Sword Art Online II [রিভিউ] — Shifat Mohiuddin

SAO 2 a

এনিমে: Sword Art Online II
জনরা : অ্যাকশন, অ্যাডভেঞ্চার, সায়েন্স ফিকশন (দ্বিমত থাকতে পারে)
এপিসোড : ২৪
স্টুডিও : A-1 Pictures
উৎস : Sword Art Online লাইট নভেল বাই রেকি কাওয়াহারা

*

Sword Art Online একটি বহুল আলোচিত ও সমালোচিত এনিমে সিরিজ। ২০১২ সালে রিলিজ হওয়ার পরেও পাক্কা তিন বছর এর হাইপ ভালোভাবেই দৃশ্যমান ছিল। সেই হাইপের সুবাসে এক নবীন এনিমেভক্ত আমি ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এনিমেটা দেখা শুরু করি। যত যাই হোক না কেন, এনিমেটা আমার স্মৃতিতে চিরঅম্লান হয়ে থাকবে কারণ SAO হচ্ছে আমার ডাউনলোড করে দেখা প্রথম এনিমে। যাই হোক, জীবনে কোন রোমান্সধর্মী এনিমে না দেখা এই তরুণ আমি চট করেই কিরিতো আর আসুনার অসম প্রেমে মজে যাই। আর ঘটনাক্রমে ঐ মাসেই আমি এনিমখোরে জয়েন করি। অসংখ্য জ্ঞানগর্ভ পোস্টের ছড়াছড়ি দেখে আর নিজের মত প্রকাশ করতে সাহস পাই নি। আজ দীর্ঘ প্রায় দুই বছর এই এনিমের সেকেন্ড সিজন দেখে শেষ করলাম। আমি যখন SAO দেখছিলাম তখন SAO 2 মাত্র ইংরেজিতে ডাব হওয়া শুরু হয়েছে। তখন আবার ইংরেজি ডাব ছাড়া এনিমে দেখতে চাইতাম না। তাই ফুল হাইপে থাকা অবস্থায় আর এনিমেটা দেখা হয় নি। ২০১৫ এর নভেম্বরে anicoders এ 720p ডুয়াল অডিও এর খোঁজ পাই, কিন্তু নানাবিধ কারণে এনিমেটা দেখা হয়ে উঠে নি। ততদিনে SAO এর লেইমনেস নিয়েও অবগত হয়ে গেছি। কিন্তু প্রথম ভালোবাসার (বিশেষ করে আসুনার) টান উপেক্ষা করা বড়ই কঠিন কাজ। তাই শেষমেশ দেখেই ফেললাম SAO 2. গৌরচন্দ্রিকাটা হয়তো বেশি দীর্ঘায়িত করে ফেলেছি।

*

প্লট: SAO 2 এর কাহিনী মূলত তিনটি অংশে বিভক্ত। লাইট নভেলের মোট তিনটা আলাদা আলাদা আর্ক ২৪ পর্বে অ্যাডাপ্ট করা হয়েছে। আর্ক তিনটার নাম, Phantom Bullet, Calibur ও Mother’s Rosario. Phantom Bullet এর কাহিনী ছিল ১-১৪ পর্ব পর্যন্ত, ক্যালিবারের কাহিনী ১৫-১৭ এপিসোড পর্যন্ত ও মাদারস রোজারিও এর কাহিনী ১৮-২৪ এপিসোড পর্যন্ত বর্ণিত হয়েছে।

*

ফ্যান্টম বুলেট আর্ক: (স্পয়লার মিশ্রিত)
SAO ইনসিডিন্টের পর কিরিতো যখন একটু স্বাভাবিক জীবনের আভাস খুঁজে পাচ্ছিল তখনই মন্ত্রনালয়ের এক হোমরাচোমরা আমলার কাছে তাকে তলব করা হয়। গভর্নমেন্ট খুবই ইন্টারেস্টিং একটা ব্যাপারের তদন্তে কিরিতোর সাহায্য প্রার্থনা করে। কেসটা হল Gun Gale Online ( যাকে সবাই সংক্ষেপে GGO বলে অভিহিত করে) নামের একটা নতুন VRMMORPG নিয়ে যেটি U.S.A হতে পরিচালিত। GGO হল একমাত্র MMORPG যেটা খেলে সরাসরি আয় করা যায়। তাই প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যেই এটি বহুল প্রচলিত। তো GGO এর অত্যন্ত মর্যাদাকর একটি টুর্নামেন্ট Bullet of Bullets শেষ হওয়ার কিছুদিন পরেই গেইমটিতে এক রহস্যময় ও ভৌতিক খেলোয়াড়ের আবির্ভাব ঘটে। Bullet of Bullets এর চ্যাম্পিয়ন টিভিতে সাক্ষাৎকার দেবার সময় গেইমার রেস্ট হাউজে কালো আলখেল্লা পড়া সেই রহস্যময় গেইমারের আগমন ঘটে। সত্যিকারের পাওয়ারের সংজ্ঞা দিতে দিতে টিভি স্ক্রিনের দিকে সে তার অদ্ভুতদর্শন পিস্তল তাক করে। অন্যরা যখন এই ঘটনা দেখে হাসাহাসিতে ব্যস্ত, সেই অদ্ভুতদর্শন পিস্তল হতে একটি বুলেট ছুটে গিয়ে টিভি পর্দাকে আঘাত করে। সবাই তখন আরো হাসিতে ফেটে পড়তে পড়তে আতংকের সাথে খেয়াল করে যে চ্যাম্পিয়ন অদ্ভুত রকমের যন্ত্রণাকর মুখভঙ্গি করছে এবং একসময় তার অ্যাভাটারটা ডিসকানেক্টেড হয়ে যায়। আলখেল্লাধারী সেই রহস্যময়ী নিজেকে Death Gun নামে পরিচিতি দেয় এবং বলে যে সে তার একই নামের পিস্তল দিয়ে গেইমের ভেতরেই বাস্তব জীবনে মানুষ খুন করতে সক্ষম। এই ভয়ংকর ঘটনা গেইমারদের মধ্যে আরো বড় আলোড়ন সৃষ্টি করে যখন তারা জানতে পারে যে পুলিশ চ্যাম্পিয়নের মৃতদেহ তার নিজ ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার করেছে। ব্যাপারটা শীঘ্রই সরকারের নজরে আসে এবং তারা এই Death Gun রহস্যের সমাধানের জন্য কিরিতোর সাহায্য চায়। প্রথম দিকে নিমরাজি থাকলেও শেষপর্যন্ত কিরিতো এই কেসের তদন্তের দায়িত্ব নেয় এবং GGO তে প্রবেশ করে। ঘটনাক্রমে কিরিতোর সাথে দেখা হয়ে যায় ঠাণ্ডা মাথার তরুণী স্নাইপার সিননের যে কিনা এক অদ্ভুত ফোবিয়ার শিকার এবং এক নির্মম অতীত তাকে সর্বদাই তাড়া করে বেরায়। ক্রমে কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে সাপ বের হয়ে আসে এবং কিরিতো টের পায় যে ডেথ গান তার পুরোনো এক শত্রুই এবং তার মতই একজন SAO সারভাইভার। কে এই ডেথ গান? কি করে সে গেইমের মাধ্যমে বাস্তব জীবনে মানুষ খুন করে? কিরিতো কি পারবে এই নতুন ঘরানার সাইবারপাংক গেইমের সাথে নিজেকে খাপ খাওয়াতে?

SAO 2 b*

ক্যালিবার আর্ক: খুবই ছোট অর্থাৎ মাত্র চার পর্বের আর্ক এটি। এখানে বর্ণিত হয়েছে কিরিতো ও তার টিমের লেজেন্ডারি সোর্ড এক্সক্যালিবার পাওয়ার কাহিনী। ঘটনাক্রমে একদিন কিরিতো আর লিফা ওয়ার্ল্ড ট্রির একেবারে নিচে ঝুলন্ত উলটো আকৃতির এক পিরামিডের মধ্যে লেজেন্ডারি সোর্ড এক্সক্যালিবারকে দেখতে পায়। কিন্তু ওয়ার্ল্ড ট্রির একেবারে নিচের অংশ হওয়ায় সেইখানে ফেয়ারিদের পাখা ঠিকমত কাজ করে না তাই আর কোন উপায় রইলো না এক্সক্যালিবারের কাছে পৌঁছানোর। কিন্তু এক অদ্ভুতদর্শন প্রাণীর সাহায্যে কিরিতো অ্যান্ড কোং পৌছে যায় সেই উল্টো পিরামিডের কাছে, কিন্তু সেইখানে তারা আরো অদ্ভুতুড়ে এক কোয়েস্টের খোঁজ পায় যা কিনা তাদেরকে মুখোমুখি করে দেয় ফ্রস্ট জায়ান্টদের রাজা Thymer বিপক্ষে। পথে তাদের সাহায্য করে এক অনিন্দ্যসুন্দরী নারী যার নাম ফ্রেয়া। এই লেজেন্ডারি সোর্ড এক্সক্যালিবারের সাথে মিশে আছে এক জাতির টিকে থাকার আশা ভরসা, কিরিতো অ্যান্ড কোং কি পারবে সেই আশাকে টিকিয়ে রাখতে?

*

মাদারস রোজারিও আর্ক: ব্যক্তিগতভাবে আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে এই আর্কটি। মাদারস রোজারিও আর্কের কাহিনী মূলত আবর্তিত হয়েছে Nights of the blood oath এর সাবেক ভাইস কমান্ডার, লাইটনিং ফ্ল্যাশ আসুনা ইউকিকে কেন্দ্র করে। নিজের কেবিনে রাত্রিযাপন করার সময় আসুনা তার বান্ধবীদের কাছ থেকে Zekken নামক এক অদ্ভুত খেলোয়াড়ের খোঁজ পায়। Zekken প্রতিদিন আইনকার্ডের চব্বিশতম ফ্লোরের একটি দ্বীপে প্রতিদ্বন্দ্বীদের অপেক্ষায় থাকে। মজার ব্যাপার হল এই পর্যন্ত কোন প্রতিপক্ষই ডুয়েলে জেক্কেনকে হারাতে পারে নি, এমনকি খোদ কিরিতো পর্যন্ত। তার উপর জেক্কেন আবার ঘোষণা দিয়ে রেখেছে যে তার বিরুদ্ধে বিজয়লাভকারীকে সে তার অরিজিনাল সোর্ড স্কিলটি দিয়ে পুরস্কৃত করবে। এবং এই সোর্ড স্কিলটা হল একটি অতিমানবিক ১১ হিট কম্বো মুভ যা কিনা যেকোন গেইমারের জন্য অত্যন্ত আকর্ষণীয়। তাই আসুনা এই রহস্যময়ী জেক্কেন সম্পর্কে আগ্রহী হয় এবং সিদ্ধান্ত নেয় জেক্কেনকে চ্যালেঞ্জ করার। আর বেশি কিছু বলবো না এই আর্ক নিয়ে কারণ স্পয়লার হয়ে যেতে পারে।

*

SAO 2 আমার কাছে অনেক দিক দিয়েই পূর্ববর্তী সিরিজের চেয়ে ভালো লেগেছে। বিশেষ করে আগের সিজনের Alfheim Online আর্ক থেকে তো অবশ্যই বেশি ভালো লেগেছে। ফ্যান্টম বুলেট আর্কটা যথেষ্ট পরিমাণে ম্যাচিউর ছিল বলে মনে করি, তবে এনিমে অ্যাডাপ্টশন যে লাইট নভেলের ধারেকাছেও হয় নি তা সঙ্গে সঙ্গেই বুঝতে পেরেছি। আসলে SAO এর কিউট মার্কা ক্যারেকটার ডিজাইন সিরিজের গাম্ভীর্য নষ্ট করে দিতে যথেষ্ট। তারপরেও GGO তে ডার্ক ভাবটা একেবারেই ছিল না বলা যাবে না। অতীতের সাথে সিনন আর কিরিতোর নিরন্তর সংগ্রামের এবং অপরাধবোধকে দমিয়ে রাখার ব্যাপারগুলা ভালোই উপভোগ করেছি। আর ডেথ গান চরিত্রটা যে কারোরই পছন্দসই লিস্টে জায়গা করে নেবে তা ভালোভাবেই বলা যায়।

ক্যালিবার আর্কটা খুবই ছোট হওয়ায় সেইভাবে মনে দাগ কাটতে পারে নি। যথেষ্ট পরিমাণে কমেডি এলিমেন্ট ছিল আর্কটাতে যা ফ্যান্টম বুলেট আর্কের নিরানন্দ ভাবটাকে দূরে সরিয়ে দিতেও যথেষ্ট ছিল। আমার জন্য এই আর্কের একমাত্র ভালো দিক ছিল আসুনা ইউকিকে বহুদিন পরে সক্রিয় অবস্থায় দেখা। (যদিও কিরিতোই যা করার করেছে)

মাদারস রোজারিও আর্ক আমাকে অত্যন্ত আবেগপ্রবণ করে তুলেছিল কিছু জায়গায়। মেইন লিডে আসুনাকে দেখা SAO এর গতানুগতিক কিরিতো কেন্দ্রিক পরিবেশে ভালো একটা সুবাতাসই আনতে পেরেছে। এই আর্ক নিয়ে কিছু বললেই স্পয়লার, তাই অনেক অনুভূতি ব্যক্ত করাও সম্ভব হচ্ছে না। হয়তো অনেকের কাছে এই আর্কটা ততটা আহামরি নাও লাগতে পারে। এই আর্কটাতে বাস্তব জীবনের উপর ভার্চুয়াল রিয়েলিটির প্রভাব যে কত ভাবে হতে পারে তা অত্যন্ত সুন্দরভাবে দেখানো হয়েছে। ভার্চুয়াল রিয়েলিটিও যে যুগান্তকারী পরিবর্তন ও মানবজীবন উন্নয়নের একটা চাবিকাঠি হতে পারে তা দেখানো হয়েছে এই আর্কের শেষ পর্বগুলাতে। এবং নতুন এক রহস্যের আভাসও দেওয়া হয়েছে শেষের পর্বে।

SAO 2 c

ইংরেজি ডাব দেখেছি তাই ভয়েস অ্যাকটিং নিয়ে বেশি কিছু বলতে চাই না। তবে ভালোমানের ছিল ইংরেজি ডাব তা বলতে পারি। ওপেনিং আর এন্ডিং সং আগের সিজনের মতই খুবই ভালো ছিল। Tomatsu Haruka এর গাওয়া দ্বিতীয় ওপেনিং ‘Courage’ সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে। Luna Haruna এর গাওয়া প্রথম এন্ডিং সং ‘Startear’ টাও খুব আবেগী একটা গান ছিল।

SAO সিরিজের সবচেয়ে ভালো যে দুটো দিক সেগুলো নিয়ে কথা বলতে চাই। এই সিরিজের গ্রাফিক্সের কাজও আগের মত ভালো ছিল। তবে গান গেইল অনলাইনের যান্ত্রিক পরিবেশটা অধিক CG ব্যবহারের মাধ্যমে আরো ভালোভাবে তুলে ধরা যেত। পরের দুইটা আর্কে অবশ্য আগের মতই রূপকথাময় পটভূমি থাকায় A-1 Pictures তাদের মুন্সিয়ানা ঠিকমতনই দেখিয়েছে। বিশেষ করে ‘Courage’ গানটার মিউজিক ভিডিওর ভিজুয়ালের কাজগুলা অনন্য হয়েছে।

ফ্যানসার্ভিস আগের মতই নিম্নমানের ছিল। তবে পরিমাণে আগের সিজনের চেয়ে অনেক কম ছিল। সিলিকা আর লিসবেথের মত দুইটা বিরক্তিকর চরিত্রকে স্ক্রিনটাইম কম দেওয়াতে বহুত প্যাঁচাল থেকে বাঁচা গিয়েছে। সামনের কাহিনীতে এইগুলারে পুরাপুরি বাদ দিয়ে দিলে আরো ভালো হত। পুরুষ চরিত্রের সংখ্যা SAO তে অত্যন্ত কম। সামনে তা আরো বাড়ানো উচিত বলে মনে করি। ক্লায়েনকে অনেকটা ফোকাস করায় অবশ্য ভালো লেগেছে। তবে খেলনামার্কা সোর্ড আর ওয়েপনের ডিজাইন ঠিকই অপরিবর্তিত রয়েছে। আসুনার পারিবারিক সমস্যা ফেস করাটা অনেক বাস্তবসম্মত মনে হয়েছে।

সাউন্ডট্র‍্যাক নিয়ে কিছু কথা বলতে চাই। Kajiura Yuki এর সব কাজই অসাধারণ হয়। এখানেও তার ব্যতিক্রম হয় নি। রূপকথাময় সেটিং থাকায় SAO তে যে ধরণের মিউজিক ব্যবহার করা হয়েছে তা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা মিউজিক ব্যবহৃত হয়েছে ফ্যান্টম বুলেট আর্কে। সাইবারপাংক পরিবেশে একেবারে খাপে খাপে বসে গেছে ট্র‍্যাকগুলো। Death Gun, Gunland, she has to overcome her fear, bullet of bullets ইত্যাদি ট্র‍্যাকগুলো অত্যন্ত শ্রুতিমধুর। মিউজিকে প্রচুর মেটাল ভাইব আনা হয়েছে পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়ানোর জন্য। পরের দুই আর্কে অবশ্য আগের ঘরানার মিউজিকেই ফেরত যাওয়া হয়েছে। তারপরও ভালো ট্র‍্যাকের অভাব হয় নি যেমন: light your sword, desolate landscape, heartbreaking reality, you are not alone ইত্যাদি। শুধুমাত্র সাউন্ডট্র‍্যাকের জন্যই এই এনিমে দেখা যায় বলে মনে করি।

*

সর্বোপরি এই সিরিজটাকে আমি রিকমান্ড করবো না সবার কাছে। যাদের কাছে SAO 1 ভালো লেগেছিল তারাই এটির সঠিক বিচার করতে পারবেন। আসলে কোন এনিমে একবার আবেগের জায়গাটা দখল করে ফেললে তা মন থেকে সরানোটা খুব কঠিন। গত প্রায় দুই বছরে তো SAO এর কম সমালোচনা শুনলাম না। তারপরও কিন্তু সিরিজটা ঠিকই দেখেছি এবং একই কাজ অনেকেই করেছেন। যাইহোক কিছুদিন পরে Sword Art Online: Ordinal Scale মুভি আসছে। দেখি কেমন লাগে।

SAO 2 d

Yuri!!! on Ice [রিভিউ] — Safin Zaman

Yuri on Ice
গত বছর (২০১৬) সবচেয়ে সমালোচিত/আলোচিত এনিম ইউরি অন আইস নিয়ে এনিমে সমাজ দুইভাগে বিভক্ত। একদল এইটাকে অলিখিতভাবে মাস্টারপিস ঘোষণা দিয়ে ভিক্টর কত হট, ভিক্টিউরি কত কাওয়াই হ্যান ত্যান নিয়ে ফ্যানিগার্লিং করতে ব্যস্ত আর আরেকদল তো এনিমে না দেখেই গে বলে এই এনিম গার্বেজের খাতায় ফেলে দেয়। দুর্ভাগ্যজনত এইই দুই দলের চুলাচুলির মাঝে খুব কমই মানুষ ছিল এনিমেটা নিয়ে নিউট্রাল কিছু বলার। ভাগ্য ভাল এমন কিছু পোস্ট চোখে পড়ছিল, নাইলে দেখাই হত না এই জিনিস।

ইউরি অন আইসের কাহিনী অতি সাধারণ। জাপানিজ স্কেটার ইউরি কাৎসুকি কিভাবে তার কোচ ভিক্টর নিকিফরভ এর সহায়তায় একজন Nobody থেকে আইস স্কেটিং জগৎের অন্যতম পরিচিত মুখ হয়ে উঠে তার গল্পই ইউরি অন আইস। ইউরির চলার পথে তার সামনে আসে অসংখ্য বন্ধু, প্রতিদ্বন্দ্বী যাদের অর্ধেকের বেশির একমাত্র কাজ হলো স্কেট করা, স্কেট করে কতগুলা ডায়লগ মারা আর দর্শকদের মন থেকে ভ্যানিশ হয়ে যাওয়া। ক্যারেক্টারগুলা এম্নিতেই কম প্রভাব ফেলে তার উপর এই এনিমে তার স্পটলাইটের অধিকাংশই ইউরি কাৎসুকির ফেলে রাখে যার কারণে ক্যারেক্টারগুলা আরো মলিন হয়ে যায়। একমাত্র জেজে ছাড়া আর কোন সাইড ক্যারেক্টার নাই যার মনস্তাত্ত্বিক দিকটা এনিমে তুলে ধরসে, তার উপর সেইটাও ছিল ফোর্সড। ক্রিয়েটররা মনে হয় ফুজোশিরা যাতে টাম্বলার ভরায় ফ্যানার্ট আঁকতে পারে সেই চিন্তা করে সব গুড লুকিং, হ্যান্ডসাম ক্যারেক্টার বানাইসে। একটা ক্যারেক্টারের জন্য নুন্যতম যে ডেপথ লাগে তা চিন্তাও করে নাই।

সাইড ক্যারেক্টার বাদ দেই, মেইন ভিক্টর আর ইউরির কথায় আসি। এরা গে, আর এই বিষয় এনিমেতে খুব পরিষ্কার করেই বুঝাইসে আর এই বিষয় নিয়ে আমার কোন নাঁক সিটকানো ব্যাপার নাই। এনিমের মেইন ক্যারেক্টার সাইকোপ্যাথ হয়,ম্যাস মার্ডারার হয় সেই তুলনায় গে তো অনেক নিরীহ প্রজাতি(!) সিরিজের শুরুর দিকে এই ‘ড্যাম্প গে’ নেস দেখানোর জন্য কিছুটা ম্যানসার্ভিস ছিল যা খানিকটা অস্বস্তিকর হলেও পরে এনিমে ফোকাস ম্যানসার্ভিস থেকে স্কেটিং এর দিকে সরায় নিসে যার জন্য ডাইরেক্টরকে ধন্যবাদ। ইউরি, রাশিয়ান ইউরি আর ভিক্টর এদের ক্যারেক্টার নিয়ে আমার কোন সমস্যা নাই। বেশ ভালভাবেই তুলে ধরা হইসে এদেরকে আর ইউরিদের ক্যারেক্টার ডেভেলপমেন্ট স্মুথ ছিল। প্লাসপয়েন্ট।

আইস স্কেটিং এনিমে হিসেবে এই এনিমেতে আইস স্কেটিং যতটা প্রাধান্য পাওয়ার কথা ততটা পাইসে বলে মনে হয় নাই। তারপরেও যতটুকু ছিল ভালই ছিল। বিশেষভাবে এর OST গুলা। স্কেটিং যতটা না মনোযোগ নিয়ে দেখসি তার চেয়ে বেশি মনোযোগ নিয়ে শুনসি ব্যাকগ্রাউন্ড এ বাজতে থাকা মিউজিক। YOI এর সবচেয়ে স্ট্রং পয়েন্ট যদি কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করে তবে আমি বলবো এর OST। এর প্রত্যেকটা OST আমি ঘন্টার পর ঘন্টা শুনে কাটায় দিতে পারব কোনরকম ক্লান্তি ছাড়াই। এতটাই অসাধারণ।

সব মিলায় ইউরি অন আইস আমার কাছে মোটামুটি এঞ্জয়েবল একটা এনিমে ছিল। মাস্টারপিসের ধারে কাছেও না, আবার সম্পুর্ণ গার্বেজও না। বিরক্তিকর ফ্যান প্রত্যেকটা এনিমেরই থাকে আর তাদের থেকে যত দূরত্ব বজায় রাখা যায় ততই ভাল। জাস্ট বিকজ একটা ‘গে’ এনিমে একগাদা এওয়ার্ড জিতসে দেখে তা বাতিলের খাতায় ফেলে দিবেন তা নিতান্তই হাস্যকর।, মানুষের কথায় কান না দিয়ে নিজে শো দেখে নিজে জাজ করুন। সবার টেস্ট একরকম না। যে এনিমে একজনের কাছে গার্বেজ সেই এনিম আপনার টপ টেন লিস্টেও জায়গা করে নিতে পারে।

ওভারল,যদি দেখার মত কোন এনিমে খুজে না পান। অথবা এঞ্জয় করার মত কিছু দেখতে চান এবং প্লেলিস্টে কিছু অসাধারণ OST যোগ করতে তবে ইউরি অন আইস অবশ্যই রেকমেন্ডেড।

Baccano! [রিভিউ] — নাফিস মুহাইমিন

ফ্লাইং পুসিফুটের শেষ যাত্রাটা এমন হবে ভাবতে পারেনি কেউই। ১৯৩২ এর শুরুতে ট্রেনটার করুণ প্রত্যাবর্তন। বাকরুদ্ধ না হয়ে উপায় থাকে না।

উপায় তেমনি থাকে না মাঝসমুদ্রে। এক জাহাজে। সময়টা অষ্টাদশ শতাব্দী। একের পর এক অ্যালকেমিস্ট উধাও হয়ে যাচ্ছে। অমরত্বের দাম তবে কি এতটাই চড়া?

মাফিয়া এবং সাইকো। স্ট্রিট থাগ এবং কাপল। অ্যালকোহল কিংবা নিছক পাগলামো।

টারময়েল বটে গল্পটা…….. ইটালিয়ান ডিকশনারিতো তাই বলে।

Baccano

গল্পের মূল পটভূমি গ্রেট ডিপ্রেশন চলাকালীন ইউনাইটেড স্টেটস। সোর্স রিয়ো’গো নারিটার লেখা নভেল। টুকরো টুকরো ঘটনা-অনুঘটনা জোড়া দিয়ে কাহিনীর প্রগ্রেশন। ‘পাল্প ফিকশন’-এর কথা মনে পড়ে যায়। অফ-ট্র্যাক ন্যারেটিভ স্টাইলের মুভি দিয়ে অমর হয়ে গেছেন কোয়েন্টিন টারান্টিনো। একুশ ভল্যুমের নারিটার নভেলগুলোও একই ধাঁচে লেখা। পুরো গল্প না পড়া পর্যন্ত সঙ্গতি মিলবে না। ২০০২ এ প্রথম ভল্যুম ‘দ্যা রোলিং বুটলেগস্’ পুরস্কারপ্রাপ্ত হয়। বেশ পরে বের হয় দু’ ভল্যুমের ম্যাঙ্গা। নারিটার আরেকটা নভেল ‘দুরারারা!’ও অ্যানিমে অ্যাডাপ্টেশন পায়। ভালো বই পাঠককে তৈরি করে। শ্রোতা তৈরি করে ভালো মিউজিক। আর ‘বাকানো!’ দেখতে হলে দর্শককে তৈরি হয়ে আসতে হয়।

অধিক সন্ন্যাসীতে গাঁজন সবসময় নষ্ট হয় না। এত বিরাট কাস্টিং নিয়ে রেকর্ড করে ফেলেছে অ্যানিমেটা। ক্যারেক্টারগুলোর ডিপিকশন বেশ ভাবায়। মর মানুষ নিজেদের যেভাবে দেখতে চায় তাই চিত্রিত করেছেন কাহিনীকার। ফ্রয়েডীয় কোনো ব্যাখ্যা থাকতে পারে। আত্মবিশ্বাস আর স্বকীয়তা চরিত্রগুলোর উপজীব্য। তবু তাদের সম্পাত বিন্দু একটাই ― ব্যাডাসারি।

ডার্ক স্টোরির জন্য অ্যানিমেশন যেমনটা হওয়া দরকার, আলো ছায়ার খেলা। গোর সিনগুলোতে ইম্প্রেসিভ কিছু ছিল। ইম্প্রেসিভ ছিল আরো অনেক কিছুই। পাপেট মাস্টাররা চেয়েছিলেন দর্শকরা যেন স্টোরিটাকেই মূল্যায়ন করে, সেভাবেই সবকিছু হ্যান্ডল করা। ব্রেইন’স বেস কমপ্লেইন করার কোনো সুযোগ রাখেনি। সুযোগ রাখেনি সেইয়ুরাও। নতুন পুরোনো শিল্পীদের আন্তরিকতা টের পাওয়া যায়। কখনো প্রিফার করি না যদিও, বাকানো! -এর ইংলিশ ডাবিং যথেষ্ট স্ট্রং। ক্যারেক্টারগুলোর পরিপূর্ণতা আর কোনো কিছুতে হতে পারত না।

আর্লি থার্টিজ’ ভাইবটা ভালোই ফুটে উঠে বাকানো! -এর সাউন্ডট্র্যাকে। অডিওফাইল হওয়া সত্ত্বেও জ্যাজ নিয়ে কখনো আলাদা করে সময় দিইনি। অন্তত সিরিজটা দেখার আগেতো নয়ই। ভালো লেগেছে পিয়ানো সোলোগুলো। ‘কিয়োকু নো তেগামি’ ট্র্যাকটা একধরণের শূন্যতা তৈরি করে। লিখে বোঝানো সম্ভব হবে না কখনোই। আবার ‘ইন দ্যা স্পিক ইজি’ খুব সুন্দর হ্যাপি সোলো। আরো ভালো লেগেছে ‘অ্যালভিয়্যার নো ব্রুস’, ‘উতাকাতা নো ইনোরি’, ‘রিঙগো নো এ নো উয়ে নো রাকুগাকি’। স্যাটায়ার ধাঁচের বেশ কিছু ইনস্ট্রুমেন্টাল আছে। ব্যাকগ্রাউন্ডে চমৎকার শোনায়।

ওপেনিং নিয়ে আলাদা কিছু না বললে রিভিউটাই মিথ্যা হয়ে যাবে। ‘গানস্ অ্যান্ড রোজেস’ অবকাশটা তৈরি করে নেয় এভাবেই। প্যারাডাইজ লাঞ্চের করা ট্র্যাকটা সেরা কিছু ওপেনিং থিমের একটা অ্যানিমের ইতিহাসে। কম্পোজিশনে এতটা পারফেকশন আনা যায় না আর কোনোভাবে। ইউটিউব লিঙ্ক : https://youtu.be/OOZ1hsb8smQ
এন্ডিং থিম কিছুটা স্লো পেসড, মাইল্ড। ওদা কাওরির ‘কলিং’ তেমন আপিল তৈরি করতে না পারলেও একেবারে খারাপ না। অ্যানিমের সাথে এটা খাপ খাইয়ে নিয়েছে সফলভাবে।

বাকানো! -কে আর দশটা অ্যানিমে দিয়ে মাপতে গেলে হয় না। গল্পটা একজন শিল্পীর পরিণত মানসিকতার ফসল। অল্প কিছু শব্দে যার পর্যায় বলে ফেলা যায় না। বলে ফেলা যায় না ক্যারেক্টারগুলোর অসাধারণত্ব। বলে ফেলা যায় না অ্যানিমেটার স্ট্রেন্থ। বলে ফেলা যায় না এটার জন্য ভালো-লাগাগুলো।

খুব অপেক্ষা করে আছি সেভেন্টিন্থ এপিসোডের জন্য। অপেক্ষা ফুরোচ্ছে না।

Hell Girl [রিভিউ] — Rahima Jahan Mitu

Jigoku Shoujo

THE ENTIRE ANIME IS A SPOILER. It doesn’t matter if anyone gives you a spoiler or not.

অমুকের উপর তমুক একটা অন্যায় করবে, অমুক অনেক সমস্যায় ভুগতে থাকবে। তারপর অমুকের পাশ দিয়ে দুইটা স্কুলপড়ুয়া মেয়ে হেঁটে যেতে যেতে Hell Link নিয়ে ফুসুর-ফাসুর করবে। অমুক রাত বারোটায় হেল লিংকে ঢুকে তমুকের নাম দিয়ে মেসেজ করবে। রাত বারোটা পেরিয়ে গেলে হেল লিংক কই গেল বলে কিবোর্ড নিয়ে গুতাগুতি করবে। এমন অবস্থাতেই চরকা কাটা দাদির কথামত Enma Ai অমুকের সামনে হুট করে হাজির হবে। অমুক চমকে গিয়ে জিজ্ঞেস করবে,

“আরে তুমিই হেল গার্ল?”
এনমা বলবে, “হ্যা। আমাকে ডেকেছিলে মনে নাই?”

তারপর সে একটা লাল ফিতে বাঁধা পুতুল দিয়ে বলবে কিভাবে পুতুলের ফিতে খুললেই সব মুশকিলে আসান। যেই মূহুর্তে অমুক আশান্বিত হয়ে মুখ খুলে কিছু একটা বলতে যাবে তখনই তাকে থামিয়ে দিয়ে এনমা বলবে, “কিন্তু, দাম দিতে হবে”।

-“কি দাম?”
-“মোরগরা ডেকেডুকে শ্রান্ত হয়ে ঘরে ফিরে আসে। তোমাকেও নরকে যেতে হবে।”
-“হায় হায়। এখন কি হবে?”
-“চিন্তা করো না। এখনই নরকে যেতে হবে না, মরার পরে।”

এই ফাঁকে অমুককে নরকের একটা প্রিভিউ দেখানো হবে। অমুক খুব চিন্তায় পড়ে যাবে, এনমা আবার উধাও হয়ে যাবে।

এদিকে তমুক আরো বেশি নিপীড়ন শুরু করবে। কোণঠাসা হয়ে পড়লে অমুক পুতুলের লাল ফিতে খুলে ফেলবে। সাথে সাথে ব্জ্রপাতের গুড়্গুড় গলায় একজন আকাশ থেকে ফিতে খুলার ভেরিফিকেশন জানাবে। দাদি ডাক দিলে পরে এনমা তার গোসল মাঝপথে থামিয়ে একটা কিমোনো গায়ে চাপিয়ে গাড়িতে চড়বে। ক্যামেরা প্রথমে আকাশে উড়ন্ত গাড়ির একটা চাকা দেখাবে, পরে আরেকপাশের আরেকটা চাকা দেখাবে। দুইটা চাকা দেখে আমরা বুঝতে পারি যে দুইটা চাকা আসলে একটা মাথারই দুই কপি।

অতঃপর এনমার বয়স্ক সাঙ্গোপাঙ্গরা তমুককে নানাভাবে ভয় দেখিয়ে তার স্বীকারোক্তি নেয়ার চেষ্টা করবে। তমুক জোর গলায় বলতে থাকবে সে কোনো ভুল করেনি। তখন তারা এনমাকে বলবে, “এই হল অবস্থা।” এনমা তখন দুই লাইনের একটা ডায়ালগের পর তমুককে বলবে, “একবার মরে দেখ না।”

এনমার কিমোনোর হাতা থেকে সুন্দর সুন্দর ফুল বের হবে। তারপরের দৃশ্যেই আমরা দেখতে পাব তমুককে সে নৌকা বেয়ে নরকের দ্বারে নিয়ে যাচ্ছে, তমুক ভয় পেয়ে চিল্লাচিল্লি করছে।

অমুকের সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। আর তমুক হঠাত করে কিভাবে উধাও হল এ নিয়ে মানুষ একটু বলাবলি করবে। অমুক তার বুকের উপর নরকের সীলমোহর দেখে একটু মন খারাপ করবে, তারপর “জীবনে কি আছে” টাইপের একটা হাসি দিয়ে দৃশ্যের সমাপ্তি ঘটাবে। অমুকের নামে একটা মোমবাতি জ্বালিয়ে পর্ব শেষ হবে।

ধৈর্য ধরে যদি এটুকু পড়ে থাকেন তবে আপনার Hell Girl দেখা হয়ে গেছে। ২০ মিনিট, কিংবা 20 x N মিনিট ব্যয় করার চেয়ে এই ৫ মিনিটেই যদি আপনি একটা এনিমে দেখে শেষ করতে পারেন তবে সেটা অবশ্যই অধিকতর সাশ্রয়ী।

চতুর্থ সিজন আসবে শুনে হেল গার্ল দেখতে বসেছিলাম। চারটা পর্ব দেখার পর বুঝলাম না এই জিনিস আবার তিনটা সিজনের পর আরেকটা সিজন দেখার ধৈর্য হবে কিভাবে মানুষের। ভিলেনগুলো একদম স্টিরিওটাইপ ভিলেন, তাদেরকে কোণঠাসা করার সময় ওএসটি শুনে মনে হয়েছে প্রতিশোধকে গ্লোরিফাই করা হচ্ছে। এটা বাদ দিলে এই এনিমের ওএসটি আমার ভাল লেগেছে, বিশেষত এন্ডিং সংটা অনেক ভাল। স্ক্রীনশটটা এন্ডিং সং থেকে নেয়া। ভিজ্যুয়াল মন্দ না। এনমার বাড়ির আর্টটা পছন্দ হয়েছে।

এছাড়া Hell Girl নিয়ে বলার মত কিছুই নেই, absolutely NOTHING.

সাকুরা কি আসলেই ইউজলেস? নাকি সব আমাদের পার্স্পেক্টিভের ব্যাপার? — তাহসিন ফারুক অনিন্দ্য

নারুতো ভক্তদের অন্যতম বড় এক দাবী, সাকুরা চরিত্রটি অসম্ভব রকমের ইউজলেস, সোজা ভাষায় একদমই অকার্যকর। এক সাকুরা না থাকলেই নারুতো আর সাসকের জার্নি অনেক সহজ হয়ে যেত, গল্প অনেক গতি পেত, তাদের জীবন অনেক সহজ হত ইত্যাদি কত কথা! আসলে ব্যাপারটা কি সেটাই? নাকি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে কোন এক জায়গায় এমন গোলযোগ বেঁধে গিয়েছে যার কারণে এরপর থেকে সাকুরা যা কিছুই করুক না কেন, চরিত্রটা আমাদের চোখে একদম অকার্যকর? আজকে এই বিষয়টা নিয়েই আলোচনা করতে চাই।

প্রথমেই আমরা আগে দেখি একদম অল্প বয়সে সিরিজের শুরুর দিকে যখন আমাদের গল্পের নায়ক-নায়িকাদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়, তখন একেকজনের ব্যাকগ্রাউন্ড কীরকম। নাইন টেইল ফক্সের ঘটনার কারণে বিখ্যাত/কুখ্যাত হওয়া ছাড়াও নারুতোর বাবা ছিল চতুর্থ হোকাগে, মা তার সময়ের অন্যতম শক্তিশালী কুনোইচি, এবং নাইন টেইল ফক্সের জিঞ্চুরিকি। বিখ্যাত উচিহা পরিবারের অন্যতম সদস্য সাসকে। টিম ১০-এর ইনো, শিকামারু ও চৌজি তিন জনেই কোনোহার তিন বিখ্যাত পরিবারের সদস্য, যাদের অনন্য ক্ষমতা ও এদের প্রয়োগ এই তিন পরিবারকেই বানিয়েছে তাদের গ্রামের ভয়ংকর সব নিঞ্জা। টিম ৮-এর হিনাতা বিখ্যাত হিউগা পরিবারের সদস্য, তার বিয়াকুগান রয়েছে যাকে গল্পের শুরুর দিকের সবচাইতে শক্তিশালী চোখ সম্পর্কিত ক্ষমতা বলে ধরে নেওয়া হয়। শিনো হল পোকামাকড়ের উপর ক্ষমতাধরী অন্যতম ভীতিকর বংশ আবুরামে-এর সদস্য, আর কিবা হল ইনাজুকা পরিবারের সদস্য, যারা কুকুরদের নিঞ্জা হিসাবে কাজে লাগানোর জন্যে বিখ্যাত। টিম গাই-এর নেজি আরেক বিখ্যাত বিয়াকুগান ব্যবহারকারী, তেনতেন তার বিভিন্ন রকমের নিঞ্জা টুলস ব্যবহার করার জন্যে জনপ্রিয়, এবং রক লি তার ভয়াবহ তাইজুতসুর জন্যে সবার মনে জায়গা করে নেবার মত এক চরিত্র। সেই তুলনায় বাকি থাকা সাকুরার পরিচয় কী? সাকুরার একমাত্র পরিচয় সে সাসকে-কে ভালবাসে। তার বাবা-মাও বিখ্যাত কোন নিঞ্জা নয়, এমনকি সাকুরার বাবা-মায়ের ব্যাপারে পরবর্তীতে আমরা যখন জানতে পারি, ততদিনে শিপুদেনের ৩৫০ পর্ব অতিক্রম করে ফেলে, এবং যেই পর্বে জানতে পারি সেটাই ফিলার পর্ব। অর্থাৎ প্রথম পরিচয়েই সাকুরাকে আমরা কিউট একটা মেয়ে ছাড়া আর বিশেষ কোন কারণে মনে রাখতে পারছি না। প্রথম ইম্প্রেশনেই সাকুরা তাই নিজেকে মেলে ধরার মত কিছুই পায় নি গল্পের নির্মাতার কাছ থেকে।

ল্যান্ড অভ স্টিল আর্কে, অর্থাৎ জাবুজার আর্কে কাকাশি, সাসকে আর নারুতো পুরা স্পটলাইট কেড়ে নেয়। সাকুরার সেখানে কান্নাকাটি করা ছাড়া আর কিছু করার থাকেও না। ধীরে ধীরে বুঝতে পারে অন্যদের তুলনায় সে কতটা পিছনে। এরপরে চুনিন আর্কে পুরা গল্পজুড়ে সাকুরার একমাত্র বলার মত ঘটনা ছিল সাউন্ড ভিলেজের নিঞ্জাদের সাথে মারামারির এক পর্যায়ে নিজের চুল কেটে ফেলা, যেন তাকে ধরে রেখে সাকুরার বন্ধুদের পথে বাঁধা হতে না পারে। বলে রাখা দরকার, এই পর্যায়ে এসে আমরা প্রায় সব অল্পবয়স্ক নিঞ্জাদের প্রত্যেকেরই ক্ষমতার ভাল ব্যবহার দেখেছি। নারুতোর সাসকে-কে বাঁচানো কিংবা তার বিস্ময় জাগানো ট্যাকটিক্স আর সাসকের কাধের সেই সিলের ক্ষমতা, টিম ৭-এর অন্য দুইজনই এরই মধ্যে গল্পের প্রধান চরিত্র হিসাবে দাবী করার মত অনেক কিছু দেখিয়ে ফেলেছে। চুনিন পরীক্ষার ফাইনাল স্টেজ শুরু আগে প্রিলিমিনারি রাউন্ডে সাকুরা আর ইনোর মারামারির সময়ে আরেকটা ব্যাপার স্পষ্ট হয়ে উঠে, এই দুইজন আসলে এখনও চুনিন হবার উপযুক্ত নয়। অন্যরা সবাই নিজেদের প্রমাণ করে ফেলেছে, এমনকি যারা পরবর্তী রাউন্ডে উঠতে পারে নি তারাও।

haruno_sakura__the_last_by_vashperado-d7zwm74

পরবর্তী বড় ৩টা আর্কে সাকুরার বলার মত কোন কার্যকরী ভূমিকাই ছিল না আসলে। কোনোহা ছেড়ে দিয়ে সাসকে ওরোচিমারুর উদ্দেশ্যে চলে যায়, আর তাকে ফিরিয়ে আনবার জন্যে নারুতোর কাছে মিনতি করা, যার ফলে নারুতোও জিরাইয়ার সাথে গ্রামের বাইরে চলে যায় ট্রেনিং করা – এতটুকুই ছিল সাকুরার প্রথম দিকের ভূমিকা।

গল্পের প্রথম টাইম জাম্প হবার আগ পর্যন্ত তাই সাকুরা সত্যিকার অর্থে তার সমসাময়িক অন্যান্য নিঞ্জার তুলনায় অনেক পিছিয়ে ছিল এটা ঠিক। সে নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়েও দেখতে পারে অন্যরা তার চাইতে যোজনে যোজনে এগিয়ে। অন্যরা যেখানে সবাই নিজেদের পরিবারের বিশেষ ক্ষমতার অধিকারী হয়ে এগিয়ে যেতে পেরেছে, কিংবা রক লির মত নিঞ্জারা যেখানে নিজেদের একমাত্র ক্ষমতাকে শাণিত করে নিজেদের প্রমাণ দিয়ে যেতে পেরেছে, সাকুরা সেখানে পিছিয়ে গিয়েছে স্বকীয় কোন কিছু না থাকার কারণে। আমরা নারুতোর উদাহরণ দিয়ে বলতে পারি, ছেলেটার কিছুই ছিল না, সবার ঘৃণার পাত্র থেকে শুরু করে পুরা পৃথিবীর নায়ক হয়ে গিয়েছে, সেখানে কিন্তু একটু লক্ষ্য করলেই দেখবো কথাটা শুরু থেকেই ভুল। নারুতো উজুমাকির বংশধর, তার মধ্যে রয়েছে নাইন টেইলসের চাকরা। তাই কেউ যদি শুরু থেকে অভাগা হয়ে থাকে, সেটা সাকুরা। হ্যাঁ, সাকুরা অন্যদের তুলনায় বেশ সুন্দর আর চমৎকার একটা জীবন পাড়ি দিয়ে এসেছে নিঞ্জা হবার আগে, কিন্তু সুপার পাওয়ারের এই যুগে তার বলার মত কোন কিছুই ছিল না যে অন্যদের মধ্য থেকে আলাদা হয়ে নিজেকে তুলে ধরতে পারে। ছিল শুধু অনেক জ্ঞান, আর প্রবল মনোবল, যার কারণে মাইন্ড কন্ট্রোল ক্ষমতা থাকবার পরেও ইনো সাকুরাকে চুনিন পরীক্ষার অফিসিয়াল ম্যাচে হারাতে পারে নি। গল্পের প্রথম অংশে তাই সাকুরা আসলে ইউজলেস ছিল না, সাকুরার সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য সে তার নিঞ্জা জীবন শুরু করেছে সব জিনিয়াসদের মধ্য থেকে।

টিম ৭-এর অন্য দুজন কোনোহার বাইরে থাকাকালীন সাকুরা একটা কঠিন সিদ্ধান্তে আসে, আর তা হল, অন্যদের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হলে তাকে খুব বিশেষ কিছু করে উঠতে হবে। ৩ লেজেন্ডারি সানিনের অন্যতম সুনাদের কাছে শিক্ষাগ্রহণ শুরু করে। টাইম জাম্পটা শেষ হবার পর যখন আমরা নারুতোকে কোনোহাতে ফেরত আসতে দেখি, তখন সাকুরা কিন্তু সুনাদের সেরা শিষ্য হয়ে উঠেছে। জিরাইয়া নিজে থেকে বলে উঠেছে যে সাকুরা সেই মুহুর্তে সুনাদের যোগ্য শিষ্য হয়ে উঠেছে, এমন একজন যাকে রাগানো ঠিক হবে না।

এখন একটা জিনিস পাঠকদের জিজ্ঞেস করতে চাই। আমরা কি এই মুহুর্তে সাকুরার ক্ষমতাটুকু বুঝতে পারছি? যদি বুঝে উঠতে না পারি, তবে আসুন দেখি সাকুরা এই মুহুর্তে কোন উচ্চতায় আছেঃ
* গল্পের এরকম সময়ে ৩ সানিনের তিনজনই নিজেদের সেরা ছাত্র-ছাত্রীকে পেয়ে গিয়েছে। ওরোচিমারুকে প্রায় অনেক দিক থেকে ছাড়িয়ে গিয়েছে সাসকে, যদিও তার বড় ভূমিকা রাখে সাসকের শারিঙ্গানের ক্ষমতা। জিরাইয়ার শিখানো পথে এসে তাকে পৃথিবীর অবস্থা পরিবর্তন করে ফেলবার আশা দেখাচ্ছে নারুতো, কিন্তু শিখবার আছে অনেক কিছু। আর সুনাদে, যে কিনা নিঞ্জা দুনিয়ার সেই মুহুর্তের সেরা মেডিকাল নিঞ্জাই শুধু নয়, বরং শারীরিক ক্ষমতার দিক থেকে পৃথিবীর সর্বোচ্চ শক্তিশালী নিঞ্জাদের একজন, তাকে কিনা সাকুরা প্রায় ধরে ফেলেছে! সেটাই নয়, অন্য দুই বড় সানিনের কাছে শিক্ষানবিস থাকা নারুতো-সাসকে যখন দর্শকদের কাছে ভয়াবহ ক্ষমতাধর বলে পরিচিতি পায়, সেখানে সুনাদের এই ছাত্রীকে সেই মুহুর্তে ধরে নেওয়া হত যেকোনদিনে সুনাদেক ছাড়িয়ে যাবে!!! হ্যাঁ, সেই অভাগা সাকুরা যে কিনা বংশানুক্রমে কোন বিশেষ ক্ষমতা পায় নি, সেই সাকুরা যে কিনা তার সময়ের জিনিয়াস সব নিঞ্জাদের ছায়া হয়ে থাকার মত থাকলেও তাদের সাথে দাপট দেখিয়ে চলতে পেরেছে, সেই সাকুরা এখন তার শিক্ষক এবং অন্যতম লেজেন্ডারি সানিন সুনাদেকে যেকোন দিন ছাড়িয়ে যেতে পারে! আর সেটাই শুধু নয়, বরং একই সাথে সাকুরা এই সময়টিকে কাজে লাগিয়ে বেশ বড় এক মেডিকাল নিঞ্জা হয়ে উঠেছে। সাকুরা একটা বড় সুযোগ পেয়েছে, এবং সেটার সর্বোচ্চ ব্যবহার করে যা যা অর্জন করার সব অর্জন করে নিয়েছে।

কিন্তু এসব কিছুই তো হয়েছে স্ক্রিনের পিছনে। সাকুরা ইউজলেস না, এটা প্রমাণ করার জন্যে তাকে অনস্ক্রিনে কিছু করে দেখানো লাগবে। মুখে মুখে “অন্যতম সেরা শক্তিশালী নিঞ্জা” হলে চলবে না, বরং দর্শকদের দেখানো দরকার সাকুরা আসলেই বিশেষ কিছু হয়ে উঠেছে। এজন্যে সাকুরা পরবর্তীকে কী করলো চলুন এক নজরে দেখে নেই।

কাজেকাগে হয়ে যাওয়া গারা-কে আকাতসুকি কিডন্যাপ করেছে। তাকে উদ্ধার করতে কোনোহা যে কয়জন নিঞ্জাকে পাঠায়, সাকুরা তার মধ্যে অন্যতম। গারার ভাই কানকুরো ততদিনে সুনাগাকুরের অন্যতম শক্তিশালী ও বড় মাপের এক নিঞ্জা হয়ে উঠে। আকাতসুকির সাসোরির কারণে তার মধ্যে অন্যরকমের এক বিষ ছড়িয়ে পরে, আর সেটা সাড়িয়ে তুলবার মত কোন মেডিকাল নিঞ্জা ছিল না সুনাগাকুরেতে। সাকুরা সেখানে এসে সেখানে বসেই সেই বিষ পরীক্ষা করে নিয়ে কানকুরোকে সারিয়ে তুলে। এক সাকুরা একাই সম্মিলিতভাবে সুনাগাকুরে যা করতে পারে নি তা করে দেখিয়েছে। এই পর্যায়ে এসে আমরা সাকুরার মেডিকাল ক্ষমতা হাতেনাতে প্রমাণিত হতে দেখতে পারি। সাকুরা তার অর্জিত জ্ঞানের একটি অংশের প্রমাণ দিয়ে নিজেকে চিনিয়ে নিতে পেরেছে।

পরবর্তীতে বেশ বড়সড় অনেক ঘটনা ঘটে, এবং এক পর্যায়ে দেখতে পাই চিয়ো-এর সাথে মিলে সে আকাতসুকির অন্যতম বড় এক নাম সাসোরিকে হারিয়ে দেয়। হ্যাঁ, চিয়োর ভূমিকা এখানে বেশি ছিল হয়তো, কিন্তু সাকুরার ভূমিকা কোন দিক থেকেই কম নয়। কম তো নয়ই, বরং অনেক অনেক বেশি। নিজেকে চিয়োর পাপেট বানিয়ে নিলেও সাকুরার নিজের ক্ষমতা তেমন কিছু বলার মত না হলে এই মারামারির ফলাফল তাদের বিপক্ষে চলে যেত একদম শুরুর দিকেই।

সাকুরা, যে কিনা নিজের দূর্ভাগ্যের জন্যে এরই মধ্যে “ইউজলেস” খেতাব পেয়ে গিয়েছে দর্শকদের কাছ থেকে, সে প্রথম পাওয়া সুযোগটি কাজে লাগিয়েই আকাতসুকির সবচাইতে ভীতি জাগানিয়ে একজনকে হারিয়ে দিয়েছে। আরেকজনের সাথে মিলিত হয়ে মারামারি মূখ্য নয়, কারণ নিঞ্জাদের শক্তির এক বড় অংশ হলে অন্যদের সাথে মিলে নিজেদের কাজ উদ্ধার করে নেওয়া। সাকুরা সেই মারামারিতে বড় ভূমিকা রেখে আকাতসুকির একজনকে শেষ করে ফেলে। গল্পের এই পর্যায়ে আমরা সাকুরার একই ব্যাচের আর কয়জন নিঞ্জাকে আকাতসুকির কোন সদস্যকে হারিয়ে দিতে দেখি? একজনকেও না।

এর পরবর্তীতেই সাকুরা কিন্তু নিজেকে প্রমাণ করার আরেকটা সুযোগ নিয়েও কাজে লাগিয়ে দেয়, যেটা অনেকেরই হয়তো মনে নেই। তেনচি ব্রিজে টিম কাকাশি যখন ওরোচিমারুর মুখোমুখি হয়, তখন নারুতো নিজের উপর ক্ষমতা হারিয়ে নাইন টেইল অবস্থায় চলে যায়। একাই ওরোচিমারুকে পিছে হটিয়ে দিতে পারে। এই অবস্থায় নারুতোকে শান্ত করবার জন্যে সবাই যেখানে ভয়ে ভয়ে থাকে, সাকুরা এগিয়ে আসে। নারুতো তার উপর চড়াও হলেও গুরুতর জখম পায়, কিন্তু নারুতো স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরত আসলে তাকেও আমার সুস্থ করে তুলতে সাহায্য করে নিজের মেডিকাল ক্ষমতার বলে। বড় বড় নিঞ্জারা যেখানে এগিয়ে যেতে ভয় করে, সাকুরা সেখানে এগিয়ে যায়, এবং আঘাতপ্রাপ্ত হয়েও অন্যদের সারিয়ে তুলে। অকার্যকর? না, এটা অকার্যকারিতার সংজ্ঞা নয়।

এর পরবর্তীতে বড় যেই আর্কে আমরা সাকুরাকে দেখি, সেটা নারুতোর অন্যতম সেরা আর্কঃ পেইন আর্ক। আসলে এই আর্কটিতে সাকুরার ভূমিকা ছিল মেডিকাল নিঞ্জা হিসাবে সবার সাহায্য করা। কোনোহা ধ্বংসের পরে আসলে নারুতো বাদে চোখে পড়ার মত একমাত্র যে ছিল সে হল নারুতো ভালবেসে নিজেকে উতসর্গ করে দেবার জন্যে এগিয়ে আসা হিনাতা। সেই জন্যে এই আর্কে সাকুরার আসলে অন্য সব নিঞ্জার মত ভূমিকা থাকার কথা না তেমন। কিন্তু সবাই যেখানে বসে বসে হাহুতাশ করছে কিংবা নারুতোর দিকে চেয়ে আছে, সেখানে সাকুরা নিজের ক্ষমতা দিয়ে সব মেডিকাল নিঞ্জাকে যতজনের সম্ভব চিকিৎসা করার আহ্বান জানায় এবং সুনাদের পাশে থাকে।

নিজের একমাত্র ভালবাসার মানুষটির উপর যখন মৃত্যুর পরওয়ানা জাড়ি হয়, তখন নিজের সব রকমের কষ্টকে ধামাচাপা দিয়ে সাসকেকে নিজেই মারতে উদ্যোগী হয়। সাকুরা শুধু শারীরিকভাবেই শক্তিশালী নয়, মানসিক দিক থেকেও অনেকের চাইতে অনেক বেশি পরিমাণে এগিয়ে ছিল তার ভাল প্রমাণ এটি।

সর্বশেষে থাকছে সম্ভবত সাকুরার সবচাইতে বড় অবদানের কথা – ৪র্থ নিঞ্জা ওয়ার্ল্ড ওয়ারের ঘটনা। গল্পের এই পর্যায়ে এসে আমাদের গল্পের দুই নায়ক নারুতো ও সাসকে, ও খলনায়ক তোবি এবং পরে মাদারাসহ সব বড় বড় নামগুলি একের পর এক পাওয়ারাপ পেয়ে গিয়েছে। যেই টিমের সদস্যদের সাথে নিজেকে তুলনা করতে যাবে, সেই দলের সবাই গল্পের কারণে লাফিয়ে লাফিয়ে একের পর এক ক্ষমতা পেয়ে গিয়েছে। যুদ্ধ হবার কারণে খলনায়কেরাও নিজেদের অকল্পনীয় সব ক্ষমতা দেখানো শুরু করেছে। এমতাবস্থায় সাকুরার কী করণীয়? গল্পকার যখন তাকে এক রকমের পার্শচরিত্রের কাতারে ফেলেই দিয়েছে, সেখানে বসেই নিজের ক্ষমতা দেখিয়ে যেতে থাকে সে। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বড় চরিত্র আগাতপ্রাপ্ত হলে তার চিকিৎসায় এগিয়ে আসাটা অনেক বেশি হয়েছে বলে হয়তো এটি দর্শকদের কাছে একটি স্বাভাবিক দৃশ্যই হয়ে উঠেছে, কিন্তু ব্যাপারটির ভূমিকা কত বড় সেটা এভাবে ভেবে দেখুন যে, এই যুদ্ধে এদের সবাই বারবার বিভিন্ন শত্রুর মুখোমুখি হয়েছে। সাকুরার চিকিৎসা না পেলে গল্পের এত বড় বড় চরিত্রদের অনেকেই শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারতো না।

এদিকে সাদা জেতসুর অতর্কিত হামলার কারণে যেখানে সবাই দিকবিদিকশুন্য হয়ে পড়েছিল, তখন সাকুরা সাদা জেতসুর ব্যাপারটি সবার আগে ধরতে পারে। হ্যাঁ, গল্পের নায়ক হবার কারনে নারুতো আরেকটি পাওয়ারাপ পায়, এবং এখন সে সবধরনের এরকম লুকায়িত জেতসুদের খুঁজে বের করতে পারে। পাওয়ারাপ না পাওয়া সাকুরা নিজ ক্ষমতায় তাদের ব্যাপারটি জেনে নিতে পারে ও সবাইকে সে ব্যাপারে সতর্ক করতে পারে। “ইউজলেস” সাকুরা অন্য সব নিঞ্জাদেরকে ইউজলেস হওয়া হতে আরেকবার বাঁচিয়ে দেয়।

শেষ পর্যন্ত যখন বড় যুদ্ধে মেডিকাল নিঞ্জা হবার পরেও অংশগ্রহণ করে, তখন দর্শকদের মনে করা উচিৎ সুনাদের সেই নিয়মের কথা। যেখানে শেষ নিয়মটিতে বলা হয়, যদি মেডিকাল নিঞ্জা এত ক্ষমতাধর হয় যে সরাসরি মারামারি করতে পারে, তাহলে অন্য সব নিয়ম ছুড়ে ফেলে দিয়ে নিজেই ফ্রন্টলাইনে এসে যুদ্ধে অংশ নেয়। সাকুরা সেটিই করে, এবং নারুতো ও সাসকের সাথে মিলে ওবিতোর বিপক্ষে লড়াই করে। নারুতোর কাছ থেকে যখন নাইন টেইলসকে কেড়ে নেওয়া হয়, তখন নারুতো যেন সাথেসাথে মারা না যায় তার জন্যে জানপ্রাণ দিয়ে চেষ্টা করে। খেয়াল রাখতে হবে, নারুতোকে এই পর্যায়ে বাঁচিয়ে তুলবার জন্যে সাকুরা ছাড়া আর কেউ যোগ্য মেডিকাল নিঞ্জা ছিলও না। নারুতোর হার্টকে পাম্প করতে থাকে, যেন নারুতো বেঁচে ফিরবার জন্যে আরেকটু সময় পায়। “ইউজলেস” সাকুরা একাই পুরা নিঞ্জার দুনিয়ার হার্ট পাম্প করে বাঁচিয়ে তুলে।

কাগুইয়ার সাথে মারামারিতে যেখানে নারুতো আর সাসকেই একমাত্র তাকে হারানর ক্ষমতা রাখে, সেখানে সাকুরার সাহসিকতা সাসকে-কে উদ্ধার করবার জন্যে বড় ভূমিকা রাখে। হ্যাঁ, আক্ষরিক অর্থে এক দেবীকে হারাবার জন্যে যেই দুজনের একত্রে উপস্থিত থাকা দরকার, সেখানে একজন প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছিল, সাকুরার সাহসী ভূমিকার অভাবে হয়তো সেক্ষেত্রে গল্পের ফলাফল অন্যরকম হতে পারতো।

সত্যিকার অর্থে বলার মত ব্যাকগ্রাউন্ড না থাকার পরেও একের পর এক ক্ষমতা আর জিনিয়াস নামধারী সব নিঞ্জাদের পাশেই শুধু ছিল না সাকুরা, তাদের অনেককে ছাড়িয়ে গিয়ে যুদ্ধে নিঞ্জাদের জোটকে জিতাতে সাহায্য করেছে সাকুরা। সাকুরা যদি সত্যিকার অর্থেই অকার্যকর হয়ে থাকতো, তাহলে নারুতোর গল্পটি নারুতো কম বরং বার্সার্কের মত হয়ে যেত। একের পর এক ট্র্যাজেডির শিকার হওয়া থেকে একাই রক্ষা করেছে গল্পের অন্যান্য মূল চরিত্রদের।

তাহলে কেন দর্শকদের অধিকাংশই সাকুরাকে এখনও ইউজলেস বলে আসছে? এখানে আসলে দর্শকদের সাইকোলজি একটা বড় ভূমিকা রেখেছে। আমরা যখনই সাকুরাকে দেখি, তখনই তার তুলনা করি নারুতো আর সাসকের সাথে। কেনই বা করবো না আমরা, তারা তিনজন যে একই টিমের সদস্য। সেই টিমের লিডার আবার কাকাশি নিজেই। পরবর্তীতে তাদের এই টিমে যোগ দেয় ইয়ামাতো আর সাই, যারা স্পেশাল আনবু ফোর্সের সদস্য বলে আগে থেকেই তাদের ভারী ক্ষমতার অধিকারি বলে জানি। আসলে এত সব জিনিয়াস আর অপরিসীম ক্ষমতার অধিকারীদের দলে এমন একজনকে আমরা দেখতে পাই যার শুরু থেকে বলার মত কিছু ছিল না কখনই। এমনকি নারুতোর মাঙ্গা বা আনিমের ইনফো ঘাটলে আমরা দেখতে পাই সাকুরা একজন মেইন চরিত্র, অথচ গল্পে তাকে আমরা নারুতো আর সাসকের তুলনায় খুব কম সময়েই দেখেছি। হ্যাঁ, সাকুরার চরিত্রের সবচাইতে বড় দিক হল সে সাসকে-কে অনেক বেশি ভালবাসে। বলার মত কিছু নেই এমন এক চরিত্রের যখন মূল ফোকাসটা পড়ে তার ভালবাসার জীবনের উপর, যেখানে তার আশেপাশের সবার ফোকাস পড়ে তাদের নিঞ্জা ক্ষমতার উপর, সেখানে দর্শকদের মনে এই ধারণাটা হওয়া অসম্ভব নয় যে সাকুরা ইউজলেস। ব্যাপার হল, সাকুরা কখনই ইউজলেস ছিল না। বরং কঠিন পরিবেশে শুরুতে খাপ খেয়ে নেওয়াতে কষ্ট পেতে হলেও এরপর সে ঠিকভাবেই সেই পরিবেশে মানিয়ে নিয়েছে। কিন্তু দর্শক মনের সাইকোলজিতে আরেকটা জিনিস খাটে – প্রথম ইম্প্রেশন। সেটা শুধু দর্শকদের জন্যেই নয়, বরং আমাদের দৈনন্দিন জীবনে সবক্ষেত্রেই দেখতে পারি। প্রথম ইম্প্রেশনের উপরেই আমাদের আরেকটি মানুষের ব্যাপারে জন্ম নেওয়া ধারণাটি গড়ে উঠতে থাকে। হয়তো তার চরিত্রের অন্যান্য দিক দেখতে পেলে সেই ধারণাতে বিভিন্ন প্রলাপ পড়ে, কিন্তু ধারণার মূল ভিত্তি থাকে সেই প্রথম ইম্প্রেশনেই। সাকুরার ক্ষেত্রেও সেরকমই হয়েছে, দর্শকদের প্রথম ইম্প্রেশনটিই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সাসকে উচিহা কেন “নারুতো” গল্পের সবচাইতে পূর্ণতাপ্রাপ্ত চরিত্র — তাহসিন ফারুক অনিন্দ্য

Uchiha Sasuke Evolution

লেখাটির টপিক দেখে হয়তো অনেকে শুরুতেই ভ্রু কুঁচকে উঠবেন। দাঁড়ান একটু, আমি বলছি না সাসকে এই আনিমেটির সবচাইতে সেরা চরিত্র। নারুতোর গল্পের চরিত্রদের মধ্যে আমার সবচাইতে প্রিয় অবশ্যই ইতাচি। কিন্তু সেই প্রসঙ্গে যাচ্ছি না এখানে, আজকে যে বিষয়ে আলোচনা করতে চাই তা হল, উচিহা সাসকে এই গল্পটির সবচাইতে ভালভাবে গড়ে তুলা চরিত্র। লেখাটি কিছুটা বড় হতে পারে, তাই সময় নিয়ে পড়বার অনুরোধ করছি।

একটা ১২-২৪ পর্বের সিরিজে চরিত্রের গঠন জিনিসটা যেভাবে হয়, স্বাভাবিকভাবেই একটা শত পর্বের সিরিজে তার চাইতে বেশ ভিন্নভাবে হয়ে থাকবে। এ জন্যে ৬০০+ পর্বের নারুতো সিরিজের একটা পার্শ্ব চরিত্র যে ধরণের ক্রমবিকাশের মধ্য দিয়ে যায়, তা অনেক ১২ বা ২৪ পর্বের সিরিজের প্রধাণ চরিত্রের ক্ষেত্রেও হয়ে থাকে না।

এবার আসি চরিত্রের গড়ে উঠার ব্যাপারটিতে, অর্থাৎ ক্যারেক্টার ডেভলপমেন্টের বিষয়টি নিয়ে কথা বলা যাক। ডেভলপমেন্ট হিসাব করলে লিটারেচার কাজগুলিতে আমরা দুই ধরণের চরিত্রায়ন দেখে থাকতে পারিঃ Static Characterization ও Dynamic Characterization. স্ট্যাটিক চরিত্রায়নের ক্ষেত্রে কোন চরিত্র ঘটনাক্রমে গল্প এগিয়ে যেতে থাকলেও বড় ধরণের কোন পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায় না। তার লক্ষ্য, চিন্তা-ভাবনা, ধারণা ইত্যাদি মোটামুটি একই রকমের থেকে যায়। অন্যদিকে ডিনামিক চরিত্রায়ণ বলতে সেই ব্যাপারটি বুঝিয়ে থাকে, যেখানে একটা চরিত্র গল্পের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এগিয়ে যেতে থাকার সাথে সাথে বড় ধরণের পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে যায়। সেই পরিবর্তন থাকে তার লক্ষ্যে, চিন্তাভাবনায়, আচার-আচরণে, ও দৃষ্টিভঙ্গিতে। বলার অপেক্ষা রাখে না, এই দুই আলাদা ধরণের চরিত্র অর্থ কিন্তু এই নয় যে একটি বেশি ভালো ও অন্যটি খারাপ। ক্ষেত্র বিশেষে তাদের উপযুক্ত ব্যবহার দুই ধরনের চরিত্রকেই বিশেষ কিছু করে তুলতে পারে।

আমাদের আলোচ্য গল্পের প্রধাণ চরিত্র নারুতো উজুমাকি স্ট্যাটিক চরিত্রায়ণের সবচাইতে বড় উদাহরণ। গল্পের একদম শুরু থেকে তার লক্ষ্য ছিল হোকাগে হওয়া ও সবার কাছে এক সম্মানজনক ব্যক্তিত্বে পরিণত হওয়া। হাটতে-চলতে সব ক্ষেত্রেই নারুতোর এই লক্ষ্যের কথা আমরা শুরু থেকে জেনে এসেছি, এবং কোন ধরণের বাঁধা তাকে দমাতে পারে নি এই উদ্দেশ্য অর্জন থেকে। তার এই অনড় অবস্থান মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি ঘৃণা থেকে ঘুড়িয়ে নিয়ে সম্মানের পথে নিয়ে আসে।

ডিনামিক চরিত্রায়নের আদর্শ উদাহরণ সাসকে। তার ছোটবেলা থেকেই লক্ষ্য ছিল তার ভাইকে হত্যা করে প্রতিশোধ নিবে আর নিজের বংশের পুনরুত্থান ঘটাবে। ঘটনাপ্রবাহে আমরা দেখতে পারি সাসকে তার সেই লক্ষ্য মাঝপথেই অর্জন করতে পেরেছে, কিন্তু এরপর সত্যি কথাটা তার সামনে চলে আসলে তার চরিত্রে একটা ভাঙ্গন দেখতে পারি। শুরু হয়ে যায় ভাঙ্গা-গড়ার খেলা, যেখানে কোনোহাকে ধ্বংশ করে দেওয়া কিংবা কোনোহাকে বাঁচিয়ে ফেলা – এই দোটানায় তার চিন্তাভাবনা ঝড়ের মধ্য দিয়ে যেতে থাকে। শেষ পর্যন্ত নারুতোর সাথে শেষবারের মত মারামারির মধ্য দিয়ে তার চরিত্র পূর্ণায়তা পেয়ে উঠে।

দুটি চরিত্রই আনিমে জগতের অন্যতম জনপ্রিয়তা পাওয়া চরিত্র, সন্দেহ নেই। কিন্তু এবার যদি আমরা এই দুজনের ক্যারেক্টার ডেভলপমেন্টের দিকে তাকিয়ে থাকি, তাহলে কোন চরিত্রটিকে আমরা ঠিকভাবে গড়ে উঠতে দেখি? নিঃসন্দেহে সেটা সাসকে। নারুতো চরিত্রটির প্রতি বিদ্বেষ নেই আমার, একটি চিরাচরিত শৌনেন গল্পের প্রধান চরিত্র হবার মত সবকিছুই তাকে দিয়েছে গল্পের লেখক – অনড় চিন্তাভাবনা, হাসিখুশিভাবে সবাইকে আপন করে নেওয়া, বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেওয়া, এ সব কিছুই তাকে একজন হিরো করে তুলে। কিন্তু, চরিত্রের বিকাশ যদি হিসাব করি আমরা, নারুতো উজুমাকি কি আদৌ তেমন কোন বিকাশ দেখাতে পেরেছে? নারুতোর চরিত্রে যেটি হয়ে উঠে নি, সাসকের চরিত্রে তার সবকিছু হয়ে উঠেছে আসলে।

ঘটনাক্রমে আমরা দেখে উঠতে পারি সাসকে ছোটকালে খুবই হাসিখুশি এক চরিত্র ছিল, যে বাবার দৃষ্টি আকর্ষণ পাবার জন্যে সবরকমের চেষ্টা করতো। একদিন তার বড় ভাই তার বাবা-মাসহ পুরা উচিহা বংশকে হত্যা করে ফেলে। এই ঘটনা সাসকে-কে করে তুলে হিংস্র ও প্রতিশোধপরায়ণ, এবং এরকম একটা অবস্থান থেকেই গল্পে প্রথম তাকে দেখতে পারি আমরা। এরকম সময়ে তার বয়স ছিল ১২-১৩ বছর, নিঞ্জাদের দুনিয়া হয়ে থাকলেও ম্যাচিউরিটি আসার মত বয়স তখনও হয়ে উঠে নি। নিজের প্রতিশোধ নেবার লক্ষ্যে নিজের গ্রাম ছেড়ে দিতেও রাজী হয়ে উঠেছিল। এরপর ১৬ বছর বয়সের দিকে এসে বড় ভাইকে হত্যা করে যখনই নিজের জীবনের লক্ষ্য পূরণের পথে এক ধাপ এগিয়ে গিয়েছে বলে মনে করেছিল, তখনই তোবির কাছ থেকে আসল ঘটনা জানতে পারে। জানতে পারে কীভাবে তার বড় ভাই বাধ্য হয়েছিল নিজের বংশকে নির্মূল করে দিতে। এমন সময়ে এসেই আমরা সাসকের চরিত্রে সবচাইতে বড় ধাক্কাটা দেখতে পারি। এই মুহুর্তটি ছিল তার চরিত্রের বিকাশের একটি বড় উপলক্ষ্য। অবশেষে নিজে থেকে একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে উঠে সে, কোনোহাকে ধ্বংস করবে সে, কোনোহার উপর বদলা নিবে সে।

ইতোমধ্যে নিঞ্জাদের ৪র্থ বিশ্বযুদ্ধের সূচনা হয়, আর এমন এক কঠিন মুহুর্তে তোবি, কাবুতো আর জেতসু সবাই তাকে নিজের মত করে ব্যবহার করতে চেষ্টা করে, সে বিষয়টিও বুঝে উঠতে পারে। যুদ্ধের এক পর্যায়ে বড় ভাইকে রিএনিমেশন অবস্থায় দেখতে পারে। বড় ভাইয়ের কাছ থেকে সত্য ঘটনাটির অন্য আরেক সংস্করণ শুনতে পারে। সাসকের চরিত্রের গঠনের আরেকটি বড় মুহুর্তের সাক্ষী হতে পারে দর্শক এই জায়গাটিতে, যখন সাসকে বুঝে উঠতে পারে শুধুমাত্র প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে আর সিদ্ধান্ত নেওয়াটা বোকামি হবে। এরপর পূর্বের হোকাগেদের কাছ থেকে নিঞ্জার ইতিহাসের সবকিছু জেনে নেয় সে। বুঝে উঠতে পারে পুরা নিঞ্জা সিস্টেমটাতেই সমস্যা হয়েছে।

শুধু প্রতিশোধ আর প্রতিশোধ যার লক্ষ্য ছিল, সেই চরিত্রকে আমরা এরপর কী সিদ্ধান্তে উপনীত হতে দেখি? সে কি এরপর পুরা নিঞ্জা দুনিয়াকে নির্মূল করতে উঠে যায়? না, বরং এই প্রথম সে বুঝে উঠতে পারে নিজের পরিণতি যেন অন্য কাউকে মুখোমুখি হতে না হয়, এজন্যে পুরা নিঞ্জা সিস্টেমটাকে নতুন করে গড়ে তুলতে হবে। হোকাগে হয়ে এই লক্ষ্য পূরণের জন্যে এগিয়ে যেতে দেখি আমরা, যদিও গল্পের নায়ক না হবার কারণে সেটা তার ভাগ্যে জুটে নি। কিন্তু হোকাগে হবার লক্ষ্য নারুতোর কাছে রেখে দিয়ে এলেও, এরপর সাসকে পুরা নিঞ্জা দুনিয়া ঘুড়ে দেখে সব সমস্যা ঠিকঠাক করার উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে পরে।

একটি প্রতিশোধপরায়ণ ছোট্ট বাচ্চা বিভিন্ন ধরণের মানসিক ধাক্কা, অশান্তি, কষ্ট, ক্ষোভ সামলে উঠে সুন্দর একটি বিশ্ব গড়ে তুলার উদ্দেশ্যে শান্তির পথে অগ্রসর হয় — লক্ষ্য, চারিত্রিক বিকাশ ও ব্যক্তিত্বের পুর্ণায়ন হয়ে উঠে সাসকে উচিহা চরিত্রটির।

আমরা গল্পের ক্রমে অন্যান্য অনেক চরিত্রেরও কাছাকাছি বিকাশ দেখতে পাই। বাবার প্রতি অন্যায়ে কঠিন হয়ে যাওয়া, আপন দুই বন্ধুকে হারানোর পরে এক অন্ধকারাচ্ছন্ন জীবনে হারিয়ে যাওয়া এবং নারুতো-সাসকে-সাকুরার শিক্ষক হবার মাধ্যমে আবার আলোর পথে ফেরত আসা – কাকাশিরও প্রায় একই ধরণের ডিনামিক পরিবর্তন আসে। কিন্তু আমরা এই পরিবর্তনের অধিকাংশই জানতে পারি গল্পের শেষের দিকে এসে। ওবিতো চরিত্রটিও বেশ ট্র্যাজিক এক চরিত্র। তবে এত বিশাল মাপের দুনিয়া পাল্টে দেওয়া যুদ্ধ শুরুর পর, অগণিত মানুষ হত্যার পর শুধু নিজের ভুল বুঝতে পেরে সেটা কাটিয়ে তুলার চেষ্টা – তার চরিত্রের বিকাশটি অনেকের কাছেই তাই আপত্তিকর। অন্যদিকে ইতাচির মনের মধ্যে ঝড়ঝঞ্ঝা এবং অকল্পনীয় ত্যাগের মাধ্যমে ট্র্যাজিক হিরো হয়ে উঠা – সবকিছু মিলিয়ে তাকে গল্পটির সবচাইতে পছন্দের চরিত্র করে তুলতে পেরেছে। কিন্তু জনপ্রিয়তা এক জিনিস, আর ব্যক্তিত্বের গঠন আরেক জিনিস।

সবসময়ে শান্তির পথে থাকতে চাওয়া ইতাচিকে নিজের পুরা বংশকে হত্যা করতে বাধ্য হতে হয়। এক কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে সন্দেহ নাই, কিন্তু এত বড় এক ঘটনা ঘটিয়ে ফেলবার পরে সবার চোখে অপরাধী হয়ে থাকার পরেও কোনোহাকে ও নিজের ছোট ভাইকে চোখে চোখে রাখতে আকাতসুকিতে যোগদান করে সে। ভাইয়ের হাতে নিজের মৃত্যুটিকে নিজের পাপের শাস্তি ও কষ্ট থেকে মুক্তির পথ হিসাবে বেঁছে নেয়। আমরা গল্পের শুরু থেকেই ইতাচিকে গল্পের সেরা ব্যক্তিত্বের অধিকারী হিসাবে দেখে এসেছি, তার অংশ শেষ হবার পরেও একইভাবে তাকে গল্পের অন্যতম সেরা ব্যক্তিত্বের অধিকারী হিসাবেই জানতে পেরেছি। ফলাফল স্বরূপ, তার ক্যারেক্টার ডেভলপমেন্ট জিনিসটি বাদ পড়ে গিয়েছে।

অতএব, ডেভলপমেন্ট ব্যাপারটি যদি লক্ষ্য করি শুধু, তাহলে পুরা গল্পে সাসকের মত চারিত্রিক বিকাশ আর দ্বিতীয়টি কারও নেই। সাসকে চরিত্রটি ভুলত্রুটির ঊর্ধ্বে কখনই ছিল না, কিন্তু নিজের ত্রুটি মেনে নিয়ে সেটিকে ঠিক করে তুলবার প্রচেষ্টা দেখা গিয়েছে, এবং প্রায় ৬৫০ পর্বের এই যাত্রায় তাতে সফল হওয়াটা তার চরিত্রকে পরিপূরণ করতে পেরেছে। Well-developed চরিত্রের কথা যদি উঠে থাকে, তাহলে এই গল্পে সাসকের চরিত্রের গঠনের ধারেকাছেও কেউ নেই।

নারুটো ফ্যান-ফিকশান: Jiraiya — Rahat Rubayet

কোনোহার আকাশপথে বিশালাকারের বেলুনযানে গ্রাম এর অবস্থা তদারকি করছেন ৭ম হোকাগে। গ্রামের বিভিন্ন জায়গায়-নানা কাজে এখানে সেখানে অন্তত শ’খানেক শ্যাডো ক্লোন বা কাগে বুনশিন ঘুরে বেড়াচ্ছে। গ্রামে প্রযুক্তির ছোঁয়া লাগতে কাজের চাপ পাহাড়সম। এই এখন বহুতল অত্যাধুনিক হাঁসপাতালের উদ্বোধন তো ১ মিনিট বাদেই নতুন ব্রীজের কাজে শ্রমিক-বিদ্রোহ, পরক্ষনেই পাশের গ্রামের কাগের স্পেশাল গেস্ট হিসেবে গ্রামে আসা, তারওপর গাদা গাদা ডেস্কজব, টেলিভিশনের বিশেষ ইন্টারভিউ- তারপর নিজের ফ্যামিলি।
এছাড়াও গ্রামের এখানে সেখানে হাজারটা দরকারে স্বয়ং হোকাগে হিসেবে নিজেই কাজ করে যাচ্ছে। যদিও গ্রামের দেখভালের কাজটা সানন্দেই করে চলেছে নারুতো। তবু মাঝে মাঝে এতটাই ব্যস্ত সময় পার করে যে, কাজের বাইরেও যে একটা জীবন আছে তা ভুলে যেতে বসেছে ধীরে ধীরে।
এতসবের মাঝেও প্রায়ই একটা দীর্ঘশ্বাস চাপে ও মনে মনে। জীবনের চাওয়া পাওয়ার মাপকাঠিতেতে প্রাপ্তির পাল্লাটা হেলে পরলেও অপ্রাপ্তির ভারটাও নেহায়েত কম না।
নারুতো সেই ছোট থেকেই চাইতো গ্রামের সবাই ওকে গ্রহন করুক আর সম্মান করুন। সে থেকেই হোকাগে হওয়ার স্বপ্ন আর তাকে বাস্তবে রূপ দেয়ার এত সাধনা।
ইরুকা সেন্সে, কাকাশি সেন্সের পাশাপাশি এরো সেননিনও থাকবে- হোকাগের ক্লোকটা গায়ে চাপিয়ে…. চাইল্ড অব প্র……… এবার আর দীর্ঘশ্বাস গোপন করে না নারুতো। মাথাটা নামায় ডেস্কের স্তুপ করে রাখা কাগজে। চোখ দুটো বুজে এসেছে -অবসন্ন। চিন্তায় ছেদ পরল দরজায় টোকা পরায়।
এরই মধ্যে নিজের অফিসে ফিরে এসেছে ও। শিকামারু ঢুকল টোকা দিয়ে।
নারুতো এরর মাঝে ধাতস্থ হয়েছে। একমনে কাজ করে যাওয়ার একটা অভিব্যক্তি চোখে মুখে।
-“নারুতো, ওরোচিমারু এসেছে, কি নিয়ে যেন কথা বলবে তোমার সাথে।”
একটু অবাক হয় নারুতো। শ্যাডো ক্লোনের সাইন করতে যেতেই বাধা দেয় শিকামারু।
-“ক্লোন নয়, তোমাকে সশরীর এ যেতে বলেছে বারবার করে। ছাদে চলে যাও সরাসরি।”
এবারে বেশ অবাক হলেও কিছু না বলে দরজার দিকে এগোয়। কাছে যেতেই দরজায় নকের শব্দ পায়, খুলেই দেখলো বোরুতো এসেছে হিমাওয়ারিকে নিয়ে।
নারুতো অন্যমনস্ক থাকলেও ঠিকই খেয়াল করল ওদেরকে। কিছু না বলে ইশারায় বসতে বলে ছাদের পথ ধরলো। ইচ্ছে করলেই জানালা গলে লাফ দিয়ে ছাদে পৌঁছতে পারত ও। কিন্তু, এখন ও হোকাগে। ইচ্ছে থাকলেও অনেক কিছুই করা সম্ভব না ওর পক্ষে।
ছাদে ওরোচিমারু দাঁড়িয়ে আছে দক্ষিনমুখো হয়ে। গ্রামের প্রায় পুরোটা অংশেই চকিতে চোখ বুলিয়ে নেয়া যায়। মেয়েলি চুলগুলো কোমর ছাড়িয়ে নেমে গেছে- দুলছে বাতাসে। নারুতো পেছনে গিয়ে দাড়াতেই ওর দিকে ফিরলো। নারুতোর গায়ে কাটা দিয়ে ওঠে। দেখতে ওদের থেকেও কমবয়সী লাগছে ওরোচিমারুকে। কথা ওরোচিমারুই বলতে শুরু করে প্রথমে।
ধির ঠান্ডা গলায় তার জীবনবোধ নিয়ে বেশ কিছু কথা বলে গেলো ওরোচিমারু। নারুতো চুপ করে শুধু শুনে গেলো। বলতে বলতে জিরাইয়ার কথায় এসে হালকা দীর্ঘশ্বাস কি ফেললো ওরোচিমারু? নারুতোর কাছে দীর্ঘশ্বাসই মনে হল।একটু থামলো, উলটো ঘুরে নারুতোর মুখোমুখি হল।
হাত নাড়ল ওরোচিমারু। হ্যান্ডসাইন ওয়েভ করেই মাটি স্পর্শ করল। সামোনিং জুতসুর সাইন ভালই চিনে নারুতো। চকিতে অনেকগুলো চিন্তা মাথাচাড়া দিয়ে উঠল, নারুতো পাত্তা দিল না। ওরোচিমারু এখন আর গ্রামের জন্য কোন থ্রেট নয়। তাছাড়া তার অভিব্যক্তিতেও এমন কিছু একটা আছে যা নারুতো ধরতে না পারলেও তা থেকে বিপদের আভাস পেল না।
ওদিকে ওরচিমারুর সামোনিং জুতসুতে সাড়া দিয়েই ধিরে একটা কফিন উঠে এল।
নারুতো তাকিয়ে আছে কফিনের দিকে। তাকিয়ে থাকতে থাকতেই দেখলো, কফিনের দরজা খুলে আছড়ে পরল একপাশে। নারুতো কফিনের দরজার দিকে তাকায় না। ওর দৃষ্টি নিবদ্ধ কফিনের ভেতরের মানুষটার দিকে। এরো সেননিন(পারভি সেইজ)!
জিরাইয়া এক পা ফেলে কফিনের বাইরে, তারপর আরেক পা।
সূর্যের তাপ কি কিছুটা কমে এলো? চারিদিক কেমন যেন ম্লান আর নিষ্প্রভ লাগে নারুতোর কাছে। সেই, সাদা চুল- অদ্ভুত পোষাক। পায়ের খড়মগুলো কেমন যেন ঝাপসা লাগে নারুতোর চোখে। ইচ্ছে করলেই হাত দিয়ে চোখটা মুছে নিতে পারে ও।
নারুত ঝাপসা দৃষ্টি নিয়ে বোকাচোখে তাকিয়ে থাকে। বুকটা চাপ দিয়ে ওঠা অনুভূতিটা মরে গিয়ে কেমন যেন ফাকা ফাকা লাগে হটাত।
জিরাইয়ার কন্ঠ গমগম করে ওঠে “হিসাশিবুরি দানা”
নারুতো কিছু না বলে তাকিয়ে থাকে শুধু।
“আরে, হোকাগের ক্লোকে দারূন মানিয়েছে তোমাকে। তবে, বড্ড ছোট হয়ে গেছে- এই যা। ৪র্থ হোকাগের ক্লোকটা সে দিক থেকে বলতে চমৎকার বানিয়েছিল।”
নারুতো সামলে নিয়েছে নিজেকে। চোখের পানি অদৃশ্য হয়ে, মুখের ম্লান হাসিটা স্বরূপে ফিরে এসেছে। জিরাইয়া তির্যক চোখে নারুতোর নিল চোখের দিকে তাকিয়ে ভ্রুকুটি করলো। শেষবার যে নারুতোকে দেখেছিল তার সাথে এখনকার নারুতোর অমিল থাকবেই- এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু, কিছু একটার ছায়া দেখতে পেলো সে নারুতোর চোখেমুখে। ২ ২টো নিঞ্জা ওয়ার চাক্ষুষী চোখ তা চিনতে ভুল করলো না। আগেও এমন ছায়া অনেকের চোখেই দেখেছে জিরাইয়া। তবে নারুতোর প্রাণবন্ত মুখটার জায়গায় অমন ভারিক্কী চেহারা দেখে অস্বস্তি লাগছে জিরাইয়ার। ও কি মিনাতোর মৌন অনুরোধ ঠিকমতন রাখতে পারে নি? আরো বেশি সময় কি নারুতোকে দেয়া কর্তব্য ছিল তার?
না, তা নয়। জিরাইয়া তার অস্বস্তির কারনটা ধরতে পারে। অস্বস্তি লাগার কারন তাকে রিএনিমেট করা হয়েছে। আর তা করেছে, পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা চিরনবীন ওরোচিমারু।

ওরোচিমারুর দিকে তাকাতেই মুখের অভিব্যক্তি পরিবর্তন হয় জিরাইয়ার।
-“পুরনো বন্ধুর কাছ থেকে অভিবাদন মূলক কথাবার্তাকে সৌজন্যতা বলে বোধ হয়, জিরাইয়া।”
–“বন্ধু, সৌজন্যতা, অভিবাদন- খেয়ালি শব্দগুলো তোমার মুখ থেকে বেরুচ্ছে, বিশ্বাস হয় না।”
-“হাহাহাহা, এত সিরিয়াস হবার কিছু নেই। তোমাকে গ্রাম ধ্বংসের কাজে ম্যানুপুলেট করার কোন ইচ্ছে আমার নেই।”
–” তাহলে?”
-“আমাদের ৭ম হোকাগের সাথে দেখা করিয়ে দেবার জন্যই এই ‘আয়োজন’।”
–” ৭ম? ৬ষ্ঠ হোকাগে কে?”, বলেই ঘুরে স্টোন-ফেইসগুলোর তাকায় জিরাইয়া।
“কাকাশি? ছোকরার মুখোশ সমেতই মুখচ্ছবি বানিয়েছে!!” বলেই হাসতে থাকে উঁচু গলায়।
এর মাঝে বেশ অনেকটা সময় কথা বলল, জিরাইয়া নারুতো আর ওরোচিমারুর সাথে।
এর মাঝে থাকতে না পেরে ঘুমন্ত হিমাওয়ারিকে সোফায় রেখে ছাদে এসেছে বোরুতোও তাও বহুক্ষণ। ছাদের দরজার আড়াল থেকে তার বাবা, ওরোচিমারু আর অচেনা ওই দীর্ঘদেহী লোকটাকে দেখে যাচ্ছে।
হটাত, হিমাওয়ারির শব্দ পেয়ে পাশে তাকাল। দেখলো, চোখ কচলে দাঁড়িয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে আছে। বোরুতো তাকাতেই দেখলো, অচেনা সেই লোকটা যেন বালুর মতন ঝড়ে পরছে ছাদের ওপর।
হিমাওয়ারি আরেকবার চোখ কচলে নিয়ে ভাল করে তাকায়। তার বাবা শিশুদের মতন কাদছে ওখানে। হিমাওয়ারি ভায়ের জামাটা শক্ত করে ধরে চোখ বড়বড় করে তাকিয়ে থাকে।

King Golf [মাঙ্গা রিভিউ] — Arnab Basu

King Golf

মাঙ্গাঃ King Golf
MAL Rating: 7.87/10
Personal Rating: 8/10
গলফ খেলাটা ঠিক আর দশটা খেলার মত না। সব দিক থেকেই এটা বেশ বিলাসবহুল খেলা। গলফ টুর্নামেন্টগুলোর প্রাইজমানিও অনেক বেশি। এরকম একটা খেলা নিয়েই এই মাঙ্গা। হাই স্কুলের ছেলে-মেয়েরা এই খেলা খেলছে, টুর্নামেন্ট হচ্ছে এটা দেখে প্রথমে বেশ অবাক লেগেছে। জাপানে হাই স্কুলগুলোতে গলফ খেলার সুযোগ আসলে আছে কিনা জানি না, তবে থাকলে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

প্রোটাগনিস্ট ইয়ুকি সৌসকে(aka Predator) তার স্কুলের সবচাইতে বড় Delinquent, মারামারিতে অপরাজেয়। একই স্কুলের কাজুমি নামকরা Amateur গলফার, এক দিন ইয়ুকিকে দেখে পাত্তা না দিয়ে চলে যায়। এতে নায়কের বেশ গায়ে লাগে। কাজুমিকে খুঁজতে খুঁজতে সে চলে আসে স্কুলের গলফ ক্লাবে। এখান থেকেই শুরু হয় ইয়ুকির গলফের রাজা হওয়ার পথচলা।

মাঙ্গার গল্প আসলে আহামরি কিছু না। টিপিকাল স্পোর্টস-শোউনেন গল্পগুলো যেমন হয় আর কি। তাহলে বারবার এই টিপিকাল জিনিসগুলো কেন পড়ি বা দেখি? আসলে এ ধরণের গল্পগুলোর মজা ছোট ছোট মোমেন্টগুলোতে। কিং গলফও তার ব্যতিক্রম না। ইয়ুকির গলফ ক্লাবের সুইং, তার ডায়লগ বা এমন জিনিসগুলোই এই মাঙ্গার আকর্ষণ। তাছাড়া দারুণ আর্ট তো আছেই।

ড্রেডলক চুলের প্রোটাগনিস্ট আমি প্রথম এই মাঙ্গাতেই দেখেছি। ইয়ুকির আচরণ অনেকটাই স্ল্যাম ডাঙ্কের হানামিচির মত। তবে একটা জিনিস আমাকে বেশ চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। গল্পে ইয়ুকির যে প্রোগ্রেস দেখানো হয়েছে, সেটা বেশ অবিশ্বাস্য। তবে এমন না যে সে ট্রেইনিং বা পরিশ্রম ছাড়া সেটা করছে। কিন্তু সে এত দ্রুত এত ভাল খেলোয়াড় হয়ে গেল, যেটা আসলে আমার চোখে লেগেছে। আমি জানি না গলফ বেশ সহজ কোন খেলা কিনা, তা যদি না হয়, তাহলে ইয়ুকি আমার দেখা এখন পর্যন্ত সবচাইতে প্রোডিগাল প্রোটাগনিস্ট।

স্পোর্টস ভক্তদের জন্য মাস্ট রিড এই মাঙ্গাটা পড়ে ফেলুন। গলফ নিয়ে নতুন মাঙ্গা Robot x Laserbeam কেমন হবে জানি না। তবে কিং গলফ এর সমপর্যায়ে আসা বেশ কঠিন হবে।

Paranoia Agent [রিভিউ] — Shifat Mohiuddin

Paranoia Agent

কিছু কিছু এনিমে দেখার পর মনে হয় এনিমেটা না দেখাই হয়তো স্বাস্থ্যের জন্য মঙ্গলকর ছিল। বিখ্যাত পরিচালক সাতোশি কনের একমাত্র টিভি সিরিজ হওয়ায় অনেকদিন ধরেই প্যারানয়া এজেন্ট ওয়াচলিস্টে ছিল। তের পর্বের এনিমেটা দ্রুত গতিতেই শেষ করেছি কিন্তু তারপরও মনে হয়েছিল এনিমেটা আরো তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেলেই ভাল হত।
*
কাহিনীর শুরুটা কিছুটা আর্বান লেজেন্ড ঘরানার। টোকিও শহরে Lil’ Slugger (জাপানিজে Shonen Bat) নামের এক কিশোর অপরাধীর আবির্ভাব ঘটে। একাধিক নগরবাসী লিটল স্লাগারের আক্রমণের শিকার হয়। লিটল স্লাগার কে এবং কোথা থেকে কি উদ্দেশ্য নিয়ে আক্রমণ করে তা কেউ জানে না।শুধুমাত্র ভিক্টিমরা এটাই বলতে পারে যে আনুমানিক সিক্সথ গ্রেডে পড়া এক কিশোরই আক্রমণকারী। কিশোরের মাথায় একটা লম্বা ক্যাপ পড়া থাকায় চেহারা ঠিকমত দেখা যায় না। ভিক্টিমরা আরো মনে করতে পারে যে লিটল স্লাগার সোনালি রঙের রোলার স্কেটে করে পেছন থেকে সোনালি রঙেরই একটা বাঁকানো বেসবল ব্যাট দিয়ে আক্রমণ চালায়। লিটল স্লাগারের প্রথম আক্রমণের শিকার হয় সুকিকো সাগি নামের একজন ক্যারেকটার ডিজাইনার। তারপর বিভিন্ন পেশার, বিভিন্ন বয়সের মানুষ র‍্যান্ডমলি রাস্তাঘাটে লিটল স্লাগারের আক্রমণের শিকার হয়। লিটল স্লাগারের পরিচয় উদঘাটনের জন্য পেছনে লাগে দুই গোয়েন্দা ইকারি আর মানিওয়া।
*
প্যারানয়া এজেন্টের কাহিনী প্রথমদিকে ডিটেকটিভ উপন্যাসের মতই আগাচ্ছিল। জিজ্ঞাসাবাদ, অপরাধের স্থানে ক্লু খোঁজা ইত্যাদি আরকি। তবে আক্রমণের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত জীবনে যখন আলোকপাত করা শুরু হয় তখনই নড়েচড়ে বসতে বাধ্য হই। কিছু চরম অসুস্থ মানুষের চরম অসুস্থ চিন্তাভাবনার চিত্রায়ন হল প্যারানয়া এজেন্ট। লিটল স্লাগারের ভিক্টিমদের মধ্যে কোন আন্তঃসম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যায় না। তবে তদন্ত এগোনোর সময় আবিষ্কৃত হয় যে লিটল স্লাগারের আক্রমণের সময় ভিক্টিমরা সবাই কোন না কোনভাবে মানসিক অস্থিরতায় ভুগছিল। একেকজন ভিক্টিমের মানসিক অস্থিরতাকে কাভার করে কয়েকটা পর্ব রচিত হয়েছে। আবার লিটল স্লাগারের আবির্ভাবের গুজব আর সাধারণ মানুষের উপর তার প্রভাব নিয়ে কয়েকটা পর্ব বানানো হয়েছে। তবে লিটল স্লাগারের একেকজন ভিক্টিমের আত্মকাহিনী দেখলে ঘৃণায় গা রি রি করে উঠতে বাধ্য। ভদ্রলোকের মুখোশ পড়ে রাখা পশুর সংখ্যা সমাজে উত্তরোত্তর বেড়ে যাওয়াকে সাতোশি কন চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন। এই মুখোশ পরে রাখা লোকের মধ্যে রয়েছে স্কুলশিক্ষিকা থেকে শুরু করে পুলিশ অফিসার থেকে এলিমেন্টারি স্কুলবালক পর্যন্ত। জাপানের নাগরিক জীবনের অন্ধকার দিক যেগুলো কখনোই অন্য এনিমেতে সচরাচর দেখানো হয় না তারও চিত্রায়ন করেছেন সাতোশি কন উনার মুভিগুলোর মতই। পারফেক্ট ব্লু মুভিতে অনেক ডার্ক মুহূর্ত থাকলেই প্যারানোয়া এজেন্টে এর চেয়ে অনেক বেশি ডার্ক ডেভেলপমেন্ট আছে। তাই মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে এনিমেটা দেখা উচিত।

Diamond no Ace: বেসবল সমাচার! — Mithila Mehjabin

জনরা যদি হয় স্পোর্টস, আর দর্শক যদি হয় আমার মত খুতখুতে, তাহলে স্পোর্টস না বুঝে এনিমের আনন্দ উপভোগ করাটা তাকে দিয়ে হয় কম! :’)
আহামরি খুব বেশী স্পোর্টস এনিমে দেখা হয়নি, কিন্তু যে কয়টা দেখেছি তন্মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় হলো দাইয়া নো এস তথা ডায়ামন্ড নো এস।  এনিমেটা দেখার সময় রীতিমত খাতা-কলম নিয়ে বসে গেছিলাম, বেসবলের সকল রহস্য বুঝে ছাড়ব!  বিপুল পড়াশুনা (!) করে মোটামুটি একটা ধারণা আনতে পেরেছিলাম বেসবল সম্বন্ধে, আর বাকিটা দাইয়া দেখেই বুঝেছি! :’) তাই, যারা খেলাটা না বোঝার কারণে দাইয়া বা বেসবল সংক্রান্ত অন্য কোনো এনিমে দেখতে পারছেন বা চাইছেন না, তাদের জন্য লিপিবদ্ধ করে ফেললাম আমার সকল বেসবল জ্ঞান! আশা করি উপকৃত হবেন!
ইয়াকিউ তথা বেসবল…পশ্চিমা বিশ্বে বহুল প্রচলিত ও জনপ্রিয় একটি খেলা, ঠিক আমাদের দেশে ক্রিকেট যেমন। ক্রিকেটের সাথে বেসবলের মিলও বেশ, দুটোই ব্যাটে বলে রান তোলার দৌড়!
দুদিক থেকে দুটি তীর্যক রেখা উঠে যাওয়া একটি বিন্দুকে কেন্দ্র করে একটি বৃত্ত আঁকলে, তীর্যক রেখা দুটির অন্তভূক্ত অর্ধবৃত্ত, যেখানে বিন্দু থেকে অর্ধবৃত্ত পর্যন্ত একটা হীরকখন্ড বা ডায়ামন্ডের মত মনে হয়…এই ডায়ামন্ডই বেসবল খেলার মাঠ। আবার বিন্দু থেকে অর্ধবৃত্তের ভেতর দিকে একটি তাস পাতার ডায়মন্ড কল্পনা করলে, এই ডায়ামন্ডের চারটি কোণা হচ্ছে চারটি বেস। প্রথম বিন্দু, যেখান থেকে দুটি তীর্যক রেখা উঠে গেছে, সেটি হচ্ছে হোম বেস, এই হোম বেস থেকে ডানের বেসটি ফার্স্ট, বিপরীত বেসটি সেকেন্ড, এবং বামের বেসটি থার্ড বেস। বড় ডাযামন্ডের ভেতর ছোট ডায়ামন্ড, বেসবল খেলায় দুটোকেই ডায়ামন্ড বলা হয়।
ছোট ডায়ামন্ডটির কেন্দ্রে একটু উচুঁ জায়গাটা হচ্ছে পিচার’স মাউন্ড, যেখান থেকে বল ছোড়ে পিচার। পিচারের মাউন্ড বরাবর প্রথম বিন্দু, তথা ফার্স্ট বেস থেকে উঠে যাওয়া তীর্যক রেখা দুটি ফাউল লাইন। হোমবেস থেকে ছোট ডায়ামন্ডের বাইরের খানিকটা অংশ জুড়ে ইনফিল্ড, ইনফিল্ড থেকে বড় ডায়ামন্ডের আউটার ফেন্স পর্যন্ত জায়গাটুকু হচ্ছে আউটফিল্ড। কল্পনা করতে কষ্ট হলে নেট ঘেটে বেসবল ফিল্ডের একটা ছবি দেখে নিলে বুঝতে পারা খুবই সহজ।
একেকটি দলে নয়জন করে দুটি টিমের মধ্যে খেলা হয়। ক্রিকেটের মতই, এট এ টাইম একদল ব্যাটিং এবং বিপক্ষ দল বলিং এবং ফিল্ডিং করে। এভাবে পালা করে একটি ব্যাটিং ও একটি ফিল্ডিং নিয়ে হয় এক ইনিং; বেসবলে নয়টি ইনিং নিয়ে খেলা হয়। টাই হলে ইনিং বাড়তে পারে।
ব্যাটিং দলের লক্ষ্য থাকে ফিল্ডিং দলের পিচারের ছোড়া বল পিটানো, এবং পিটিয়ে যদ্দুর সম্ভব দূরে ফেলানো। ব্যাটার বল পিটিয়েই ব্যাট ফেলে দৌড় দেবে প্রথম বেস এ। এভাবে একজন ব্যাটার হোম বেস থেকে ফার্স্ট, সেকেন্ড, থার্ড এবং ব্যাক হোম, অর্থাৎ পুরো চারটা টা বেস ঘুরে হোম বেস এ ফেরত আসলে তখন ব্যাটিং দলের জন্য একটি রান কাউন্ট হয়।
বলিং বা ফিল্ডিং দলের লক্ষ থাকে ব্যাটারকে যেকোনোভাবে আউট করা এবং রান করা থেকে বিরত রাখা।
ব্যাটিংদলের তিনজন খেলোয়াড় আউট হলে ব্যাটিং টিমের ব্যাটিংয়ের পালা শেষ, তারপর ব্যাটিং টিম ফিল্ডিং এবং ফিল্ডিং টিম ব্যাটিংয়ে নামবে। এভাবে করে নয় ইনিং শেষে যে দলের রান বেশী হবে, সে-ই জয়ী!
কত সহজ, তাই-না?! :’) AS IF!
লক্ষণীয়:
* বেসবল খেলায় “বল” শব্দটা একটা বিশেষ অর্থ বহন করে, তাই এখানে “বল” এর বদলে “পিচ” ব্যাবহার করে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
** কোনো খেলাই শতভাগ নিয়ম অনুসরণ করে না। রুল ফ্লেক্সিবেল্, আবার নিয়ম তৈরী হয় এবং ছাঁটাই হয়। তাই খেলা দেখার সময় আরও অনেক ব্যাপারেই চোখে পড়বে। এখানে অনুক্ত কিছু চোখে পড়লে নেটের সাহায্য নিতে পারেন; অথবা প্রশ্ন থাকল উত্তর বের করে দেয়ার যথাসাধ্য চেষ্টা করব।
***অপরিচিত লাগতে পারে, এমন সকল শব্দ “ফ্যাক্টস” অংশে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
****দাইয়া নো এস এর একটা প্রসঙ্গ যেহেতু, দাইয়ার রেফারেন্স ব্যাবহার করা হয়েছে টুকটাক জায়গায়,; সেগুলোকে কোনোভাবেই স্পয়লার বলা যায় না।
প্রত্যেক হাফ-ইনিংয়ের শুরুতে ফিল্ডিং টিম এর নয়জন প্লেয়ার নিজেদের পজিশন অনুযায়ী ফিল্ডে দাড়িয়ে যাবে। পিচার, যার কাজ বল ছোড়া বা পিচ করা, থাকবে মাউন্ডের ওপর। ক্যাচার থাকবে হোম বেসে, যেখানে ব্যাটার দাড়াবে, তার ঠিক পেছনে, বসা অবস্থায়, পিচারের দিকে মুখ করে। পিচার ও ক্যাচারের মধ্যে সাংকেতিক চিহ্ণের আদান-প্রদানের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়ে থাকে কি ধরণের বল, কোথায় ছোড়া হবে। হোমবেসের দায়িত্বে থাকা বেসম্যানও ক্যাচার। তিনটা বেস এ চারজন ফিল্ডার অবস্থান নেয়, যাদেরকে ইনফিল্ডারও বলা হয়। প্রথম বেসপ্লেট থেকে কয়েক পা বামদিকে অবস্থানকারী হচ্ছে ফার্স্ট বেসম্যান, সেকেন্ড বেসের ডানদিকে অবস্থানকারী সেকেন্ড বেসম্যান, সেকেন্ড বেসের বামদিকে অবস্থানকারী শর্টস্টপ, এবং থার্ডবেসের কয়েক পা ডান দিকে হচ্ছে থার্ড বেসম্যান।
আউটার ফিল্ডের বাম দিকে লেফট ফিল্ডার, মাঝখানে সেন্টার ফিল্ডার, ডানে রাইট ফিল্ডার।
ক্যাচারের পেছনে একজন নিরপেক্ষ আম্পায়ার থাকে, প্রতিটা বেসেও একজন করে আম্পায়ার থাকতে পারে। গেম এর গুরুত্বের ওপর নির্ভর করে একটি বেসবল ম্যাচে ১-৬ জন আম্পায়ার থাকতে পারে।
খেলার শুরুতে একজন ব্যাটার হোম বেস এ এসে দাড়াবে ব্যাট হাতে, হোমপ্লেটের দিকে পিচারের ছোড়া বল হিট করার উদ্দেশ্যে। পিচারের ছোড়া সেসকল পিচ যা ব্যাটার চেষ্টা করেও হিট করতে পারে না অথবা ইচ্ছে করেই করে না, গিয়ে ক্যাচারের মিট বা গ্লাভসে ধরা পড়ে, এবং ক্যাচার বল ফেরত পাঠায় পিচার কে। একজন ব্যাটার, যে বল পিটিয়ে খেলার মাঠে গড়াতে পারে, তাকে অবশ্যই বল গড়ানো মাত্র ব্যাট ফেলে প্রথম বেসের উদ্দেশ্যে দৌড়াতে হবে, সে বল দূরেই গড়াক, আর কাছেই গড়াক।
ব্যাটার বল গড়িয়ে হাত থেকে ব্যাট ফেলামাত্রই ব্যাটার হিসেবে তার দায়িত্ব শেষ, তখন সে একজন রানার তথা ব্যাটার- রানার। আউট না হয়ে যে ব্যাটার প্রথম বেস এ পৌছে যেতে পারে, সে হচ্ছে “সেফ”, মানে তাকে প্রথম বেস এ থাকা অবস্থায় আর আউট করা যাবে না। একজন ব্যাটার-রানার চাইলে প্রথম বেস এ থাকতে পারে, অথবা দ্বিতীয় বেস, কিংবা এর পরের বেসেও পৌছানোর সিন্ধান্ত নিতে পারে, যত বেস পর্যন্ত সে বিশ্বাস করে যে আউট না হয়ে পৌছাতে পারবে।
একজন ব্যাটার যদি পিচারের ছোড়া পিচ মাঠে গড়িয়ে নিরাপদে প্রথম বেস এ পৌছাতে পারে, সেটাকে বলা হয় “সিঙ্গেল”। যদি সে বল গড়িয়ে প্রথম প্রচেষ্টায়ই দ্বিতীয় বেস পর্যন্ত পৌছাতে পারে, তাহলে সেটা “ডাবল”, তৃতীয় বেস পর্যন্ত পৌছে গেলে সেটা “ট্রিপল”। ব্যাটার যদি পিচারের ছোড়া বল পিটিয়ে পুরো আউটফিল্টের ওপর দিয়ে আউটার ফেন্স পর্যন্ত উড়াতে পারে, তাহলে সেটাকে বলে “হোম রান”। এক্ষেত্রে ব্যাটার সহ বেস এ থাকা প্রতিটা রানার বিনা বাঁধায় সকল বেস ঘুরে হোম বেস এ পৌছানোর অধিকার পায়। ব্যাটার সহ তিন রানারের রান মিলে হয় চারটি রান- যেটা যেকোনো সিচুয়েশনে ব্যাটিং দলের জন্য সবচেয়ে প্রত্যাশিত ফলাফল।
বেস এ থাকা যেকোনো রানার ফেয়ার টেরিটোরিতে ব্যাটারের পিটানো পিচ মাটিতে গড়ানোর আগমুহুর্ত থেকে, পিচ মাটি স্পর্শ করা মাত্র বা পিচ গড়ানোর পরমুহুর্ত থেকে, তথা ব্যাটার পিচের গায়ে আঘাত করা মাত্রই যেকোনো অবস্থা থেকেই দৌড়িয়ে পরবর্তী বেস এ পৌছানোর চেষ্টা করতে পারে। প্রথম বেসের রানারকে পিচ গড়ানো মাত্র অবশ্যই দৌড় দিতে হবে, কারণ পিচ গড়ালে ব্যাটার ব্যাট ফেলে দৌড়াতে বাধ্য, সেক্ষেত্রে প্রথম বেস রানারকে প্রথম বেস খালি করে দিতে হবে। কিন্তু পিচ যদি গড়িয়ে ফাউল লাইনের বাইরে চলে যায়, তাহলে যেকোনো বেস এর রানার আবার পূববর্তী বেসে ফেরত আসবে। ব্যাটারের পিটানো পিচ যদি বাতাসে উড়ে যায়, এবং মাটিতে গড়ানোর আগে ফিল্ডার তালুবন্দী করে ফেলে, তাহলে ব্যাটার আউট। এক্ষেত্রে যে কোনো রানারকে পরবর্তী বেসে এডভান্স হবার হন্য বর্তমান বেস কে ট্যাগ বা টাচ করতে হবে। কারণ বেস রানাররা কিন্ত মোটেই ভালোমানুষের বাচ্চার মত বেসপ্লেটের ওপর দাড়িয়ে থাকে না! তারা পরবর্তী বেসের দিকে, অবস্থানকৃত বেসপ্লেট থেকে খানিকটা এগিয়ে দাড়িয়ে থাকে, যেন ব্যাটার পিচ হিট করা মাত্রই যত দ্রুত সম্ভব পরবর্তী বেস এ পৌছুতে পারে। কিন্তু এগিয়ে থাকা একজন বেসম্যান যদি বুঝতে পারে যে ব্যাটার কতৃক উড়ে যাওয়া পিচ ফিল্ডারের হাতে পড়তে যাচ্ছে, তাহলে তাকে এগিয়ে থাকা অবস্থান থেকে অবশ্যই বেসপ্লেটে ফিরে এসে প্লেট টাচ করতে হবে, তারপর পিচ ফিল্ডারের তালুবন্দী হওয়া মাত্রই পরবর্তী বেসের দিকে দৌড়াতে পারবে। পিচার ব্যাটারের দিক পিচ ছোড়া অবস্থায়ও একজন রানার পরবর্তী বেসের উদ্দেশ্যে দৌড় দিতে পারে, কারণ পিচ যেহেতু ব্যাটারের দিকে যাচ্ছে, রানারকে আউট করতে পারার সুযোগ তখন কম। এক্ষেত্রে রানারের প্রচেষ্টা সফল হলে সেটাকে বলে বেস চুরি, বা “স্টোলেন বেস”। আমাদের কুরামোচি সেনপাই একেবারে পরিষ্কার চেহারায় অনায়াসে বেস চুরি করে, কারণ এই চুরির জন্য তো আর তার শ্বাস্তি হচ্ছে না!  মিয়ুকি আবার এককাঠি বাড়া, ও ক্যাচার হলে, বিপক্ষ দলে এমনকি কুরামোচি থাকলেও বেস চুরি করার সাহস দেখাবে না, কারণ বেস চুরির ফন্দী বানচালের দায়িত্ব কিন্তু আবার ক্যাচারের!
পিচারের ছোড়া পিচ যদি ব্যাটার কতৃক হিট না হয়, তাহলে সেটা হয় “বল” নাহয় “স্ট্রাইক”। তিনটা স্ট্রাইক হলে ব্যাটার আউট। পিচারের ছোড়া পরপর চারটা পিচ যদি “বল” হয়, তাহলে ব্যাটারকে একটা “ফ্রি ওয়াক” দ্বারা পুরষ্কৃত করা হয়। অর্থাৎ পরপর চারটা পিচ “বল” হলে ব্যাটার ব্যাট ফেলে বিনা বাঁধায় প্রথম বেস এ চলে যাবে। (পিচারের পিচ যদি ব্যাটারকে হিট করে, অর্থাৎ ছোড়া পিচ ব্যাটারের গায়ে লাগে, তাহলেও একটা “ফ্রি ওয়াক” পাবে ব্যাটার, এই শর্তে যে, ব্যাটার ঐ পিচের দিকে ব্যাট সুইং করেনি।) অনেক সময় অনেক ভালো ব্যাটার পিচ স্লটে পেলে হোম রান করতে পারে, এই ভয়ে পিচার ইচ্ছা করেই চারটা “বল” করে, যেন ব্যাটার বেস এ চলে যায়। তাহলে ঐ ব্যাটারকে আপাতত ফেইস করতে হচ্ছে না তার। পিচারের ছোড়া বল কি স্ট্রাইকজোনের মধ্য দিয়ে গিয়ে “স্ট্রাইক” হয়েছে, না স্ট্রাইকজোনের বাইরে দিয়ে গিয়ে “বল” হয়েছে, তা হোমবেস আম্পায়ার নির্ধারণ করেন।
নিম্নোল্লেখিত কারণগুলোর কোনোটি ঘটলে একটা পিচ কে “স্ট্রাইক” ধরা হয়:
১. ব্যাটার স্ট্রাইকজোনের মধ্য দিয়ে পিচ করা একটি বল এ সুইং না করে তা ক্যাচারের কাছে যেতে দিলে।
২. ব্যাটার যেকোন পিচ (এমনকি সে পিচ যদি “বল” ও হয়) এর দিকে ব্যাট সুইং করলে, কিন্তু লাগাতে না পারলে সে পিচ যদি গিয়ে ক্যাচারের হাতে পড়ে।
৩. ব্যাটারের পেটানো পিচ যদি কোনোভাবে ফাউল লাইনের বাইরে গড়ায়, তাহলে। এক্ষেত্রে উল্লেখ্য যে, ব্যাটারের যদি অলরেডি দুটো স্ট্রাইক হয়ে থাকে, তাহলে তৃতীয় স্ট্রাইক হিসেবে ফাউল টেরিটোরিতে গড়ানো বল গণ্য করা হবে না, অর্থাৎ তৃতীয় স্ট্রাইকের সময় পেটানো পিচ ফাউল টেরিটোরিতে গড়ালেও সেটা “স্ট্রাইক” হিসেবে গণ্য হবে না, যদি না সে পিচ টা বান্ট করা হয়। ফাউল বান্ট যদি তৃতীয় স্ট্রাইকও হয়, তবুও স্ট্রাইক হিসেবে গণ্য হবে।
একটা পিচ কে “বল” হিসেবে গণ্য করা হয় যখন পিচারের ছোড়া পিচ স্ট্রাইকজোনের বাইরে দিয়ে যায়, যদি না ব্যাটার ঐ পিচের দিকে ব্যাট সুইং করে থাকে তো। ব্যাট সুইং করা হলে সেটা স্ট্রাইক হিসেবে গণ্য হবে।
ব্যাটিং টিম যখন রান করার চেষ্টা করে, ফিল্ডিং টিম এর লক্ষ থাকে ব্যাটারদের আউট করা এরং রান করা থেকে বিরত রাখা। সাধারণত নিম্নোল্লেখিত পাঁচটি উপায়ে একজন ব্যাটার বা ব্যাটার-রানার আউট হয়ে থাকে:
১. স্ট্রাইকআউট: উপরে যেমন বলা হয়েছে, তিনটা স্ট্রাইক হলে, অর্থাৎ পিচারের ছোড়া বল স্ট্রাইকজোনের মধ্য দিয়ে যাওয়া সত্বেও ব্যাটার সে পিচ না পেটাল বা পেটাতে না পারলে, অথবা “বল” হওয়া সত্বেও সুইং করলে স্ট্রাইক কাউন্ট হবে। আর তিনটা স্ট্রাইক মানে ব্যাটার আউট।
২. ফ্লাইআউট: পেটানো বল যদি মাটিতে পড়ার আগে ফিল্ডার তালুবন্দী করে ফেলে, তাহলে সেটা ফেয়ার টেরিটোরি, ফাউল টেরিটোরি বা যে অবস্থায়ই হোক না কেন, ব্যাটার আউট হয়ে যাবে।
৩. গ্রাউন্ডআউট: ব্যাটারের পেটানো পিচ ফেয়ার টেরিটোরিতে গড়ানোর পর যদি সে পিচ ফিল্ডারদের হাত হয়ে ব্যাটার বা কোনো ব্যাটার-রানারের আগে বেসপ্লেট টাচ করে, তাহলে সেই ব্যাটার বা ব্যাটার রানার আউট। যেমন: ব্যাটারের পেটানো পিচ গড়িয়ে সোজা শর্টস্টপের হাতে গেলে শর্টস্টপ যদি সে পিচ ব্যাটারের ফার্স্ট র্বেস এ পৌছানোর আগে ফার্স্ট বেসে অবস্থানকারী বেসম্যান কে ছুড়ে দেয়, তাহলে ব্যাটার আউট হয়ে যাবে। একই ব্যাপার অন্যন্য বেস রানারদের ক্ষেত্রেও ঘটতে পারে। গ্রাউন্ডআউট দেখা টা আসলে শ্বাসরুদ্ধকর, কারণ শুধু একজন ব্যাটার বা একজন রানারকেই যে গ্রাউন্ডআউট করা যায় তা-ই না, মাঝেমাঝে দুজন, এমনকি তিনজন ব্যাটার-রানারকেও আউট করে ফুল বেস মুহুর্তে শুণ্য করে দেয়া যায়! উদাহারণস্বরুপ: ধরুন ব্যাটিং টিম এর তিনজন ব্যাটার তিনটা বেস এ এডভান্স করতে পেরেছে! বেস ফুল, এমন সময় চতুর্থ ব্যাটার এসে পিচারের ছোড়া পিচ পেটাতে গিয়ে ব্যাটে-বলে মেলাতে পারল না! অথচ পিচ ফেয়ার টেরিটোরিতে গড়ানো মানে কিন্তু দৌড়াতে হবে ব্যাটারকে, স্বাভাবিকভাবেই আর বাকি বেস রানারদেরও দৌড়াতে হবে আগের বেসের বেসম্যানকে জায়গা করে দেয়ার জন্য। অথচ পিচ ধুলোয় কিছুটা লুটোপুটি খেয়ে সোজা গড়ালো সেকেন্ড বেসম্যানের হাতে, মানে ফার্স্ট থেকে সেকেন্ড বেসের উদ্দেশ্যে দৌড় শুরু করা রানার আউট! সেকেন্ড বেসম্যান পিচটা ধরেই আবার ছুড়ে দিল ক্যাচার বা হোমবেসম্যান এর হাতে, অর্থাৎ থার্ড বেস থেকে হোমবেসের দিকে দৌড় শুরু করা রানার আউট! ক্যাচার আবার সেই বল ছুড়ে দিল ফার্স্ট বেসম্যানের হাতে, মানে ব্যাটার, যে হোম থেকে ফার্স্টবেসের দিকে দৌড়াচ্ছিল, সে-ও আউট!  ট্রিপল্ প্লে অর্থাৎ তিনজন প্লেয়ার আউট! এবং জ্বী! ঠিক এমনই একটা ট্রিপল প্লে দেখতে পাই আমরা দাইয়া তে! বলদ পিচারের কন্ট্রোলবিহীন পিচ দিয়েও কিভাবে একটা ট্রিপল প্লে খেলা যায়, তারই একটা চমৎকার প্ল্যান বানিয়েছিলেন জিনিয়াস ক্যাচার!
উল্লেখ্য যে: ব্যাটার বা রানারকে আউট করার জন্য পিচ বেসম্যানের হাতেই থাকতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। মাঠের সব ফিল্ডারই অবস্থা বুঝে নিজেদের পজিশন ছেড়ে অন্য যেকোনো পজিশন খেলার অধিকার রাখে। সেকেন্ড বেসম্যান যেমন পেটানো পিচ ধরার জন্য নিজের পজিশন ছেড়ে অন্য কোথাও ছুটতে পারে, তেমনি সেকেন্ডের পজিশনে লেফ্ট ফিল্ডারও বেসম্যান হিসেবে দাড়িয়ে যেতে পারে সেকেন্ডের ছোড়া বল রানারের আগে বেসপ্লেটে টাচ করানোর জন্য। আউটের জন্য বল রানারের বেসপ্লেট টাচ করলেই হলো, কার হাত দিয়ে টাচ হচ্ছে, তা বড় কথা না। ঠিক ক্রিকেটে যেমন উইকেটরক্ষক না হয়েও উইকেট ভাঙতে পারে অন্য যেকোনো ফিল্ডার, তেমনই।
৪. ফোর্স আউট: যখন ব্যাটারের পেটানো পিচ ফেয়ার টেরিটোরিতে গড়ানোর কারণে রানার দৌড়াতে বাধ্য হয় বেস খালি করার জন্য, পরবর্তী বেসে পৌছানোর আগেই গ্রাউন্ডআউট হয়ে যাবে জেনেও। যেমন: ফেয়ার টেরিটোরিতে ব্যাটারের পেটানো পিচ দূরে না গড়ালেও; পিটিয়েছে যখন, দৌড়াতে হবে ব্যাটারকে। তখন ফার্স্ট বেসের রানার সরে গিয়ে সেকেন্ড বেস এ যেতে বাধ্য হবে, কিন্তু বল ইতোমধ্যে পৌছে গেছে সেকেন্ড বেসম্যানের হাতে, অর্থাৎ রানার আউট।
৫. ট্যাগ আউট: পেটানো পিচ ট্যাগ বা স্পর্শ করানোর মাধ্যমে যখন আউট করা হয়। রানার দৌড়াতে থাকা অবস্থায়, বা অন্যমনষ্কভাবে বেসপ্লেট থেকে দূরে দাড়িয়ে থাকলে পেটানো পিচ হাতে ফিল্ডারদের কেউ যদি সেই পিচ রানারের গায়ে স্পর্শ করে ফেলে, তাহলে সেই রানার আউট।
উদাহারণে যেমন বললাম, ব্যাটিং টিমের একইসাথে দুইজন, এমনকি তিনজন প্লেয়ারকেও আউট করা যায় ডাবল্ বা ট্রিপল্ প্লে খেলে- যদিও এধরণের সুযোগ খুব কমই পাওয়া যায়। আউট হওয়া প্লেয়ারকে অবশ্যই মাঠ ত্যাগ করে বেঞ্চ বা ডাগআউটে ফিরে যেতে হবে। রানার বেসে দাড়িয়ে থাকা অবস্থায় যদি টিমের তৃতীয় ব্যাটসম্যান আউট হয়ে যায়, তাহলে রানারসহ ব্যাটিং টিমের ব্যাটিং খেলার পালা শেষ, তারপর ফিল্ডিংয়ে নামবে ব্যাটিং টিম। প্রত্যেক ব্যাটিং ইনিং শূণ্য বেস নিয়ে শুরু হবে, আগের ইনিংয়ে রানারদের পজিশন পরের ইনিংয়ে কোনো কাজে আসবে না।
একেকজন ব্যাটারের ব্যাটিং পালা, বা প্লেটে অবস্থান পূর্ণ হয়ে যায় যখন সে হোম রান করে, বেস ঘুরে হোম বেস এ ফেরত আসে, আউট হয়ে যায়, বা রানার অবস্থানে থাকাকালে টিমের তৃতীয় ব্যাটার আউট হযে যায়, তখন। একজন ব্যাটার ব্যাটিংলাইনে একবারই ব্যাটিংএ আসবে; আবার আসবে যদি শুধু তিনজন ব্যাটার স্ট্রাইক হওয়ার আগেই বাকি আটজন ব্যাটারের প্লেটে উপস্থিতি পূর্ণ হয়ে যায়, তাহলে- যেটা হয়না সাধারণত।
কোন প্লেয়ার কখন ব্যাটিং করবে, সেটা ব্যাটিং অর্ডারে সুনির্দিষ্ট করা থাকে, কারণ ব্যাতীত অর্ডার পরিবর্তন হয় না সাধারনত। প্রত্যেক এট ব্যাটে আগের ইনিঙয়ে ব্যাটিং এর সময় যে ব্যাটার পর্যন্ত শেষ হয়েছিল, তার থেকেই পুনরায় ব্যাটিং শুরু হয়; এভাবে সব প্লেয়ারই ব্যাটিং করতে পারে।
ব্যাটিং অর্ডারে সাধারণত প্রথম ব্যাটারকে লিডঅফ হিটার বলা হয়, যার কাজ বল কোনোমতে ঠেলে দিয়ে আগে বেস দখল করা!
দ্বিতীয় ব্যাটারকে বলা হয় কন্ট্যাক্ট হিটার, যার কাজ সাধারণত বান্ট বা নিজেকে স্যাকরিফাইসের মাধ্যমে লিডঅফ হিটারকে স্কোরিং পজিশন তথা থার্ড বেস পর্যন্ত চলে আসার সুযোগ করে দেয়া।
তৃতীয় ব্যাটার হলো থ্রি-হোল্, যাকে সাধারণত ভালো ব্যাটিং এবং বেস দখল করতে হয়; বল পিটিয়ে যেন অন্তত এতদূর নিতে পারে যা বেস রানারদের এডভান্স হওয়ার সুযোগ করে দেয়।
চতুর্থ ব্যাটার হচ্ছে টিমের সবচেয়ে যোগ্য ব্যাটার, যাকে বলা হয় ক্লিনাপ-ব্যাটার। নামের মতই, ওর কাজ হলো বেস ক্লিন করা, অর্থাৎ পিচ পিটিয়ে সম্ভব হলে চাঁদে পাঠাবে, যেন রানাররা সবাই বেস ক্লিন করে হোমবেস এ ফিরে আসে।
পরবর্তী ব্যাটাররা যথাক্রমে ফিফথ-হোল্, সিক্সথ-হোল, সেভেন্থ, এইটথ ও নাইন্থ-হোল।
উল্লেখ্য যে, ব্যাটিং অর্ডার কোনো স্ট্রিক্ট ডিসিপ্লিন নয়, অবস্থা অনুযায়ী ব্যাটারদের ভূমিকা ও কাজ অনেকভাবে পরিবর্তিত ও পরিবর্ধিত হতে পারে।
একটি টিমের নয়জন প্লেয়ার খেলবে, তারমানে কিন্তু এই না যে একেকটা টিম এ মাত্র নয়জন করে খেলোয়াড় থাকবে! গেমের ইম্পরট্যান্স লেভেলের ওপর ডিপেন্ড করে রোস্টারে বিভিন্ন সংখ্যায় খেলোয়ার থাকতে পারে; মেজর লীগগুলোতে একেকটা রোস্টারে সাধারণত ২৫ জন করে খেলোয়াড় থাকে। একেকটা পজিশনের জন্য ব্যাকআপ প্লেয়ার সহ বিশেষ পজিশন, যেমন: পিঞ্চ হিটারের মত অনেকজন প্লেয়ারের সমন্বয়ে গঠিত হয় একটি রোস্টার বা টিম। প্লেয়ার ছাড়াও টিমে থাকেন কোচ এবং ম্যানেজার। মেইন কোচ ছাড়াও সর্বোচ্চ লেভেলের খেলাগুলোতে ব্যাটিংয়ের সময় মাঠে দুজন কোচ উপস্থিত থাকে; ফার্স্ট বেস কোচ, এবং থার্ড বেস কোচ। ফাউল লাইনের বাইরে কোচে’স বক্সে অবস্থান নেয় এ দুজন, সাধারণত বল খেলার মাঠে গড়ালে বেস-রানারদের দৌড়ের ব্যাপারে এসিস্ট করাসহ মাঠে ফিল্ডারদের পজিশন অনুসারে পরিস্থিতি যাচাই করে নির্দেশনা দেয়া, মেইন কোচ এবং খেলোয়াড়দের মধ্যে নির্দেশ আদান-প্রদান করা এদের কাজ। অন্যন্য খেলা থেকে ভিন্ন, বেসবল টিমের কোচ এবং ম্যানেজাররা সাধারণত দলীয় পোশাক বা ইউনিফর্ম পরে থাকেন, কোনো কারণে খেলার মাঠে আসতে হলে কোচকে অবশ্যই ইউনিফর্ম পরা অবস্থায় আসতে হবে।
ম্যাচের গুরুত্বের ওপর নির্ভর করে একটা বেসবল ম্যাচে ১-৬ জন আম্পায়ার থাকতে পারেন। একজন হলে ক্যাচারের পেছনে, হোমবেসের কাছাকাছি অবস্থান নেন। ছয়জন হলে চারজন চারটি বেস, বাকি দুজন ফাউল লাইনের কাছাকাছি অবস্থান নেন।
ফ্যাক্টস:
#স্ট্রাইকজোন: ব্যাট হাতে ব্যাটিং করার ভঙ্গিতে দাড়ালে ব্যাটারের কনুই থেকে হাটু পর্যন্ত যদি একটি নয়ঘর বিশিষ্ট চারকোনা বাক্স কল্পনা করা যায়, তাহলে সেটি হচ্ছে স্ট্রাইকজোন। স্ট্রাইকজোনের ভেতর দিয়ে যাওয়া পিচে হিট না করা হলে ব্যাটারের বিপক্ষে স্ট্রাইক কাউন্ট হয়। স্ট্রাইকজোনের বাইরে দিয়ে যাওয়া পিচ কে “বল” বলা হয়। পিচারের ছোড়া পরপর চারটা পিচ “বল” হলে ব্যাটসম্যান প্রথম বেস পর্যন্ত ফ্রি-ওয়াক পায়।
#বান্ট: বান্ট একটা স্পেশাল ধরণের ব্যাটিং টেকনিক যেখানে ব্যাটার হাতের ব্যাটটির দুইমাথা আলতো করে ধরে পিচারের ছোড়া বল আস্তে করে, এমনভাবে ঠেলে দেয় যেন বল মাটিতে গড়িয়ে খুব বেশী দূরে না যেতে না পারে। সাধারণত নো-ম্যানস ল্যান্ডে, যেখানে কোনো ফিল্ডার নেই, সেখানে পিচ গড়ানোর মাধ্যমে ফিল্ডারদের কনফিউজ করে রানারদের বেস এডভান্সের সুযোগ করে দেয়ার একটি কৌশল হলো বান্ট। এ কৌশলে ব্যাটারের পেটানো পিচের গতি যেহেতু খুব কমে যায়, ইনফিল্ডের ভেতর খুব বেশীদূর গড়ায় না পিচ, এবং সেটা তোলার জন্য নিজেদের অবস্থান ছেড়ে সরে আসতে হয় ইনফিল্ডারদের; উপরন্তু, পিচ্টা কে তুলবে, তা নিয়ে দ্বিধা দেখা দেয় ফিল্ডারদের মাঝে। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দ্রুত এডভান্স করতে পারে বেস রানাররা।
#শর্টস্টপ: বেসবলে শর্টস্টপ একটি বিশেষ ফিল্ডিং পজিশন যার অবস্থান সেকেন্ড ও থার্ডবেসের মাঝখানে। বেশীরভাগ ব্যাটার বা হিটার ডানহাতি হয়ে থাকে, এবং ডানহাতি ব্যাটারের পেটানো পিচ সাধারণত সেকেন্ড ও থার্ড বেসের মধ্য দিয়ে গড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। শর্টস্টপের কাজ হলো ডানহাতি ব্যাটারের ব্যাটিং এক্সপেরিয়েন্স খানিকটা বিষিয়ে দেয়া! সোজা কথায়, ব্যাটারকে সাবধান করা, যে, “চাঁদ, তুমি যদি ভেবে থাকো আমাকে ফাঁকি দিতে পারবে তোমার পিচ, তাহলে ভুল করছ! অতএব বুঝেশুনে পেটাও, বাপু!”   এজন্য শর্টস্টপকে প্রচন্ড দ্রুতগতির একজন প্লেয়ারও হতে হয় বটে, তাছাড়া ট্রিপল, এবং ডাবল্ প্লে তে শর্টস্টপের বড় ভূমিকা রয়েছে।
#ব্যাটারী: বেসবলে ব্যাটারী বলতে পিচার এবং ক্যাচারের পার্টনারশিপ কে বোঝানো হয়। উল্লেখ্য যে, ক্যাচারের নির্দেশ অনুযায়ী পিচ করে পিচার, যেটার ওপর ফিল্ডিং দলের ফলাফল অনেকটাি নির্ভর করে। তাই এই পার্টনারশিপকে ফিল্ডিং টিমের সঞ্জীবনী শক্তি হিসেবে ধরা হয়।
#বুলপেন: খেলায় নামার আগে পিচারদের ওয়ার্ম-আপ হওয়ার জন্য একটি নির্দিষ্ট এরিয়া হচ্ছে বুলপেন। আমাদের সম্মানিত পিচারের বড়ই প্রিয় জায়গা এই বুলপেন! :’)
# বেসবল ম্যাচের ধারাভাষ্য বিবরণকারীদের বলিং এর অবস্থা বিবরণের সময় মাঝে মাঝে “1-2”, “2-3” বলতে শোনা যায়। প্রথম সংখ্যাটা দ্বারা “বল”, এবং দ্বিতীয় সংখ্যাটা দ্বারা “স্ট্রাইক” এর সংখ্যা বোঝানো হয়। যেমন: “2-2” মানে হচ্ছে 2 “বল” 2 “স্ট্রাইকস্”।
# ডাবল্ প্লে এর বর্ণনার সময় ধারা বিবরণকারীরা “6-4-3 ডাবল্ প্লে”, বা “5-4-3 ডাবল প্লে” বলে থাকে; এর অর্থ হলে এ সকল জার্সি নম্বরের প্লেয়ারদের দ্বারা খেলাটা সংঘটিত হয়েছে। যেমন: “6-4-3 ডাবল্ প্লে” কথাটার অর্থ হলো, ব্যাটারের পেটানো পিচ গড়িয়ে সোজা শর্টস্টপের (জার্সি 6) হাতে ধরা খেয়েছে, শর্টস্টপ সে পিচ সেকেন্ড বেসম্যানের (জার্সি 4) হাতে ছুড়ে দিয়েছে, অর্থাৎ ফার্স্ট থেকে সেকেন্ড বেসের দিকে দৌড়াতে থাকা ব্যাটার আউট। সেকেন্ড বেসম্যান আবার সে পিচ ফার্স্ট বেসম্যানেে (জার্সি 3) দিকে ছুড়ে দিয়েছে, মানে হোম বেস থেকে ফার্স্ট বেসের দিকে দৌড়াতে থাকা ব্যাটার আউট, অর্থাৎ ডাবল্ প্লে।
বিভিন্ন ধরণের পিচ:
পিচার কতটা ভালো পিচ, কতটা কন্ট্রোলের সাথে এবং ব্যাটারের জন্য কতটা কঠিন করে ছুড়তে পারে, তার ওপর ফিল্ডিং টিমের সাফল্য অনেকখানিই নির্ভর করে। এস অফ ডায়ামন্ডের মেইন প্রোটাগনিস্ট যেহেতু একজন পিচার, বিভিন্ন ধরণের পিচ সংক্রান্ত আলোচনা প্রায়ই চলে আসবে এনিমেতে। কিন্তু, বেসবলে পিচের ধরনসংখ্যা অনেক, এতগুলো নিয়ে আলোচনা সম্ভব নয়। তাই মোটামুটি কমন কতগুলো পিচ নিয়ে প্রাথমিক ধারণা দেয়ার চেষ্টা করছি।
একটা পিচ কে বিভিন্ন দিক থেকে বিচার করে অনেকগুলো সংজ্ঞায় ফেলানো যায়। হাতে পিচ ধরার বা গ্রিপিংয়ের স্টাইল, ছোড়ার স্টাইল, গতি, ইত্যাদির ভিত্তিতে প্রধানত তিন ধরণের পিচ বেশী দেখা যায়:
#ফাস্টবল: ফোর-সিম, টু-সিম, কাটার, স্প্লিটার, ফর্ক।
#ব্রেকিং বল: কার্ভ, স্লাইডার, স্ক্রু।
#চেঞ্জআপ।
ফাস্টবল হচ্ছে সবচেয়ে কমন পিচ, প্রায় সব পিচারেরই প্রথম আয়ত্ত করা পিচ ফাস্টবল। নামের মতই, প্রচন্ড গতিতে ছোড়া হয় এই পিচ, গতিই এর অস্ত্র। বেগের পরিবর্তন এবং ধরার ভঙ্গির ভিত্তিতে কয়েক ধরণের ফাস্টবল রয়েছে। আমাদের Eijun এর বহুল ব্যাবহৃত একটা পিচ হচ্ছে টু-সিম ফাস্টবল, তথা মুভিং ফাস্টবল; প্লেটের ওপর বেশ নড়াচড়া করে এই পিচ, এবং দূরত্বের সাথে সাথে গতি বৃদ্ধির কারণে ব্যাটারের পক্ষে টাইমিং করা মুশকিল।
ব্রেকিং বল হচ্ছে সেই পিচ যেটা চলার সময় এর গতিপথ থেকে যেকোন দিকে ভেঙ্গে যায় বা বেঁকে যায়। গতিপথ থেকে টার্ন নিলে স্বাভাবিকই পিচের গতিতেও প্রভাব পড়ে, তাই ব্যাটারের জন্য এ পিচ ব্যাটিং করা যেমন কঠিন, তেমনি ক্যাচারের জন্যও এ পিচ ক্যাচ করা কঠিন। গ্রিপ, গতির পরিবর্তন এবং বেঁকে যাওয়ার দিকের ভিত্তিতে কার্ভ, স্লাইডার, স্ক্রু ছাড়াও আরেকটি ব্রেকিং বল হচ্ছে স্লার্ভ।
চেঞ্জআপ হচ্ছে এমন একধরণের পিচ, যেটা পিচারের হাত থেকে ছোড়ার মুহুর্তে দেখতে ফাস্টবল বলে মনে হয়, কিন্তু প্লেটের ওপর পিচের গতি নেমে যায়, এবং অনেক ধীরে এগিয়ে আসে বল। বেসিক ফাস্টবল গ্রিপ আর চেঞ্জআপের গ্রিপের মধ্যে পার্থক্য হলো; চেঞ্জআপের সময় আঙ্গুলের ডগার বদলে হাতের অনেকটা ভেতর থেকে ছোড়া হয় পিচ, ফলে সেটা দেখতে ফাস্টবলের মত মনে হলেও আসলে ফাস্টবলের তুলনায় খানিকটা পরে মুক্ত হয় পিচারের গ্রিপ থেকে, যেহেতু হাতের ভেতর থেকে মুক্ত হতে খানিকটা সময় লাগে। মানুষের চোখ এ পার্থক্য ধরতে পারে না, কারণ একটা নির্দিষ্ট দূরত্বে না আসলে চোখ দিয়ে প্রচন্ড বেগে চলন্ত বস্তুর গতি ঠাওর করা যায়না। পিচ প্লেটের কাছাকাছি আসার পর বোঝা যায় যে সেটার গতি আসলে ফাস্টবলের তুলনায় বেশ ধীর, কিন্তু ততক্ষণে ব্যাট সুইং করে ফেলে ব্যাটার, কিন্তু পিচ আসে আরও পড়ে। ঠিকভাবে ছোড়া গেলে একটি চেঞ্জআপ তাই ব্যাটারকে বিভ্রান্ত করতে বাধ্য, বিশেষত সেটা যদি হয় আমাদের সম্মানিত পিচারের চেঞ্জআপ! :’) ব্যাটার তো ব্যাটার, এমনকি আমাদের জিনিয়াস ক্যাচারসহ ফিল্ডে এবং গ্যালারিতে উপস্থিত প্রত্যেকটা মানুষ জিনিসটা দেখে বিভ্রান্ত হবেই হবে! XD
এই তো, আর কি! :’) পাঠকের বেসবল বোঝার জন্য প্রয়োজন হতে পারে, এমন সকল বিষয় সম্বন্ধে মোটামুটি একটা ধারণা পেয়েছেন আশা করি! :’) এবার থিওরি ইন প্র্যাকটিকাল দেখতে চাইলে দেখে ফেলুন দাইয়া নো এস!
সকল তথ্যই কয়েকবার করে চেক করে শেয়ার করা হয়েছে, তারপরও কোনো তথ্যে ভুল পাওয়া গেলে তা ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখে সঠিক তথ্য শেয়ার করলে কৃতজ্ঞ থাকব। পোস্টটা পড়ে যদি পাঠক দাইয়া নো এস দেখতে প্রলুব্ধ হন…থুড়ি, মানে উপকৃত হন, তো আমার পরিশ্রম স্বার্থক। :’D
ধন্যবাদ সবাইকে!
বি:দ্র: পোস্টের ভীতিকর সাইজের জন্য লেখিকা ক্ষমাপ্রার্থী, এর চেয়ে ছোট করা সম্ভব বলে মনে হয়নি।