হোয়েন মারনি ওয়াস দেয়ার
জানরাঃ মিস্ট্রি, সাইকোলজিক্যাল
ডিউরেশনঃ ১ ঘণ্টা ৪৩ মিনিট
ম্যাল রেটিং: ৮.৪৫
ব্যক্তিগত রেটিং: ৯/১০
স্টুডিও জিব্লির প্রতিটি মুভিই অসাধারণ এবং অনেক জনপ্রিয়। বিখ্যাত ডিরেক্টর হায়াও মিয়াযাকির কল্যাণেই যে এটা সম্ভব হয়েছে তা সবার জানা কথা। কিন্তু এত সব ভালো ভালো মুভির মাঝে স্টুডিও জিব্লির বানানো আমার সবচেয়ে প্রিয় দুটি মুভিরই ডিরেক্টর ছিলেন অন্য কেউ। তাই এই মুভি দুটো নিয়ে আলোচনাও কম হয় এবং অনেকেই মুভি দুটো চিনে না। এর মাঝে একটি হল “হোয়েন মারনি ওয়াস দেয়ার”।
একদিকে হায়াও মিয়াযাকি ডিরেক্টর না অন্যদিকে স্টুডিও জিব্লি তখন অনেক চরাই-উতরাই পার হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই তাই আমার মুভিটা নিয়ে তেমন একটা প্রত্যাশা ছিল না। শুধু মুভির পোস্টারটা খুব পছন্দ হয়েছিল। অনেকটা হুট করেই দেখে ফেলি মুভিটি। দেখার সময় শুধু একটা কথাই মাথায় ঘুরছিল। কেন এই মুভিটা আরও আগে দেখলাম না!! যদি আরও পরে দেখতাম তো সারাজীবনের একটা আফসোস থেকে যেত।
কাহিনীটি আন্না নামের একটি মেয়ের হাত ধরে শুরু যে অ্যানাক্সাইটি অ্যাটাকে ভুগছে। স্কুলে কারো সাথে সে খুব একটা মিশতে পারে না। নিজের প্রতি তার প্রচণ্ড ঘৃণা। তাকে নিয়ে সবসময় দুশ্চিন্তায় থাকে তার মা। কিন্তু কষ্টের বিষয় আন্না একজন দত্তক নেয়া সন্তান। তাই মায়ের এই দুশ্চিন্তা, মমতা কিংবা ভালবাসার বহিঃপ্রকাশ সবই যেন আন্নার কাছে অর্থহীন ও মিথ্যার বেড়াজালে লুকানো অভিনয় বলে মনে হয়। চুপচাপ, মনমরা আন্নাকে তাই ডাক্তারের পরামর্শে তার মা গ্রামে এক আত্মীয়ের বাসায় পাঠিয়ে দেন গ্রীষ্মের ছুটি কাটাতে। সেখানে গিয়েও সে বিমর্ষ ছিল। না, গ্রামের কোন মানুষের সাথে মিশে সে তার আগের উৎফুল্ল জীবনে ফিরে যায়নি। বরং কিছু ঝামেলাই বাধিয়ে ফেলে। কিন্তু আন্নার জীবন এবং কাহিনী পাল্টে দেয় অন্যকিছু। নিশ্চুপ আর শান্ত সাগরের পাড়ে বসে ছবি আঁকতে গিয়ে আন্না আবিষ্কার করে সাগরের ওপারে রয়েছে এক সুন্দর বাড়ি। বাড়িটি এখন পরিত্যক্ত। কিন্তু শুধু একটি ঘরের জানালায় আলো দেখা যায়। আন্না কল্পনায় বা ঘুমের মাঝে সেই জানালার পাশে একটি সোনালি চুলের মেয়েকে দেখতে পায়। কেমন যেন এক অচেনা অনুভুতি তাকে টানে। এই রহস্যময় বাড়ির এক মেয়ে মারনির সাথে আন্নার বন্ধুত্ব হয়। কিন্তু মারনির পরিচয়ও অনেক রহস্যময়।
কেউ যদি এ পর্যন্ত পড়ে ভেবে থাকেন এটা আমেরিকান কোন ভূতের গল্প তাহলে বড় ভুল করবেন। জানরায় যেমনটা বলা হয়েছে, আনিমেটা সাইকলজিক্যাল। সাথে কিছুটা ফ্যান্টাসি বা সুপারন্যাচারালের মিশেল। আমেরিকান ভূতের গল্প না হলেও গল্পটি ব্রিটিশ লেখক জোয়ান জি. রবিনসনের একই নামের উপন্যাস থেকে নেওয়া। তাই আগেকার আমলের ইংরেজি সংস্কৃতির স্বাদ পাবেন বেশ ভালোই। যারা পুরাতন ইংরেজি গল্প, উপন্যাস বা তখনকার আমলের জীবনাচরণ পছন্দ করেন তাদের মুভিটি ভালো লাগবে বলে আমার ধারণা।
মুভিটি পুরোটা দেখে কাহিনী বুঝার পর ভালো লাগাটাই স্বাভাবিক কিন্তু আমার একবারে শুরু থেকেই কাহিনীর ভিতরে না ঢুকতেই অনেক ভালো লাগতে শুরু করেছিল। আমার আবার “ভিজুয়ালি প্লিজিং” আনিমে পেলে আর কিছু লাগে না। মুভিটির অ্যানিমেশন অসম্ভব সুন্দর। দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। নিরিবিলি গ্রাম, শান্ত প্রকৃতি, পাখির কলকাকলি, সবুজ পাহাড়, তুলোর মত মেঘ আর নীলাকাশ, বালুচর, সাগরের ঢেউ পাড়ে আছড়ে পড়া, সাগরে নৌকা ভাসানো, বিরাট ম্যানশন, পূর্ণিমা রাত কিংবা বৃষ্টি, সোনালি চুলের গাউন পড়া একটি মেয়ে… দৃশ্যগুলো আপনাকে সম্মোহিত করে রাখবে। ছোটবেলায় পড়া রূপকথার বইয়ের ছবিগুলোর মত। সাথে তো বাকগ্রাউন্ড মিউজিক আছেই। আর আন্নার অ্যাডভেঞ্চার গল্পের মাঝে ঢুকিয়ে নিবে। যদিও আমি ধীর গতির দৈনন্দিন জীবনের কাহিনী নিয়ে আনিমে দেখে অভ্যস্ত তারপরেও আমার কাছে কেন জানি শুরুতে গল্পটা বেশ ধীর গতির লাগছিল। কেননা শুরুর আধ ঘণ্টায়ও মুভিটি মূল গল্পে প্রবেশ করে না। অনেক সময় নিয়ে ধীরেসুস্থে আগায়। যারা ধুমধাড়াক্কা মারামারি বা শুধু মাত্র একটা নির্দিষ্ট গল্পের জন্যই আনিমে দেখেন তাদের একটু অধৈর্য লাগার সম্ভবনা আছে শুরুতে। কিন্তু পরে গিয়ে গল্পে বেশ উত্তেজনা আসে। তাই একটু ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করলে উপভোগ করতে পারবেন। আর সমাপ্তিটা বেশ হৃদয়গ্রাহী। এখানে একই সাথে দুটি মেয়ের জীবনের গল্প তুলে ধরা হয়েছে। শেষের দিকে কিছু চমক অপেক্ষা করছে।
মুভিটির একই সাথে যত ভালো দিক রয়েছে তাতে এর আরও বেশি নামডাক বা জনপ্রিয়তা পাওয়া উচিত ছিল। তাই লেখাটি পড়ে যদি আপনার রুচির সাথে মিলে যায় তবে অবশ্যই দেখতে ভুলবেন না “হোয়েন মারনি ওয়াস দেয়ার” বা “ওমোইদে নো মারনি”।
লেজেন্ড অফ দ্য গ্যালাক্টিক হিরোস/গিঙ্গা এইয়্যু দেনসেতসু(১৯৮৮-১৯৯৭)
Legend of the Galactic Heroes/Ginga Eiyuu Densetsu(1988-1997)
জনরাঃ স্পেস অপেরা, সাই-ফাই, ড্রামা, রোমান্স, মিলিটারী
প্রযোজকঃ আর্টল্যান্ড
মূলঃ ইয়োশিকি তানাকা
পরিচালকঃ নোবুরো ইশিগুরো (স্পেস ব্যাটলশীপ ইয়ামাতো(১৯৭৪))
সেন্সরঃ ভায়োলেন্স মাঝে মাঝে নৃশংস, খুব কম হলেও ন্যুডিটি আছে
মাইঅ্যানিমেলিস্ট রেটিংঃ ৯.০৬(#৮)
বাংলাদেশী এবং নিয়মিত অ্যানিমে দেখাটা গত ৪-৫ বছর থেকে শুরু হলে হয়তো বড় একটা সময় ধরে এই অ্যানিমে সাথে পরিচিতও ছিলেন না। তারপর একদিন মাইঅ্যানিমেলিস্ট-এর “টপ অ্যানিমে” পেজ এ গেলেন। “ফুলমেটাল…হুম, স্টাইন্স;গেট…আচ্ছা, গিন্তামা…হুম, ক্লানাড…, কোড গিয়াস…গি-গিঙ্গা-এ-এই-ইয়া…কী!!?”
নয় বছর, চার সিজন আর ১১০ পর্ব। মাইঅ্যানিমেলিস্ট-এ এত রেটিং, আইএমডিবিতে এত রেটিং(৮.৯)। তবুও এই অ্যানিমে (বাংলাদেশ/বর্তমান অ্যানিমে ফ্যানদের কাছে) এতো কম জনপ্রিয় হওয়ার কারণ কী? অনেক পুরান বলে?
“In every time, in every place, the deeds of men remain the same”
৩৫ শতাব্দী।
স্পেস ক্যালেন্ডার ৭৯৬। ৭৯৬ বছর হয়েছে মানুষ পৃথিবী ত্যাগ করেছে।
প্রায় আট শতাব্দী আগে পৃথিবী ত্যাগ করা মানুষ যে একত্রে সুখে-শান্তিতে বাস করছে তা কিন্তু না। ছায়াপথে ছড়ানো নক্ষত্রগুলোর শ’ শ’ গ্রহে তারা ছড়ানো, আর ভাবাদর্শ দিয়ে দুভাবে বিভক্ত। একদিকে যেমন “ওডিন” গ্রহকে কেন্দ্র করে একনায়কতন্ত্র আর আভিজাত্যের আদলে রাজা আর প্রজার ষ্পষ্ট বিভেদ থাকা “ইম্পেরিয়াল” সাম্রাজ্য। আরেকদিকে শত শত আলোকবর্ষ দূরে তেমন “হাইনেসেনপোলিস”-এ টিকে আছে “ফ্রি প্লানেটস অ্যালায়েন্স” সরকার আর তার জনগণ, সাম্যবাদের ঝান্ডা উড়িয়ে, গনতন্ত্রের ধারক ও বাহক হিসেবে।
আর দেড় শতাব্দী ধরে এই দুই মতবাদের যুদ্ধ চলে আসছে, মহাকাশে। দখলের লড়াই। গনতন্ত্র, না একনায়কতন্ত্র? কোনটা বেছে নিবেন আপনি? সমান অধিকার নাকি প্রজাত্ব? গণতন্ত্র অবশ্যই? আসলেই কী ব্যাপারটা এতো সহজ?
স্পেস ক্যালেন্ডার ৭৯৬। ইম্পেরিয়াল ক্যালেন্ডার ৪৮৭।
ব্যাটল অফ আসতার্তে-তে মুখোমুখি হল ইম্পেরিয়াল আর অ্যালায়েন্স সৈন্যদল।
ইম্পেরিয়াল সৈন্যদের নেতৃত্বে এক যুবক ফ্লিট কমান্ডার; সবকিছু হারানো, প্রতিশোধস্পৃহা যার জ্বালানী আর অনন্যসাধারন নেতৃত্ব যার অস্ত্র – রাইনহার্ড ভন মুসেল। প্রথমবারের মত দেখালো তার ঝলক।
অ্যালায়েন্স এর সৈন্যদের নেতা না হয়েও এই ব্যাটল অফ আসতার্তে-তে প্রথম প্রচারের আলোয় আসলো প্রায় ত্রিশ ছোঁয়া এক অ্যাডমিরাল; মিলিটারিতে যোগ দেওয়ার ইচ্ছা যার কখনোই ছিলো না, বরং ইতিহাসবেত্তা হওয়ার স্বপ্নদেখা, “মিরাকল ইয়াং” – ইয়াং ওয়েনলী।
তারা একে অপরের সরাসরি মুখোমুখি হল না। কিন্তু এই ব্যাটল অফ আসতার্তে-তে প্রথম বয়ে গেল এক পরিবর্তনের বাতাস। ঝড়ের পূর্ভাভাস নিয়ে।
আর এখান থেকেই তাদের গল্পের শুরু, সমান্তরালে।
তাদের দৈরত্ব্যের গল্প।
তাদের উত্থানের গল্প।
তাদের পতনের গল্প।
তাদের পুনোরুত্থানের গল্প।
রাইনহার্ড আর ওয়েনলী – এই দুই মহাকাশীয় নায়কের কিংবদন্তী।
ইয়োশিকি তানাকার লেখা উপন্যাস সিরিজের গল্প অবলম্বনে বের হওয়া লেজেন্ড অফ দ্য গ্যালাক্টিক হিরোস এর মূল গল্প হল ১১০ পর্বের ওভিএ (আর ডালাপালা ছড়ানো সাইডস্টোরি, প্রিকুয়াল নিয়ে আরো একটা ৫২ পর্বের সিরিজ আর ৫-৬টা মুভি, দেখা আবশ্যকীয় না)। যার চার সিজন, যথাক্রমে ২৬, ২৮, ৩২ ও ২৪ পর্বের এবং যা প্রচারিত হয়েছে যথাক্রমে ১৯৮৮-৮৯, ১৯৯১-৯২, ১৯৯৪-৯৫ ও ১৯৯৬-৯৭ সালে।
প্রতি দুই বছরে গড়ে মাত্র ২৮ পর্ব। লেজেন্ড অফ দ্য গ্যালাক্টিক হিরোসের অ্যানিমেশন তো বেশ উচ্চমানেরই আশা করা যায়, না? এদিকেই আপনি প্রথম আশাহত হবেন। ‘৮০-এর শেষ কিংবা ‘৯০-দশকের অন্যান্য সেরা অ্যানিমের সাথে তুলনা করলে লেজেন্ড অফ দ্য গ্যালাক্টিক হিরোস-এর অ্যানিমেশন পিছিয়েই থাকবে। যদিও প্রতি সিজনে ক্রমশ উন্নতি হয়েছে, কিন্তু শুধু আধুনিক অ্যানিমেশনের ভক্ত হলে তা আপনার তৃষ্ণা মেটানোর জন্য হয়তো যথেষ্ট না।
সাই-ফাই স্টোরি – রোবট, অটোমেটিক অস্ত্র, স্পেসশীপের অসাধারন অ্যাকশন সীন? আপনি তাও পাবেন না। স্পেসশীপ গুলো খুব সাধারন, যুদ্ধের দৃশ্যগুলো অধিকাংশ সময়ই শূধু মনিটর স্ক্রিনের কিছু ত্রিভুজ আর চতুর্ভুজের “ফর্মেশন”-এই সীমাবদ্ধ।
হার্ড সাই-ফাই হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা জন্য যদি আপনি বৈজ্ঞানিক যুক্তির আতশ-কাঁচের নিচে রাখেন তবুও হতাশ হবেন।
পেসিং? প্রতিটি সিজনই একটি ক্লোজার দিয়ে শেষ হয়, তাই প্রতিটি সিজনের প্রথম পর্বগুলো বেশ ধীর। বিশেষ করে প্রথম সিজনের গল্প ভালোভাবে শুরু হতে, লেজেন্ড অফ দ্য গ্যালাক্টিক হিরোস এর ইউনিভার্স সম্পর্কে ভালোভাবে ধারণা পেতে আপনাকে পার করতে হবে প্রায় ১৩-১৪ টি পর্ব।
লেজেন্ড অফ দ্য গ্যালাক্টিক হিরোস এর পরিচালনাতেও বিশেষ কিছু পাবেন না, অন্তত অন্যান্য “সেরাদের সেরা” অ্যানিমের তুলনায়। অ্যানিমেটোগ্রাফি খুবই সাধারন, মাঝে মাঝে একঘেঁয়ে। পর্বে পর্বে ক্লিফহ্যাঙ্গার নেই, নেই হঠাৎ কোন টুইস্টও। এর গল্পের বাঁক আপনি খুব সহজেই আঁচ করতে পারবেন এবং বেশ আগে থেকেই। অন্যান্য “সেরাদের সেরা” অ্যানিমের তুলনায় এর “মাইনাস পয়েন্ট”-এর সংখ্যা অনেক বেশি।
কিন্তু অন্যান্য যেকোন অ্যানিমের তুলনায়, “যেকোন” অ্যানিমের তুলনায় লেজেন্ড অফ দ্য গ্যালাক্টিক হিরোস এর “প্লাস পয়েন্ট” ও অনেক অনেক বেশি।
এর সবচেয়ে সেরা দিক? এর সংলাপ আর সংগীত। স্পেস অপেরার থেকে যা আশা করা করবেন, ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ, নাটুকে আর দার্শনিক।
কিন্তু লেজেন্ড অফ দ্য গ্যালাক্টিক হিরোস শুধু এখানেই সীমাবদ্ধ না। এই অ্যানিমে আপনাকে যেমন ভাবাবে, তেমন দিবে নির্মল বিনোদনও। সেন্স অফ হিউমার অসাধারন। বাস্তবিক আর সহজাত। অন্যান্য বর্তমান বেশিরভাগ অ্যানিমের মতই জোর করে হাসানোর (অপ)চেষ্টা না।
আবহ সংগীত মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখার মত। মোজার্ট, বেটোফেন, বাখদের ধ্রুপদী যন্ত্রসংগীত যুদ্ধের দৃশ্যগুলোর প্রাণসঞ্চারক।
আর এর আর্ট গুমোট, মধ্যযুগীয় পেইন্টিং এর মত। অ্যানিমেটার “আভিজাত্য”-এর প্রতিকও কি না?
এর সবচেয়ে সেরা দিক? এর চরিত্র। ১১০ পর্বের যেকোন অ্যানিমেতে সর্বোচ্চ কয়জন চরিত্র থাকতে পারে? লেজেন্ড অফ দ্য গ্যালাক্টিক হিরোস এর শুধু গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের সংখ্যাই প্রায় অর্ধশতাধিক। এবং তারা আপনার দেখা, বর্তমান, অতীতের আর সব মানুষের মতই বাস্তব আর ত্রুটিযুক্ত। কোড গিয়াসের মত ওয়ান-ম্যান-শো ও না, ডেথনোটেরর মত টু-ম্যান-শো ও না। হ্যাঁ, রাইনহার্ডের অসাধারণ নেতৃত্ব গুণ আপনাকে মুগ্ধ করতে পারে, আপনি অভিভূত হতে পারেন ওয়েনলী বুদ্ধিদীপ্ত রনকৌশল দেখে। রাইনহার্ড আর ওয়েনলী প্রধান হলেও গল্পে ইউলিয়ান, কিরকিয়াইস, গ্রীনহিল, রয়েন্টাল আর মিত্তারমায়ারদের অবদান আর প্রভাবও প্রবল। সিরিজের প্রথমে পার্শ্বচরিত্র মনে হওয়ারাও পরে বড় কিছুর অংশে জড়িয়ে যাবে। আমাদের নায়কদের পরিবর্তন আসবে, শারীরিকভাবে, মানসিকভাবে, ছয়টি বসন্তব্যাপী, বদল আসবে অন্যান্য চরিত্রদেরও। সিরিজের মাঝখানে যখন কেউ চার-পাঁচ বছর আগের কোন ঘটনার কথা উল্লেখ করবে তখন তা ফ্ল্যাশব্যাক না, আসলেই চার-বছর আগের ঘটা। আপনি তা দেখে এসেছেন, আপনি তার অংশ ছিলেন।
এটা শুধু এই দুজনের ভাবাদর্শগত পার্থক্যের যুদ্ধেরও গল্প না, সমগ্র মানব্জাতিরই যুগ যুগ ধরে চলে আসা যুদ্ধ-বিগ্রহের গল্প। আপনি এই গল্প দেখবেন রাজাদের চোখ থেকে, সরকারের উচ্চতর কর্মকর্তাদের চোখ থেকে, সৈন্যদের চোখ থেকে, সাধারণ মানুষের চোখ থেকে, কু আর অপসংষ্কারে আটকে থাকা গোঁড়াদের চোখ থেকেও। লেজেন্ড অফ দ্য গ্যালাক্টিক হিরোস পক্ষপাতবিহীন, মানবিক গল্প।
এর সবচেয়ে সেরা দিক? এর গল্প। যখন বলব অ্যানিমে মাধ্যমেরই সর্বসেরা গল্প, তখন হয়তো বিশ্বাস করতে কষ্ট হবে। মনস্টার, ফুলমেটাল ব্রাদারহুডরা এর থেকে ভালো “অ্যানিমে” হতে পারে, কিন্তু লেজেন্ড অফ দ্য গ্যালাক্টিক হিরোস এর গল্পের কাছে তারা হার মানবে। না এটাতে কোন মাথা ঘুরিয়ে দেওয়া কোন কনসেপ্ট নেই, প্রচন্ড প্যাঁচ লাগা কোন রহস্যও নেই – লেজেন্ড অফ দ্য গ্যালাক্টিক হিরোস বাস্তব আর সাধারন। সম্ভবত যুদ্ধ আর রাজনীতি নিয়ে টিভিতেই প্রচারিত হওয়া সবচেয়ে বাস্তব এবং সাধারন ফিকশনাল শো। গণতন্ত্র, একনায়কতন্ত্র, অভিজাততন্ত্র, নির্বাচন, সরকার, দূর্নীতি, ধর্মব্যবসা, টেরোরিজম, অভ্যুত্থান, আন্দোলন, গৃহযুদ্ধ, ষড়যন্ত্র – লেজেন্ড অফ দ্য গ্যালাক্টিক হিরোস হল সমাজ বই। রাজনীতি/অপরাজনীতির এত ভালো শিক্ষক আর পাবেন না। ইতিহাস আর যুদ্ধ? এতে মানুষ মারা যাবে, অগণিত; সম্ভবত যেকোন অ্যানিমের মধ্যে সংখ্যাটা সবচেয়ে বেশি। যুদ্ধে মারা যাবে, আত্নহত্যায় মারা যাবে, দূর্ঘটনায় মারা যাবে, টেরোরিজমে মারা যাবে, গণহত্যায় মারা যাবে, গুপ্তহত্যায় মারা যাবে।
“Heroes do not neccessarily die heroic deaths” – এই চরম সত্যটাও খুব ভালোভাবে বুঝিয়ে দিয়ে যাবে।
আগেই যেটা বলেছি পর্বে পর্বে ক্লিফহ্যাঙ্গার নেই, টুইস্টও। সময়ে সময়ে বুদ্ধিরখেলাটা শুধু দ্বিমুখীই না – ত্রিমুখী, চতুর্মুখী এমনকি পঞ্চমুখীও। কিন্তু তবুও গল্পের বাঁক আপনি খুব সহজেই আঁচ করতে পারবেন এবং বেশ আগে থেকেই। আর এখানেই এর অসাধারণ গল্পের মহাত্ব্য, আপনি অনিবার্যের অপেক্ষা করবেন্ অসহায়ভাবে। লেজেন্ড অফ দ্য গ্যালাক্টিক হিরোস একই সাথে “সাহসী” গল্পও।
এসব কিছুর পরও এই অ্যানিমেটা একটা নির্দির্ষ্ট দর্শকের কাছেই সীমাবদ্ধ কেন? কারণ লেজেন্ড অফ দ্য গ্যালাক্টিক হিরোস হল আমার দেখা সবচেয়ে “ম্যাচুর” অ্যানিমে। রাজনীতি, ইতিহাস আর যুদ্ধবিগ্রহ, যাতে আবার ভালো কোন অ্যাকশন নেই, নায়কদের অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা নেই – তা বেশির ভাগ মানুষের কাপেরই চা না। সংলাপ নির্ভর, কাহিনী নির্ভর, চরিত্র নির্ভর অ্যানিমের ভক্ত না হলে আপনাকে এই অ্যানিমে ১১০ পর্ব ধরে আকর্ষন করতে পারবে না।
কিন্তু আপনি যদি ভালো কিছু দেখতে চান, আসলেই খুব ভালো কিছু দেখতে চান, তাহলে প্রস্তুত হোন। এখন বেশ সস্তা হয়ে যাওয়া “এপিক” শব্দটার আদি ও অকৃত্রিমতার জন্য। ১১০ পর্ব আর ৬ বছর আর পুরো মহাকাশ জুড়ে চলা বিশাআআআআআল এক কাহিনীর জন্য। “কাইজার” রাইনহার্ড আর “মিরাকল” ইয়াং – ছায়াপথের ইতিহাস চিরদিনের জন্য বদলে দেওয়া এই দুই নায়কের ধ্রুপদী, অভিজাত আর মহাকাব্যিক এই কিংবদন্তীর জন্য। অ্যানিমের ইতিহাসের সর্বকালের সর্বসেরা গল্প আপনার জন্য প্রস্তুত।
প্রত্যেকটা এনিমে একটা ম্যাসেজ দিয়ে থাকে, ডেথ প্যারেড এর ম্যাসেজটা হবে দাত থাকতে দাতের মর্যাদা বোঝা। অর্থাৎ জীবনের মর্ম বোঝা। হতাশা মানুষের জীবনের অনেক কাছের একটা সঙ্গী এটা মানুষকে এমন এমন সব কাজ করতে বাধ্য করে যার ফল মৃত্যুর পর ও ফল ভোগ করতে হয়।
বর্তমান সময়ের মানুষের জিবনে হতাশার মাত্রা অনেক বেড়ে গিয়েছে বিভিন্ন কারনে এবং এই এনিমেটা আমাদের অনেককে অনেকাংশেই উপকার করবে মানষিক দিক থেকে। এনিমের মনস্তাত্ত্বিক দিকগুলো আলোচনা এটা বলতেই হয়।
এবার এনিমের মুল দুটো ক্যারেক্টার কথা বলিঃ চিউকি একটা অসম্ভব সুন্দরি একজন গুনবতী মেয়ে। এবং ডেকিম একজন দক্ষ বিচারক যার আচরন, তার সাথে তার চেহারার ধরন ও এক্সপ্রেশন সবি একটি দক্ষ বিচারকের মতই, সবুজ রঙের চোখ যার অসীম গভিরতা ও সাদা চুল- কিন্তু সে মানুষ না একটা পুতুল যার কাজ মানুষর বিচার করা তবে সে মানুষের অনুভুতি সম্বলিত।
এনিমের মুল পটভুমি হল মৃতদের বিচার করা তাদের পৃথিবীর কর্মের উপর ভিত্তি করে। এবং এই বিচারকদের একজন হল ডেকিম যার বিচারের ধরন চিউকির সাথে দেখা হওয়ার পর বিশেষ ভাবে প্রভাবিত হতে থাকে।………… প্রথম পর্বটাই একজনেকে এনিমটা দেখতে আগ্রহি করতে যথেষ্ট।
কিভাবে ডেকিম প্রভাবিত হল জানার জন্য এনিমটা দেখা শুরু করে দিন জলদি জলদি।
[মানুষকে কখনই একটা ঘটনার ভিত্তিতে জাজ করা উচিত না কারন কোন নিদৃষ্ট পরিস্থিতিতে মানুষ ভিন্ন রকম আচরন করে থাকে]
আনোহানা
জানরা : স্লাইস অফ লাইফ, সুপারন্যাচারাল, ড্রামা, ট্রাজেডি
পর্ব: ১১+ ১ টা মুভি
বয়স রেটিং: ১৩+
ব্যক্তিগত স্কোর: ৯/১০
কত জানরা, কত কি কিছু নিয়েই তো অ্যানিমে তৈরি হয়। একটা খুব সাধারণ বিষয় হিসেবে অনেক অ্যানিমেতেই বন্ধুত্বকে তুলে ধরা হয়েছে। তবে কেউ যদি কোন অ্যানিমে দেখতে চায় যেটা শুধুমাত্রই বন্ধুত্বকে উৎসর্গ করে তৈরি করা তাহলে তার জন্যে আনোহানা একটি আদর্শ অ্যানিমে। পুরো নাম “আনো হি মিতা হানা নো নামায়ে য়ো বকুতাচি ওয়া মাদা শিরানাই”। অনেক বিশাল নাম তাই না?! ইংরেজিতে নাম “উই স্টিল ডোন্ট নো দ্যা নেম অফ দ্যা ফ্লাওয়ার উই সও দ্যাট ডে”। সংক্ষেপে “আনোহানা: দ্যা ফ্লাওয়ার উই সও দ্যাট ডে।“
কাহিনীটি গড়ে উঠেছে ছয়জন ছোটবেলার বন্ধুকে ঘিরে। জিনতা ইয়াদোমি (জিনতান), মেইকো হোনমা (মেনমা), নারুকো আনজোও (আনারু), আৎসুমু মাৎসুয়ুকি (য়ুকিইয়াতসু), চিরিকো সুরুমি (সুরুকো), তেৎসুদো হিসাকাওয়া (পোপ্পো); এই ছয়জনের একটা দল ছিল যার নাম সুপার পিস বাসটারস্। বনের মত এক জায়গায় রয়েছে তাদের গোপন আস্তানা যেখানে ছোটবেলায় হাসি-আনন্দ, হইহুল্লোর, ছুটে বেড়ানো আর খেলায় কাটত তাদের দিনগুলো। কিন্তু সেই সুখের দিনগুলো হারিয়ে যায় যখন মেনমা এক দুর্ঘটনায় পানিতে পড়ে মারা যায়। তাদের বন্ধুত্বে ফাটল ধরে। ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠে হাই স্কুল পড়ুয়া ছেলেমেয়েগুলো পরস্পর থেকে আলাদা হয়ে যায়। ইয়ুকিয়াতসু আর সুরুকো চলে যায় এক স্কুলে। পোপ্পো স্কুল ছেড়ে দিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেরায় এবং পার্ট-টাইম জব করে টাকা আয় করে। আনারু আর জিন্তানও পড়ে একই হাই স্কুলে। কিন্তু জিন্তান মেন্মার মৃত্যুতে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। স্কুলে, মানুষের মাঝে না গিয়ে নিজেকে ঘরের মাঝে বন্দী রাখতেই সে বেশি সাছন্দ্য বোধ করে। সেই জিন্তানের সামনে এক গ্রীষ্মে হাজির হয় মেন্মা। জিন্তান ব্যাপারটিকে তার মানসিক চাপ থেকে তৈরি নিছক কল্পনা হিসেবে ধরে নেয়। কিন্তু জিন্তান বুঝতে পারে মেন্মা তার কল্পনা থেকে সৃষ্টি কেউ নয়। সে আসলেই তার সামনে এসেছে একটি অনুরোধ নিয়ে। মেন্মা জানায় সে একটি অপূর্ণ ইচ্ছে নিয়ে মারা গিয়েছিল। যেটার কারণে তার আত্মা স্বর্গে প্রবেশ করতে পারছে না। মেন্মার আত্মা পৃথিবী থেকে চলে যেতে পারবে যদি তার সেই ইচ্ছে পূরণ হয়। কিন্তু কি সেই ইচ্ছে? মেন্মা সেটাই মনে করতে পারে না। সে জিন্তানকে অনুরোধ করে তার সেই ইচ্ছে পূরণ করে দেয়ার জন্যে। তবে তাতে অবশ্যই লাগবে তাদের সেই ছোটবেলার বন্ধুদের সাহায্য।
কি করবে জিন্তান? খুঁজে কি পাবে বিছিন্ন হয়ে যাওয়া বন্ধুদের? যাদের সাথে এত দূরত্ব তৈরি হয়েছে পারবে কি তাদের মাঝের দূরত্ব আবার কমিয়ে ফেলতে? ফিরে পাবে সেই হারানো দিনগুলো? জোড়া লাগবে কি তাদের বন্ধুত্ব? মেন্মা কি স্বর্গে যেতে পারবে? উত্তরগুলো জানা নেই জিন্তানের…
অ্যানিমেটিতে বন্ধুদের মাঝের মান-অভিমান, বিরোধ, কিছু চাওয়া-পাওয়ার জন্যে স্বার্থপর আচরন, অপরাধ বোধ, ভালবাসার মানুষকে না পাওয়ার বেদনা, ছোট থেকে বড় হয়ে উঠে মানসিকতার পরিবর্তন, জীবনে কাছের মানুষের মৃত্যুর প্রভাব ইত্যাদি বিষয়গুলো খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। গল্পের অগ্রগতির সাথে সাথে প্রতিটা প্রধান চরিত্রই বিকশিত হয়েছে। আর এই সিরিজটি নিয়ে কথা বলতে গেলে এর এন্ডিং সং “সিক্রেট বেস” বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অসম্ভব সুন্দর এই গানটি। গানটির কথাগুলোও অপূর্ব। অ্যানিমে ফ্যানদের কাছে এই গানটি অতি জনপ্রিয়।
মাত্র ১১ পর্বেই অ্যানিমেটির কাহিনীর সমাপ্তি হয়। কিন্তু সব অ্যানিমে এটার মত সন্তোষজনক সমাপ্তি দিতে সক্ষম হয় না। আনোহানা এক অসাধারণ অ্যানিমে যা মনে গভীর দাগ কেটে রাখবে। খুব কম মানুষই আছে যারা এটা দেখে কাঁদেনি। তবে না কাঁদলেও চোখের কোণে এক ফোঁটা অশ্রু আসবেই এটা নিশ্চিত করে বলতে পারি! এর মুভিটিতে কাহিনী বেশি আগায়নি বরং সিরিজটি গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো পুনরায় দেখায়।
এই ব্যস্ত জীবনে এখন আমাদের সময় কই পুরনো দিন আর বন্ধুদের নিয়ে ভাবার? তবু কেউ যদি সময় পান তো দেখে ফেলতে ভুলবেন না এই ছোট অ্যানিমেটা। আর যদি বন্ধুদেরও সাথে পান তাহলে তো বাজিমাত! বন্ধুরা মিলে একত্রে বন্ধুত্ব নিয়ে অ্যানিমে দেখার চেয়ে ভালো আর কিই বা হতে পারে?! যারা ইতিমধ্যে এটা দেখে ফেলেছেন এবং আনোহানা’র মত আরও অ্যানিমে দেখতে চান তারা দেখে ফেলতে পারেন “আনো নাতসু দে মাত্তেরু” বা “ওয়েটিং ইন দ্যা সামার”।
২০০৬ এর কেমোনোজুমে দিয়ে টেলিভিশনে ইউয়াসার আত্নপ্রকাশ। আর ২০১০-এ তার সবচেয়ে জনপ্রিয় আর প্রশংসিত কাজ তাতামি গ্যালাক্সি। এখন কিছু সাধারন পার্থক্য থাকলেও মৌলিক দিক দিয়ে ইউয়াসার সব অ্যানিমের আর্টে মিল খুঁজে পাবেন। কিন্তু কেমোনো আর তাতামির মাঝে স্যান্ডুইজড হয়ে ২০০৮ সালে যে কাইবা বের হল, তা শুধু আর সব পরিচালকের সব অ্যানিমের থেকেই আলাদা না, ইউয়াসার যেকোন কাজের থেকেও আলাদা! আর কাইবা, তার রেট্রো আর্ট স্টাইল দিয়ে – অ্যানিমের সাথে যা কল্পনাও করা যায় না – ছোট পর্দায় ফুটিয়ে তুলল এক জাঁকালো, প্রাণবন্ত আর চাদর ঘেরা রহস্য গল্প। তার সাথে আবার সাইন্স ফিকশন আর রোমান্স!
কাইবা এক কল্পনার জগতের সাথে তুলনা করা যায়। সাইন্স ফিকশন অ্যানিমে সাধারণত যা হয় – অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, অত্যাধুনিক এক জগত। কিন্তু তবুও বর্তমান জগতের সাথে তার মিলটা স্পষ্টই থাকে। কাইবা আসলেই এক কল্পনার জগত; স্বপ্ন অথবা দুঃস্বপ্ন; পরাবাস্তব আর অপরিচিত; নিজ চোখে আশেপাশে যা দেখেন তার সাথে এর মিল খুঁজে পাওয়া প্রায় দুঃসাধ্য এক ব্যাপার।
আর কাইবার এই জগতে মানুষের স্মৃতিশক্তি জমিয়ে রাখা যায় বিভিন্ন নির্জীব বস্তুতে! স্থানান্তর করা যায় এক দেহ থেকে আরেক দেহ, এক বস্তু থেকে আরেক বস্তুতে; যোগ করা যায়, বদলানো যায়…মুছে ফেলা যায়। অমরত্বের এখানে এক নতুন সংজ্ঞা আছে – তা শারীরগত না, অস্তিত্বগত। কিন্তু এ ধরনের জগতে, কোন জিনিসটাকে প্রানী বলা যায়? কীভাবে জানবেন আপনার মাথায় ছোটকালের সুখের যে স্মৃতিগুলো আছে তা আসলেই ঘটেছে, যোগ করা কোন ব্যাপার না? কীভাবে বুঝবেন – আপনি আসলেই আপনি?
আকাশে ভেসে বেরাচ্ছে মেঘের দল, তার উপরে রাজকীয় জীবনের হাতছানি। কিন্তু যা পার হতে হওয়ার একটাই মূল্য – হারাতে হবে আপনার সব স্মৃতি।
আর তার নিচে বিশৃঙ্খলা, অরাজকতা আর প্রতারণার এক জগত। জায়গায় জায়গায় ফাঁদ পাতা, দারিদ্রতায় জর্জরিত মানুষগুলোর কাছে মূল্যবোধের চেয়ে বেঁচে থাকাটাই আসল।
আর এই স্মৃতির চরম বিশৃঙ্খলার জগতে আমাদের নায়ক, কাইবা, জেগে উঠল – স্মৃতিভ্রষ্ঠ হয়ে; একেবারেই ‘শুন্য মাথায়’; এমনকি নিজের নাম, পরিচয় সম্পর্কেও কোন ধারণা নেই। গলায় শুধু একটা হার ঝুলানো, আর তাতে এক মহিলার ছবি, অবশ্যই যার কোন স্মরণও তার নেই! শুরু হল নিজেকে খুঁজে পাওয়ার এক যাত্রা…
ক্লিশে, অ্যামনেশিয়া গল্প? শুধু আর্ট বাদ দিলেও কাইবা আর যেকোন সাই-ফাই থেকে আলাদা। রহস্য গল্পের অসাধারন এক সম্পাদনা আর তার নিখুঁত এক আখ্যান। প্রথম দুটো পর্ব হয়তো পুরোপুরি মাথার উপর দিয়ে যাবে। কিন্তু বাকানো!-র মত এলোমেলো পূর্বাভাসগুলো সবজায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। সময় দিন, ধাঁধার ছড়ানো টুকরা গুলো এক হতে শুরু করবে।
কাইবা উজ্জ্বল রঙ-এ ভরপুর, সম্মোহিত করে রাখা এক জগত। সিরিজের প্রথম অংশ, এপিসোডিক, মূশি-শির মত মন ঠান্ডা করা এক একটি পর্ব, আস্তে আস্তে এই অপরিচিত জগতের সাথে পরিচয় করিয়ে দিবে। হয়তো কয়েক পর্ব যেতেই আর অচেনা মনে হবে না; অর্থকষ্টে থাকায় নিজেদের দেহ বিক্রি করা(আক্ষরিক অর্থেই) এক পরিবার, দুঃখের স্মৃতি ভুলার চেষ্টারত এক বৃদ্ধা অথবা ক্রনিকোর আর তার পরিবারের গল্পে(পর্ব ৩ – আমার দেখা যেকোন অ্যানিমের অন্যতম সেরা পর্ব) আপনিও হয়তো সহমর্মী হবেন।
আর এই পর্বগুলো ভিত্তি করে দেবে পরবর্তী অংশের জন্য। যেখানে রহস্যের জট খুলতে শুরু করবে একে একে; নান্দনিক কায়দায়। সাধারন অ্যাডভেঞ্চার থেকে যা দ্রুতই বদলে যাবে বিদ্রোহ, রাজনীতি আর বিশ্বাসঘাতকতার এক গল্পে।
আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় এর আবহ সংগীত; এই আজানা, অদেখা জগতের পরাবাস্তবতা ফুটিয়ে তুলতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। আর তার সাথে আছে দুটি চমৎকার ওপেনিং আর এন্ডিং থিম। কাইবার সংগীত আবেগময়, বিষন্ন এক ভালো লাগার অনুভূতি দিয়ে যাবে।
সাধারন অ্যানিমে আর্টওয়ার্কের বাইরে কিছু পছন্দ না হলে, কাইবা আপনার জন্য না। অ্যানিমে স্টুডিওতে দিনরাত বসে বসে আর্টিস্টের সুনিপূণ হাতে আঁকা না, ঘরে বসে আনাড়ি হাতে মাইক্রসফট পেইন্টে আঁকা ছবির সাথেই এর মিল খুঁজে পাবেন বেশি। কিন্তু এতোটুক ‘অস্বস্তি’ কাটিয়ে উঠতে পারলে, পাবেন এক চমৎকার গল্প; সাই-ফাই, রহস্য আর ভালোবাসার এর অসাধারন মেলবন্ধন।
তাতামি গ্যালাক্সি, পিংপং অথবা মাইন্ড গেম দেখে ইউয়াসা সম্পর্কে নূন্যতম ধারনা থাকলেও তা ভুলে যান। কাইবা আরো চিত্রানুগ, বাস্তবতা বিচ্ছিন্ন আর অচেনা। আর তা আপনাকে নিয়ে যাবে ‘সমুদ্রের তলদেশ’, আর নিয়ে যাবে ‘মেঘের উপরে’; পুরো জগৎ উলট পালট করে দেওয়া, নিজেকে খুঁজে পাওয়ার এই যাত্রায়। আপনি প্রস্তুত?
১) মাঙ্গা পড়ি নাই (পড়বও না); সুতরাং “মাঙ্গাটা এনিমটা থেকে হাজার গুণ ভাল” জাতীয় কথা শুনতে আগ্রহী না; ওই ইতিহাস বহু আগেই জানা আছে।
২) এইখানে সেইখানে গুড়াগাড়ি স্পয়লার থাকতে পারে; বেশি ডরাইলে পইরেন না। পরে আবার কইয়েন না আমি সাবধান করি নাই।
৩) আন্সেন্সর্ড ভার্শন দেখসি। আলোচনা সেইটা নিয়েই।
রিভিউঃ টোকিও ঘুল
কানেকি কেন শান্ত শিষ্ট সারাক্ষণ বইয়ে ডুবে থাকা একটা ছেলে। যে কোন ভাবেই হোক, সে একবার রিজে কামিশিরো নামক ভয়াবহ এক সুন্দরীর সাথে ডেট জুটিয়ে ফেলে; যে কিনা তার মতনই বইপড়ুয়া। রিজের আরেকটা বড় পরিচয় সে একজন ঘুল। ঘুল হচ্ছে এক ধরণের মানুষের মতন জীব; যাদের জীবন ধারণের একমাত্র উপায় নরমাংস ভক্ষণ। স্বাভাবিক খাবার খেলে তারা অসুস্থ হয়ে পড়ে। ডেটের শেষটা অবশ্য খুব সুখকর হয় না। এক কন্সট্রাকশন বিল্ডিং এর নিচে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় কিছু বীম মাটিতে পড়ে গেলে তার আঘাতে রিজে মারা যায়। গুরুতর আহত কানেকি নিজেকে আবিস্কার করে হাসপাতালের বিছানায়, রিজের শরীরের কিছু অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ট্রান্সপ্লান্ট অবস্থায়; যা কিনা তাকে আধামানুষ আধাঘুল বানিয়ে দেয়। এই অবস্থায় কানেকি মনুষ্য সমাজেও ফিরে যেতে পারে না; ঘুল সমাজও তাকে গ্রহণ করে না। এই অবস্থায় কানেকির আভ্যন্তরীণ লড়াই; বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কারের গল্প নিয়েই টোকিও ঘুল।
সিরিজটার প্রথমেই যে জিনিসটা দৃষ্টি আকর্ষণ করবে সেটা হল ওপেনিং সং। ওয়ান অফ দা বেস্ট এনিম ওপেনিং। চমৎকার কাজ। 🙂
এনিমেশন বেশ চমৎকার, বিশেষ করে ফাইটগুলোতে। কাগুনে, কুইঙ্কিগুলোর ডিজাইন বেশ ভাল ছিল। আক্ষরিক অর্থেই রক্তাক্ত লড়াই ছিল; গ্যালন গ্যালন রক্ত বয়ে গেসে একেক্টা ফাইটে। 😀
গল্প বেশ ভাল; বিশেষ করে মানুষ এবং ঘুল দুই দিকের সাইকোলোজিই পাশাপাশি শো করার চেষ্টাটা বেশ আকর্ষণীয় ছিল। ঘুল রা যে শুধুই মানুষখেকো জন্তু না; তাদেরও ইমোশন আছে; পরিবার আছে; আন্তেকুর মতন কিছু কিছু ঘুলরা যে মৃত মানুষ খেয়ে মানুষের সাথে মিলে মিশে বাস করছে; করতে চেষ্টা করছে – এই ব্যাপারগুলার চিত্রায়নের ব্যাপারটা ভাল ছিল।
আরেকটা চমৎকার দিক বোধহয় ভয়েস এক্টিং। বেশ গোছানো এবং চিত্তাকর্ষক কাজ।
১২ এপির সিরিজ; তাই “খুব বেশি ক্যারেকটার ডেভেলপমেন্ট হয় নি” বলাটাও বোধহয় আন্ডারস্টেটমেন্ট হয়ে যায়। মোটামুটি কিছু বুঝে ওঠার আগেই একটা রাশড এন্ডিং দিয়ে সিরিজটা শেষ হয়ে গেসে। মাঝে হিনামি সহ কিছু কিছু চরিত্র “ঘুলরাও মানুষ” ধরণের আইডিয়া দেওয়া ছাড়া গল্পে খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখতে পারে নাই।
সো সব মিলিয়েঃ
পজেটিভঃ ওপেনিং সং, কিছু ফাইট সিন, কুইঙ্কি ডিজাইন, স্টোরি প্রেমিজ, ভয়েস এক্টিং।
নেগেটিভঃ রাশড এন্ডিং, আন্ডার ডেভেলপড ক্যারেক্টার, কিছু কিছু চরিত্রের অতি নাটুকেপনা।
মনে রাখার মতন কিছু না হোক, মাঙ্গার জন্য অপমানজনক এডাপশন হোক, ওভারহাইপড হোক; শুধু এঞ্জয় করার জন্য কোন একটা সিরিজ দেখতে তো সমস্যা থাকার কথা না। মাঙ্গা না পড়া যে কেউই সিরিজটা এঞ্জয় করবেন বলেই আমার বিশ্বাস ! 🙂
স্মৃতি কি গুছিয়ে রাখা আছে
বইয়ের তাকের মত,
লং প্লেইং রেকর্ড-ক্যাসেটে
যে-রকম সুসংবদ্ধ নথীভুক্ত
থাকে গান, আলাপচারীতা?
আমার স্মৃতিরা বড় উচ্ছৃঙ্খল,
দমকা হাওয়া যেন
লুকোচুরি, ভাঙাভাঙি,
ওলোটপালটে মহাখুশি
দুঃখেরও দুপুরে গায়,
গাইতে পারে, আনন্দ-ভৈরবী।
সময় খুব নিষ্ঠুর সত্ত্বা। তার কাজ শুধু বয়ে যাওয়া; সে কারো জন্যই অপেক্ষা করে না; না ঝিঁঝিঁ ডাকা তপ্ত গ্রীষ্মের দুপুরের জন্য, না শরতের ঝড়ে পড়া পাতার জন্য, না জীর্ণ শীর্ণ নিরুত্তাপ শীতের জন্য। কোন একদিনের ঝুম বৃষ্টি আর মাটির সোদা গন্ধ পরমুহুরতেই স্মৃতি হয়ে যায়।
Hotarubi no Mori e এর চরিত্রগুলো ঠিক এমন করেই সময়ের পাকে বাঁধা। ছেলেটি মানুষের ছোঁয়ায় বিলীন হয়ে যাবে বলে পাহাড়ী দেবতার বন ছাড়তে পারে না। মেয়েটি পুরো একটি বছর পার না করে তাকে দেখতে পায় না। তাই প্রতি গ্রীষ্মেই মেয়েটি ছুটে যায় ছেলেটির কাছে; কোন একদিন হটাত করেই আর এই ছুটাছুটির দরকার পড়বে না – এটা খুব ভালভাবে জেনেই।
Hotarubi no Mori e “ফিজিকাল ভালবাসা”র কনসেপ্টটা জানালা দিয়ে ছুড়ে ফেলে দিয়ে ভালবাসার যে আসল নির্যাস তাকে খুজে ফিরেছে। যে ভালবাসাকে আমরা খুজে পাই যখন আমরা প্রিয়জনের কাছাকাছি থাকি; কিঞ্চিত দুষ্টুমিতে তার মুখের হাসিটুকু দেখি; যখন কি বলব তা খুজে না পেয়ে দম বন্ধ হয়ে আসে; কিংবা দুজনে পাশাপাশি নিরিবিলি বসে থাকি। ভালবাসা সব সময় সরব হতে হয় না; মাঝে মাঝে নীরবতায়, অনেক কিছু না বলাতেও ভালবাসা লুকিয়ে থাকে। Hotarubi no Mori e সেই থিমের উপর দাঁড়িয়েই আমাদের একটা ভালবাসার গল্প শোনায়; যে ভালবাসাটা কোন রকম চাওয়া পাওয়া বিবর্জিত; যে ভালবাসাটা খুব স্নিগ্ধ।
পুরো মুভিটার পরতে পরতে দুর্দান্ত আর্টওয়ার্ক; চমৎকার ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক আর দুটো ভিন্ন জগতের বাসিন্দার কথোপকথন – ৪২টা মিনিট যে কোন দিক দিয়ে পার হয়ে যাবে টেরও পাওয়ার কথা না। “ভাল না বাসাটা দুঃখের, ভাল বাসতে না পারাটা বোধহয় তার চেয়েও বেশি” – স্প্যানিশ কবি মিগুয়েলের কথাগুলো যেন এক হয়ে যায় মুভিটার সাথে।
শুরুটা করেছিলাম পুর্নেন্দ পত্রীর একটা কবিতায়। শেষ করি নির্মলেন্দু গুণের কবিতার কয়েকটা লাইন দিয়ে –
কতবার যে আমি তোমোকে স্পর্শ করতে গিয়ে
গুটিয়ে নিয়েছি হাত-সে কথা ঈশ্বর জানেন।
তোমাকে ভালোবাসার কথা বলতে গিয়েও
কতবার যে আমি সে কথা বলিনি
সে কথা আমার ঈশ্বর জানেন।
…
এমত উল্লাসে নিজেকে নিক্ষেপ করবো তোমার উদ্দেশ্যে
কতবার যে এরকম একটি দৃশ্যের কথা আমি মনে মনে
কল্পনা করেছি, সে-কথা আমার ঈশ্বর জানেন।
কিছু গল্প দিয়ে শুরু করা যাক। হলিউড মুভির গল্প না; একেবারে নিখাদ বাস্তব জীবনে ঘটতে থাকা কিছু গল্প। জাপানের চুকিও ইউনিভার্সিটির একদল গবেষক কিছু বাচ্চাকাচ্চা রোবট বানিয়েছেন। এই রোবটগুলো একেবারে মানুষের বাচ্চার মতন; হাসে, কাঁদে ঘুমায়ে যায়। ওল্ড হোমে থাকা নিঃসঙ্গ মানুষগুলোকে একটু সময় কাটানোর সুযোগ করে দিতেই এই প্রজেক্টের উদ্ভব। ওদিকে টেরাসেম মুভমেন্ট নামে একটা সংগঠন মানুষের স্মৃতি, ব্যাক্তিত্ত, আবেগ – এগুলো রোবটের মধ্যে জমায়ে রাখার কাজ শুরু করে দিয়েছে ইতিমধ্যেই। আবার হোন্ডা বানাচ্ছে হাটতে চলতে সিড়ি বাইতে পারে এমন রোবট।
এতো গেল গায়ে গতরে খাটানো যায় এমন রোবট নিয়ে প্যাচাল। টেক্সাস অস্টিন ইউনিভার্সিটির গবেষকরা রীতিমত কম্পিউটারকে স্কিতজোফ্রেনিকই বানিয়ে ছেড়েছেন। আর জর্জিয়া টেক স্কুলের রোনাল্ড আরকিন তো বানিয়েছেন মিথ্যেবাদী রোবট। এই রোবটে মিথ্যে আগে থেকে প্রোগ্রাম করা থাকে না; সে নিজে নিজেই পরিবেশ দেখে মিথ্যে বলাটা আয়ত্ব করে নেয় !!!
জি হ্যা; এতক্ষণে বোধহয় এতো রোবট আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কচকচানির উদ্দেশ্য বুঝে যাবার কথা। যে মুভিটা নিয়ে লিখতে বসেছি সেটা মানুষ, রোবট আর মনুষ্যত্ব, বুদ্ধিমত্তা – এইসব কনসেপ্টকে নিয়েই বানানো।
দেখলাম “Time of eve”. ১০৬ মিনিটের এই মুভির সেটিংস নিকট ভবিষ্যতে; যেখানে মানুষ এবং হিউম্যানয়েড রোবট “এন্ড্রয়েড” এর পাশাপাশি সহাবস্থান। বাস্তবের রোবটরা না করলেও গল্প সিনেমার বেশিরভাগ রোবটই আসিমভ সাহেবের তিনটে সুত্রই মেনে চলে; এখানেও তার ব্যাতিক্রম নয়। তবে সেখানে একটা “কিন্তু” থেকে যায়। আসিমভের ল গুলোতে “রোবট তাকে দেওয়া আদেশের বাইরে কিছু করা যাবে না” কিংবা “রোবট মিথ্যে বলতে পারবে না” এই ধরণের কোন বাইলজ নেই। আমাদের এই গল্পে বেশিরভাগ মানুষই রোবটকে “শুধু মেশিন” হিসেবে দেখে যেভাবে ট্রিট করার কথা – স্বার্থপর, ঠান্ডা এবং নিষ্ঠুর – সেভাবেই ট্রিট করে। কিন্তু এর মাঝেও কিছু কিছু মানুষ থাকে; যারা আসলে “শুধু মেশিন” এর ধারণার বাইরে গিয়ে এন্ড্রয়েডদের আলাদা “সত্ত্বা” হিসেবে দেখার চেষ্টা করে; বোঝার চেষ্টা করে। কিন্তু কেন? রোবটদেরকে অধিক বুদ্ধিমত্তা দিলে সেটা কি মানবজাতির জন্য আশীর্বাদ বয়ে আনবে না অভিশাপ? একটা খেলনা গাড়ির প্রতিও কিছুদিন পরে একটা মায়া, একটা ভালোবাসা জন্মে যায়; সেখানে একটা বাচ্চাকে লালন পালনের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কোন রোবটের হাতে ছেড়ে দিলে সম্পর্কটা কি হতে পারে? মানবিক আবেগ কি শুধু মানুষের করায়ত্ত থাকবে? মানুষ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার একটা সত্ত্বার সাথে মানবিক আবেগের সম্পর্কের মাত্রাটা কি হবে? এ ধরণের বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে মুভিটিতে।
মুভিটা দেখার সময় আমার বার বার যে কথাটা মনে হয়েছে সেটা হল “স্নিগ্ধ”। মুভিটার সেটিং সিম্পল, আমাদের বর্তমান পৃথিবীর সাথে সমান্তরাল, কিন্তু তার মাঝেও খুব সূক্ষ্ম একটা পার্থক্য আছে; যেটা মুভির অদেখা কিন্তু সম্ভাব্য ভবিষ্যতে প্লট সাজাতে সাহায্য করে। চরিত্র রুপায়ন, তাদের চলাফেরা, চারপাশের পরিবেশ এতটাই বাস্তবের সাথে মিল যে খুব সহজেই নিজের চেনাজানা জগতের সাথে মিলিয়ে ফেলতে পারবেন। কিন্তু তার মাঝেই, এই এত শত বাস্তবতার ভীড়েও ফুটপাথের বিষণ্ণ ছায়ায় কি যেন লুকনো রহস্য কিংবা উজ্জ্বল সূর্যালোকে ঝলমলে কিন্তু প্রাণহীন শহরের পথ অথবা ধূসর বাদামী আবহ অনিশ্চিত এক ভবিষ্যতেরই ইঙ্গিত দেয় যেন !!
চরিত্র, গল্প অথবা সাউন্ডট্র্যাক – কোন কিছুই নিয়েই আর আলাদা করে তেমন কিছু একটা বলার নেই আসলে। শুধু এইটুকু প্রমিজ করতে পারি মুভিটা দেখা শুরু করলে সবকিছু ভুলে গিয়ে কোন দিক দিয়ে সময়টা পার হয়ে যাবে টেরই পাবেন না !
জনৈক দার্শনিক বলেন “মানুষ মাত্রই অসন্তুষ্ট।” মানুষ এক মূহুর্ত হাসে,পরমূহুর্তেই নাসিকা দিয়ে ফোঁস করে কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণ করে বলে “হুম,আমি অসন্তুষ্ট।” মানুষের মনের এই অসন্তোষের কক্ষে এসে যোগ দেয় অতীতকে দোষারোপ,নিজেকে দোষারোপ,মানুষকে দোষারোপের এক ধরণের প্রবণতা এবং একটি ‘যদি’র কাল্পনিক কোর্ট।‘যদি এই কাজটা না করতাম’, ‘যদি এই জিনিসটা না হইত’, ‘যদি এই ব্যাটা এই আকাম না করত’…কিন্তু এই ‘যদি’ই যদি বাস্তব হত তবে কি জীবনের সব অসন্তোষ ঘুঁচে গিয়ে চিরকাঙ্খিত ‘rose coloured life’ এর আগমন ঘটত?
গল্পের ন্যারেটর কলেজের নতুন জীবনের দ্বারকোঠায়।আর দশজন স্বাভাবিক যুবকের মত সেও এক গ্যালন বসন্তপূর্ণ ফুলেল জীবনের আশা নিয়ে প্রবেশ করে তার ক্যাম্পাসে।অজস্র নব নব ক্লাব বা অতিরঞ্জিত করে বললে ‘জীবনের দরজা’র মধ্যে থেকে সে পছন্দ করে নিল টেনিস ক্লাব।কিন্তু হ্যাঁ, জীবন তাকে স্বভাবতই কচু দেখিয়ে সব আকাঙ্খা পণ্ড করে দিল।আর কচু দেখাতে সাহায্য করল টেনিস ক্লাবের নিন্দনীয় এক চরিত্র Ozu। তবে যদি সে প্রথমে টেনিস ক্লাব না নিয়ে অন্য কোন ক্লাব বেছে নিত? যদি তার জীবনের choice এবং activity ভিন্ন হত? সে কি পেত চিরকাঙ্খিত ‘rose coloured life’ ?
মানুষ আকাশের দিকে তাকালে তার জীবন নিয়ে ভাবে,ঘুমানোর সময় তার জীবন নিয়ে ভাবে,খামোখা বসে থাকলেও তার জীবন নিয়ে ভাবে।ভাবে নিজের choice এর কথা আর পাল্টে দিতে চায় অতীতের হতাশাময় ব্যাপারগুলোকে।ঘরের বাইরের ঘাসের উপর শিশির না দেখে আকাশ পাতাল ঘুরাঘুরির মতই আমরা আমাদের আশেপাশের রঙ্গিন ব্যাপারগুলো না দেখে খুঁজে বেড়াই এক অস্তিত্বহীন ঝলমলে জীবনকে।কিন্তু আমরা ভুলে যাই চিরসত্যটি।১০০০/২০০০ প্যারালাল পৃথিবী ঘুরে আসলেও,শত শতবার নিজের choice, অতীত পরিবর্তন করলেও সর্বশেষে আমাদের অবস্থান অপরিবর্তনীয়।সব ক্ষেত্রেই আমাদের হতাশা,কষ্ট সমানুপাতিক। যেখানে জীবন আছে সেখানে হাসির কলরব আছে,আবার যেখানে জীবন আছে সেখানে সমপরিমাণে অবশ্যই আছে অসন্তোষ এবং ব্যর্থতা।
জীবনের এই চিরন্তন ব্যাপার এবং জীবনের দর্শনপাত না করা সুন্দর জিনিসগুলিই এই এনিমেতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে চমৎকার স্টোরি ন্যারেশন, চমৎকার ভয়েস অ্যাক্টিং, চমৎকার ইলাস্ট্রেশন(পড়ুন মাসাকি ইয়ুয়াসার হা করে দেয়া ব্যাপার স্যাপার) এবং আটকে রাখা এন্টারটেইনমেন্টের মাধ্যমে।
যখনই বোর লাগে, অথবা দেখার মতো কোন এনিমে পাই না,অথবা মন খারাপ থাকে, অথবা কিছু করতে ইচ্ছা করে না সে সময় দেখার মতো একটা এনিমে হলো Natsume Yuujinchou.
কাহিনি হলো , নাতসুমে একজন স্কুল পড়ুয়া ছাত্র, সে youkai অর্থাৎ আত্মা / ghost দেখতে পারে যা অন্য কেউ দেখতে পারে না। সে তার চাচীর সাথে থাকে এবং শুধু সেই একমাত্র মানুষ যে ইয়োকাই দেখতে পারে বলে তার মন খারাপ থাকে। উল্লেখ্য যে , তার গ্র্যান্ডমাদার রেইকো নাতসুমে ও ইয়োকাই দেখতে পারতো এবং সে ‘ Book of Friends’ বই এর ক্রিয়েটার, যেই বই এ বিভিন্ন ইয়োকাইদের সাথে নির্দিষ্ট কন্ট্রাক্ট সিল করে তাদের নাম এন্ট্রি করা হয়েছে। তার মৃত্যুর পরে তার নাতি নাতসুমের কাছে এই বই থাকে এবং বিভিন্ন ইয়োকাই তাদের নাম ফেরত নিতে আসে। এসময় সর্বদা তার বডিগার্ড হিসেবে সাথে থাকে Madara নামের অত্যন্ত শক্তিশালি এবং নোবেল একজন ইয়োকাই নেকো , যার সাথে তার চুক্তি হলো নাতসুমের কিছু হয়ে গেলে [মাদারার মতে মৃত্যু] Book Of Friends মাদারা নিয়ে নিবে।
এভাবেই এপিসোডিক এনিমেটির কাহিনি এগিয়ে যায়, আস্তে আস্তে আরো অনেকেই আসে , নাতসুমে তার গ্র্যান্ডমাদার সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারে। প্রচণ্ড শান্তি আর রিলাক্সনেস পাওয়া যায় শুধু এই এনিমেই । সাউন্ডট্র্যাক ও অনেক সুন্দর। আর এনিমেশন ও যথেষ্ট ভালো !
না দেখে থাকলে ১ টি ১ টি এপি করে দেখে সময় নিয়ে দেখে ফেলুন নাতসুমে ইউজিনচো। ৪ টা সীজন মোট। একটা এডভাইস , এই এনিমেটা শেষ করবেন না অথবা প্রাইম এনিমে হিসেবে দেখবেন না, বরং অন্য কোন এনিমে দেখার মাঝে এটার ১ থেকে ২ টা করে এপি দেখবেন, তাহলে সবচেয়ে বেশিক্ষন নাতসুমের সুধা পান করতে পারবেন।