আকিরা: জাপানের ইতিহাসের আয়না — Anirban Mukherjee

আকিরা নিয়ে আমার দু-পয়সা

প্রথমত ,”সিনেমা vs মাঙগা ” এটা সম্পূন ফালতু তুলনা আমার কাছে,কারন যে জিনিসটাকে বেস করে সিনেমা বানানো হয়(সাহিত্য অথবা মাঙগা) সেটা অনেকটা আর্ট ক্লাসের ছবি আঁকার জন্য সাজানো মডেলের মত,সিনেমা হচ্ছে মডেল দেখে আঁকা চিত্রটা । আর অবশ্যই, আমরা যদি একই মডেল দিয়ে ,তিশিয়ান, পিকাসো এবং কোন পোস্ট মর্ডান চিত্রকরকে বসিয়ে দি ছবিটা আঁকতে ,তবে আউটপুট তিনটিতেই আলাদা হবে ।এখানেই সিনেমা পরিচালকের কৃতিত্ব,যেমনটা মডেল দেখে আঁকা কোন চিত্রকরের ।সেজন্য কলা মাধ্যম হিসাবে ,সিনেমাকে ,সাহিত্যের চেয়ে চিত্রশিল্পের সবচেয়ে কাছের মনে হয়,আমার ।

দুটো আলাদা মাধ্যম ,এবং দুটো আলাদা মাধ্যমে পরিচালক এবং লেখক (দুজনা একই লোক) দুটো আলাদা ভাবে জিনিসটা দেখাতে চেয়েছে ।
আমার মনে হয় কাটসুও ওতোমো সিনেমাতে সেটা সবচেয়ে ভালো সফল হয়েছে ,
আসলে গোটা সিনেমাটা হচ্ছে জাপানের ইতিহাসের আয়না। জিনিসটা ব্যাখ্যা করা যাক ,

1/সিনেমার প্রথমে আকিরার ধংস হয়ে যাওয়া হচ্ছে হিরোসিমা আর নাগাসাকির রুপক(মেটাফোর)।
2/তারপর নিউ টোকিও গঠন, সেখানে একটা আপাত উন্নত কিন্তু ভেতরে ধংস হওয়া ভোগবাদী সমাজ গঠন হচ্ছে,সেটা 1945 থেকে 19985 এর জাপানের প্রচণ্ড উন্নত অর্থনীতি অগ্রগতির প্রতীক(লক্ষ রাখবেন সিনেমাতে যে 2019 সালে অলিম্পিক দেখানো হয়েছে সেটা 1964 টোকিও অলিম্পিক এর প্রতীক)।

3/আপাত গনতন্ত্রের প্রভাব থাকলেও নিউ টোকিও এবং জাপানে মিলিটারির প্রভাব খুব ছিলো,এই মিলিটারি আবার আকিরাকে সৃষ্টির জন্য দায়ী ।এই মিলিটারি হচ্ছে আমেরিকার প্রতীক,যে আবার হিরোসিমা, নাগাসাকির জন্য দায়ী কিন্তু যুদ্ধে জিতে যাওয়ার জন্য পোস্ট দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ জাপানের মিলিটারি গঠন ,সংবিধান প্রনয়ন এবং অন্য অনেক ক্ষেত্রেই ভূমিকা নেয়,যেমন নিউ টোকিওর মিলিটারি আকিরার জন্য দায়ী হয়েও পোস্ট আকিরা ঘটনার পর সেখানকার রাজনৈতিক নেতাদের নির্ভর যোগ্যতা পেয়েছিল ।
4/ তেটসুও এর বিশাল মাংসের ডেলাতে পরিনত হওয়া এবং তার জন্য হওয়া ক্ষতি এগুলো হচ্ছে 1980s এর জাপানের অর্থনৈতিক বাবলস ধংস হওয়ার প্রতীক,যে অর্থনৈতিক বাবলসটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তৈরি হয় ।এবং তেটসুও- পরবর্তী নিউ টোকিও এর সঙ্গে আমরা দর্শকরা 1990 দশক এর জাপানকে মিলিয়ে দিতে পারি,যাকে জাপানের লস্ট জেনারেশন বলে,যেটা 1980 দশকের অর্থনৈতিক অস্তিরতা থেকে উঠছে এবং কিন্তু চারিদিকে রুগন চেহারা।
মাঙগাতে অনেক ঘটনা আছে যেগুলো গল্প হিসাবে শুধুই গল্প, কোন বাস্তব ঘটনাকে দেখতে পাচ্ছি না ।সেজন্য সিনেমাটা হয়ে উঠেছে জাপানের ইতিহাসের আয়না ।

Akira

সিনেমাতে অনেক ধর্মীয় রেফারেন্স আছে , অন্য সিনেমার রেফারেন্সও ।যেমন প্রথম দিকে blade runner এর রেফারেন্স বা শেষে কুরবিকের 2001 এর সঙ্গে সঙ্গতি রাখা ।
সব ধরনেই ধর্মে এইরকম একটা মত আছে ,যে ধর্মে বিশ্বাসী প্রবল ভাবে ঈশ্বরের অনুসন্ধান চালাতে লাগল তখন দেখল সে আর ঈশ্বর আলাদা নয়,যেমন সুফিবাদ ।ফেসবুকে সুফিবাদ নিয়ে একটা পোস্টে কদিন আগে একজন লিখেছিলো যে সুফিবাদকে পাখির রুপক দিয়ে ব্যাখা করা যায়, পাখিরা সবাই তাদের বাদশা সী মোরগের কাছে যাচ্ছিল তাদের দলপতি হুদহুদের নেতৃত্বে ,যখন পৌছল তখন দেখল তারা নিজেরাই সবাই এক এক জন সী মোরগ হয়ে গেছে ।
কল্প বিজ্ঞানের জগতে একটা জনপ্রিয় অংশ হচ্ছে পোস্টহিউম্যানের কনসেপ্ট ।বাঁদর জাতীয় প্রানী থেকে মানুষের বিবর্তন ,এবং সেখান থেকে আরও আরও সুপিরিয়র কিছু ঈশ্বর প্রতীম এনট্রিটিতে বিবর্তন ।সেজন্য কুরবিকের 2001 এ ডেভিড ব্যোওম্যান ,আর একটা ঈশ্বর প্রতীম সভ্যতার সাহায্যে অসীম শক্তিশালী স্টার চাইল্ডে পরিনত হয়, যা আকিরাতে, আকিরার সাহায্যে তেটসুও এর ঈশ্বর হওয়ার মতনই ।মাঝে সিনেমার যা বিষয়বস্তু ,আকিরাকে খোঁজা,সেটা আমাদের মানতিকুত তৈয়ায়ের পাখিদের সী মোরগের খোঁজকেই মনে করায়,অথবা আমাদের রক্ত পিচ্ছিল মানবসভ্যতাকে ।

লেখাটা লিখতে একটা ভালো ভিডিও রিভিউ এর সাহায্য পেয়েছিলাম,যেটা অনেকদিন আগে দেখার হেতু হারিয়ে ফেলেছি ।নাহলে ভিডিওটার লিংক দিতাম ।

Comments