এক্স এক্স এক্স হোলিক-জাপানের অতিপ্রাকৃতিক জগতের অন্দরমহলে
আনিমে সিরিজের পরিচালক:- ত্সুতমু মিজুশিমা ।
সিরিজের গল্প লিখেছেন:- নানাসে ওকাওয়া এবংমিচিকো ইয়োকোতে(টিম ক্লাম্পের সদস্য)।
এপিসোড সংখ্যা:- 24 টি।
জাপানে “ইয়োকাই” শব্দটির অর্থ বাংলায় আত্মা এবং বা ইংরেজিতে স্পিরিট খুব কাছাকাছি। “আয়াকাশি” হলো এমন এক ধরনের “ইয়োকাই” যারা জলে বা জলের উপরে অবস্থান করে।
হয়ত কোন সকালে পথে হাঁটতে হাঁটতে দেখছেন ,কেউ আপনার সামনে দিয়ে কোনো কারন ছাড়াই চিৎকার করতে করতে দৌড়ে পালাচ্ছে, যেন কেউ বা কারা তাকে তাড়া করেছে–( “ছেড়ে দে -আমি বলছি, ছেড়ে দে,আমি কী কোন হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালা ?” ইত্যাদি ইত্যাদি) এবং কোন কারন ছাড়াই ছুটতে ছুটতে রাস্তাতে পড়ে কাতরাতে লাগল,গড়াগড়ি খেতে লাগল ,যেন তার উপরে কোন জগদ্দল বোঝা চেপে আছে এবং সে বোঝা থেকে পরিত্রাণ পেতে চাইছে।স্বাভাবিক ভাবেই আপনি তাকে কোন পাগল -ছাগল- স্কিজোফ্রেনিক বলে পাশ কাটাবেন ।সত্যিই তো ,এমন কত পাগল আমাদের চারপাশে,হাওয়ার সঙ্গে কথা বলে ,হাওয়ায় বিনুনি কাটে আঙুল দিয়ে ।কিন্তু এই কেসটা সেরকম নয়,ইনি হচ্ছেন আমাদের কাহিনীর “বেচারা” নায়ক কিমিহিরো ওয়াতানুকি, সেইরকম বিরল মানুষের একজন যে শুধু নিয়মিত ইয়োকাই বা আয়াকাশি দেখতে পায় না ,বরং সেগুলো তার জীবনকে জ্বালিয়ে ছাড়ছে ।যেখানে যাচ্ছে ,জেলির মতো বিশাল বড় উদ্ভট আকৃতির ইয়োকাইগুলো তার পিছু ছাড়ে না ।তো সেদিনও সেই কাহিনীর রিপিট হচ্ছে, বেচারা ওয়াতানুকি দৌড়াচ্ছে, পেছনে সেই ইয়োকাইগুলো দৌড়াচ্ছে ,একসময় তার উপর চেপে বসল ইয়োকাইগুলো,বেচারা ওয়াতানুকি মাটিতে শুয়ে গড়াগড়ি খাচ্ছে ,মাটিতে হাত ঠুকছে ।মাটিতে হাত ঠুকতে ঠুকতে তার হাতটা গেয়ে পড়ল একটা বড় কাঠের প্রাচীরের গায়ে ।ব্যাস,সঙ্গে সঙ্গে জেলির মত আকৃতিহীন ইয়োকাইগুলও ভ্যানিশ !!মাঝ রাস্তা থেকে সে কীভাবে এখানে টপকে পড়ল ?
ওয়াতানুকি তো অবাক ।

হাত ঝেড়ে ওঠে সে দেখল ,একটা বড় উদ্ভট ডিজাইনের বাড়ির সামনে সে দাঁড়িয়ে ।বাড়িটার ডিজাইন না ইউরোপীয়ান ,না জাপানি কায়দায় ,আবার বাড়ির দুটো ছাদে অর্ধগোলাকৃতি
চাঁদের প্রতীক ।ওয়াতানুকি সদর্পনে একটু উঁকি দিতেই দেখল বাড়িটা তাকে চুম্বকের মত টানছে ,প্রচণ্ড টান ,সত্যিই টান।এমন সময় বাড়ির সদর দরজা খুললো এবং দুজন অদ্ভুত হেয়ারস্টাইলের ছোট মেয়ে বেড়িয়ে এল,বয়স হবে হয়ত বারোর কাছাকাছি ,একজনার বিশাল গোটানো চুল মাটি ছুঁয়েছে , আর একজনের ছোট গোলাপি কালারের চুল কাঁধ ছাড়ায়নি ।তারা ওয়াতানুকিকে ওয়েলকাম করল ,এটা একটা কোনও দোকান !!
সেই রহস্যময় মেয়েদুটো ওয়াতানুকিকে টানতে টানতে বাড়ির ভেতরে নিয়ে গেল । তারা বিশাল সৌজি দরজাটা খুললো এবং ওয়াতানুকি ওপার থেকে একরাশ ধোঁয়া ছাড়িয়ে একটা বড় কেদারার উপর ধূমপানরত ,লাল কিমোনো পড়া ইউকো সানের দেখা পেলো ।সে তার জন্যই অপেক্ষা করছিলো
এবার ইউকোর পরিচয় কীভাবে দি ? পুরোনো বঙ্গিম-কালীদাস মার্কা বাংলাতে বললে “বৃহৎবক্ষা-ক্ষীনকটি-গুরু নিতম্ব” ইত্যাদি ইত্যাদি অথবা আমার চলিত চিন্তাতে বললে ইউকো একজন কঠিন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মেয়ে ,যে আবার সময়ে সময়ে মেজাজের দিক থেকে ছোট বাচ্চাদের মত হয়ে যায় । চেন -স্মোকার পর্যায়ে ,পান করে প্রচুর,ওয়াতানুকিকে খাটিয়ে মারে কিন্তু গোটা সিরিজের একাংশে তার অন্যতম সেরা বন্ধু,পোশাক,খাবার এবং স্টাইল সচেতন ,নিজের জীবনটা ভালোভাবে উপভোগ করে,স্বাধীন । আবার এই ইউকোই তার ম্যাজিকের দোকানের কাস্টমারদের সামনে হয়ে যায় নম্র,বিনয়ী এবং নিজের রহস্যপূর্ণ দিকটা কাস্টমারের সামনে রেখে তাদের সমস্যার সমাধান যথাসম্ভবভাবে করে ।ইউকো ডাইমেনশন ভাঙার ক্ষমতা রাখে ,সেজন্য হোলিক সিরিজ ছাড়াও ৎসুবাসা সিরিজেও তার দেখা মেলে ।ইউকো কিন্তু অনেক দিন আগেই মারা গেছে ,ৎসুবাসা ইউনিভার্সের এক যাদুকর ইউকোর নিজস্ব বাস্তবতার টাইম জোনকে থামিয়ে দিয়েছে,সেজন্য সে হোলিক দুনিয়ায় বেঁচে আছে ।যদিও শেষ অবধি সে আর থাকবে না ,যাকে ম্যাজিকের ভাষাতে বলে ভ্যানিশ ।মৃত্যু ।
টিম ক্লাম্প ইউকোকে বানানোর পর মনে করেছিলো সেই হবে সিরিজের প্রধান চরিত্র ।তারপর মনে করে ,আরও একটা চরিত্র তৈরি করা যাক ,যে ইউকোর মতই আত্মা,দেবতা,অতিপ্রাকৃতিক জিনিস দেখতে পারে ।তো ,সেইমত তৈরি হলো ওয়াতানুকি ।ইউকো আর ওয়াতানুকির মধ্যে সম্পকটা অনেকটা ডোরিমনের ডোরিমন-নোবিতার সম্পকের মত ।যদিও ডোরিমন ছোটদের জন্য বানানো ।
ওয়াতানুকি ,অনেকটা সেইরকম চরিত্রের ,যে নিজের ইমোশনকে নিজের মনের মধ্যে বেঁধে রাখে না,বাইরে প্রকাশ করে দেয় ।আর তার ইমোশনকে প্রকাশ করে বিভিন্ন উদ্ভটভাবে হাত পা শরীর নাড়ানোর মাধ্যমে, জোরে কথা বলে ।যাতে ওয়াতানুকিকে হাস্যকর লাগে ।কিন্তু ওয়াতানুকির সহজাত বুদ্ধির দিকটা ঝলসে ওঠে কোন চরম বিপদের সময় ..আবার প্রচণ্ড কৌতুহলী মন,তার চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ।

হিমাওয়ারি, যার বাংলা অর্থ হবে সূর্যমুখী , ওয়াতানুকির ক্রাশ ।সে যদিও ইউকোর থেকে অনেকটা আলাদা ,এইরকম সরল,সাধাসিধে মেয়ে চরিত্র অনেক আনিমে সিরিজেই থাকে ।ওয়াতানুকি, দৌমেকি এবং ইউকোর ভালো বন্ধু হিমাওয়ারি, যখনই কোনও খাবার আনে দৌমেকি আর ওয়াতানুকির মধ্যে ভাগ করে দেয়,দৌমেকির অন্যতম প্রীয় বান্ধবী হওয়ার জন্য তারও কেয়ার নেয়, তীরন্দাজী প্রতিযোগিতায় তাকে চিয়ারস করে ,এবং এসব দেখে ওয়াতানুকির জ্বলে ।
দৌমেকি আবার ওয়াতানুকির চেয়ে অনেকটা আলাদা , একেবারে বিপরীত মেরুর । হ্যান্ডসাম ,কুল এবং কম সিরিয়াস ।যেখানে ওয়াতানুকি প্রচুর বকে,সেখানে দৌমেকি খুবই কম কথা বলে। সে বহু মেয়ের আকর্ষণের কেন্দ্র, যেটা দেখেও ওয়াতানুকির জ্বলে ।কিন্তু দৌমেকি ওয়াতানুকির খুব ভালো বন্ধু, কেয়ার নেয় অনেক ,যার প্রমান সিরিজের বহু এপিসোডে ।
আর যার কথা ছাড়া হোলিক গ্যাং এর কথা শেষ হয় না ,অবশ্যই মোকোনা ।খরগোশের মত দেখতে কালো আর সাদা রঙের এই দুটো কিউট প্রানীটা হোলিক ইউনিভার্স ছাড়াও ক্লাম্পদের বানানো আরও দুটো ইউনিভার্সে হাজির,ৎসুবাসা সিরিজ আর ম্যাজিক নাইট রেআর্থ ।দেখলে মনে হয় চোখ বন্ধ করে আছে,লম্বা লম্বা কান আর মাথার কাছে বড় একটা নীল রঙের গোলাকৃতি বস্তু -এই হচ্ছে প্রধান বৈশিষ্ট্য মোকোনার ।কালো মোকোনা ওরফে লার্গ বা রাগু হচ্ছে ইউকো-সানের অন্যতম প্রিয় বন্ধু,দাবা খেলা আর ড্রিঙ্কস পার্টনার ।
হোলিক ইউনিভার্স প্রচণ্ড রহস্যময় ,ওয়াতানুকি প্রতি এপিসোডে নতুন নতুন অতিপ্রাকৃতিক জিনিসের সঙ্গে মুখোমুখি হয়,কখনও রহস্যময় আঙটি আর তার ইয়োকাই ,কখনও এমন কিছু অতিপ্রাকৃতিক উপাদান যা স্কুলে উদ্ভট ঘটনা ঘটাচ্ছে ,কখনও মানুষের মত কথাবলা শিয়াল পরিবার,বৃষ্টি আত্মা, আত্মা আর অতিপ্রাকৃতিক প্রানীদের দীর্ঘ মিছিল অথবা এমন এক পূর্ণিমার চাঁদ, যা ওয়াতানুকিকে এই বাস্তবতার গভীরে ঢুকতে সাহায্য করবে ।
কোন পূর্ণিমার রাত্রে,যখন বিশাল বড় বহুরঙা চাঁদ একদিকে ওঠে,তাদের মধ্যে দিয়ে কোন ঝাঁটায় উড়ন্ত যাদুকর ছাতা হাতে নেমে আসে বা মৃতদের উদ্ভট মিছিল দিগন্ত পেরোয় অথবা অমাবস্যার শেষে যখন অন্ধকার দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয় ,সেই পথ দিয়ে ইয়োকাইরা জেলির মত ওয়াতানুকির পেছন নেয় অথবা বসন্তের চেরিব্লসম ঝড়া সন্ধ্যায়, কোন শিন্তো শ্রাইনের চত্বরে উদ্ভট প্রানীদের আনাগোনা শুরু হয়,এ রকমই হোলিকের প্রকৃতি, সঙ্গে অবশ্যই কমেডির মিশেল একে অন্য একটা চেহারা দেয়।
হোলিক আমাদের এটাও দেখায় যে সবার একটা নিজস্ব বাস্তবতা আছে,হয়ত কারও সেটা প্রচণ্ড একান্ত ,কোন গ্র্যান্ড ন্যারেটিভ দিয়ে সবার বাস্তবতা এবং বোধ এক কাতারে ফেলা যায় না ।
হোলিক হচ্ছে আনিমে জগতের ছোট্ট আরব্য রজনী ,সঙ্গে অবশ্যই কমেডির মিশেল ।অথবা হোলিককে কোনও কিছুর সঙ্গে তুলনাই করা উচিত নয়,হোলিক ইউনিভার্স এবং এর প্রত্যেক লৌকিক এবং অতিপ্রাকৃতিক চরিত্রগুলো অথবা গল্পের চরিত্রগুলো এবং দিকপ্রকৃতি এটতাই আলাদা আলাদা,উদ্ভট যে একে অন্য কোন কিছুর সঙ্গে তুলনা করতে ইচ্ছা করে না,এমনকী টিম ক্লাম্প এর অন্য কাজগুলোর সঙ্গে ও নয় ।
আনিমে সিরিজের অন্যতম অর্জন হচ্ছে এর এনিমেশন, পরিচালক ৎসুতমু মিজুশিমা একেবারে ক্লাম্পের মেজাজে পরিচালনা করেছেন ।
এছাড়া এর ওপেনিং আর এন্ডিং থিমও ব্যাপক ।বিশেষ করে এপিসোড 24 অবধি চলা ওপেনিং সং “19 সাই” আমার অন্যতম প্রিয় আনিমে ওপেনিং ,গান সমেত ভিডিওতে একটা যাদু বাস্তবতার আবেশ আছে ।এছাড়া এপিসোড 37 অবধি চলা “নোবডি নোওজ” ও খুব প্রিয় ।দুটোই গেয়েছে শুনা(শুগা) শি(ই)কো ।তেমনি 37 এপিসোড ধরে চলা এন্ডিং সং “রিসন” যেন সিরিজ সম্পকেই কথা বলে ।
যারা পরাবাস্তব,অ অথবা অতিপ্রাকৃতিক অথবা যাদু বাস্তবতাধর্মী এবং কমেডি ধাঁচের কাজ পছন্দ তার অবশ্যই এক্স এক্স এক্স হোলিক সিরিজ ভালো লাগবে,আশা করি ।এরপরও এর একটা ভালো সিনেমাও আছে ।
ব্যাক্তিগতভাবে এই সিরিজটা আমার প্রিয় দশটা আনিমে সিরিজের অন্যতম ।পাঁচ বছর আগে আনিম্যাক্সে দেখার পরও অনলাইনে একাধিক বার দেখেছি ।আর হ্যাঁ, ড্রয়িং আর এনিমেশনে সরু সরু হাত পা টিম ক্লাম্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ।




