Spirited Away বন্দনা অথবা Roger Ebert-এর চোখে Spirited Away [Translated by Amor Asad]

Spirited Away কেন অ্যানিমেশন জগতের (কেবল জাপানিজ নয়) সেরা ৫ টার একটা, কেন এত রেটিং বেশী— এই প্রশ্নগুলো যদি আপনার মনে জাগে কখনও; তবে এই পোস্ট আপনার জন্যে।
.
দেড় বছর অ্যানিমে কম্যুনিটি গুলোতে ঘোরাঘুরি করার পর বিভিন্ন ফ্যানবেইজ সম্পর্কে হালকা পাতলা ধারণা হয়েছে। বিশেষ করে অ্যানিমে মুভি এবং অ্যানিমে সিরিজের দর্শকদের পার্থক্য চোখে পড়ার মত। দু-ক্ষেত্রেই সমান বিচরণ করে এমন দর্শকের সংখ্যা আনুপাতিক হারে বেশ কম। আবার অনেক সিরিজ দর্শক মুভি একদমই দেখে না। এধরণের কিছু কারণে কোন কোন গ্রেট অ্যানিমে মুভি আলোচিত কম হয়েছে। বিশেষ বাংলাদেশী দর্শকদের ক্ষেত্রে, বাইরের কথা বলা কঠিন। তবে সিনেমাপাড়ায় এই মুভিগুলোর কদর অনেক। অনেক মানে অনেক।
এত কথা বলা এই কারণে যে, লক্ষ্য করেছি এনিমখোরের কেউ কেউ Spirited Away পছন্দ করেননি। ‘কেমন কেমন’ যেন লেগেছে। স্বাভাবিক, স্পিরিটেড অ্যাওয়ে মডার্ন অ্যানিমেটেড ফিল্মে বিশাল পরিবর্তন এনেছিলো এবং যেকোন অ্যানিমেটেড মুভি বা সিরিজ থেকে আলাদা। পশ্চিমা বিশ্ব মিয়াজাকিকে তথা জিবলি স্টুডিওকে চোখ বড় বড় করে দেখেছে এবং তাঁর কাছ থেকে শিখতে চেয়েছে কিভাবে এই সিনেম্যাটিক মাস্টারমাইন্ড কাজ করেন।

ফেসবুকের অন্য আরেকটা অ্যানিমে গ্রুপে তাই স্পিরিটেড অ্যাওয়ে নিয়ে নেতিবাচক মনোভাব আমলে না নিলেও, ‘এনিমখোরে’ এমন ভাবনা থাকাটা আপত্তিকর মনে হয়েছে। বিশেষ করে সপ্তাহখানেক আগে একটা পোস্ট দেখে খানিকটা কষ্ট পেয়েছি। তাই স্পিরিটেড অ্যাওয়ে নিয়ে লেখার ইচ্ছে একদিনের নয়। লিখতে বসে কিন্তু ঝামেলায় পড়েছি, নিরপেক্ষ অবস্থানে থেকে ঔদ্ধত্যপূর্ণ কথা ছাড়া কিভাবে লেখা যায় কেবল সিনেমাটিক সৌন্দর্য নিয়ে তা বুঝে উঠতে পারিনি।
যার কারণে বরেণ্য ফিল্ম ক্রিটিক, যার হাত ধরে ফিল্ম ক্রিটিসিজম জনপ্রিয়তা পেয়েছে, সিনেমা সমালোচনার প্রবাদ পুরুষ রজার ইবার্টের Spirited Away রিভিউ অনুবাদ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। যে কথাগুলো আমার মুখে ঔদ্ধত্য মনে হবে, সেগুলো ইবার্টের মুখে বাস্তবতা। যাই হোক, তাঁর রিভিউটা বেশ বড়ই ছিলো, তবে আগ্রহীরা পড়ে মজা পাবেন মনে করি।

spirited-away-roger-ebert

============
Spirited Away
Roger Ebert
July 11, 2012

হায়াও মিয়াজাকির “Spirited Away” তৃতীয় বারের মত দেখার পর, প্রাচুর্যতা আর ঢেলে দেয়া যত্নের মাঝামাঝি কোন এক শিল্পগুণ আমাকে তাড়িত করেছিলো।
এর আগে যখন দেখেছি তখন গল্পের সীমাহীন কল্পনায় আটকে গিয়েছিলাম। আর এবার যখন দেখতে বসি তখন এমন সব সিনেম্যাটিক উপাদান খেয়াল করতে শুরু করি যেগুলো সিনেমায় না থাকলেও চলত। অ্যানিমেশন আসলে খুব কষ্টসাধ্য একটা প্রক্রিয়া তাই এতে ভিজুয়াল এলিমেন্টস সরজ সরল করে ফেলার একটা চল দেখা যায়। অন্যদিকে মিয়াজাকি বরঞ্চ জটিলতায় বিশ্বাসী। তাঁর অ্যানিমেশনের ব্যাকগ্রাউন্ডগুলো খুঁটিনাটি বিষয়ে ভর্তি, নিঃসঙ্কোচে বিস্তৃত ক্যানভাসে কাজ করেন এবং সবকিছুই গভীর মনোযোগ দিয়ে আঁকা। আমরা সাধারণত সচেতনভাবে কোন মুভির ক্যানভাসের (সম্পূর্ণ স্ক্রিন) কোণার দিক গুলো দেখি না, আমরা না দেখলেও সেগুলো কিন্তু ঠিকই কোণায় থাকে এবং মিয়াজাকির সিনেমায় এই কোণার কাজগুলি তাঁর কল্পনার জগতকে অসাধারণরকম নিখুঁত করে তোলে।

“Spirited Away” নিশ্চিতভাবেই সমগ্র অ্যানিমেশন ফিল্মের মধ্যে সেরাদের একটা এবং এর ভিত্তিপ্রস্তর নির্মিত হয়েছে ট্রাডিশনাল অ্যানিমেশন প্রক্রিয়ার কঠিনতম পদ্ধতিতে, অর্থাৎ ফ্রেম-বাই-ফ্রেম আঁকা। মিয়াজাকি নিজের ক্যারিয়ার এই অ্যানিমেশন স্টাইলে শুরু করেন বটে, কিন্তু তিনি বাস্তববাদী এবং অ্যানিমেশনের কিছু কুঁড়ে কাজ কম্পিউটারে করে থাকেন। কিন্তু তিনি ব্যক্তিগত ভাবে হাজার হাজার ফ্রেম নিজ হাতে আঁকেন।
“আমরা হাতে আঁকা একক অ্যানিমেশন ফ্রেমগুলো নিয়ে পরবর্তীতে ডিজিটাইজ করি ভিজুয়াল দিকটা সমৃদ্ধ করতে। কিন্তু সবকিছুর শুরুটা হয় মনুষ্য হাতে আঁকা ফ্রেম থেকে।”— ২০০২ সালে আমাকে বলেন মিয়াজাকি।

“Spirited Away” থেকে একটা দৃশ্য ধরা যাক যেখানে কিশোরী নায়িকা জাদুময় বাথহাউজ থেকে বের হবার ব্রিজের উপর দাঁড়িয়ে থাকে। এখানে সিনেমার অনেকটাই দেখানো হয়েছে। গল্পের নাট্যক্রিয়া এবং চরিত্রগুলো দৃশ্য চালিয়ে নিতে যথেষ্ট, আর কিছু দরকার নেই, কিন্তু বাথহাউজের বারান্দা আর জানালা দিয়ে দেখতে থাকা অনেকেই বাথহাউজের অধিবাসী। এদের কেবল চলমান কিছু অস্পষ্ট ছায়ার মত দেখালেই চলত, কিন্তু মিয়াজাকি যত্নের সাথে এমন কিছু চরিত্র আঁকেন যাদের আমরা চিনতে পারি এবং সবগুলোই গতিশীল। এবং এক্ষেত্রে এটা কিন্তু রিপিটেটিভ অ্যানিমেশন না যেক্ষেত্রে আইডিয়াটা হচ্ছে একই কাছাকাছি ফ্রেমের পুনরাবৃত্তি যা দিয়ে কোন আকৃতি নড়াচড়া করছে এমনটা বোঝানো হয়। বরঞ্চ স্পিরিটেড অ্যাওয়ের ক্ষেত্রে এটা বাস্তবধর্মী, পরিবর্তনশীল তাও একগাদা ডিটেইলস সহকারে।

বেশীরভাগ মানুষ মুভিটা দেখার সময় এই নড়াচড়াকে স্রেফ “নড়াচড়া” হিসেবেই ধরে নিবে। কিন্তু আমরা খেয়াল করে দেখি যে আসলেই কী কী ঘটছে। আর এটা দিয়েই আমি প্রাচুর্যতা আর ঢেলে দেয়া যত্ন বুঝিয়েছি।
প্রতিটা ফ্রেমের কম গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোতে এতটা শ্রম ঢেলে দেয়ার মত আন্তরিক মিয়াজাকি আর তাঁর সহকর্মীগণ। খেয়াল করুন বাথহাউজের কতখানি আপনি দেখতে পান। কেবল একটা ব্রিজ আর একটা বড় প্রবেশদ্বার দেখিয়ে দিলে সহজ এবং তাড়াতাড়ি হতো। কিন্তু মিয়াজাকি বাথহাউজকে বাস্তব যায়গায় রূপ দিতে ফ্রেমগুলো জটিল করে সমৃদ্ধতা দেন, যা তাঁর ঠিক পরবর্তী গল্পে কাজে লাগবে নাকি লাগবে না, সেই বৈশিষ্ট্যবহন করে।

Spirited Away-এর গল্পে চরিত্রের সমাগম হয়েছে অসীম সৃষ্টিশীলতার মাধ্যমে। এর আগে এমন কোন মুভি তৈরী হয়েছে কী, যেখানে এত বৈচিত্রময় ভিন্ন ভিন্ন সত্ত্বা আছে যা আমরা আগে কখনও দেখিনি? আসলেই মিয়াজাকির কল্পনার যেন শেষ নেই। একটা দৃশ্য আছে যেখানে নায়িকা এবং তাঁর সঙ্গী জলাভূমির মাঝখানে ট্রেইন থেকে নামে। দূরের বন থেকে একটা আলো কাছে আসছে, তাঁরা দেখতে পায়। পরে দেখা যায়, জিনিসটা পুরনো ধাঁচের আলোক মশাল যা কিনা এক পায়ে লাফিয়ে লাফিয়ে আসছে। এটা কাছে এসে তাঁদের কুর্নিশ করে এবং যে পথে যেতে হবে সে পথ নির্দেশ করতে আলো জ্বালিয়ে দেয়। যখন তাঁরা কুড়েঘরে পৌঁছায়, মশালটা নিজে নিজে দরজার উপরে নিজেকে ঝুলিয়ে নেয়। এই জীবন্ত আলোক মশালটার দরকার ছিলো না গল্পে। আমাদের উদ্দেশ্যে এটা মিয়াজাকির দেয়া উপহার।

সিনেমার গল্পটা ১০ বছর বয়সী মেয়ে ‘চিহিরো’কে কেন্দ্র করে। চিহিরো বিভিন্ন অ্যানিমেশন ফিল্মের উৎফুল্ল, উচ্ছ্বল পিচ্চি একটা যন্ত্রের মতো নয়। অনেক সিনেমা সমালোচক তাকে গোমড়া, অধৈর্য এবং হুট করে কাজ করে ফেলে বলে আখ্যায়িত করেছেন। চিহিরো তাঁর বাবা-মায়ের সাথে লং-ড্রাইভে গাড়ির পিছনে বাধ্য হয়ে বসে ছিলো এবং তাঁর বাবা-মা যাচ্ছিলো পুরনো এক বাড়ি সম্পর্কে খোঁজ খবর নিতে। তাঁর বাবা পথ হারিয়ে ঘন এক বনে ঢুকে যান এবং পথটা শেষমেষ এক টানেলের মুখে এসে শেষ হয়। টানেল বা সুরঙ্গ ধরে এগোলে তাঁরা দেখতে পায় টানেলের শেষ মাথায় পরিত্যক্ত একটা অ্যামিউজমেন্ট পার্ক। কিন্তু সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে কিছু কিছু দোকানের ঝাপটা খুলতে থাকে, বিশেষ করে একটা খাবারের দোকান যার গন্ধ বাতাসে ময়ময় করতে থাকে। চিহিরোর বাবা-মার আর তর সয় না, তাঁরা পড়িমরি করে খাবারে ভরপুর কাউন্টারের সামনে চেয়ার টেনে বসে পড়েন এবং দেদারসে গিলতে থাকেন। এদিকে চিহিরো গোঁয়ার মেয়ে, খিদে লাগেনি, খিছু খাবে না — জানিয়ে দেয়। তাঁর বাবা-মা এত বেশী খেয়ে ফেলে যে তাঁরা সাইজে দুই বা তিনগুণ হয়ে যায়। একদম শূয়রের মত খেতে থাকে তাঁরা এবং শেষে তাঁরাই শূয়র হয়ে যায়। তাঁরা ঠিক অ্যামেরিকান অ্যানিমেশনের বাবা-মার মত না, বরঞ্চ এমন বাবা-মা যাদের কাজকামে বাচ্চারা ভয় পেয়ে যেত পারে।

অ্যামিউজমেন্ট পার্কের মাধ্যমে চিহিরো বিশালাকার এক ভাসমান বাথহাউজে উপস্থিত হয়, যার বুরুজ এবং জানালা এবং কার্নিশ ইত্যাদি যেন একটার উপর আরেকটা জুড়ে আছেই, কোন সীমাটিমা নেই। অচেনা অজানা বন্ধুভাবাপন্ন এক কিশোর তাকে সতর্ক করে এবং ফিরে যেতে বলে। কিন্তু ততক্ষণে দেরী হয়ে গেছে, বাথহাউজটা কূল থেকে ভাসতে ভাসতে দূরে চলে এসেছে। অগত্যা চিহিরো সাহস করে ভিতরে ঢোঁকে বাথহাউজের এবং অসীম বৈচিত্রময় এক দুনিয়ার সম্মুখীন হয়। কিন্তু সে ফিরে যাবার পথ খুঁজে পায় না আর। কিশোরটা বলে, বাথহাউজের সবাইকে কোন না কোন কাজ করতেই হবে, এবং সে চিহিরোকে কামাজির কাছে পাঠায়। কামাজি একজন বৃদ্ধ, বড় দাড়িওয়ালা লোক যার আটখান লম্বা, দির্ঘায়িত হাত আছে। তাঁর কাজ বয়লার রুম সামলানো। কামাজি এবং একজন তরুনী চিহিরোকে বলে ইউবাবার কাছে যেতে, সে বাথহাউজের মালিক, কাজ পেতে হলে তাঁর সাথে কথা বলতে হবে। এদিকে ইউবাবা হচ্ছে ভয়ংকর এক ডাইনি, যার খড়মড় বিকট হাসিতে ধোঁয়ার তাল বের হয়।

এই হচ্ছে অসাধারণ এক অ্যাডভেঞ্চারের শুরু। চিহিরো বাথহাউজে কোন মানুষের দেখা পাবে না। সে ইউবাবার জাদুতে বশ হবে— ইউবাবা তাঁর নাম চুরি করে তাকে নতুন নাম দিবে, বাথহাউজে সে পরিচিতি পাবে “সেন” নামে। যদি না সে তাঁর পুরনো নাম ফিরে না পায়, কখনও বাথহাউজ ছেড়ে যেতে পারবে না। একটার পর একটা অদ্ভুত যায়গা দেখা যায় বাথহাউজে, যেখানে অগুনতি, বৈচিত্রময় স্বত্বারা বাস করে; যাদের আমরা কখনও দেখিনি বা কল্পনা করিনি। এখানে আশওয়ালা ছোট ছোট কালো রঙের দুই চোখওয়ালা বল আছে, যারা সেন বা চিহিরোর জুতো চুরি করে। অর্ধস্বচ্ছ এক স্বত্বা আছে যার কোন মুখমণ্ডল নেই এবং সে তাঁর ভৌতিক শরীরে একটা মুখোশ ব্যবহার করে মুখের অস্তিত্ব বোঝাতে। তিনটা আজব মাথা আছে, যাদের কোন শরীর নেই— এরা মাথা দিয়ে লাফিয়ে চলে। এদের দেখতে রাগী রাগি লাগে এবং চেহারাতেও কার্ল মার্ক্সের সাথে মিল খুঁজে পাওয়া যায়। কালো আঠালো বিকট গন্ধওয়ালা স্তূপাকৃতির অবয়ব আছে, আছে সামুদ্রিক প্রাণী যার সারা শরীর পানি দূষণের ফলে ময়লা আবর্জনা দিয়ে ভর্তি। শেপ-শিফটিংও আছে এখানে, অবশ্য এটা জাপানিজ রুপকথায় কমন জিনিষ। এবং যে কিশোর প্রথমে চিহিরোর বন্ধু ছিলো, পরবর্তীতে দেখা যায় সে আসলে ভয়ঙ্কর ফণাওয়ালা সাগরের ড্রাগন।

সেন এই দুনিয়ায় মানিয়ে নেয়। কারো কারো বন্ধু হয় সে, কেউ কেউ তাকে এড়িয়ে চলে, আর সাথে ইউবাবার রাঙ্গাচোখ তো আছেই—চলতে ফিরতে শেখে সেন। তাঁর আর “ভদ্র মেয়ে” হয়ে ওঠা হয়না, বরং তাঁর তেজ এবং দৃঢ়চরিত্র আমাদের অনুরাগে ভাগ বসায়। সেন সঙ্কল্প করে নিজের নাম ফিরে পেতে এবং কূলে ফিরে যেতে। সঙ্কল্প করে নিজের বাবা-মা’কে আবার ফিরে পেতে।

মিয়াজাকি বলেন তিনি এই সিনেমা দশ বছর বয়সী মেয়েদের জন্যে নির্দিষ্ট করে বানিয়েছেন। এ জন্যে এটা এত শক্তিশালী প্রভাব ফেলে প্রাপ্তবয়স্ক দর্শকের মনে। কারণ “সবার” উদ্দেশ্যে বানানো সিনেমা আসলে নির্দিষ্ট করে কারো জন্যেই বানানো না। বিষদ, বিশাল দুনিয়ায় নির্দিষ্ট চরিত্রকে নিয়ে নির্মিত সিনেমাগুলো মন্ত্রমুগ্ধকর হয় কারণ এই সিনেমাগুলো আমাদের মুখে চামচ তুলে দেয়ার চেষ্টা করে না; এই সিনেমাগুলো স্পষ্টভাবে, সফলভাবে স্বতন্ত্র। সিনেমাটা আবার যখন দেখলাম, আমি যে মুভি গুলোকে ‘সেরা’ হিসেবে বিবেচনা করি সেগুলোর মত করে মন্ত্রমুগ্ধ হয়েছি। যার ফলে ধারণা পাওয়া যায় কেন “Spirited Away” জাপানে “Titanic” থেকে বেশী কামাই করেছে এবং প্রথম বিদেশী সিনেমা যা অ্যামেরিকায় মুক্তি পাওয়ার আগে যার ঝুলিতে ইতোমধ্যেই ২০০ মিলিয়ন ডলারের বেশী ছিলো।

আমি ভাগ্যবান, ২০০২ সালে টরন্টো ফিল্ম ফেস্টিভালে মিয়াজাকির সাথে সাক্ষাৎ হয়েছিলো। আমি তাকে বলেছিলাম, আমি তাঁর সিনেমার গল্পের জন্যে দরকারি সিকোয়েন্স থেকে “অদরকারী অংশগুলো” বেশী পছন্দ করি, যেমন মাঝে মাঝে সিনেমায় চরিত্রগুলি অল্পক্ষণের জন্যে বসবে, হাই তুলবে অথবা স্রোতশীল জলরাশির দিকে তাকিয়ে থাকবে অথবা এটা সেটা করবে— ঠিক গল্প আগাতে না, বরঞ্চ সিনেমার দিনক্ষণ বা চরিত্রগুলোর পরিচয় তুলে ধরতে।

“জাপানিজ ভাষায় এই ব্যপারটার একটা নাম আছে”, মিয়াজাকি বলেন। “এটাকে বলে ‘মা’। এর অর্থ শূন্যতা। এটা ইচ্ছে করেই রাখা হয়েছে।” তিনি কয়েকবার নিজের হাতে তালি বাজালেন। “আমার প্রত্যেক তালির মাঝের সময়টা হলো ‘মা’। যদি বিরতিহীন গল্প টেনে নিয়ে যান নিঃশ্বাস ফেলার ফুসরত না দিয়ে, সবটাই কেবল ব্যস্ততা হয়ে যায়।”

আমার মনে হয় ব্যপারটা ব্যাখ্যা করে কেন বেশীরভাগ দ্রুতগতির অ্যামেরিকান অ্যানিমেশন থেকে মিয়াজাকির মুভিগুলো অধিকতর চিত্তগ্রাহী। মিয়াজাকি বলেন, “যারা সিনেমা বানায়, ওরা সিনেমায় নিরবতাকে ভয় পায়। তাই ওরা নিরবতাকে ঢাকতে চেষ্টা করে। তাঁরা শঙ্কিত থাকে হয়ত দর্শকেরা বোরড হয়ে যাবে। কিন্তু সিনেমার সবটুকু জুড়ে ৮০ ভাগই ইন্টেন্স থাকলেই যে বাচ্চারা তাঁদের মনোযোগ দিয়ে তোমাকে ধন্য করবে এমনটা কিন্তু নয়। সত্যিকার দরকারি বিষয় হচ্ছে অন্তর্নিহিত আবেগ—যেগুলো কারো মধ্য থেকে কখনও নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় না।”

“আমি এবং আমার বন্ধুরা মিলে ৭০’এর দশক থেকে যা করতে চেষ্টা করে যাচ্ছি তা হলো, সিনেমার গল্পে কিছুটা নিরবতা আনতে; কেবলই ধুমধারাক্কা আর চিত্তবিনোদন না দিতে। এবং সেই সাথে ফিল্ম বানানোর পাশাপাশি বাচ্চাদের আবেগ অনুভূতির পথে হাঁটতে। যদি তুমি আনন্দ, উৎফুল্লতা এবং সহমর্মিতার প্রতি মনোনিবেশ করেন তবে ভায়োলেন্সও দরকার হবে না, অ্যাকশনেরও দরকার হবে না। এগুলো এমনিতেই তোমাকে অনুসরণ করবে। এটাই আমাদের নীতি।”, মিয়াজাকি যোগ করেন।

তিনি বলেন লাইভ-একশন সুপারহিরো মুভিতে প্রচুর অ্যানিমেশন দেখে তিনি আমোদিত হয়েছেন। “এক হিসেবে, লাইভ একশন মুভি অ্যানিমেশন নামক স্যুপের অংশ হয়ে যাচ্ছে। অ্যানিমেশন এমন এক শব্দে পরিণত হয়ে যা অনেক বেশী কিছুকে পরিবেষ্টন করে রাখে, আর আমার অ্যানিমেশন কেবল ছোট্ট একটা ফোঁটা এক কোণায়। আমার জন্যে কিন্তু তা যথেষ্ট,”

মিয়াজাকির সাথে আমি একমত, আমার জন্যেও যথেষ্ট।
— Roger Ebert (1942-2013)

==============

মূল ইংরেজি রিভিউ এর লিঙ্কঃ http://www.rogerebert.com/re…/great-movie-spirited-away-2002
==============

তো এই ছিলো রজার ইবার্টের রিভিউ। ইবার্ট বিভিন্ন সময়ে মিয়াজাকির এবং জিবলি স্টুডিওর প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছেন। বিশেষ করে তাঁর গ্রেভ অফ দ্য ফায়ারফ্লাইস রিভিউ পড়লে মনে হতে পারে তিনি আকাশে ভেসে ভেসে রিভিউ লিখেছেন। রজার ইবার্টের থেকে এমন অ্যাফেকশন আসলে বিস্ময়কর। তিনি যেই মাপের ক্রিটিক ছিলেন, তাঁর সামান্য প্রশংসা যে কোন সিনেমার জন্যে আশীর্বাদ স্বরুপ। তাঁর সার্টিফাইড কিছু মুভি আছে যা তিনি তাঁর “Great Movies” তালিকায় যোগ করেছেন। Spirited Away সে তালিকায় বহাল তবিয়তে নিজ যায়গা জুড়ে বসে আছে।

যাই হোক, এই লেখার উদ্দেশ্য সফল হলেই আমি খুশি। যারা Spirited Away দেখে অবাক হয়েছেন, আশা করি আবার দেখবেন। যারা দেখেননি, এখনই সময় বসে পড়ার।
তবু যদি এই সিনেমা ভালো না লাগে, আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি এটা আপনার ব্যর্থতা। মিয়াজাকির স্পিরিটেড অ্যাওয়ের পাহাড়সম ভার তাতে সামান্য কমছে না। স্পিরিটেড অ্যাওয়ে সেরাদের সেরা অ্যানিমের একটা, এই সত্যও বিন্দুমাত্র খর্ব হচ্ছে না, হবেও না।

Spritied Away রিভিউ — Tufika Anwar

আচ্ছা আপনার ছেলেবেলায় কি কখনো এমন হয়েছে, আপনি বাবা মার হাত ধরে মাথা নাড়তে নাড়তে বাজারে গেছেন। রং বেরঙের দোকান, হরেক রকম মানুষ, আর নানা ধরনের জিনিসপত্র দেখতে গিয়ে কখন যে মায়ের হাতটা ছেড়ে দিয়েছেন তা আর মনে নেই। আর মনে পড়তেই মা বাবার ছায়াটিরও আর খোঁজ পাচ্ছেন না। অনেক খোঁজার পরে সেই ছোট্ট আপনার একটু আগের ভীষণ রঙিন পৃথিবীটা মুহূর্তে যেন সাদাকালো হয়ে গেল।
ছোট্ট চিহিরুর সাথেও প্রায় এ রকমই ঘটে জিবলী স্টুডিও এর অ্যানিমেটেড মুভি Spirited Away তে। বাবা মার সাথে পুরনো বাড়ি ছেড়ে ভীষণ মন খারাপ করে নূতন জায়গায় নূতন বাড়ির উদ্দেশে আসছিল চিহিরু। কিন্তু পথিমধ্যে তারা এক আশ্চর্য রহস্যজনক স্থানে এসে পৌঁছে, সেখানকার সুন্দর সাজানো দোকান, মজাদার খাবার, আর জাদুকরী এক আকর্ষণে চিহিরু আর তার বাবা এতটাই মুগ্ধ হয়ে যায় যে তারা বুজতেই পারে না যে এটা একটা মায়াজাল। কিন্তু গল্পের নায়ক হাকুর সহায়তায় চিহিরুর সম্ভিত ফিরলেও এই প্রবল মায়াজালে আটকা পরে তার বাবা মা।
এখন চিহিরুর অবস্থা দাড়ায় সেই বিশাল বাজারে হারিয়ে যাওয়া বাচ্চাটির মত। পার্থক্য শুধু একটাই যে চিহিরু হারিয়ে যায় মায়াজালে আচ্ছন্ন ভুত আর অদ্ভুত সব প্রাণীতে ঘেরা ভিন্ন এক জায়গায় কাজ নেয় একটা বাথ হউসে।
তারপর গল্পে আসে আরও সব মজাদার ব্যাপার- এই মায়াচ্ছন্ন জায়গায় চিহিরু পরিচিতি পায় সিন নামে, এই ছোট্ট সিন বিভিন্ন ঘটনার মধ্যে দিয়ে বড় সব পরিবর্তন আনে এই মায়াপুরিতে। হাকুর সাথে মিলে সিন আবার তার আসল পরিচয় আর বাবা মা কে ফিরে পায়। এমনিই একটা মজাদার গল্প নিয়ে এই মুভি।
এই ছোট্ট মুভিতে হায়াতো মিয়াজাকি এত চমৎকার কিছু অ্যানিম্যাটেড ক্যারেক্টার সৃষ্টি করেছে যা মুভিকে করেছে আরও বেশি আকর্ষণীয়। রূপকথার পঙ্খীরাজ ঘোড়ায় চড়া রাজকুমারতো সবার পরিচিত কিন্তু এখানে আচ্ছে আকাশে উড়ে বেড়ানো সুদর্শন ড্রাগন রাজকুমার হাকু। আর অসাধারণ গুনে গুণান্বিত অনেক সাধারণ চিহিরু।
জানি অনেকেরই দেখা আছে এই অসাধারণ মুভিটি কিন্তু যাদের এখনও দেখা হয়নি তারা আর দেরি না করে দেখতে পারেন সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী কাহিনীর মুভি Spirited Away.

Spirited Away

Movie Time With Yami – 51

spirited_away_by_nuriko_kun-d3cyj4y

 

Name: Spirited Away / Sen to Chihiro no Kamikakushi
Duration: 2 hours 5 min.
MAL Score: 8.93
Ranked: 12
Genres: Adventure, Drama, Supernatural

মাই আনিমে লিস্টের স্ট্যান্ড অ্যালোন মুভির টপ লিস্ট যদি কেউ চেক করেন, দেখতে পাবেন, সবার ওপরে যে নামটি আছে, সেটি হল স্পিরিটেড অ্যাওয়ে। স্টুডিও জিবলীর অন্যতম ব্যবসাসফল এবং প্রশংশিত এ মুভিটি রিলিজ হওয়ার বছরে (২০০১ সাল) একাই দখল করেছিল সকল বড় বড় অ্যাওয়ার্ডগুলো; যার মধ্যে অস্কারও রয়েছে।

নিজের পরিচিত গন্ডি ছেড়ে, স্কুল-বন্ধুবান্ধব-খেলার সাথীদের ছেড়ে যদি হঠাৎ দূরে একেবারে অচেনা কোন জায়গায় চলে যেতে হয় আপনাকে হঠাৎ করে, কেমন লাগবে আপনার? নিশ্চয় মন খারাপ/বিরক্ত লাগবে কিছুটা হলেও! সেরকমটাই ঘটেছে চিহিরোর সাথে। পরিবারের সিদ্ধান্তের কারণে অনিচ্ছাসত্ত্বেও তাকে নিজের পরিচিত গন্ডি ছেড়ে যেতে হচ্ছিল অজানা এক জায়গাতে। সেজন্য চিহিরোর মন বেশ খারাপ। পুরো রাস্তায় এজন্য বাবা-মার সাথে অসহিষ্ণু আচরণ করে সে।

পথে গাড়ি চালানোর সময় হঠাৎ এক জায়গায় একটা ভুল রাস্তায় ঢুকে পড়ে চিহিরোদের গাড়ি। অচেনা পথে দিকভ্রষ্ট হয়ে গাড়ি চালাতে চালাতে একসময় গাড়িটা এসে পৌছায় একটা জনমানবশূণ্য থিম পার্কের সামনে। চিহিরো যদিও জায়গাটা নিয়ে শঙ্কিত থাকে, তারপরেও বাবা-মায়ের পেছনে পেছনে জায়গাটা পরিদর্শন করতে বেরিয়ে পড়ে।

পার্কটির একপ্রান্তে হঠাৎই একটি খাবারের স্টল খুঁজে পায় চিহিরোর বাবা-মা। কোনকিছু চিন্তা না করে খেতে বসে যায় তারা। চিহিরো তাদের সাথে বসে না ভয়ের কারণে। এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই সে আবিষ্কার করে, বাবা-মায়ের অদূরদর্শী কাজের কারণে এক ভয়াবহ বিপদের মধ্যে এসে হাজির হয়েছে তারা।

মুভিটির কাহিনী বেশ দ্রুতগতিতে আগায় বলা চলে, কোন জায়গায় দম ফেলার সুযোগ তেমন একটা পাওয়া যায় না। স্পিরিট ওয়ার্ল্ড ও তার আজগুবি ক্রিয়েচারগুলো দেখে আমার একটু অস্বস্তি লেগেছিল, আর কাহিনীটা মাঝে যেন একটু খাপছাড়া লেগেছিল। তবে এঞ্জয়মেন্ট ভ্যালু হিসেবে বলা যায়, বেশ উপভোগ্য ছিল মুভিটি। মিয়াজাকি হায়াও এর সব মুভিতে তার কাজের ছোঁয়া স্পষ্ট থাকে, এ মুভিটিও তার ব্যাতিক্রম নয়, ক্যারেক্টার ডিজাইন, আর্টওয়ার্ক, ডেভেলপমেন্ট- পুরোটাই একটা জিবলী জিবলী ভাব তৈরি করে। আর্টওয়ার্ক জিবলীর বাকি কাজগুলোর মতই অসাধারণ, আজগুবি ক্রিয়েচারগুলোকেও খুব যত্ন নিয়ে তৈরি করা হয়েছে। সাউন্ডট্র্যাকও বেশ চমৎকার, আর চিহিরোর ক্যারেক্টার ডেভেলপমেন্ট বেশ ভাল ছিল।

আর, বলা হয়ে থাকে যে, মুভিটিতে রূপক অর্থে দর্শককে মেসেজ দিতে চেষ্টা করা হয়েছে, এই মেসেজ নিয়ে অনেক থিওরী, ভিডিও ছড়িয়ে আছে ইন্টারনেটে। মুভি দেখার পরে যদি আগ্রহী হন তো এগুলো কিছুটা ঘাটাঘাটি করে দেখতে পারেন, দেখে মজাই লাগবে, আর মুভিটির ব্যাপারে মনে নতুন ধারণার জন্ম হওয়াটাও অস্বাভাবিক নয়! কিংবা কে জানে, হয়ত আপনিও একটি নতুন থিওরী দাড়া করিয়ে ফেললেন!

Movie Download Link-
http://kissanime.com/Anime/Spirited-Away

Movie time with Yami প্রচারিত হচ্ছে প্রতি বৃহস্পতিবার। সেগমেন্ট সম্পর্কে আপনার যেকোন মতামত কমেন্টে জানাতে ভুলবেন না। আশা করি মুভির সাথে আপনার উইকএন্ড ভালো কাটবে !!