মিলেনিয়াম একট্রেস ও একটি জাতির পুনর্জন্ম — Fahim Bin Selim

[সহযোগ
কন আর্ট – স্বপ্ন, বিভ্রম আর চলচ্চিত্রের প্রতি প্রেমপত্র: http://www.animeloversbd.com/satoshi-kon-fahim-bin-selim/]
 
তাইওয়ানিয় চলচ্চিত্র নির্মাতা এডওয়ার্ড ইয়াং-এর ২০০০ সালের চলচ্চিত্র Yi Yi-এর এক পর্যায়ে এর অন্যতম চরিত্র পাঙ্গজি বলে, “[…]we live three times as long since man invented movies.”
চিয়োকো ফুজিওয়ারা বেঁচে থাকলো এক সহস্রাব্দ – জীবন, স্মৃতি আর চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে – সেনগোকু কাল থেকে দূর ভবিষ্যৎ পর্যন্ত; যে সময়টায়, চন্দ্রমাসের চতুর্দশ দিন হোক আর পঞ্চদশ, চাঁদের পুরোটা জুড়েই মানুষের পদচারণা, আর অসীম মহাকাশের দিকে যাত্রা শুরুর জন্য তার উপর তৈরি পদ্মাকৃতির ঘাঁটি।
কোনো কোনো পদ্মফুল বেঁচে থাকতে পারে হাজার বছর। ঠিক যেমনটা জাপানিরা বিশ্বাস করে লালচাঁদি বা মাঞ্চুরিয়ান সারসের ক্ষেত্রে। তাই তো সারস নকশার কিমোনো জড়িয়ে জন্ম চিয়োকোর, ১৯২৩-এর বৃহৎ কান্টো ভূমিকম্পের সময়। ভূমিকম্পের সাথে জাপান আর চিয়োকোর যোগসূত্র চিরকালের। তার বাবার মৃত্যুও এসময়টায়। চিয়োকো বলে, একজনের জীবনের পরিবর্তে যেন আরেকজনের জন্ম।
 
 
চিয়োকোর তখনো বাইরের বিশ্বের সাথে সংযোগ হয়নি। ম্যাগাজিনের পাতায় নায়ক-নায়িকাদের ছবি দেখে অপার মুগ্ধতায় ডুবে থাকে। এই কৈশোরেই তার সাথে পরিচয় মুখে-ক্ষতওয়ালা একজন সেনার কিংবা একটি রাস্ট্রের, মাথায় টুপি-পড়া নাম-না-জানা একজন বিদ্রোহীর কিংবা একটি আদর্শের; আর প্রথম ভালোবাসার। তবে জাপান সাম্রাজ্যের কাছে তখন ভালোবাসার একমাত্র সংঙ্গা জাতীয়বাদ। আর তার একমাত্র লক্ষ্য সম্প্রসারণ। তারই প্রেক্ষিতে ১৯৩১-এ চীনের শাসনাধীন মাঞ্চুরিয়া দখল করে বসানো হলো মাঞ্চুকুয়ো পুতুল রাস্ট্র। শুরু হলো দ্বিতীয় চীন-জাপান যুদ্ধ। কোরীয় উপদ্বীপ আর দক্ষিণ মাঞ্চুরিয়ার রেল-এলাকা আগে থেকেই তাদের দখলে ছিলো। মাঞ্চুরিয়ার সাধারণ মানুষের উপর চালানো হলো নিপীড়ন; ভাগ্য ভালো থাকলে তাদের জোরপূর্বক শ্রমে কাজে লাগানো হবে, ভাগ্য খারাপ থাকলে হতে হবে জৈব-রাসায়নিক গবেষণার বস্তু। এখানেই বসানো হলো মাঞ্চুকুয়ো ফিল্ম এসোসিয়েশন, আর তার অধীনে নির্মিত হতে শুরু করলো সব প্রোপাগান্ডা চলচ্চিত্র। জাতীয়তাবাদের সুরায় তখনও নেশাগ্রস্থ সাধারণ জাপানিরা।
 
 
ভালোবাসার আশায় সেখানেই পদার্পণ চিয়োকোর। সময়ে সময়ে তার অভিনীত চলচ্চিত্র, স্মৃতিতে থাকা মাঞ্চুরিয়ার জীবন আর গেনিয়ার কাছে দেওয়া সাক্ষাৎকার – তিন স্তরের আখ্যান যেন একসাথে মিশে যায়। বিদ্রোহীর খোঁজে উত্তরের রেলযাত্রায় চিয়োকোর প্রথম দেখা মিলে প্রতিরোধশক্তির – দেশরক্ষায় ঝাঁপিয়ে পড়া চৈনিক সৈন্যদল। “জাতীয়তাবাদী নাকি সাম্যবাদী?” একজন যাত্রী জিজ্ঞেস করে। জীবনমরণের প্রশ্নে সেটায় কীইবা তফাত! দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে সময়। নানকিং, ওকিনাওয়া কিংবা হিরোশিমা-নাগাসাকি তখনো লাশের ভাগাড়ে পরিণত হয়নি।
 
সবশেষে পড়ে রইলো একটি বিধ্বস্ত বিশ্ব। আর একটি বিধ্বস্ত জাতি। সেই জাতির ফিরে আসার অবলম্বন হলো চলচ্চিত্র। গেনিয়ার স্বগোতক্তি,পঞ্চাশের দশক চিয়োকোর সেরা সময়। জাপানের চলচ্চিত্রেরও তো স্বর্ণযুগ এটাই। যুদ্ধপরবর্তী বাস্তবতায় একদল তরূণ আর মাঝবয়সী লোক নেমে পড়লো ক্যামেরা হাতে – কেঞ্জি মিযোগুচি, মাসাকি কোবায়াশি, আকিরা কুরোসাওয়া, মিকিও নারুসে, ইয়াসুজিরো ওযু – জাপানের বর্তমান আর অতীত সেলুলয়েডে তুলে ধরতে। তা যত তিক্তমধুরই হোক। একটি জাতির টিকে থাকার আশা-আকাঙ্খা, অনুভূতি আর অনুতাপের সাথে বহির্বিশ্বের পূনর্পরিচয় হলো কুরোসাওয়া আর কোবায়াশিদের প্রতিটি শট, প্রতিটি ফ্রেমে। আর এই নতুন জাপানি চলচ্চিত্রের মুখপাত্র হলো অদম্য কিছু নারী চরিত্র। চিয়োকো তো বেঁচে রইলো তাদের মাঝেই।
 
সঙ্গী হয়ে আকিরা কুরোসাওয়ার সাথে যাত্রায় প্রাচীন জাপানে। কখনো সে যেন ইসুযু ইয়ামাদা, তাকে তাড়িয়ে বেড়ায় এক প্রেতাত্মা। আর দেওয়ালের রক্তের ছোপ। প্রতিশোধ আর প্রতিহিংসার। সে অবলোকন করে অন্ধবিশ্বাস আর ঔদ্ধত্য, বিশ্বাসঘাতকতা আর পতন। কখনোবা মিসা উয়েহারার মত ঘোড়সওয়ার হয়ে তার খুঁজে বেড়ানো বিদ্রোহীর, আর পেছনে সবসময় লেগে থাকা মুখে-ক্ষতওয়ালা সেই ব্যক্তির; ভিন্ন বেশে, ভিন্ন সময়ে, সবসময়। সেনগোকু, এদো, মেইজি – প্রেতাত্মার অথবা সময়ের চরকার অনবরত ঘূর্ণন, আর বারবার ফিরে আসা একই জায়গায়। যুদ্ধ-বিগ্রহ, ক্ষমতালোভ, আর রক্তের ধারা। যুগে যুগে শান্তির এক নিরন্তর খোঁজ।
 
আকিরা কুরোসাওয়ার Throne of Blood

 

 

লেডি আসাজি চরিত্রে ইসুযু ইয়ামাদা; আকিরা কুরোসাওয়ার Throne of Blood

 

 

প্রিন্সেস ইউকি চরিত্রে মিসা উয়েহারা; আকিরা কুরোসাওয়ার The Hidden Fortress

 

মিকিও নারুসের দৃষ্টিপাত বরং নিকট অতীত আর বর্তমানে – যুদ্ধ-পূর্ববর্তী এক গ্রামীন স্কুল কিংবা যুদ্ধ-শেষে টোকিওর ধ্বংসস্তুপ। যুদ্ধের ভয়াবহতা যে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে দেশের ভিতরেও চলে এসেছিলো। আকাশে ভেসে বেড়ানো কালো মেঘের ভেতর থেকে বর্ষণ হলো গুলি-বোমা। তা বিদায় নিলে আবার হাজির দূর্ভিক্ষ, বাস্তুহরণ আর বেকারত্ব। আর নিজভূমে থেকেও পরাধীনতার স্বাদ পাওয়া প্রথমবারের মত। রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো আমেরিকান সেনারা জানান দেয় সেই নতুন বাস্তবতার। সে সময়টায় চিয়োকো মাথায় জড়ায় হিদেকো তাকামিনের স্কার্ফ। ভাঙ্গা কাঠ আর জঞ্জালের নিচে হাতড়ে ফিরে স্মৃতি আর স্বপ্ন। গলায় তখনো ঝুলতে থাকে সেই আরাধ্য চাবি।

ওইশি-সেনসেই চরিত্রে হিদেকো তাকামিনে; মিকিও নারুসের Twenty-four Eyes

 

 

ইউকিকো কোদা চরিত্রে হিদেকো তাকামিনে; মিকিও নারুসের Floating Clouds

 

কারণ তবুও তো জীবন থেমে থাকে না। ইয়াসুজিরো ওযু তাই আসন গাড়েন মেঝেতে, ক্যামেরা সাজান এমনভাবে যাতে ধরা পড়ে পুরো ঘর আর তাতে থাকা সব মানুষ। বাইরের সব কোলাহলমুক্ত, অন্তত ব্যক্তিগত এই জায়গা-ই তো শেষ সম্বল। অতীতকে পাশে রেখে সামনে এগিয়ে যাওয়ার মন্ত্রণা দেন। সেৎসুকো হারার হাসি জায়গা নেয় চিয়োকোর ঠোঁটে। নাকি তার পুরোটাই দখল করে নেয়! তাই কি ষাটের দশকের মাঝ থেকে দুজনেই হারিয়ে গেলো লোকচক্ষুর আড়ালে?

নোরিকো চরিত্রে সেৎসুকো হারা; ইয়াসুজিরো ওযুর Late Spring

 

সে-ও তো অনেক বছর আগের কথা। সবার স্মৃতিতেই কিছুটা মরচে পড়েছে। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে কীভাবে! চিয়োকো যে পান করেছে অমরত্বের সুধা। ফিল্মের ফিতা আর গেনিয়ার মুগ্ধতায় চিয়োকোর প্রতিটি সংলাপ আর অভিব্যক্তি টিকে আছে আগের মতই। তাই গেনিয়া হাজির হলো চাবি নিয়ে। ধুলোর আস্তরণ সরিয়ে খুলে বসলো বাক্সটা আবার। চিয়োকো, জাপান, সাতোশি কনের নিজের কিংবা আমাদের স্মৃতির। মুখে-ক্ষতওয়ালা লোকটা এখনো বিদ্যমান; নতুন চরিত্র নিয়ে, নতুন জায়গায় দখলদারিত্ব আর সাম্রাজ্যবিস্তারের সেই পুরনো নাটকের মঞ্চায়ন।

তাই চিয়োকো বাড়ির পশ্চাতে জন্মায় তার অতিপ্রিয় পদ্মফুল। কর্দমাক্ত মাটিতে শিকড় গেড়েও সেগুলো যখন পানির উপর ভেসে উঠে তখন থাকে শ্বেতশুভ্র। শত ঘাত-প্রতিঘাতের পরও আদর্শ থেকে বিচ্যুত না হওয়ার দর্শন নিয়ে প্রস্ফুটিত যেন: মানবসভ্যতার অন্ধরূপের সাথে সাক্ষাতের পরও তার উপর আশা না হারানোর প্রতিজ্ঞা, মাঝেমাঝেই সেই আশা দুরাশা বলে সাব্যস্ত হলেও; জীবন আর মৃত্যুর অনন্ত চক্রে বিদ্রোহীর খোঁজে সময় আর কাল পাড়ি দেওয়ার সংকল্প, তার চেহারা এখন বিস্মৃত হলেও। মাঞ্চুরিয়া কিংবা দূর মহাকাশে। শান্তির খোঁজে। ভালোবাসার খোঁজে। পথচলাটাই মুখ্য।
আর সেই পুনর্জন্ম কিংবা নির্বাণের যাত্রায় চলচ্চিত্রের চেয়ে ভালো মাধ্যম আর কী হতে পারে?

উচিয়াগে হানাবি ও কিছু অসংলগ্ন চিন্তাভাবনা — Shifat Mohiuddin

Uchiage Hanabi, Shita kara Miru ka? Yoko kara Miru ka?
 
Warning! পুরো পোস্টটাই একটা স্পয়লার।

উচিয়াগে হানাবি ও কিছু অসংলগ্ন চিন্তাভাবনা:
 
উচিয়াগে হানাবি মুভিটা আমি দেখেছিলাম সেই ২০১৮ সালে। বের হওয়ার পর যখন নেটে আসলো তার পরপরই দেখেছিলাম বলা চলে। দেখার পর স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম দেড় ঘন্টা সময় নষ্ট ইত্যাদি ইত্যাদি। তবে কেন এতদিন পরে পুরনো জিনিসকে টেনে আনা!
কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখলাম মুভিটার সাথে আমার কোন এক ধরণের আত্মার সংযোগ রয়েছে। হ্যাঁ, সিরিয়াসলিই বলছি। এনিমের সাথে আত্মার সংযোগ হওয়া সম্ভব আসলেই। এখন আপনারা একে নিছক উইবগিরি বলে উড়িয়ে দিতে পারেন, আমি বিতর্কে জড়াবো না কোন।
উচিয়াগে হানাবি নোরিমিচি ও নাজুনা নামের দুই কিশোর-কিশোরীর কাহিনী। কাহিনী না বলে কল্পনাও দাবি করা যেতে পারে। পুরো মুভিটাতে ফ্যান্টাসি আবহ শুরু থেকেই ছিল। এরকম ফ্যান্টাসির আবহ ক্লানাড নামের এনিমেটাতে দেখেছিলাম তবে সীমিত আকারে। উচিয়াগে হানাবিতে ফ্যান্টাসি মাধ্যমের উপূর্যপুরি ব্যবহার ছিল বারবার, ফলে মারাত্মক জগাখিচুড়িতে পরিণত হয়েছিল মুভিটা। বাস্তবতা আর কল্পনার ফারাক ধরতে গিয়ে যদি মুভিই শেষ হয়ে যায় তাহলে উস্মা প্রকাশ করাটাই স্বাভাবিক।
শুরুতেই একগাদা অভিযোগ করে ফেললাম। এখন উচিয়াগে হানাবির সাথে আমার নাড়ির টান কিভাবে প্রতিষ্ঠিত হলো সেই আলোচনায় আসি।
উচিয়াগে হানাবির সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে এর ইউটোপিয়ান ভিশনের মধ্যে। কমবেশ সব স্লাইস অফ লাইফ, রোমান্টিক এনিমেই ইউটোপিয়ান। এই জনরার এনিমেগুলো বেছে বেছে আমাদের জীবনের ইতিবাচক স্লাইসটাকেই পর্দায় তুলে আনে। বাস্তব জীবনের দুঃলহ-দুর্দশা তুলে ধরার চেষ্টা যে একদুইটা হয় না তা না, তবে বেশীরভাগ প্রদর্শনীই হয় মধুমাখা। কেন জানি ইনজাস্টিসে জর্জরিত এই দুনিয়ার সাথে এনিমের দুনিয়াকে মেলাতে পারি না।
 
উচিয়াগে হানাবি সম্ভবত এই কারণেই স্পেশাল যে এতে ইউটোপিয়ান উপাদানের পরিমাণ এতই বেশী যে দর্শকরা ঠিকভাবে এর সাথে মানসিক সংযোগই স্থাপন করতে পারে নি। একে অপরের হাত ধরে জাপানের কোন এক মফঃস্বল থেকে দুই কিশোর-কিশোরীর পালাতে চাওয়াটা ছিল ইউটোপিয়া তৈরির প্রথম ধাপ। নোরিমিচি আর নাজুনা দুজনেই কিন্তু বাহিরের কঠিন দুনিয়া সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ। আবার নোরিমিচির জীবনে নাজুনার আগমনও অপ্রত্যাশিতভাবে। তার উপর সাঁতারের সময় চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়া ইত্যাদি আসলে শুরু থেকেই মুভিটার চরম অবাস্তবতার দিকে ধাবিত হওয়ার ইঙ্গিত দিয়ে যাচ্ছিলো। খেয়াল করা উচিত, মুভিটা কিন্তু কিশোর মানসিকতাকে আঁকড়ে ধরে বানানো। সেজন্য কিশোর নোরিমিচির চোখে কিশোরী নাজুনা সবসময়েই রহস্যের এক ভাণ্ডার। নাজুনা আকৃতিতে নোরিমিচির চেয়ে দীর্ঘাকৃতির। পুরুষ হিসেবে বলতে পারি ছেলেবেলায় ড্রিমগার্লরা এভাবেই আমাদের মানসপটে এসে জায়গা করে নিতো। তন্বী দেহই ছিল আমাদের অনেকের আদর্শ নারীর উদাহরণ। তুলনামূলক নাতিদীর্ঘ আকৃতির মেয়েরাও যে পূজনীয় হতে পারে তা তো পরে ইস্ট এশিয়ান কালচার হাতে-কলমে শেখালো!
 
নোরিমিচির মতো কিশোরকালে মিশুক মেয়েদের দিকে মন ঝুঁকে থাকতে চাইতো বেশী। মুভিতে খেয়াল করলে দেখা যায় নাজুনা বেশ বাঁচাল প্রকৃতিরই। নোরিমিচির দ্বিগুণ কথা সে নিজেই বলেছে বলা যায়। সে কথার টানেই কিন্তু নোরিমিচি সিদ্ধান্ত নিল বাসা থেকে পালাবে।
 
মুভির সবচেয়ে সুন্দর জায়গার একটা ছিল সাইকেলের পেছনে নাজুনাকে বসিয়ে নোরিমিচির ঢালু পথ বেয়ে নেমে যাওয়া। দৃশ্যটা দুটো জায়গার কথা মনে করিয়ে দিয়েছিল এক মুহূর্তে:
১। Whisper of the heart মুভির একেবারে শেষে ভোরে নায়ক-নায়িকার সাইকেলে চড়ে কাটানো সময়।
২। মুহাম্মদ জাফর ইকবালের ‘রাজু ও আগুনালির ভূত’ নামের কিশোর উপন্যাসের একেবারে শেষে ১১০ সিসি হোন্ডা বাইকে করে রাজু আর শাওনের পালিয়ে যাওয়া।
 
এই যে সাত-পাঁচ না ভেবে বাসা থেকে পালানোর মত ভয়ানক সিদ্ধান্ত নেয়ার যে তড়িৎ ক্ষমতা, অনেকে একে অদূরদর্শীতা বললেও আমি একে বয়ঃসন্ধিকালের সবচেয়ে বড় শক্তি বলবো। হাইস্কুলের কিশোর নোরিমিচি নাজুনাকে নিয়ে যে অবাস্তব স্বপ্ন দেখেছিল তা সে নিশ্চয়ই বিশ পেরিয়ে গেলে এত সহজে নিতে পারতো না। নাজুনাও সাহস যোগাতে পারতো না কোথাকার এক অর্ধপরিচিত ছেলের হাত ধরে টোকিওর মত বিশাল শহরে যাওয়ার।
কথা প্রসঙ্গে নাজুনার মনস্তত্ত্ব নিয়ে কিছু বলি। শ্যাফটের অ্যানিমেশনের কারিগরির কারণে তাকে প্রথম দিকে খুবই দুর্বোধ্য মনে হচ্ছিল। এতদিন পরে আস্তে আস্তে তাকে কিছুটা হলেও উপলদ্ধি করতে পেরেছি। নাজুনাও আসলে বয়ঃসন্ধি কালের অস্থির সময়ের এক প্রতিনিধি। পরিবারের শেকল ভেঙে সে কিছু দিনের জন্য হলেও বাঁধনহারা জীবন উপভোগ করতে চায়। প্রবল ইচ্ছে থাকার পরেও নানা বাঁধার কারণে কাজটা করতে পারছিল না সে। নোরিমিচিকে সঙ্গী করার মাধ্যমে সে শেষমেষ নিজেকে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ করতে পারে কাজটা করার। আমার মতে নাজুনার সম্পূর্ণ আবেগে বয়ঃসন্ধিকালের আধাআধি বেড়ে উঠা যৌন চেতনার কোন প্রভাব ছিল না। পুরো ব্যাপারটাই ছিল তার কাছে কৌতুহলের খেলা। টোকিওতে গিয়ে সে কিভাবে নিত্য প্রয়োজনের যোগাড় করবে তার দুশ্চিন্তা বিন্দুমাত্র তার মাথায় ছিল না। সম্ভবত নোরিমিচিকে আশ্বাস দেয়ার জন্য সে কাজ খোঁজার কথা বলেছিল।
 
তবে ট্রেনের বগির ভেতরে আমরা নাজুনার চিন্তার আরেকটা পিঠ দেখতে পাই। Ruriiro no Chikyuu গানটা গাওয়ার সময় নাজুনা নিজেকে রাজকুমারী হিসেবে কল্পনা করে। সে কল্পনা করে নোরিমিচি রাজপুত্র বেশে তাকে রথে করে অনেক অনেক দূরে কোথাও নিয়ে যাচ্ছে। শ্যাফটের অপূর্ব অ্যানিমেশন কিশোরী মস্তিষ্কের নিউরনের প্রতিটি স্পন্দনকে পিক্সেলে রূপান্তরিত করার চেষ্টা করেছে এই জায়গাটাতে। নির্ভেজাল আবেগমেশা এই মুহূর্তগুলো তখন স্পর্শ না করলেও এখন হৃদইয়ে দাগ কাটতে সমর্থ হয়েছে।
নোরিমিচির জীবনে নাজুনার আগমনের মত করে আমাদের জীবনে কারোর আসার প্রশ্নই আসে না। তবে এর কাছাকাছি অনুভূতি নিশ্চয়ই অনেকেই নিয়েছেন কল্পনায় অথবা বাস্তবে। আমি আমার কিশোরকালের ব্যক্তিগত একটা ঘটনার বিবরণ দিচ্ছি প্যারালাল টানার জন্য:
 
২০১১-২০১২ সালের দিকে প্রচুর হংকংভিত্তিক মার্শাল আর্টস সিনেমা দেখা হতো। সেসব সিনেমায় নায়িকারা থাকতো চরম অবলা, নায়করা উদ্ধার না করলে তারা কিছুই করতে পারতো না। damsel in distress ই ছিল আমার কাছে নারীর একমাত্র সংজ্ঞায়ন, femme fatale বলতে যে কিছু আছে তা জানতাম না তখন!
স্কুলের একটা মেয়েকে বেশ ভাল লাগতো তখন। যদিও মুখ ফুটে কখনো বলা হয়ে উঠে নি। সে মেয়েটা আবার এলাকায় নতুন আসায় রাস্তাঘাট চিনতো না একদম। পাশাপাশি পাড়াতেই ছিল দুজনের বাসা।
ঘটনাক্রমে একদিন রাত নয়টার দিকে বাসা থেকে বের হওয়ার পর রাস্তার মোড়ে দেখা! মফঃস্বল এলাকায় রাত আটটা বাজলেই তখন ঘুরঘুট্টি অন্ধকার। তার উপর লোডশেডিং চলছিল। জানতে পারলাম আত্মীয়ের বাসা থেকে ফেরার পথে পথ হারিয়ে ফেলেছে! এলাকার ছেলে হওয়ায় অনায়াসেই বাসা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে যেতে পেরেছিলাম। কিছুদিন আগেই The Karate Kid দেখায় নিজের উপর নিজেরই ভক্তি বেড়ে গিয়েছিল!
 
এই মেলোড্রামাটিক ঘটনার রেশ আমার উপর মাসখানেক ছিলো। তখন যদি নাজুনার মত আমাকে বলা হতো পালিয়ে যেতে, অনায়াসেই পনের বছরের আমি দু-চোখ যেদিকে যায় সেদিকে চলে যেতাম। যে চিন্তা ও কাজ উভয়ই এই বিশোর্ধ্ব নাগরিক আমার দ্বারা কোনভাবেই সম্ভব হতো না। অগ্রীম নানারকম দুশ্চিন্তার বেড়াজালে আটকে শেষমেষ ইতস্ততই করতাম। নোরিমিচি কিন্তু এই দ্বিধায় ভুগে আটকে থাকে নি, ঐ বয়সে আমিও অত ভাল-মন্দের ধার ধারতাম না।
 
উচিয়াগে হানাবি বয়ঃসন্ধি কালের এই অপার সম্ভাবনাকে সেলিব্রেট করে। একই সাথে মুভিটা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সীমাবদ্ধতাকে ফ্যান্টাসির বর্শা দিয়ে বিদ্ধ করতে চায়। মরবিড চিন্তাভাবনার এ জায়গাটাতেই মুভিটার সার্থকতা আমার মতে। তবে তারমানে এই নয় যে এই দিকগুলো অন্য কোন এনিমের চেয়ে অনেক বেশী ভাল দেখিয়েছে। দিনশেষে প্রচন্ড সীমাবদ্ধতা থাকা একটা মুভি উচিয়াগে হানাবি। তবে কিছু জিনিস থাকে যার শত ক্রুটি থাকার পরেও মনের মধ্যে আলাদা একটা আবেদন থাকে, উচিয়াগে হানাবি আমার জন্য সেরকম একটা এনিমে।
 
দ্রষ্টব্য: জাফর ইকবাল পরবর্তীতে ‘রাতুলের রাত রাতুলের দিন’ নামে একটা বই লিখেছিল। এটাও কিছুটা এই ঘরানার হলেও আগুনালির মত হতে পারে নি মোটেই। চরিত্রগুলা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়াতেই সম্ভবত গল্পটা মাঠে মারা গিয়েছিল। আগুনালির মত গল্পের সাজেশন চাচ্ছি সবার কাছে।

Paradox Paradigm (Kara no Kyoukai, EP 5) [অ্যানালাইসিস] — Amor Asad

KnK 5

গার্ডেন অফ সিনারস দেখতে গিয়ে মনে হলো এটা নিয়ে big pile of shit লিখবো কোন এক সময়, তবে পাঁচ নম্বর এপিসোড Paradox Paradigm বিশেষ নজরে আসায় স্থগিত করতে মন চাইলো না। সিরিজটা দেখে ফেলেছি এবং পুরো সিরিজে এটা সবচেয়ে পছন্দের এপিসোড। কারণ সমেত এটা তাই—মাঝারি pile of shit.

প্রথমত, পুরো সিরিজে এটা সম্পূর্ণ একটা গল্প। এর আগের এপিসোডগুলো একটার সাথে একটা জড়িত মনে হয়েছে, স্বতন্ত্র মনে হয়নি। প্যারাডক্স প্যারাডাইম ওই গল্পগাথার সাথে জড়িত হলেও, একে আলাদা ভাবে দাঁড় করানো যায়। অন্যতম মূল চরিত্র Tomoe-এর পরিচয় পর্ব, মূল গল্পের সাথে তাঁর সম্পৃক্ততা, তাঁর সাথে Shiki-র যোগাযোগ পর্ব এবং একই সময়কালে Tauko এবং Kokutou এর অবস্থান, শিকির উধাও পর্বের সাথে তাঁর কমরেডদের পদক্ষেপ, মূল অ্যান্টাগনিস্টের পরিচয় পর্ব ও পুরো ব্যাপারে তাঁর ভূমিকা সবকিছু একটা গল্পের নানা অংশ যা অন্য এপিসোডগুলোর উপর নির্ভরশীল না। শিকি হয়তো সিরিজের প্রোটাগনিস্ট কিন্তু এই গল্পের চাবিকাঠি ছিলো Tomoe.
এছাড়া গল্পটা যে চমৎকার, এটা আলাদা করে বলছি না।

মেকার নন-লিনিয়ার স্টোরিটেলিং ব্যবহার করে ভালো কাজ করেছেন। সোজা সাপ্টাভাবে গল্প এগোলে ভালো লাগতো ঠিকই, কিন্তু এখন যেমন মনে হয়েছে, অতটা হয়তো লাগতো না।

দ্বিতীয়ত, মন্টেজ এর সঠিক ব্যবহার। মন্টেজ ফিল্মমেকিং এর একধরনের টেকনিক, যেখানে একাধিক এলোমেলো ছবি যোগ করে কোন অর্থ প্রকাশ করা হয়। যেমন, কারো পা দেখা গেলো, এর পর একটা রোড দেখানো হলো, ক্লোজ শটে একটা গাড়ি দ্রুত বেগে ধেয়ে আসা দেখানো হলো, আরেকটা শটে দেখান হলো একজন রাস্তায় পড়ে আছে, গায়ে রক্ত। এই এলোমেলো শটগুলো দিয়ে বোঝানো যায় রোড-অ্যাকসিডেন্ট ঘটেছে।

মন্টেজের ব্যবহার অ্যানিমেতে প্রচুর দেখা যায়। বিশেষ করে মাকোতো শিনকাই একদম খামোখা ব্যবহার করেন। স্রেফ একটা বিশেষ আবহ আনতে। এই কাজ অবশ্য Garden of Sinners-এও আছে, হাবিজাবি শট এক করে একটা আবহ আনার চেষ্টা। কিন্তু এর মাঝেও একটা অংশ আছে যখন মন্টেজের ভালো ব্যবহার ছিলো।

Tomoe শিকির ঘরে থাকা শুরু করলো, দিন পার হয়ে যাওয়া বোঝাতে দরজার হ্যান্ডেল ঘোরানো, বেসিনে কাপের পর কাপ আইসক্রিম জমা হওয়া আবার ফাঁকা হওয়া এরকম একগাদা সদৃশ ফ্রেম ব্যবহার করা হয়েছে।

এখানে সফলতাটা হচ্ছে, যে সময়ের ভিতর দেখানো হয়েছিলো সেই সময়ে স্রেফ কোন একটা চরিত্রকে দিয়ে বলানো যেত, ‘অনেকদিন পার হয়ে গেছে।’— কিন্তু মন্টেজ দিয়ে আক্ষরিকভাবে সময়পার হবার একটা আপেক্ষিক রূপ দর্শককে দেখানো হচ্ছে। এতগুলো আইসক্রিম খেতে কতদিন সময় লাগতে পারে একটা খসড়া হিসেব হয়ে যায় মনে মনে।

তৃতীয়ত, পয়েন্ট অফ ভিউ শট। প্রথমার্ধের শেষে যখন শিকি বন্দি হলো আরায়া সৌরেন এর দেহরুপী ইমারতে, তার পরের কিছু অংশে সরাসরি শিকি-কে না দেখিয়ে পয়েন্ট অফ ভিউ স্টাইল ব্যবহার করা হয়েছে। ব্যাপারটা অনেকটা ফার্স্ট-পার্সন-শুটার গেম এর ভিউ এর মতো। শিকির চোখ এখানে ক্যামেরা, তাঁর চোখে দর্শক দেখছে, কথা শুনছে, কিন্তু তাঁকে দেখতে পাচ্ছে না। প্রথমার্ধের পর শিকিকে না দেখিয়ে কেবল পয়েন্ট অফ ভিউতে দর্শকের মধ্যে এক ধরণের প্রবল কৌতুহল আর টেনশন সৃষ্টি করা হয়। আমি জানি না গল্পের এই পর্যায়ে কাজটা ইন্টেনশনাল ছিলো কিনা, ইনটেনশনাল হলে সত্যিই ব্রিলিয়ান্ট কাজ।

চতুর্থত, ম্যাচ কাট। প্রথমার্ধে বেশ কটা ম্যাচ কাট ছিলো, বিশেষ করে আপাত মূল চরিত্র Tomoe-কে নিয়ে। ম্যাচ কাট বিশেষ ধরণের সিন-ট্রানজিশন, যেখানে একটা দৃশ্যপটের সাথে ভিন্ন আরেকটা দৃশ্যের মিল করা হয় পারিপার্শ্বিকতা মিল করে। এই কাজটা সুচারুরূপে অ্যানিমেতে প্রথম এবং শেষ যাকে করতে দেখেছি, তিনি ক্ষণজন্মা মাস্টারমাইন্ড, সাতোশি কন। ম্যাচ কাট নিয়মিত ব্যবহার করে অনেকেই, কিন্তু স্টাইলিস্ট সিন ট্রানজিশন এর উপায় হিসেবে খুব কমই করে। প্যারাডক্স প্যারাডাইমের কয়েকটা অংশ হুট করে কন-এর কথা মনে করিয়ে দিয়েছিলো।

এটা অবশ্য অ্যানিমের পক্ষে খুব শক্তিশালী কোন প্রমাণ নাও হতে পারে, হতে পারে কেবলই কনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থেকে অযথাই মেলাচ্ছি।

যাই হোক, কেবল এই এপিসোডের জন্যে আমার রেটিং ৯/১০
ভালো থাকুন, ভালো অ্যানিমে দেখুন।

Devilman: Crybaby-এর সবচাইতে হৃদয়বিদারক দৃশ্যগুলির একটি, Baton Passing দৃশ্যের ব্যাখ্যা — Tahsin Faruque Aninda

Miki_Makimura_(Crybaby)_ddf0e9c2-08cc-4236-8ff8-aff5e6d82d34

[Spoiler Warning: যেহেতু আনিমের সবচাইতে বড় স্পয়লারের একটি এটি, তাই আনিমে শেষ করে লেখাটি পড়ার অনুরোধ রইলো।]

আনিমেটির একদম শেষ পর্বে আর্মাগেডন ধরণের এক বড় ফাইট দেখতে পাই আমরা। স্যাটান আর ডেভিলদের দলের বিপক্ষে আকিরা আর ডেভিলম্যানের দল। এই বড় ফাইটের মাঝখানে খুব আর্টিস্টিকভাবে একটি দৃশ্য যোগ করা হয়েছেঃ ব্যাটোন পাস করার দৃশ্য। হঠাৎ এরকম ফাইটের সময়ে মিকি, মিকো, আকিরা আর রিয়োর মধ্যে ব্যাটোন পাস করার দৃশ্যের মানে কী!? এই শেষ ফাইটগুলিতে তো আকিরা বাদে বাকি কেউ ছিলও না, তাহলে? আসলে, এই দৃশ্যটার একটা বেশ বড় অর্থ রয়েছে।

আনিমেটির মূল থিম কী, জানেন?

ভালবাসা।

হ্যাঁ, আকিরার ডেভিলম্যান হয়ে ডেভিলদের সাথে মারামারি, তারপর কাহিনী এক দিক থেকে গড়াতে গড়াতে আরেকদিকে চলে যাওয়া, এত সবকিছু মূলে আসলে একটি মূল ব্যাপার ছিল, তা হল – ভালবাসা। কীভাবে, বুঝতে পারছেন না? চিন্তা নেই, সেটি বুঝানোই এই লেখাটির উদ্দেশ্য।

আর হ্যাঁ, আনিমের মূল থিম ভালবাসা – এইটা আমার নিজের বানানো কথা না। মূল গল্পের মাঙ্গাকা আর ডিরেক্টর দুইজনেই এই কথা বলেছে। আমার পোস্টের উদ্দেশ্য সেটা সবার জন্যে সোজা ভাষায় তুলে ধরা।

মিকো ব্যাটোনটা মিকিকে পাস করে, মিকি সেটা আকিরাকে পাস করে, আকিরা সেটা রিয়োকে দিতে যায়, কিন্তু রিয়ো অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে বা একদম ইগ্নোর করে। ব্যাটোন আর পাস করা হয় না। বেশ অনেকবার এই দৃশ্যটি দেখি আমরা, তাও এমন সময়ে যখন আকিরা আর স্যাটান মারামারি করতে থাকে, দুনিয়া ধ্বংস হতে থাকে। হঠাৎ এরকম মুহুর্তে ব্যাটোন পাস করা কেন? আসলে ব্যাটোন পাস – এই আইডিয়াটা পুরা সিরিজ জুড়েই ছিল কিন্তু। যেমন এই দৃশ্যেও একবার দেখতে পাই আমরাঃ

tumblr_p25ocfLs0u1tg8peeo1_500

এবার আসি আসল প্রসঙ্গে। মিকোকে দিয়েই শুরু করা যাক।

৯ম পর্বের এক পর্যায়ে মিকো তার ভালবাসার কথা মিকিকে বলতে পারে অবশেষে, যার কিছুক্ষণের পরেই মিকো মারা যায়। মিকো তাই মিকিকে ভালবাসার ব্যাটোন পাস করে দিল। শেষ পর্বের ব্যাটোন পাসের সিরিয়ালে প্রথমেই তাই দেখতে পাই মিকো মিকিকে ব্যাটনটা দিল।

এরপর ৯ম পর্বের শেষে মিকি মারা যাবার আগে আকিরার প্রতি তার আস্থা আর ভালবাসা পৌঁছে দেয়। মৃত্যুর মুহুর্তে কল্পনার দৃশ্যে সেটা দেখতে পায় সেই ব্যাপারটা। আকিরা শেষ মুহুর্তে হলেও তাকে বাঁচাবে, সেই বিশ্বাস মিকির ছিল, এমনকি মারা যাবার সময়েও আকিরার প্রতি তার টান বুঝা যায়। মিকি আর অন্য সবার ছিন্নবিচ্ছিন্ন মৃতদেহ দেখে আকিরার কষ্ট পাওয়াটা খুবই ইমোশনাল এক দৃশ্য ছিল। মিকো আর মিকি, ছোটকালের দুই বন্ধুর পৌঁছে দেওয়া ভালবাসা আর তাদের করুণ মৃত্যু তাকে মানসিকভাবে ভেঙ্গে ফেল। ব্যাটোন পাসের সিরিয়ালে দ্বিতীয় ক্রমে মিকোর পৌঁছে দেওয়া ব্যাটোন মিকির হাত থেকে আকিরার কাছে চলে যায় এ জন্যে।

শেষ যুদ্ধে আকিরা রিয়োর প্রতি এতদিনের ভালবাসা আর ঘৃণার এক অদ্ভুত মিশ্রণে পড়ে সব অনুভূতি একের পর এক ঘুষির আকারে পৌঁছে দেয়। রিয়োর বিট্রে করা আকিরা মন থেকে মেনে নিতে পারে নি — শুধু এই কারণে না যে পৃথিবীর এই অবস্থা হয়েছে বলে। বরং তার সবচাইতে কাছের বন্ধু তাকে বিট্রে করেছে। সেই দুঃখ তো আছেই, আর রয়েছে আকিরার সব চেনাজানা মানুষ, এবং পুরা পৃথিবীরই করুণ পরিণতি!

ঐ সময়ে প্রত্যেকটা ঘুষির সময়ে ব্যাটোন পাস দেখানো হয়। স্যাটানকে একটা করে ঘুষি মারে, আর পরের দৃশ্যেই আকিরা রিয়োকে ব্যাটোন পাস করার চেষ্টা করে। স্যাটান ফিরতি আঘাত দেয়, আর রিয়ো সেই ব্যাটোন ফেলে দেয়। মানুষদের প্রতি আকিরার ভালবাসা জিনিসটা রিয়ো ঠিকমত বুঝে না, তাই বারবার আকিরার পাস করা ব্যাটোন রিয়োর কাছে পৌছার আগেই নিচে পড়ে যায়।

যুদ্ধের শেষে আকিরার মৃত্যু হয়, আর তখন রিয়ো বুঝতে পারে তার ভুলটা। গড কেন ডিমনদের ধ্বংস করবে এই রাগের কারণে স্যাটান নিজেই যে মানুষদের ধ্বংস করতে গিয়ে হিপোক্রিসি করলো সেটা সব মানুষ আর আকিরা মারা যাবার পর বুঝতে পারলো। আর আকিরাকে হারানোর পর বুঝতে পারে আকিরার প্রতি তার ভালবাসার ব্যাপারটা। বুঝতে পারে কত বড় ভুল হয়েছে। আকিরার পাস করা ব্যাটোন অবশেষে রিয়োর কাছে পৌঁছে। কিন্তু ততক্ষণে অনেক, অনেক দেরী হয়ে যায়! একমাত্র কাছের বন্ধু, একমাত্র ভালবাসার মানুষটাকে নিজ হাতে মেরে ফেলে স্যাটান নিজেই পরাজিত হয়ে যায়।

মিকোর সেই এগিয়ে দেওয়া ভালবাসার ব্যাটোন মিকির হাত ধরে আকিরার কাছ হয়ে রিয়োর হাতে পৌঁছে যায় অবশেষে। আর সেই সাথে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যায়।

Fate Series Character Origin: Gilles de Montmorency Laval — Safayet Zafar

Caster 1

Full Name: Gilles de Montmorency Laval
Born: prob. c. September at France
Social standing: c (baron)

এই সেই ফেট জিরোর Gille de rais . Caster class, was a servant of Ryonnosuke

এই ব্যক্তি ছিলেন ফ্রান্সের একজন নোবেল ম্যান। ফান্সের ব্রিটানি (ফ্রান্সের উত্তর পূর্বে অবস্থিত) মিলিটারির সদস্য ছিলেন ১৫ শতাব্দীতে। তার ভাগ্য ছিল অনেক সু প্রসন্ন। তার জমা করা মোট সম্পত্তি এতোই বেশি ছিল তা ব্রিটানির ডিউকের মোট সম্পত্তিকে ছাড়িয়ে যায়। Hundred Years war এ তিনি অকল্পনীয় সাফল্য লাভ করেন যার কারণে তাকে মার্শাল অফ ফ্রান্স উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

১৪৩৪/১৪৩৫ খ্রিষ্টাব্দে তিনি মিলিটারি থেকে অবসর নেন এবং তার জমা করা সম্পদ বিপুল ভাবে খরচ করতে থাকেন। ১৪৩২ খ্রিষ্টাব্দে তার উপর সিরিয়াল কিলিং এর অভিযোগ আনা হয় যা ছিল ১০০ এর উপর বাচ্চা হত্যার।

Caster 2এর পর পর ই এক পাদ্রীর সাথে ভয়ংকর ঝগড়া হবার পর অভিযোগের তদন্ত যাযকীয় তন্দন্তে রূপ নেয় এবং ১৪৪০ খ্রিষ্টাব্দে তার অপরাধ সবার সামনে এসে পড়ে। তার বিচার কার্যে তিনি নিজের মুখে হত্যাকান্ডের শিকার হওয়া বাচ্চাদের পরিবারের সামনে নিজের দোষ শিকার করেন।

তিনি ১ম হত্যা করেন জেউডন নামের ১২ বছর বয়সী এক ছেলেকে ( ১৪৩২-১৪৩৩) খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে। এই জেউডন ছিল পশম প্রস্তুত কারী Gulliaume Hilairet এর সহকারী।

Gille de rais এর খালাতো ভাই Gilles de sille এবং Roge de Briqueville. সেই পশম প্রস্তুতকারী কে বলে জেউডেন কে নিয়ে যায় Machecoul এ একটি বার্তা পাঠাতে। যা ছিল পুরোই একটি মিথ্যা কথা এবং সেই বালক টি আর ফিরে আসেনি। তারা পরে অপহরনের কথা বলে বিষয়টিকে ধামাচাপা দেয়।

Gilles de rais এর ১৯৭১ নং বায়োগ্রাফিতে Jean Benedetti বলেছেন যে বালকটি কিভাবে gille এর হাতে পড়ে ও মারা যায়।

“[The boy] was pampered and dressed in better clothes than he had ever known. The evening began with a large meal and heavy drinking, particularly hippocras, which acted as a stimulant. The boy was then taken to an upper room to which only Gilles and his immediate circle were admitted. There he was confronted with the true nature of his situation. The shock thus produced on the boy was an initial source of pleasure for Gilles.”

Gilles de rais এর দেহ ভৃত্য poitou যিনিও এসব নির্মম হত্যাকান্ডে সহায়তা করতেন তিনি স্বীকার করেছেন যে Gilles ১ম এ বাচ্চা দের কে উলঙ্গ করতো। তারপর তাদের একটি হুকের সাথে বেধে ঝুলিয়ে দিতো এবং তাদের গায়ের উপর বীর্যপাত করতো। এরপর তাদের আশস্ত করা হতো এই বলে যে সে তাদের সাথে কিছুক্ষণ খেলতে চায়। এরপর পরইর তাদের হত্যা করা হতো।

আর যেসব বাচ্চাদের Gilles এর পছন্দ হতো তাদের সে সোডোমাইজ (sodomize = kind of. sexually abuse like oral or anal sex).

সবশেষে তাদের পেট চিরে ফেলে তাদের ভিতরের অঙ্গপ্রতঙ্গ গুলো দেখতেন Gille, তাদের চুমু খেতেন ও পেটের উপর বসে মৃত্যুযন্ত্রনা দেখতেন। শেষে মৃতদেহ গুলো তার রুমের ফায়ার প্লেসে পুড়িয়ে ফেলা হতো।

সকল দোষ প্রমাণিত হওয়ার পর তাকে ফাসির আদেশ দেওয়া হয় এবং ২৬ অক্টোবর, ১৪৪০ খ্রিষ্টাব্দে ৩৫ বছর বয়সে মারা যান। তাকে Church of the monastrey of Notre Dame des carmes যা Nantes এ অবস্থিত, সেখানে দাফন করা হয়। ধারণা করা হয় তার হাতে মারা যাওয়া বাচ্চার সংখ্যা ১৪০ জন।

Caster 3

চরিত্র বিশ্লেষন এবং উৎস অনুসন্ধান -৫ – Atlanta [Fate/Apocrypha] — Shifat Mohiuddin

Atlanta 1

চরিত্র: আটলান্টা/Atlanta
উপাধি: আর্চার অফ রেড
এনিমে: Fate/Apocrypha
ভূমিকা: মধ্যমপন্থী
জাতীয়তা: গ্রীক
জন্ম ও মৃত্যু: জানা যায় নি
মৃত্যুর ধরণ: জানা যায় নি

ছোটবেলা হয়তো আমরা অনেকেই এমন একটা গল্প পড়েছি যে, একবার এক রাজকন্যা বিয়ের সময় শর্ত জুড়ে দেন যে তাকে বিয়ে করতে চাইলে তার সাথে পাণিপ্রার্থীকে একটা দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে হবে। জিততে পারলে রাজকন্যা মিলবে, হেরে গেলে প্রতিযোগীর শিরশ্ছেদ করা হবে। অনেক জায়গা থেকে বড়বড় বীরগণ ভিড় করলেও কাটা মাথার সংখ্যা বাড়তেই থাকে ক্রমান্বয়ে কারণ রাজকন্যা অত্যন্ত দ্রুতগতির ছিলেন। অবশেষে এক প্রতিযোগী রেসের মধ্যে একটা করে সোনার আপেল নিক্ষেপ করেন রাজকন্যাকে বিভ্রান্ত করার জন্য। স্বর্ণের আপেল জিনিসটা অনেক চিত্তাকর্ষক হওয়ায় রাজকন্যা ঝুঁকে দেখতে গেলে এই সুযোগে ঐ প্রতিযোগী রেস জিতে যান এবং ঐ রাজকন্যার স্বামী হবার সুযোগ লাভ করেন। আজকে Fate/Apocrypha এর চার নম্বর এপিসোড দেখার সময় এই কাহিনীর কথা মনে পড়ে গেল। হ্যাঁ, রেড সেকশনের আর্চার আটলান্টাই ছিলেন সেই রাজকন্যা। জটিলতা এড়ানোর জন্য রূপকথার বইয়ে কঠিন কঠিন গ্রীক নাম দেওয়া হত না আরকি। প্রায় দুই বছর আগে আমি ফেইট সিরিজের কতিপয় চরিত্রের ব্যাকগ্রাউন্ড নিয়ে ধারাবাহিক কিছু লেখা লিখেছিলাম। মধ্যে হুট করে লেখার আগ্রহ চলে যায়। আজ আবার হুট করে কীবোর্ডের গায়ে কিছু আগাছা জন্মানোর ইচ্ছা হল।

আটলান্টার পিতৃপরিচয় নিয়ে বিশেষ কিছু জানা যায় না। রাজা Iasus এর ঘরে তার জন্ম এই ধারণাটাই বেশি জনপ্রিয়। আটলান্টাকে জন্মের পরপরই মারাত্মক প্রতিকূল পরিবেশের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। তার পিতা পুত্র সন্তানের আশা করেছিলেন, আটলান্টাকে দেখে তিনি আশাহত হন। কন্যাসন্তান পালনের ইচ্ছা না থাকায় তিনি আটলান্টাকে জঙ্গলে রেখে আসেন। একটি বন্য ভাল্লুক আটলান্টাকে প্রতিপালন করে। (এইসব ঘটনা গ্রীক পুরাণে নিত্যনৈমিত্তিক!) বয়ঃপ্রাপ্তির সাথে সাথে আটলান্টা শিকারিদের সাথে মেশা শুরু করেন এবং কিছুদিনের মধ্যেই নিজের দক্ষতা প্রদর্শন করে অন্য সবার থেকে শ্রেষ্ঠ হয়ে উঠেন। সভ্য সমাজের সাথে না চলা নিয়ে আটলান্টার মনে কোন দুঃখ ছিল না। আটলান্টা দেবী আর্টিমেসের অনুসারী হয়ে কুমারীব্রত গ্রহণ করেন। নিজের নারীত্ব নিয়ে তার মনে বিন্দুমাত্র দুশ্চিন্তা ছিল না এবং জীবনযাত্রায় পুরুষকে তিনি নিতান্তই অপ্রয়োজনীয় মনে করতেন। তাছাড়া তার বিয়ে নিয়ে অমঙ্গলজনক ভবিষ্যৎবাণী ছিল।

আটলান্টার বীরত্বের প্রথম নিদর্শন পাওয়া যায় ‘ক্যালিডোনিয়ার বন্য শূকর’ শিকারের সময়। ঠিকমত পূজা না করায় দেবী আর্টেমিস ক্যালিডোনিয়া রাজ্যে একটা বন্য শূকর পাঠান সেখানের মানুষকে শায়েস্তা করার জন্য। ক্যালিডোনিয়ার রাজপুত্র মেলিয়েগারের নেতৃত্বে একদল শিকারি প্রস্তুত হয় শিকারের জন্য। আটলান্টা এই শিকারি দলে যোগ দিতে চাইলে নারী হওয়ার কারণে অনেকেই এর বিরোধিতা করে। মেলিয়েগার বিবাহিত হওয়ার পরও আটলান্টার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে এবং তার চাপাচাপিতেই আটলান্টাকে দলে নিতে সবাই রাজী হয়। আটলান্টার ছোঁড়া তীরই সর্বপ্রথম শূকরটার গায়ে আঘাত হানতে সমর্থ হয়। অবশেষে মেলিয়েগার তার বর্শা দিয়ে শূকরটাকে হত্যা করেন। পরবর্তীতে মেলিয়েগার প্রথম আঘাতের কৃতিত্বস্বরূপ আটলান্টাকে শূকরের ছাল উপহার দিতে চাইলে মেলিয়েগারের মামারা এর বিরোধীতা করে। তারা আটলান্টার কাছ থেকে পুরষ্কার কেড়ে নিতে চাইলে মেলিয়েগার রেগেমেগে তার দুই মামাকে হত্যা করেন। ভাতৃদ্বয়ের মৃত্যুর কারণে রাগে অন্ধ হয়ে তাই মেলিয়েগারের মা আলথিয়া একটি জাদুর কাষ্ঠখণ্ডকে আগুনে নিক্ষেপ করে যাতে মেলিয়েগারের জীবনীশক্তি অবস্থান করছিল। ফলে মেলিয়েগার মারা যান এবং কিছুক্ষণ পরে জঙ্গল থেকে আরেকটা বন্য শূকর এসে আলথিয়াকে হত্যা করে।

¤

আটলান্টা কলচিস (Fate/stay night এর ক্যাস্টার মিডিয়ার রাজ্য) অভিযানে যেতে চাইলেও জ্যাসন (মিডিয়ার স্বামী) তাতে রাজী হন নি। কারণ হিসেবে আবারও সেই নারী হয়ে জন্ম নেওয়াটাকেই দাঁড়া করানো হয়। তবে কলচিস অভিযান নিয়ে তৈরি হওয়া একাধিক কাহিনীর একটি অনুযায়ী আটলান্টা অভিযানে ঠিকই যোগ দিয়েছিলেন। তিনি যুদ্ধে আহতও হন এবং কথিত আছে যে মিডিয়া তাকে সেবাশুশ্রূষা দিয়ে সারিয়ে তোলেন।
(ফেইট সিরিজ বড়ই বিশাল ব্যাকগ্রাউন্ডওয়ালা একটা সিরিজ। অনেককিছুর সাথেই অনেককিছুর কানেকশান পাওয়া যায়!)

¤

Atlanta 2

আটলান্টাকে নিয়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় যে কাহিনী সেটা হল রূপকথার সেই দৌড় প্রতিযোগিতার গল্প। ক্যালিডোনিয়ার শূকর শিকারের পর আটলান্টার বাবা নিজের মেয়েকে স্বীকৃতি দেন। তিনি নিজের মেয়েকে রাজ্যে ফিরিয়ে নেন এবং বিয়ের জন্য চাপ প্রয়োগ করতে থাকেন। সরাসরি বিরোধিতা করা বোকামি হবে ভেবে আটলান্টা শর্ত জুড়ে দেন যে তাকে রেসে পরাজিত করতে পারলেই বিয়ের অনুমতি মিলবে। আটলান্টা তার সময়ের সর্বাধিক গতি সম্পন্ন মানুষ ছিলেন তাই তার কুমারীত্ব অক্ষুণ্ণ থাকে। কথিত আছে যে, আটলান্টা নানাভাবে তার প্রতিযোগীদের সুযোগ করে দিতেন। যেমন: বর্ম পরিধান করে অংশগ্রহণ অথবা প্রতিযোগীকে অর্ধেক পথ এগিয়ে দেওয়ার পর দৌড় দেওয়া। এরপরও কেউই তাকে পরাজিত করতে পারছিল না। তখনই দৃশ্যপটে আসেন মেলানিওন। (হিপ্পোমেনেস নামেও পরিচিত) মেলানিওন আটলান্টাকে ভালবাসতেন। তাই তিনি ভালবাসার দেবী আফ্রোদিতির কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেন। আফ্রোদিতি প্রেমিকদের প্রতি দয়াশীল হওয়ায় মেলানিওনকে তিনটি সোনার আপেল দেন আটলান্টাকে বিভ্রান্ত করার জন্য। নির্দিষ্ট সময়ে রেস শুরু হওয়ার পর আটলান্টা কিছুক্ষণের মধ্যেই মেলানিওনকে পেরিয়ে যান। তখনই মেলানিওন প্রথম আপেলটি নিক্ষেপ করেন। সোনার সেই আপেল দেখতে এতই চিত্তাকর্ষক ছিল যে আটলান্টা সেটা তুলে নিতে গিয়ে দেখেন যে মেলানিওন তাকে পেরিয়ে গেছে। তারপরও আটলান্টা আত্মবিশ্বাসী ছিলেন রেসে জয়লাভ করার ব্যাপারে। এবং এর প্রমাণ দেন তিনি আবারও মেলানিওনকে পেরিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে। তখনই মেলানিওন দ্বিতীয় আপেলটি নিক্ষেপ করেন। আত্মবিশ্বাসী আটলান্টা আবারও সেই আপেলটি কুড়িয়ে নেন। লক্ষ্যসীমার নিকটবর্তী হওয়ার পর যখন আটলান্টা মেলানিওনকে আবার পেরিয়ে যাচ্ছিলেন তখন মেলানিওন শেষ আপেলটি নিক্ষেপ করে আটলান্টাকে বিভ্রান্ত করে দেন এবং রেসে জয়লাভ করে আটলান্টাকে জিতে নেন।

কুমারীব্রত ভেঙ্গে গেলেও আটলান্টা এবং মেলানিওনের সংসার ঠিকমতই চলছিল। আনন্দের স্রোতে ভাসতে ভাসতে মেলানিওন আফ্রোদিতির প্রতি তার দায়বদ্ধতা ভুলে যান। তাই রাগান্বিত হয়ে আফ্রোদিতি সুযোগের অপেক্ষা করতে থাকেন। একবার জিউসের মন্দিরের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার আফ্রোদিতি দম্পতির মাথায় নিষিদ্ধ কিছু করার প্ররোচনা ঢুকিয়ে দেন। ফলে মেলানিওন আটলান্টাকে নিয়ে মন্দিরে প্রবেশ করেন এবং সেখানে তারা মিলিত হন। মন্দিরের পবিত্রতা নষ্ট হওয়ায় জিউস ক্ষুদ্ধ হয়ে মেলানিওন ও আটলান্টাকে সিংহ বানিয়ে দেন। গ্রীকদের ধারণা অনুযায়ী ব্যাপারটা অত্যন্ত কাব্যিক এবং ট্র‍্যাজিক ছিল কারণ তারা বিশ্বাস করতো সিংহরা নিজেদের মাঝে প্রজনন করতে পারে না, তারা মনে করতো সিংহরা শুধুমাত্র চিতাদের সাথে প্রজনন করে। ফলে মেলানিওন এবং আটলান্টা চিরদিনের জন্য আলাদা হয়ে যান।
(প্রথমে আটলান্টার বিড়ালের মত কান আর লেজ দেখে অবাক হয়েছিলাম। এখন ব্যাপারটা খাপে খাপে মিলে যাচ্ছে। সিংহী অবস্থায় মৃত্যুবরণ করার কারণে হয়তো সামনিংয়ে এর প্রভাব পড়েছে। নভেল পড়ি নি তাই জানি না সামনে এই ব্যাপারে কিছু বলা হবে কিনা। তবে টাইপ-মুনের প্রশংসা করতেই হবে, মিথের অনুসরণ আর ওয়াইফু চার্মের কাজ দুটোই একসাথে হয়ে গেল।

অ্যাকিলিসের আটলান্টাকে বড় বোন ডাকার ব্যাপারটা একটু ধোয়াটে লেগেছিল। এই ব্যাপারের সাথে একটা ঘটনার সংযোগ ঘটানো যায়। একবার এক শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে অ্যাকিলিসের বাবা পেলেয়ুসের সাথে আটলান্টার একটা কুস্তি ম্যাচ হয়েছিল। ম্যাচে আটলান্টা জয়লাভ করে ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেন। হয়তো অ্যাকিলিস এই ঘটনার কথা জানতো। তবে আন্টি না ডেকে সিস ডাকার ব্যাপারটা এখনো পরিষ্কার হচ্ছে না।

আটলান্টা এক সন্তানের মা হয়েছিলেন। তবে সেই সন্তানের বাবা মেলানিওন নাকি মেলিয়েগার তা নিয়ে মতভেদ আছে। সেই সন্তান, পার্থেনোপাসকে নিয়েও অনেক বীরত্বের কাহিনী প্রচলিত আছে।

সোর্স: উইকিপিডিয়া, এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা, greekmythology.com

সাকুরা কি আসলেই ইউজলেস? নাকি সব আমাদের পার্স্পেক্টিভের ব্যাপার? — তাহসিন ফারুক অনিন্দ্য

নারুতো ভক্তদের অন্যতম বড় এক দাবী, সাকুরা চরিত্রটি অসম্ভব রকমের ইউজলেস, সোজা ভাষায় একদমই অকার্যকর। এক সাকুরা না থাকলেই নারুতো আর সাসকের জার্নি অনেক সহজ হয়ে যেত, গল্প অনেক গতি পেত, তাদের জীবন অনেক সহজ হত ইত্যাদি কত কথা! আসলে ব্যাপারটা কি সেটাই? নাকি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে কোন এক জায়গায় এমন গোলযোগ বেঁধে গিয়েছে যার কারণে এরপর থেকে সাকুরা যা কিছুই করুক না কেন, চরিত্রটা আমাদের চোখে একদম অকার্যকর? আজকে এই বিষয়টা নিয়েই আলোচনা করতে চাই।

প্রথমেই আমরা আগে দেখি একদম অল্প বয়সে সিরিজের শুরুর দিকে যখন আমাদের গল্পের নায়ক-নায়িকাদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়, তখন একেকজনের ব্যাকগ্রাউন্ড কীরকম। নাইন টেইল ফক্সের ঘটনার কারণে বিখ্যাত/কুখ্যাত হওয়া ছাড়াও নারুতোর বাবা ছিল চতুর্থ হোকাগে, মা তার সময়ের অন্যতম শক্তিশালী কুনোইচি, এবং নাইন টেইল ফক্সের জিঞ্চুরিকি। বিখ্যাত উচিহা পরিবারের অন্যতম সদস্য সাসকে। টিম ১০-এর ইনো, শিকামারু ও চৌজি তিন জনেই কোনোহার তিন বিখ্যাত পরিবারের সদস্য, যাদের অনন্য ক্ষমতা ও এদের প্রয়োগ এই তিন পরিবারকেই বানিয়েছে তাদের গ্রামের ভয়ংকর সব নিঞ্জা। টিম ৮-এর হিনাতা বিখ্যাত হিউগা পরিবারের সদস্য, তার বিয়াকুগান রয়েছে যাকে গল্পের শুরুর দিকের সবচাইতে শক্তিশালী চোখ সম্পর্কিত ক্ষমতা বলে ধরে নেওয়া হয়। শিনো হল পোকামাকড়ের উপর ক্ষমতাধরী অন্যতম ভীতিকর বংশ আবুরামে-এর সদস্য, আর কিবা হল ইনাজুকা পরিবারের সদস্য, যারা কুকুরদের নিঞ্জা হিসাবে কাজে লাগানোর জন্যে বিখ্যাত। টিম গাই-এর নেজি আরেক বিখ্যাত বিয়াকুগান ব্যবহারকারী, তেনতেন তার বিভিন্ন রকমের নিঞ্জা টুলস ব্যবহার করার জন্যে জনপ্রিয়, এবং রক লি তার ভয়াবহ তাইজুতসুর জন্যে সবার মনে জায়গা করে নেবার মত এক চরিত্র। সেই তুলনায় বাকি থাকা সাকুরার পরিচয় কী? সাকুরার একমাত্র পরিচয় সে সাসকে-কে ভালবাসে। তার বাবা-মাও বিখ্যাত কোন নিঞ্জা নয়, এমনকি সাকুরার বাবা-মায়ের ব্যাপারে পরবর্তীতে আমরা যখন জানতে পারি, ততদিনে শিপুদেনের ৩৫০ পর্ব অতিক্রম করে ফেলে, এবং যেই পর্বে জানতে পারি সেটাই ফিলার পর্ব। অর্থাৎ প্রথম পরিচয়েই সাকুরাকে আমরা কিউট একটা মেয়ে ছাড়া আর বিশেষ কোন কারণে মনে রাখতে পারছি না। প্রথম ইম্প্রেশনেই সাকুরা তাই নিজেকে মেলে ধরার মত কিছুই পায় নি গল্পের নির্মাতার কাছ থেকে।

ল্যান্ড অভ স্টিল আর্কে, অর্থাৎ জাবুজার আর্কে কাকাশি, সাসকে আর নারুতো পুরা স্পটলাইট কেড়ে নেয়। সাকুরার সেখানে কান্নাকাটি করা ছাড়া আর কিছু করার থাকেও না। ধীরে ধীরে বুঝতে পারে অন্যদের তুলনায় সে কতটা পিছনে। এরপরে চুনিন আর্কে পুরা গল্পজুড়ে সাকুরার একমাত্র বলার মত ঘটনা ছিল সাউন্ড ভিলেজের নিঞ্জাদের সাথে মারামারির এক পর্যায়ে নিজের চুল কেটে ফেলা, যেন তাকে ধরে রেখে সাকুরার বন্ধুদের পথে বাঁধা হতে না পারে। বলে রাখা দরকার, এই পর্যায়ে এসে আমরা প্রায় সব অল্পবয়স্ক নিঞ্জাদের প্রত্যেকেরই ক্ষমতার ভাল ব্যবহার দেখেছি। নারুতোর সাসকে-কে বাঁচানো কিংবা তার বিস্ময় জাগানো ট্যাকটিক্স আর সাসকের কাধের সেই সিলের ক্ষমতা, টিম ৭-এর অন্য দুইজনই এরই মধ্যে গল্পের প্রধান চরিত্র হিসাবে দাবী করার মত অনেক কিছু দেখিয়ে ফেলেছে। চুনিন পরীক্ষার ফাইনাল স্টেজ শুরু আগে প্রিলিমিনারি রাউন্ডে সাকুরা আর ইনোর মারামারির সময়ে আরেকটা ব্যাপার স্পষ্ট হয়ে উঠে, এই দুইজন আসলে এখনও চুনিন হবার উপযুক্ত নয়। অন্যরা সবাই নিজেদের প্রমাণ করে ফেলেছে, এমনকি যারা পরবর্তী রাউন্ডে উঠতে পারে নি তারাও।

haruno_sakura__the_last_by_vashperado-d7zwm74

পরবর্তী বড় ৩টা আর্কে সাকুরার বলার মত কোন কার্যকরী ভূমিকাই ছিল না আসলে। কোনোহা ছেড়ে দিয়ে সাসকে ওরোচিমারুর উদ্দেশ্যে চলে যায়, আর তাকে ফিরিয়ে আনবার জন্যে নারুতোর কাছে মিনতি করা, যার ফলে নারুতোও জিরাইয়ার সাথে গ্রামের বাইরে চলে যায় ট্রেনিং করা – এতটুকুই ছিল সাকুরার প্রথম দিকের ভূমিকা।

গল্পের প্রথম টাইম জাম্প হবার আগ পর্যন্ত তাই সাকুরা সত্যিকার অর্থে তার সমসাময়িক অন্যান্য নিঞ্জার তুলনায় অনেক পিছিয়ে ছিল এটা ঠিক। সে নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়েও দেখতে পারে অন্যরা তার চাইতে যোজনে যোজনে এগিয়ে। অন্যরা যেখানে সবাই নিজেদের পরিবারের বিশেষ ক্ষমতার অধিকারী হয়ে এগিয়ে যেতে পেরেছে, কিংবা রক লির মত নিঞ্জারা যেখানে নিজেদের একমাত্র ক্ষমতাকে শাণিত করে নিজেদের প্রমাণ দিয়ে যেতে পেরেছে, সাকুরা সেখানে পিছিয়ে গিয়েছে স্বকীয় কোন কিছু না থাকার কারণে। আমরা নারুতোর উদাহরণ দিয়ে বলতে পারি, ছেলেটার কিছুই ছিল না, সবার ঘৃণার পাত্র থেকে শুরু করে পুরা পৃথিবীর নায়ক হয়ে গিয়েছে, সেখানে কিন্তু একটু লক্ষ্য করলেই দেখবো কথাটা শুরু থেকেই ভুল। নারুতো উজুমাকির বংশধর, তার মধ্যে রয়েছে নাইন টেইলসের চাকরা। তাই কেউ যদি শুরু থেকে অভাগা হয়ে থাকে, সেটা সাকুরা। হ্যাঁ, সাকুরা অন্যদের তুলনায় বেশ সুন্দর আর চমৎকার একটা জীবন পাড়ি দিয়ে এসেছে নিঞ্জা হবার আগে, কিন্তু সুপার পাওয়ারের এই যুগে তার বলার মত কোন কিছুই ছিল না যে অন্যদের মধ্য থেকে আলাদা হয়ে নিজেকে তুলে ধরতে পারে। ছিল শুধু অনেক জ্ঞান, আর প্রবল মনোবল, যার কারণে মাইন্ড কন্ট্রোল ক্ষমতা থাকবার পরেও ইনো সাকুরাকে চুনিন পরীক্ষার অফিসিয়াল ম্যাচে হারাতে পারে নি। গল্পের প্রথম অংশে তাই সাকুরা আসলে ইউজলেস ছিল না, সাকুরার সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য সে তার নিঞ্জা জীবন শুরু করেছে সব জিনিয়াসদের মধ্য থেকে।

টিম ৭-এর অন্য দুজন কোনোহার বাইরে থাকাকালীন সাকুরা একটা কঠিন সিদ্ধান্তে আসে, আর তা হল, অন্যদের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হলে তাকে খুব বিশেষ কিছু করে উঠতে হবে। ৩ লেজেন্ডারি সানিনের অন্যতম সুনাদের কাছে শিক্ষাগ্রহণ শুরু করে। টাইম জাম্পটা শেষ হবার পর যখন আমরা নারুতোকে কোনোহাতে ফেরত আসতে দেখি, তখন সাকুরা কিন্তু সুনাদের সেরা শিষ্য হয়ে উঠেছে। জিরাইয়া নিজে থেকে বলে উঠেছে যে সাকুরা সেই মুহুর্তে সুনাদের যোগ্য শিষ্য হয়ে উঠেছে, এমন একজন যাকে রাগানো ঠিক হবে না।

এখন একটা জিনিস পাঠকদের জিজ্ঞেস করতে চাই। আমরা কি এই মুহুর্তে সাকুরার ক্ষমতাটুকু বুঝতে পারছি? যদি বুঝে উঠতে না পারি, তবে আসুন দেখি সাকুরা এই মুহুর্তে কোন উচ্চতায় আছেঃ
* গল্পের এরকম সময়ে ৩ সানিনের তিনজনই নিজেদের সেরা ছাত্র-ছাত্রীকে পেয়ে গিয়েছে। ওরোচিমারুকে প্রায় অনেক দিক থেকে ছাড়িয়ে গিয়েছে সাসকে, যদিও তার বড় ভূমিকা রাখে সাসকের শারিঙ্গানের ক্ষমতা। জিরাইয়ার শিখানো পথে এসে তাকে পৃথিবীর অবস্থা পরিবর্তন করে ফেলবার আশা দেখাচ্ছে নারুতো, কিন্তু শিখবার আছে অনেক কিছু। আর সুনাদে, যে কিনা নিঞ্জা দুনিয়ার সেই মুহুর্তের সেরা মেডিকাল নিঞ্জাই শুধু নয়, বরং শারীরিক ক্ষমতার দিক থেকে পৃথিবীর সর্বোচ্চ শক্তিশালী নিঞ্জাদের একজন, তাকে কিনা সাকুরা প্রায় ধরে ফেলেছে! সেটাই নয়, অন্য দুই বড় সানিনের কাছে শিক্ষানবিস থাকা নারুতো-সাসকে যখন দর্শকদের কাছে ভয়াবহ ক্ষমতাধর বলে পরিচিতি পায়, সেখানে সুনাদের এই ছাত্রীকে সেই মুহুর্তে ধরে নেওয়া হত যেকোনদিনে সুনাদেক ছাড়িয়ে যাবে!!! হ্যাঁ, সেই অভাগা সাকুরা যে কিনা বংশানুক্রমে কোন বিশেষ ক্ষমতা পায় নি, সেই সাকুরা যে কিনা তার সময়ের জিনিয়াস সব নিঞ্জাদের ছায়া হয়ে থাকার মত থাকলেও তাদের সাথে দাপট দেখিয়ে চলতে পেরেছে, সেই সাকুরা এখন তার শিক্ষক এবং অন্যতম লেজেন্ডারি সানিন সুনাদেকে যেকোন দিন ছাড়িয়ে যেতে পারে! আর সেটাই শুধু নয়, বরং একই সাথে সাকুরা এই সময়টিকে কাজে লাগিয়ে বেশ বড় এক মেডিকাল নিঞ্জা হয়ে উঠেছে। সাকুরা একটা বড় সুযোগ পেয়েছে, এবং সেটার সর্বোচ্চ ব্যবহার করে যা যা অর্জন করার সব অর্জন করে নিয়েছে।

কিন্তু এসব কিছুই তো হয়েছে স্ক্রিনের পিছনে। সাকুরা ইউজলেস না, এটা প্রমাণ করার জন্যে তাকে অনস্ক্রিনে কিছু করে দেখানো লাগবে। মুখে মুখে “অন্যতম সেরা শক্তিশালী নিঞ্জা” হলে চলবে না, বরং দর্শকদের দেখানো দরকার সাকুরা আসলেই বিশেষ কিছু হয়ে উঠেছে। এজন্যে সাকুরা পরবর্তীকে কী করলো চলুন এক নজরে দেখে নেই।

কাজেকাগে হয়ে যাওয়া গারা-কে আকাতসুকি কিডন্যাপ করেছে। তাকে উদ্ধার করতে কোনোহা যে কয়জন নিঞ্জাকে পাঠায়, সাকুরা তার মধ্যে অন্যতম। গারার ভাই কানকুরো ততদিনে সুনাগাকুরের অন্যতম শক্তিশালী ও বড় মাপের এক নিঞ্জা হয়ে উঠে। আকাতসুকির সাসোরির কারণে তার মধ্যে অন্যরকমের এক বিষ ছড়িয়ে পরে, আর সেটা সাড়িয়ে তুলবার মত কোন মেডিকাল নিঞ্জা ছিল না সুনাগাকুরেতে। সাকুরা সেখানে এসে সেখানে বসেই সেই বিষ পরীক্ষা করে নিয়ে কানকুরোকে সারিয়ে তুলে। এক সাকুরা একাই সম্মিলিতভাবে সুনাগাকুরে যা করতে পারে নি তা করে দেখিয়েছে। এই পর্যায়ে এসে আমরা সাকুরার মেডিকাল ক্ষমতা হাতেনাতে প্রমাণিত হতে দেখতে পারি। সাকুরা তার অর্জিত জ্ঞানের একটি অংশের প্রমাণ দিয়ে নিজেকে চিনিয়ে নিতে পেরেছে।

পরবর্তীতে বেশ বড়সড় অনেক ঘটনা ঘটে, এবং এক পর্যায়ে দেখতে পাই চিয়ো-এর সাথে মিলে সে আকাতসুকির অন্যতম বড় এক নাম সাসোরিকে হারিয়ে দেয়। হ্যাঁ, চিয়োর ভূমিকা এখানে বেশি ছিল হয়তো, কিন্তু সাকুরার ভূমিকা কোন দিক থেকেই কম নয়। কম তো নয়ই, বরং অনেক অনেক বেশি। নিজেকে চিয়োর পাপেট বানিয়ে নিলেও সাকুরার নিজের ক্ষমতা তেমন কিছু বলার মত না হলে এই মারামারির ফলাফল তাদের বিপক্ষে চলে যেত একদম শুরুর দিকেই।

সাকুরা, যে কিনা নিজের দূর্ভাগ্যের জন্যে এরই মধ্যে “ইউজলেস” খেতাব পেয়ে গিয়েছে দর্শকদের কাছ থেকে, সে প্রথম পাওয়া সুযোগটি কাজে লাগিয়েই আকাতসুকির সবচাইতে ভীতি জাগানিয়ে একজনকে হারিয়ে দিয়েছে। আরেকজনের সাথে মিলিত হয়ে মারামারি মূখ্য নয়, কারণ নিঞ্জাদের শক্তির এক বড় অংশ হলে অন্যদের সাথে মিলে নিজেদের কাজ উদ্ধার করে নেওয়া। সাকুরা সেই মারামারিতে বড় ভূমিকা রেখে আকাতসুকির একজনকে শেষ করে ফেলে। গল্পের এই পর্যায়ে আমরা সাকুরার একই ব্যাচের আর কয়জন নিঞ্জাকে আকাতসুকির কোন সদস্যকে হারিয়ে দিতে দেখি? একজনকেও না।

এর পরবর্তীতেই সাকুরা কিন্তু নিজেকে প্রমাণ করার আরেকটা সুযোগ নিয়েও কাজে লাগিয়ে দেয়, যেটা অনেকেরই হয়তো মনে নেই। তেনচি ব্রিজে টিম কাকাশি যখন ওরোচিমারুর মুখোমুখি হয়, তখন নারুতো নিজের উপর ক্ষমতা হারিয়ে নাইন টেইল অবস্থায় চলে যায়। একাই ওরোচিমারুকে পিছে হটিয়ে দিতে পারে। এই অবস্থায় নারুতোকে শান্ত করবার জন্যে সবাই যেখানে ভয়ে ভয়ে থাকে, সাকুরা এগিয়ে আসে। নারুতো তার উপর চড়াও হলেও গুরুতর জখম পায়, কিন্তু নারুতো স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরত আসলে তাকেও আমার সুস্থ করে তুলতে সাহায্য করে নিজের মেডিকাল ক্ষমতার বলে। বড় বড় নিঞ্জারা যেখানে এগিয়ে যেতে ভয় করে, সাকুরা সেখানে এগিয়ে যায়, এবং আঘাতপ্রাপ্ত হয়েও অন্যদের সারিয়ে তুলে। অকার্যকর? না, এটা অকার্যকারিতার সংজ্ঞা নয়।

এর পরবর্তীতে বড় যেই আর্কে আমরা সাকুরাকে দেখি, সেটা নারুতোর অন্যতম সেরা আর্কঃ পেইন আর্ক। আসলে এই আর্কটিতে সাকুরার ভূমিকা ছিল মেডিকাল নিঞ্জা হিসাবে সবার সাহায্য করা। কোনোহা ধ্বংসের পরে আসলে নারুতো বাদে চোখে পড়ার মত একমাত্র যে ছিল সে হল নারুতো ভালবেসে নিজেকে উতসর্গ করে দেবার জন্যে এগিয়ে আসা হিনাতা। সেই জন্যে এই আর্কে সাকুরার আসলে অন্য সব নিঞ্জার মত ভূমিকা থাকার কথা না তেমন। কিন্তু সবাই যেখানে বসে বসে হাহুতাশ করছে কিংবা নারুতোর দিকে চেয়ে আছে, সেখানে সাকুরা নিজের ক্ষমতা দিয়ে সব মেডিকাল নিঞ্জাকে যতজনের সম্ভব চিকিৎসা করার আহ্বান জানায় এবং সুনাদের পাশে থাকে।

নিজের একমাত্র ভালবাসার মানুষটির উপর যখন মৃত্যুর পরওয়ানা জাড়ি হয়, তখন নিজের সব রকমের কষ্টকে ধামাচাপা দিয়ে সাসকেকে নিজেই মারতে উদ্যোগী হয়। সাকুরা শুধু শারীরিকভাবেই শক্তিশালী নয়, মানসিক দিক থেকেও অনেকের চাইতে অনেক বেশি পরিমাণে এগিয়ে ছিল তার ভাল প্রমাণ এটি।

সর্বশেষে থাকছে সম্ভবত সাকুরার সবচাইতে বড় অবদানের কথা – ৪র্থ নিঞ্জা ওয়ার্ল্ড ওয়ারের ঘটনা। গল্পের এই পর্যায়ে এসে আমাদের গল্পের দুই নায়ক নারুতো ও সাসকে, ও খলনায়ক তোবি এবং পরে মাদারাসহ সব বড় বড় নামগুলি একের পর এক পাওয়ারাপ পেয়ে গিয়েছে। যেই টিমের সদস্যদের সাথে নিজেকে তুলনা করতে যাবে, সেই দলের সবাই গল্পের কারণে লাফিয়ে লাফিয়ে একের পর এক ক্ষমতা পেয়ে গিয়েছে। যুদ্ধ হবার কারণে খলনায়কেরাও নিজেদের অকল্পনীয় সব ক্ষমতা দেখানো শুরু করেছে। এমতাবস্থায় সাকুরার কী করণীয়? গল্পকার যখন তাকে এক রকমের পার্শচরিত্রের কাতারে ফেলেই দিয়েছে, সেখানে বসেই নিজের ক্ষমতা দেখিয়ে যেতে থাকে সে। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বড় চরিত্র আগাতপ্রাপ্ত হলে তার চিকিৎসায় এগিয়ে আসাটা অনেক বেশি হয়েছে বলে হয়তো এটি দর্শকদের কাছে একটি স্বাভাবিক দৃশ্যই হয়ে উঠেছে, কিন্তু ব্যাপারটির ভূমিকা কত বড় সেটা এভাবে ভেবে দেখুন যে, এই যুদ্ধে এদের সবাই বারবার বিভিন্ন শত্রুর মুখোমুখি হয়েছে। সাকুরার চিকিৎসা না পেলে গল্পের এত বড় বড় চরিত্রদের অনেকেই শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারতো না।

এদিকে সাদা জেতসুর অতর্কিত হামলার কারণে যেখানে সবাই দিকবিদিকশুন্য হয়ে পড়েছিল, তখন সাকুরা সাদা জেতসুর ব্যাপারটি সবার আগে ধরতে পারে। হ্যাঁ, গল্পের নায়ক হবার কারনে নারুতো আরেকটি পাওয়ারাপ পায়, এবং এখন সে সবধরনের এরকম লুকায়িত জেতসুদের খুঁজে বের করতে পারে। পাওয়ারাপ না পাওয়া সাকুরা নিজ ক্ষমতায় তাদের ব্যাপারটি জেনে নিতে পারে ও সবাইকে সে ব্যাপারে সতর্ক করতে পারে। “ইউজলেস” সাকুরা অন্য সব নিঞ্জাদেরকে ইউজলেস হওয়া হতে আরেকবার বাঁচিয়ে দেয়।

শেষ পর্যন্ত যখন বড় যুদ্ধে মেডিকাল নিঞ্জা হবার পরেও অংশগ্রহণ করে, তখন দর্শকদের মনে করা উচিৎ সুনাদের সেই নিয়মের কথা। যেখানে শেষ নিয়মটিতে বলা হয়, যদি মেডিকাল নিঞ্জা এত ক্ষমতাধর হয় যে সরাসরি মারামারি করতে পারে, তাহলে অন্য সব নিয়ম ছুড়ে ফেলে দিয়ে নিজেই ফ্রন্টলাইনে এসে যুদ্ধে অংশ নেয়। সাকুরা সেটিই করে, এবং নারুতো ও সাসকের সাথে মিলে ওবিতোর বিপক্ষে লড়াই করে। নারুতোর কাছ থেকে যখন নাইন টেইলসকে কেড়ে নেওয়া হয়, তখন নারুতো যেন সাথেসাথে মারা না যায় তার জন্যে জানপ্রাণ দিয়ে চেষ্টা করে। খেয়াল রাখতে হবে, নারুতোকে এই পর্যায়ে বাঁচিয়ে তুলবার জন্যে সাকুরা ছাড়া আর কেউ যোগ্য মেডিকাল নিঞ্জা ছিলও না। নারুতোর হার্টকে পাম্প করতে থাকে, যেন নারুতো বেঁচে ফিরবার জন্যে আরেকটু সময় পায়। “ইউজলেস” সাকুরা একাই পুরা নিঞ্জার দুনিয়ার হার্ট পাম্প করে বাঁচিয়ে তুলে।

কাগুইয়ার সাথে মারামারিতে যেখানে নারুতো আর সাসকেই একমাত্র তাকে হারানর ক্ষমতা রাখে, সেখানে সাকুরার সাহসিকতা সাসকে-কে উদ্ধার করবার জন্যে বড় ভূমিকা রাখে। হ্যাঁ, আক্ষরিক অর্থে এক দেবীকে হারাবার জন্যে যেই দুজনের একত্রে উপস্থিত থাকা দরকার, সেখানে একজন প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছিল, সাকুরার সাহসী ভূমিকার অভাবে হয়তো সেক্ষেত্রে গল্পের ফলাফল অন্যরকম হতে পারতো।

সত্যিকার অর্থে বলার মত ব্যাকগ্রাউন্ড না থাকার পরেও একের পর এক ক্ষমতা আর জিনিয়াস নামধারী সব নিঞ্জাদের পাশেই শুধু ছিল না সাকুরা, তাদের অনেককে ছাড়িয়ে গিয়ে যুদ্ধে নিঞ্জাদের জোটকে জিতাতে সাহায্য করেছে সাকুরা। সাকুরা যদি সত্যিকার অর্থেই অকার্যকর হয়ে থাকতো, তাহলে নারুতোর গল্পটি নারুতো কম বরং বার্সার্কের মত হয়ে যেত। একের পর এক ট্র্যাজেডির শিকার হওয়া থেকে একাই রক্ষা করেছে গল্পের অন্যান্য মূল চরিত্রদের।

তাহলে কেন দর্শকদের অধিকাংশই সাকুরাকে এখনও ইউজলেস বলে আসছে? এখানে আসলে দর্শকদের সাইকোলজি একটা বড় ভূমিকা রেখেছে। আমরা যখনই সাকুরাকে দেখি, তখনই তার তুলনা করি নারুতো আর সাসকের সাথে। কেনই বা করবো না আমরা, তারা তিনজন যে একই টিমের সদস্য। সেই টিমের লিডার আবার কাকাশি নিজেই। পরবর্তীতে তাদের এই টিমে যোগ দেয় ইয়ামাতো আর সাই, যারা স্পেশাল আনবু ফোর্সের সদস্য বলে আগে থেকেই তাদের ভারী ক্ষমতার অধিকারি বলে জানি। আসলে এত সব জিনিয়াস আর অপরিসীম ক্ষমতার অধিকারীদের দলে এমন একজনকে আমরা দেখতে পাই যার শুরু থেকে বলার মত কিছু ছিল না কখনই। এমনকি নারুতোর মাঙ্গা বা আনিমের ইনফো ঘাটলে আমরা দেখতে পাই সাকুরা একজন মেইন চরিত্র, অথচ গল্পে তাকে আমরা নারুতো আর সাসকের তুলনায় খুব কম সময়েই দেখেছি। হ্যাঁ, সাকুরার চরিত্রের সবচাইতে বড় দিক হল সে সাসকে-কে অনেক বেশি ভালবাসে। বলার মত কিছু নেই এমন এক চরিত্রের যখন মূল ফোকাসটা পড়ে তার ভালবাসার জীবনের উপর, যেখানে তার আশেপাশের সবার ফোকাস পড়ে তাদের নিঞ্জা ক্ষমতার উপর, সেখানে দর্শকদের মনে এই ধারণাটা হওয়া অসম্ভব নয় যে সাকুরা ইউজলেস। ব্যাপার হল, সাকুরা কখনই ইউজলেস ছিল না। বরং কঠিন পরিবেশে শুরুতে খাপ খেয়ে নেওয়াতে কষ্ট পেতে হলেও এরপর সে ঠিকভাবেই সেই পরিবেশে মানিয়ে নিয়েছে। কিন্তু দর্শক মনের সাইকোলজিতে আরেকটা জিনিস খাটে – প্রথম ইম্প্রেশন। সেটা শুধু দর্শকদের জন্যেই নয়, বরং আমাদের দৈনন্দিন জীবনে সবক্ষেত্রেই দেখতে পারি। প্রথম ইম্প্রেশনের উপরেই আমাদের আরেকটি মানুষের ব্যাপারে জন্ম নেওয়া ধারণাটি গড়ে উঠতে থাকে। হয়তো তার চরিত্রের অন্যান্য দিক দেখতে পেলে সেই ধারণাতে বিভিন্ন প্রলাপ পড়ে, কিন্তু ধারণার মূল ভিত্তি থাকে সেই প্রথম ইম্প্রেশনেই। সাকুরার ক্ষেত্রেও সেরকমই হয়েছে, দর্শকদের প্রথম ইম্প্রেশনটিই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সাসকে উচিহা কেন “নারুতো” গল্পের সবচাইতে পূর্ণতাপ্রাপ্ত চরিত্র — তাহসিন ফারুক অনিন্দ্য

Uchiha Sasuke Evolution

লেখাটির টপিক দেখে হয়তো অনেকে শুরুতেই ভ্রু কুঁচকে উঠবেন। দাঁড়ান একটু, আমি বলছি না সাসকে এই আনিমেটির সবচাইতে সেরা চরিত্র। নারুতোর গল্পের চরিত্রদের মধ্যে আমার সবচাইতে প্রিয় অবশ্যই ইতাচি। কিন্তু সেই প্রসঙ্গে যাচ্ছি না এখানে, আজকে যে বিষয়ে আলোচনা করতে চাই তা হল, উচিহা সাসকে এই গল্পটির সবচাইতে ভালভাবে গড়ে তুলা চরিত্র। লেখাটি কিছুটা বড় হতে পারে, তাই সময় নিয়ে পড়বার অনুরোধ করছি।

একটা ১২-২৪ পর্বের সিরিজে চরিত্রের গঠন জিনিসটা যেভাবে হয়, স্বাভাবিকভাবেই একটা শত পর্বের সিরিজে তার চাইতে বেশ ভিন্নভাবে হয়ে থাকবে। এ জন্যে ৬০০+ পর্বের নারুতো সিরিজের একটা পার্শ্ব চরিত্র যে ধরণের ক্রমবিকাশের মধ্য দিয়ে যায়, তা অনেক ১২ বা ২৪ পর্বের সিরিজের প্রধাণ চরিত্রের ক্ষেত্রেও হয়ে থাকে না।

এবার আসি চরিত্রের গড়ে উঠার ব্যাপারটিতে, অর্থাৎ ক্যারেক্টার ডেভলপমেন্টের বিষয়টি নিয়ে কথা বলা যাক। ডেভলপমেন্ট হিসাব করলে লিটারেচার কাজগুলিতে আমরা দুই ধরণের চরিত্রায়ন দেখে থাকতে পারিঃ Static Characterization ও Dynamic Characterization. স্ট্যাটিক চরিত্রায়নের ক্ষেত্রে কোন চরিত্র ঘটনাক্রমে গল্প এগিয়ে যেতে থাকলেও বড় ধরণের কোন পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায় না। তার লক্ষ্য, চিন্তা-ভাবনা, ধারণা ইত্যাদি মোটামুটি একই রকমের থেকে যায়। অন্যদিকে ডিনামিক চরিত্রায়ণ বলতে সেই ব্যাপারটি বুঝিয়ে থাকে, যেখানে একটা চরিত্র গল্পের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এগিয়ে যেতে থাকার সাথে সাথে বড় ধরণের পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে যায়। সেই পরিবর্তন থাকে তার লক্ষ্যে, চিন্তাভাবনায়, আচার-আচরণে, ও দৃষ্টিভঙ্গিতে। বলার অপেক্ষা রাখে না, এই দুই আলাদা ধরণের চরিত্র অর্থ কিন্তু এই নয় যে একটি বেশি ভালো ও অন্যটি খারাপ। ক্ষেত্র বিশেষে তাদের উপযুক্ত ব্যবহার দুই ধরনের চরিত্রকেই বিশেষ কিছু করে তুলতে পারে।

আমাদের আলোচ্য গল্পের প্রধাণ চরিত্র নারুতো উজুমাকি স্ট্যাটিক চরিত্রায়ণের সবচাইতে বড় উদাহরণ। গল্পের একদম শুরু থেকে তার লক্ষ্য ছিল হোকাগে হওয়া ও সবার কাছে এক সম্মানজনক ব্যক্তিত্বে পরিণত হওয়া। হাটতে-চলতে সব ক্ষেত্রেই নারুতোর এই লক্ষ্যের কথা আমরা শুরু থেকে জেনে এসেছি, এবং কোন ধরণের বাঁধা তাকে দমাতে পারে নি এই উদ্দেশ্য অর্জন থেকে। তার এই অনড় অবস্থান মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি ঘৃণা থেকে ঘুড়িয়ে নিয়ে সম্মানের পথে নিয়ে আসে।

ডিনামিক চরিত্রায়নের আদর্শ উদাহরণ সাসকে। তার ছোটবেলা থেকেই লক্ষ্য ছিল তার ভাইকে হত্যা করে প্রতিশোধ নিবে আর নিজের বংশের পুনরুত্থান ঘটাবে। ঘটনাপ্রবাহে আমরা দেখতে পারি সাসকে তার সেই লক্ষ্য মাঝপথেই অর্জন করতে পেরেছে, কিন্তু এরপর সত্যি কথাটা তার সামনে চলে আসলে তার চরিত্রে একটা ভাঙ্গন দেখতে পারি। শুরু হয়ে যায় ভাঙ্গা-গড়ার খেলা, যেখানে কোনোহাকে ধ্বংশ করে দেওয়া কিংবা কোনোহাকে বাঁচিয়ে ফেলা – এই দোটানায় তার চিন্তাভাবনা ঝড়ের মধ্য দিয়ে যেতে থাকে। শেষ পর্যন্ত নারুতোর সাথে শেষবারের মত মারামারির মধ্য দিয়ে তার চরিত্র পূর্ণায়তা পেয়ে উঠে।

দুটি চরিত্রই আনিমে জগতের অন্যতম জনপ্রিয়তা পাওয়া চরিত্র, সন্দেহ নেই। কিন্তু এবার যদি আমরা এই দুজনের ক্যারেক্টার ডেভলপমেন্টের দিকে তাকিয়ে থাকি, তাহলে কোন চরিত্রটিকে আমরা ঠিকভাবে গড়ে উঠতে দেখি? নিঃসন্দেহে সেটা সাসকে। নারুতো চরিত্রটির প্রতি বিদ্বেষ নেই আমার, একটি চিরাচরিত শৌনেন গল্পের প্রধান চরিত্র হবার মত সবকিছুই তাকে দিয়েছে গল্পের লেখক – অনড় চিন্তাভাবনা, হাসিখুশিভাবে সবাইকে আপন করে নেওয়া, বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেওয়া, এ সব কিছুই তাকে একজন হিরো করে তুলে। কিন্তু, চরিত্রের বিকাশ যদি হিসাব করি আমরা, নারুতো উজুমাকি কি আদৌ তেমন কোন বিকাশ দেখাতে পেরেছে? নারুতোর চরিত্রে যেটি হয়ে উঠে নি, সাসকের চরিত্রে তার সবকিছু হয়ে উঠেছে আসলে।

ঘটনাক্রমে আমরা দেখে উঠতে পারি সাসকে ছোটকালে খুবই হাসিখুশি এক চরিত্র ছিল, যে বাবার দৃষ্টি আকর্ষণ পাবার জন্যে সবরকমের চেষ্টা করতো। একদিন তার বড় ভাই তার বাবা-মাসহ পুরা উচিহা বংশকে হত্যা করে ফেলে। এই ঘটনা সাসকে-কে করে তুলে হিংস্র ও প্রতিশোধপরায়ণ, এবং এরকম একটা অবস্থান থেকেই গল্পে প্রথম তাকে দেখতে পারি আমরা। এরকম সময়ে তার বয়স ছিল ১২-১৩ বছর, নিঞ্জাদের দুনিয়া হয়ে থাকলেও ম্যাচিউরিটি আসার মত বয়স তখনও হয়ে উঠে নি। নিজের প্রতিশোধ নেবার লক্ষ্যে নিজের গ্রাম ছেড়ে দিতেও রাজী হয়ে উঠেছিল। এরপর ১৬ বছর বয়সের দিকে এসে বড় ভাইকে হত্যা করে যখনই নিজের জীবনের লক্ষ্য পূরণের পথে এক ধাপ এগিয়ে গিয়েছে বলে মনে করেছিল, তখনই তোবির কাছ থেকে আসল ঘটনা জানতে পারে। জানতে পারে কীভাবে তার বড় ভাই বাধ্য হয়েছিল নিজের বংশকে নির্মূল করে দিতে। এমন সময়ে এসেই আমরা সাসকের চরিত্রে সবচাইতে বড় ধাক্কাটা দেখতে পারি। এই মুহুর্তটি ছিল তার চরিত্রের বিকাশের একটি বড় উপলক্ষ্য। অবশেষে নিজে থেকে একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে উঠে সে, কোনোহাকে ধ্বংস করবে সে, কোনোহার উপর বদলা নিবে সে।

ইতোমধ্যে নিঞ্জাদের ৪র্থ বিশ্বযুদ্ধের সূচনা হয়, আর এমন এক কঠিন মুহুর্তে তোবি, কাবুতো আর জেতসু সবাই তাকে নিজের মত করে ব্যবহার করতে চেষ্টা করে, সে বিষয়টিও বুঝে উঠতে পারে। যুদ্ধের এক পর্যায়ে বড় ভাইকে রিএনিমেশন অবস্থায় দেখতে পারে। বড় ভাইয়ের কাছ থেকে সত্য ঘটনাটির অন্য আরেক সংস্করণ শুনতে পারে। সাসকের চরিত্রের গঠনের আরেকটি বড় মুহুর্তের সাক্ষী হতে পারে দর্শক এই জায়গাটিতে, যখন সাসকে বুঝে উঠতে পারে শুধুমাত্র প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে আর সিদ্ধান্ত নেওয়াটা বোকামি হবে। এরপর পূর্বের হোকাগেদের কাছ থেকে নিঞ্জার ইতিহাসের সবকিছু জেনে নেয় সে। বুঝে উঠতে পারে পুরা নিঞ্জা সিস্টেমটাতেই সমস্যা হয়েছে।

শুধু প্রতিশোধ আর প্রতিশোধ যার লক্ষ্য ছিল, সেই চরিত্রকে আমরা এরপর কী সিদ্ধান্তে উপনীত হতে দেখি? সে কি এরপর পুরা নিঞ্জা দুনিয়াকে নির্মূল করতে উঠে যায়? না, বরং এই প্রথম সে বুঝে উঠতে পারে নিজের পরিণতি যেন অন্য কাউকে মুখোমুখি হতে না হয়, এজন্যে পুরা নিঞ্জা সিস্টেমটাকে নতুন করে গড়ে তুলতে হবে। হোকাগে হয়ে এই লক্ষ্য পূরণের জন্যে এগিয়ে যেতে দেখি আমরা, যদিও গল্পের নায়ক না হবার কারণে সেটা তার ভাগ্যে জুটে নি। কিন্তু হোকাগে হবার লক্ষ্য নারুতোর কাছে রেখে দিয়ে এলেও, এরপর সাসকে পুরা নিঞ্জা দুনিয়া ঘুড়ে দেখে সব সমস্যা ঠিকঠাক করার উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে পরে।

একটি প্রতিশোধপরায়ণ ছোট্ট বাচ্চা বিভিন্ন ধরণের মানসিক ধাক্কা, অশান্তি, কষ্ট, ক্ষোভ সামলে উঠে সুন্দর একটি বিশ্ব গড়ে তুলার উদ্দেশ্যে শান্তির পথে অগ্রসর হয় — লক্ষ্য, চারিত্রিক বিকাশ ও ব্যক্তিত্বের পুর্ণায়ন হয়ে উঠে সাসকে উচিহা চরিত্রটির।

আমরা গল্পের ক্রমে অন্যান্য অনেক চরিত্রেরও কাছাকাছি বিকাশ দেখতে পাই। বাবার প্রতি অন্যায়ে কঠিন হয়ে যাওয়া, আপন দুই বন্ধুকে হারানোর পরে এক অন্ধকারাচ্ছন্ন জীবনে হারিয়ে যাওয়া এবং নারুতো-সাসকে-সাকুরার শিক্ষক হবার মাধ্যমে আবার আলোর পথে ফেরত আসা – কাকাশিরও প্রায় একই ধরণের ডিনামিক পরিবর্তন আসে। কিন্তু আমরা এই পরিবর্তনের অধিকাংশই জানতে পারি গল্পের শেষের দিকে এসে। ওবিতো চরিত্রটিও বেশ ট্র্যাজিক এক চরিত্র। তবে এত বিশাল মাপের দুনিয়া পাল্টে দেওয়া যুদ্ধ শুরুর পর, অগণিত মানুষ হত্যার পর শুধু নিজের ভুল বুঝতে পেরে সেটা কাটিয়ে তুলার চেষ্টা – তার চরিত্রের বিকাশটি অনেকের কাছেই তাই আপত্তিকর। অন্যদিকে ইতাচির মনের মধ্যে ঝড়ঝঞ্ঝা এবং অকল্পনীয় ত্যাগের মাধ্যমে ট্র্যাজিক হিরো হয়ে উঠা – সবকিছু মিলিয়ে তাকে গল্পটির সবচাইতে পছন্দের চরিত্র করে তুলতে পেরেছে। কিন্তু জনপ্রিয়তা এক জিনিস, আর ব্যক্তিত্বের গঠন আরেক জিনিস।

সবসময়ে শান্তির পথে থাকতে চাওয়া ইতাচিকে নিজের পুরা বংশকে হত্যা করতে বাধ্য হতে হয়। এক কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে সন্দেহ নাই, কিন্তু এত বড় এক ঘটনা ঘটিয়ে ফেলবার পরে সবার চোখে অপরাধী হয়ে থাকার পরেও কোনোহাকে ও নিজের ছোট ভাইকে চোখে চোখে রাখতে আকাতসুকিতে যোগদান করে সে। ভাইয়ের হাতে নিজের মৃত্যুটিকে নিজের পাপের শাস্তি ও কষ্ট থেকে মুক্তির পথ হিসাবে বেঁছে নেয়। আমরা গল্পের শুরু থেকেই ইতাচিকে গল্পের সেরা ব্যক্তিত্বের অধিকারী হিসাবে দেখে এসেছি, তার অংশ শেষ হবার পরেও একইভাবে তাকে গল্পের অন্যতম সেরা ব্যক্তিত্বের অধিকারী হিসাবেই জানতে পেরেছি। ফলাফল স্বরূপ, তার ক্যারেক্টার ডেভলপমেন্ট জিনিসটি বাদ পড়ে গিয়েছে।

অতএব, ডেভলপমেন্ট ব্যাপারটি যদি লক্ষ্য করি শুধু, তাহলে পুরা গল্পে সাসকের মত চারিত্রিক বিকাশ আর দ্বিতীয়টি কারও নেই। সাসকে চরিত্রটি ভুলত্রুটির ঊর্ধ্বে কখনই ছিল না, কিন্তু নিজের ত্রুটি মেনে নিয়ে সেটিকে ঠিক করে তুলবার প্রচেষ্টা দেখা গিয়েছে, এবং প্রায় ৬৫০ পর্বের এই যাত্রায় তাতে সফল হওয়াটা তার চরিত্রকে পরিপূরণ করতে পেরেছে। Well-developed চরিত্রের কথা যদি উঠে থাকে, তাহলে এই গল্পে সাসকের চরিত্রের গঠনের ধারেকাছেও কেউ নেই।

Diamond no Ace: বেসবল সমাচার! — Mithila Mehjabin

জনরা যদি হয় স্পোর্টস, আর দর্শক যদি হয় আমার মত খুতখুতে, তাহলে স্পোর্টস না বুঝে এনিমের আনন্দ উপভোগ করাটা তাকে দিয়ে হয় কম! :’)
আহামরি খুব বেশী স্পোর্টস এনিমে দেখা হয়নি, কিন্তু যে কয়টা দেখেছি তন্মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় হলো দাইয়া নো এস তথা ডায়ামন্ড নো এস।  এনিমেটা দেখার সময় রীতিমত খাতা-কলম নিয়ে বসে গেছিলাম, বেসবলের সকল রহস্য বুঝে ছাড়ব!  বিপুল পড়াশুনা (!) করে মোটামুটি একটা ধারণা আনতে পেরেছিলাম বেসবল সম্বন্ধে, আর বাকিটা দাইয়া দেখেই বুঝেছি! :’) তাই, যারা খেলাটা না বোঝার কারণে দাইয়া বা বেসবল সংক্রান্ত অন্য কোনো এনিমে দেখতে পারছেন বা চাইছেন না, তাদের জন্য লিপিবদ্ধ করে ফেললাম আমার সকল বেসবল জ্ঞান! আশা করি উপকৃত হবেন!
ইয়াকিউ তথা বেসবল…পশ্চিমা বিশ্বে বহুল প্রচলিত ও জনপ্রিয় একটি খেলা, ঠিক আমাদের দেশে ক্রিকেট যেমন। ক্রিকেটের সাথে বেসবলের মিলও বেশ, দুটোই ব্যাটে বলে রান তোলার দৌড়!
দুদিক থেকে দুটি তীর্যক রেখা উঠে যাওয়া একটি বিন্দুকে কেন্দ্র করে একটি বৃত্ত আঁকলে, তীর্যক রেখা দুটির অন্তভূক্ত অর্ধবৃত্ত, যেখানে বিন্দু থেকে অর্ধবৃত্ত পর্যন্ত একটা হীরকখন্ড বা ডায়ামন্ডের মত মনে হয়…এই ডায়ামন্ডই বেসবল খেলার মাঠ। আবার বিন্দু থেকে অর্ধবৃত্তের ভেতর দিকে একটি তাস পাতার ডায়মন্ড কল্পনা করলে, এই ডায়ামন্ডের চারটি কোণা হচ্ছে চারটি বেস। প্রথম বিন্দু, যেখান থেকে দুটি তীর্যক রেখা উঠে গেছে, সেটি হচ্ছে হোম বেস, এই হোম বেস থেকে ডানের বেসটি ফার্স্ট, বিপরীত বেসটি সেকেন্ড, এবং বামের বেসটি থার্ড বেস। বড় ডাযামন্ডের ভেতর ছোট ডায়ামন্ড, বেসবল খেলায় দুটোকেই ডায়ামন্ড বলা হয়।
ছোট ডায়ামন্ডটির কেন্দ্রে একটু উচুঁ জায়গাটা হচ্ছে পিচার’স মাউন্ড, যেখান থেকে বল ছোড়ে পিচার। পিচারের মাউন্ড বরাবর প্রথম বিন্দু, তথা ফার্স্ট বেস থেকে উঠে যাওয়া তীর্যক রেখা দুটি ফাউল লাইন। হোমবেস থেকে ছোট ডায়ামন্ডের বাইরের খানিকটা অংশ জুড়ে ইনফিল্ড, ইনফিল্ড থেকে বড় ডায়ামন্ডের আউটার ফেন্স পর্যন্ত জায়গাটুকু হচ্ছে আউটফিল্ড। কল্পনা করতে কষ্ট হলে নেট ঘেটে বেসবল ফিল্ডের একটা ছবি দেখে নিলে বুঝতে পারা খুবই সহজ।
একেকটি দলে নয়জন করে দুটি টিমের মধ্যে খেলা হয়। ক্রিকেটের মতই, এট এ টাইম একদল ব্যাটিং এবং বিপক্ষ দল বলিং এবং ফিল্ডিং করে। এভাবে পালা করে একটি ব্যাটিং ও একটি ফিল্ডিং নিয়ে হয় এক ইনিং; বেসবলে নয়টি ইনিং নিয়ে খেলা হয়। টাই হলে ইনিং বাড়তে পারে।
ব্যাটিং দলের লক্ষ্য থাকে ফিল্ডিং দলের পিচারের ছোড়া বল পিটানো, এবং পিটিয়ে যদ্দুর সম্ভব দূরে ফেলানো। ব্যাটার বল পিটিয়েই ব্যাট ফেলে দৌড় দেবে প্রথম বেস এ। এভাবে একজন ব্যাটার হোম বেস থেকে ফার্স্ট, সেকেন্ড, থার্ড এবং ব্যাক হোম, অর্থাৎ পুরো চারটা টা বেস ঘুরে হোম বেস এ ফেরত আসলে তখন ব্যাটিং দলের জন্য একটি রান কাউন্ট হয়।
বলিং বা ফিল্ডিং দলের লক্ষ থাকে ব্যাটারকে যেকোনোভাবে আউট করা এবং রান করা থেকে বিরত রাখা।
ব্যাটিংদলের তিনজন খেলোয়াড় আউট হলে ব্যাটিং টিমের ব্যাটিংয়ের পালা শেষ, তারপর ব্যাটিং টিম ফিল্ডিং এবং ফিল্ডিং টিম ব্যাটিংয়ে নামবে। এভাবে করে নয় ইনিং শেষে যে দলের রান বেশী হবে, সে-ই জয়ী!
কত সহজ, তাই-না?! :’) AS IF!
লক্ষণীয়:
* বেসবল খেলায় “বল” শব্দটা একটা বিশেষ অর্থ বহন করে, তাই এখানে “বল” এর বদলে “পিচ” ব্যাবহার করে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
** কোনো খেলাই শতভাগ নিয়ম অনুসরণ করে না। রুল ফ্লেক্সিবেল্, আবার নিয়ম তৈরী হয় এবং ছাঁটাই হয়। তাই খেলা দেখার সময় আরও অনেক ব্যাপারেই চোখে পড়বে। এখানে অনুক্ত কিছু চোখে পড়লে নেটের সাহায্য নিতে পারেন; অথবা প্রশ্ন থাকল উত্তর বের করে দেয়ার যথাসাধ্য চেষ্টা করব।
***অপরিচিত লাগতে পারে, এমন সকল শব্দ “ফ্যাক্টস” অংশে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
****দাইয়া নো এস এর একটা প্রসঙ্গ যেহেতু, দাইয়ার রেফারেন্স ব্যাবহার করা হয়েছে টুকটাক জায়গায়,; সেগুলোকে কোনোভাবেই স্পয়লার বলা যায় না।
প্রত্যেক হাফ-ইনিংয়ের শুরুতে ফিল্ডিং টিম এর নয়জন প্লেয়ার নিজেদের পজিশন অনুযায়ী ফিল্ডে দাড়িয়ে যাবে। পিচার, যার কাজ বল ছোড়া বা পিচ করা, থাকবে মাউন্ডের ওপর। ক্যাচার থাকবে হোম বেসে, যেখানে ব্যাটার দাড়াবে, তার ঠিক পেছনে, বসা অবস্থায়, পিচারের দিকে মুখ করে। পিচার ও ক্যাচারের মধ্যে সাংকেতিক চিহ্ণের আদান-প্রদানের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়ে থাকে কি ধরণের বল, কোথায় ছোড়া হবে। হোমবেসের দায়িত্বে থাকা বেসম্যানও ক্যাচার। তিনটা বেস এ চারজন ফিল্ডার অবস্থান নেয়, যাদেরকে ইনফিল্ডারও বলা হয়। প্রথম বেসপ্লেট থেকে কয়েক পা বামদিকে অবস্থানকারী হচ্ছে ফার্স্ট বেসম্যান, সেকেন্ড বেসের ডানদিকে অবস্থানকারী সেকেন্ড বেসম্যান, সেকেন্ড বেসের বামদিকে অবস্থানকারী শর্টস্টপ, এবং থার্ডবেসের কয়েক পা ডান দিকে হচ্ছে থার্ড বেসম্যান।
আউটার ফিল্ডের বাম দিকে লেফট ফিল্ডার, মাঝখানে সেন্টার ফিল্ডার, ডানে রাইট ফিল্ডার।
ক্যাচারের পেছনে একজন নিরপেক্ষ আম্পায়ার থাকে, প্রতিটা বেসেও একজন করে আম্পায়ার থাকতে পারে। গেম এর গুরুত্বের ওপর নির্ভর করে একটি বেসবল ম্যাচে ১-৬ জন আম্পায়ার থাকতে পারে।
খেলার শুরুতে একজন ব্যাটার হোম বেস এ এসে দাড়াবে ব্যাট হাতে, হোমপ্লেটের দিকে পিচারের ছোড়া বল হিট করার উদ্দেশ্যে। পিচারের ছোড়া সেসকল পিচ যা ব্যাটার চেষ্টা করেও হিট করতে পারে না অথবা ইচ্ছে করেই করে না, গিয়ে ক্যাচারের মিট বা গ্লাভসে ধরা পড়ে, এবং ক্যাচার বল ফেরত পাঠায় পিচার কে। একজন ব্যাটার, যে বল পিটিয়ে খেলার মাঠে গড়াতে পারে, তাকে অবশ্যই বল গড়ানো মাত্র ব্যাট ফেলে প্রথম বেসের উদ্দেশ্যে দৌড়াতে হবে, সে বল দূরেই গড়াক, আর কাছেই গড়াক।
ব্যাটার বল গড়িয়ে হাত থেকে ব্যাট ফেলামাত্রই ব্যাটার হিসেবে তার দায়িত্ব শেষ, তখন সে একজন রানার তথা ব্যাটার- রানার। আউট না হয়ে যে ব্যাটার প্রথম বেস এ পৌছে যেতে পারে, সে হচ্ছে “সেফ”, মানে তাকে প্রথম বেস এ থাকা অবস্থায় আর আউট করা যাবে না। একজন ব্যাটার-রানার চাইলে প্রথম বেস এ থাকতে পারে, অথবা দ্বিতীয় বেস, কিংবা এর পরের বেসেও পৌছানোর সিন্ধান্ত নিতে পারে, যত বেস পর্যন্ত সে বিশ্বাস করে যে আউট না হয়ে পৌছাতে পারবে।
একজন ব্যাটার যদি পিচারের ছোড়া পিচ মাঠে গড়িয়ে নিরাপদে প্রথম বেস এ পৌছাতে পারে, সেটাকে বলা হয় “সিঙ্গেল”। যদি সে বল গড়িয়ে প্রথম প্রচেষ্টায়ই দ্বিতীয় বেস পর্যন্ত পৌছাতে পারে, তাহলে সেটা “ডাবল”, তৃতীয় বেস পর্যন্ত পৌছে গেলে সেটা “ট্রিপল”। ব্যাটার যদি পিচারের ছোড়া বল পিটিয়ে পুরো আউটফিল্টের ওপর দিয়ে আউটার ফেন্স পর্যন্ত উড়াতে পারে, তাহলে সেটাকে বলে “হোম রান”। এক্ষেত্রে ব্যাটার সহ বেস এ থাকা প্রতিটা রানার বিনা বাঁধায় সকল বেস ঘুরে হোম বেস এ পৌছানোর অধিকার পায়। ব্যাটার সহ তিন রানারের রান মিলে হয় চারটি রান- যেটা যেকোনো সিচুয়েশনে ব্যাটিং দলের জন্য সবচেয়ে প্রত্যাশিত ফলাফল।
বেস এ থাকা যেকোনো রানার ফেয়ার টেরিটোরিতে ব্যাটারের পিটানো পিচ মাটিতে গড়ানোর আগমুহুর্ত থেকে, পিচ মাটি স্পর্শ করা মাত্র বা পিচ গড়ানোর পরমুহুর্ত থেকে, তথা ব্যাটার পিচের গায়ে আঘাত করা মাত্রই যেকোনো অবস্থা থেকেই দৌড়িয়ে পরবর্তী বেস এ পৌছানোর চেষ্টা করতে পারে। প্রথম বেসের রানারকে পিচ গড়ানো মাত্র অবশ্যই দৌড় দিতে হবে, কারণ পিচ গড়ালে ব্যাটার ব্যাট ফেলে দৌড়াতে বাধ্য, সেক্ষেত্রে প্রথম বেস রানারকে প্রথম বেস খালি করে দিতে হবে। কিন্তু পিচ যদি গড়িয়ে ফাউল লাইনের বাইরে চলে যায়, তাহলে যেকোনো বেস এর রানার আবার পূববর্তী বেসে ফেরত আসবে। ব্যাটারের পিটানো পিচ যদি বাতাসে উড়ে যায়, এবং মাটিতে গড়ানোর আগে ফিল্ডার তালুবন্দী করে ফেলে, তাহলে ব্যাটার আউট। এক্ষেত্রে যে কোনো রানারকে পরবর্তী বেসে এডভান্স হবার হন্য বর্তমান বেস কে ট্যাগ বা টাচ করতে হবে। কারণ বেস রানাররা কিন্ত মোটেই ভালোমানুষের বাচ্চার মত বেসপ্লেটের ওপর দাড়িয়ে থাকে না! তারা পরবর্তী বেসের দিকে, অবস্থানকৃত বেসপ্লেট থেকে খানিকটা এগিয়ে দাড়িয়ে থাকে, যেন ব্যাটার পিচ হিট করা মাত্রই যত দ্রুত সম্ভব পরবর্তী বেস এ পৌছুতে পারে। কিন্তু এগিয়ে থাকা একজন বেসম্যান যদি বুঝতে পারে যে ব্যাটার কতৃক উড়ে যাওয়া পিচ ফিল্ডারের হাতে পড়তে যাচ্ছে, তাহলে তাকে এগিয়ে থাকা অবস্থান থেকে অবশ্যই বেসপ্লেটে ফিরে এসে প্লেট টাচ করতে হবে, তারপর পিচ ফিল্ডারের তালুবন্দী হওয়া মাত্রই পরবর্তী বেসের দিকে দৌড়াতে পারবে। পিচার ব্যাটারের দিক পিচ ছোড়া অবস্থায়ও একজন রানার পরবর্তী বেসের উদ্দেশ্যে দৌড় দিতে পারে, কারণ পিচ যেহেতু ব্যাটারের দিকে যাচ্ছে, রানারকে আউট করতে পারার সুযোগ তখন কম। এক্ষেত্রে রানারের প্রচেষ্টা সফল হলে সেটাকে বলে বেস চুরি, বা “স্টোলেন বেস”। আমাদের কুরামোচি সেনপাই একেবারে পরিষ্কার চেহারায় অনায়াসে বেস চুরি করে, কারণ এই চুরির জন্য তো আর তার শ্বাস্তি হচ্ছে না!  মিয়ুকি আবার এককাঠি বাড়া, ও ক্যাচার হলে, বিপক্ষ দলে এমনকি কুরামোচি থাকলেও বেস চুরি করার সাহস দেখাবে না, কারণ বেস চুরির ফন্দী বানচালের দায়িত্ব কিন্তু আবার ক্যাচারের!
পিচারের ছোড়া পিচ যদি ব্যাটার কতৃক হিট না হয়, তাহলে সেটা হয় “বল” নাহয় “স্ট্রাইক”। তিনটা স্ট্রাইক হলে ব্যাটার আউট। পিচারের ছোড়া পরপর চারটা পিচ যদি “বল” হয়, তাহলে ব্যাটারকে একটা “ফ্রি ওয়াক” দ্বারা পুরষ্কৃত করা হয়। অর্থাৎ পরপর চারটা পিচ “বল” হলে ব্যাটার ব্যাট ফেলে বিনা বাঁধায় প্রথম বেস এ চলে যাবে। (পিচারের পিচ যদি ব্যাটারকে হিট করে, অর্থাৎ ছোড়া পিচ ব্যাটারের গায়ে লাগে, তাহলেও একটা “ফ্রি ওয়াক” পাবে ব্যাটার, এই শর্তে যে, ব্যাটার ঐ পিচের দিকে ব্যাট সুইং করেনি।) অনেক সময় অনেক ভালো ব্যাটার পিচ স্লটে পেলে হোম রান করতে পারে, এই ভয়ে পিচার ইচ্ছা করেই চারটা “বল” করে, যেন ব্যাটার বেস এ চলে যায়। তাহলে ঐ ব্যাটারকে আপাতত ফেইস করতে হচ্ছে না তার। পিচারের ছোড়া বল কি স্ট্রাইকজোনের মধ্য দিয়ে গিয়ে “স্ট্রাইক” হয়েছে, না স্ট্রাইকজোনের বাইরে দিয়ে গিয়ে “বল” হয়েছে, তা হোমবেস আম্পায়ার নির্ধারণ করেন।
নিম্নোল্লেখিত কারণগুলোর কোনোটি ঘটলে একটা পিচ কে “স্ট্রাইক” ধরা হয়:
১. ব্যাটার স্ট্রাইকজোনের মধ্য দিয়ে পিচ করা একটি বল এ সুইং না করে তা ক্যাচারের কাছে যেতে দিলে।
২. ব্যাটার যেকোন পিচ (এমনকি সে পিচ যদি “বল” ও হয়) এর দিকে ব্যাট সুইং করলে, কিন্তু লাগাতে না পারলে সে পিচ যদি গিয়ে ক্যাচারের হাতে পড়ে।
৩. ব্যাটারের পেটানো পিচ যদি কোনোভাবে ফাউল লাইনের বাইরে গড়ায়, তাহলে। এক্ষেত্রে উল্লেখ্য যে, ব্যাটারের যদি অলরেডি দুটো স্ট্রাইক হয়ে থাকে, তাহলে তৃতীয় স্ট্রাইক হিসেবে ফাউল টেরিটোরিতে গড়ানো বল গণ্য করা হবে না, অর্থাৎ তৃতীয় স্ট্রাইকের সময় পেটানো পিচ ফাউল টেরিটোরিতে গড়ালেও সেটা “স্ট্রাইক” হিসেবে গণ্য হবে না, যদি না সে পিচ টা বান্ট করা হয়। ফাউল বান্ট যদি তৃতীয় স্ট্রাইকও হয়, তবুও স্ট্রাইক হিসেবে গণ্য হবে।
একটা পিচ কে “বল” হিসেবে গণ্য করা হয় যখন পিচারের ছোড়া পিচ স্ট্রাইকজোনের বাইরে দিয়ে যায়, যদি না ব্যাটার ঐ পিচের দিকে ব্যাট সুইং করে থাকে তো। ব্যাট সুইং করা হলে সেটা স্ট্রাইক হিসেবে গণ্য হবে।
ব্যাটিং টিম যখন রান করার চেষ্টা করে, ফিল্ডিং টিম এর লক্ষ থাকে ব্যাটারদের আউট করা এরং রান করা থেকে বিরত রাখা। সাধারণত নিম্নোল্লেখিত পাঁচটি উপায়ে একজন ব্যাটার বা ব্যাটার-রানার আউট হয়ে থাকে:
১. স্ট্রাইকআউট: উপরে যেমন বলা হয়েছে, তিনটা স্ট্রাইক হলে, অর্থাৎ পিচারের ছোড়া বল স্ট্রাইকজোনের মধ্য দিয়ে যাওয়া সত্বেও ব্যাটার সে পিচ না পেটাল বা পেটাতে না পারলে, অথবা “বল” হওয়া সত্বেও সুইং করলে স্ট্রাইক কাউন্ট হবে। আর তিনটা স্ট্রাইক মানে ব্যাটার আউট।
২. ফ্লাইআউট: পেটানো বল যদি মাটিতে পড়ার আগে ফিল্ডার তালুবন্দী করে ফেলে, তাহলে সেটা ফেয়ার টেরিটোরি, ফাউল টেরিটোরি বা যে অবস্থায়ই হোক না কেন, ব্যাটার আউট হয়ে যাবে।
৩. গ্রাউন্ডআউট: ব্যাটারের পেটানো পিচ ফেয়ার টেরিটোরিতে গড়ানোর পর যদি সে পিচ ফিল্ডারদের হাত হয়ে ব্যাটার বা কোনো ব্যাটার-রানারের আগে বেসপ্লেট টাচ করে, তাহলে সেই ব্যাটার বা ব্যাটার রানার আউট। যেমন: ব্যাটারের পেটানো পিচ গড়িয়ে সোজা শর্টস্টপের হাতে গেলে শর্টস্টপ যদি সে পিচ ব্যাটারের ফার্স্ট র্বেস এ পৌছানোর আগে ফার্স্ট বেসে অবস্থানকারী বেসম্যান কে ছুড়ে দেয়, তাহলে ব্যাটার আউট হয়ে যাবে। একই ব্যাপার অন্যন্য বেস রানারদের ক্ষেত্রেও ঘটতে পারে। গ্রাউন্ডআউট দেখা টা আসলে শ্বাসরুদ্ধকর, কারণ শুধু একজন ব্যাটার বা একজন রানারকেই যে গ্রাউন্ডআউট করা যায় তা-ই না, মাঝেমাঝে দুজন, এমনকি তিনজন ব্যাটার-রানারকেও আউট করে ফুল বেস মুহুর্তে শুণ্য করে দেয়া যায়! উদাহারণস্বরুপ: ধরুন ব্যাটিং টিম এর তিনজন ব্যাটার তিনটা বেস এ এডভান্স করতে পেরেছে! বেস ফুল, এমন সময় চতুর্থ ব্যাটার এসে পিচারের ছোড়া পিচ পেটাতে গিয়ে ব্যাটে-বলে মেলাতে পারল না! অথচ পিচ ফেয়ার টেরিটোরিতে গড়ানো মানে কিন্তু দৌড়াতে হবে ব্যাটারকে, স্বাভাবিকভাবেই আর বাকি বেস রানারদেরও দৌড়াতে হবে আগের বেসের বেসম্যানকে জায়গা করে দেয়ার জন্য। অথচ পিচ ধুলোয় কিছুটা লুটোপুটি খেয়ে সোজা গড়ালো সেকেন্ড বেসম্যানের হাতে, মানে ফার্স্ট থেকে সেকেন্ড বেসের উদ্দেশ্যে দৌড় শুরু করা রানার আউট! সেকেন্ড বেসম্যান পিচটা ধরেই আবার ছুড়ে দিল ক্যাচার বা হোমবেসম্যান এর হাতে, অর্থাৎ থার্ড বেস থেকে হোমবেসের দিকে দৌড় শুরু করা রানার আউট! ক্যাচার আবার সেই বল ছুড়ে দিল ফার্স্ট বেসম্যানের হাতে, মানে ব্যাটার, যে হোম থেকে ফার্স্টবেসের দিকে দৌড়াচ্ছিল, সে-ও আউট!  ট্রিপল্ প্লে অর্থাৎ তিনজন প্লেয়ার আউট! এবং জ্বী! ঠিক এমনই একটা ট্রিপল প্লে দেখতে পাই আমরা দাইয়া তে! বলদ পিচারের কন্ট্রোলবিহীন পিচ দিয়েও কিভাবে একটা ট্রিপল প্লে খেলা যায়, তারই একটা চমৎকার প্ল্যান বানিয়েছিলেন জিনিয়াস ক্যাচার!
উল্লেখ্য যে: ব্যাটার বা রানারকে আউট করার জন্য পিচ বেসম্যানের হাতেই থাকতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। মাঠের সব ফিল্ডারই অবস্থা বুঝে নিজেদের পজিশন ছেড়ে অন্য যেকোনো পজিশন খেলার অধিকার রাখে। সেকেন্ড বেসম্যান যেমন পেটানো পিচ ধরার জন্য নিজের পজিশন ছেড়ে অন্য কোথাও ছুটতে পারে, তেমনি সেকেন্ডের পজিশনে লেফ্ট ফিল্ডারও বেসম্যান হিসেবে দাড়িয়ে যেতে পারে সেকেন্ডের ছোড়া বল রানারের আগে বেসপ্লেটে টাচ করানোর জন্য। আউটের জন্য বল রানারের বেসপ্লেট টাচ করলেই হলো, কার হাত দিয়ে টাচ হচ্ছে, তা বড় কথা না। ঠিক ক্রিকেটে যেমন উইকেটরক্ষক না হয়েও উইকেট ভাঙতে পারে অন্য যেকোনো ফিল্ডার, তেমনই।
৪. ফোর্স আউট: যখন ব্যাটারের পেটানো পিচ ফেয়ার টেরিটোরিতে গড়ানোর কারণে রানার দৌড়াতে বাধ্য হয় বেস খালি করার জন্য, পরবর্তী বেসে পৌছানোর আগেই গ্রাউন্ডআউট হয়ে যাবে জেনেও। যেমন: ফেয়ার টেরিটোরিতে ব্যাটারের পেটানো পিচ দূরে না গড়ালেও; পিটিয়েছে যখন, দৌড়াতে হবে ব্যাটারকে। তখন ফার্স্ট বেসের রানার সরে গিয়ে সেকেন্ড বেস এ যেতে বাধ্য হবে, কিন্তু বল ইতোমধ্যে পৌছে গেছে সেকেন্ড বেসম্যানের হাতে, অর্থাৎ রানার আউট।
৫. ট্যাগ আউট: পেটানো পিচ ট্যাগ বা স্পর্শ করানোর মাধ্যমে যখন আউট করা হয়। রানার দৌড়াতে থাকা অবস্থায়, বা অন্যমনষ্কভাবে বেসপ্লেট থেকে দূরে দাড়িয়ে থাকলে পেটানো পিচ হাতে ফিল্ডারদের কেউ যদি সেই পিচ রানারের গায়ে স্পর্শ করে ফেলে, তাহলে সেই রানার আউট।
উদাহারণে যেমন বললাম, ব্যাটিং টিমের একইসাথে দুইজন, এমনকি তিনজন প্লেয়ারকেও আউট করা যায় ডাবল্ বা ট্রিপল্ প্লে খেলে- যদিও এধরণের সুযোগ খুব কমই পাওয়া যায়। আউট হওয়া প্লেয়ারকে অবশ্যই মাঠ ত্যাগ করে বেঞ্চ বা ডাগআউটে ফিরে যেতে হবে। রানার বেসে দাড়িয়ে থাকা অবস্থায় যদি টিমের তৃতীয় ব্যাটসম্যান আউট হয়ে যায়, তাহলে রানারসহ ব্যাটিং টিমের ব্যাটিং খেলার পালা শেষ, তারপর ফিল্ডিংয়ে নামবে ব্যাটিং টিম। প্রত্যেক ব্যাটিং ইনিং শূণ্য বেস নিয়ে শুরু হবে, আগের ইনিংয়ে রানারদের পজিশন পরের ইনিংয়ে কোনো কাজে আসবে না।
একেকজন ব্যাটারের ব্যাটিং পালা, বা প্লেটে অবস্থান পূর্ণ হয়ে যায় যখন সে হোম রান করে, বেস ঘুরে হোম বেস এ ফেরত আসে, আউট হয়ে যায়, বা রানার অবস্থানে থাকাকালে টিমের তৃতীয় ব্যাটার আউট হযে যায়, তখন। একজন ব্যাটার ব্যাটিংলাইনে একবারই ব্যাটিংএ আসবে; আবার আসবে যদি শুধু তিনজন ব্যাটার স্ট্রাইক হওয়ার আগেই বাকি আটজন ব্যাটারের প্লেটে উপস্থিতি পূর্ণ হয়ে যায়, তাহলে- যেটা হয়না সাধারণত।
কোন প্লেয়ার কখন ব্যাটিং করবে, সেটা ব্যাটিং অর্ডারে সুনির্দিষ্ট করা থাকে, কারণ ব্যাতীত অর্ডার পরিবর্তন হয় না সাধারনত। প্রত্যেক এট ব্যাটে আগের ইনিঙয়ে ব্যাটিং এর সময় যে ব্যাটার পর্যন্ত শেষ হয়েছিল, তার থেকেই পুনরায় ব্যাটিং শুরু হয়; এভাবে সব প্লেয়ারই ব্যাটিং করতে পারে।
ব্যাটিং অর্ডারে সাধারণত প্রথম ব্যাটারকে লিডঅফ হিটার বলা হয়, যার কাজ বল কোনোমতে ঠেলে দিয়ে আগে বেস দখল করা!
দ্বিতীয় ব্যাটারকে বলা হয় কন্ট্যাক্ট হিটার, যার কাজ সাধারণত বান্ট বা নিজেকে স্যাকরিফাইসের মাধ্যমে লিডঅফ হিটারকে স্কোরিং পজিশন তথা থার্ড বেস পর্যন্ত চলে আসার সুযোগ করে দেয়া।
তৃতীয় ব্যাটার হলো থ্রি-হোল্, যাকে সাধারণত ভালো ব্যাটিং এবং বেস দখল করতে হয়; বল পিটিয়ে যেন অন্তত এতদূর নিতে পারে যা বেস রানারদের এডভান্স হওয়ার সুযোগ করে দেয়।
চতুর্থ ব্যাটার হচ্ছে টিমের সবচেয়ে যোগ্য ব্যাটার, যাকে বলা হয় ক্লিনাপ-ব্যাটার। নামের মতই, ওর কাজ হলো বেস ক্লিন করা, অর্থাৎ পিচ পিটিয়ে সম্ভব হলে চাঁদে পাঠাবে, যেন রানাররা সবাই বেস ক্লিন করে হোমবেস এ ফিরে আসে।
পরবর্তী ব্যাটাররা যথাক্রমে ফিফথ-হোল্, সিক্সথ-হোল, সেভেন্থ, এইটথ ও নাইন্থ-হোল।
উল্লেখ্য যে, ব্যাটিং অর্ডার কোনো স্ট্রিক্ট ডিসিপ্লিন নয়, অবস্থা অনুযায়ী ব্যাটারদের ভূমিকা ও কাজ অনেকভাবে পরিবর্তিত ও পরিবর্ধিত হতে পারে।
একটি টিমের নয়জন প্লেয়ার খেলবে, তারমানে কিন্তু এই না যে একেকটা টিম এ মাত্র নয়জন করে খেলোয়াড় থাকবে! গেমের ইম্পরট্যান্স লেভেলের ওপর ডিপেন্ড করে রোস্টারে বিভিন্ন সংখ্যায় খেলোয়ার থাকতে পারে; মেজর লীগগুলোতে একেকটা রোস্টারে সাধারণত ২৫ জন করে খেলোয়াড় থাকে। একেকটা পজিশনের জন্য ব্যাকআপ প্লেয়ার সহ বিশেষ পজিশন, যেমন: পিঞ্চ হিটারের মত অনেকজন প্লেয়ারের সমন্বয়ে গঠিত হয় একটি রোস্টার বা টিম। প্লেয়ার ছাড়াও টিমে থাকেন কোচ এবং ম্যানেজার। মেইন কোচ ছাড়াও সর্বোচ্চ লেভেলের খেলাগুলোতে ব্যাটিংয়ের সময় মাঠে দুজন কোচ উপস্থিত থাকে; ফার্স্ট বেস কোচ, এবং থার্ড বেস কোচ। ফাউল লাইনের বাইরে কোচে’স বক্সে অবস্থান নেয় এ দুজন, সাধারণত বল খেলার মাঠে গড়ালে বেস-রানারদের দৌড়ের ব্যাপারে এসিস্ট করাসহ মাঠে ফিল্ডারদের পজিশন অনুসারে পরিস্থিতি যাচাই করে নির্দেশনা দেয়া, মেইন কোচ এবং খেলোয়াড়দের মধ্যে নির্দেশ আদান-প্রদান করা এদের কাজ। অন্যন্য খেলা থেকে ভিন্ন, বেসবল টিমের কোচ এবং ম্যানেজাররা সাধারণত দলীয় পোশাক বা ইউনিফর্ম পরে থাকেন, কোনো কারণে খেলার মাঠে আসতে হলে কোচকে অবশ্যই ইউনিফর্ম পরা অবস্থায় আসতে হবে।
ম্যাচের গুরুত্বের ওপর নির্ভর করে একটা বেসবল ম্যাচে ১-৬ জন আম্পায়ার থাকতে পারেন। একজন হলে ক্যাচারের পেছনে, হোমবেসের কাছাকাছি অবস্থান নেন। ছয়জন হলে চারজন চারটি বেস, বাকি দুজন ফাউল লাইনের কাছাকাছি অবস্থান নেন।
ফ্যাক্টস:
#স্ট্রাইকজোন: ব্যাট হাতে ব্যাটিং করার ভঙ্গিতে দাড়ালে ব্যাটারের কনুই থেকে হাটু পর্যন্ত যদি একটি নয়ঘর বিশিষ্ট চারকোনা বাক্স কল্পনা করা যায়, তাহলে সেটি হচ্ছে স্ট্রাইকজোন। স্ট্রাইকজোনের ভেতর দিয়ে যাওয়া পিচে হিট না করা হলে ব্যাটারের বিপক্ষে স্ট্রাইক কাউন্ট হয়। স্ট্রাইকজোনের বাইরে দিয়ে যাওয়া পিচ কে “বল” বলা হয়। পিচারের ছোড়া পরপর চারটা পিচ “বল” হলে ব্যাটসম্যান প্রথম বেস পর্যন্ত ফ্রি-ওয়াক পায়।
#বান্ট: বান্ট একটা স্পেশাল ধরণের ব্যাটিং টেকনিক যেখানে ব্যাটার হাতের ব্যাটটির দুইমাথা আলতো করে ধরে পিচারের ছোড়া বল আস্তে করে, এমনভাবে ঠেলে দেয় যেন বল মাটিতে গড়িয়ে খুব বেশী দূরে না যেতে না পারে। সাধারণত নো-ম্যানস ল্যান্ডে, যেখানে কোনো ফিল্ডার নেই, সেখানে পিচ গড়ানোর মাধ্যমে ফিল্ডারদের কনফিউজ করে রানারদের বেস এডভান্সের সুযোগ করে দেয়ার একটি কৌশল হলো বান্ট। এ কৌশলে ব্যাটারের পেটানো পিচের গতি যেহেতু খুব কমে যায়, ইনফিল্ডের ভেতর খুব বেশীদূর গড়ায় না পিচ, এবং সেটা তোলার জন্য নিজেদের অবস্থান ছেড়ে সরে আসতে হয় ইনফিল্ডারদের; উপরন্তু, পিচ্টা কে তুলবে, তা নিয়ে দ্বিধা দেখা দেয় ফিল্ডারদের মাঝে। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দ্রুত এডভান্স করতে পারে বেস রানাররা।
#শর্টস্টপ: বেসবলে শর্টস্টপ একটি বিশেষ ফিল্ডিং পজিশন যার অবস্থান সেকেন্ড ও থার্ডবেসের মাঝখানে। বেশীরভাগ ব্যাটার বা হিটার ডানহাতি হয়ে থাকে, এবং ডানহাতি ব্যাটারের পেটানো পিচ সাধারণত সেকেন্ড ও থার্ড বেসের মধ্য দিয়ে গড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। শর্টস্টপের কাজ হলো ডানহাতি ব্যাটারের ব্যাটিং এক্সপেরিয়েন্স খানিকটা বিষিয়ে দেয়া! সোজা কথায়, ব্যাটারকে সাবধান করা, যে, “চাঁদ, তুমি যদি ভেবে থাকো আমাকে ফাঁকি দিতে পারবে তোমার পিচ, তাহলে ভুল করছ! অতএব বুঝেশুনে পেটাও, বাপু!”   এজন্য শর্টস্টপকে প্রচন্ড দ্রুতগতির একজন প্লেয়ারও হতে হয় বটে, তাছাড়া ট্রিপল, এবং ডাবল্ প্লে তে শর্টস্টপের বড় ভূমিকা রয়েছে।
#ব্যাটারী: বেসবলে ব্যাটারী বলতে পিচার এবং ক্যাচারের পার্টনারশিপ কে বোঝানো হয়। উল্লেখ্য যে, ক্যাচারের নির্দেশ অনুযায়ী পিচ করে পিচার, যেটার ওপর ফিল্ডিং দলের ফলাফল অনেকটাি নির্ভর করে। তাই এই পার্টনারশিপকে ফিল্ডিং টিমের সঞ্জীবনী শক্তি হিসেবে ধরা হয়।
#বুলপেন: খেলায় নামার আগে পিচারদের ওয়ার্ম-আপ হওয়ার জন্য একটি নির্দিষ্ট এরিয়া হচ্ছে বুলপেন। আমাদের সম্মানিত পিচারের বড়ই প্রিয় জায়গা এই বুলপেন! :’)
# বেসবল ম্যাচের ধারাভাষ্য বিবরণকারীদের বলিং এর অবস্থা বিবরণের সময় মাঝে মাঝে “1-2”, “2-3” বলতে শোনা যায়। প্রথম সংখ্যাটা দ্বারা “বল”, এবং দ্বিতীয় সংখ্যাটা দ্বারা “স্ট্রাইক” এর সংখ্যা বোঝানো হয়। যেমন: “2-2” মানে হচ্ছে 2 “বল” 2 “স্ট্রাইকস্”।
# ডাবল্ প্লে এর বর্ণনার সময় ধারা বিবরণকারীরা “6-4-3 ডাবল্ প্লে”, বা “5-4-3 ডাবল প্লে” বলে থাকে; এর অর্থ হলে এ সকল জার্সি নম্বরের প্লেয়ারদের দ্বারা খেলাটা সংঘটিত হয়েছে। যেমন: “6-4-3 ডাবল্ প্লে” কথাটার অর্থ হলো, ব্যাটারের পেটানো পিচ গড়িয়ে সোজা শর্টস্টপের (জার্সি 6) হাতে ধরা খেয়েছে, শর্টস্টপ সে পিচ সেকেন্ড বেসম্যানের (জার্সি 4) হাতে ছুড়ে দিয়েছে, অর্থাৎ ফার্স্ট থেকে সেকেন্ড বেসের দিকে দৌড়াতে থাকা ব্যাটার আউট। সেকেন্ড বেসম্যান আবার সে পিচ ফার্স্ট বেসম্যানেে (জার্সি 3) দিকে ছুড়ে দিয়েছে, মানে হোম বেস থেকে ফার্স্ট বেসের দিকে দৌড়াতে থাকা ব্যাটার আউট, অর্থাৎ ডাবল্ প্লে।
বিভিন্ন ধরণের পিচ:
পিচার কতটা ভালো পিচ, কতটা কন্ট্রোলের সাথে এবং ব্যাটারের জন্য কতটা কঠিন করে ছুড়তে পারে, তার ওপর ফিল্ডিং টিমের সাফল্য অনেকখানিই নির্ভর করে। এস অফ ডায়ামন্ডের মেইন প্রোটাগনিস্ট যেহেতু একজন পিচার, বিভিন্ন ধরণের পিচ সংক্রান্ত আলোচনা প্রায়ই চলে আসবে এনিমেতে। কিন্তু, বেসবলে পিচের ধরনসংখ্যা অনেক, এতগুলো নিয়ে আলোচনা সম্ভব নয়। তাই মোটামুটি কমন কতগুলো পিচ নিয়ে প্রাথমিক ধারণা দেয়ার চেষ্টা করছি।
একটা পিচ কে বিভিন্ন দিক থেকে বিচার করে অনেকগুলো সংজ্ঞায় ফেলানো যায়। হাতে পিচ ধরার বা গ্রিপিংয়ের স্টাইল, ছোড়ার স্টাইল, গতি, ইত্যাদির ভিত্তিতে প্রধানত তিন ধরণের পিচ বেশী দেখা যায়:
#ফাস্টবল: ফোর-সিম, টু-সিম, কাটার, স্প্লিটার, ফর্ক।
#ব্রেকিং বল: কার্ভ, স্লাইডার, স্ক্রু।
#চেঞ্জআপ।
ফাস্টবল হচ্ছে সবচেয়ে কমন পিচ, প্রায় সব পিচারেরই প্রথম আয়ত্ত করা পিচ ফাস্টবল। নামের মতই, প্রচন্ড গতিতে ছোড়া হয় এই পিচ, গতিই এর অস্ত্র। বেগের পরিবর্তন এবং ধরার ভঙ্গির ভিত্তিতে কয়েক ধরণের ফাস্টবল রয়েছে। আমাদের Eijun এর বহুল ব্যাবহৃত একটা পিচ হচ্ছে টু-সিম ফাস্টবল, তথা মুভিং ফাস্টবল; প্লেটের ওপর বেশ নড়াচড়া করে এই পিচ, এবং দূরত্বের সাথে সাথে গতি বৃদ্ধির কারণে ব্যাটারের পক্ষে টাইমিং করা মুশকিল।
ব্রেকিং বল হচ্ছে সেই পিচ যেটা চলার সময় এর গতিপথ থেকে যেকোন দিকে ভেঙ্গে যায় বা বেঁকে যায়। গতিপথ থেকে টার্ন নিলে স্বাভাবিকই পিচের গতিতেও প্রভাব পড়ে, তাই ব্যাটারের জন্য এ পিচ ব্যাটিং করা যেমন কঠিন, তেমনি ক্যাচারের জন্যও এ পিচ ক্যাচ করা কঠিন। গ্রিপ, গতির পরিবর্তন এবং বেঁকে যাওয়ার দিকের ভিত্তিতে কার্ভ, স্লাইডার, স্ক্রু ছাড়াও আরেকটি ব্রেকিং বল হচ্ছে স্লার্ভ।
চেঞ্জআপ হচ্ছে এমন একধরণের পিচ, যেটা পিচারের হাত থেকে ছোড়ার মুহুর্তে দেখতে ফাস্টবল বলে মনে হয়, কিন্তু প্লেটের ওপর পিচের গতি নেমে যায়, এবং অনেক ধীরে এগিয়ে আসে বল। বেসিক ফাস্টবল গ্রিপ আর চেঞ্জআপের গ্রিপের মধ্যে পার্থক্য হলো; চেঞ্জআপের সময় আঙ্গুলের ডগার বদলে হাতের অনেকটা ভেতর থেকে ছোড়া হয় পিচ, ফলে সেটা দেখতে ফাস্টবলের মত মনে হলেও আসলে ফাস্টবলের তুলনায় খানিকটা পরে মুক্ত হয় পিচারের গ্রিপ থেকে, যেহেতু হাতের ভেতর থেকে মুক্ত হতে খানিকটা সময় লাগে। মানুষের চোখ এ পার্থক্য ধরতে পারে না, কারণ একটা নির্দিষ্ট দূরত্বে না আসলে চোখ দিয়ে প্রচন্ড বেগে চলন্ত বস্তুর গতি ঠাওর করা যায়না। পিচ প্লেটের কাছাকাছি আসার পর বোঝা যায় যে সেটার গতি আসলে ফাস্টবলের তুলনায় বেশ ধীর, কিন্তু ততক্ষণে ব্যাট সুইং করে ফেলে ব্যাটার, কিন্তু পিচ আসে আরও পড়ে। ঠিকভাবে ছোড়া গেলে একটি চেঞ্জআপ তাই ব্যাটারকে বিভ্রান্ত করতে বাধ্য, বিশেষত সেটা যদি হয় আমাদের সম্মানিত পিচারের চেঞ্জআপ! :’) ব্যাটার তো ব্যাটার, এমনকি আমাদের জিনিয়াস ক্যাচারসহ ফিল্ডে এবং গ্যালারিতে উপস্থিত প্রত্যেকটা মানুষ জিনিসটা দেখে বিভ্রান্ত হবেই হবে! XD
এই তো, আর কি! :’) পাঠকের বেসবল বোঝার জন্য প্রয়োজন হতে পারে, এমন সকল বিষয় সম্বন্ধে মোটামুটি একটা ধারণা পেয়েছেন আশা করি! :’) এবার থিওরি ইন প্র্যাকটিকাল দেখতে চাইলে দেখে ফেলুন দাইয়া নো এস!
সকল তথ্যই কয়েকবার করে চেক করে শেয়ার করা হয়েছে, তারপরও কোনো তথ্যে ভুল পাওয়া গেলে তা ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখে সঠিক তথ্য শেয়ার করলে কৃতজ্ঞ থাকব। পোস্টটা পড়ে যদি পাঠক দাইয়া নো এস দেখতে প্রলুব্ধ হন…থুড়ি, মানে উপকৃত হন, তো আমার পরিশ্রম স্বার্থক। :’D
ধন্যবাদ সবাইকে!
বি:দ্র: পোস্টের ভীতিকর সাইজের জন্য লেখিকা ক্ষমাপ্রার্থী, এর চেয়ে ছোট করা সম্ভব বলে মনে হয়নি।

Berserk (2016): [Honest Reaction, Rant, Appreciation] — Tahsin Faruque Aninda

berserk_2016_5127

সর্বকালের সেরা মাঙ্গা বলে কোন নাম উল্লেখ করতে বললে সব চাইতে বেশি নাম যেটা আসবে সেটা হল বার্সার্ক। কেন্তারো মিউরার এই অনবদ্য সৃষ্টি শুধু মাঙ্গা হিসাবেই নয়, কমিক্স/গ্রাফিক্স নোভেল হিসাব করতে গেলেও এরকম মানের জিনিস খুব কমই পাওয়া যায়। প্রায় ৩০ বছর ধরে চলে আসা এই মাঙ্গার গল্প যেমন অসাধারণ, আর্ট তেমনই অবাক করার মত সুন্দর! এত বছর ধরে চলে আসার পরেও গল্পের কোন কুলকিনারা করে উঠা যাচ্ছে না তার একটা বড় কারণ মাঙ্গাকার কয়েকদিন পরপর হায়াটাসে চলে যাওয়া। এক নৌকা ভ্রমণে গল্প ৭ বছর আটকিয়ে রাখার মত আকাম করেছে এই লোক। নাহলে কে জানে, গল্প হয়তো এতদূর এগিয়ে যেত যে গল্পের শেষের দিকে কী হতে পারে না পারে তার কিছুটা হলেও ধারণা পাওয়া যেত।

সে যা হোক, সর্বজনবিদিত এই মাঙ্গার আনিমে এডাপশনের উপর যেন সবসময়েই একটা অভিশাপ লেগে থাকতো। অনেক নামকরা মাঙ্গার মতই এটারও আনিমে এডাপশনের ভাগ্যের শিকে ছিড়ে উঠে নি অনেকদিন। এডাপশন কনফার্ম হলেও আনিমের বাজেট খুবই কম থাকার কারণে স্টিল শট ব্যবহার করার কারণে কুখ্যাত হয়ে উঠে ১৯৯৭ সালের সেই সিরিজ। অনেকদিন পর আবার বার্সার্কের আনিমের খবর বের হলেও দেখা যায় সেটা মুভি ট্রিলজি, তাও আবার ১৯৯৭ সালে গল্প যতটুকু দেখিয়ে রেখে দিয়েছিল, ততটুকুই আবার রিবুট করবে। এই মুভি তিনটি বের হয়ে থাকলেও এরপর আবার খবর নেই। অনেকদিন পর আবার বার্সার্কের নতুন আনিমে এডাপশনের খবর বের হলেও সবাই চিন্তায় থাকে আবার রিবুট না তো! এবার অন্তত রিবুট হবে না এটা মোটামুটি কনফার্ম হবার পরেও সবার মনে আরেকটা চিন্তা উকি দেয় — CG এর ব্যাবহার আনিমের মানটাকে আবার খারাপ করে ফেলবে না তো!

তা শেষ পর্যন্ত কেমন হয়ে উঠে সিরিজটা? এডাপটেশন খারাপ বলে সবাই গলা ছাড়িয়ে বেড়ালেও আর মাঙ্গা পাঠকদের হতাশ করা হয়ে থাকলেও সব মিলিয়ে সিরিজটি কেমন হয়েছে? দেখার মত নাকি একদমই ফেলে দেবার জিনিস?

মাঙ্গা এডাপশন হিসাবে কেমন, সেই টপিক আপাতত সরিয়ে রাখি। ইন্টারনেটে গত তিন মাস উপস্থিত থাকলে যে কেউই এতক্ষণে জেনে গিয়েছে পাঠকদের রিএকশন কেমন। তাই সে কথা বাদ থাক। আগে থেকে কেউ যদি মাঙ্গা পড়ে না থাকেন, আনিমে দিয়েই শুরু করেন, তাহলে তার জন্যে এই লেখাটি একটি গাইডলাইন হতে পারে সিরিজটা সম্পর্কে বিচার করার জন্যে।

শুনতে অবাক লাগলেও, সিরিজটির বেশ ভাল কিছু দিক আছে। সেই ভাল দিকগুলি তুলে ধরার আগে অল্প কথায় সিরিজটির অনাকর্ষণীয় দিকগুলি নিয়ে আসি:

— CG মানেই খারাপ নয়, ভাল CG-এর ব্যবহার একটা সিরিজকে অনেক বেশি আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে। বার্সার্কে CG-এর ব্যবহার খারাপ ছিল নিঃসন্দেহে, তবে তার চাইতেও বড় সমস্যা হল CG কিভাবে ব্যবহার হয়েছে এখানে। সিরিজ ডিরেক্টর এর আগে যত আনিমেতে কাজ করেছে, সেগুলি ছিল ৩-৪ মিনিটের পর্ব করে slapstick slice of life comedy সিরিজ। সেই ডিরেক্টর (এবং একই সাথে আগের আনিমেগুলির সেই একই স্টুডিওকে) এমন একটি আনিমের দায়িত্ব দেওয়া হল যা ছিল সবদিক থেকে আগের কাজগুলি থেকে একদম আলাদা। comedy slice of life এর জায়গায় dark fantasy horror, 2d এর জায়গায় 3d cg, short fast paced slapstick আনিমের জায়গায় বড় পর্বের action drama সিরিজ। এত কঠিন সব কন্ডিশনের পরেও সিরিজটা চমৎকার হয়ে উঠতে পারে যদি ডিরেক্টরের গুণ অনেক বিশেষ কিছু হয়ে উঠে। বলার অপেক্ষা রাখে না, এরকম কিছুই হয়ে উঠে নি। অ্যানিমেশন, স্ক্রিনপ্লে, কোরিওগ্রাফি, কোন কিছুই ঠিকমত হয়ে উঠে নি। এই ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে চাইলে এই ভিডিওটি দেখে ফেলুন, সুন্দর করে সবকিছুর analysis করা হয়েছে:

— গল্পের কাটছাট অনেক বেশি হয়েছে। বিশেষ করে Black Swordsman arc ও Conviction arc এই ১২ পর্বে দেখানোর কথা থাকলেও অর্ধেকের মত গল্পের উপাদানই বাদ দেওয়া হয়েছে এখানে। বাকিটুকুও যা দেখানো হয়েছে সেগুলিও অনেক rushed করে দেখিয়েছে।

— Censoring.
এটা বলার আগেই বুঝে নেওয়া যায়, মাঙ্গায় যে ভয়াবহ রকমের বেশি পরিমাণ nudity আর gore ছিল, তা আনিমেতে কোনভাবেই দেখাতো না। HBO যদি Berserk-এর কোন এডাপশন করে, তাহলেই একমাত্র সেখানে এরকম কিছু দেখা যেত [এবং যার কাছে GoT এর nudity-কে রীতিমত childish পর্যায়ে ফেলে দেওয়া যায়]। তা স্বত্ত্বেও কিছু কিছু যায়গায় সেন্সরিং চোখে পড়ার মত ছিল।

এবার আসি সিরিজটার ভাল দিকগুলির কথায়:

+ শুরুর দিকে সিনেম্যাটোগ্রাফি খারাপ থাকলেও ধীরে ধীরে ভাল হয়ে উঠতে শুরু করে। ডিরেক্টরের কাজ দেখে মনে হয়েছে, প্রথম ৪-৫ পর্ব কোনরকম হয়ে থাকলেও এর মধ্যেই সে অনেক কিছু শিখে উঠে। যার কারণে পরের দিকের পর্বগুলি তুলনামূলক বেশ ভাল হয়।

+ মিউজিক চমৎকার ছিল। এন্ডিং গানটা খুব ভাল না হলেও ওপেনিং গানটা এই বছরের অন্যতম পছন্দের গান। মিউজিকের ব্যবহার ভাল তো ছিলই, আমার কাছে সাউন্ড ইফেক্টও ভাল লেগেছে।

+ ক্যারেক্টার ডিজাইন।
হ্যাঁ, গাটসকে বেশি খারাপ লেগেছে আসলে, মুখটা বেশি চিকন করে ফেলেছে, শরীরটাকেও। কিন্তু বাকি সবাই একদম মাঙ্গার মতই রয়ে গিয়েছে।

+ একশন দৃশ্যগুলি বেশ ভাল ছিল। শুরুর দিকে একশন দৃশ্যের মান খারাপ থাকলেও, প্রথম পয়েন্টটার মত এ ক্ষেত্রেও যথেষ্ট উন্নতি ঘটে শেষের দিকে এসে। বিশেষ করে conviction arc-এর শেষের মারামারিটা বেশ মুগ্ধ করেছে আমাকে।

+ আনিমের জন্যে তৈরি নতুন অংশটি।
যেহেতু অনেকদিন পর আনিমে হিসাবে বার্সার্ক এসেছে আবার, আর তাছাড়া এর আগের সিরিজ/মুভিগুলির কারণে আর একই সাথে এইবারের সিরিজে সময়-স্বল্পতার কারণে কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাদ দিতে হয়েছে, এই জন্যে apostle জিনিসটা কী সেই ব্যাপারে দর্শকদের পরিষ্কার ধারণা না থাকতে পারে। এজন্যে apostle-এর ব্যাপারটা নতুন দর্শকদেরকে ভাল মত introduce করাবার জন্যে শুরুর দিকে একটি anime only mini arc দেখায়। এই অংশটি “ফিলার” বলে দাবী করতে গেলেও একে ফিলার বলা যাবে না আসলে। কারণ মিউরা নিজেই গল্পের এই অংশটুকু লিখেছে। আর এটি বেশ ভালই হয়েছিল, দেখার সময়ে বিরক্তি তো লাগেই নাই, বরং গল্পের অন্যান্য অংশের সাথে মানিয়ে যাবার মত ঘটনাই দেখিয়েছে। মাঙ্গাকা নিজে লিখেছে বলেই এই অংশটুকু ভাল হয়েছে।

+ নতুন জেনারেশনকে বার্সার্কের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া।
আনিমেটাকে মাঙ্গার এডভার্টাইজমেন্ট হিসাবে ধরে নেওয়া হোক বা না হোক, এই সুযোগে এখনকার জেনারেশনের অনেক দর্শক এবং একই সাথে পাঠকদেরকে বার্সার্কের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্যে একটা ভাল উদ্যোগ। “READ THE MANGA” বলে চেঁচানোর কারণে অনেকে আনিমে দেখে এরপর আর সাসপেন্স সইতে না পেরে মাঙ্গাটা শুরু করে দিবে সন্দেহ নাই।

সব মিলিয়ে এটুকু বলবো, কেউ যদি মাঙ্গা পড়ে না থাকেন, তার কাছে এই বার্সার্ক একদম ভয়াবহ খারাপ লাগবে না। সব মিলিয়ে একটা ইন্টারেস্টিং সিরিজ হিসাবেই মনে হবে। মাঙ্গা পড়তে না চাইলে এবং শুধু আনিমে দর্শক হয়ে থাকলে, সিরিজটা উপভোগ্য লাগবে পরের দিকে গিয়ে। বিশেষ করে সময়ের সাথে সাথে সিরিজটার making-এ উন্নতির ছাপটা বুঝা যাবে। তবে মাঙ্গা পড়তে আপত্তি না থেকে থাকলে অবশ্যই মাঙ্গা পড়তে অনুরোধ করবো।

সবশেষে বলবো, যেহেতু এর সিকোয়েল আসবে সামনের বছর, তার অর্থ খুব নিকট ভবিষ্যতে অন্য কোন ভাল স্টুডিওর পক্ষ থেকে এর রিবুট আসছে না। তাই প্রথম সিজনের ভুলভ্রান্তি থেকে শিক্ষা নিয়ে দ্বিতীয় সিজনটা যেন আরও ভাল করে তুলে সেটাই আশা করছি। Falcon of the Millennium Empire Arc-টা কোনভাবেই খারাপ কিছু যেন না হয়ে উঠে এই আশাতেই আছি।