দেখে ফেললাম রেডলাইন। ২০১০ সালের মুভি তবে আলোচনা কমই হতে দেখেছি মুভিটা নিয়ে। মুভিটার খোঁজ কোন রিভিউ-ব্লগ থেকে পাই নি। পেয়েছিলাম এনিমে ইউটিউবার Gigguk এর একটা মজার ভিডিও থেকে। গিগাকের একটা ভিডিওতে দেখা যায় মিয়াজাকিরূপী স্টুডিও জিবলি ম্যাডহাউজকে ব্যঙ্গ করছে একটা goddamn মুভি বানানোর পেছনে সাত বছর পার করা নিয়ে। আমি তখনই ভাবলাম যে, ম্যাডহাউজের মত শক্তিশালী স্টুডিওকে সাত বছর ঘোরাতে পারে এমন কী জিনিস থাকতে পারে! নেট-টেট ঘেঁটে জানলাম সেই জিনিস হল ‘রেডলাইন’ আর মুভির পোস্টারের বাহার দেখেই চোখ কপালে উঠলো। অবশেষে দেখেই ফেললাম আর ম্যাডহাউজের সাত বছরের পরিশ্রম যে উশুল হয়েছে তা না বলে উপায় নাই। ‘রেডলাইন’ কোন মুভি নয় বরং একে একটা বিস্ফোরক অভিজ্ঞতা বলা উচিত।
প্লট: রেডলাইনের দুনিয়াটা সুদূর ভবিষ্যতের যেখানে কার রেসিং খুব জনপ্রিয়। তবে সেখানকার রেসিং কারের সাথে আমাদের রেসিং কারের আকাশ-পাতাল তফাত। ভয়ানক রকমের দ্রুতগতিসম্পন্ন বিশাল বিশাল যান্ত্রিক দেহওয়ালা সেই রেসিং কারগুলোকে মানুষ-এলিয়েন সবাই সমানতালেই চালায়। আর সেই দুনিয়ার কার রেসিং এর সবচেয়ে বড় টুর্নামেন্টের নাম হল ‘রেডলাইন’। গল্পের নায়ক
JP কে দেখা যায় সেই টুর্নামেন্টের বাছাইপর্ব ‘ইয়োলো লাইনে’ অংশগ্রহণ করতে। ভয়ানক রকমের বিপদজনক কিছু স্টান দেখিয়ে JP রেস জয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌছে যায়। কিন্তু JP ইতোমধ্যেই মাফিয়া বসদের সাথে ম্যাচ পাতানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছে। তাই তাকে রেসে প্রথম স্থান বিসর্জন দিতে হয়। কিন্তু প্রথম না হওয়ার পরও JP রেডলাইনে অংশগ্রহণের সুযোগ পায় দর্শকদের ভোটের কারণে! রেডলাইনের ভেন্যু হিসেবে ঘোষণা করা হয় ‘রোবোওয়ার্ল্ডকে’ যেখানকার সাইবর্গ সরকার আবার রেডলাইন রেসকে দুচোখে দেখতে পারে না। সেই সরকার তাই সচেষ্ট হয়ে উঠে রেস বানচাল করার জন্য কিন্তু এর মধ্যেই রেসে নেমে পড়ে রেসের আট প্রতিযোগী। JP এর সাথে রেসে আছে চারবারের রেডলাইন চ্যাম্পিয়ন ‘মেশিন হেড’ ও ইয়োলো লাইন চ্যাম্পিয়ন সুন্দরী ‘সোনোশি’। রেসটা একপর্যায়ে JP এর জন্য পরিণত হয় মাফিয়া, রোবট সেনাবাহিনী আর নিজের উচ্চাকাঙ্ক্ষার মধ্যকারের লড়াইয়ে।
আগেই একবার বলেছি রেডলাইন কোন এনিমের নাম নয়, এটি একটি ‘অভিজ্ঞতার’ নাম। মুভিটা দেখলে কথাটা আপনাদের একটুও অত্যুক্তি মনে হবে না। রেডলাইন ডিরেক্টর Takeshi Koike এর প্রথম পূর্ণাঙ্গ কাজ। প্রথম কাজেই তিনি সৃজনশীলতার পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে দিলেন। রেডলাইনের অ্যানিমেশনের কথাই প্রথমে বলি। এমন অ্যানিমেশন যে জাপানে তৈরি হতে পারে তা সহজে বিশ্বাস হতে চাইবে না। রেডলাইনের পুরো দুনিয়াটা আশি আর নব্বইয়ের দশকের কমিকবুকের আদলে তৈরি। আকাশ-বাতাস, ল্যান্ডস্কেপ, পাহাড়-পর্বত সবকিছুতেই একটা অদ্ভুত তারল্য লক্ষ করা যায়। মনে হয় পিসির স্ক্রিনটা একটুখানি নড়ালেই সবকিছু ভেঙ্গে পড়ে যাবে। পুরো এনিমের প্রতিটা ফ্রেমেই একটা কালচে আউটলাইনার ছিল অবজেক্টগুলার গায়ে যার ফলে সবকিছুকে অনেক জান্তব মনে হচ্ছিল। আসলে রেডলাইনের অ্যানিমেশনকে ব্যাখ্যা করতে গেলে হয়তো শব্দের অভাবেই ভুগতে হবে। পুরো এনিমেটাই ছিল ভয়ানক রকমের রঙিন। রেসিং কারগুলার বডির কালার ছিল চোখে পড়ার মত আর চরিত্রগুলোর দেহে নানা রঙের আউটফিট থাকায় একটা গ্রাফিটি গ্রাফিটি ভাব ছিল। গাড়িগুলো যখন রেস করতে থাকে তখন মনে হয় পেছনে একটা রঙের বন্যা বুঝি বয়ে গেছে। নিট্রো জিনিসটা গেইমে-টিভিতে অনেকবার দেখেছি কিন্তু রেডলাইনের নিট্রো দেখিয়ে দিল দেহের রক্তচাপ কিভাবে বাড়াতে হয়।
অ্যানিমেশনের ধারণা মানুষের মধ্যে কিভাবে এল? আমার মতে মানুষ যখন তার মনের আপাত অবাস্তব ও অসম্ভব ধারণাগুলো বাস্তব দুনিয়াতে বাস্তবায়ন/দৃশ্যায়ন করতে পারলো না তখনই অ্যানিমেশনের সাহায্য নিল। রেডলাইনকে এই হিসেবে অ্যানিমেশন জগতের অ্যানিমেশন বলা যায়। মানে একই সাথে এত এত পাগলাটে ঘটনার দৃশ্যায়ন ১০২ মিনিটে হয়েছে যে একে এনিমের মত অস্বাভাবিক জিনিসের মাপকাঠিতেও মাপা যাবে না। রেস বাদ দিয়েও স্পেইসশিপ ব্যাটল, প্রোজেক্টাইল ওয়েপনের মহড়া, ব্যাটলের ফলে পাহাড়-পর্বত কাগজের মত গুড়ো হয়ে যাওয়া, হ্যান্ড টু হ্যান্ড কমব্যাট এমনকি ঐতিহ্যবাহী কাইজু ব্যাটলও (Battle between monsters) ঠেসে ঢোকানো হল একটা রেসে। রেসের ল্যান্ডস্কেপ এত উল্টাপাল্টা রকমের ছিল যে পেইন ভার্সাস নারুতোর ফাইটের বিক্ষিপ্ত ল্যান্ডস্কেপও হার মানবে। গাড়ির স্পিড বাড়ানোর মুহূর্তগুলো এত উজ্জ্বল ছিল যে আলোর ঝলকানির কারণে চোখ পুরো ঝলসে যাওয়ার মত অবস্থা! নিট্রো দেওয়ার সময় চারপাশের স্পেইস মুভিতে এত ভয়ানকভাবে বেন্ড করছিল যে এক দৃশ্যের থেকে আরেক দৃশ্যে তাল মেলাতে পারছিলাম না। মেশিন হেডের সাথে ফাইনাল মুখোমুখির সময় দৃশ্যায়ন এত দ্রুত হয়েছিল যে কয়েকবার পজ করে স্ক্রিন আগুপিছু করিয়েছি শুধুমাত্র এটা বোঝার জন্য যে চারদিকে এসব ঘটছে! মুভি রেসিং কার নিয়ে তৈরি ঠিক আছে কিন্তু এর ফলে দৃশ্যায়নও যে রেসিং কারের গতিতে হবে তা কে জানতো! তাতামি গ্যালাক্সির মত এনিমেগুলাতে প্লেবেক স্পিড কমিয়ে দেখতে হয় সাবটাইটেল পড়ার জন্য, আর রেডলাইনে প্লেবেক স্পিড কমাতে হয়েছে জাস্ট what the hell is going on তা অনুধাবন করার জন্য।
এত দ্রুতলয়ের এনিমেতে যদি দ্রুতলয়ের মিউজিক না থাকে তাহলে তো উত্তেজনা ধরে রাখা সম্ভব না। সেই দিক দিয়েও হতাশ হই নি। টেকনো ধাঁচের দুর্দান্ত মিউজিক কম্পোজ করেছেন মিউজিক ডিরেক্টর James Shimoji. ইঞ্জিনের গর্জনকে দুর্দান্ত সঙ্গ দিয়েছে ট্র্যাকগুলো।Redline ও Yellow Line ট্র্যাকদুটো রেসের ইনটেনসিটির সাথে পুরোপুরি মানিয়েছিল। তবে সবচেয়ে বেশী অ্যাড্রেনালিন রাশ হয়েছিল ‘Machine Head’ ট্র্যাকটা শোনার পর। চারবারের চ্যাম্পিয়নের ভাবমূর্তির যথোপযুক্ত ট্র্যাক। চারটে দুর্দান্ত ইংরেজি গানও ছিল মুভির পশ্চিমাভাবের সাথে তাল মেলাতে। And it’s so beautiful গানটাতে আবেদনের মাত্রা বেশীই ছিল আর Redline Day গানটা যেন পুরো মুভির ভাবই বহন করছিল।
রেডলাইন মুভির যে জিনিসটা সবার চোখে পড়তে পারে তা হল এর গল্পের অগভীরতা। যদিও JP এর পাতানো খেলা সংক্রান্ত অন্ধকার অতীত ও উচ্চাকাঙ্ক্ষার ব্যাপারগুলো আরো গভীরতা পেতে পারতো তবে মুভির দ্রুতলয়ের কারণে তা আর বোঝা যায় নি। মেশিনহেড মেইন রাইভাল হওয়ার পরেও তার দর্শনের একটু-আধটূ ইঙ্গিত পাওয়া যায় মাত্র। সোনোশি আর JP এর সম্পর্কটা আরেকটু বিস্তৃত হতে পারতো। রোবোওয়ার্ল্ডের সরকারের বিরোধিতার পেছনের ideology কে হয়তো ইচ্ছে করেই হাস্যকরভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। আসলে সিরিয়াস কোন রেসিং স্টোরি দেখতে চাইলে হয়তো রেডলাইন প্রথম চয়েস নাও হতে পারে। কিন্তু এন্টারটেইনমেন্টকে মাথায় রাখলে রেডলাইনই হবে এক নাম্বার রেসিং মুভি। হয়তো এসব জিনিস ডিটেইলে ব্যাখ্যা করা হলে মুভিটা এত উপভোগ্য হত না।
সাত বছর ধরে একটি মুভির পেছনে খাটাখাটির ফলাফল কী হতে পারে তা রেডলাইনের অ্যানিমেশন দেখে বুঝলাম। প্রায় ১০০০০০ এর মত হাতে আঁকা ফ্রেমের সমন্বয়ে রেডলাইকে পর্দায় আনা সম্ভব হয়েছে! যেখানে একটা ৪৫ মিনিটের মুভির জন্য চাহিদাভেদে ৯০০-১২০০ ফ্রেম লাগে। একদল অসম্ভব রকমের প্যাশন থাকা মানুষের কারণেই রেডলাইনের মহাকাব্যিক অ্যানিমেশন তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। রেডলাইন আধুনিক অ্যানিমেশনের চূড়া সেই ২০১০ সালেই এঁকে দিয়েছে। যারা OPM এর সাইতামা ভার্সাস বোরোসের ফাইট দেখে চোখ কপালে তুলেছেন তারা রেডলাইন মুভিটা দেখে থাকলে পুরো ১০২ মিনিটই চোখ কপালে তুলে রাখবেন।
রেডলাইনের কিছু কিছু মুহূর্ত আজীবন মনে রাখার মত। নিট্রো দেওয়ার পর JP এর দাঁত-কপাটি লেগে যাওয়া চেহারা কে ভুলতে পারবে! রেডলাইন রেসের শেষমুহূর্তে JP এর বলা, I have got the goddess on my side” কথাটা চমৎকার ছিল। মেশিনহেডের বারবার ট্রান্সফর্ম হওয়া দেখে হালই ছেড়ে দিয়েছিলাম। ফ্রিসবি আর বুড়ো মোল আর অন্য সব চরিত্রের কৌতুকগুলাও ভাল ছিল। পুরো মুভিটাতেই একটা আবেদনময়ী ভাব প্রকট ছিল যা লক্ষ্য করেছিলাম কাউবয় বিবপ আর সামুরাই চ্যাম্পলুতে।
সবমিলিয়ে রেডলাইন যেন একটা বোমার মত এসে অ্যানিমেশন দুনিয়াকে কাঁপিয়ে দিয়ে গেল। তাই নিছক কোন মুভি নয়; বিস্ফোরক, রঙিন, আবেদনময়ী এবং ভয়ানক দ্রুতগতির এক অভিজ্ঞতার নাম রেডলাইন। চাদরে জড়সড়ো হয়ে থাকা যুবকের দেহে রেসিং কারের ইঞ্জিনের উন্মুক্ততা এনে দেওয়ার নাম রেডলাইন। দুর্দান্ত সব কার স্টান্টের মাধ্যমে দর্শকের চোখে স্বপ্ন এঁকে দেওয়ার নাম রেডলাইন।
MAL রেটিং: ৮.৩৩/১০ (জনগণের ভালই লেগেছে বোঝা গেল)
আমার রেটিং: ৯/১০
আচ্ছা, এবার আমি দুটো চরিত্রকে একসাথে উঠিয়ে আনতে চাচ্ছি লেখাতে। চরিত্র দুটোই গ্রীক মিথের অন্তর্ভুক্ত। ফেইট/অ্যাপোক্রিফা যেহেতু এখন খুব হাইপড মোমেন্টে আছে তাই ভাবলাম এখনই সময় দুইজনকে নিয়ে আলোচনা করার।
প্রতিটি ফেইট সিরিজেই একজন আরেকজনের সাথে পূর্ব পরিচিত এমন একাধিক সারভেন্টের দেখা পাওয়া যায়। ফেইট জিরোতে ছিল আর্থুরিয়া-ল্যান্সেলট, স্টে নাইট আর UBW তে ছিল গিলগামেশ-আর্থুরিয়া। অ্যাপোক্রিফাতেও এর ব্যতিক্রম হল না। হ্যাঁ, আজকের পোস্ট পূর্ব পরিচিত গুরু-শিষ্য যুগল কেইরন আর অ্যাকিলিসকে নিয়ে। দুইজনের কাহিনীই গ্রীক সাহিত্যের একটা বড় অংশ জুড়ে আছে। দুইজনই দেবতাদের আশীর্বাদপুষ্ট ছিলেন, যুগে যুগে তাদের নিয়ে অসংখ্য কাব্য, নাটক ও চিত্রকর্ম রচিত হয়েছে। আধুনিক সাহিত্য ও অন্যান্য শিল্পকর্মেও তাদের নিয়মিত আবির্ভাব দেখা যায়। যেহেতু মিথ এবং এনিমে দুই জায়গাতেই তারা খুব ডিপলি কানেক্টেড তাই এক পোস্টেই তাদের অতীত নিয়ে আলোচনা করবো।
শুরুর আগে বলে রাখি, কেইরন আর অ্যাকিলিস দুজনই সম্পূর্ণ মিথিকাল চরিত্র। তাদের ঐতিহাসিক সত্যতা নেই বললেই চলে। কেইরন তো মানুষ নন তাই তার অস্তিত্ব থাকার প্রশ্নই উঠে না। অ্যাকিলিসও কাল্পনিক চরিত্র তবে ট্রয় যুদ্ধের ঐতিহাসিক প্রমাণাদি থাকায় অ্যাকিলিসের মত বড় কোন বীরের অস্তিত্ব থাকার বিষয়টি পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ধারণা করা হয় একাধিক বীরের বীরত্বগাথা যোগ করে গ্রীক কবিরা অ্যাকিলিসের গুণকীর্তন করেছেন।
চরিত্র: কেইরন (Chiron) এনিমে: Fate/Apocrypha ভূমিকা: মধ্যমপন্থী জাতীয়তা: ? (পেলিয়ন নামক এক পর্বতে বাস করতেন) জন্মস্থান: জানা যায় নি জন্ম ও মৃত্যুসাল: জানা যায় নি
চরিত্র: অ্যাকিলিস (Achilles) এনিমে: Fate/Apocrypha ভূমিকা: মধ্যমপন্থী জাতীয়তা: গ্রীক (থেসেলিয়ান) জন্মস্থান: থেসেলি, গ্রীস জন্ম ও মৃত্যুসাল: জানা যায় নি
যেহেতু শিক্ষক তাই কেইরনকে দিয়েই শুরু করি। সবাই জানি কেইরন মানুষ নন, তিনি একজন সেন্টর। সেন্টররা এক ধরণের পৌরাণিক প্রাণী যাদের শরীরের অর্ধেক ঘোড়া আর অর্ধেক মানুষের মতন। সেন্টররা মারাত্মক অশিক্ষিত, উশৃঙ্খল, মদ্যপ, ধর্ষকামী জাতি হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু কেইরন অন্যান্য সেন্টরদের চেয়ে আলাদা ছিলেন। এর কারণ জানতে চাইলে সেন্টরদের উৎপত্তি নিয়ে আলোচনা করতে হবে।
সেন্টরদের জন্ম হয়েছিল খুব অদ্ভুতভাবে। ইক্সিওন নামের একজন রাজা একবার দেবী হেরার (জিউসের স্ত্রী) প্রতি খুব প্রলুব্ধ হয়ে পড়েছিল। জিউস তাই ইক্সিওনের সাথে একটু কৌতুক করে বলা যায়। জিউস ধুলা আর মেঘের সমন্বয়ে হেরার মত দেখতে একটি আকৃতি তৈরি করে। ইক্সিওনের সাথে এই আকৃতির মিলনের ফলে যেসব প্রাণীর জন্ম হয় তাদের শরীরের নিচের অংশ ঘোড়ার মত আর উপরের অংশ মানুষের মত ছিল। এদের বংশধরেরাই পরে সেন্টর নামে পরিচিতি লাভ করে।
কেইরনের জন্ম এসব সেন্টরদের মত হয় নি। আসলে সেন্টরদের জন্মের অনেক আগেই কেইরনের জন্ম হয়েছিল। টাইটানদের শাসক ক্রোনোস (জিউসের বাবা) একবার ফিলাইয়া নামের এক মৎসকন্যার সাথে ঘোড়ার রূপ ধরে জোর করে মিলিত হন। (এইসব অস্বাভাবিক সম্পর্ক গ্রীক মিথে স্বাভাবিকই বলা যায়!) ফিলাইয়ার গর্ভেই কেইরনের জন্ম হয়। আর কেইরনের দেহের নিম্নাংশের আকার হয় ঘোড়ার মত। টাইটানের ঔরসে জন্ম নেওয়ায় কেইরনের বুদ্ধিমত্তা উচ্চপর্যায়ের ছিল। গ্রীক মিথে খুব কম সংখ্যক বুদ্ধিমান সেন্টরের অস্তিত্ব পাওয়া যায় আর কেইরন ছিলেন তাদের মধ্যে সর্বাধিক বুদ্ধিমান। কেইরনের দৈহিক আকৃতিও অন্য সেন্টরদের চেয়ে ভিন্ন ছিল। বিভিন্ন চিত্রকর্মে দেখা যায় যে, কেইরনের সামনের পা দুটো মানুষের যেখানে অন্য সেন্টরদের চারপাই ঘোড়ার মত ছিল।
কেইরনের শৈশব-কৈশোর সম্পর্কে বেশি কিছু জানা যায় নি। শৈশবে অ্যাপোলো ও আর্টেমিসের সঙ্গ কেইরনের শান্তিপ্রিয় ও যৌক্তিক চরিত্র গড়ে তোলার পেছনে ভূমিকা রাখে। কেইরন সেন্টর-মানুষ উভয়ের কাছেই শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন। সেন্টরদের সাথেই তিনি বসবাস করতেন এবং মাউন্ট পেলিয়নে তিনি অন্য অসভ্য সেন্টরদের সাথে বিতাড়িত হয়ে আসেন। কেইরন অন্য সেন্টরদের সভ্য করার চেষ্টা চালাতেন। বর্ষীয়ান হওয়ায় মানুষের সাথে কেইরনের পরিচয় কিভাবে হয়েছিল তা জানা যায় না। কয়েক পুরুষ ধরে অসংখ্য বীর কেইরনের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছে তাই তার বয়স ও কালও আন্দাজ করা যায় না।
একজন দক্ষ সমরবিদ, জ্যোতিষী ও চিকিৎসক হলেও কেইরনের মূল পরিচিতি ছিল শিক্ষক হিসেবে। অসংখ্য মানুষ তার কাছে যুদ্ধবিদ্যার শিক্ষা নিয়েছিল। পার্সিয়াস, থিসিয়াস, ইনিয়াস, অ্যাজাক্স, জ্যাসন (স্টে নাইটের মিডিয়ার স্বামী), হেরাক্লস (হারকিউলিস), অ্যাকতিওন সহ অনেক বড় বড় বীর কেইরনের নিজের হাতে গড়া। এছাড়া উদ্ভিদবিজ্ঞান ও চিকিৎসাশাস্ত্রের একজন আদি পথপ্রদর্শক হিসেবে কেইরনকে কৃতিত্ব দেয়া হয়।
অ্যাকিলিসের কাছে আসা যাক। এই শিক্ষকতার সুবাদে অ্যাকিলিসের সাথে কেইরনের পরিচয়ের সূত্রপাত ঘটে। অ্যাকিলিসকে চেনে না এমন কেউ গ্রুপে মনে হয় না আছে। ট্রয় সিনেমার ব্র্যাড পিটের দুর্দান্ত অভিনয় কে ভুলতে পেরেছে! অ্যাকিলিসকে সহজেই গ্রীক মিথের সবচেয়ে জনপ্রিয় বীর বলা যায়। অ্যাকিলিসের মত সুদক্ষ যোদ্ধা, বক্তা ও নেতা কমই আছে গ্রীক সাহিত্যে। শৌর্য-বীর্যে অ্যাকিলিস অনন্য আর সবচেয়ে সুদর্শন বীর হিসেবেও অ্যাকিলিস স্বীকৃত। এনিমেতে অ্যাকিলিসের বিশৌনেন হওয়াটা তাই খুবই যৌক্তিক। এখন অ্যাকিলিসকে নিয়ে কিছুক্ষণ আলোচনা করা যাক।
অ্যাকিলিসের জন্ম থেসেলিতে, তার পিতার নাম পেলেয়ুস, মাতার নাম থেটিস। অ্যাকিলিসের জন্ম নিয়ে বিশাল একটা কাহিনী আছে। সংক্ষেপে বর্ণনা করছি:
অ্যাকিলিসের মা থেটিস ছিল একজন সমুদ্রদেবী। প্রধান দুই দেবতা জিউস আর পোসাইডন দুজনেই থেটিসের পাণিপ্রার্থী ছিল। কিন্তু ভবিষ্যৎবাণী আসে যে থেটিসের গর্ভে জন্মানো সন্তান তার পিতার চেয়েও শক্তিশালী হবে। তাই ক্ষমতা হারানোর ভয়ে দুজনেই পিছিয়ে আসে। থেসেলির শাসক বীর পেলেয়ুসের সাথে থেটিসের বিয়ে ঠিক করা হয়। বলা যায় এই বিয়েতে ঘটিকালির কাজটা কেইরনই করেন। এখানেও একটা বিশাল কাহিনী আছে তবে সেটা অন্যদিনের জন্য তোলা থাকুক। তো এভাবে জন্মের আগেই অ্যাকিলিসের সাথে কেইরনের একটা সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়।
বিখ্যাত ‘অ্যাকিলিস হিল’ প্রসঙ্গে আসা যাক। মানুষ হওয়ার পরও অ্যাকিলিস প্রায় অমর ছিলেন, শুধুমাত্র বাম পায়ের গোড়ালিই তার একমাত্র মরণশীল জায়গা ছিল। ‘অ্যাকিলিস হিল’ তৈরি হওয়া নিয়ে দুটো কাহিনী প্রচলিত:
১। থেটিস সমুদ্রদেবী হওয়ায় পাতালের নদী স্টিক্সের অবস্থান জানতেন। শিশু অ্যাকিলিসকে তিনি সেই নদীর পানিতে গোসল করাতেন নিয়মিত। শিশু অ্যাকিলিসকে বাম পায়ে ধরে উল্টো করে স্টিক্সের পানিতে ডোবানো হত। ফলে অ্যাকিলিসের সারা দেহই অমর হয়ে যায়। পায়ের গোড়ালি হাতে ধরা থাকতো বলে সেই স্থানে পানি লাগে নি। এ কারণেই বাম পায়ের গোড়ালিই অ্যাকিলিসের একমাত্র দুর্বল জায়গা ছিল। এই কাহিনীটিই সবচেয়ে জনপ্রিয়।
২। অন্য আরেকটি কাহিনী অনুসারে থেটিস নিজ পুত্রের সারাদেহ অ্যামব্রোসিয়া (দেবতাদের খাদ্য- সহজ ভাষায় অমৃত) দ্বারা আবৃত করে অ্যাকিলিসের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেন। এর ফলে অ্যাকিলিসের ভেতরের মরণশীল অংশ পুড়ে যায়। পেলেয়ুস এই ঘটনা দেখতে পেরে নিজ স্ত্রীকে বাঁধা দেন। অ্যাকিলিসের বাম পা শুধুমাত্র আগুনের স্পর্শ পায় নি তাই এই জায়গাটাই তার একমাত্র মরণশীল জায়গা হিসেবে রয়ে যায়। পেলেয়ুস বাঁধা দেওয়ায় থেটিস ক্রোধান্বিত হয়ে পরিবার ত্যাগ করেন এবং সমুদ্রে চলে যান।
‘অ্যাকিলিস হিল’ প্রবাদটি দিয়ে এখন কোন শক্তিশালী জিনিসের দুর্বল জায়গাকে ইঙ্গিত করা হয়।
কেইরনের কাছে অ্যাকিলিসের শিক্ষা গ্রহণের প্রসঙ্গে আসা যাক। হোমারের ‘ইলিয়াডে’ এ প্রসঙ্গে কোন তথ্য নেই। কবি Statius এর কাব্য ‘অ্যাকিলিডে’ এ সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ আছে।
অ্যাকিলিসের পিতা পেলেয়ুস নিজেই কেইরনের ছাত্র ছিলেন। থেটিস চলে যাওয়ার পর পেলেয়ুস নিজের ছেলেকে সঠিক শিক্ষা দেওয়ার জন্য কেইরনের কাছে নিয়ে আসেন। কেইরনের কাছে অ্যাকিলিস নয় বছর অধ্যয়ন করেন। কেইরন অ্যাকিলিসকে তলোয়ারবিদ্যা, রথচালনা, বর্শাচালনা, তীরন্দাজি সহ যুদ্ধবিদ্যার সকল শাখায় পারদর্শী করে তোলেন। হিলিং মেডিসিনেও অ্যাকিলিস তার কাছ থেকে বিশেষ জ্ঞান লাভ করেন যা ট্রোজান যুদ্ধে কাজে এসেছিল। শরীর সম্পর্কিত এসব বিদ্যা ছাড়াও সুস্থ মানসিকতা তৈরির শিক্ষাও তিনি কেইরনের কাছে পান। অ্যাকিলিসের ভাষ্যে,
এইসব শিক্ষা কোন আরামদায়ক উপায়ে আসে নি। কেইরন অ্যাকিলিসকে সিংহের নাঁড়িভুঁড়ি, স্ত্রী নেকড়ের মজ্জা ও বন্য শুয়োরের মাংস খাওয়াতেন। এই ভয়ানক খাদ্যাভাসের সাথে চলতো কঠোর সাধনা। দয়ালু হলেও বকাঝকার বেলায় কেইরন কোন কার্পণ্য করতেন না। অ্যাকিলিসের ভাষ্যে,
“আমি শক্তভাবে দাঁড়িয়ে ছিলাম কিন্তু নদীর প্রবল স্রোত আর তার ক্রমাগত তাড়া দেওয়ার কারণে আমি নড়বড়ে হয়ে যাচ্ছিলাম। তিনি আমাকে ভয়ানক হুমকি দিলেন এবং বকাঝকা করে ধুয়ে দিলেন। আমি ভয়ে জায়গা ছেড়ে নড়তে পারলাম না।” (অ্যাকিলিড- 2.146-150).
কেইরনের কাছে অ্যাকিলিসের তীরন্দাজি শিক্ষা। সাথে শাসনও চলছে সমানে
এইধরণের অম্লমধুর আচরণের কারণে অ্যাকিলিস আর কেইরনের সম্পর্কটা ছাত্র-শিক্ষকের গণ্ডি পেরিয়ে অনেকটা পিতা-পুত্রের মত হয়ে যায়। অ্যাকিলিস কয়েকবার কাব্যে কেইরনকে পিতৃস্থানীয় হিসেবে উল্লেখ করেন। কেইরন যখন অ্যাকিলিসকে মুখে তুলে খাইয়ে দিতেন তখন অ্যাকিলিস তাকে পিতা হিসেবেই মনে করতেন। এক সন্ধ্যায় থেটিস তাকে দেখার জন্য কেইরনের আস্তানায় আসলে অ্যাকিলিস মাকে ছেড়ে কেইরনের উপরেই গুটিসুটি মেরে শুয়ে থাকে। কবির ভাষ্যে:
“রাত গভীর থেকে গভীরতর হয়। দীর্ঘদেহী সেন্টর পাথরের উপর এলিয়ে পড়েন আর ছোট্ট অ্যাকিলিস তার কাঁধে গুটিসুটি মেরে ঘুমিয়ে পড়ে। যদিও তার মা এখানেই আছেন কিন্তু অ্যাকিলিসের কাছে পারিবারিক টানের চেয়ে এটাই বেশী পছন্দনীয়।” (অ্যাকিলিড- 1.195-97).
এখানে কেইরনকেও কোন সেন্টর মনে হচ্ছে না। কেইরনের দেহ পশুর হলেও অন্তরে যে কোন পশুত্ব নেই তা এখান থেকে বোঝা যায়। দয়ালু কেইরন এর এই ভালবাসা অ্যাপোক্রাইফায় কেইরনের মাস্টার ফিয়োরেও পেয়েছে। আমি খুব আবেগান্বিত হয়ে গিয়েছিলাম যখন কেইরন, ফিয়োরের হাতের উল্টোপিঠে চুমু খেয়ে বিদায় নেয়।
কেইরনের পিঠে কিশোর অ্যাকিলিস!
অ্যাকিলিসে ফেরা যাক। প্রশিক্ষণ শেষে অ্যাকিলিস নিজ রাজ্যে ফিরে আসে। গ্রীসের সবচেয়ে সুন্দরী নারী হেলেনের স্বয়ংবর সভায় অ্যাকিলিসও অংশ নেয়। পরে হেলেন, প্যারিস কর্তৃক ট্রয় নগরীতে অপহৃত হলে অন্যান্য বীরদের মত অ্যাকিলিসও ট্রয় অভিযানে যোগ দেন। যুদ্ধে যাওয়ার পূর্বে মা থেটিস অ্যাকিলিসের সাথে দেখা করেন। থেটিস বলেন যে দেবতার আশীর্বাদে তিনি অ্যাকিলিসের জন্য দুটো গন্তব্য নিয়ে এসেছেন:
১। অ্যাকিলিস কোন যুদ্ধে যোগদান করতে পারবে না। তবে এর বিনিময়ে অ্যাকিলিস একটি দীর্ঘ, সুখী জীবন পাবে।
২। যুদ্ধে যোগদান করলে অ্যাকিলিস অনেক বড় বীর হবে কিন্তু বেশীদিন বাঁচতে পারবে না।
রোমাঞ্চপ্রিয় অ্যাকিলিস দ্বিতীয় জীবনটাই বেছে নেন। ৫০ জাহাজ বোঝাই ২৫০০ সৈনিক নিয়ে অ্যাকিলিস ট্রয় অভিমুখে যাত্রা করেন। অ্যাকিলিসের বাহিনীর সৈন্যদের মিরমিডিয়ন বলা হয়। (মিরমিডিয়নরা আগে পিঁপড়া ছিল)
এরপরের কাহিনী সবার জানা। যুদ্ধের সবচেয়ে আলোচিত চরিত্র ছিল অ্যাকিলিস। ট্রয়ের সবচেয়ে বড় বীর হেক্টরকে পরাজিত করে অ্যাকিলিস। অবশেষে দেবতা অ্যাপোলোর পথনির্দেশনায় কাপুরুষ প্যারিসের তীর আঘাত করে অ্যাকিলিসের বাম পায়ের গোড়ালিতে। অ্যাকিলিস সেখানেই মারা যান। বন্ধু প্যাট্রোক্লাসের ছাইয়ের সাথে তার ছাই মিশিয়ে তাকে সমাধিস্থ করা হয়।
কেইরন, অ্যাকিলিসকে lyre বাজানো শেখাচ্ছেন
এনিমেতে অ্যাকিলিসের দুটো নোবেল ফ্যান্টাজম দেখা গেছে। দুটোই কিছুটা রিয়েলিটি মার্বেল ঘরানার। Diatrekhōn Astēr Lonkhē অ্যাকিলিস ব্যবহার করেছিল কেইরনের বিপক্ষের ফাইটে। প্রতিপক্ষের পেছনে বর্শা ছুঁড়ে মেরে এটা অ্যাক্টিভেট করতে হয়। মজার ব্যাপার হল এই বর্শাটা কেইরন তৈরি করে পেলেয়ুসকে দিয়েছিলেন, পেলেয়ুস পরে নিজ পুত্রকে উপহার দেন। বর্শাটি কেইরনের বাসস্থান মাউন্ট পেলিয়নের গাছ থেকে তৈরি।
Akhilleus Kosmos নোবেল ফ্যান্টাজমটা অ্যাস্টোলফো অসাধারণভাবে ব্যবহার করেছিল কর্ণের বিপক্ষে। দুর্দান্ত এই নোবেল ফ্যান্টাজমের পেছনেও একটা কাহিনী আছে। মনে হয় সবাই কাহিনীটা জানেন তারপরও বলি:
ট্রয়ের যুদ্ধের এক পর্যায়ে অ্যাকিলিস যুদ্ধ না করার সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে গ্রীক বাহিনী পর্যদুস্ত হয়ে পড়ে। অ্যাকিলিসের বন্ধুবর প্যাট্রোক্লাস তাই অ্যাকিলিসের বর্ম আর ঢাল ধার নিয়ে যুদ্ধে নেমে পড়ে। সবাই ভাবে অ্যাকিলিস নিজেই যুদ্ধে নেমে এসেছে তাই গ্রীক বাহিনী তার হারানো উদ্যম ফিরে পায়। সারাদিন বীরের মত যুদ্ধ করলেও ট্রোজান বীর হেক্টরের হাতে প্যাট্রোক্লাস নিহত হয়। হেক্টর, প্যাট্রোক্লাসের গা থেকে বর্ম আর ঢাল খুলে নিজের কাছে রেখে দেয়।
প্রিয় বন্ধুর মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর অ্যাকিলিস যেন আগ্নেয়গিরি হয়ে উঠে। লৌহশিল্প ও অগ্নির দেবতা হেফাস্টাস, অ্যাকিলিসকে নতুন একটা ঢাল বানিয়ে দেন। এটাই সেই বিখ্যাত ‘অ্যাকিলিস শিল্ড’। ঢালটি অপূর্ব কারুকার্যময় ছিল। হোমার তাঁর ইলিয়াডের আঠারো নাম্বার অধ্যায়ে প্রায় ১০০ শ্লোক ধরে এই ঢালের গায়ে আঁকা কারুকাজের বর্ণনা করেন। ঢালটিতে গ্রীক নগর সভ্যতার একটা মিনিয়েচার আঁকা ছিল। তাই অ্যাকিলিসের নোবেল ফ্যান্টাজমে আমরা একটা গ্রীক সভ্যতার অনুরূপ রিয়েলিটি মার্বেল দেখি। এই জায়গায় হিগাশিদার কল্পনাশক্তির তারিফ করতেই হবে, A-1 পিকচারসও দুর্দান্ত ফ্লুয়িড অ্যানিমেশন ঢেলেছে। ভাসাবি শক্তিকে প্রতিহত করার জায়গাটা চমৎকার ছিল। এইসব ছোটখাটো ডিটেইলের জন্য অ্যাপোক্রাইফার ২২ নম্বর পর্ব স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
শিল্পীর কল্পনায় অ্যাকিলিসের শিল্ড
অ্যাকিলিসের একটি মাত্র সন্তানই ছিল। সেই ছেলের নাম ছিল নিওপতেলেমাস। নিওপতেলেমাস পরে ‘অ্যাকিলিস শিল্ডের’ মালিক হয়। ট্রয় যুদ্ধের পরে আগামেমননের ছেলে ওরেস্তেসের হাতে নিওপতেলেমাস নিহত হয়। বাবা-ছেলে দুজনের মৃত্যুই ট্র্যাজিক।
গুরু কেইরনের মৃত্যুও আর দশজনের মত হয় নি। টাইটানের ঘরে জন্ম নেওয়ার কারণে কেইরন অমর ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত নিজের ছাত্র হেরাক্লসের কারণেই কেইরন মারা পড়ে। হেরাক্লস একবার গুরুর আস্তানায় ওয়াইনের বোতল খুললে সেই ওয়াইনের গন্ধে মদ্যপ সেন্টররা ভীষণ গোলমাল শুরু করে। এক পর্যায়ে মারামারি শুরু হয়ে যায় এবং তাদের থামানোর জন্য হেরাক্লস হাইড্রার রক্তমাখা তীর ছুঁড়তে থাকেন। কেইরন তখন কী গোলমাল হল তা দেখার জন্য নিজের আস্তানার দিকে যাচ্ছিলেন। দুর্ভাগ্যবশত একটা রক্তমাখা তীর কেইরনের গায়ে এসে লাগে।
কেইরন যিনি কিনা নিজে ঔষধ নির্মাণে ওস্তাদ, নিজ ব্যথার কোন ঔষধ তৈরি করতে পারছিলেন না। হাইড্রার রক্ত অব্যর্থ বিষ, দেহে স্পর্শ হলেই মৃত্যু নিশ্চিত। অমর হওয়ায় কেইরনের মৃত্যু হচ্ছিল না কিন্তু অসহনীয় যন্ত্রণা ঠিকই পাচ্ছিলেন। যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে অবশেষে তিনি নিজের অমরত্ব সরিয়ে নেওয়ার প্রার্থনা জানান দেবতাদের কাছে। তার সৎ ভাই জিউস এই প্রার্থনা মঞ্জুর করেন এবং কেইরনকে আকাশের একটা নক্ষত্রপুঞ্জ বানিয়ে দেন। সেই নক্ষত্রপুঞ্জটিই Sagittarius বা ধনু নামে পরিচিত। দেখলে মনে হয় কোন সেন্টর হাতে তীর-ধনুক তাক করে রেখেছে।
কেইরনের নোবেল ফ্যান্টাজম ‘Antares Snipe’ এর আন্তারেস শব্দটি একটি নক্ষত্রকে নির্দেশ করে। নক্ষত্রটি স্যাজিটেরিয়াসের পাশের স্করপিয়াস নক্ষত্রপুঞ্জে অবস্থিত। স্যাজিটেরিয়াসের দিকে তাকালে মনে হয় এর ডান দিকের শেষ প্রান্ত অর্থাৎ ধনুক সামনের ‘আন্তারেসের’ দিকে তাক করা আছে। এজন্যই কেইরনের নোবেল ফ্যান্টাজম সবসময়ই চালু থাকে।
২১ পর্বে কেইরন আর অ্যাকিলিস নিজেদের মধ্যে যে মার্শাল আর্টসটা চর্চা করেছিল সেটার নাম Pankration. প্যানক্রেইশন সর্বাধিক প্রাচীন মার্শাল আর্ট হিসেবে স্বীকৃত। প্যানক্রেইশনের নির্দিষ্ট কোন নিয়ম ও টাইম লিমিট ছিল না। বক্সিই, রেসলিং, কিকিং, সাবমিশন হোল্ডিং সবকিছুই গ্রহণযোগ্য ছিল, একমাত্র নিষিদ্ধ ছিল প্রতিপক্ষের চোখ খোঁচানো ও কামড়াকামড়ি। লড়াইয়ে অনেক সময়ই অংশগ্রহণকারীদের মৃত্যু হত।
প্যানক্রেইশন ম্যাচ
প্রাচীন অলিম্পিকে প্যানক্রেইশন একটা ডিসিপ্লিন হিসেবে ছিল। তবে খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ অব্দ থেকেই গ্রীসে প্যানক্রেইশন চর্চা হয়ে আসছে এমন প্রমাণ পাওয়া যায়। স্পার্টান সেনাবাহিনী এবং আলেকজান্ডারের সৈন্যরা প্যানক্রেইশনে দক্ষ ছিল। আলেকজান্ডারের পিতা ফিলিপের প্যানক্রেইশনে অংশ নেয়ার নজির আছে।
মিথলজিতে হেরাক্লস ও থিসিয়াসকে প্যানক্রেইশনের আবিষ্কারক হিসেবে পাওয়া যায়। কেইরনই সম্ভবত ঐ সময়েই প্যানক্রেইশন শেখেন তারপর অ্যাকিলিসকে সেই বিদ্যায় দক্ষ করে তোলেন। আধুনিক যুগে আবার প্যানক্রেইশনের পুনর্জন্ম ঘটেছে। ইউটিউবে বেশ কিছু ভিডিও দেখেছিলাম। নিয়ম-কানুনের কারণে এখন মরণের গন্ধ নেই খেলাটাতে। কেইরন ভার্সাস অ্যাকিলিস পর্যায়ের ভয়ানক গতিময় জিনিসের ছিটেফোঁটাও নেই। তবে এরপরও বেশ উপভোগ্য একটা মিক্সড মার্শাল আর্টস হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে ডিসিপ্লিনটা।
(Now just imagine a pankration match between Iskander and Achilles. Also imagine Iskander performing a submission hold on our lovely Gilgamesh. )
বিশেষ দ্রষ্টব্য: একটা মতবাদ আছে, আলেকজান্ডারের ভারত অভিযানের সময় প্যানক্রেইশন ভারতে প্রবেশ করে। পরে ভারত ঘুরে এই প্যানক্রেইশনই দূরপ্রাচ্যে গিয়ে কুংফু-যুযুৎসুতে পরিণত হয়েছে। কুংফুর প্রচারক বোধিধর্মাকে ‘নীল চোখের দানব’ হিসেবে অভিহিত করা হত। হতে পারে তিনি আলেকজান্ডারের সেনাবাহিনীর লোক ছিলেন, পরে ভারতবর্ষে থেকে যান। (মতবাদটি অতটা শক্তিশালী নয়)
অ্যাকিলিস আর কেইরনের সম্পর্ক প্রাচীন ভারতের গুরু-শিষ্যদের নিয়ে যেসব কিংবদন্তী রয়েছে তার সমতুল্য। ভারতীয় পুরাণে ছাত্রকে শিক্ষকের আস্তানায় অবস্থান নিয়ে দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নানা বিষয়ে দীক্ষিত হতে দেখা যায়। অ্যাকিলিসও সেই প্রক্রিয়া পার হয়ে এসেছে। অ্যাকিলিসের জীবনে কেইরনের ভূমিকা পিতার চেয়ে কোন অংশ কম নয়। এজন্যই অ্যাপোক্রাইফা শুরু হওয়ার পর আমি সবচেয়ে বেশী হাইপড ছিলাম এই দুইজনকে নিয়ে। অ্যাকিলিস জানতো যে ব্ল্যাক ফ্যাকশনের কেউ তাকে ঠেকাতে পারবে না। আর্চার অফ ব্ল্যাকের পরিচয় জানার পর অ্যাকিলিসের সেই আত্মবিশ্বাস অনেক কমে যায়। কারণ অ্যাকিলিসের সকল কৌশল কেইরনের চেয়ে ভাল কেউ জানে না। কেইরনও নিজ শিষ্যের উন্নতি কেমন হয়েছে তা দেখার জন্য মুখিয়ে ছিলেন। অ্যাকিলিস নিজের যুদ্ধলব্ধ বিদ্যা দিয়ে কেইরনকে হতাশ করে নি। পরাজিত হয়ে কেইরন নিজেই আসলে জয়ী হলেন। এই জয় মহান শিক্ষকব্রতের জয়। এনিমের একটা বড় অংশে দুইজনের দ্বন্দ্বকে একটুও ফোকাস করা হয় নি, তবে সব পুষিয়ে দিয়েছে একটা পর্বই। ইডিওলজিকাল কোন ক্ল্যাশ না থাকার পরও শুধুমাত্র দুর্দান্ত একটা অতীতের জোরে দুজনের মধ্যের লড়াইটা চমৎকারিত্ব পেয়েছে। অ্যাকিলিস ‘গুরু মারা বিদ্যা’ প্রয়োগ করলেও আন্তারেস স্নাইপের মাধ্যমে কেইরন দেখিয়ে দিলেন যে ‘ওস্তাদের মার শেষ রাতে”।
সাধারণত আমি একেবারে নতুন কোন মাঙ্গা পড়ার ক্ষেত্রে আগ্রহ পোষণ করি না। যে মাঙ্গার এনিমে নেই আরকি। অর্ধসমাপ্ত এনিমেগুলার মাঙ্গা পড়ে কৌতূহল মিটিয়েই কূল পাই না। তাছাড়া এতদিন পরেও মাঙ্গা পড়ার অভ্যাসটা গড়ে উঠে নি পুরোপুরি। তাই মাঝেমাঝেই দেখতাম Arafin Shanto কে একটা ফ্রেশ মাঙ্গা নিয়ে চেঁচামেচি করতে। অতটা পাত্তা দেই নি প্রথমে, ‘কোন একদিন পড়বোর’ লিস্টে ফেলে রেখেছিলাম অন্য অনেক সিরিজের মত। একদিন Rezwan Shuvo তাই ক্যাঁক করে ধরলো মাঙ্গা পড়ার ব্যাপারে। আমতা আমতা করে উত্তর দিলাম এই তো এটা-সেটা পড়ছি! সুযোগ বুঝে আরেফিনের সাজেস্ট করা সেই মাঙ্গার ফার্স্ট চ্যাপ্টারের পুরোটা কাহিনী মাথায় ঢুকিয়ে দিল সে। বাসায় এসে প্রথম ভলিউম শুরু করার সময় ভাবলাম প্রথম চ্যাপ্টারের পুরো কাহিনী যখন জেনে গেছি, মাঙ্গাটা কি আর ভাল লাগবে? প্রথম চ্যাপ্টারের শকিং ফ্যাক্টরের স্পয়লার খাওয়ার পরও কমিক রিডারের পেজ উল্টাতে উল্টাতে হুট করে খেয়াল করলাম যে নিমিষেই সাত চ্যাপ্টার শেষ করে ফেলেছি। পরের ৬৬ চ্যাপ্টার যে রোলার-কোস্টার রাইড উপহার দিয়েছে তার জন্য আগে থেকেই দুজনকে ধন্যবাদ দিয়ে রাখি। মধু হই হই পুরো বিষ খাইয়ে দিল তারা! ওহ, এতক্ষণ ধরে তো মাঙ্গার নামটাই বলা হল না! পিটার প্যানের স্রষ্টা জে.এম ব্যারির কল্পিত দেশ ‘নেভারল্যান্ডের’ সাথে মিলিয়ে মাঙ্গার নাম দেওয়া হয়েছে ‘দ্যা প্রমিজড নেভারল্যান্ড’। নামকরণটা যে কেন এত ভয়াবহভাবে যথার্থ তা নিয়ে অন্য কোন পোস্টেই আলোচনা করা যাবে।
প্লট: (স্পয়লার অ্যালার্ট তবে এই স্পয়লার জরুরী)
‘Grace Field Orphanage’ এ থাকে তিন এতিম শিশু এমা, নরম্যান আর রেই। তাদের তিনজনেরই বয়স ১১. তাদের সাথে থাকে বিভিন্ন বয়সের আরো ৩৩ জন শিশু। এতিমখানার দেখাশোনা করেন ‘মাদার ইসাবেলা’। ইসাবেলাকেই তারা জন্মের পর থেকে অভিভাবক জেনে এসেছে, আর এতিমখানার বাকী শিশুদের আপন ভাই-বোন। ইসাবেলার যত্ন-আত্তিতে ভালই কেটে যাচ্ছিল এমা-নরম্যান-রেইদের দিন। মাঝেমাঝেই তাদের এতিমখানা থেকে বাচ্চাদের দত্তক নিয়ে যায় বিভিন্ন পরিবার। এমাদের মনে অনেক দুঃখ যে পরিবার পাওয়ার পর তাদের সঙ্গীরা তাদের আর খোঁজ-খবর রাখে না। এ পর্যন্ত তাদের কেউই সময় করে একটা চিঠিও পাঠায় নি। একদিন ছয় বছরের ‘কনিকে’ দেখাশোনা করার জন্য অভিভাবক পাওয়া যায়। সাজগোজ করা কনিকে অশ্রসজল চোখে বিদায় জানায় এমা-নরম্যানরা। রাতে ঘুমানোর সময় হুট করে এমা টের পায় যে কনি তার প্রিয় পুতুলটাকে ভুলে ফেলে গেছে। রেই জানায় যে হয়তোবা অরফানেজের বাইরে কনিরা এখনো আছে, তাড়াতাড়ি করলে হয়তোবা পুতুলটা দেওয়া সম্ভব হবে। এমা আর নরম্যান গেটের দিকে দৌড় লাগায়। গেটের কাছে গিয়ে দেখে চারদিক শুনশান, একটা বড় ট্রাক দেখতে পায় তারা শুধু। এমা ভাবে হয়তোবা ট্রাকের ভেতরেই পুতুলটা রেখে দিলে সেটা কনির কাছে পৌছে দেওয়া হবে। ট্রাকের পেছনে উঁকি দেওয়ার পর এমা এক অকল্পনীয় বীভৎস দৃশ্য দেখে মূর্তি হয়ে যায়। নরম্যান এগিয়ে এসে দেখার পরে আঁতকে উঠে।
ট্রাকের ভেতরে রাখা আছে সুন্দর পোশাক পরা বেচারা কনির মৃতদেহ, রক্তের সাগরে সুন্দর করে ভাসছে সে। চোখে লেগে আছে ভয়াবহ আতংক। সবচেয়ে ভয়ানক ব্যাপার হল কে জানি কনির বুকে একটা শস্যের গাছ গেঁথে রেখেছে। তখনই কথাবার্তার আওয়াজ শুনে তারা দ্রুত ট্রাকের নিচে লুকিয়ে পড়ে। ভয়ানক আতংক নিয়ে তারা দেখতে পায় যে পৈশাচিক আর বীভৎস দুই দানব কথা বলছে অরফানেজের ব্যাপারে। আড়ি পেতে তারা জানতে পারে যে এই অরফানেজ আসলে একটা হাই-ক্লাস ফার্ম। এখানে মানুষের বাচ্চার দেখভাল করা হয় সম্ভ্রান্ত দানবদের খাবার হিসেবে! ছয় বছর বয়স থেকেই বাচ্চাদের খাবার হিসেবে রপ্তানি করা হয়। দানবদের প্রিয় খাবার হল মানুষের মগজ। আর ‘মাদার ইসাবেলার’ কাজ হচ্ছে চাহিদামত সেবাযত্ন করে বাচ্চাদের ব্রেইনকে পরিপূর্ণ করে তোলা।
এসব শুনে মুহূর্তের মধ্যে এমা আর নরম্যানের চেনা জগতটা তাসের ঘরের মত ভেঙ্গে পড়ে। সদা স্নেহশীল মাদার হয়ে যায় তাদের সবচেয়ে বড় শত্রু। ঘনিষ্ঠ বন্ধু রেইকে তারা পুরো ঘটনাটা জানায়। তিনজন মিলে পুরো অরফানেজের সবাইকে নিয়ে পালানোর অসম্ভব পরিকল্পনা আঁটে। সম্বল শুধু তাদের তিনজনের তীক্ষ্ণবুদ্ধি আর জ্ঞান। বিপক্ষে আছে ভয়ানক নিষ্ঠুর মাদার, বাইরের মানুষখেকো দানবঘেরা দুনিয়া আর অরফানেজের বিশাল দেওয়াল। তারপরও খাবার না হওয়ার তীব্র তাড়না আর বাইরের দুনিয়াকে জানার বাসনা তাদের শক্তি যোগায় অসম্ভব এক অভিযানের সঙ্গী হতে।
চরিত্র: মাঙ্গার ক্যারেকটারগুলা এক কথায় দুর্দান্ত। অরফানেজের আইকিউ টেস্টে সবসময় যৌথভাবে সর্বোচ্চ নাম্বার পাওয়া এমা-নরম্যান-রেই তিনজনেরই আছে স্বকীয়তা। এমা খুব চঞ্চলমতি আর তার হৃদয়টা বিশাল। সে সব পরিকল্পনাই আঁটে সবার নিরাপত্তাকে মাথায় রেখে। তাই ভয়ানক ঝুঁকি নিতে সে পিছপা হয় না। কঠিন অনেক সমস্যার সরল সমাধানও করে দিতে পারে সে। এক কথায় নায়কোচিত সব গুণাবলি আছে এমার।
এমা প্রদীপের আলো হলে রেই হলো তার অন্যপাশের অন্ধকার। কিছুটা স্বার্থপরই বলা যায় রেইকে। তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার অধিকারী রেই সবসময়ই নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করে। এ কারণে এমার সাথে তার একচোট বাঁধে নিয়মিতই। রেইয়ের নিপুণ দৃষ্টিভঙ্গি অনেক বিপদ থেকে বাঁচায় তাদের। তাছাড়া প্রতিপক্ষের গতিপ্রকৃতি যাচাই করার অসাধারণ জ্ঞান আছে রেইয়ের।
তবে আমার সবচেয়ে প্রিয় চরিত্র নরম্যানের বৈশিষ্ট্য হল ইস্পাত-কঠিন স্নায়ু আর চমৎকার দূরদর্শী ক্ষমতা। অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথার নরম্যানকে দেখে বোঝার উপায় নেই তার মনে কী চলছে। প্রয়োজনে নিজের জীবন দিতে কিন্তু আবার প্রয়োজনে অন্যের জীবন হাসিমুখে নিতেও তার বিন্দুমাত্র হাত কাঁপবে না। প্রতিপক্ষের চাল আন্দাজ করে নিজেদের পরিকল্পনা সাজানোর বেলায় নরম্যান সিদ্ধহস্ত। ভয়-ডর বলে সম্ভবত কিছু নেই নরম্যানের। তার হাসিমুখে অন্যকে নিয়ন্ত্রণ করা দেখলে গায়ের রোম খাঁড়া না হয়েই পারে না। Monster এর ইয়োহান লিবার্টের ভদ্র সংস্করণ হল নরম্যান আমার মতে।
এছাড়া ডন, গিল্ডা, মাদার, সিস্টার ক্রোন এবং সামিনের চ্যাপ্টারগুলাতে আসা চরিত্র ও ভিলেনরাও সমান আকর্ষণীয়।
প্রতিক্রিয়া:
আমার মতে প্রমিজড নেভারল্যান্ড মাঙ্গার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হল এর টুইস্ট আর কাহিনী লুকিয়ে রাখার প্রবণতা। টুইস্টটা যেন দুই পক্ষের দিক থেকেই আসে, দুই পক্ষই প্লট টুইস্টের শিকার হয় সমানতালে। এমা-নরম্যান-রেইরা প্ল্যান আঁটার পরে দেখা যায় যে, মাদার এসে মুহূর্তে তা নস্যাৎ করে দিচ্ছে। আবার তারাও মাদারের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে বারবার চ্যালেঞ্জ জানিয়ে যাচ্ছে নিরলসভাবে। দুই পক্ষই যখন ভাবছে তাদের প্রতিপক্ষের খেল খতম তখনই অপর পক্ষ তুরুপের তাস বের করে পাশার দান উল্টে দিচ্ছে। এ যেন এক নিরন্তর ইঁদুর-বিড়াল খেলা। শুধু বিড়ালের জায়গা দখল করে নিয়েছে নিষ্ঠুর চতুর এক মহিলা আর ইঁদুরের জায়গায় আছে সুযোগসন্ধানী তিন কিশোর-কিশোরী।
এই ইঁদুর-বিড়াল খেলাকে জমিয়ে দিয়েছে মাথার লড়াই। এমা-নরম্যান-রেইদের শারীরিক সক্ষমতা অল্পই তবে তারা সেটা পুষিয়ে নিয়েছে মাথা খাটানোর ক্ষমতা দিয়ে। হাসিমুখ মাদারের সাথে দৈনন্দিন সময় অতিবাহিত করলেও তাদের মগজের ধূসর কোষগুলো সচল থাকে চব্বিশ ঘন্টা। প্রতিপক্ষের কথাবার্তার পাশাপাশি চাল-চলন, আচার-ব্যবহার ও মুখভঙ্গি দেখে ভবিষ্যৎ চাল আন্দাজ করে নেয় তারা। এগারো বছরের তিনজন শিশুর এরকম বুদ্ধিমত্তা দেখেকে অবাক হতে হয়। সাথে সাথে চলতে থাকে ভয়ানক ঝুঁকি নিয়ে আড়ি পাতা, গোপনে সরঞ্জাম সংগ্রহ করা ও বাইরের দুনিয়ার খবর নেওয়ার প্রচেষ্টা। সমান সেয়ানা প্রতিপক্ষও তাদের মানসিকভাবে গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য বদ্ধপরিকর। মাথার উপর মৃত্যু পরোয়ানা ঝুলিয়ে রেখে এরকম রিস্কি কাজের বাহার মাঙ্গাটাকে করে তুলেছে আরো উত্তেজক।
মাঙ্গাটার কাহিনী লুকিয়ে রাখার ক্ষমতা অতুলনীয়। যখনই মনে হবে তীরে এসে তরী ডুবছে তখনই ভয়ানক একটা সত্য উন্মোচন করে পাঠককে নাড়িয়ে দেবেন মাঙ্গাকারা। মাঙ্গাকারা যেন পাঠককে আশা আর নিরাশার দুটো নৌকায় পা দিতে বাধ্য করেছেন। একদিকের নৌকা হেলে পড়লেও তা পুরোপুরি ডুবে না, তাই আশার বাতিও নেভে না পুরোপুরি। এ কারণেই মাঙ্গার চরিত্রগুলাকে আরো বেশী আপন মনে হয়, তাদের কাজকর্মের উত্তেজনাটাও অন্য মাত্রায় অনুভব করা যায়। একটার পর একটা ক্লু রেখে দেওয়া হয় গল্পে যার সূত্রে চরিত্রগুলার আশার আলো জিইয়ে থাকে। সাথে সাথে আমরাও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলি। মাঝেমাঝে হতাশা চরম মাত্রায় পৌছে গেলেই ভয়াবহ কোন প্লট টুইস্ট এসে কাঁপিয়ে দিয়ে যায় সবকিছু। একঘেয়ে ভাবে কথাগুলো বলতে হচ্ছে কারণ চ্যাপ্টার আর ঘটনার কথা বিন্দুমাত্র উল্লেখ করলেই স্পয়লার হয়ে যাবে।
প্রমিজড নেভারল্যান্ড মাঙ্গাকে আসলে অ্যাটাক ইন টাইটান ও মেইড ইন অ্যাবিসের শংকর বলা যায়। AOT এর মধ্যে যে বেঁচে থাকার তাড়না ও মানবজাতির টিকে থাকার প্রেরণাটা রয়েছে তা ভালভাবেই আছে নেভারল্যান্ড মাঙ্গায়। আবার MIA এর অপূর্ব ওয়ার্ল্ড বিল্ডিং আর ইকোসিস্টেম এর বর্ণনাও আছে মাঙ্গাটাতে। AOT ও MIA এর মধ্যে অজানাকে জানার যে থ্রিলটা অপেক্ষা করে দর্শকদের জন্য তা সমানভাবেই আছে নেভারল্যান্ড মাঙ্গায়। বরংচ তা প্রদর্শিত হয়েছে আরো ভিন্ন আঙ্গিকে ও ভিন্ন পরিস্থিতিতে। আবার নারুতো শিপ্পুডেনের মত পরিবারের রহস্য-ক্ষমতার দ্বন্দ্ব-চক্রান্ত-অতীতের পাপ-নিয়ম ভাঙ্গা-সৃষ্টির অরিজিন ইত্যাদি জিনিসের ব্যাপক আভাস পাওয়া যাচ্ছে নতুন চ্যাপ্টারগুলাতে। অরফানেজের সীমাবদ্ধ জায়গায় কাহিনী শুরু হলেও দ্রুতই মাঙ্গাকারা পাঠকদের একটা নিজস্ব ইউনিভার্স উপহার দিয়েছেন। সেটা নিয়ে এখন ইন্টারনেটে তুমুল আলোচনাও চলছে।
মাঙ্গার আর্ট বেশ ভাল। ইলাস্ট্রেটর সাহেব খুব ভালভাবেই চরিত্রগুলার মুখভঙ্গি উঠিয়ে এনেছেন কাগজে। দানবগুলার ডিজাইন খুবই ভয়াবহ। কিছুটা এলিয়েন আর কিছুটা পশু মনে হয় তাদের। তুরুপের তাসগুলা বের করার সময় নরম্যান-এমা-রেইদের চেহারা হয় দেখার মতো, এই জায়গাগুলাতে ডার্ক লাইনের ব্যবহার খুব ভাল লাগে। অসহায় চেহারাও আঁকতেও অনেক ওস্তাদ ইলাস্ট্রেটর। আর রাগ-ক্রোধের দৃশ্যগুলা তো রীতিমত দুর্দান্ত। গাছপালা, ঝর্ণা, ভূগর্ভ, মরুভূমি আর অদ্ভুত সব জীবজন্তুর আঁকাও ভাল ছিল অনেক। নরম্যানের স্মিত চেহারা আর এমার হাসিমুখ দেখলে ব্যাপক প্রশান্তি অনুভূত হয়।
সম্ভবত আর কোন কিশোর সাহিত্য আমাকে এত থ্রিল দেয় নি দ্যা প্রমিজড নেভারল্যান্ডের মত। ২৯-৩০ এর দিকে গাঢ় হতাশা আমাকে ঘিরে ধরেছিল চারপাশ থেকে। ৩২-৩৩ এ যখন চমক আসলো তখন গা রীতিমত কাঁপছিল আমার। চ্যাপ্টার ৩৬ এর সময় তো আমি আনন্দে প্রায় কেঁদেই ফেলেছিলাম। বেঁচে থাকার প্রেরণা যে কত আনন্দের হতে পারে তা AOT এর পরে আরেকটা সিরিজে এত অনুভব করতে পারলাম। চ্যাপ্টার ৩৬-৩৭ এর ক্লাইমেটিক ঘটনাগুলো ঘটার সময় গায়ের রক্ত যেন টগবগ করে ফুটছিল। নিজের চেহারা নিজে দেখা যায় না, হয়তো আয়নাতে তখনকার সময়ের চেহারা দেখলে নিজেই আঁৎকে উঠতাম। এরপরে একটানে চ্যাপ্টার ৩৮-৬২ পর্যন্ত পড়ে গেছি কাহিনী এত দ্রুতগতিতে রোলার-কোস্টারের মত এগিয়েছে যে দম ফেলার ফুরসত ছিল না। নতুন চ্যাপ্টারে যে বোমা ফাটলো তাতে তো ফ্যান থিওরি দাঁড়া করাতে করাতে ফ্যানবেসের কাহিল হওয়ার যোগাড়। আসলে একটানে মাঙ্গাটা শেষ করে ফেলাই ভুল হয়েছে। এখন আবার প্রতি সপ্তাহে সপ্তাহে অপেক্ষা করতে হবে।
প্রথম থেকেই এরকম ডার্ক আর ম্যাচিউরড কাহিনীওয়ালা সিরিজ উইকলি শৌনেন জাম্পে ছাপানো হচ্ছে তা বিশ্বাস করতে কষ্টই হচ্ছে। জাম্প এডিটর সম্ভবত এই মাঙ্গা নিয়ে অনেক আত্মবিশ্বাসী। আর মাঙ্গাকারাও ইতোমধ্যে কাহিনী অর্ধেক শেষ হয়ে গেছে বলে ঘোষণা দিয়ে দিয়েছেন। উইকলি মাঙ্গা হওয়ায় প্রতি চ্যাপ্টারে মাত্র বিশটা করে পেইজ, তাই পড়তে একদমই সময় লাগে না। এই ২০১৬ সালের আগস্টে শুরু হওয়া এই সিরিজটার মাঙ্গা অলরেডি ২.১ মিলিয়ন কপি বিক্রি হয়ে গেছে। এখন এর এনিমে আসা সময়ের ব্যাপার। হয়তোবা FMAB এর মত একসাথে পুরো গল্প অ্যাডাপ্ট করা হবে। শৌনেন জাম্পের নতুন প্রজন্ম বেশ ভালই করছে বলতে হবে।
চরিত্র: আটলান্টা/Atlanta উপাধি: আর্চার অফ রেড এনিমে: Fate/Apocrypha ভূমিকা: মধ্যমপন্থী জাতীয়তা: গ্রীক জন্ম ও মৃত্যু: জানা যায় নি মৃত্যুর ধরণ: জানা যায় নি
ছোটবেলা হয়তো আমরা অনেকেই এমন একটা গল্প পড়েছি যে, একবার এক রাজকন্যা বিয়ের সময় শর্ত জুড়ে দেন যে তাকে বিয়ে করতে চাইলে তার সাথে পাণিপ্রার্থীকে একটা দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে হবে। জিততে পারলে রাজকন্যা মিলবে, হেরে গেলে প্রতিযোগীর শিরশ্ছেদ করা হবে। অনেক জায়গা থেকে বড়বড় বীরগণ ভিড় করলেও কাটা মাথার সংখ্যা বাড়তেই থাকে ক্রমান্বয়ে কারণ রাজকন্যা অত্যন্ত দ্রুতগতির ছিলেন। অবশেষে এক প্রতিযোগী রেসের মধ্যে একটা করে সোনার আপেল নিক্ষেপ করেন রাজকন্যাকে বিভ্রান্ত করার জন্য। স্বর্ণের আপেল জিনিসটা অনেক চিত্তাকর্ষক হওয়ায় রাজকন্যা ঝুঁকে দেখতে গেলে এই সুযোগে ঐ প্রতিযোগী রেস জিতে যান এবং ঐ রাজকন্যার স্বামী হবার সুযোগ লাভ করেন। আজকে Fate/Apocrypha এর চার নম্বর এপিসোড দেখার সময় এই কাহিনীর কথা মনে পড়ে গেল। হ্যাঁ, রেড সেকশনের আর্চার আটলান্টাই ছিলেন সেই রাজকন্যা। জটিলতা এড়ানোর জন্য রূপকথার বইয়ে কঠিন কঠিন গ্রীক নাম দেওয়া হত না আরকি। প্রায় দুই বছর আগে আমি ফেইট সিরিজের কতিপয় চরিত্রের ব্যাকগ্রাউন্ড নিয়ে ধারাবাহিক কিছু লেখা লিখেছিলাম। মধ্যে হুট করে লেখার আগ্রহ চলে যায়। আজ আবার হুট করে কীবোর্ডের গায়ে কিছু আগাছা জন্মানোর ইচ্ছা হল।
আটলান্টার পিতৃপরিচয় নিয়ে বিশেষ কিছু জানা যায় না। রাজা Iasus এর ঘরে তার জন্ম এই ধারণাটাই বেশি জনপ্রিয়। আটলান্টাকে জন্মের পরপরই মারাত্মক প্রতিকূল পরিবেশের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। তার পিতা পুত্র সন্তানের আশা করেছিলেন, আটলান্টাকে দেখে তিনি আশাহত হন। কন্যাসন্তান পালনের ইচ্ছা না থাকায় তিনি আটলান্টাকে জঙ্গলে রেখে আসেন। একটি বন্য ভাল্লুক আটলান্টাকে প্রতিপালন করে। (এইসব ঘটনা গ্রীক পুরাণে নিত্যনৈমিত্তিক!) বয়ঃপ্রাপ্তির সাথে সাথে আটলান্টা শিকারিদের সাথে মেশা শুরু করেন এবং কিছুদিনের মধ্যেই নিজের দক্ষতা প্রদর্শন করে অন্য সবার থেকে শ্রেষ্ঠ হয়ে উঠেন। সভ্য সমাজের সাথে না চলা নিয়ে আটলান্টার মনে কোন দুঃখ ছিল না। আটলান্টা দেবী আর্টিমেসের অনুসারী হয়ে কুমারীব্রত গ্রহণ করেন। নিজের নারীত্ব নিয়ে তার মনে বিন্দুমাত্র দুশ্চিন্তা ছিল না এবং জীবনযাত্রায় পুরুষকে তিনি নিতান্তই অপ্রয়োজনীয় মনে করতেন। তাছাড়া তার বিয়ে নিয়ে অমঙ্গলজনক ভবিষ্যৎবাণী ছিল।
আটলান্টার বীরত্বের প্রথম নিদর্শন পাওয়া যায় ‘ক্যালিডোনিয়ার বন্য শূকর’ শিকারের সময়। ঠিকমত পূজা না করায় দেবী আর্টেমিস ক্যালিডোনিয়া রাজ্যে একটা বন্য শূকর পাঠান সেখানের মানুষকে শায়েস্তা করার জন্য। ক্যালিডোনিয়ার রাজপুত্র মেলিয়েগারের নেতৃত্বে একদল শিকারি প্রস্তুত হয় শিকারের জন্য। আটলান্টা এই শিকারি দলে যোগ দিতে চাইলে নারী হওয়ার কারণে অনেকেই এর বিরোধিতা করে। মেলিয়েগার বিবাহিত হওয়ার পরও আটলান্টার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে এবং তার চাপাচাপিতেই আটলান্টাকে দলে নিতে সবাই রাজী হয়। আটলান্টার ছোঁড়া তীরই সর্বপ্রথম শূকরটার গায়ে আঘাত হানতে সমর্থ হয়। অবশেষে মেলিয়েগার তার বর্শা দিয়ে শূকরটাকে হত্যা করেন। পরবর্তীতে মেলিয়েগার প্রথম আঘাতের কৃতিত্বস্বরূপ আটলান্টাকে শূকরের ছাল উপহার দিতে চাইলে মেলিয়েগারের মামারা এর বিরোধীতা করে। তারা আটলান্টার কাছ থেকে পুরষ্কার কেড়ে নিতে চাইলে মেলিয়েগার রেগেমেগে তার দুই মামাকে হত্যা করেন। ভাতৃদ্বয়ের মৃত্যুর কারণে রাগে অন্ধ হয়ে তাই মেলিয়েগারের মা আলথিয়া একটি জাদুর কাষ্ঠখণ্ডকে আগুনে নিক্ষেপ করে যাতে মেলিয়েগারের জীবনীশক্তি অবস্থান করছিল। ফলে মেলিয়েগার মারা যান এবং কিছুক্ষণ পরে জঙ্গল থেকে আরেকটা বন্য শূকর এসে আলথিয়াকে হত্যা করে।
¤
আটলান্টা কলচিস (Fate/stay night এর ক্যাস্টার মিডিয়ার রাজ্য) অভিযানে যেতে চাইলেও জ্যাসন (মিডিয়ার স্বামী) তাতে রাজী হন নি। কারণ হিসেবে আবারও সেই নারী হয়ে জন্ম নেওয়াটাকেই দাঁড়া করানো হয়। তবে কলচিস অভিযান নিয়ে তৈরি হওয়া একাধিক কাহিনীর একটি অনুযায়ী আটলান্টা অভিযানে ঠিকই যোগ দিয়েছিলেন। তিনি যুদ্ধে আহতও হন এবং কথিত আছে যে মিডিয়া তাকে সেবাশুশ্রূষা দিয়ে সারিয়ে তোলেন।
(ফেইট সিরিজ বড়ই বিশাল ব্যাকগ্রাউন্ডওয়ালা একটা সিরিজ। অনেককিছুর সাথেই অনেককিছুর কানেকশান পাওয়া যায়!)
¤
আটলান্টাকে নিয়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় যে কাহিনী সেটা হল রূপকথার সেই দৌড় প্রতিযোগিতার গল্প। ক্যালিডোনিয়ার শূকর শিকারের পর আটলান্টার বাবা নিজের মেয়েকে স্বীকৃতি দেন। তিনি নিজের মেয়েকে রাজ্যে ফিরিয়ে নেন এবং বিয়ের জন্য চাপ প্রয়োগ করতে থাকেন। সরাসরি বিরোধিতা করা বোকামি হবে ভেবে আটলান্টা শর্ত জুড়ে দেন যে তাকে রেসে পরাজিত করতে পারলেই বিয়ের অনুমতি মিলবে। আটলান্টা তার সময়ের সর্বাধিক গতি সম্পন্ন মানুষ ছিলেন তাই তার কুমারীত্ব অক্ষুণ্ণ থাকে। কথিত আছে যে, আটলান্টা নানাভাবে তার প্রতিযোগীদের সুযোগ করে দিতেন। যেমন: বর্ম পরিধান করে অংশগ্রহণ অথবা প্রতিযোগীকে অর্ধেক পথ এগিয়ে দেওয়ার পর দৌড় দেওয়া। এরপরও কেউই তাকে পরাজিত করতে পারছিল না। তখনই দৃশ্যপটে আসেন মেলানিওন। (হিপ্পোমেনেস নামেও পরিচিত) মেলানিওন আটলান্টাকে ভালবাসতেন। তাই তিনি ভালবাসার দেবী আফ্রোদিতির কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেন। আফ্রোদিতি প্রেমিকদের প্রতি দয়াশীল হওয়ায় মেলানিওনকে তিনটি সোনার আপেল দেন আটলান্টাকে বিভ্রান্ত করার জন্য। নির্দিষ্ট সময়ে রেস শুরু হওয়ার পর আটলান্টা কিছুক্ষণের মধ্যেই মেলানিওনকে পেরিয়ে যান। তখনই মেলানিওন প্রথম আপেলটি নিক্ষেপ করেন। সোনার সেই আপেল দেখতে এতই চিত্তাকর্ষক ছিল যে আটলান্টা সেটা তুলে নিতে গিয়ে দেখেন যে মেলানিওন তাকে পেরিয়ে গেছে। তারপরও আটলান্টা আত্মবিশ্বাসী ছিলেন রেসে জয়লাভ করার ব্যাপারে। এবং এর প্রমাণ দেন তিনি আবারও মেলানিওনকে পেরিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে। তখনই মেলানিওন দ্বিতীয় আপেলটি নিক্ষেপ করেন। আত্মবিশ্বাসী আটলান্টা আবারও সেই আপেলটি কুড়িয়ে নেন। লক্ষ্যসীমার নিকটবর্তী হওয়ার পর যখন আটলান্টা মেলানিওনকে আবার পেরিয়ে যাচ্ছিলেন তখন মেলানিওন শেষ আপেলটি নিক্ষেপ করে আটলান্টাকে বিভ্রান্ত করে দেন এবং রেসে জয়লাভ করে আটলান্টাকে জিতে নেন।
কুমারীব্রত ভেঙ্গে গেলেও আটলান্টা এবং মেলানিওনের সংসার ঠিকমতই চলছিল। আনন্দের স্রোতে ভাসতে ভাসতে মেলানিওন আফ্রোদিতির প্রতি তার দায়বদ্ধতা ভুলে যান। তাই রাগান্বিত হয়ে আফ্রোদিতি সুযোগের অপেক্ষা করতে থাকেন। একবার জিউসের মন্দিরের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার আফ্রোদিতি দম্পতির মাথায় নিষিদ্ধ কিছু করার প্ররোচনা ঢুকিয়ে দেন। ফলে মেলানিওন আটলান্টাকে নিয়ে মন্দিরে প্রবেশ করেন এবং সেখানে তারা মিলিত হন। মন্দিরের পবিত্রতা নষ্ট হওয়ায় জিউস ক্ষুদ্ধ হয়ে মেলানিওন ও আটলান্টাকে সিংহ বানিয়ে দেন। গ্রীকদের ধারণা অনুযায়ী ব্যাপারটা অত্যন্ত কাব্যিক এবং ট্র্যাজিক ছিল কারণ তারা বিশ্বাস করতো সিংহরা নিজেদের মাঝে প্রজনন করতে পারে না, তারা মনে করতো সিংহরা শুধুমাত্র চিতাদের সাথে প্রজনন করে। ফলে মেলানিওন এবং আটলান্টা চিরদিনের জন্য আলাদা হয়ে যান।
(প্রথমে আটলান্টার বিড়ালের মত কান আর লেজ দেখে অবাক হয়েছিলাম। এখন ব্যাপারটা খাপে খাপে মিলে যাচ্ছে। সিংহী অবস্থায় মৃত্যুবরণ করার কারণে হয়তো সামনিংয়ে এর প্রভাব পড়েছে। নভেল পড়ি নি তাই জানি না সামনে এই ব্যাপারে কিছু বলা হবে কিনা। তবে টাইপ-মুনের প্রশংসা করতেই হবে, মিথের অনুসরণ আর ওয়াইফু চার্মের কাজ দুটোই একসাথে হয়ে গেল।
অ্যাকিলিসের আটলান্টাকে বড় বোন ডাকার ব্যাপারটা একটু ধোয়াটে লেগেছিল। এই ব্যাপারের সাথে একটা ঘটনার সংযোগ ঘটানো যায়। একবার এক শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে অ্যাকিলিসের বাবা পেলেয়ুসের সাথে আটলান্টার একটা কুস্তি ম্যাচ হয়েছিল। ম্যাচে আটলান্টা জয়লাভ করে ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেন। হয়তো অ্যাকিলিস এই ঘটনার কথা জানতো। তবে আন্টি না ডেকে সিস ডাকার ব্যাপারটা এখনো পরিষ্কার হচ্ছে না।
আটলান্টা এক সন্তানের মা হয়েছিলেন। তবে সেই সন্তানের বাবা মেলানিওন নাকি মেলিয়েগার তা নিয়ে মতভেদ আছে। সেই সন্তান, পার্থেনোপাসকে নিয়েও অনেক বীরত্বের কাহিনী প্রচলিত আছে।
এনিমে: Sword Art Online II জনরা : অ্যাকশন, অ্যাডভেঞ্চার, সায়েন্স ফিকশন (দ্বিমত থাকতে পারে) এপিসোড : ২৪ স্টুডিও : A-1 Pictures উৎস : Sword Art Online লাইট নভেল বাই রেকি কাওয়াহারা
*
Sword Art Online একটি বহুল আলোচিত ও সমালোচিত এনিমে সিরিজ। ২০১২ সালে রিলিজ হওয়ার পরেও পাক্কা তিন বছর এর হাইপ ভালোভাবেই দৃশ্যমান ছিল। সেই হাইপের সুবাসে এক নবীন এনিমেভক্ত আমি ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এনিমেটা দেখা শুরু করি। যত যাই হোক না কেন, এনিমেটা আমার স্মৃতিতে চিরঅম্লান হয়ে থাকবে কারণ SAO হচ্ছে আমার ডাউনলোড করে দেখা প্রথম এনিমে। যাই হোক, জীবনে কোন রোমান্সধর্মী এনিমে না দেখা এই তরুণ আমি চট করেই কিরিতো আর আসুনার অসম প্রেমে মজে যাই। আর ঘটনাক্রমে ঐ মাসেই আমি এনিমখোরে জয়েন করি। অসংখ্য জ্ঞানগর্ভ পোস্টের ছড়াছড়ি দেখে আর নিজের মত প্রকাশ করতে সাহস পাই নি। আজ দীর্ঘ প্রায় দুই বছর এই এনিমের সেকেন্ড সিজন দেখে শেষ করলাম। আমি যখন SAO দেখছিলাম তখন SAO 2 মাত্র ইংরেজিতে ডাব হওয়া শুরু হয়েছে। তখন আবার ইংরেজি ডাব ছাড়া এনিমে দেখতে চাইতাম না। তাই ফুল হাইপে থাকা অবস্থায় আর এনিমেটা দেখা হয় নি। ২০১৫ এর নভেম্বরে anicoders এ 720p ডুয়াল অডিও এর খোঁজ পাই, কিন্তু নানাবিধ কারণে এনিমেটা দেখা হয়ে উঠে নি। ততদিনে SAO এর লেইমনেস নিয়েও অবগত হয়ে গেছি। কিন্তু প্রথম ভালোবাসার (বিশেষ করে আসুনার) টান উপেক্ষা করা বড়ই কঠিন কাজ। তাই শেষমেশ দেখেই ফেললাম SAO 2. গৌরচন্দ্রিকাটা হয়তো বেশি দীর্ঘায়িত করে ফেলেছি।
*
প্লট: SAO 2 এর কাহিনী মূলত তিনটি অংশে বিভক্ত। লাইট নভেলের মোট তিনটা আলাদা আলাদা আর্ক ২৪ পর্বে অ্যাডাপ্ট করা হয়েছে। আর্ক তিনটার নাম, Phantom Bullet, Calibur ও Mother’s Rosario. Phantom Bullet এর কাহিনী ছিল ১-১৪ পর্ব পর্যন্ত, ক্যালিবারের কাহিনী ১৫-১৭ এপিসোড পর্যন্ত ও মাদারস রোজারিও এর কাহিনী ১৮-২৪ এপিসোড পর্যন্ত বর্ণিত হয়েছে।
*
ফ্যান্টম বুলেট আর্ক: (স্পয়লার মিশ্রিত)
SAO ইনসিডিন্টের পর কিরিতো যখন একটু স্বাভাবিক জীবনের আভাস খুঁজে পাচ্ছিল তখনই মন্ত্রনালয়ের এক হোমরাচোমরা আমলার কাছে তাকে তলব করা হয়। গভর্নমেন্ট খুবই ইন্টারেস্টিং একটা ব্যাপারের তদন্তে কিরিতোর সাহায্য প্রার্থনা করে। কেসটা হল Gun Gale Online ( যাকে সবাই সংক্ষেপে GGO বলে অভিহিত করে) নামের একটা নতুন VRMMORPG নিয়ে যেটি U.S.A হতে পরিচালিত। GGO হল একমাত্র MMORPG যেটা খেলে সরাসরি আয় করা যায়। তাই প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যেই এটি বহুল প্রচলিত। তো GGO এর অত্যন্ত মর্যাদাকর একটি টুর্নামেন্ট Bullet of Bullets শেষ হওয়ার কিছুদিন পরেই গেইমটিতে এক রহস্যময় ও ভৌতিক খেলোয়াড়ের আবির্ভাব ঘটে। Bullet of Bullets এর চ্যাম্পিয়ন টিভিতে সাক্ষাৎকার দেবার সময় গেইমার রেস্ট হাউজে কালো আলখেল্লা পড়া সেই রহস্যময় গেইমারের আগমন ঘটে। সত্যিকারের পাওয়ারের সংজ্ঞা দিতে দিতে টিভি স্ক্রিনের দিকে সে তার অদ্ভুতদর্শন পিস্তল তাক করে। অন্যরা যখন এই ঘটনা দেখে হাসাহাসিতে ব্যস্ত, সেই অদ্ভুতদর্শন পিস্তল হতে একটি বুলেট ছুটে গিয়ে টিভি পর্দাকে আঘাত করে। সবাই তখন আরো হাসিতে ফেটে পড়তে পড়তে আতংকের সাথে খেয়াল করে যে চ্যাম্পিয়ন অদ্ভুত রকমের যন্ত্রণাকর মুখভঙ্গি করছে এবং একসময় তার অ্যাভাটারটা ডিসকানেক্টেড হয়ে যায়। আলখেল্লাধারী সেই রহস্যময়ী নিজেকে Death Gun নামে পরিচিতি দেয় এবং বলে যে সে তার একই নামের পিস্তল দিয়ে গেইমের ভেতরেই বাস্তব জীবনে মানুষ খুন করতে সক্ষম। এই ভয়ংকর ঘটনা গেইমারদের মধ্যে আরো বড় আলোড়ন সৃষ্টি করে যখন তারা জানতে পারে যে পুলিশ চ্যাম্পিয়নের মৃতদেহ তার নিজ ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার করেছে। ব্যাপারটা শীঘ্রই সরকারের নজরে আসে এবং তারা এই Death Gun রহস্যের সমাধানের জন্য কিরিতোর সাহায্য চায়। প্রথম দিকে নিমরাজি থাকলেও শেষপর্যন্ত কিরিতো এই কেসের তদন্তের দায়িত্ব নেয় এবং GGO তে প্রবেশ করে। ঘটনাক্রমে কিরিতোর সাথে দেখা হয়ে যায় ঠাণ্ডা মাথার তরুণী স্নাইপার সিননের যে কিনা এক অদ্ভুত ফোবিয়ার শিকার এবং এক নির্মম অতীত তাকে সর্বদাই তাড়া করে বেরায়। ক্রমে কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে সাপ বের হয়ে আসে এবং কিরিতো টের পায় যে ডেথ গান তার পুরোনো এক শত্রুই এবং তার মতই একজন SAO সারভাইভার। কে এই ডেথ গান? কি করে সে গেইমের মাধ্যমে বাস্তব জীবনে মানুষ খুন করে? কিরিতো কি পারবে এই নতুন ঘরানার সাইবারপাংক গেইমের সাথে নিজেকে খাপ খাওয়াতে?
*
ক্যালিবার আর্ক: খুবই ছোট অর্থাৎ মাত্র চার পর্বের আর্ক এটি। এখানে বর্ণিত হয়েছে কিরিতো ও তার টিমের লেজেন্ডারি সোর্ড এক্সক্যালিবার পাওয়ার কাহিনী। ঘটনাক্রমে একদিন কিরিতো আর লিফা ওয়ার্ল্ড ট্রির একেবারে নিচে ঝুলন্ত উলটো আকৃতির এক পিরামিডের মধ্যে লেজেন্ডারি সোর্ড এক্সক্যালিবারকে দেখতে পায়। কিন্তু ওয়ার্ল্ড ট্রির একেবারে নিচের অংশ হওয়ায় সেইখানে ফেয়ারিদের পাখা ঠিকমত কাজ করে না তাই আর কোন উপায় রইলো না এক্সক্যালিবারের কাছে পৌঁছানোর। কিন্তু এক অদ্ভুতদর্শন প্রাণীর সাহায্যে কিরিতো অ্যান্ড কোং পৌছে যায় সেই উল্টো পিরামিডের কাছে, কিন্তু সেইখানে তারা আরো অদ্ভুতুড়ে এক কোয়েস্টের খোঁজ পায় যা কিনা তাদেরকে মুখোমুখি করে দেয় ফ্রস্ট জায়ান্টদের রাজা Thymer বিপক্ষে। পথে তাদের সাহায্য করে এক অনিন্দ্যসুন্দরী নারী যার নাম ফ্রেয়া। এই লেজেন্ডারি সোর্ড এক্সক্যালিবারের সাথে মিশে আছে এক জাতির টিকে থাকার আশা ভরসা, কিরিতো অ্যান্ড কোং কি পারবে সেই আশাকে টিকিয়ে রাখতে?
*
মাদারস রোজারিও আর্ক: ব্যক্তিগতভাবে আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে এই আর্কটি। মাদারস রোজারিও আর্কের কাহিনী মূলত আবর্তিত হয়েছে Nights of the blood oath এর সাবেক ভাইস কমান্ডার, লাইটনিং ফ্ল্যাশ আসুনা ইউকিকে কেন্দ্র করে। নিজের কেবিনে রাত্রিযাপন করার সময় আসুনা তার বান্ধবীদের কাছ থেকে Zekken নামক এক অদ্ভুত খেলোয়াড়ের খোঁজ পায়। Zekken প্রতিদিন আইনকার্ডের চব্বিশতম ফ্লোরের একটি দ্বীপে প্রতিদ্বন্দ্বীদের অপেক্ষায় থাকে। মজার ব্যাপার হল এই পর্যন্ত কোন প্রতিপক্ষই ডুয়েলে জেক্কেনকে হারাতে পারে নি, এমনকি খোদ কিরিতো পর্যন্ত। তার উপর জেক্কেন আবার ঘোষণা দিয়ে রেখেছে যে তার বিরুদ্ধে বিজয়লাভকারীকে সে তার অরিজিনাল সোর্ড স্কিলটি দিয়ে পুরস্কৃত করবে। এবং এই সোর্ড স্কিলটা হল একটি অতিমানবিক ১১ হিট কম্বো মুভ যা কিনা যেকোন গেইমারের জন্য অত্যন্ত আকর্ষণীয়। তাই আসুনা এই রহস্যময়ী জেক্কেন সম্পর্কে আগ্রহী হয় এবং সিদ্ধান্ত নেয় জেক্কেনকে চ্যালেঞ্জ করার। আর বেশি কিছু বলবো না এই আর্ক নিয়ে কারণ স্পয়লার হয়ে যেতে পারে।
*
SAO 2 আমার কাছে অনেক দিক দিয়েই পূর্ববর্তী সিরিজের চেয়ে ভালো লেগেছে। বিশেষ করে আগের সিজনের Alfheim Online আর্ক থেকে তো অবশ্যই বেশি ভালো লেগেছে। ফ্যান্টম বুলেট আর্কটা যথেষ্ট পরিমাণে ম্যাচিউর ছিল বলে মনে করি, তবে এনিমে অ্যাডাপ্টশন যে লাইট নভেলের ধারেকাছেও হয় নি তা সঙ্গে সঙ্গেই বুঝতে পেরেছি। আসলে SAO এর কিউট মার্কা ক্যারেকটার ডিজাইন সিরিজের গাম্ভীর্য নষ্ট করে দিতে যথেষ্ট। তারপরেও GGO তে ডার্ক ভাবটা একেবারেই ছিল না বলা যাবে না। অতীতের সাথে সিনন আর কিরিতোর নিরন্তর সংগ্রামের এবং অপরাধবোধকে দমিয়ে রাখার ব্যাপারগুলা ভালোই উপভোগ করেছি। আর ডেথ গান চরিত্রটা যে কারোরই পছন্দসই লিস্টে জায়গা করে নেবে তা ভালোভাবেই বলা যায়।
ক্যালিবার আর্কটা খুবই ছোট হওয়ায় সেইভাবে মনে দাগ কাটতে পারে নি। যথেষ্ট পরিমাণে কমেডি এলিমেন্ট ছিল আর্কটাতে যা ফ্যান্টম বুলেট আর্কের নিরানন্দ ভাবটাকে দূরে সরিয়ে দিতেও যথেষ্ট ছিল। আমার জন্য এই আর্কের একমাত্র ভালো দিক ছিল আসুনা ইউকিকে বহুদিন পরে সক্রিয় অবস্থায় দেখা। (যদিও কিরিতোই যা করার করেছে)
মাদারস রোজারিও আর্ক আমাকে অত্যন্ত আবেগপ্রবণ করে তুলেছিল কিছু জায়গায়। মেইন লিডে আসুনাকে দেখা SAO এর গতানুগতিক কিরিতো কেন্দ্রিক পরিবেশে ভালো একটা সুবাতাসই আনতে পেরেছে। এই আর্ক নিয়ে কিছু বললেই স্পয়লার, তাই অনেক অনুভূতি ব্যক্ত করাও সম্ভব হচ্ছে না। হয়তো অনেকের কাছে এই আর্কটা ততটা আহামরি নাও লাগতে পারে। এই আর্কটাতে বাস্তব জীবনের উপর ভার্চুয়াল রিয়েলিটির প্রভাব যে কত ভাবে হতে পারে তা অত্যন্ত সুন্দরভাবে দেখানো হয়েছে। ভার্চুয়াল রিয়েলিটিও যে যুগান্তকারী পরিবর্তন ও মানবজীবন উন্নয়নের একটা চাবিকাঠি হতে পারে তা দেখানো হয়েছে এই আর্কের শেষ পর্বগুলাতে। এবং নতুন এক রহস্যের আভাসও দেওয়া হয়েছে শেষের পর্বে।
★
ইংরেজি ডাব দেখেছি তাই ভয়েস অ্যাকটিং নিয়ে বেশি কিছু বলতে চাই না। তবে ভালোমানের ছিল ইংরেজি ডাব তা বলতে পারি। ওপেনিং আর এন্ডিং সং আগের সিজনের মতই খুবই ভালো ছিল। Tomatsu Haruka এর গাওয়া দ্বিতীয় ওপেনিং ‘Courage’ সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে। Luna Haruna এর গাওয়া প্রথম এন্ডিং সং ‘Startear’ টাও খুব আবেগী একটা গান ছিল।
SAO সিরিজের সবচেয়ে ভালো যে দুটো দিক সেগুলো নিয়ে কথা বলতে চাই। এই সিরিজের গ্রাফিক্সের কাজও আগের মত ভালো ছিল। তবে গান গেইল অনলাইনের যান্ত্রিক পরিবেশটা অধিক CG ব্যবহারের মাধ্যমে আরো ভালোভাবে তুলে ধরা যেত। পরের দুইটা আর্কে অবশ্য আগের মতই রূপকথাময় পটভূমি থাকায় A-1 Pictures তাদের মুন্সিয়ানা ঠিকমতনই দেখিয়েছে। বিশেষ করে ‘Courage’ গানটার মিউজিক ভিডিওর ভিজুয়ালের কাজগুলা অনন্য হয়েছে।
ফ্যানসার্ভিস আগের মতই নিম্নমানের ছিল। তবে পরিমাণে আগের সিজনের চেয়ে অনেক কম ছিল। সিলিকা আর লিসবেথের মত দুইটা বিরক্তিকর চরিত্রকে স্ক্রিনটাইম কম দেওয়াতে বহুত প্যাঁচাল থেকে বাঁচা গিয়েছে। সামনের কাহিনীতে এইগুলারে পুরাপুরি বাদ দিয়ে দিলে আরো ভালো হত। পুরুষ চরিত্রের সংখ্যা SAO তে অত্যন্ত কম। সামনে তা আরো বাড়ানো উচিত বলে মনে করি। ক্লায়েনকে অনেকটা ফোকাস করায় অবশ্য ভালো লেগেছে। তবে খেলনামার্কা সোর্ড আর ওয়েপনের ডিজাইন ঠিকই অপরিবর্তিত রয়েছে। আসুনার পারিবারিক সমস্যা ফেস করাটা অনেক বাস্তবসম্মত মনে হয়েছে।
সাউন্ডট্র্যাক নিয়ে কিছু কথা বলতে চাই। Kajiura Yuki এর সব কাজই অসাধারণ হয়। এখানেও তার ব্যতিক্রম হয় নি। রূপকথাময় সেটিং থাকায় SAO তে যে ধরণের মিউজিক ব্যবহার করা হয়েছে তা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা মিউজিক ব্যবহৃত হয়েছে ফ্যান্টম বুলেট আর্কে। সাইবারপাংক পরিবেশে একেবারে খাপে খাপে বসে গেছে ট্র্যাকগুলো। Death Gun, Gunland, she has to overcome her fear, bullet of bullets ইত্যাদি ট্র্যাকগুলো অত্যন্ত শ্রুতিমধুর। মিউজিকে প্রচুর মেটাল ভাইব আনা হয়েছে পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়ানোর জন্য। পরের দুই আর্কে অবশ্য আগের ঘরানার মিউজিকেই ফেরত যাওয়া হয়েছে। তারপরও ভালো ট্র্যাকের অভাব হয় নি যেমন: light your sword, desolate landscape, heartbreaking reality, you are not alone ইত্যাদি। শুধুমাত্র সাউন্ডট্র্যাকের জন্যই এই এনিমে দেখা যায় বলে মনে করি।
*
সর্বোপরি এই সিরিজটাকে আমি রিকমান্ড করবো না সবার কাছে। যাদের কাছে SAO 1 ভালো লেগেছিল তারাই এটির সঠিক বিচার করতে পারবেন। আসলে কোন এনিমে একবার আবেগের জায়গাটা দখল করে ফেললে তা মন থেকে সরানোটা খুব কঠিন। গত প্রায় দুই বছরে তো SAO এর কম সমালোচনা শুনলাম না। তারপরও কিন্তু সিরিজটা ঠিকই দেখেছি এবং একই কাজ অনেকেই করেছেন। যাইহোক কিছুদিন পরে Sword Art Online: Ordinal Scale মুভি আসছে। দেখি কেমন লাগে।
কিছু কিছু এনিমে দেখার পর মনে হয় এনিমেটা না দেখাই হয়তো স্বাস্থ্যের জন্য মঙ্গলকর ছিল। বিখ্যাত পরিচালক সাতোশি কনের একমাত্র টিভি সিরিজ হওয়ায় অনেকদিন ধরেই প্যারানয়া এজেন্ট ওয়াচলিস্টে ছিল। তের পর্বের এনিমেটা দ্রুত গতিতেই শেষ করেছি কিন্তু তারপরও মনে হয়েছিল এনিমেটা আরো তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেলেই ভাল হত।
*
কাহিনীর শুরুটা কিছুটা আর্বান লেজেন্ড ঘরানার। টোকিও শহরে Lil’ Slugger (জাপানিজে Shonen Bat) নামের এক কিশোর অপরাধীর আবির্ভাব ঘটে। একাধিক নগরবাসী লিটল স্লাগারের আক্রমণের শিকার হয়। লিটল স্লাগার কে এবং কোথা থেকে কি উদ্দেশ্য নিয়ে আক্রমণ করে তা কেউ জানে না।শুধুমাত্র ভিক্টিমরা এটাই বলতে পারে যে আনুমানিক সিক্সথ গ্রেডে পড়া এক কিশোরই আক্রমণকারী। কিশোরের মাথায় একটা লম্বা ক্যাপ পড়া থাকায় চেহারা ঠিকমত দেখা যায় না। ভিক্টিমরা আরো মনে করতে পারে যে লিটল স্লাগার সোনালি রঙের রোলার স্কেটে করে পেছন থেকে সোনালি রঙেরই একটা বাঁকানো বেসবল ব্যাট দিয়ে আক্রমণ চালায়। লিটল স্লাগারের প্রথম আক্রমণের শিকার হয় সুকিকো সাগি নামের একজন ক্যারেকটার ডিজাইনার। তারপর বিভিন্ন পেশার, বিভিন্ন বয়সের মানুষ র্যান্ডমলি রাস্তাঘাটে লিটল স্লাগারের আক্রমণের শিকার হয়। লিটল স্লাগারের পরিচয় উদঘাটনের জন্য পেছনে লাগে দুই গোয়েন্দা ইকারি আর মানিওয়া।
*
প্যারানয়া এজেন্টের কাহিনী প্রথমদিকে ডিটেকটিভ উপন্যাসের মতই আগাচ্ছিল। জিজ্ঞাসাবাদ, অপরাধের স্থানে ক্লু খোঁজা ইত্যাদি আরকি। তবে আক্রমণের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত জীবনে যখন আলোকপাত করা শুরু হয় তখনই নড়েচড়ে বসতে বাধ্য হই। কিছু চরম অসুস্থ মানুষের চরম অসুস্থ চিন্তাভাবনার চিত্রায়ন হল প্যারানয়া এজেন্ট। লিটল স্লাগারের ভিক্টিমদের মধ্যে কোন আন্তঃসম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যায় না। তবে তদন্ত এগোনোর সময় আবিষ্কৃত হয় যে লিটল স্লাগারের আক্রমণের সময় ভিক্টিমরা সবাই কোন না কোনভাবে মানসিক অস্থিরতায় ভুগছিল। একেকজন ভিক্টিমের মানসিক অস্থিরতাকে কাভার করে কয়েকটা পর্ব রচিত হয়েছে। আবার লিটল স্লাগারের আবির্ভাবের গুজব আর সাধারণ মানুষের উপর তার প্রভাব নিয়ে কয়েকটা পর্ব বানানো হয়েছে। তবে লিটল স্লাগারের একেকজন ভিক্টিমের আত্মকাহিনী দেখলে ঘৃণায় গা রি রি করে উঠতে বাধ্য। ভদ্রলোকের মুখোশ পড়ে রাখা পশুর সংখ্যা সমাজে উত্তরোত্তর বেড়ে যাওয়াকে সাতোশি কন চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন। এই মুখোশ পরে রাখা লোকের মধ্যে রয়েছে স্কুলশিক্ষিকা থেকে শুরু করে পুলিশ অফিসার থেকে এলিমেন্টারি স্কুলবালক পর্যন্ত। জাপানের নাগরিক জীবনের অন্ধকার দিক যেগুলো কখনোই অন্য এনিমেতে সচরাচর দেখানো হয় না তারও চিত্রায়ন করেছেন সাতোশি কন উনার মুভিগুলোর মতই। পারফেক্ট ব্লু মুভিতে অনেক ডার্ক মুহূর্ত থাকলেই প্যারানোয়া এজেন্টে এর চেয়ে অনেক বেশি ডার্ক ডেভেলপমেন্ট আছে। তাই মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে এনিমেটা দেখা উচিত।
মুভি: The Anthem of the Heart (Kokoro ga Sakebitagatterunda) জনরা: মিউজিক, ইয়ুথ ড্রামা স্টুডিও: A-1 Pictures দৈর্ঘ্য: ১২০ মিনিট MAL রেটিং: ৮.৩
অ্যানথেম অফ দ্যা হার্ট।
একটি মুভির জন্য খুবই সুন্দর একটি টাইটেল। মূলত নামের জন্যই মুভি দেখার আগ্রহ জন্মেছিল। এনিমের পোস্টারের সুন্দর আর্ট সেই আগ্রহকে আরো তরান্বিত করে। অবশেষে বহুদিন পরে একটা নন-জিনবি আর নন-শিনকাই মুভি দেখা হল। মনের কথা দীর্ঘদিন জমিয়ে রাখার দরুন পরিস্থিতি কেমন হতে পারে তার একটা ভাল উদাহরণ মুভিটা।
*
মুভির প্লট আরো বেশি আকর্ষণীয়। কথা বলায় সদাব্যস্ত কিশোরী নারুসে জুনের শৈশবকালে এমন একটি অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে যার কারণে সে রীতিমত আশেপাশের মানুষের সাথে কথা বলাই বন্ধ করে দেয়। আশেপাশের মানুষ বলতে নিজের মা-ক্লাসমেট থেকে শুরু করে আত্মীয়-প্রতিবেশী পর্যন্ত কারোর সাথেই নারুসে কথা বলে না। ঘটনাক্রমে স্কুলের এক সাংষ্কৃতিক অনুষ্ঠানের কমিটির সাথে নারুসেকে যুক্ত করা হয়। প্রতিবাদ করার জন্য নারুসে মুখ খোলার প্রচেষ্টা চালায় কিন্তু তার মুখ থেকে দুই-তিনটার বেশি শব্দ বের হতে পারে না। মজার ব্যাপার হল এই ঘটনার পর ক্লাসের অনেক ছেলেমেয়ে নিশ্চিত হয় যে নারুসে আসলে বোবা নয়, এতদিন অনেকে তাকে বোবাই মনে করে এসেছে। তারপর কমিটির আরেক সদস্য তাকুমি সাকাগুমির সাথে পরিচয় হয় হয় নারুসের এবং তাকুমিই প্রথম জানতে পারে নারুসে একটি অভিশাপে আক্রান্ত এবং এই অভিশাপের কারণে কথা বললেই তার পেটে মারাত্মক ব্যাথা হয়। তবে তাকুমি আবিষ্কার করে ফেলে যে, গান গাইলে নারুসের উপর এই অভিশাপ কাজ করে না আর সাথে এটাও লক্ষ্য করে যে, নারুসের কণ্ঠস্বর ভারী মিষ্টি। তাই কমিটির অন্য সদস্য আর ক্লাসমেটদের সাথে অনেক আলোচনার চড়াই-উৎরাই পার হবার পর একটি মিউজিকাল থিয়েটার (কাব্যনাট্য) আয়োজন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আস্তে আস্তে অনুষ্ঠানের কাজ এগিয়ে যেতে থাকে এবং নারুসে সবার সাথে আরো বেশি সামাজিক হয়ে উঠতে থাকে। কিন্তু সেই অভিশাপ দিনে দিনে করাল থাবা বাড়াতে থাকে নারুসের হৃদয়ের উপর। কারণ নারুসের মুখ হয়তো এতদিন বন্ধ ছিল, কিন্তু তার অন্তর কখনোই চুপ করে ছিল না। এখন সঙ্গীত আর বন্ধুত্বের ছোঁয়া কি পারবে নারুসের অভিশাপ দূর করতে?
*
মুভি রিলিজ হয়েছে ২০১৫ সালে কিন্তু খোঁজ পেয়েছি অনেক দেরীতে। মুভির অ্যানিমেশন দেখেই টের পাচ্ছিলাম এটা A-1 Pictures এর তৈরি। অনেকটা আনোহানা+হিউকার স্টাইলের ছাপ ছিল মুভিটার ভিজুয়ালে। রাস্তাঘাট, গাছপালা, দিনের বিভিন্ন সময়ের আকাশের দৃশ্যগুলাতে সৌন্দর্য ছিল। নাইট সিনগুলাও মন্দ লাগে নি।
*
মুভিতে ক্যারেক্টার ডেভেলপমেন্টের উপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পুরো মুভিটাকে নারুসে জুনের মানসিক পরিবর্তনের চিত্র হিসেবে সহজেই অভিহিত করা যায়। এছাড়া কমিটির বাকী তিন সদস্যের মানসিক টানাপোড়েনের চিত্রায়নও খুব ভাল হয়েছে। আমার বেশি ভাল লেগেছে ইনজুরির কারণে বেসবল টিম থেকে ছিটকে পড়া দাইকি-কুনের চরিত্রটি। নিতো আর তাকুমির মিথস্ক্রিয়ার জায়গাগুলো প্রথম দিকে ভাল না লাগলেও পরে খারাপ লাগে নি। আর মুভির শেষের দিকের ঘটনাটা(শিপিংটা) একেবারেই অপ্রত্যাশিত ছিল। মাত্র চারটি চরিত্রকে ঘিরে কাহিনী চিত্রায়িত হলেও বিরক্তি লাগে নি কখনো।
*
মুভির মিউজিকের কথা বলতেই হবে। যেহেতু চরিত্রগুলোর প্রধান উদ্দেশ্যই ছিল একটা মিউজিকাল থিয়েটার করার তাই অনেকগুলা শ্রুতিমধুর গান পরিবেশিত হয়েছে মুভির শেষাংশে একই সাথে। মোট সাতটার মত সঙ্গীতের সাহায্যে পুরো কাব্যনাট্যটি মঞ্চায়িত করা হয়। পুরো মুভিতে মোট গান ছিল এগারটা। তবে বেশিরভাগই মৌলিক নয়, বিভিন্ন ট্র্যাডিশনাল গানের পরিমার্জিত সংস্করণ। কাহিনীর সাথে গানগুলো এত সুন্দর করে মিশে গিয়েছিল যে আলাদা করে খেয়াল করার সুযোগ পাই নি। পুরো মুভির অনেক কাহিনীই বর্ণিত হয়েছে শুধুমাত্র গানের কথার মাধ্যমে যা অত্যন্ত আকর্ষণীয় একটা দিক ছিল। পরবর্তিতে সাউন্ডট্র্যাক অ্যালবাম নামানোর পর পুরো মজাটা পাই তবে ঝামেলাও পোহাতে হয়েছে অনেকটা। অ্যালবামের সব গুলো ট্র্যাকের নাম জাপানিজ অক্ষরে দেওয়া হয়েছিল তাই বারবার গুগল ট্রান্সলেটে কপি-পেস্ট করে ইংরেজি অর্থ জেনে নিতে হয়েছে। তাই মিউজিক ইনফরমেশন এডিটের পেছনে ভাল সময় দিতে হয়েছে তবে লাভই হয়েছে। কারণ অনেকগুলা গানই গেয়েছেন আমাদের কিছু পরিচিত আর প্রিয় সেইয়ু এবং মিউজিশিয়ানরা। kiyoura natsumi এর গাওয়া Over the Rainbow গানটা অনেক শ্রুতিমধুর ছিল। তবে সবচেয়ে ভাল লেগেছিল খোদ নারুসের সেইয়ুর গাওয়া ‘Watashi no koe’ (My Voice) গানটা। এই গানের সুর আবার নেওয়া হয়েছে ইংরেজি লোকগান ‘Greensleeves’ থেকে। একই গানের সুর The last Naruto the movie এর প্রোলোগে ব্যবহৃত হয়েছিল তাই চেনা চেনা লাগছিল মিউজিকটা। গান গাইতে গাইতে ক্লোকে আবৃত নারুসের স্টেজে উঠার জায়গাটা অনেকদিন মনে থাকবে।
*
সব মিলিয়ে খুবই এনজয়েবল একটা মুভি। হয়তো মুভির শেষের জায়গাটা কিছুটা ক্লিশে ছিল তবে আবেগের জায়গাগুলো ভালভাবেই ছুঁয়ে গেছে। এবং মুভিটা ভাল রকমের শিক্ষণীয়ও বটে। নিজেকে প্রকাশ না করার অক্ষমতার অসুবিধা সম্পর্কে ভাল ভাবেই অবগত করে দেয় মুভিটা। নারুসের ভয়েস অ্যাক্টিং খুব উপভোগ করেছি। বিশেষ করে কথা বলতে না চাওয়া নারুসের আকার-ইঙ্গিত, জোরে জোরে মাথা নাড়ানো আর অস্ফুট অব্যক্ত ধ্বনিগুলোর ব্যবহার খুবই কিউট(দুঃখিত, এখানে কোন জুতসই ভারী শব্দ ব্যবহার করতে পারছি না ছিল। সেন্সেইয়ের একটা কথা খুব ভাল লেগেছিল,
“Music and miracles go hand in hand”.
আর মুভির শেষের এই স্বগোতক্তিগুলো ভাল ছিল,
“What’s inside the egg?
All kinds of feelings locked inside…
Then, unable to keep them locked in…
It explodes…
And the world that’s created then…
It is more beautiful than I ever thought”.
মুভি: Children Who Chase Lost Voices ( Hoshi o Ou Kodomo) জনরা: অ্যাডভেঞ্চার, ফ্যান্টাসি সাল: ২০১১ স্টুডিও: CoMix Wave Films দৈর্ঘ্য: ১১৫ মিনিট MAL রেটিং: ৭.৮ IMDB রেটিং: ৭.৩
মৃত্যুর পরের দুনিয়া নিয়ে আমাদের বরাবরই একটা নিষিদ্ধ আগ্রহ রয়েছে। ছোট বেলায় এই নিষিদ্ধ সত্য থেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য বাবা-মা আমাদের মানুষ মারা যাওয়ার পর তারা অথবা চাঁদে চলে যায় এধরণের গল্প শোনাতেন। বড় হওয়ার পর যখন এই ছেলেভুলানো কথার ভ্রান্ততা সম্পর্কে অবগত হই তখন আবার মৃত মানুষকে ইহধামে ফিরিয়ে আনার অনিয়ন্ত্রিত ফ্যান্টাসি মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। এই সারমর্মকেই কেন্দ্র করে রচিত হয়েছে Fullmetal Alchemist এর মত কালজয়ী এনিমে।
শিল্প-সাহিত্য-কল্পকথায় প্রিয় মানুষকে ফিরিয়ে আনার জন্য অনেকবারই মানুষের পাতালে যাওয়ার কথা বর্ণিত আছে। যেমন: সাপের দংশনে মারা যাওয়া স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনার জন্য অর্ফিয়ুসের পাতাল গমন এবং সন্তান জন্মদানের সময় পরলোকগামী হওয়া স্ত্রী ইজানামিকে ফিরিয়ে আনার জন্য দেবতা ইজানাগির পাতাল অভিযান। তো ডিরেক্টর মাকাতো শিনকাই সাহেব বরাবরই তার সিনেমাতে দুটো মানুষের দূরত্বকে আলোকপাত করেন। কিন্তু Children Who Chase Lost Voices এ তিনি সেই দূরত্বকে দুনিয়াবি সীমানা থেকে বের করে এনেছেন। অন্য সিনেমাগুলোতে তিনি মানুষের মধ্যে দূরত্বের মাধ্যম হিসেবে টেনে এনেছেন মহাকাশ, শারীরিক অসক্ষমতা, যোগাযোগব্যবস্থার অপ্রতুলতা, বয়স ও মানসিকতার পার্থক্য এবং খোদ টাইম ও স্পেসকে। কিন্তু এই মুভিতে শিনকাই সাহেব দুটো মানুষের মধ্যে দূরত্ব হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন ইহকাল ও পরকালের মধ্যের সীমাকে!
প্লট: কাহিনী আবর্তিত হয়েছে পনের বছর বয়সের বালিকা আসুনা ওয়াতাসেকে ঘিরে। অন্য অনেক এনিমে মুভির মত আসুনাও মফস্বল এলাকার মেয়ে। আসুনা পিতৃহীন, তার মাও নার্সিং পেশার কারণে মেয়েকে বেশি সময় দিতে পারেন না। স্কুল ছুটির পরের অবসর সময়গুলা আসুনা কাটায় পাহাড়ের গায়ে আবিষ্কৃত তার সিক্রেট প্লেসে। আসুনার বাবার উপহার দেওয়া একটা ক্রিস্টাল রেডিওর মাধ্যমে শুধুমাত্র ঐ হাইডআউটেই আসুনা একটি রহস্যময় সুর শুনতে পায়। একদিন স্কুল থেকে হাইডআউটে ফেরার সময় আসুনা এক ভয়ংকর জন্তুর আক্রমণের শিকার হয়। কিন্তু রহস্যময় এক কিশোর এসে ঘটনাক্রমে আসুনাকে ঐ জন্তুর হাত থেকে উদ্ধার করে। পরে ঐ কিশোর নিজেকে Shun নামে পরিচয় দেয় এবং জানায় যে সে Agartha নামক এক ভিনদেশ থেকে এসেছে। শুন আসুনাকে আশীর্বাদ করে এবং বলে যে তার ইচ্ছা যে, আসুনা যেন দীর্ঘদিন বেঁচে থাকে। শুনের অদ্ভুত আচরণে লজ্জিত আসুনা প্রতিশ্রুতি দেয় দেয় যে সে পরের দিন একই জায়গায় দেখা করবে শুনের সাথে। শুন তারার দিকে তাকিয়ে থাকে এবং পাহাড়ের ঢাল থেকে ঝাপ দেয়!
পরের দিন আসুনা তার মার কাছ থেকে জানতে পারে পাহাড়ি নদীর তীরে এক ছেলের মৃতদেহ পাওয়া গেছে। অবিশ্বাস আর দুশ্চিন্তাভরা চাহনি নিয়ে আসুনা স্কুলের দিকে রওয়ানা দেয়। ক্লাসে আসুনার নতুন শিক্ষক মিঃ মোরিসাকি পরকালের কিছু স্থানের নাম উল্লেখ করেন। সেই স্থানগুলোর নামের মধ্যে Agartha নাম দেখে আসুনা যারপরনাই অবাক হয় এবং ক্লাস ছুটির পরই মিঃ মোরিসাকির সাথে দেখা এই বিষয় নিয়ে আলাপ করার জন্য। আলাপ শেষে আসুনা পাহাড়ের হাইড আউটে গিয়ে আসুনা শুনকে আবিষ্কার করে আশ্বস্ত হয়। কিন্তু এই শুন আসুনাকে চিনতে পারে না এবং পূর্ব সম্পর্কের কথা অস্বীকার করে। তখনই সেখানে আক্রমণ করে একদল সশস্ত্র যোদ্ধা এবং তারা ধাওয়া করে আসুনা আর শুনকে। তারা পাহাড়ের তলদেশে লুকায় একপর্যায়ে আগার্থার প্রবেশপথে চলে আসে। শুন জানায় যে সে আগার্থার নাগরিক এবং আগার্থার মধ্যেই আছে Gate of death and life যার মধ্য দিয়ে মৃত মানুষকে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা যায়। কিন্তু দূর্ভাগ্যক্রমে সশস্ত্র দলের কমান্ডার আসুনাকে জিম্মি করে আগার্থার গেইট দিয়ে প্রবেশ করে। কে এই কমান্ডার? কিবা তার উদ্দেশ্য? সে কি শুধুমাত্র আগার্থার ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে নিজের সংস্থার শক্তিবৃদ্ধি করতে চায় নাকি তার অন্য কোন
লক্ষ্য আছে? আর আসুনারই বা কি হবে এই পাতাল জগতে!
এটি মাকাতো শিনকাইয়ের চতুর্থ মুভি এবং আমার দেখা তার বানানো মুভিগুলোর মধ্যে সর্বশেষ। শিনকাইয়ের বানানো ছয়টি মুভির মধ্যে এই মুভিটি যথেষ্ট স্বতন্ত্র। বরাবরের মত এই মুভির ভিজুয়ালও ঝকঝকে ছিল। তবে এই মুভির দৃশ্যগুলাতে কিছুটা জিবলি জিবলি ভাব রয়েছে। বিশেষ করে আগার্থার দৃশ্যগুলার অ্যানিমেশনে এক টুকরো জিবলিকে খুঁজে পেয়েছি। শিনকাইয়ের মুভিতে যেইরকম কিছু কমন দৃশ্যপট থাকে তা এই মুভিতেও রয়েছে। ফিনিস টেরার যে ছবিটা আপলোড করেছি সেটার সাথে কিমি নো নাওয়ার গোধূলিলগ্নের দৃশ্যের সম্পূর্ণ মিল পাওয়া যায়। এই মুভির ক্যারেকটার ডিজাইনও বরাবরের মত চকচকে তবে আসুনার ডিজাইনে জিবলির ছাপ আবারো খুঁজে পেলাম। খেয়াল করে দেখলাম When Marnie Was There(2014) এর Annar এর চেহারার সাথে আসুনার চেহারার ভাল মিল আছে। মুভির মিউজিক আগেরগুলার মতই ভাল ছিল। অন্য মুভিগুলোর মতই এই মুভির শেষেও ছিল একটি অসাধারণ থিম সং ‘Hello Goodbye & Hello’.
আর এই মুভির ঘটনাপ্রবাহ নিয়েও বলার কিছু আছে। মানে আমি কাহিনী কোনদিকে যাবে তা নিয়ে যে সিদ্ধান্তেই পৌছেছি, কাহিনী ঠিক তার উল্টোদিকে গড়িয়েছে। জায়গায় জায়গায় ধরা খেয়ে আমি শেষপর্যন্ত প্রিডিকশন করা ছেড়েই দিয়েছিলাম। কিছু জায়গায় এসে ঠাহর করতে পারছিলাম না যে এই মুভির এন্ডিং দেওয়া যাবে কী করে!
তাই এই মুভির এন্ডিং নিয়ে কিছু কথা বলা যেতে পারে। শিনকাইয়ের অনেক মুভিতে অস্পষ্ট এন্ডিং দেওয়া হয় এবং প্রধান চরিত্রগুলোর নিয়তি দর্শকদের উপরে ছেড়ে দেওয়া হয়। কিন্তু এই মুভিতে একটি সলিড এন্ডিং রয়েছে যা না হলে আমি কম খুশি হতাম না। মানে, সেন্সেইয়ের ইচ্ছা পূরণ হলেই আমি বেশি খুশি হতাম। কিন্তু কাহিনী অন্যদিকে চলে যাওয়ায় কিছুটা ক্ষুদ্ধই হয়েছি। তবে শেষে সেন্সেইয়ের উদ্দেশ্যে শিনের বলা কথাগুলো ভাল ছিল।
এই মুভিতে Shakana Vimana (রাবণের পুষ্পরথ) বা Quetzalcoatl (মেসোআমেরিকান/অ্যাজটেক দেবতা) এর মত কিছু পৌরাণিক টার্ম ব্যবহার করা হয়েছে। ব্যাপারটা ডিরেক্টর হিসেবে শিনকাইয়ের অগাথ জ্ঞানেরই পরিচয় দেয়। জিনিসগুলা একেবারেই অপরিচিত ছিল আমার কাছে তবে মুভিটা দেখার মাধ্যমে কিছু জিনিস জানারও সুযোগ হল।
Anime: BECK: MONGOLIAN CHOP SQUAD Genre: Music, Slice of life, Comedy-drama Episode: 26 Year: 2004 Studio: Madhouse
¤
কুরবানির ছুটিতে কিছুদিন বাড়িতে ছিলাম। একটা এনিমে দেখবো দেখবো করছিলাম। এক সিনিয়রের পরামর্শে বেক নামালাম ও দেখলাম। মিউজিক বোধহয় আসলেই জীবনের কথা বলে আর এজন্যই সব মিউজিক ভিত্তিক এনিমেগুলা ভালো হয়। BECK ও এর ব্যতিক্রম নয়। ছাব্বিশটা পর্ব আর হাতে সময় ছিল সাত দিন। কিন্তু ডেটলাইন শেষ হওয়ার দুই দিন আগেই এনিমেটা দেখে শেষ করি। ক্লাসিকাল মিউজিক নিয়ে কিছু এনিমে দেখা হলেও রক মিউজিক নিয়ে এটাই প্রথম অভিজ্ঞতা। শিগাতসুর পর আরেকটা এনিমে পেলাম যার মধ্যে অনেকগুলো ভালো ভালো অরিজিনাল সং আছে।
¤
কাহিনী আবর্তিত হয় তানাকা কয়ুকি নামক এক নিরীহ মিডল স্কুল বালককে ঘিরে। ক্রমাগত বুলিংয়ের শিকার হওয়া কয়ুকি যখন পৃথিবীর সব ধরণের এলিমেন্টের উপর আকর্ষন হারিয়ে ফেলছিল ঠিক তখনই ঘটনাচক্রে BECK নামক এক অদ্ভুত দর্শন কুকুরের সাথে তার দেখা হয়ে যায়। কিছু অল্প বয়স্ক বালকের কবল থেকে কুকুরটাকে রক্ষা করার পর কুকুরটির মালিক রিয়ুসকে মিনামি তাকে আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানায়। পরবর্তিতে বন্ধু মারফত কয়ুকি জানতে পারে যে, রিয়ুসকে নিজেকে বিশ্ববিখ্যাত ব্যান্ড ‘THE DYING BREED’ এর লিড গিটারিস্ট এডি লি এর বন্ধু বলে দাবি করে। রিয়ুসকে আট বছর USA এ তে কাটানোতে জাপানিজের চেয়ে ইংরেজিতেই বেশি দক্ষ। তারপর কয়ুকি আবিষ্কার করে যে, রিয়ুসকে আসলেই একজন প্রতিভাবান গিটারিস্ট এবং তাকে নেকস্ট জিমি পেইজ নামে ডাকা হয়। রিয়ুসকে ‘SERIAL MAMA’ নামক একটা ব্যান্ডের সদস্য যারা কিনা বিভিন্ন কনসার্ট হলে লাইভ পারফরম্যান্স করে থাকে।কিন্তু ব্যান্ডের আরেক সদস্য এইজির সাথে রিয়ুসকের দ্বন্দ্ব বাঁধে এবং এই দ্বন্দ্বের জের ধরে সিরিয়াল মামা ব্যান্ডটি ভেঙ্গে যায়। রিয়ুসকে ও এইজি উভয়েই একটি আল্টিমেট ব্যান্ড গড়ার চ্যালেঞ্জ নেয় এবং সেই লক্ষ্যে নতুন মেম্বার খোঁজা শুরু করে। রিয়ুসকে তায়রা কুন নামের এক প্রতিভাবান বেসিস্টকে বেস গিটারিস্ট হিসেবে পাশে পায়। নিমরাজি হওয়ার পরও চিবা কুনকে সে দলে নেয় ভোকাল হিসেবে যে কিনা কারাতেতেও পারদর্শী। আর কোগা সান নামক একজনকে ড্রামার হিসেবে ব্যান্ডে নেওয়া হয়। ব্যান্ডের নাম দেওয়া হয় রিয়ুসকের অদ্ভুতদর্শন কুকুর BECK এর নামে। এই ফাঁকে রিয়ুসকের সাথে কয়ুকির ঘনিষ্ঠতা বাড়তে থাকে ও এরই প্রভাবে সারাজীবন আইডল মার্কা গান শোনা কয়ুকি রক মিউজিকের দিকে ঝুঁকে পড়তে শুরু করে। সে BECK এর বিভিন্ন লাইভ শো তে উপস্থিত থাকা শুরু করে। এরকম এক শো তেই রিয়ুসকে তার চতুর্দশী কিশোরি বোন মাহো মিনামির সাথে কয়ুকির পরিচয় করিয়ে দেয়। সমবয়সী হওয়ায় মাহো আর কয়ুকির মধ্যে সখ্যতা গড়ে উঠে। পশ্চিমা সংষ্কৃতির স্পর্শে বেড়ে উঠা মাহোর সাহসী চলাফেরা কয়ুকির মনে ভালোবাসার অনুভূতির সঞ্চার করে। মাহো নিজেও খুব ভালো গায়কির অধিকারী কিন্তু তারপরও সে মিউজিকে ক্যারিয়ার গড়তে চায় না। একদিন রিয়ুসকের আস্তানা হতে ফেরার সময় সুইমিং পুলের পানিতে চাঁদের পূর্ণ প্রতিবিম্ব দেখে অদ্ভুত সুরেলা কণ্ঠে মাহো ‘THE DYING BREED’ এর ‘MOON ON THE WATER’ গাওয়া শুরু করে। সঙ্গে থাকা কয়ুকিও তখন আবেগবশত গানটির প্রথম চার লাইন গেয়ে উঠে। তখনই মাহো কয়ুকির প্রতিভা অনুধাবণ করতে পারে এবং কয়ুকিকে BECK এ অন্তর্ভুক্ত করার জন্য রিয়ুসকেকে অনুরোধ করে। ইতোমধ্যে কয়ুকি সাইটো সান নামক এক সাবেক সাঁতারু ও সঙ্গীতপ্রেমীর কাছে গিটারের তালিম নেওয়া শুরু করে। পরবর্তিতে অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে কয়ুকি BECK এর সদস্যপদ পায়। সাথে সঙ্গী হিসেবে পায় ট্রান্সফার হওয়া স্কুল ফ্রেন্ড সাকুরাই ওরফে সাক্কুকে যাকে কিনা কোগা সানের বদলে ড্রামার হিসেবে দলে নেওয়া হয়। শুরু হয় একদল নবীন অভিযাত্রী কাঁটাভরা পথে দুর্গম যাত্রা…
¤
বেক নিয়ে কথা বলতে গেলে এর গ্রাফিক্স নিয়ে কিছু কথা বলতেই হবে। এনিমেটা যে ম্যাডহাউজের তা একটুও আন্দাজ করতে পারি নি। এনিমেশন খুবই পুরনো ধাঁচের তবে তাতে পশ্চিমা সংষ্কৃতির ধাঁচটা ভালোভাবেই উঠে এসেছে। আর ক্যারেকটার ডিজাইন খুবই সাদামাটা। এতই সাদামাটা যে কোন চরিত্রকে অনিন্দ্যসুন্দর করে উপস্থাপন করার চেষ্টাই করা হয় নি (মানে এক দৃষ্টিতে ক্রাশ খাওয়ার মত করে কাউকে ডিজাইন করা হয় নি)। তবে গিটারগুলোর ডিজাইনে অসাধারণ কম্পিউটার গ্রাফিক্সের ব্যবহার করা হয়েছে। গিটারগুলোকে অনেকটা বাস্তবই মনে হয়েছে বটে। আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে Lucille আর White Falcon এর ডিজাইন দুটো।
¤
বেক এনিমেটার মূল আকর্ষনই হল মিউজিক যেখানে অরিজিনাল সংগুলাই মূখ্য, ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকই বরং গৌণ। অসাধারণ একগাদা অরিজিনাল সং ব্যবহৃত হয়েছে এনিমেটাতে। বেক মূলত হিপহপ ও ওল্ড ব্লুজ রক ঘরানার গান পরিবেশন করে থাকে। এর মধ্যে চিবা কুনের গাওয়া ‘BRAINSTORM’ ও ‘SPICE OF LIFE’ গান দুটো উপভোগ্য। তবে মূল আকর্ষন হল কয়ুকির গাওয়া ব্লুজ রক গানগুলো। তার গাওয়া ‘FACE’, ‘MOON ON THE WATER’, ‘SLIP OUT’ গানগুলো আন্তর্জাতিক মানের বলে মনে করি। আর সাথে আছে একেবারে ভিন্ন আঙ্গিকে গাওয়া দ্য বিটলসের ‘I’ve got a feeling’ অসাধারণ গিটারওয়ার্কও এনিমেটার অন্যতম প্লাসপয়েন্ট।আর BEAT CRUSEDARS এর গাওয়া ওপেনিং ‘HIT IN THE USA’ গানটা একেবারেও স্কিপ করতে পারবেন না। প্রথম এন্ডিং ‘MY WORLD DOWN’ গানটাও ভালো মানের।
¤
সর্বোপরি এনিমেটাকে আমি মাস্টারপিসের ক্যাটাগরিতে রাখতে চাইবো। কারণ এরকম একটা অপরিচিত সংষ্কৃতিকে কেন্দ্র করে শক্ত কাহিনীর গাঁথুনি দিয়ে এনিমেটাকে অত্যন্ত মজবুত করা হয়েছে এবং কাজটা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। সাসপেন্স, থ্রিল, হালকা মিস্ট্রি, রোমান্স, ম্যাচিউরড কনটেন্ট, ব্যাকস্টেজ পলিটিকস সবকিছুই অত্যন্ত পরিমাণমত দেখানো হয়েছে। এনিমেটা সাবে দেখলেও এত বেশি ইংরেজি সংলাপ আছে যে মাঝে মাঝে মনে হত ইংলিশ ডাব দেখছি। আর মাহো আর কয়ুকির রিলেশন দেখে একটা জিনিসই শিখেছি আর তা হল, “বামুন হয়ে চাঁদের দিকে হাত বাড়াতে নেই।” আর মাহোর প্রতি রিয়ুসকের দায়িত্বপরায়ণতা দেখে আমি পুরা তব্দা খাইছি।
এনিমেঃ One Punch man Genre: অ্যাকশন,প্যারোডি,সুপারপাওয়ার,সেইনেন এপিসোডঃ ১২+৭ OVA স্টুডিওঃ Madhouse উৎসঃ One punch man নামক ওয়েবকমিক
¤
ওয়ান পাঞ্চ ম্যান এনিমেটি গত বছরের ফল সিজনে মুক্তি পায়।সম্প্রচারের সাথে সাথেই ভক্তরা হাইপের বন্যায় ভাসতে শুরু করে।অসংখ্য OPM সম্পর্কিত মেমে ও পোস্টে গ্রুপের ওয়ালকে ছেয়ে যেতে দেখা যায়।আমিও দূর থেকে এই হাইপকে অনুসরণ করতে থাকি।অবশেষে দেখেও ফেললাম এবং স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছি,এই হসচ পরীক্ষার প্যারার মধ্যে এর চেয়ে ভালো এন্টারটেইনিং এনিমে আর কিছু হতে পারে না।
¤
কাহিনীর পটভূমি একটা ফিউটারিস্টিক পৃথিবী যাতে মানবজাতিকে নিশ্চিহ্ন করতে নানা ধরনের দানবরা ক্রমান্বয়ে আক্রমন চালিয়েই যাচ্ছে।ফলে উদ্ভব ঘটেছে হিরোজ অ্যাসোসিয়েশনের যাদের কাজ হল মানবজাতিকে হুমকির হাত থেকে রক্ষা করা।কাহিনীর নায়ক ২৫ বছরের বেকার যুবক সাইতামা যে কিনা হিরোইজমকে তার জীবনের পরমব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছে।তবে সে হিরোগিরি শুধুমাত্র নিজ খেয়ালেরই বশে।কিন্তু নিজের প্রতিদ্বন্দ্বিদের নিয়ে সাইতামা একদমই সন্তুষ্ট নয় কারণ তার মাত্র এক ঘুষিই সব ভিলেনকে হারানোর জন্য যথেষ্ট।ভাগ্যের ফেরে সাইতামার সাথে দেখা হয়ে যায় সাইবর্গ জেনোসের যে কিনা প্রতিশোধস্পৃহার আগুনে প্রজ্বলিত।সাইতামার অতিমানবিক শক্তির নমুনা পেয়ে জেনোস সাইতামার শিষ্যত্ব গ্রহণ করে।পরে জেনোসের পরামর্শেই সাইতামা হিরোজ অ্যাসোসিয়েশনে যোগদান করে।অতিব শক্তিশালী হওয়ার পরও খুব কম মানুষই সাইতামার প্রতিভা সম্পর্কে সচেতন হতে পারে।বীরত্বসূচক কর্মকান্ডের অভাবে সাইতামাকে তার সহকর্মী এবং জনগণের সম্মান পেতে প্রচুর সংগ্রাম করতে হয়।এই C ক্লাস হিরো কি পারবে সাফল্যের চূড়ায় আরোহণ করতে?সাইতামা কি পারবে সকলের মন জয় করতে?
¤
মাত্র বারো পর্বের এনিমে হলেও OPM এ অসংখ্য চরিত্রের সমাবেশ ঘটেছে।একমাত্র শিষ্য জেনোস,আইনের সাইক্লিস্ট মুমেন রাইডার,প্রবীণ হিরো সিলভার ফ্যাং, tsundere টর্নেডো,গর্বিত তলোয়ারবাজ অ্যাটমিক সামুরাই,রহস্যময়ী মেটাল নাইট,আরো রহস্যময়ী ড্রাইভ নাইট,ঘাড়ত্যাড়া আমাই মাস্ক এবং হিরোজ অ্যাসোসিয়েশনের অন্যান্য হিরোরা যথেষ্ট বিনোদনদায়ক ছিল।তাদের ভিন্নধর্মী চরিত্র ও আদর্শ আমাদেরকে যথেষ্ট হাসির খোরাক জুগিয়েছে।আর ভিলেনদের কথা তো বলাই বাহুল্য।তাদের লেকচারের তুবড়ির মুখে সাইতামার হতাশাগ্রস্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্য আপনার মুখে হাসি আনবেই।তাছাড়া অনেক ভিলেনের মধ্যেই অন্য শৌনেন এনিমের ভিলেনদের প্রতি করা ব্যঙ্গ আপনি স্পষ্ট ধরতে পারবেন।মাত্র বারো এপিসোডে এতগুলো চরিত্রকে অবশ্য ভালো করে ফুটিয়ে তোলা সম্ভব হয় নি।আশা করি স্যিকুয়েলে এ ঘাটতিটা পূরণ করা হবে।
¤
এনিমেটার সবচেয়ে আকর্ষনীয় দিকের একটি হলো ফাইট সিনগুলা।যদিও সাইতামার এক ঘুষিতেই ফাইটগুলা দ্রুতই শেষ হয়ে যায়।কিন্তু শেষের দিকের দুইটি বস ফাইট আমার হৃদয় ছুঁয়ে গেছে।শেষ ফাইটটিতে অসাধারন গ্রাফিক্স ব্যবহার করা হয়েছে।মুহুর্মুহু টুডি আর থ্রিডি গ্রাফিক্সের ছড়াছড়িতে চোখ ঝলসে যাওয়ার মত অবস্থা।এছাড়া জেনোসের ফাইটগুলো খুবই ফ্ল্যাশি এবং মেইনস্ট্রিম মনে হয়েছে আমার কাছে।এনিমেটাতে কেউই আজাইরা নীতিকথার বুলি কপচাবে না,ফ্ল্যাশব্যাকও নেই আর ফিলার তো নেই ই।ফাইটের মধ্যে সাইতামার ভাবলেশহীন হয়ে দাঁড়িয়ে থাকাটা প্রথমে অস্বাভাবিক মনে হলেও আস্তে আস্তে মানিয়ে নিতে পারবেন।
¤
এনিমেটার সাউন্ডট্র্যাক অনেক ভালো ছিল।সাইতামা আর মুমেন রাইডারের অ্যাপিয়ারেন্সের সময় বাজা হেভি মেটাল মিউজিক আমার খুবই ভালো লেগেছে।আর জ্যাম প্রজেক্টের গাওয়া opening song ‘The Hero’ আপনার রক্ত সঞ্চালন বাড়াতে বাধ্য করবে।মূলত ওপেনিং সংয়ের এই দুইটি লাইন “I don’t want applause, or people praising my name” যেন সাইতামার মাহাত্ম্যকে পুরোপরি ঘোষণা করে।এন্ডিং সংটা আশ্চর্যজনকভাবে অনেক soothing ছিল।লাস্ট ফাইটের সময় অস্থিরভাবে The hero এর ফুল ভার্সন বেজে উঠে আর আমিও পারলে লাফ দিয়ে উঠি।(লাস্ট ফাইটে গানের ফুল ভার্সন দেওয়া মেবি একটা ভালো ট্রেন্ড হয়ে উঠেছে।)
¤
আপাতদৃষ্টিতে OPM কে একটি প্যারোডি শো ব্যতিত কোন কিছু আপনার মনে নাও হতে পারে।আমিও প্রথম পাঁচ-ছয় পর্বে রিভিউ লেখার মত কোন উপাদান খুঁজে পাচ্ছিলাম না।কিন্তু Deap sea king এর সাথে লড়াইয়ের পর সাইতামার স্বেচ্ছায় কৃতিত্ব বিসর্জনের জায়গাটা আমার অন্তরাত্মায় আঘাত করে।আমিও চিন্তা করতে শুরু করি, সাইতামা কি আসলেই মানুষের প্রতিক্রিয়াকে কেয়ার করে না?সেকি এতটাই ইস্পাতকঠিন স্নায়ুর অধিকারী?কৃতিত্ব দিবি না ভালো কথা তাই বলে প্রতারক বলে অপমান করবি?এইসব জিনিস এখনও আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে।আমার কেন জানি মনে হয়,মানুষের এই প্রতিক্রিয়া সাইতামার মনে বিশাল দুঃখবোধের জন্ম দিচ্ছে।সাইতামা কিন্তু এই জেদকে সঙ্গী করেই সামনে এগিয়ে যায়।কিন্তু সাইতামা কি বাধ্য হবে মানুষের এই আবেগের সামনে হার মানতে?
¤
এখন এনিমের দ্বিতীয় সিজনের প্রতীক্ষায় আছি।সাইতামার best male character হওয়াতে এখন আর অত্যুক্তি খুঁজে পাচ্ছি না।এখনই এটাকে সর্বকালের অন্যতম সেরা বলাটা বোকামি হলেও একেবারে ফালতু সিরিজ বলাটাও হবে চরম বোকামি।তাই আবেগকে দমিয়ে রেখে এনিমে দেখুন এই প্রত্যাশা ব্যক্ত করছি।