এন্ডলেস এইট আর মেলানকলি অফ ইউকি নাগাতো — Fahim Bin Selim

[The Melancholy of Haruhi Suzumiya এবং The Disappearance of Haruhi Suzumiya স্পয়লার সতর্কতা]
 
1
“কিওন-কুন, দেনওয়া!”
“ইউওয়ারেনদেমো, ওয়াকাত্তেইরু।”
Endless Eight-এর প্রথম দৃশ্য।
 
হারুহির ফোন, কিন্তু কিওনের মনে হয় আগে থেকেই সে জানতো তা আসবে। কীভাবে? আবার সুইমিং পুলে যখন সবার সাথে দেখা হয় – হারুহি কিছু বলার আগেই শব্দগুলো চলতে থাকে মাথায়, যেন সেগুলো অনেকবার শোনা। দেজা-ভ্যুঁ! কোইযুমি কী বলতে নিয়ে বলে না? পানির ধারে একাকী বসে থাকা নাগাতোর চেহারায় কি রাজ্যের হতাশা ভর করা? না একঘেয়েমি? ক্যাফেতে হারুহি লিস্ট করতে বসে গ্রীষ্মের ছুটির বাকি দুই সপ্তাহে যা যা করা হবে – ঘুরঘুরে পোকা ধরার প্রতিযোগিতা, খন্ডকালীন চাকরি, আকাশ পর্যবেক্ষণ, বেসবল প্র্যাকটিস, আতশবাজি উৎসব, সাহসের পরীক্ষা, চলচ্চিত্র দেখতে যাওয়া, সমুদ্রে সাঁতার কাটা, বোওলিং আর ক্যারাওকে! আর কিছু? আসাহিনা বলে, তার গোল্ডফিশ স্কুপিং-এর খুব শখ। নতুন আরেকটা যোগ হলো তাহলে – কিনগিও-সুকুই, সাথে কোনো ও-বোন উৎসবও ঘুরা হয়ে যাবে তাহলে!
সবাই যখন বাড়ির পথে হাঁটা ধরে, কিওন আবার লক্ষ করে নাগাতোকে। পেছন থেকে ডেকে জিজ্ঞাস করে সব ঠিক আছে কিনা। অভিব্যক্তিহীন চেহারায় এক শব্দের জবাব, গেনকি। আসলেই কি? গত কয়েক মাস ধরে যা কিছু সে সয়ে গেছে – কিওনের ত্রাণকর্তা হয়ে বারবার আবির্ভাব হয়ে।
 
 
2
“কিওন-কুন, দেনওয়া!”
 
লাইট নভেল ভলিউম ১ পুরোটা, আর ৩, ৫, ৬ এর অংশবিশেষ নিয়ে, ভলিউম ১ এর নামানুসারেই ২০০৬ সালে The Melancholy of Haruhi Suzumiya টিভি অ্যানিমের প্রথম সিজন প্রচারিত হয়। হয়তো ভাবা হয়েছিলো এক সিজনেই শেষ হয়ে যাবে, তাই ৬ পর্বের প্রথম আর্কের পর বাকি ৮ পর্ব মোটামুটি খন্ড কাহিনী নিয়েই তৈরি। মোট ১৪ পর্ব। কিন্তু জনপ্রিয়তার কারণে ২০০৯ সালে আবার ফিরে আসে, দ্বিতীয় সিজন নিয়ে। গতানুগতিক ধারায় দ্বিতীয় সিজন অবশ্য ঠিক বলা যায় না। নতুন আরো ১৪টি পর্ব, কিন্তু আগের ১৪ পর্বের সাথে আগে-পরে মিল করে একসাথে প্রচার করা হয় টিভিতে। মূল উপন্যাসগুলোয় কালক্রম অনুসরণ না করা হলেও, এখানে তা করা হয় – বসন্ত, গ্রীষ্ম, শরৎ, শীত – হাইস্কুলের প্রথম বর্ষ। এপ্রিলে স্কুল শুরুর দিন থেকে নভেম্বর-শেষে যখন শীত জাঁকিয়ে বসা শুরু করছে।
আরেকটা বড় পরিবর্তন – ভলিউম ৫ The Rampage of Haruhi Suzumiya-’র মাত্র একটি চ্যাপ্টার যেখানে Endless Eight, সেখানে টিভি অ্যানিমেতে তা দেখানো হলো আসলেই ৮ পর্ব ধরে! সিরিজের সবচেয়ে বড় আর্ক! উপন্যাস সবগুলোই লেখা কিওনের বর্ণনায়, সেখানে এটা যুক্তিসম্মতই যে কিওন আটকে থাকা সময়চক্রের কেবল শেষবারের কথাই মনে করতে পারবে। আর তার গ্রীষ্মের ছুটির শেষ দুই সপ্তাহের বর্ণনাও তাই হবে কেবল একবারের। তাহলে ৮ পর্ব ধরে বারবার একই জিনিস দেখানোর কী অর্থ? এই ৮টি পর্বের কারণেই যেখানে এই অ্যানিমের এত কুখ্যাতি!
প্রথমত, অবশ্যই তা কম খরচে টেলিভিশনের বেশি এয়ারটাইম দখলের জন্য না। কারণ প্রত্যেকটি পর্বের কাহিনী এক হলেও, তার প্রত্যেকটি আলাদা করে অ্যানিমেট করা। শুধু প্রথম আর শেষ পর্ব বাদে(মিৎসুহিরো ইওনেদা) বাকি সব পর্বের পর্ব-পরিচালক আলাদা। কোন দুই পর্বের একই সীনের মধ্যে মিল খুঁজে পাওয়া যাবে না। এমনকি প্রত্যেক পর্বের অ্যানিমেশন কিংবা ন্যারেটিভ স্টাইল একটা আরেকটার চেয়ে ভিন্ন। দ্বিতীয় পর্ব Endless Eight II যেমন আর বাকি সব পর্বের চেয়ে স্বতন্ত্র তার অতিউজ্জ্বল কালার কম্পোজিশনের জন্য, এই পর্বে আবার অনেক বেশি ফ্যানসার্ভিসও দেওয়া(পর্ব-পরিচালক তোমোয়ে আরাতানি)। তবে আমার সবচেয়ে প্রিয় পঞ্চম পর্ব Endless Eight V, যার পর্ব-পরিচালক সিরিজের নির্মাতা নিজেই – তাৎসুইয়া ইশিহারা(Hibike, Clannad, Kanon, Nichijou, Air)। এই পর্বে কিছু কিছু জিনিস আলাদাভাবে দেখানো, যা আর বাকি কোন পর্বে হয় না। এটা শুধু এই আর্কই নয় পুরো সিরিজেরই অন্যতম সেরা পর্ব। আগষ্ট ৩১-এর রাতে সময় যখন ১২টার দিকে আগায় তখন একই সাথে ক্যামেরাটাও ঘুরতে থাকে; বিছানায় থাকা কিওন আর ঘড়ির সেকেন্ডের কাঁটাটার মধ্যে পর্যায়ক্রমে বদলাতে থাকে দৃশ্য, যতক্ষণ না পর্যন্ত তিনটি কাটা মিলিত হয় একসাথে – সিরিজের অন্যতম সেরা দৃশ্যও এই পর্বে!
দ্বিতীয়ত,…
 
3
“কিওন-কুন, দেনওয়া!”
 
হারুহির ফোনে সকাল সকাল কিওনের ঘুম ভাঙ্গে। ও-বোন উৎসবে সবাই মিলে ইউকাতা পরে না গেলে গ্রীষ্মের ছুটি পূর্ণ হবে কী করে! হারুহি আর আসাহিনা গোল্ডফিশ স্কুপিং-এ যায়। কিওন ইউকিকে প্রথমে খাবার কিনে দিতে চায়, পরে আবার ইউকি মুখোশ কিনতে গেলে, তার টাকা দিতে চায়। ইউকি দুবারই না করে দেয়, ইই। দোকান থেকে আলট্রাম্যান-এর একটা মুখোশ কিনে নেয় ইউকি। আলট্রাম্যান – যে মানুষের দেহে স্থান নেওয়া প্রযুক্তিগত অত্যুন্নত ভিনগ্রহবাসী! আর কার মত যেন?
আতশবাজি ফাটানোর সময় কিওন প্রথম অযাচিত প্রসঙ্গটা তুলে। ছুটিতে মজা করে বেড়ানো ভালো, হ্যাঁ, কিন্তু এত যে বাড়ির কাজ বাকি তা কবে শেষ করবে সবাই! হারুহি জানায় সে তো তার গুলো আগেই শেষ করে ফেলেছে। কিন্তু বাকিদের কী হবে? পরদিন সারাদিন লাগিয়ে ঘুরঘুরে পোকাগুলো বাক্সে ধরে আবার দিনশেষে ছেড়ে দেওয়ার সময় কিওনের নিজেকে প্যান্ডোরা বলে মনে হয়। কিন্তু বাক্সটা সে তো খুলেছে আগেরদিন রাতেই।
 
 
4
“কিওন-কুন, দেনওয়া!”
 
২০০৬ আর ২০০৯ দু্টো সিরিজেরই শেষ পর্ব Someday in the Rain. নভেম্বর-শেষের কোনো এক দিন। কিওনের বাজারে যাওয়া প্রয়োজন। ঢালটা বেয়ে নামতে হবে, তারপর ট্রেনে আসা-যাওয়া, আবার ঢালটা বেয়ে উঠতে হবে। এই শীতল দিনে! হারুহির বাকপটুতার খাতিরে দোকান থেকে পটিয়ে পাওয়া বিনামূল্যের একটা হিটার নিয়ে আসার জন্য। আর নাগাতো বই পড়ে একা দিনটা কাটায় ক্লাবঘরে, যখন বাকি তিনজন ব্যস্ত আসাহিনার ফটোশ্যুট নিয়ে। বৃষ্টি পড়ার সম্ভাবনা ১০%। কিন্তু ফেরার পথেই তার শিকার হয় কিওন। ক্লান্ত আর কিছুটা কি বিরক্ত কিওন ক্লাবঘরে এসে ঘুমিয়ে পড়ে। সাথে উপস্থিত একমাত্র নাগাতো।
 
 
5
কিওন-কুন, দেনওয়া!
 
আসাহিনার ফোনে মধ্যরাতে ঘুম ভাঙ্গে কিওনের। মস্ত গোলযোগ! ভবিষ্যতে আর ফেরত যাওয়া যাচ্ছে না। আসলে ভবিষ্যতে বলেই তো আর কিছু নেই, যেখানে সময় এক চক্রের মধ্যে আটকে আছে। কোইজুমি ব্যখ্যা করে কিওনকে:
– We are currently looping through the same period of time over and over again.
– What?
– We are currently looping through the same period of time over and over again.
-…
– We are currently looping- (Endless Eight III, পর্ব-পরিচালক ইয়োশি কিগামি)
নির্দিষ্ট করে বললে আগষ্ট ১৭ থেকে আগষ্ট ৩১। গ্রীষ্মে ছুটির শেষ দুই সপ্তাহ। একই ১৪ দিন। বারবার। এর কারণেই তো বারবার দেজা-ভ্যুঁর অনুভূতি হচ্ছিলো! আগের চক্রগুলোর অবশিষ্ট স্মৃতি। বাকিদের স্মৃতি বারবার পুনর্লিখিত হলেও একজন কিন্তু প্রত্যেকটি ১৪ দিন একইভাবে মনে রেখেছে, স্থান-কালের বাধা থেকে যে মুক্ত।
কতবার এই চক্রর ভেতর দিয়ে গেছে নাগাতো?
১৫,৪৯৮ বার।
১৫,৪৯৯ বার।
১৫,৫১৩ বার।
১৫,৫২১ বার।
১৫,৫২৪ বার।
১৫,৫২৭ বার।
১৫,৫৩২ বার।
পেছনে দায়টা কার?
কোইযুমি জানায়, হারুহি।
 
 
6
“কিওন-কুন, দেনওয়া!”
 
২০১০-এর মুক্তি পেল ভলিউম ৪ নিয়ে পুরো একটা মুভি The Disappearance of Haruhi Suzumiya, ২ ঘন্টা ৪২ মিনিট, মোটামুটি হিসেব করলে ৮ টিভি পর্বের সমান!
এসওএস ব্রিগেডের বড়দিনের পার্টির ঠিক এক সপ্তাহ আগে, ১৮ আগষ্ট সকাল। কিওন ঘুম থেকে উঠে আবিষ্কার করে পুরো জগৎটা পালটে গেছে। হারুহি এখন আর তার স্কুলে পড়ে না, কোইযুমিও। আসাহিনা কেবলই উপর ক্লাসের একজন সিনিয়র। নাগাতো, লিটারেচার ক্লাবের একমাত্র সদস্য। কেউ এসপার না, টাইম ট্রাভেলার না, ইন্টেগ্রেটেড ডেটা এনটিটির ইনটারফেস না! সাধারণ মানুষ। কিওনের সাধারণ, চাঞ্চল্যহীন জীবনে।
প্রথম পর্বে ক্লাস শুরুর আগে কিওনের মনোলোগে যখন শোনা যায় – “Deep in my heart, I wished that aliens, time travelers, ghost, demons, espers or evil organizations might pop up in front of me. But reality is rather cruel.”, সেই বাস্তবতা ৯ মাস পর এসে নির্মমতার রূপ ধরলো? সেই সাদাকালো প্রোলোগের দৃশ্য, যা হঠাৎ করেই রঙিন হয়ে যায় যখন হারুহি ঘোষণা দেয়, “…Haruhi Suzumiya. I have no interest in ordinary humans. If there are any aliens, time travelers, sliders, or espers, come join me.”
হারুহির অগোচরেই যে এতদিন আসাকুরা এসে খুন করার চেষ্টা করলো কিওনকে, একের পর এক তৈরী হল ক্লোজড স্পেস, তারপর সময়চক্র; বেসবল ব্যাট থেকে ছুটলো হোমরানের ফোয়ারা, শরৎকালে সাকুরা গাছে ফুলে ভরে গেলো, লাল পায়রারা সাদা বেশ ধরলো, আসাহিনার লেন্স থেকে লেজার এসে আঘাত করতে নিলো কিওনকে। জগত ধ্বংসের কাছাকাছি চলে গেলো কয়েকবার।
এতদিন পর এসে কি কিওন হারুহির অত্যাচারে ক্লান্ত, বিরক্ত?
 
 
7
“কিওন-কুন, দেনওয়া!”
 
আকাশ পর্যবেক্ষণের রাত। নাগাতোর এপার্ট্মেন্টের ছাদে। কোইজুমির নিয়ে আসা টেলিস্কোপ। হারুহি বলে, এর চেয়ে ইউএফও খুঁজে বের করা মজার। কিওনকে জিজ্ঞেস করে সে ভিনগ্রহবাসীতে বিশ্বাস করে কিনা। নাগাতোর চোখ রাখা টেলিস্কোপে। বেসবল প্র্যাকটিস কিংবা সাহস পরীক্ষার সময়(Endless Eight V) কিওন ইউকিকে জিজ্ঞেস করে, সে কেন সময়চক্রের কথা আগে থেকেই তাদের বলেনি। নাগাতো জানায় অংশগ্রহণ করা তার কাজ না, সে কেবল একজন দর্শক।
কিন্তু আসাকুরার আক্রমণ, আসাহিনার লেজাররশ্মি, ক্লোজড স্পেসে ঝিঁঝিঁ পোকার আক্রমণ, কিংবা হারুহির সাথে আটকে পড়ার সময় কম্পিউটারে দিয়ে দেওয়া হিন্ট – বারবারই তো হস্তক্ষেপ করেছে ইউকি! আবির্ভাব হয়েছে ত্রানকর্তা হিসেবে! কিওনের।
বারবার চক্রে আটকে থেকেও তা মেনে নিয়েছে, কিওনের হোমওয়ার্ক যে এখনো করা হয়নি! নাগাতোর থাকার কথা ছিলো নীরব দর্শক। নিরপেক্ষ, অনুভূতিশূন্য। কিন্তু ইন্টেগ্রেটেড ডেটা এন্টিটির তৈরি হিউম্যানয়েড ইন্টারফেসেরও অনুভূতি জন্মাতে শুরু করলো।
 
 
“কিওন-কুন, আসাদায়ো, ওকিতে!”
 
…দ্বিতীয়ত, Endless Eight আর Disappearance-এর সমাপ্তীর সম্পূর্ণ গভীরতা উপলব্ধির জন্য Endless Eight-এর আটটি পর্বের মধ্যে দিয়ে যাওয়া এক রাইট অফ প্যাসেজ। Disappearance-এর কিওনের মনোলোগের মাঝে নিজের মাথায় পা রাখার দৃশ্যটা যেখানে পুরো সিরিজের সবচেয়ে আইকনিক দৃশ্য হিসেবে ধরা হয়, তখন আরো দুটো দৃশ্যের কথা ভুলে যাওয়া রীতিমত অপরাধই।
Endless Eight-এর শেষ পর্বের অবশেষে ক্যাফেতে বসে কিওন শেষবারের মত যখন চিন্তা করে আর কী করা বাকি আছে, তখন আগের ১৫,৪৩১ পুনরাবৃত্তির স্মৃতি তার মাথায় এসে হানা দেয়, আমাদেরও, অন্তত আগের ৭ বারের, হানাবি, সমুদ্রের ডাক, তারাভরা আকাশ, আর হাতে ফেরত আসা ঘুরঘুরে পোকা; ৭০ সেকেন্ডের মনোলোগের পর কিওনের ঘোষনা, “I HAVEN’T FINISHED MY HOMEWORK YET.”
প্যান্ডোরার বাক্স বন্ধ হলো। কিন্তু তার সবটুকুর জন্যই তো Endless Eight পার করে আসা দরকার ছিলো।
Disappearance-এর শুরুর কারণটা বুঝার জন্যও। এক আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্সের অনুভূতি জন্মানোর জন্য কী প্রয়োজন? এতদিন পর এসে হারুহির অত্যাচারে ক্লান্ত, বিরক্ত হওয়ার জন্য? তাকে বিষাদ গ্রাস করার জন্য? নীরব দর্শক থেকে সম্পূর্ণ জগতটাই পালটে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার মত অবস্থায় পৌছানোর জন্য? এর চেয়ে বেশি অংশগ্রহণ তো আর সম্ভবও না!
আসাকুরা, আসাহিনা কিংবা ঝিঁঝিঁপোকার আক্রমণ, সবকিছুই অনুঘটক কিন্তু তার চেয়েও বেশি ১৫,৪৩২ বারের সময়চক্রে আটকে থাকা; ১৫,৪৩২ বার, ২ সপ্তাহ করে, ২১৭,৪৪৮ দিন, ৭,১৪৮ মাস…প্রায় ৫৯৫ বছর। হারুহি কিংবা কিওনের খেয়ালের কারণে। হাসপাতালের ছাদে কিওন আর নাগাতো…ইউকির কথোপকথনের সময় তো কেবল আগের আড়াই ঘন্টার কাহিনীই না, Endless Eight-এর প্রতিটি মুহূর্ত তুষারপাতের মত এসে স্মৃতিতে জমা হয়। এত কিছুর পর এবার Great Goddess ইউকিরই তো এক ত্রানকর্তার দরকার ছিলো। আর কিছু না হোক, কেবল একটি কথা বললেই হবে-
 

আরো টুডি এনিমেশন মুভি – লেখক ব্লগার স্বাধীনতার বার্তা

টুডি এনিমেশন মুভি নিয়ে আগের পোস্টটা দিয়েছিলাম গত বছর। এবার আরো কিছু টুডি ফিল্ম নিয়ে হাজির হলাম। আগেরবারের মতই কোন নির্দিষ্ট ক্রমে লিখলাম না। যখন যেটার নাম মনে আসে তখনই সেটা লিখলাম। এগুলোর বেশিরভাগই গত এক বছরের মধ্যে দেখা। আর শিরোনাম টুডি এনিমেশন মুভি হলেও এই পোস্টের সবগুলো শুধুই জাপানীজ এনিমে। স্বাগতম আমার পোস্টে।

#১। Colorful (2010):

Colorful
মৃত্যুর পর একটি আত্মাকে সুযোগ দেয়া হয় আবার পৃথিবীতে ফেরত যাওয়ার। এই আত্মাকে মাকোতো কোবাইয়াশি নামে এক কিশোরের জায়গায় রিপ্লেস করা হয়। অন্যদিক এ মাকোতো নামের ছেলেটি আত্মহত্যা করে। তাকে বলা একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তাকে তার আগের জীবনের পাপকে খুঁজে বের করতে হবে। আর তাকে আরো বলে হয় ঠিক কোন ঘটনা মাকোতোকে আত্মহত্যার পথে নিয়ে গেছে তা খুঁজে বের করতে।
ডিরেক্টর Keiichi Hara এর দ্বিতীয় বিগ প্রোডাকশন। এর আগের মুভি ছিল Summer Days with Coo (২০০৭)। তারো আগে এই ডিরেক্ট কিছু টিভি সিরিজ, সেই রিলেটেড মুভি ও কিছু অল্প বাজেটের মুভি বানিয়েছেন। Colorful ছবিটি ২০১০ সালে Mainichi Film Award এ এনিমেশন গ্র্যান্ড এওয়ার্ড জিতে নেয়।
এখন আমার মন্তব্য বলতে গেলে আমি বলব খুবই unsettling মুভি। কয়েকদিন কেমন যেন খচখচ করেছে মুভিটা দেখার পর। দেখার মত।

#২। Summer Days with Coo (2007):

Summer Days with Coo

এটা বাচ্চাদের জন্য বানানো।
Kappa জাতের এক Yokai (ভূত) ২০০ বছর পর নিজেকে মডার্ন টোকিওতে আবিষ্কার করে। Kouichi Uehara নামের এক পিচ্চি তাকে খুঁজে বের করে। এরপর কাপ্পা চায় এই পরিবেশে খাপ খাইয়ে নিতে।
খারাপ না।

#৩। Redline (2010):

Redline
“Sweet JP” প্রায় জিতে যাচ্ছিল ইয়েলো লাইন আর তার হাতে এসে যাচ্ছিলি রেড লাইনের টিকেট। কিন্তু শেষ মূহুর্তে প্রতিশ্রুত ম্যাচ ফিক্সিং এর কারনে বরন করে নিল সবার শেষ পজিশন। কিন্তু পপুলার ডিমান্ড আর কয়েক রেসারের রেড লাইন বর্জন করায় সে শেষ পর্যন্ত চান্স পেল রেড লাইনে। তার সারা জীবনের স্বপ্ন রেড লাইন জেতা। এখন সে কি আবার ম্যাচ ফিক্স করবে নাকি রেড লাইন জেতার চেষ্টা করবে?
মনে হচ্ছে খুবই সুন্দর একটা স্পোর্টস কাহিনী। কিন্তু ওয়েট এ মিনিট! এখানের সব রেসাররাই বিভিন্ন এলিয়েন। রেসটা একটা ইলিগ্যাল রিয়েলিটি শো। তার উপর পুরো এডাল্ট ওরিয়েন্টেড। এটা বানানো হয়েছে পুরোই Speed Racer সিরিজের ছায়ায়।
তবে একটা কথা আমি বলব, ছবির বিভিন্ন জায়গায় যতই গজগজ করি না কেন, শেষ আধা ঘন্টা স্ক্রিন থেকে চোখ সরাতে পারিনি। এটার এনিমেশন প্রশংশাযোগ্য। UK Anime Network এর রিভিউতে বলা হয়েছে “A sense of the cool and outrageous is seeped into every pore of the design” অন্যদিকে আরে রিভিউ এ বলা হয়েছে, “Speed Racer on crack”। তবে ছবি দেখা শেষ হয়ে যাওয়ার পর খুব বেশিদিন মনে থাকবে না। এটার আমেরিকান ডিস্ট্রিবিউটর ফানিমেশন এটাকে ২০১১ এর এনিমেশন বিভাগে অস্কারের জন্য সাবমিট করেছিল। আমার মতে এটার চেয়ে Colorful কে সাবমিট করলে ভালো হত। কিন্তু শুনেছি অস্কারের নিয়ম অনুযায়ী এনিমেশন বিভাগে সাবমিশনের জন্য অন্তত এক সপ্তাহের জন্য আমেরিকার কোন হলে সিনেমাটা চলতে হয়। অন্যদিক এ Colorful এখনো ইংলিশ ডাব এর জন্য লাইসেন্সই হয় নাই। :@
যাই হোক রেডলাইন খারাপ না। কিন্তু আপনার মাথা ঘুরাতে পারে এনিমেশন স্টাইলটার জন্য।

#৪। The Wings Of Honneamise (1987):

The Wings Of Honneamise
একটি দেশ স্পেস প্রোগ্রাম শুরু করেছে। এই দেশের সাথে পাশের দেশের আবার যুদ্ধ আসন্ন। প্রোগ্রামের মাঝখানে মাঝখানে অনেক সমস্যাও রয়েছে। এর মাঝেই রয়াল স্পেস ফোর্স তাদের স্পেস কার্যক্রম শেষ করতে চায়।
স্টোরিটা অনেক সিম্পল। এনিমেশন ও সিম্পল। সবকিছুই সিম্পল।

#৫। Jin-Roh the Wolf Brigade (1999):

Jin-Roh the Wolf Brigade
টোকিও শহরে চলছে দাঙ্গা। এর মাঝেই টেরোরিস্ট গ্রুপ সেক্ট এই দাঙ্গায় বোমা হামলার পরিকল্পনা করে। আর এ কাজে তারা ব্যাবহার করে ছোট ছোট মেয়েদের। যাদের বলা হয় ‘লিটল রেড রাইডিং হুড’। এমনই এক মেয়ে, করপোরাল কাযুকি এর সামনে আত্মহত্যা করে। এভাবেই শুরু হয়।
ছবিটার ডিড়েক্টর Hiroyuki Okiura এবং রাইটার Mamoru Oshii (Ghost in the Shell সিনেমা দুইটার ডিরেক্টর)। পলিটিক্যাল ব্যাকগ্রাউন্ড হিসেবে ১৯৫০-১৯৭০ এর জাপানকে বেছে নেয়া হয়েছে।
আমার ভালো লেগেছে সিনেমাটা। একটু পর পর লিটল রেড রাইডিং হুড থেকে কোটেশন হয়। সবচেয়ে ভালো লেগেছে এটার এন্ডিং টা। দেখতে পারেন।

#৬। K-ON! The Movie (2011):

K-ON! The Movie
এটা একটা টিভি সিরিজের ফিল্ম। আল গার্লস ব্যান্ড “আফটার স্কুল টি টাইম” এর সদসদের ইংল্যান্ড এ বেড়াতে যাওয়ার গল্প। ছবিটা দেখে নিশ্চয় বুঝতে পারছেন এটা সেই বিখ্যাত এবে রোড। সিরিজটা আমার খুবই পছন্দের ছিল। সেই সাথে এই মুভিটাও ভালো লেগেছে। সবসময়ই ওয়ার্ম, ফাজি। কমেডি ঘরনার। এই মুভি এর আগে ৩৯ পর্বের এক সিরিজ আছে। যেখানে দেখানো হয় ভগ্নপ্রায় এক লাইট মিউজিক ক্লাব এ চারজন এসে যোগ দেয়। এরপর তাদের দুষতামি, ফাইজলামি এর মাধ্যমে একটা মেডিকোর ব্যান্ড প্রতিষ্ঠা করে। এইত।

#৭। Dante’s Inferno: An Animated Epic (2010):

Dante's Inferno An Animated Epic
Electronics Arts এর অর্থায়নে বিভিন্ন জাপানীজ স্টুডিও এ বিভিন্ন সেগ্মেন্ট বানানো। স্টোরিটা খুবই সিম্পল, দান্তে ক্রুসেড থেকে ফিরে এসে দেখে তার স্ত্রীকে হেল এর গার্ডরা নিয়ে যাচ্ছে। এরপর সে এক অভিযানে নেমে পড়ে তার স্ত্রী বিয়েট্রিসকে ফেরত আনার জন্য। এটা বানানো হয়েছে Dante’s Inferno গেম এর টাই ইন হিসেবে। গেমটা খেলা হয় নি কারন গেমটা পিসিতে রিলিজ পায় নি। গেমটা খেলার খুব ইচ্ছা ছিল। তাই গেমের স্বাদ এই এনিমেশন ফিল্ম এই নিতে হল। সিগ্নিফিকেন্ট দিক বলতে বিভিন্ন সেগ্মেন্ট এ বিভিন্ন এনিমেশন স্টাইল ইউজ করা হয়েছে যা প্রতিটা স্টুডিও এর সিগ্নেচার স্টাইল ফলো করেছে।

#৮। Batman: Gotham Knight (2008):

Batman Gotham Knight
এটা মনে হয় অনেকেরই দেখা আছে। ডিসি কমিক্স এর অর্থায়নে বানানো। স্টাইল এর দিক দিয়ে Dante’s Inferno এর মত। তবে একটা কথা বলতে হবে। প্রথম সেগমেন্ট Have I Got a Story for You টাকে বলতে হয়, “out of this world experience.” সম্ভবত, ব্যাটম্যান নিয়ে এখন পর্যন্ত যতগুলো জিনিসপত্র দেখেছি তার মধ্যে এটা আমার সবচেয়ে পছন্দের। ডার্ক নাইট এর ফ্যানদের মধ্যে যারা এটা দেখেননি তাদের এটা দেখার অনুরোধ থাকল।

#৯। The Disappearance of Haruhi Suzumiya (2010):

The Disappearance of Haruhi Suzumiya
এটাও আরেকটা টিভি ফিল্ম। জাপান সম্পর্কে একটা পাই চার্ট নেটে খুব পপুলার তা হলেঃ What is going on in Japan? 15% – Typical Things and 75% – Some Weird Shit. Haruhi Suzumiya সিরিজটি সম্ভবত শেষের ৭৫% এর মধ্যে পড়ে। এই মুভিটি দেখার আগে যে কারো The Melancholi of Harufi Suzumiya সিরিজের প্রথম ৬/৭ পর্ব দেখা বাধ্যতামূলক। হারুহি সুজুমিয়া নামের এক মেয়ে, ধারনা করা হচ্ছে এই মেয়ে গড। অন্যদিক এ হারুহি এর তৈরি করা ক্লাবে হারুহি জড়ো করে কয়েকজনকে। একে একে দেখা যায় এই গ্রুপের একেকজন একেক ক্ষমতা সম্পন্ন। একজন টাইম ট্রাভেলার, একজন এস্পার (মেন্টালিস্ট), একজন থট ইন্টেগ্রিটি/ডাটা এন্টিটি এর একটি নোড। এতসবের মাঝে এক সাধারন মানুষ হিসেবে সিরিজের প্রধান চরিত্র কিয়ন জড়িয়ে পড়ে। হারুহি জানে না যে তাকে গড ধারনা করে। আর অন্য তিন গ্রুপের সদস্যরা হারুহিকে অব্জার্ভ করার জন্য এ ক্লাবে যোগ দেয়। এই ক্লাব নিয়েই কাহিনী। ডিজএপেয়ারেন্স অফ হারুহি সুজুমিয়া এ দেখানো হয় সম্পুর্ণ এনভায়রন্মেন্ট চেঞ্জ হয়ে গেছে। কিন্তু কিয়ন ছাড়া আর কারো এর স্মৃতি মনে নেই। অনেক লম্বা সিনেমাটা, প্রায় ২ ঘন্টা ৪০ মিনিট। কিন্তু মজা লেগেছিল দেখতে গিয়ে এবং কোন্দিক দিইয়ে পুরো সময় চলে গেল টেরই পাইনি।

#১০। Hotarubi no Mori e (2011):

Hotarubi no Mori e
সামার ভ্যাকেশনে এক ফরেস্ট স্পিরিট এর সাথে দেখা হয় পিচ্চি টাকেগাওয়ার। এরপর প্রতি সামার ভ্যাকেশনই স্পিরিটের সাথে দেখা করে এই পিচ্চি। ৫০ মিনিট এর ছোট্ট একটা মুভি।

#১১। The Sky Crawlers (2008):

The Sky Crawlers
সেম নামের উপন্যাস থেকে এডাপ্টেশন করেছেন লিজেন্ডারি ডিরেক্টর Mamoru Oshii। তবে এই সিনেমায় মনে হয় অনেক সিম্বলিক ব্যাপার স্যাপার ছিল। ওশি এর অন্যান্য ফিল্মের মতই বেশ কিছু অংশ মাথার উপর দিয়ে গিয়েছে। স্পেশালি শেষ দশ মিনিট যে কি দেখাল আল্লাহ জানে। যাই হোক, এটা ২০০৮ এ Mainichi Film Award এ এনিমেশন গ্র্যান্ড প্রাইজ জিতে নেয়। এবং অনেকেরই প্রিয় এনিমে এর তালিকায় আছে।
একদল এরিয়াল ফাইটারদের নিয়ে গল্প। এবং সায়েন্স ফিকশন। আর সায়েন্স ফিকশন পার্ট্টাই শেষ ১০-১৫ মিনিট এর আগে দেখা যায় না। এর আগ পরযন্ত ড্রামা মুভি হিসেবে চলতে থাকে।

আজ এ পর্যন্তই। সামনে আবার আসব আরো কিছু এনিমে ফিল্ম নিয়ে।

—-

ডাউনলোড লিঙ্কসঃ
দান্টে’স ইনফার্নো ছাড়া সবগুলো বাকাবিটি এর লিঙ্ক। সবগুলোই টরেন্ট। কম সাইজেরগুলো দিলাম। তবে পেজের কোনায় অন্যান্য ভার্সন দেখা যাবে।
Colorful:720p
Summer Days with Coo: ৪৮০পি
Redline: 480p
The Wings Of Honneamise: 480p
Jin-Roh the Wolf Brigade: 480p
Dante’s Inferno: 720p
K-ON! The Movie: ৭২০পি
Batman: Gotham Knight: 720p
Hotarubi no Mori e: 720p
The Sky Crawlers: ৪৮০পি