MAL লিঙ্ক: https://myanimelist.net/anime/10178/Otona_Joshi_no_Anime_Time
আনিমেটির প্রতিটি এপিসোড হল একটি করে ছোটগল্পের এডাপটেসন। প্রতিটি গল্পই পুরস্কারপ্রাপ্ত। একেকটির থিম একেকরকম হলেও প্রতিটি গল্পেরই কেন্দ্রে থাকে একেকজন প্রাপ্তবয়স্কা নারী। ওদের জীবনের কিছু সুখ-দুঃখের ও রোমান্টিক মুহূর্তের কথা অত্যন্ত নিপুণতার সাথে বলা হয়। আনিমেটির ঘটনাপ্রবাহ অত্যন্ত বাস্তব; মনে হবে যেন কোন উঁচুমানের টিভি ড্রামা দেখছেন।
আনিমেটির ভিজুয়াল মোটামুটি। এছাড়া সবকিছুই অসাধারণ। মিউজিকের ব্যবহার অতুলনীয়, আমার দেখা অন্যতম সেরা। চরিত্রগুলি একেকটি যেন বাস্তব জীবন থেকে উঠে এসেছে। ওদের হাসি-কান্নার মুহূর্তগুলি দর্শকের মনে সহজেই নানা অনুভূতির সঞ্চার করে। আর প্রধান চরিত্রের স্বগতোক্তিগুলি (monologue) খেয়াল করবেন, নিশ্চয়ই আপনার মনে দাগ কাটবে।
একেবারেই ছোট সাইজের জিনিস। দেখেই ফেলুন না। পস্তাবেন না।
আনিমে: Kemono no Souja Erin (The Beast Player Erin)
জানরা: ফ্যান্টাসি, স্লাইস অফ লাইফ, ড্রামা
এপিসোড সংখ্যা: ৫০
MAL লিঙ্ক: https://myanimelist.net/anime/5420/Kemono_no_Souja_Erin
গল্পটি হচ্ছে মূলত মধ্যযুগের আদলে নির্মিত এক ফ্যান্টাসি জগতে এরিন নামের একটি মেয়ের জীবনকাহিনী। জন্মের আগেই বাবাকে হারানো ছোট্ট এরিনের জীবনের শুরু হয় ওর মায়ের স্নেহে। ছোটকালে ও থাকত একটি গ্রামে, যেখানে সবাই তোউদা নামক এক প্রকার বিরাটকায় জীবের দেখভাল করে থাকে। তখন থেকেই অত্যন্ত কৌতূহলী ও বুদ্ধিমতী মেয়ে এরিন ওর মায়ের কাছ থেকে ওর জগত সম্পর্কে বহু শিক্ষা পায়। এরপর গল্প যত আগাতে থাকে, এরিনের জীবনে ততই নানা ঘাত-প্রতিঘাত আসতে থাকে। কিন্তু এরিন সকল বাধা অতিক্রম করে ওর অভীষ্ট লক্ষ্যে এগিয়ে চলে।
আনিমেটির যেই দিকটি সবচেয়ে মনকাড়া সেটি হলো এর ওয়ার্ল্ড বিল্ডিং। সময় নিয়ে, যত্নের সাথে এরিনের জগতের খুঁটিনাটি সবকিছু চোখের সামনে নিয়ে আসা হয়েছে। আনিমেটি দেখে সহজেই ঐ জগতের পরিবেশ, সংস্কৃতি, আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থা, মানুষের মনোভাব ও বিদ্যাবুদ্ধির পরিধি সম্পর্কে বুঝা যায়। আর তার সাথে রয়েছে খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা এক একটি চরিত্র। এরিন ও ওর সঙ্গীসাথীদের মনোভাব সহজেই বুঝা যায়, ওদের বাস্তব চরিত্রের মতই মনে হয়। চরিত্রগুলি বেশ কন্সিস্টেন্ট আচরণ প্রদর্শন করে থাকে। আর ওদের সুখ-দুঃখের মুহূর্তগুলি অনায়াসেই অন্তর দিয়ে অনুধাবন করা যায়।
আনিমেটির ভিজুয়াল আর এনিমেশন মোটামুটি ভাল। বেশ কিছু সুন্দর ওএসটি আছে। ওপেনিং আর এন্ডিং গানদুটি খুব ভাল। তবে সব কিছুকে ছাপিয়ে গেছে আনিমেটির ওয়ার্ল্ড বিল্ডিং, স্টোরিটেলিং, আর চরিত্রায়ন।
কিছুটা ধীরলয়ের গল্পে আপত্তি না থাকলে অবশ্যই অবশ্যই দেখবেন। আর এর সাথে একই লেখিকার “Seirei no Moribito” দেখবার প্রস্তাব রইল। এটি নিয়ে এক পূর্ববর্তী পর্বে লিখেছি।
মেইড ইন অ্যাবিস বের হয়েছিল সেই তিন বছর আগে, ২০১৭ সালে। দেখেছিলাম সেই বছরেই, তিন বছর পরে যখন এই সিকুয়েল মুভিটা দেখতে বসলাম তখন দেখা গেল এনিমের ভেতরকার অনেক তথ্যই ভুলে বসে আছি।
তবে এতদিন পরে সিরিজটার সংস্পর্শে যাওয়ার পরেও বুঝতে সমস্যা হয় নি তেমন। মুভিটাতে ফিফথ লেয়ারে পৌছানোর পর রিকো আর তার গ্যাংয়ের ফিফথ লেয়ারের sovereign ব্নড্রেডের সাথে কাহিনী দেখানো হয়েছে, যে জিনিসটাকে সিরিজের শেষ পর্বগুলাতে দারুণভাবে বিল্ডআপ করা হয়েছিল।
তো তিন বছর অপেক্ষার পর এই বিল্ডআপ বৃথা যায় নি। মুভিটা সিরিজের নান্দনিকতাকে ধরে রাখতে পেরেছে পুরোপুরি। অ্যানিমেশন খুবই ভাল ছিল, সিরিজে প্রথম দিকের লেয়ারগুলায় তাদের অ্যাডভেঞ্চার দেখানোতে সবুজের অনেক অস্তিত্ব ছিল। কিন্তু এই ফিফথ লেয়ার মারাত্মক কর্কশ একটা জায়গা, প্রাণের ছিটেফোঁটা সেখানে অল্পই আছে। তো পরিবেশ এভাবে বদলে যাওয়ার পরেও Kinema Citrus তাদের মুন্সিয়ানা ঠিকই দেখিয়েছে।
সাউন্ডট্র্যাক আগের মতই সেরা ছিল। কেভিন পেনকিনের জাদু আবার টের পাওয়া গেছে, শিল্ড হিরোতে জিনিসটা পাই নি তেমনভাবে। সিরিজের আগের ওএসটি Hanezeve কে আরো এপিকভাবে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছেন তিনি। আর যে মুহূর্তে ট্র্যাকটা বাজানো হয়েছে সেটার আর কথা আর নাই বললাম।
সবশেষে আসি কাহিনীতে। এখানে কিছু বললেই স্পয়লার হয়ে যাবে। তবে এটুকু আশ্বাস দিতে পারি দর্শকরা সিরিজ দেখে যে অনুভূতিগুলার ছোঁয়া পেয়েছিলেন সেই অনুভূতিগুলো মুভিটাও আপনাদের সরবরাহ করবে। MIA এর ট্রেডমার্ক কাহিনীর হুট করে ডার্ক টার্ন নেয়াটা এখানে একেবারেই শুরু থেকে আছে। রিকো-রেগু-নানাচিদের সাথে আপনিও হাসবেন আর কাঁদবেন মুভি দেখার সময়।
১০ এ সলিড ৮.৫ দিলাম মুভিটাকে ব্যক্তিগত জায়গা থেকে। ৯ দিতাম যদি কাহিনীটা আরেকটু কম প্রেডিক্টেবল হতো।
দারুণ ব্যাপার হলো ১০৪ মিনিটের এত দারুণ একটা সিকুয়েলের পরেও সিরিজটার সাসপেন্স একটুও কমে নি। অ্যাবিসের রহস্য যেন শেষ হওয়ার নয়, মুভি শেষ হওয়ার পর আপনার মনে প্রশ্নের সংখ্যা না কমে বরং বাড়বে। এত এত রহস্য রেখে যায় বলেই সিরিজটার জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করা স্বার্থক।
MAL লিঙ্ক: https://myanimelist.net/anime/31405/Joker_Game
সময়টা ১৯৩৭ সাল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ হব-হব। জাপানি সাম্রাজ্যের স্বার্থ রক্ষার্থে লেফটেন্যান্ট ইউকি নামক এক রহস্যময় ব্যক্তি নিজ উদ্যোগে D Agency নামক এক স্পাই ট্রেনিং প্রতিষ্ঠান খুলেছেন। তার আন্ডারে তিনি নিয়েছেন বহু কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ আটজনকে। প্রতিষ্ঠানটির অনন্য সাফল্যে ঈর্ষান্বিত হয়ে এক মিলিটারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা একজনকে পাঠান ডি এজেন্সির সাথে লিয়াজোঁ হিসেবে কাজ করতে। একই সাথে একটি “অসম্ভব” মিশনে ওদের নিয়োগ দেন। ঐ লিয়াজোঁ (নাম সাকুমা) স্পাইদের সম্পর্কে নিচু ধারণা পোষণ করে। কিন্তু ঐ মিশনে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়ে নিজের চোখে ওদের দক্ষতা বুঝতে পেরে সাকুমার ভুল ভাঙে। গল্পের শুরুটা এইভাবেই। তারপর একেকটি এপিসোডে ডি এজেন্সির ভিন্ন ভিন্ন সদস্যরা একেকটি গুপ্ত মিশনে অংশ নেয়।
আনিমেটির ভিজুয়াল খুবই দৃষ্টিনন্দন। ক্যারাক্টার ডিজাইনে আছে বাস্তবের ছোঁয়া। ওএসটির ব্যবহারও ঠিকঠাক। গল্পটিতে আপনি তৎকালীন জাপান ও বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির একটি স্পষ্ট খণ্ডচিত্র পাবেন। তার সাথে গুপ্তচরবৃত্তির টানটান উত্তেজনা তো থাকছেই।
আনিমেটির একটি ত্রুটি হলো প্লট প্রগ্রেসনের অভাব। ডি এজেন্সি আর ইউকি সম্পর্কে গল্পে বেশ একটি রহস্যময় আবহ তৈরি করা হয়েছে, কিন্তু যৎসামান্য তথ্যই উদঘাটিত হয়েছে। এই ব্যাপারে আপত্তি না থাকলে আনিমেটি অবশ্যই দেখার মত।
MAL লিঙ্ক: https://myanimelist.net/anime/160/Ima_Soko_ni_Iru_Boku
গল্পের নায়ক মাতসুতানি শুউ হাসিখুশি, প্রাণবন্ত, ও অত্যন্ত অপটিমিস্টিক একটি ছেলে। একদিন সে লালা রু নামের এক অদ্ভুত ও রহস্যময়ী মেয়ের দেখা পায়। এর কিছু পরেই এক তীব্র আলোর ঝলকানির সাথে শুউ নিজেকে আবিষ্কার করে লালা রু এর সাথে এক সম্পূর্ণ অচেনা জগতে। সে জানতে পারে যে সে পড়ে গিয়েছে এক পাষণ্ড একনায়ক রাজা হামদোর খপ্পরে, যে কিনা নিজের স্বার্থের জন্য লালা রুকে চায়। শুউ কী পারবে লালা রুকে বাঁচাতে? সে কী পারবে নিজের জগতে ফিরে যেতে?
গল্পের সেটিং অত একটা অসাধারণ না হলেও আনিমেটি অনেক দিক দিযেই অসাধারণ। এতে মানবমনের কুৎসিত দিক ও ভালো দিক দুটিই কঠোর বাস্তবতার মিশেলে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। যুদ্ধের ভয়াবহতা ও মানবমনে এর বিচিত্রমুখী প্রভাব ও সবশেষে ভায়োলেন্সের খারাপ পরিণতিগুলি চোখের সামনে চলে এসেছে কোনরকম রাখঢাক ও কৃত্রিমতা ছাড়াই। আনিমেটি বেশ ডিপ্রেসিং হলেও অবশ্যই দেখার মতো।
গল্পের চরিত্রগুলিকে অনেক যত্নের সাথে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে বিধায় ওদের আপন বোধ হয়। ওপেনিং আর এন্ডিং গানদুটি চমৎকার। ডিরেকশন ও ওএসটির জবাব নেই। ধীরলয়ে, যত্নের সাথে এক অত্যন্ত মানবিক গল্প বলেছে আনিমেটি।
ডিপ্রেসিং জিনিসে আপত্তি না থাকলে অবশ্যই অবশ্যই দেখবেন। এইরকম আনিমে পাওয়াই যায় না।
আনিমে: Eikoku Koi Monogatari Emma (Emma: A Victorian Romance)
জানরা: রোমান্স, হিস্টোরিকাল, স্লাইস অফ লাইফ, সেইনেন
এপিসোড সংখ্যা: ১২ + ১২
MAL লিঙ্ক: https://myanimelist.net/anime/345/Eikoku_Koi_Monogatari_Emma
লন্ডন, ১৮৯৬ সাল। এক অবসরপ্রাপ্ত বৃদ্ধা গভর্নেসের বাসায় মেইডের কাজ করছে এমা নামের এক তরুণী। মিতভাষী শান্ত সুন্দরী এমার পাণিপ্রার্থীর অভাব হয় না, কিন্তু সবাইকে সে কেন জানি মানা করে দেয়। গভর্নেসকে দেখা করতে একদিন এলো উনার যত্নে বড় হওয়া লন্ডনের এক উচ্চবিত্ত ঘরের ছেলে উইলিয়াম। এমাকে দেখেই তার ভালো লেগে গেল। ফুর্তিবাজ ও খোলামেলা উইলিয়ামকে এমারও বেশ ভালোই লাগলো। এরপর শুরু হলো মন দেওয়া-নেওয়ার পালা। কিন্তু সমাজের একেবারে দুই প্রান্তে থাকা জুটি কী পারবে এক হতে?
আনিমের পুরোটা জুড়ে একটা ধীরলয়, শান্ত সৌন্দর্য আছে। ওএসটি সুদিং, ওপেনিং ও এন্ডিং গানদুটিতে লিরিক্স নেই, কিন্তু বেশ প্রশান্তি আনে। আর্টস্টাইল সিমপ্লিস্টিক ও দেখতে ভালো লাগে। তৎকালীন ইউরোপের একটি বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে আনিমেটিতে। চরিত্রগুলি বেশ বাস্তবিক আচরণ করায় ওদের বেশ ভালো লেগে যায়, যোগস্থাপন করা যায় সহজেই। রোমান্টিক ডেভেলপমেন্টও বেশ বাস্তবসম্মত। তাই আমি রোমান্স জানরার বড় ভক্ত না হওয়া সত্ত্বেও এই আনিমেটি খুব উপভোগ করেছি।
বাস্তবতার ছোঁয়াসমৃদ্ধ ধীরলয়ের রোমান্টিক গল্পের সন্ধানে থাকলে এটি দেখবেন। মাঙ্গাটিও পড়তে পারেন। লেখিকা মরি কাওরু উনার আর্টের জন্য বিখ্যাত। ওনার Otoyomegatari মাঙ্গাটি পড়ে দেখার প্রস্তাব রইল।
MAL লিঙ্ক: https://myanimelist.net/anime/3702/Detroit_Metal_City
কলেজ গ্র্যাজুয়েট নেগিশি এক অতি সাধারণ শান্তশিষ্ট ছেলে। পড়াশুনার জন্য টোকিওতে আসা নেগিশির লক্ষ্য হল নিজের পায়ে দাঁড়ানো, আর বাপমায়ের মুখ উজ্বল করা। ওর আবার পপ মিউজিকের উপর খুব শখ। সে চায় নিজে গান গাইতে, আর নিজের ব্যান্ড খুলতে। কিন্তু আসল ঘটনা এত সহজ নয়। কারণ নেগিশি ঘটনাচক্রে এক ডেথ মেটাল ব্যান্ডের লীড ভোকালিস্ট হিসাবে যুক্ত হয়ে পড়ে! ডেথ মেটাল ব্যান্ডের অবস্থাও তথৈবচ – অদ্ভুত সব কস্টিউম পরে অত্যন্ত উচ্চস্বরে অশ্রাব্য লিরিক্সের গান চলে সারাক্ষণ। তাই বেচারা নেগিশির এখন দুই কূল সামলাতে হয়। বন্ধুবান্ধব আর তার love interest এর সামনে ভদ্র সাজতে হয়, আর স্টেজে উঠে ডেথ মেটাল গায়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হয়। কিন্তু বিধি বাদ সাধেন বারবার, আর হাস্যকর সব পরিস্থিতিতে পড়তে হয় তাকে।
মজাদার কিছু মুহূর্তের স্বাদ পেতে চাইলে এখনি শুরু করে দিন।
::::: বোনাস :::::
আনিমে: Dareka no Manazashi (Someone’s Gaze)
MAL লিঙ্ক: https://myanimelist.net/anime/17121/Dareka_no_Manazashi
মাত্র ছয় মিনিটের এই শর্টফিল্মটি মাকোতো শিনকাই নির্মিত। ফিল্মটিতে পাবেন বাপ-মেয়ের মাঝে হাসি-কান্না মিশ্রিত কিছু পারিবারিক মুহূর্ত। আর তার সাথে টিপিকাল শিনকাই স্টাইলের আলট্রা-রিয়ালিস্টিক ভিজুয়াল তো থাকছেই।
কন আর্ট – স্বপ্ন, বিভ্রম আর চলচ্চিত্রের প্রতি প্রেমপত্র: http://www.animeloversbd.com/satoshi-kon-fahim-bin-selim/]
তাইওয়ানিয় চলচ্চিত্র নির্মাতা এডওয়ার্ড ইয়াং-এর ২০০০ সালের চলচ্চিত্র Yi Yi-এর এক পর্যায়ে এর অন্যতম চরিত্র পাঙ্গজি বলে, “[…]we live three times as long since man invented movies.”
চিয়োকো ফুজিওয়ারা বেঁচে থাকলো এক সহস্রাব্দ – জীবন, স্মৃতি আর চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে – সেনগোকু কাল থেকে দূর ভবিষ্যৎ পর্যন্ত; যে সময়টায়, চন্দ্রমাসের চতুর্দশ দিন হোক আর পঞ্চদশ, চাঁদের পুরোটা জুড়েই মানুষের পদচারণা, আর অসীম মহাকাশের দিকে যাত্রা শুরুর জন্য তার উপর তৈরি পদ্মাকৃতির ঘাঁটি।
কোনো কোনো পদ্মফুল বেঁচে থাকতে পারে হাজার বছর। ঠিক যেমনটা জাপানিরা বিশ্বাস করে লালচাঁদি বা মাঞ্চুরিয়ান সারসের ক্ষেত্রে। তাই তো সারস নকশার কিমোনো জড়িয়ে জন্ম চিয়োকোর, ১৯২৩-এর বৃহৎ কান্টো ভূমিকম্পের সময়। ভূমিকম্পের সাথে জাপান আর চিয়োকোর যোগসূত্র চিরকালের। তার বাবার মৃত্যুও এসময়টায়। চিয়োকো বলে, একজনের জীবনের পরিবর্তে যেন আরেকজনের জন্ম।
চিয়োকোর তখনো বাইরের বিশ্বের সাথে সংযোগ হয়নি। ম্যাগাজিনের পাতায় নায়ক-নায়িকাদের ছবি দেখে অপার মুগ্ধতায় ডুবে থাকে। এই কৈশোরেই তার সাথে পরিচয় মুখে-ক্ষতওয়ালা একজন সেনার কিংবা একটি রাস্ট্রের, মাথায় টুপি-পড়া নাম-না-জানা একজন বিদ্রোহীর কিংবা একটি আদর্শের; আর প্রথম ভালোবাসার। তবে জাপান সাম্রাজ্যের কাছে তখন ভালোবাসার একমাত্র সংঙ্গা জাতীয়বাদ। আর তার একমাত্র লক্ষ্য সম্প্রসারণ। তারই প্রেক্ষিতে ১৯৩১-এ চীনের শাসনাধীন মাঞ্চুরিয়া দখল করে বসানো হলো মাঞ্চুকুয়ো পুতুল রাস্ট্র। শুরু হলো দ্বিতীয় চীন-জাপান যুদ্ধ। কোরীয় উপদ্বীপ আর দক্ষিণ মাঞ্চুরিয়ার রেল-এলাকা আগে থেকেই তাদের দখলে ছিলো। মাঞ্চুরিয়ার সাধারণ মানুষের উপর চালানো হলো নিপীড়ন; ভাগ্য ভালো থাকলে তাদের জোরপূর্বক শ্রমে কাজে লাগানো হবে, ভাগ্য খারাপ থাকলে হতে হবে জৈব-রাসায়নিক গবেষণার বস্তু। এখানেই বসানো হলো মাঞ্চুকুয়ো ফিল্ম এসোসিয়েশন, আর তার অধীনে নির্মিত হতে শুরু করলো সব প্রোপাগান্ডা চলচ্চিত্র। জাতীয়তাবাদের সুরায় তখনও নেশাগ্রস্থ সাধারণ জাপানিরা।
ভালোবাসার আশায় সেখানেই পদার্পণ চিয়োকোর। সময়ে সময়ে তার অভিনীত চলচ্চিত্র, স্মৃতিতে থাকা মাঞ্চুরিয়ার জীবন আর গেনিয়ার কাছে দেওয়া সাক্ষাৎকার – তিন স্তরের আখ্যান যেন একসাথে মিশে যায়। বিদ্রোহীর খোঁজে উত্তরের রেলযাত্রায় চিয়োকোর প্রথম দেখা মিলে প্রতিরোধশক্তির – দেশরক্ষায় ঝাঁপিয়ে পড়া চৈনিক সৈন্যদল। “জাতীয়তাবাদী নাকি সাম্যবাদী?” একজন যাত্রী জিজ্ঞেস করে। জীবনমরণের প্রশ্নে সেটায় কীইবা তফাত! দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে সময়। নানকিং, ওকিনাওয়া কিংবা হিরোশিমা-নাগাসাকি তখনো লাশের ভাগাড়ে পরিণত হয়নি।
সবশেষে পড়ে রইলো একটি বিধ্বস্ত বিশ্ব। আর একটি বিধ্বস্ত জাতি। সেই জাতির ফিরে আসার অবলম্বন হলো চলচ্চিত্র। গেনিয়ার স্বগোতক্তি,পঞ্চাশের দশক চিয়োকোর সেরা সময়। জাপানের চলচ্চিত্রেরও তো স্বর্ণযুগ এটাই। যুদ্ধপরবর্তী বাস্তবতায় একদল তরূণ আর মাঝবয়সী লোক নেমে পড়লো ক্যামেরা হাতে – কেঞ্জি মিযোগুচি, মাসাকি কোবায়াশি, আকিরা কুরোসাওয়া, মিকিও নারুসে, ইয়াসুজিরো ওযু – জাপানের বর্তমান আর অতীত সেলুলয়েডে তুলে ধরতে। তা যত তিক্তমধুরই হোক। একটি জাতির টিকে থাকার আশা-আকাঙ্খা, অনুভূতি আর অনুতাপের সাথে বহির্বিশ্বের পূনর্পরিচয় হলো কুরোসাওয়া আর কোবায়াশিদের প্রতিটি শট, প্রতিটি ফ্রেমে। আর এই নতুন জাপানি চলচ্চিত্রের মুখপাত্র হলো অদম্য কিছু নারী চরিত্র। চিয়োকো তো বেঁচে রইলো তাদের মাঝেই।
সঙ্গী হয়ে আকিরা কুরোসাওয়ার সাথে যাত্রায় প্রাচীন জাপানে। কখনো সে যেন ইসুযু ইয়ামাদা, তাকে তাড়িয়ে বেড়ায় এক প্রেতাত্মা। আর দেওয়ালের রক্তের ছোপ। প্রতিশোধ আর প্রতিহিংসার। সে অবলোকন করে অন্ধবিশ্বাস আর ঔদ্ধত্য, বিশ্বাসঘাতকতা আর পতন। কখনোবা মিসা উয়েহারার মত ঘোড়সওয়ার হয়ে তার খুঁজে বেড়ানো বিদ্রোহীর, আর পেছনে সবসময় লেগে থাকা মুখে-ক্ষতওয়ালা সেই ব্যক্তির; ভিন্ন বেশে, ভিন্ন সময়ে, সবসময়। সেনগোকু, এদো, মেইজি – প্রেতাত্মার অথবা সময়ের চরকার অনবরত ঘূর্ণন, আর বারবার ফিরে আসা একই জায়গায়। যুদ্ধ-বিগ্রহ, ক্ষমতালোভ, আর রক্তের ধারা। যুগে যুগে শান্তির এক নিরন্তর খোঁজ।
আকিরা কুরোসাওয়ার Throne of Blood
লেডি আসাজি চরিত্রে ইসুযু ইয়ামাদা; আকিরা কুরোসাওয়ার Throne of Blood
প্রিন্সেস ইউকি চরিত্রে মিসা উয়েহারা; আকিরা কুরোসাওয়ার The Hidden Fortress
মিকিও নারুসের দৃষ্টিপাত বরং নিকট অতীত আর বর্তমানে – যুদ্ধ-পূর্ববর্তী এক গ্রামীন স্কুল কিংবা যুদ্ধ-শেষে টোকিওর ধ্বংসস্তুপ। যুদ্ধের ভয়াবহতা যে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে দেশের ভিতরেও চলে এসেছিলো। আকাশে ভেসে বেড়ানো কালো মেঘের ভেতর থেকে বর্ষণ হলো গুলি-বোমা। তা বিদায় নিলে আবার হাজির দূর্ভিক্ষ, বাস্তুহরণ আর বেকারত্ব। আর নিজভূমে থেকেও পরাধীনতার স্বাদ পাওয়া প্রথমবারের মত। রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো আমেরিকান সেনারা জানান দেয় সেই নতুন বাস্তবতার। সে সময়টায় চিয়োকো মাথায় জড়ায় হিদেকো তাকামিনের স্কার্ফ। ভাঙ্গা কাঠ আর জঞ্জালের নিচে হাতড়ে ফিরে স্মৃতি আর স্বপ্ন। গলায় তখনো ঝুলতে থাকে সেই আরাধ্য চাবি।
ওইশি-সেনসেই চরিত্রে হিদেকো তাকামিনে; মিকিও নারুসের Twenty-four Eyes
ইউকিকো কোদা চরিত্রে হিদেকো তাকামিনে; মিকিও নারুসের Floating Clouds
কারণ তবুও তো জীবন থেমে থাকে না। ইয়াসুজিরো ওযু তাই আসন গাড়েন মেঝেতে, ক্যামেরা সাজান এমনভাবে যাতে ধরা পড়ে পুরো ঘর আর তাতে থাকা সব মানুষ। বাইরের সব কোলাহলমুক্ত, অন্তত ব্যক্তিগত এই জায়গা-ই তো শেষ সম্বল। অতীতকে পাশে রেখে সামনে এগিয়ে যাওয়ার মন্ত্রণা দেন। সেৎসুকো হারার হাসি জায়গা নেয় চিয়োকোর ঠোঁটে। নাকি তার পুরোটাই দখল করে নেয়! তাই কি ষাটের দশকের মাঝ থেকে দুজনেই হারিয়ে গেলো লোকচক্ষুর আড়ালে?
নোরিকো চরিত্রে সেৎসুকো হারা; ইয়াসুজিরো ওযুর Late Spring
সে-ও তো অনেক বছর আগের কথা। সবার স্মৃতিতেই কিছুটা মরচে পড়েছে। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে কীভাবে! চিয়োকো যে পান করেছে অমরত্বের সুধা। ফিল্মের ফিতা আর গেনিয়ার মুগ্ধতায় চিয়োকোর প্রতিটি সংলাপ আর অভিব্যক্তি টিকে আছে আগের মতই। তাই গেনিয়া হাজির হলো চাবি নিয়ে। ধুলোর আস্তরণ সরিয়ে খুলে বসলো বাক্সটা আবার। চিয়োকো, জাপান, সাতোশি কনের নিজের কিংবা আমাদের স্মৃতির। মুখে-ক্ষতওয়ালা লোকটা এখনো বিদ্যমান; নতুন চরিত্র নিয়ে, নতুন জায়গায় দখলদারিত্ব আর সাম্রাজ্যবিস্তারের সেই পুরনো নাটকের মঞ্চায়ন।
তাই চিয়োকো বাড়ির পশ্চাতে জন্মায় তার অতিপ্রিয় পদ্মফুল। কর্দমাক্ত মাটিতে শিকড় গেড়েও সেগুলো যখন পানির উপর ভেসে উঠে তখন থাকে শ্বেতশুভ্র। শত ঘাত-প্রতিঘাতের পরও আদর্শ থেকে বিচ্যুত না হওয়ার দর্শন নিয়ে প্রস্ফুটিত যেন: মানবসভ্যতার অন্ধরূপের সাথে সাক্ষাতের পরও তার উপর আশা না হারানোর প্রতিজ্ঞা, মাঝেমাঝেই সেই আশা দুরাশা বলে সাব্যস্ত হলেও; জীবন আর মৃত্যুর অনন্ত চক্রে বিদ্রোহীর খোঁজে সময় আর কাল পাড়ি দেওয়ার সংকল্প, তার চেহারা এখন বিস্মৃত হলেও। মাঞ্চুরিয়া কিংবা দূর মহাকাশে। শান্তির খোঁজে। ভালোবাসার খোঁজে। পথচলাটাই মুখ্য।
আর সেই পুনর্জন্ম কিংবা নির্বাণের যাত্রায় চলচ্চিত্রের চেয়ে ভালো মাধ্যম আর কী হতে পারে?
MAL লিঙ্ক: https://myanimelist.net/anime/388/Capeta
গল্পের মূল চরিত্র দশ বছর বয়সের মা-মরা ছেলে তাইরা কাপেতা। বাবাকে নিয়ে থাকা কাপেতা এই কচি বয়সেই টুকটাক ঘরের কাজ করে বাবাকে সাহায্য করে। ওর বাবা কন্সট্রাকশন ওয়ার্কার, দিনরাত কঠোর পরিশ্রম করায় কাপেতাকে খুব একটা সময় দিতে পারেন না। তাই তিনি চান ছেলেকে কিছু একটা উপহার দিয়ে ওর মুখে সত্যিকারের হাসি ফোটাতে। তো একদম পিচ্চি থাকতেই গাড়ি নিয়ে কাপেতার খুব আগ্রহ ছিল। তা লক্ষ্য করে ওর বাবা ওকে একটা পুরনো গো-কার্ট মেরামত করে মোটামুটি চালানোর উপযোগী করে উপহার দেন। সেটা পেয়ে কাপেতা অতি উৎসাহের সাথে চালানো শুরু করে। গল্পের শুরুটা এভাবেই, একদম রুট লেভেল থেকে। তারপরে কাপেতা ধীরে ধীরে প্রফেশনাল রেসিং ক্যারিয়ার গঠনে আরও বহুদূর এগিয়ে যায়। অবশেষে সে একজন রেসারের কাঙ্খিত স্বপ্ন – ফর্মুলা ওয়ান টুর্নামেন্ট পর্যন্ত যায়।
এই জানরার অন্যান্য কিছু রেসিং আনিমের থেকে আনিমে কাপেতাকে আলাদা রাখব এটার সিমপ্লিসিটির জন্য। এটা পূর্ণরূপে উপভোগ করতে আপনার গাড়ি সম্পর্কে অতটা জ্ঞান বা উৎসাহ না থাকলেও চলে। গল্পটি বেশ ইমোশনাল, কাপেতার সুখদুঃখের মুহূর্তগুলি আর ওর বেড়ে ওঠা দর্শকের মনে দাগ কাটে। আর একদম শুন্য থেকে একজন সফল রেসার হয়ে ওঠার ধাপগুলি এই আনিমেতে বেশ যত্নসহকারে দেখিয়েছে।
আনিমেটির ভিজুয়াল আর এনিমেশন মোটামুটি, রেসিং আনিমেগুলিতে এটাই কমন আসলে। তবে জমাটি গল্প আছে, দারুণ একটি রাইভালরি আছে, আর রেসিং-এর টানটান উত্তেজনা তো আছেই। তাই প্রথম কয়েকটি এপিসোড ট্রাই করেই দেখুন না।
জানরা: স্লাইস অফ লাইফ, ড্রামা, সেইনেন, হিস্টোরিকাল
এপিসোড সংখ্যা: ১১
MAL লিঙ্ক: https://myanimelist.net/anime/1589/Bartender
গল্পের কর্ণধার সাসাকুরা রিউ হলো জাপানের গিনজা শহরে অবস্থিত “ইডেন হল” বারের বারটেন্ডার। গল্পের প্রতিটি এপিসোডে ওর কাছে কাস্টোমার আসে। তবে তারা শুধুই মদ খেতে আসে না – তারা চায় একটু মানসিক শান্তি আর জীবনের নানা ঝুটঝামেলা থেকে মুক্তি। অসাধারণ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা, জ্ঞান, আর বিষয়বুদ্ধির অধিকারী রিউ প্রত্যেকবার ওর কাস্টোমারের মনের সুপ্ত ইচ্ছা বুঝতে পারে আর ওদের সমস্যার সমাধান দেয়। ব্যস, গল্প মোটামুটি এতটুকুই।
গল্পের প্রতি পর্বে বার ও বহুরকম ককটেলের ব্যাপারে নানা জিনিস জানানো হয়। আনিমেটার ভিজুয়াল খুব সিমপ্লিস্টিক হলেও ক্লাসিক ঘরানার ওএসটি আছে। ওপেনিং এন্ডিং গানগুলোও ভালো। প্রতি পর্বের শেষে লাইভ একশন পার্টে একজন বারটেন্ডার একটি ককটেল প্রস্তুত করেন।
একটি মনোমুগ্ধকর ও ধীরলয়ের বাস্তব শিক্ষামূলক আনিমের স্বাদ পেতে চাইলে এটি দেখতে পারেন। ভালো লাগলে মাঙ্গাটাও পড়ে দেখতে পারেন।