতে পারি কোন কিছুই বৃথা যায় নি। এই একটা ঘটনাই এনিমেটার ধাপে ধাপে উন্নতির বড় একটা সাক্ষী। সব মিলিয়ে মনে রাখার মত একটা অভিজ্ঞতা দিয়ে গেল এনিমেটা। এরকম ভাল এন্ডিংওয়ালা আরো ফ্যান্টাসি এনিমে আসুক এই প্রত্যাশা করি।

রেটিং: ৮/১০
থার্ড সিজন রেটিং: ৯/১০

Only Yesterday [মুভি রিভিউ/রেকোমেন্ডেশন] — Towhid Chowdhury Faiaz

Omoide Poroporo 1

Only Yesterday (Omoide Poroporo)
পরিচালক: ইসাও তাকাহাতা
প্রযোজনা: স্টুডিও জিব্লি

অনেকেই হয়তবা ইতিমধ্যে শুনেছেন যে স্টুডিও জিব্লির সহ-নির্মাতা এবং গ্রেভ অফ দা ফায়ারফ্লাইস, টেইল অফ দা প্রিন্সেস কাগুয়া খ্যাত পরিচালক ইসাও তাকাহাতা আমাদের মধ্যে আর নেই। বিষয়টা অত্যন্ত দুঃখজনক। তার মৃত্যুতে তাকে শ্রদ্ধা করে আমি তার করা ছবিগুলোর মধ্যে আমার সবচেয়ে প্রিয় ছবিটাকে নিয়ে কথা বলতে চাই।

“আমাদের শৈশবকাল আমাদের স্মৃতি থেকে বিস্মৃত হইয়া গেলেও,
শৈশবকালের স্মৃতি হইতে আমরা বিস্মৃত হই নাই”

কোনো এক কালে স্কুলে মাইকেল মধুসূদন দত্তের কোনো এক গল্পে যেন পড়েছিলাম এই জিনিসটা।আমাদের জীবনের পথে যত দিন আমরা পার করি ততই আমরা অতীতের দিনগুলোকে ভুলে যাই।ছোটবেলার ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা আমরা ত্যাগ করি বড় হবার এই জীবনের বাস্তবতার জন্যে।

স্টুডিও জিব্লির বেশির ভাগ ছবিগুলোর মতো এখানে কোনো কাল্পনিক কিংবা অতিপ্রাকৃত কিছু নেই এই ছবিতে। তায়েকো অকাজিমা ২৭ বছর বয়সী একজন সিঙ্গেল চাকরিজীবী যে শহরে সবার মতোই সাদামাটা একটি জীবন বসবাস করছে। ছবিটা শুরু হয় সে তার বোনের জামাইয়ের গ্রামে ছুটি কাটাতে যাচ্ছে এমন একটি সময় থেকে। তার নিজের কোনো কাছের আত্মীয় গ্রামে থাকে না বলে তাকে তার বোনের জামাইয়ের গ্রামে যেতে হচ্ছে। সত্যি কথা বলতে এতটুকুই গল্পের মূল কাহিনী। বাকি পুরোটা সময় আমরা তায়েকোর সাথে তার স্মৃতিচারণা এবং তার অভিজ্ঞতার একজন যাত্রী হিসেবেই কাটাই।

Omoide Poroporo 2

“আমি আশা করি নি যে আমার পঞ্চম শ্রেণীর আমিকেও আমি এই যাত্রায় নিয়ে যাবো” এভাবেই তায়েকো পুরো যাত্রাজুড়েই নিজের পঞ্চম শ্রেণীর শৈশবেই হারিয়ে যায়। কিছু স্মৃতি মিষ্টির মতো মধুর হলে কিছু স্মৃতি আবার বিজড়িত করে এমন।জীবনের প্রথম পিরিয়ড হওয়া থেকে শুরু করে তার জীবনের প্রথম পছন্দ হওয়া সবকিছুই যেন তার মনে পড়তে শুরু করে। তখন তায়েকোই নিজেকে নিজে প্রশ্ন করে এটা কেন হচ্ছে। হয়তবা শৈশবের তায়েকো এই ব্যস্ত শহুরে চাকরিজীবী তায়েকোকে জীবন উপভোগ করার নতুন উপায় শিখাচ্ছে।

ছবিটিতেই কোনো বড় কোনো দৃষ্টি আকর্ষণীয় কিছু নেই। ছবিটা এর হৃদয়ে একটি মেয়ের স্মৃতিচারণা এবং বাঁচতে শিখা নিয়েই তৈরি। নেই কোনো প্রেম কিংবা ধরণের প্যাঁচ বরঞ্চ ছবিটা আমাদের জীবনের একটি বাস্তব এবং মিষ্টি প্রতিচ্ছবি। ছবিটা দেখে অসম্ভব নিজের শৈশবকালে হারিয়ে না যাওয়া। দেখতে দেখতে কখন যে আপনি আপনার নিজের জীবনের শৈশবে ফিরে যাবেন তা টেরই পাবেন না।

Omoide Poroporo 3

ছবিটার একটি চমৎকার দিক হচ্ছে এর স্মৃতিচারণার দৃশ্যগুলো। আপনি খেয়াল করে দেখেন যে ১০-১৫ বছর আগের কথা আপনি মনে করতে গেলে আপনি কতটুকুই বা মনে করতে পারবেন।কেবল নির্দিষ্ট কিছু ঘটনা কিন্তু আপনি যখন ওই স্মৃতির আশে পাশের জিনিসগুলো মনে করবার চেষ্টা করবেন তখন দেখবেন যে জিনিসগুলো স্মৃতির সাথে সাথেই অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে।ইসাও তাকাহাতা টার বিচক্ষন পরিচালনার মাধ্যমে অসম্ভব রকমের সৌন্দর্যের সাথে ফুটিয়ে তুলেছে।ছবির মিউজিকাল স্কোর আমার জীবনের শোনা সবচেয়ে প্রশান্তপূর্ণ স্কোর। প্রতিটি গান আপনাকে আপনার শহুরে বাস্তব জীবন থেকে শিথিল করবে। মুভিটার শেষ গানটি আমি আজও বৃষ্টির দিনে বারান্দায় বসে শুনি।আমার অসম্ভব রকমের প্রিয় একটি গান।

Omoide Poroporo 4

এখন প্রশ্ন হচ্ছে ইংরেজি ডাব নাকি অরিজিনাল জাপানিজ ভাষারটা দেখবো? ব্যাক্তিগতভাবে অামি জাপানিজটা দেখতে বলবো কারণ ডাবের রেন্ডারিং একটু সমস্যা অাছে যদিও ডেইসি রিড্লের কন্ঠ অভিনয় জাপানিজ মিকি ইমাই থেকে ভালো হয়েছে।

আমি কোনো চলচিত্রবোদ্ধা কিংবা বিশ্লেষক নই কিন্তু আমি বলবো যে Only Yesterday আমার জীবনের দেখা সেরা চলচিত্রগুলোর মধ্যে একটি।আশা করি না দেখে থাকলে ছবিটি দেখে নিবেন।ছবি শেষে আপনার ঠোঁটে মুচকি একটি হাসি ফোটাতে ছবিটি ব্যর্থ হবে না বলেই আমি আশা করি।

Kimi no Na Wa [মুভি রিভিউ] — Rumman Raihan

Kimi no Na Wa 1

Kimi no Na Wa
ইংরেজি নামঃ Your Name
জনরাঃ রোম্যান্স, সাইফাই, সুপারন্যাচারাল, স্কুল, ড্রামা 
দৈর্ঘ্যঃ ১ ঘন্টা ৪৬ মিনিট
টাইপঃ মুভি, ১২+
সময়কালঃ ২০১৬

এইতো সেদিন ইউকে প্রিমিয়ারে দেখে আসলাম সাম্প্রতিক সময়ের বহুল জনপ্রিয় অ্যানিমে “কিমি নো না ওয়া”। ইংরেজিতে Your Name. মাইঅ্যানিমেলিস্ট ওয়েবসাইটে এখন পর্যন্ত ৩ নম্বরে থাকা এই অ্যানিমে নিয়ে কিছু কথা বলতে চাই। এটি কি আসলেই একটি মডার্ন অ্যানিমে মাস্টারপিস, যেমনটি অনেকে বলছে? নাকি মাস্টারপিস বলার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল অ্যানিমেটার মার্কেটিং সফল করা…
( স্পয়লার নেই )

কাহিনীঃ

ছোট্ট কান্ট্রিসাইডের সাদামাটা জীবনের সবকিছু হাইস্কুল ছাত্রী মিতসুহার কাছে একদম একঘেয়েমি লাগে। তার ছোটবোনকে নিয়ে সে তার নানীর সাথে থাকে। তার নানীর পরিবারের সাথে শিন্তো মন্দিরের সম্পর্ক আছে বলে তাকে এক প্রাচীন ঐতিহ্য অনুসারে বিভিন্ন রিচুয়াল করতে হয়। এই ছোট শহরে সবাই সবাইকে চেনে, তাই সহপাঠীদের সামনে এসব নৃত্য, পার্থনা করতে তার খুব বিব্রত বোধ হয়। সে এই জীবন ছেড়ে টোকিয়ো চলে যেতে চায়।

একদিন সকালে মিতসুহা ঘুম থেকে উঠে দেখতে পেল সে অন্য এক অচেনা বেডরুমে। আয়নায় নিজেকে দেখে সে যা দেখলো তাতে এটা নিছক স্বপ্ন মনে হল। টোকিও শহরে তাকি নামের একটা ছেলের সাথে তার শরীর বদল হয়ে গেছে। তাকি ও ঘুম থেকে উঠে নিজেকে মিতসুহার শরীরে আবিষ্কার করলো। পরদিন আবার তারা নিজেদের শরীর ফিরে পেলেও, এরপর থেকে তারা একদিন পরপর সকালে ঘুম থেকে উঠলেই একে অপরের শরীরে আবিষ্কার করা শুরু করলো। আর শুরু হল তাদের জীবনে যত গণ্ডগোল।

আপাতদৃষ্টিতে, চমৎকার অ্যানিমেশন আর সেমি রিয়েলিস্টিক ব্যাকগ্রাউন্ড অ্যার্টের সাথে বলা একটি রোমানটিক গল্প হল কিমি নো না ওয়া । মাকোতো শিঙ্কাইয়ের সিগ্নেচার একগাদা ট্রেইন, সাইডসিন আর ডিস্ট্যান্ট লাভের গল্পে যখন সবাই মগ্ন ছিল তখন আমার মনে ছিল অন্য কিছু প্রশ্ন। এবং সেগুলোর উত্তরও আমি পেয়েছি।

দা ফল্ট ইন ইওর নেইমঃ

কেন তাদের শরীর অদল বদল হচ্ছে? আকাশে হাজার বছরে একবার দেখতে পাওয়া যায় এমন একটা ধুমকেতুর তাৎপর্য কি? বুড়ি নানির দার্শনিক সব কথার মানে কি? এগুলো আসল প্লটের সাথে কিভাবে যায়? এসব নিয়ে ভেবেছি, এবং উত্তরও পেয়েছি। এই অ্যানিমেতে সাটেলটি বলছে খুব জিনিষ আছে। তাই ওয়েস্টার্ন নতুন অ্যানিমে ফ্যানরা এগুলো সহজে হজম করতে পেরেছ। নিজের ঐতিহ্যকে বহন করার গুরুত্বের মেসেজটাও চোখের সামনে বার বার নাড়াচ্ছিল অ্যানিমেটা। যারা ধরতে পারেনি তারা শুধু রোমান্স গিলেছে। মানে সবার জন্যেই কিছু না কিছু ছিল এখানে। তাই এর জনপ্রিয়তা খুব তারাতারি বেড়েছে। আর হ্যা অবশ্যই, মার্কেটিঙএর জন্য ইন্টারনেট সাহায্য করেছে।
অ্যানিমেটাতে গার্ডেন অফ ওয়ার্ডস অ্যানিমের একটা চরিত্রকে দেখা যাবে। ক্রসভার করে কি শিনকাই তার নিজের ইউনিভার্স বানাতে চাচ্ছেন? জানিনা।

অ্যানিমের ওপেনিং সিন এবং মাঝখানের একটা দৃশ্যে মিউজিকের সাথে ট্রাঞ্জিশন করা হয়েছে। ঐ দৃশ্য দুটি চমৎকার লেগেছে। কিন্তু একটা সময়ে গিয়ে গানের ওভারস্যাচুরেশনে বিরক্ত হয়েছি। স্পেশালি একটা ইমোশনাল দৃশ্যে ব্যাকগ্রাউন্ডে গান গেয়েই চলছিল। সেখানে একটু নিরবতার দরকার ছিল।

মিতসুহা আর তাকির রোম্যান্সটা কেন জানি কিছুটা মেলোড্রামাটিক লেগেছে। যদিও ফ্যানেরা অজুহাত হিসেবে বলছে যে, একে অপরের শরীরে গিয়ে তারা দুজন দুজনাকে খুব ভালো ভাবে চিনতে পেরেছে বলেই এই রোম্যান্স তার পরেও আমি এটা মানতে পারবো না। কারন অ্যানিমেটাতে দুজনের জীবনের কঠিন সময়গুলো দেখানো হয় নি। দৈনন্দিন নিজ নিজ জীবনের প্রতিবন্ধকতাগুলো যদি তুলে ধরা হত তাহলে চরিত্রগুলি আরো ভালো করে ফুটে উঠতো। “নদীর এপার কহে ছাড়িয়া নিঃশ্বা্স, ওপারেতে সর্বসুখ আমার বিশ্বাস” – এই প্রবাদটির কথা অ্যানিমেটাতে ভালো মতই দেখানো যেত। কিন্তু তা দেখানো হয়নি। কেন তারা একে অপরকে অ্যাপ্রিশিয়েট করে তার ধারনাটা খুবই ইনার্ট লেগেছে।

অ্যানিমের আসল প্লট টুইস্টটা রিভিল হবার অনেক আগেই আমি বুঝতে পেরেছি। এটা অত কঠিন টুইস্ট না, কিন্তু আনকনভেনশনাল বটে। স্টেইক যখন মানবিক থেকে জাগতিক হয়ে গেছে, তখনই অ্যানিমের প্রতি আবেগ কিছুটা সরে যাবার আশঙ্কা করেছিলাম, কিন্তু সেটা ভালো ভাবেই এক্সেকিউট করা হয়েছে।
তবে মিতসুহার আর তার বাবার সম্পর্ক নিয়ে সাবপ্লটটা একদম কাঁচা রেখে দেয়া হয়েছে। যেটা আরেকটু ফুটিয়ে তুলতে পারলেই হত।

মুলত অনেকগুলো ভালো কন্সেপ্ট আছে মুভিটাতে কিন্তু সেগুলো আধাপাকা রেখেই মুভি এগিয়ে গেছে মেলোড্রামাটিক ডিস্ট্যান্ট-লাভ রোমান্সের দিকে।

ওয়েস্টার্ন টিনেজ দর্শকরা তাদের মুভিগুলোতে যেরকম ভালোবাসার গল্প দেখে অভ্যস্থ,তার থেকে ইয়োর নেইম এর গল্প আলাদা, তাই তাদের কাছে এই নতুন রোমান্স অবশ্যই ভালো লাগবে। কিন্তু, যারা অনেক অ্যানিমে দেখেছেন তাদের কাছে এটা তেমন স্পেশাল মনে হবে না। আমি নিজে রোম্যান্স অ্যানিমের ফ্যান না। কিন্তু তারপরেও আমি এরচে উত্তম সাইফাই রোম্যান্স এর নাম বলে দিতে পারবো। আর এ পর্যন্ত যত রিভিউ দেখেছি তাতে মনে হচ্ছে এর আগে কেউ মনে হয় জীবনেও bodyswap সাবজনরার মুভি কখনো দেখেনি।

থাক, হয়তো একটু হার্শ হয়ে যাচ্ছি, অ্যানিমেটার উপর। আসলে হয়েছে কি, অ্যানিমেটা আসলেই ভালো। কিন্তু যেভাবে এটার মার্কেটিং করা হয়েছে, আর অ্যানিমেলিস্ট গুলোতে রিভিউ দেয়া হয়েছে, তাতে অনেক বড় এক্সপেক্টেশন নিয়ে দেখলে আশাহত হতে হবে। অ্যানিমেটা ওভারহাইপড, এবং কিঞ্চিত ওভাররেটেড। মানুষের ভালো লাগা আমি বদলাতে চাচ্ছি না। আমারো ভালো লেগেছে। কিন্তু অতটা না যতটা সবাই দাবী করছে।

মাস্টারপিস না হলেও, এই মুভিটি সিনেমা হলে গিয়ে দেখার মত মুভি, তবে অস্কার নমিনেশনের যোগ্য না। এর এত জনপ্রিয়তার মূল কারণ এর গল্পটা না, বরং সহজলব্ধতা। আমি লন্ডনের একটি সিনেমায় গিয়ে দেখে এসেছি, সেখানে এর আগে জিবলি মুভি ছাড়া আর কোনো অ্যানিমে স্ক্রিনিং হয় নি। আর সেখানেই অ্যানাউন্স হবার কয়েক ঘন্টার মাঝেই অনলাইনে ফুল বুকড হয়ে গেছে। পরে যেখানে ২ দিন দেখানোর কথা ছিল, সেখানে একসপ্তাহ জুড়ে দেখানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। অনলাইন হাইপ আর বিজ্ঞাপন এই অ্যানিমের বাণিজ্যিক সফলতার জন্য কতটা সাহায্য করেছে। আশা করি ভবিষ্যতে এরকম আরো অনেক অ্যানিমে মেইনস্ট্রিম সফলতার সুযোগ পাবে। কারণ এই নেটফ্লিক্স আর সিজিআই অ্যানিমের যুগে জাপানি স্টুডিওগুলির অ্যানিমে ইন্ডাস্ট্রিতে টিকে থাকার জন্য কয়েকটি অসাধারণ অ্যানিমে মুভির বড়ই প্রয়োজন।

পার্সোনাল রেটিংঃ
গল্পঃ ৭.৫/১০
অ্যানিমেশনঃ ৯.৫/১০
সাউন্ডট্র্যাকঃ ৯/১০
ওভারঅলঃ ৮/১০
সিমিলার রেকমেন্ডেশনঃ The Girl Who Leapt Through Time, Garden of Words, A Silent Voice, Hotarubi no Mori e, Patema Inverted and other Makoto Shinkai movies.

স্পয়লারঃ মুভির কোথাও আমার নামটা খুঁজে পাইনি।

Kimi no Na Wa 2

Redline [মুভি রিভিউ] — Shifat Mohiuddin

Redline 1

REDLINE
জনরা: সাইন্স-ফিকশন, কার-রেসিং 
স্টুডিও: ম্যাডহাউজ
সাল: ২০১০
দৈর্ঘ্য: ১০২ মিনিট

দেখে ফেললাম রেডলাইন। ২০১০ সালের মুভি তবে আলোচনা কমই হতে দেখেছি মুভিটা নিয়ে। মুভিটার খোঁজ কোন রিভিউ-ব্লগ থেকে পাই নি। পেয়েছিলাম এনিমে ইউটিউবার Gigguk এর একটা মজার ভিডিও থেকে। গিগাকের একটা ভিডিওতে দেখা যায় মিয়াজাকিরূপী স্টুডিও জিবলি ম্যাডহাউজকে ব্যঙ্গ করছে একটা goddamn মুভি বানানোর পেছনে সাত বছর পার করা নিয়ে। আমি তখনই ভাবলাম যে, ম্যাডহাউজের মত শক্তিশালী স্টুডিওকে সাত বছর ঘোরাতে পারে এমন কী জিনিস থাকতে পারে! নেট-টেট ঘেঁটে জানলাম সেই জিনিস হল ‘রেডলাইন’ আর মুভির পোস্টারের বাহার দেখেই চোখ কপালে উঠলো। অবশেষে দেখেই ফেললাম আর ম্যাডহাউজের সাত বছরের পরিশ্রম যে উশুল হয়েছে তা না বলে উপায় নাই। ‘রেডলাইন’ কোন মুভি নয় বরং একে একটা বিস্ফোরক অভিজ্ঞতা বলা উচিত।

প্লট: রেডলাইনের দুনিয়াটা সুদূর ভবিষ্যতের যেখানে কার রেসিং খুব জনপ্রিয়। তবে সেখানকার রেসিং কারের সাথে আমাদের রেসিং কারের আকাশ-পাতাল তফাত। ভয়ানক রকমের দ্রুতগতিসম্পন্ন বিশাল বিশাল যান্ত্রিক দেহওয়ালা সেই রেসিং কারগুলোকে মানুষ-এলিয়েন সবাই সমানতালেই চালায়। আর সেই দুনিয়ার কার রেসিং এর সবচেয়ে বড় টুর্নামেন্টের নাম হল ‘রেডলাইন’। গল্পের নায়ক
JP কে দেখা যায় সেই টুর্নামেন্টের বাছাইপর্ব ‘ইয়োলো লাইনে’ অংশগ্রহণ করতে। ভয়ানক রকমের বিপদজনক কিছু স্টান দেখিয়ে JP রেস জয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌছে যায়। কিন্তু JP ইতোমধ্যেই মাফিয়া বসদের সাথে ম্যাচ পাতানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছে। তাই তাকে রেসে প্রথম স্থান বিসর্জন দিতে হয়। কিন্তু প্রথম না হওয়ার পরও JP রেডলাইনে অংশগ্রহণের সুযোগ পায় দর্শকদের ভোটের কারণে! রেডলাইনের ভেন্যু হিসেবে ঘোষণা করা হয় ‘রোবোওয়ার্ল্ডকে’ যেখানকার সাইবর্গ সরকার আবার রেডলাইন রেসকে দুচোখে দেখতে পারে না। সেই সরকার তাই সচেষ্ট হয়ে উঠে রেস বানচাল করার জন্য কিন্তু এর মধ্যেই রেসে নেমে পড়ে রেসের আট প্রতিযোগী। JP এর সাথে রেসে আছে চারবারের রেডলাইন চ্যাম্পিয়ন ‘মেশিন হেড’ ও ইয়োলো লাইন চ্যাম্পিয়ন সুন্দরী ‘সোনোশি’। রেসটা একপর্যায়ে JP এর জন্য পরিণত হয় মাফিয়া, রোবট সেনাবাহিনী আর নিজের উচ্চাকাঙ্ক্ষার মধ্যকারের লড়াইয়ে।

আগেই একবার বলেছি রেডলাইন কোন এনিমের নাম নয়, এটি একটি ‘অভিজ্ঞতার’ নাম। মুভিটা দেখলে কথাটা আপনাদের একটুও অত্যুক্তি মনে হবে না। রেডলাইন ডিরেক্টর Takeshi Koike এর প্রথম পূর্ণাঙ্গ কাজ। প্রথম কাজেই তিনি সৃজনশীলতার পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে দিলেন। রেডলাইনের অ্যানিমেশনের কথাই প্রথমে বলি। এমন অ্যানিমেশন যে জাপানে তৈরি হতে পারে তা সহজে বিশ্বাস হতে চাইবে না। রেডলাইনের পুরো দুনিয়াটা আশি আর নব্বইয়ের দশকের কমিকবুকের আদলে তৈরি। আকাশ-বাতাস, ল্যান্ডস্কেপ, পাহাড়-পর্বত সবকিছুতেই একটা অদ্ভুত তারল্য লক্ষ করা যায়। মনে হয় পিসির স্ক্রিনটা একটুখানি নড়ালেই সবকিছু ভেঙ্গে পড়ে যাবে। পুরো এনিমের প্রতিটা ফ্রেমেই একটা কালচে আউটলাইনার ছিল অবজেক্টগুলার গায়ে যার ফলে সবকিছুকে অনেক জান্তব মনে হচ্ছিল। আসলে রেডলাইনের অ্যানিমেশনকে ব্যাখ্যা করতে গেলে হয়তো শব্দের অভাবেই ভুগতে হবে। পুরো এনিমেটাই ছিল ভয়ানক রকমের রঙিন। রেসিং কারগুলার বডির কালার ছিল চোখে পড়ার মত আর চরিত্রগুলোর দেহে নানা রঙের আউটফিট থাকায় একটা গ্রাফিটি গ্রাফিটি ভাব ছিল। গাড়িগুলো যখন রেস করতে থাকে তখন মনে হয় পেছনে একটা রঙের বন্যা বুঝি বয়ে গেছে। নিট্রো জিনিসটা গেইমে-টিভিতে অনেকবার দেখেছি কিন্তু রেডলাইনের নিট্রো দেখিয়ে দিল দেহের রক্তচাপ কিভাবে বাড়াতে হয়।

অ্যানিমেশনের ধারণা মানুষের মধ্যে কিভাবে এল? আমার মতে মানুষ যখন তার মনের আপাত অবাস্তব ও অসম্ভব ধারণাগুলো বাস্তব দুনিয়াতে বাস্তবায়ন/দৃশ্যায়ন করতে পারলো না তখনই অ্যানিমেশনের সাহায্য নিল। রেডলাইনকে এই হিসেবে অ্যানিমেশন জগতের অ্যানিমেশন বলা যায়। মানে একই সাথে এত এত পাগলাটে ঘটনার দৃশ্যায়ন ১০২ মিনিটে হয়েছে যে একে এনিমের মত অস্বাভাবিক জিনিসের মাপকাঠিতেও মাপা যাবে না। রেস বাদ দিয়েও স্পেইসশিপ ব্যাটল, প্রোজেক্টাইল ওয়েপনের মহড়া, ব্যাটলের ফলে পাহাড়-পর্বত কাগজের মত গুড়ো হয়ে যাওয়া, হ্যান্ড টু হ্যান্ড কমব্যাট এমনকি ঐতিহ্যবাহী কাইজু ব্যাটলও (Battle between monsters) ঠেসে ঢোকানো হল একটা রেসে। রেসের ল্যান্ডস্কেপ এত উল্টাপাল্টা রকমের ছিল যে পেইন ভার্সাস নারুতোর ফাইটের বিক্ষিপ্ত ল্যান্ডস্কেপও হার মানবে। গাড়ির স্পিড বাড়ানোর মুহূর্তগুলো এত উজ্জ্বল ছিল যে আলোর ঝলকানির কারণে চোখ পুরো ঝলসে যাওয়ার মত অবস্থা! নিট্রো দেওয়ার সময় চারপাশের স্পেইস মুভিতে এত ভয়ানকভাবে বেন্ড করছিল যে এক দৃশ্যের থেকে আরেক দৃশ্যে তাল মেলাতে পারছিলাম না। মেশিন হেডের সাথে ফাইনাল মুখোমুখির সময় দৃশ্যায়ন এত দ্রুত হয়েছিল যে কয়েকবার পজ করে স্ক্রিন আগুপিছু করিয়েছি শুধুমাত্র এটা বোঝার জন্য যে চারদিকে এসব ঘটছে! মুভি রেসিং কার নিয়ে তৈরি ঠিক আছে কিন্তু এর ফলে দৃশ্যায়নও যে রেসিং কারের গতিতে হবে তা কে জানতো! তাতামি গ্যালাক্সির মত এনিমেগুলাতে প্লেবেক স্পিড কমিয়ে দেখতে হয় সাবটাইটেল পড়ার জন্য, আর রেডলাইনে প্লেবেক স্পিড কমাতে হয়েছে জাস্ট what the hell is going on তা অনুধাবন করার জন্য।

এত দ্রুতলয়ের এনিমেতে যদি দ্রুতলয়ের মিউজিক না থাকে তাহলে তো উত্তেজনা ধরে রাখা সম্ভব না। সেই দিক দিয়েও হতাশ হই নি। টেকনো ধাঁচের দুর্দান্ত মিউজিক কম্পোজ করেছেন মিউজিক ডিরেক্টর James Shimoji. ইঞ্জিনের গর্জনকে দুর্দান্ত সঙ্গ দিয়েছে ট্র‍্যাকগুলো।Redline ও Yellow Line ট্র‍্যাকদুটো রেসের ইনটেনসিটির সাথে পুরোপুরি মানিয়েছিল। তবে সবচেয়ে বেশী অ্যাড্রেনালিন রাশ হয়েছিল ‘Machine Head’ ট্র‍্যাকটা শোনার পর। চারবারের চ্যাম্পিয়নের ভাবমূর্তির যথোপযুক্ত ট্র‍্যাক। চারটে দুর্দান্ত ইংরেজি গানও ছিল মুভির পশ্চিমাভাবের সাথে তাল মেলাতে। And it’s so beautiful গানটাতে আবেদনের মাত্রা বেশীই ছিল আর Redline Day গানটা যেন পুরো মুভির ভাবই বহন করছিল।

রেডলাইন মুভির যে জিনিসটা সবার চোখে পড়তে পারে তা হল এর গল্পের অগভীরতা। যদিও JP এর পাতানো খেলা সংক্রান্ত অন্ধকার অতীত ও উচ্চাকাঙ্ক্ষার ব্যাপারগুলো আরো গভীরতা পেতে পারতো তবে মুভির দ্রুতলয়ের কারণে তা আর বোঝা যায় নি। মেশিনহেড মেইন রাইভাল হওয়ার পরেও তার দর্শনের একটু-আধটূ ইঙ্গিত পাওয়া যায় মাত্র। সোনোশি আর JP এর সম্পর্কটা আরেকটু বিস্তৃত হতে পারতো। রোবোওয়ার্ল্ডের সরকারের বিরোধিতার পেছনের ideology কে হয়তো ইচ্ছে করেই হাস্যকরভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। আসলে সিরিয়াস কোন রেসিং স্টোরি দেখতে চাইলে হয়তো রেডলাইন প্রথম চয়েস নাও হতে পারে। কিন্তু এন্টারটেইনমেন্টকে মাথায় রাখলে রেডলাইনই হবে এক নাম্বার রেসিং মুভি। হয়তো এসব জিনিস ডিটেইলে ব্যাখ্যা করা হলে মুভিটা এত উপভোগ্য হত না।

সাত বছর ধরে একটি মুভির পেছনে খাটাখাটির ফলাফল কী হতে পারে তা রেডলাইনের অ্যানিমেশন দেখে বুঝলাম। প্রায় ১০০০০০ এর মত হাতে আঁকা ফ্রেমের সমন্বয়ে রেডলাইকে পর্দায় আনা সম্ভব হয়েছে! যেখানে একটা ৪৫ মিনিটের মুভির জন্য চাহিদাভেদে ৯০০-১২০০ ফ্রেম লাগে। একদল অসম্ভব রকমের প্যাশন থাকা মানুষের কারণেই রেডলাইনের মহাকাব্যিক অ্যানিমেশন তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। রেডলাইন আধুনিক অ্যানিমেশনের চূড়া সেই ২০১০ সালেই এঁকে দিয়েছে। যারা OPM এর সাইতামা ভার্সাস বোরোসের ফাইট দেখে চোখ কপালে তুলেছেন তারা রেডলাইন মুভিটা দেখে থাকলে পুরো ১০২ মিনিটই চোখ কপালে তুলে রাখবেন।

রেডলাইনের কিছু কিছু মুহূর্ত আজীবন মনে রাখার মত। নিট্রো দেওয়ার পর JP এর দাঁত-কপাটি লেগে যাওয়া চেহারা কে ভুলতে পারবে! রেডলাইন রেসের শেষমুহূর্তে JP এর বলা, I have got the goddess on my side” কথাটা চমৎকার ছিল। মেশিনহেডের বারবার ট্রান্সফর্ম হওয়া দেখে হালই ছেড়ে দিয়েছিলাম। ফ্রিসবি আর বুড়ো মোল আর অন্য সব চরিত্রের কৌতুকগুলাও ভাল ছিল। পুরো মুভিটাতেই একটা আবেদনময়ী ভাব প্রকট ছিল যা লক্ষ্য করেছিলাম কাউবয় বিবপ আর সামুরাই চ্যাম্পলুতে।

সবমিলিয়ে রেডলাইন যেন একটা বোমার মত এসে অ্যানিমেশন দুনিয়াকে কাঁপিয়ে দিয়ে গেল। তাই নিছক কোন মুভি নয়; বিস্ফোরক, রঙিন, আবেদনময়ী এবং ভয়ানক দ্রুতগতির এক অভিজ্ঞতার নাম রেডলাইন। চাদরে জড়সড়ো হয়ে থাকা যুবকের দেহে রেসিং কারের ইঞ্জিনের উন্মুক্ততা এনে দেওয়ার নাম রেডলাইন। দুর্দান্ত সব কার স্টান্টের মাধ্যমে দর্শকের চোখে স্বপ্ন এঁকে দেওয়ার নাম রেডলাইন।

MAL রেটিং: ৮.৩৩/১০ (জনগণের ভালই লেগেছে বোঝা গেল)
আমার রেটিং: ৯/১০

Redline 2