অ্যানিমের গল্প বলতে গেলে মাঙ্গাকে তো বাদ দেওয়া যায় না! লেখা-আঁকার যুগলবন্ধী প্রচলিত ছিলো বহু আগে থেকেই। কিন্তু অ্যানিমের মত “মাঙ্গা”-র প্রসার ভালোভাবে শুরু হল যুদ্ধের পর। ১৯৪৭ সালে নতুন সংবিধান অনুযায়ী জাপানে সকল সেন্সরশীপ নিষিদ্ধ হয়ে যাওয়ায় সাহিত্য, বিনোদনের অন্যান্য মাধ্যমের মত মাঙ্গা-অ্যানিমেতেও ভিন্নধারার সূচনা ঘটল। ১৯৪৫ থেকে ১৯৫২ পর্যন্ত যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠনের সময়গুলোতে, আমেরিকার তত্বাবধায়নে থাকার কারণে তাদের সংস্কৃতি দ্বারা অনুপ্রানিত হওয়াকেও একটা কারণ হিসেবে বলা যায়। মার্কিন সুপার-হিরো কমিকস জাপানীদের জন্য নতুন এক অভিজ্ঞতা ছিল। অনুপ্রানিত হলেও, জাপান অবশ্য তা অনুসরন করল না।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রসঙ্গ এড়িয়ে চলার চেষ্টা করা হলেও সামগ্রিকভাবে যুদ্ধ-শান্তির প্রভাবটা বেশ ভালোভাবেই লক্ষনীয় ছিল। ১৯৫১ সালে, প্রথমবারের মত ‘সুপার হিরো’-দের কাহিনী জাপান নিজেদের আদলে বলা শুরু করল। ওসামু তেজুকা, যাকে বলা হয় আধুনিক অ্যানিমের নিউক্লিয়াস মাঙ্গার ধর্মপিতা, আঁকা শুরু করেন Tetsuan Atom(Mighty Atom), যেটা অধিক পরিচিত Astro Boy নামে।
আধুনিক আরেকটি উল্লেখযোগ্য মাঙ্গা অবশ্য তারও আধ-দশক আগে শুরু হয়েছে। ১৯৪৬ সাল থেকে শুরু হয়ে দীর্ঘ ২৮ বছর ধরে যা প্রকাশিত হয়! ১৯৭৪ সালে মাঙ্গা প্রকাশ শেষ হওয়ার পাঁচ বছর আগেই অবশ্য তার অ্যানিমে প্রচারও শুরু হয়ে গিয়েছিল, ১৯৬৯ সালে। এবং তা আজ অবধি চলছে!
ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘকালব্যাপী এবং সর্বাধিক প্রচারিত পর্বের অ্যানিমে, মাচিকো হাসেগাওয়ার – Sazae-san।
এই Astro Boy আর Sazae-san কেই বলা যায় যথাক্রমে আধুনিক শৌনেন-সেইনেন আর শৌজো-জোসেই জনরার অ্যাডাম-ইভ।
অ্যানিমের গল্পে ফিরে আসা যাক। ১৯৪৮ সালে আলোর মুখ দেখল “জাপান অ্যানিমেটেড ফিল্ম” স্টুডিও। প্রথম দিকে তেমন উল্লেখযোগ্য কোন কিছু তৈরী করতে না পারলেও, ১৯৫৬ সালে তোয়েই কোম্পানী এই স্টুডিওকে কিনে নেওয়ার পর অবস্থা পাল্টে যায়। নতুন নাম হয় – তোয়েই অ্যানিমেশন। মাত্র দুই বছরের মাথায় তারা বের করে প্রথম রঙ্গিন জাপানিমেশন এবং সর্বপ্রথম আধুনিক “অ্যানিমে” – The Tale of the White Serpent, ১৯৬১ সালে যা সর্বপ্রথম অ্যানিমে হিসেবে আমেরিকায় মুক্তি পায়। প্রথম আধুনিক অ্যানিমে হিসেবে বিবেচিত হলেও বর্তমান-প্রচলিত অ্যানিমে থেকে ডিজনীর রুপকথার গল্পগুলোর সাথেই এটার বেশি মিল খুঁজে পাওয়া যাবে। এবং যথাযথ কারণেই এই মুভিটি তোয়েই অ্যানিমেশনকে এনে দেয় “প্রাচ্যের ডিজনী” উপাধি।
শুধু রঙই নয়, জাপানের তৎকালীন অ্যানিমেশন প্রযুক্তির একেবারে চূড়ান্ত ব্যবহার করা হয় এই চলচ্চিত্রে। কিন্তু চমকপ্রদভাবে তাইজি ইয়াবুশিতা আর কাজুহিকো ওকাবে পরিচালিত এই অ্যানিমে তৈরী করতে লেগেছিল মাত্র ৮ মাস! একসাথে কাজ করেছিল সাড়ে তের হাজারেরও বেশি কর্মী!
তার পরের বছরই ইয়াবুশিতা আবার আকিরা দাইকুবারার সাথে মিলে তৈরী করেন Magic Boy, যার জাপানী নাম Shounen Sarutobi (না, হিরুজেনও না, আসুমাও না, এমনকি কোনোহামারুও না) Sasuke [ ]!
এই অ্যানিমেও ডিজনীর গতবাধাঃ লোকগাথা-রুপকথা-গান-কথাবলাপ
প্রতিবছর একটি মুভির ধারাবাহিকতায় ১৯৬০ সালে ওসামু তেজুকার My Son Goku মাঙ্গার উপর ভিত্তি করে তৈরী হয়, Alakazam the Great। তেজুকা আবার মাঙ্গাটি এঁকেছিলেন ষোল শতকের চাইনিজ উপন্যাস Journey to the West এর অবলম্বনে। তোয়েই অ্যানিমেশনের পক্ষ থেকে তেজুকাকে পরিচালক হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হলেও, তেজুকার ভাষ্যমতে স্টুডিওতে তার গমন বিজ্ঞাপনের জন্য ছবি তুলতে যাওয়া পর্যন্তই। তবুও এই মুভির কারণেই অ্যানিমেশনের প্রতি প্রথম তাঁর আগ্রহ জন্মায়। আর ১৯৬১ সালে অসন্তোষ আর সৃজনশীল অসামঞ্জস্য, যে কারণেই হোক, তোয়েই অ্যানিমেশনের সাথে চুক্তি শেষ হওয়ার সাথে সাথেই তেজুকা নিজেরই একটা স্টুডিও খুলে বসলেন!
তোয়েই অ্যানিমেশনের সাথে সাথে কাঁধে কাঁধে পাল্লা দেওয়ার জন্য – মুশি প্রোডাকশন।
মাঙ্গার মতোই অ্যানিমেতেও আমেরিকানদের অনুসরন না করে জাপানের স্বকীয় আখ্যান বর্ণণা করতেই তিনি বেশী মনোযোগী হলেন। ১৯৬৩ সালে নতুন বছরের প্রথম দিনে জাপানের টেলিভিশন ইতিহাস পাল্টে গেল চিরদিনের জন্য।
হলের বড় পর্দার গন্ডি পেড়িয়ে অ্যানিমেশনের যাত্রা শুরু হল টিভির চারকোনা বাক্সে। আর মাঙ্গার মতই এখানেও প্রথম নামটি হল – Astro Boy!



