Shouwa Genroku-তে আত্নহত্যা, আর রাকুগোর মঞ্চায়ন — Fahim Bin Selim

 

[Shouwa Genroku Rakugo Shinjuu স্পয়লার সতর্কতা]

ShouwaGen 2

রাকুগো [落語, Rakugo] – আক্ষরিক অর্থ “পড়ন্ত শব্দ(Falling Words)”। মূলতঃ মঞ্চে বসে কেবল এক-দুটো সরঞ্জাম দিয়ে(অধিকাংশ সময়ই একটা কাগজের পাখা একটা ছোট কাপড়ের টুকরো) গল্পবর্ণনার বাচনিক শিল্পমাধ্যম। যদিও এই ধারা বেশ আগে থেকেই জাপানে চলে আসছিলো, তবে মেইজি এরাতে এসে প্রথম “রাকুগো” শব্দটার প্রচলন হয় আর শৌয়া পিরিয়ডে এসে সাধারণের বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে জনপ্রিয়তা পায়। যদিও শেষ পর্যন্ত রাকুগো একটি নিশ(Niche) বিনোদন মাধ্যমই থেকে গেছে, বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের কাছে। একাকীই পুরো অভিনয়টা করতে হয় বলেই রাকুগো করার জন্য প্রয়োজন বেশ বড় পরিসরের কন্ঠবৈচিত্রতা আর বডি-ফেস এক্সপ্রেশনের ছোটখাটো পরিবর্তন দিয়ে বড় ধরনের ভাব আদানের দক্ষতা। এই রাকুগো পারফর্মারদের – যাদের ডাকা হয় “Deshi” বলে – বড় থিয়েটারগুলোতে, বড় উপলক্ষগুলোতে সুযোগ পাওয়ার জন্য পার হয়ে আসতে হয় বেশ কয়েকটি ধাপ। পেতে হয় কমিটির অন্যান্য রাকুগো মাস্টারদের সমর্থন। বিভিন্ন ঘরানার রাকুগো দেখা গেলেও একে সাধারণভাবে ভাগ করা যায় কমেডি, হরর(কাইদান) আর ট্র্যাজেডিতে।

আর Shouwa Genroku-’র গল্পটাতে যে ট্র্যাজিক-ড্রামা তা প্রথম পর্বেই ভালোভাবে বুঝিয়ে দেওয়া হয়, যা লাফিয়ে বেড়ায় শৌয়া পিরিয়ডের সময়টাতেই, একই সাথে অতীত(চল্লিশের দশক) আর বর্তমানে(সত্তরের দশক)। গল্পের শুরুটা উদীয়মান রাকুগো “অভিনেতা” ইয়োতারোকে দিয়ে ‘৭০ এ হলেও, অন্তত অ্যানিমের প্রথম সিজনের অধিকাংশ সময়টাই তার গুরু কিকুহিকোর সাথে কাটানো, ‘৪০ এর যুদ্ধকালীন আর যুদ্ধপরবর্তী জাপানে। Shouwa Genroku-’র প্রথম পর্বটা, যেটা আগে বেরোনো দুটো OAD-’র পুনর্বণনা আর ৪০ মিনিটেরও বেশি দীর্ঘ, একটা আদর্শ “পাইলট” এপিসোড, পুরো অ্যানিমেটারই একটা খন্ডচিত্র; তা এসথেটিক দিক দিয়েও, গল্পের মেজাজ আর গতির দিক দিয়েও। আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এর সমাপ্তী, যা আগে থেকেই বলে দেওয়া; বারবার শোনা কোন রাকুগোর মত যেন। আর একারণেই Shouwa Genroku-’র মূল বিশেষত্ব “কী হবে” তাতে নয়, বরং “কীভাবে হবে”-তে আবদ্ধ। মাঙ্গার প্যানেল-বাই-প্যানেল থেকে বেরিয়ে অ্যানিমেশন/সিনেমা মাধ্যমে গল্পের মঞ্চায়নে পরিচালকের নিজস্বতার শুরুটা এখান থেকেই। অনেকটা পার্থক্য তুলে ধরার চেষ্টাতেই যেন, “ভার্বাল স্টোরিটেলিং”-কে কেন্দ্র করে আবর্তিত এক গল্পে তার চরিত্ররা প্রথম থেকেই ভাব প্রদানে ব্যবহার করেছে খুবই কম শব্দ। রহস্য আর নাটকীয় মুহূর্তে সংলাপগুলোকে দমিয়ে দিয়ে বরং মনোযোগ দেওয়া হয়েছে ভিজুয়াল স্টোরিটেলিং আর নুয়ান্সের উপর।

vlcsnap-2016-04-20-21h11m08s220

vlcsnap-2016-04-20-21h11m14s20

 

পিরিয়ড ড্রামা হিসেবে Shouwa Genroku-’র অর্ধেক আকর্ষন যুগ পরিবর্তনের সাথে সময় রাকুগোর টিকে থাকা, তার সাথে জড়িত মানুষদের টিকে থাকার গল্প; প্রতিভা, সাফল্য, ব্যর্থতা, ভালোবাসা, তাদের টানাপোড়েনের গল্প। আগের থেকেই জনপ্রিয়তা নিয়ে ধুঁকতে থাকা এই মাধ্যম বড় একটা ধাক্কা খায় টেলিভিশন, রেডিও আর সিনেমার মত নতুন বিনোদন মাধ্যমগুলোর আবির্ভাবে। আরও একটা বড় কারণ সম্ভবত এর ঐতিহ্য আর প্রচলিত ধারার বাইরে যাওয়ার বিপক্ষে একগুঁয়েমি। অ্যানিমের পুরোটা জুড়েই শিল্পের এই চিরচেনা অন্তর্দ্বন্দ্ব চলতে থাকে। দুই মূলচরিত্র সুকেরেকু আর কিকুহিকোর রাকুগো পরিবেশনার বৈপরীত্যটা সামগ্রিক রাকুগো জগতের অবস্থার সাথেই সমান্তরাল টানার চেষ্টা। কিকুহিকো, একজন সহজাত অভিনেতা; সূক্ষ্ণ আর নিখুঁত, ক্রিটিকালি অ্যাক্লেইমড, পিয়ার(peer)-দের ঈর্ষা আর অগ্রজদের প্রশংসার পাত্র; কিন্তু দর্শকদের সাথে তার সংযোগটা, যেটা আর যেকোনো মঞ্চপ্রদর্শনের মতই রাকুগো পারফর্মেন্সের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কখনোই তার কাছে সহজাত ছিলো না। সুকেরেকুর অবস্থানটা পুরো বিপরীত। তাকে বলা যায় জনগণের রাকুগো পারফর্মার। কমেডি ধারাতেই তার বিচরণ, আর দর্শকদের বিনোদনের জন্য, তাদের সখ্যতা পাওয়ার জন্য কমেডির চেয়ে ভালো আর কী হতে পারে! কিন্তু প্রতিভা থাকলেও তা টিকিয়ে রাখার চাপ সামলাতে সুকেরেকু বারবার ব্যর্থ হয়।

sho Shouwa Genroku Rakugo Shinjuu 09.mkv_snapshot_11.52_[2016.03.10_17.08.26]

Shouwa Genroku বেশ বড় একটা সময় মঞ্চের বাইরের জীবনের নাটকীয়তা নিয়ে কাটালেও, এর বাকি সময়টা কেবলই মঞ্চের রাকুগো নিয়ে। রাকুগো, এমন একটা শিল্পমাধ্যম যা ধৈর্য্যের পরীক্ষা নেয় বেশ ভালোভাবেই – তা যেমন তার পারফর্মারের, তেমনি এর শ্রোতারও। আর Shouwa Genroku প্রথম থেকেই আমাদের থিয়েটারের ভেতর বসিয়ে দেয়, বেশ কয়েকটি রাকুগো পারফর্মেন্সের পুরোটা দেখিয়ে, যার সবচেয়ে বড়টি প্রায় ১৫ মিনিট।

গঠনগতভাবে, রাকুগো শুরুটা হয় বড় একটা বিল্ডআপের নিয়ে, আর তার শেষটা হয় হঠাৎ কোন সমাপ্তী নিয়ে – কমেডির ক্ষেত্রে কোন রানিং জোক অথবা ওয়ার্ডপ্লে আর ট্র্যাজেডির ক্ষেত্রে পতনের অনিবার্যতার নিয়ে। বিল্ড-আপের মূহুর্তটা ধীরে ধীরে শ্রোতাকে গল্পের ভেতর টেনে আনার প্রচেষ্টা। বক্তা, কেবল শব্দের মাধ্যমেই যে কিনা সকল শ্রোতার কল্পনাশক্তিকে একসাথে চালিত করে ইনডিভিজুয়াল কনশাসনেসকে ছড়িয়ে দিবে সবার মাঝে। Shouwa Genroku-’র পারফর্মেন্সের দৃশ্যগুলোকে এক্ষেত্রে নিখুঁতই।

shogen

পারফর্মেন্সগুলো আমরা দেখতে পাই বক্তা-শ্রোতা দুই পরিপ্রেক্ষিত থেকেই। রাকুগো পারফর্মারকে দূর থেকে দেখা যায়, দর্শকের চোখ দিয়ে, আসন গেড়ে বসা, বিচলিত অথবা আত্নবিশ্বাসী, স্পটলাইটের কেন্দ্রবিন্দুতে। দর্শকের দেখা যায়, বক্তার চোখ দিয়ে, অনিশ্চয়তা অথবা আগ্রহ নিয়ে তাকানো, আধো আলো-ছায়ায়। কিন্তু যতই গল্প এগোতে থাকে, আর যতই গল্পের আবহ আচ্ছন্ন করা শুরু করে, ততই বাস্তবতা বিলীন হয় আর প্রবেশ ঘটে পরাবাস্তবতার জগতে। আমাদের চোখের সামনেই দর্শকরা হারিয়ে যায় অন্ধকারে। অথবা বক্তার নিয়মিত বদলে যাওয়া গলা আর বৈচিত্র্যতা থাকা অঙ্গভঙ্গিগুলো প্রাণ নিয়ে যেন মঞ্চে হাজির হ্য় আলাদা আলাদা সব চরিত্র হিসেবে। শৌয়া পিরিয়ডের টোকিওর কোন থিয়েটারের মঞ্চ রুপান্তরিত হয় এডোর কোন পতিতালয়ের ঘরে। আমরা শ্বাসবন্ধ করে বসে থাকি, দর্শকদের সাথেই, তার যখন হঠাৎ কোন কৌতুকে হেসে ঊঠে তখন আমরাও হাসি। অথবা আঁতকে উঠি শিনিগামির আগমনে।

vlcsnap-2016-04-20-21h10m34s128

কিন্তু কেবল রাকুগোর নিখুঁত মঞ্চায়নই না, তার চেয়েও বেশি কিছু, Shouwa Genroku এক অনবদ্য সিনেমাও। সামনে থেকে না দেখতে পাওয়া পারফর্মারের দেহের অঙ্গভঙ্গিগুলো আমরা দেখি, পারফর্মারের পাশে বসে, আসলেই মিশে একাকার হই, শুধু রাকুগোগুলোর গল্পের সাথেই না, তার পেছনের মানুষটার গল্পগুলোতেও। কোন মোনোলোগ না, কোন আলাদা সংলাপ না – কিন্তু পারফর্মারের মনের ভেতর ঢুকে যেতে খুব একটা বেগ পেতে হয় না। হয়তো ছোট একটা শট-ফ্রেমিং – পায়ের আড়ষ্টতা বা ঠোটের কোনের সূক্ষ্ণ হাসি – Shouwa Genroku-’র ছোট ছোট দৃশ্যগুলোই হাজার শব্দের একটা ভাব বহন করে।

Shouwa Genroku-’র মূল গল্পের পুরোটাতেও আমরা বসে থাকি অধীর আগ্রহে, এর অনিবার্য ট্র্যাজেডির জন্য। তার চিরচেনা ভাব-গাম্ভীর্য নিয়েই কিকুহিকো যখন বলে যায় আত্নহত্যা অথবা পতনের গল্প – সুকেরেকু, মিয়োকিচি আর…রাকুগোর।

Cat Soup-এ মৃত্যু-ভাবনাঃ ভালোবাসা এবং অনিবার্যতা — Fahim Bin Selim

মানুষের জ়ীবনের সবচেয়ে বড় ভয়গুলোর মধ্যে একটা সম্ভবত পরিবর্তন; চেনা-পরিচিত জগৎটার পালটে যাওয়া। তা পরিস্থিতির বদলে হতে পারে, স্থান-কালের বদলে হতে পারে, হতে পারে পাত্রের বদলে; কিংবা অনুপস্থিতিতে। এক্ষেত্রে পরিবারের কথাই কি সবার আগে মাথায় আসে না, যেখানে মোটামুটি পরিবারকে ঘিরেই পরিচিত জগৎ-টার শুরু, এবং বড় একটা সময় জুড়ে সেটাই পুরো জগৎ হয়ে থাকে? শিশুদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা আরো বেশি।

নিয়াত্তার যুদ্ধটা এই পরিবর্তনের বিপক্ষে – পরিণতি আর অনিবার্যতার বিপক্ষে। স্রষ্টা-সর্বপরিচালকের বিপক্ষেও কি না? Cat Soup-এর শুরুটা মাসাকি ইউয়াসার[১]  ট্রেডমার্কড পারস্পেকটিভ শট দিয়ে। ক্যামেরা বাথটাবের ভিতর পরে থাকা, তার উপরে জলের আবরণ – স্থির – আপাত পরিস্থিতির মত। কিন্তু এরপরই নিয়াত্তার আগমন, খেলনা নিয়ে পানির ভেতর হাত ডুবিয়ে খেলতে থাকা, অতঃপর তাতে উপুড় হয়ে পরে যাওয়া, জলের আবরণে আন্দোলন এবং হ্যালুশিনেশনের শুরু। পরাবাস্তবতারও।

vlcsnap-2016-02-21-18h04m26s131

একটা মরা পোকার খোলস দেখা যায়, দেখা যায় বাইরের ঘরে শুয়ে থাকা অসুস্থ নিয়াকোকে। এবারের পারস্পেকটিভ শটটা তার চোখ দিয়ে দেখা – উপরের সিলিং, ক্রমশ জট পাকিয়ে যাওয়া, বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া, ক্রমশ অন্ধকার হয়ে যাওয়া দৃষ্টি। বারান্দায় মৃত্যু দেবতার আগমন। কাছাকাছি দুটি মৃত্যু এবং মহাবৈশ্বিক চিন্তাভাবনায় কোনটাই কোনটার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়। নিয়াত্তার যুদ্ধটা এখান থেকেই শুরু। সে মৃত্যু দেবতার হাত থেকে নিজের বোনের আত্নাকে একরকম টানাটানি করেই ফিরিয়ে আনে। তারপর তার মৃতদেহের ভেতর তা পুরে দেয় – আর জাদুর মত তার বোনও মৃত্যুর কোল থেকে ফিরে আসে! জাদুবাস্তবতা অথবা শিশুমনের অলীক কামনা। কিন্তু এভাবেই তাদের অভিযাত্রার সূত্রপাট।

তাদের প্রথম বিরতি এক রঙ্গমঞ্চে – দ্য বিগ হোয়াইট সার্কাস। আরো ভালোভাবে বলতে গেলে স্রষ্টা -‘র সার্কাসে। সবার সামনে একটা মেয়েকে কেটে টুকরো টুকরো করা হয় এবং তার হাতের ছোঁয়ায় তারপর ভোঁজ়বাজির মত তা আবার জুড়েও দেওয়া হয়! দর্শকদের মধ্য থেকে এবার অনুরোধ নেওয়া পালা, প্রথমে চেয়ার, তারপর মাছ, এবং সবশেষে এক হাতি – এবং আর্শ্চর্যজনকভাবে এবারও জাদুর মত সে শুধু বলে – এবং তা হয়ে যায়! তবে দর্শকদের মনোরঞ্জনের পর্ব শেষ হলে স্রষ্টা-‘রটা শুরু। এক প্রবল স্রোতের বন্যায় সবার ভেসে যাওয়া, “নোয়া’হ ফ্লাড” যেন। চারিদিক যতদুর চোখ যায় কেবল পানি আর পানি, কিন্তু নিয়াত্তা আর নিয়াকোর “আর্ক”-এ প্রাণীকূলের প্রতিনিধি হিসেবে কেবল তারা ভাইবোন দুজন বিড়াল আর তাদের “প্রিয়” পোষ্য শুকর(Cat Soup Original দ্রষ্টব্য)। লৌহ-পাখার এক প্রজাপতি উড়ে যায়। নিয়াত্তা আবারো বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হতে থাকায় তার বোনের পরিচর্যা করা শুরু করে, তাকে খাইয়ে দেয়, এমনকি পোষ্য শুকরের ক্ষতি করে হলেও – নৈতিকতা আর ভাবাদর্শ চুলোয় যাক(আক্ষরিকভাবেই!), পরিবারই সবার আগে অবশ্যই!

Screenshot_2016-02-21-11-00-12

এই নৌকায়ই নিয়াত্তার দেখা পানিতে ভাসতে থাকা মৃত পশুর জীবনচক্র – তার মৃতদেহের পাখিদের পেটে যাওয়া, শিশুপাখির মল হিসেবে পানি-বাতাস পেরিয়ে আবার ভুপৃষ্ঠে ফিরে আসা, অতঃপর পুষ্টি হিসেবে কাজ করে গাছের ডালে ফুল হিসেবে ফোটা। “Adventure Time” কার্টুন সিরিজের মাসাকি ইউয়াসা পরিচালিত পর্ব Foodchain-এ এই থিম পরবর্তীতে আরো বিশেষভাবে ব্যক্ত হয়েছে।

Screenshot_2016-02-21-11-02-09

অনেক তো সুখের সময় গেল – এপর্যায়ে স্রষ্টা-‘র পুনরাগমন। এবং তার খাওয়ার দৃশ্য। এবং অনেকটা তার খামখেয়ালীপনার কারণেই চারিদিক পানিতে ভেসে যাওয়া জায়গাগুলোরই এখন ধুঁ ধুঁ মরুভূমি হওয়ার পালা। “নোয়া’স ফ্লাড” হয়েছে আর “জোসেফ’স ফেমাইন” হবে না? প্রথমে পোষ্য-শুকর এবং পরে মরুভুমির নিচ থেকে বের করা জল-হস্তীর মৃত্যুর পর জলের অভাবে ধুঁকতে থাকা দুই ভাইবোনের এবার আশ্রয় হয় এক স্যাডো-ম্যাসোকিস্ট বুড়োর দূর্গে। আর এখানেই মুভির অন্যতম সেরা দৃশ্যের অবতারনা। খাবার টেবিলে বুড়ো নিয়াত্তা আর নিয়াকোর জন্য আয়োজন করে রাজকীয় ভোজ়ন আর তার পূর্বের রন্ধনদৃশ্যও! মৃত্যু নিয়ে Cat Soup-এর গাঢ়-রসিকতার চূড়ান্ত প্রদর্শনী। নিশ্চিতভাবেই নিয়াত্তার জন্য তা বেশ উপভোগ্যও ছিলো। যতক্ষন পর্যন্ত না তারা নিজেই আবার এর অংশ হয়ে যায় – ক্যাটস্যুপ-এর উপকরণ হিসেবে বিড়ালই তো লাগবে সবার আগে! নিয়াত্তা আর নিয়াকো কোনমতে বেঁচে ফিরে। তবে এবার স্রষ্টা-‘র খামখেয়ালীপনার দ্বিতীয় পর্বের শুরু।
Screenshot_2016-02-21-11-10-34

গড-এর হাত থেকে পরে যাওয়া খাবারের টুকরো ঘড়ির কল-কব্জা আটকে দেয়। আটকে যায় সময়ও। নিয়াত্তার নিজের বোনকে ফিরিয়ে আনার যুদ্ধটা যতটাই স্রষ্টা-‘র বিপক্ষে হোক না কেন, এক্ষেত্রে তাঁর ভ্রুক্ষেপ নেই বললেই চলে – পুরোটাই তার উপভোগের বিষয়, এখানে কেউ তাঁর সহযোগী নয়, কেউ তার শত্রু নয়। আটকে থাকা সময়ে নিয়াত্তা ঘুরে বেড়ায় পৃথিবীর বুকে। তার দেখা হয় আপাতত সময়ে আটকে থাকা, শীঘ্রই ট্রেনের নিচে চাপা পরে মরতে যাওয়া এক নারীর সাথে। নিয়াত্তা তার চোখে লেগে থাকা শক্ত হয়ে যাওয়া দুঃখ মুঁচড়ে খুলে নেয় এবং নিচে আছড়ে ফেলে। তা ভেঙ্গে চুরমার হয়। জীবনের সব সৌন্দর্য আর ভালোলাগার দেখা পাওয়ার জন্য কষ্টগুলো পার হওয়া খুবই তুচ্ছ। যাত্রাটা দুর্গম কিন্তু অসম্ভব নয়। লজ্জা, অপমান, ব্যর্থতা – সবকিছুর কষ্ট সহ্য করে হলেও কি বেঁচে থাকাটাই গুরুত্বপূর্ণ না?

Screenshot_2016-02-21-11-12-19

ঘড়ির কাঁটা সামনে এবং তারপর পিছে আগায়। এবার একগাদা অসংযুক্ত ভিনিয়েট পর্দায় খেলা করে। Mind Game[৩]-এর অনুরূপ! বিড়াল-সহোদর সময়ের চক্রে বুড়ো হয়ে যায়, আবার ফিরে আসে। মানুষেরা পেছনে দুপায়ে হাঁটতে হাঁটতে আদি-বানরের চারপায়ে নেমে আসে, সরীসৃপেরা ডাঙ্গা ছেড়ে নেমে যায় প্রাগৈতিহাসিক জলে। ডাইনোসরদের নির্বংশ করা উল্কাপিন্ড তার অধিবৃত্ত পথে অভিকর্ষ ত্যাগ করে ফিরে যায় মহাকাশে। “উন্নত” মানুষের হিংস্রতার খন্ডচিত্র দেখা যায় – মানুষ মারা যায়; যুদ্ধের মিসাইলে, বন্দুকের গুলিতে, দালানের ধ্বসে, গাড়ি দূর্ঘটনায়। আর এ সবকিছুই হয় নিস্পৃহ স্রষ্টা-‘র ভোজনামোদের অংশ। বিড়াল-সহোদর আবার তাদের নৌকায় ফিরে আসে। কর্দমাক্ত নোংরা জলে যান্ত্রিক মানুষের দেখা মেলে। পুনরাগমন ঘটে লৌহ-ডানার প্রজাপতির। ভাইবোনকে সে পথ দেখায়। আর দেখা মেলে সেই ফুলের, চক্রশেষে যার জন্ম হয়েছিল তাদের থেকেই। নিয়াকো তার প্রাণ ফিরে পায়। সুখী সমাপ্তী!

Screenshot_2016-02-21-11-18-05

অথবা শিশুমনের অলীক কামনা। নিয়াত্তার জীবনের সুখের স্মৃতিগুলো হারাতে থাকে একেক করে – তার বাবা, তার মা, সব শেষে তার বোন। এমনকি সে নিজেও হারিয়ে যায়। মৃত্যুর পর সবই সমান। অন্ধকার।

তাই প্রতিটি মূহুর্তই গুরুত্বপূর্ণ। জীবনে টিকে থাকা, তা যত কষ্ট সহ্য করেই হোক, সবসময়ই তা বিলিয়ে দেওয়ার চেয়ে সুন্দর। কারণ জীবনের প্রতিটি স্মৃতিই, প্রতিটি মূহুর্তই গুরুত্বপূর্ণ। জীবনের অংশ হও। তা এমনকি ছোটবেলায় পরিবারসহ সৈকতে গিয়ে তোলা কোন ছবিতে হলেও

vlcsnap-2016-02-21-17h47m20s104

 

 

[১] – [https://en.wikipedia.org/wiki/Masaaki_Yuasa]

[২] – [http://kisscartoon.me/Cartoon/Adventure-Time-with-Finn-Jake-Season-06/Episode-007-008?id=3768]

[৩] – [https://en.wikipedia.org/wiki/Mind_Game_(film)]

পিংপং দ্য অ্যানিমেশন – ব্যর্থতা, সংগ্রাম আর জীবনের শৈল্পিকতা — Fahim Bin Selim

[Ping Pong the Animation স্পয়লার সতর্কতাঃ নিজ দায়িত্বে পড়ুন]

পিংপং দ্য অ্যানিমেশন গতবছর দেখা অংগোয়িং অবস্থায়, সপ্তাহে এক পর্ব করে , এপ্রিল থেকে জুন অবধি। আর এটা ছিলো আমার গতবছরের সবচেয়ে প্রিয় অ্যানিমে। গত মাসে এর ডাব বের হওয়ায় কিছুদিন আগে পুনরায় দেখা শুরু করেছিলাম। আমি কি এখনোও মনে করি, পিংপং দ্য অ্যানিমেশন ২০১৪-এর সেরা অ্যানিমে? Does it hold up?

 

“There are no heroes.”

-Kazama

                      vlcsnap-2015-07-14-17h09m11s124
হোশিনো ইউতাকা – পেকো। পিংপং খেলায় অসাধারন প্রতিভাবান, আঞ্চলিক বয়সভিত্তিক প্রতিযোগীতায় দুর্জেয়, চারিদিক সমাদৃত। অত্যুৎসাহী, খামখেয়ালী। আর উদ্ধত। ছোট পুকুরের বড় মাছ।
কিন্তু একেবারেই প্রথম পর্বে কং-এর কাছে পরাজয়ে পেকো প্রথম এক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পায় – সম্ভবত সবার জীবনেরই কোন না কোন এক মুহূর্তে যার সমুক্ষীন হতে হয় – “You are not the center of the Universe.” এতদিন পেকোর কাছে পিংপং ছিলো শুধু সাফল্যগাঁথা। কিন্তু এই প্রথম পেকো মুদ্রার অপর পিঠটাও দেখে। এতদিন যে শুধু বিজয়কেই অবশ্যম্ভাবী বলে ধরে নিয়েছিল, যার সন্তরণ জল ছিল স্থির আর অগভীর – সে অনাকাঙ্খিত এক ব্যর্থতার স্বাদ পায়, সমুদ্রের প্রথম স্পর্শেই খেই হারায়। প্রথম বুঝতে পারে তার আপাত উজ্জ্বল, ঈর্ষনীয়, গুরুত্বপূর্ণ অস্তিত্ব মহাকালের প্রবাহে খুবই ম্রীয়মান, তুচ্ছ, আর গুরুত্বহীন। তার পরিচিত জগৎ তাসের ঘরের মত দুমড়ে পরে। ১১-০ তে হারা এক ম্যাচ, শুধুমাত্র একটি ম্যাচের ব্যর্থতা পেকোর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়, তার জীবন সম্পর্কে ধারণা আমূল বদলে দেয়।

                   vlcsnap-2015-07-14-17h19m14s26
আর এই ব্যর্থতা হল পিংপং দ্য অ্যানিমেশনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং বারবার ফিরে আসা প্রসঙ্গ। ব্যর্থতা, সংগ্রাম, বাস্তবতার সাথে মানিয়ে নেওয়া। কোন অত্যুক্তি  না, কোন লুকাছাপা না। আর এখানেই মনে হয় এই গল্প আর বেশিরভাগ  স্পোর্টস অ্যানিমে থেকে আলাদা। পিংপং দ্য অ্যানিমেশনের গল্প জীবনের সামগ্রিকতা নিয়ে, সকল ক্ষেত্রে সংগতিপূর্ণ। এর কাহিনী প্রত্যেক চরিত্রের কাছে খেলাটার আলাদা আলাদা অর্থ নিয়ে, তাদের জীবনাভিপ্রায়ের বৈপরিত্য নিয়ে। অবশ্যই পিংপং দ্য অ্যানিমেশন, পিংপং খেলা নিয়ে অ্যানিমে। কিন্ত এখানে খেলাটা সবসময়ই নেপথ্য বিষয়, কেবলই অন্তর্নিহিত বক্তব্যের বাহক মাত্র। পিংপং দ্য অ্যানিমেশন কখনই তার চরিত্রদের ভুলে যায় না, তাদের খেলার বাইরের জীবনটাকে ভুলে যায় না – তাদের পরিবার, তাদের পারিপার্শ্বিকতা, তাদের বেড়ে ওঠা।
এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ অ্যানিমের দুই পার্শ্বচরিত্র – ক্যাপ্টেন ওতা আর সাকুমা। ওতা, ছোটবেলার থেকেই সে পিংপং খেলার প্রতি প্রবল ভালো লাগা নিয়ে বড় হয়েছে। কিন্তু হাইস্কুলের পিংপং ক্লাবে যোগ দিয়ে পেকো আর স্মাইলের দেখা পাবার পর, বাস্তবতা বুঝতে তার খুব বেশি বেগ পেতে হয় না। তাদের সাথে তার পার্থক্যটা যে আকাচচুম্বী! কং এর কাছে পেকোর হারে যা আরো সুসংহত হয়। বড় মাছেরাই যেখানে হাবুডুবু খায়, ছোট পুকুরের ছোট মাছদের অসম্ভবত স্বপ্ন দেখাটা তো রীতিমত অপরাধের পর্যায়ে পরে। আর একারণেই তার কাছে পিংপং খেলাটা কেবলই উপভোগের জন্য, হাইস্কুলের শেষ সময়টায় কিছু স্মৃতি রেখে যাওয়ার জন্য। সে আর নামকরা পিংপং খেলোয়াড় হওয়ার স্বপ্ন দেখে না, পারিবারিক ব্যবসার হাল ধরাই জীবনের একমাত্র নিয়তি হিসেবে মেনে নেয়।

                 vlcsnap-2015-07-14-17h10m18s213
সাকুমার জন্য অবশ্য ব্যাপারটা এতটা সহজ না। সাকুমা, খেলার প্রতি যার আবেগ আর কারো চেয়ে কম না; যে বড় হয়েছে পেকো আর স্মাইলের মত প্রতিভাদের সাথে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বীতায়; যে দুর্দম, দৃঢ়কল্প। কিন্তু পরিশ্রম, অধ্যবসায় আর আবেগ কতটা দূর পর্যন্ত নিয়ে যাবে যদি প্রতিভাটাই না থাকে? যদি পরাস্ত হতে হয় অপরিবর্তনীয় কোন নিয়তির কাছে? ওতা যেটা আগে থেকেই জানতো, আকুমার তা উপলব্ধি করতে লাগে ছয় পর্ব; যখন তাৎপর্যবহুল, ষ্মরনীয় এক ম্যাচে সে স্মাইলের কাছে বিপুল ব্যবধানে পরাজিত হয় – অতঃপর তার পিংপং ক্লাব থেকে বহিষ্কৃত হয়। সাকুমা আগে অনেকবারই ব্যর্থতার মুখোমুখি হয়েছে, কিন্তু কখনোই এভাবে না। পারতপক্ষে তার ছোটবেলা কেটেছে পেকোর কাছে বারবার হার মেনে নেওয়ার পরিচিত অনুভূতি নিয়ে। পেকো ছিল অস্পৃশ্য। যাকে হারানোই ছিল তার কাছে অভিষ্ট লক্ষ্য, পরম সাফল্যের প্রতিরূপ। সাকুমা, যে এতদিন শুধু পেকোকেই সাফল্যের দুর্দমীয় চূড়া হিসেবে ভেবে এসেছে, এবং তা অবশেষে জয় করেছে, কিন্তু তাতে এতোটাই বিভোর ছিলো যে বাকি কোন কিছুর প্রতি কোন ভ্রুক্ষেপ করেনি, বুঝতে পারে স্মাইল তাদের দুজনকে বেশ আগেই অতিক্রম করে গেছে, এবং বেশ ভালোভাবেই। বাস্তবতা আকুমাকে অবশেষে অপ্রীতিকর সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। সে বুঝতে পারে নিজের অনেক পছন্দের এই খেলায় সে কখনোই সাফল্য পাবেনা, অনেক আরাধ্য এক স্বপ্ন তার কখনোই বাস্তবায়িত হবে না।

               vlcsnap-2015-07-14-17h12m00s28
কিন্তু তবুও সাকুমার গল্পটাই এই অ্যানিমের সবচেয়ে করুণ হতাশার গল্প নয়। কং ওয়েঙ্গার গল্পটা স্বর্গ থেকে মর্ত্যে পতনের। তার জন্ম পিংপং-এর দেশে। খেলোয়াড় জীবন কতটা কঠিন আর নিষ্ঠুর হতে পারে, তা নিয়ে কং এর কখনোই কোন বিভ্রম ছিলো না।  প্রতিভা কোন অভাব তার ছিলো না, দৃঢ়তারও – বরং তার একমাত্র শত্রু ছিলো ভালো করার চাপ, ব্যর্থ হবার আতঙ্ক। শুধুমাত্র একটি হারের কারণেই তাকে কিনা আসতে হল জাপানের মত ছোট এক দ্বীপরাষ্ট্রে, প্রতিভার প্রমাণ দেওয়ার জন্য! পিংপং হয়ে উঠলো তার বাড়ি ফেরার টিকেট।  কিন্তু সেই সাধারন জাপানী-দের কাছেই যখন তাকে হার মানতে হল – প্রথমে স্মাইলের সাথে না হেরেও হেরে, আর তারপর ষোলকলাপূর্ণ করতে কাজামার কাছে নাস্তানাবুদ হয়ে – তখন তার সামনে নতুন এক বাস্তবতার আগমন ঘটল। কিন্তু সেটা ছিলো তার শিক্ষার অর্ধেক মাত্র।

                  vlcsnap-2015-07-14-17h12m58s91

অনবদ্য ঘটনাপ্রবাহে, প্রচারকালের মাত্র ১৩০ মিনিটের মাথায়, এক নাকউচুঁ অভিজাত থেকে সে পরিণত হল সবচেয়ে ভালো লাগার চরিত্রে। কং নতুন উদ্দ্যমে শুরু করে, নতুন আদর্শ আর দর্শনে দীক্ষিত হয়ে। কিন্তু পরপর দ্বিতীয়বারও কং-কে পরাজয়ের গ্লানি বইতে হয় – এবার পেকোর কাছে। প্রতিযোগীতা নিষ্ঠুর – অনেক সময় কেবল ভালো আর খারাপের পার্থক্যকারী না, ভালো আর অধিকতর ভালোর নিরূপণেরও মঞ্চ।

                 vlcsnap-2015-07-14-17h13m48s118
কাজামা যতই “হিরো”-তে অবিশ্বাসী হোক, তার একজন ত্রানকর্তার প্রয়োজন ছিলো আর যে কারোর চেয়ে বেশি। সে বড় হয়েছে পিংপং-কেন্দ্রিক এক পরিবারে। পারিবারিক চাপ তাকে বাধ্য করেছে পিংপং খেলতে, সে খেলায় ভালো হতে। কারণ তাতে মিশে আছে পরিবারের সম্মান, তাদের কম্পানীর বানিজ্যিক ভবিষ্যৎ। নিজস্ব  ইচ্ছা যেখানে পারিবারিক দাবির কাছে বন্দী। পিংপং কং-এর কাছে আর বাকিদের মত ভালোবাসার কোন স্থান না, স্বপ্নপুরনের মঞ্চ না, বরং বেঁচে থাকা, পরিবারকে টিকিয়ে রাখার জন্য আবশ্যকীয় বিষয়। চিরচেনা গল্প?

স্মাইলেরও বড় হওয়া ভাঙন ধরা পরিবারে, কিন্তু তার অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীত।  তার জীবনে এমনিতেই হতাশার অনেক কারণই উপস্থিত, সেখানে নতুন করে পিংপং যোগ করার কোন ইচ্ছা তার কখনোই ছিলো না। প্রতিভা যতটাই থাকুক। পিংপং তার কাছে আর সবার মত প্রতিযোগীতা না, বরং মুখে “হাসি” ফুটানোর নিয়ামক। এবং ততোটুকুই। পিংপং-ই তাকে মানুষের সান্নিধ্যে এনেছে, তাকে যান্ত্রিকতা থেকে মুক্তি দিয়েছে, তাকে শিখিয়েছে লোহার মত স্বাদ হলেও তার ধমনী-শিরা দিয়ে বয়ে যাওয়া তরলপ্রবাহ, রক্তই, আর সবার মত লাল। স্মাইলের নতুন কোন হিরো-র প্রয়োজন ছিলো না, তার যে ইতিমধ্যেই একজন আছে। পুরো অ্যানিমে জুড়ে তার খোলসের মধ্যে চলে যাওয়া, সেই নায়কে পুনরাবির্ভাবের জন্য সংকেত হিসেবে পাঠানো – ব্যাটসিগনাল। কারণ সেই নায়কই  তখন বিধ্বস্ত, পথহারা।

                 vlcsnap-2015-07-14-18h00m01s170

সাকুমা পিংপং খেলা ছেড়ে দেয় কিন্তু যাওয়ার আগে সে তার আগে সে তার আগে “মুক্ত” করে দিয়ে যায় পেকোকে। পেকোর সহজাত প্রতিভা, তার নিজের যেটা কখনোই ছিলো না, ধ্বংস না করার পরামর্শ দেয়। আর পেকো, সে যখন তার অধপতনের চূড়ান্তে পৌছেছে, তখনই তার অতীত দিনে কথা মনে পড়ায়, খেলার প্রতি তার অগাধ ভালোবাসার কথা মনে পড়ায়, নতুন শুরুর মন্ত্রণা পায়। মাঝে মাঝে নায়কদেরও রক্ষাকর্তা দরকার হয়!

বারবার ব্যর্থতার কথা বললেও পিংপং দ্য অ্যানিমেশন শুধু নিরাশার গল্প না। বরং সম্পুর্ণ বিপরীত। বাস্তব ঘেঁষা, পতনের অনিবার্যতার কথা বলা; কিন্তু তা মেনে নিয়ে উত্তরনের, হার না মানার, এর সবটুকু উপভোগ করার বার্তাবাহী। পেকো ফিরে আসে, ভষ্ম থেকে, দুর্নিবার অগ্নিস্ফুলিঙ্গ নিয়ে; সে নিজে কং-কে মুক্তি দেয়, কাজামাকে মুক্তি দেয়। উড়তে শেখায়। কং জাপানকে আপন করে নেয়, কাজামা  নিজেকে ছাড়িয়ে নেয় প্রত্যাশা আর পারিবারিক চাপের দাসত্ব শিকল থেকে। সেই সাথে পিংপং দ্য অ্যানিমেশনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন বার্তাটা দিয়ে যায়।

জীবন কোন অঙ্কের সমীকরণ না, যে নির্দিষ্ট পদক্ষেপ অনুসারে চললে আকাংক্ষিত ফলাফল পাওয়া যাবে। জীবন আরো বেশি কিছু, আরো জটিল কিছু। হয়তো তা পিংপং খেলার মতই। জীবনে “জয়ী” হওয়া কখনোই সম্ভব না। এখানে সাফল্য কখনোই চিরস্থায়ী না। এখানে ব্যর্থতাও কখনোই চিরস্থায়ী না। কারণ জীবনের মহাত্ব্য কখনোই না পরাতে নয়, তা অবশ্যম্ভাবী, বরং পুনরোড্ডয়নের দৃঢ়কল্পতায়; তা থেকে শিক্ষালাভটাই আসল। জীবন সবকিছু নিয়েই, চিরবহমান, ধুসর।

                    

                 vlcsnap-2015-07-14-17h21m52s80        


vlcsnap-2015-07-14-17h21m19s1

আসলেই বাস্তব জীবনে নেই কোন কোন সুপারম্যান, ব্যাটম্যান; নেই কোন সুপার সেন্তাই, কামেন রাইডার। নেই কোন অতিপ্রাকৃত ক্ষমতাসম্পন্ন, অজেয় অতিমানব – যে বিপদের সময় রক্ষা করবে অবিশ্বাস্য দক্ষতায়; যার নাম ঘুরবে মানুষের মুখে মুখে, আর ত্রাস ছড়াবে দুর্বৃত্তদের হৃদয়ে। কিন্তু একজন “হিরো”, ত্রানকর্তা, অনুপ্রেরণার উৎস হওয়ার জন্য সেগুলোই একমাত্র গুণ? বাস্তব জীবনের নায়কেরা সম্ভবত কমিক বই আর চলচ্চিত্রের মত সার্বজনীন না; অনেকটা ব্যক্তিগত। হয়তো একজন বন্ধু, একজন শিক্ষক, হয়তো বাবা-মা বা কোন এক সহচর। বাস্তব জীবনের নায়করা আর যে কারোর মতই সাধারন, মানবিক আর অনেকাংশে ত্রুটিপূর্ণ।

                   vlcsnap-2015-07-14-17h19m03s163

মাত্র ১১ পর্বে – ২২০ মিনিটের প্রচারকালে পিংপং দ্য অ্যানিমেশন বলেছে কিছু উদীয়মান পিংপং খেলোয়াড়, অবিস্মরনীয় চরিত্রদের তারুন্য, তাদের বিশ্বাস, তাদের স্বপ্ন, তাদের সংগ্রাম, তাদের বেড়ে ওঠা,  “কামিং-অফ-এজ”-এর গল্প। এক বছর আগে পিংপং দ্য অ্যানিমেশন দেখা আমার কাছে যে অভিজ্ঞতা ছিল, ভালো লাগার জায়গাটা এক থাকলেও, এখন তা সম্পূর্ণ ভিন্ন।  সহজে বোধগম্য, আপাত দৃষ্টিতে সাধারন এক গল্প, কিন্তু অনেক বেশি ঘনিষ্ট, অনেক বেশি পরিচিত। অনেক বেশি অনুপ্রেরণার – এক “হিরো”।

আমি কি এখনো মনে করি পিংপং দ্য অ্যানিমেশন ২০১৪ সালের সবচেয়ে সেরা অ্যানিমে?
পিংপং দ্য অ্যানিমেশন আমার দেখা সবসময়ের সবচেয়ে প্রিয় অ্যানিমেরগুলোর তালিকায় একেবারে উপরের সারিতে থাকবে।