তাতামি গ্যালাক্সি লিখেছেন Fahim Bin Selim

স্প্রিং মৌসুম শেষের দিকে। কোন অ্যানিমেটা আপনার সবচেয়ে ভালো লেগেছে? সিজনের সবচেয়ে কম জনপ্রিয় অ্যানিমেগুলোর মধ্যে পড়লেও, এই গ্রুপের নিয়মিত সদস্য হলে পিং পং-এর নাম আপনার চোখে এড়িয়ে যাওয়া বেশ দুঃসাধ্য এক ব্যাপার। অ্যানিমেটা কি ফলো করছেন? নাকি প্রথম পর্বে আর্টস্টাইল দেখেই দমে গেছেন? এরকম জঘন্য বাচ্চাদের মত আকা আর্টের অ্যানিমে বানানো লোকদের গুষ্টি উদ্ধার করেছেন? সিজনের সবচেয়ে পোলার ওপিনিয়নের অ্যানিমে।

কিন্তু এই লেখা পিং পং নিয়ে না, তারও চার বছর আগের এক অ্যানিমে নিয়ে। কিন্তু আরো কিছুটা পিছে যাওয়া যাক। পিং পং নিয়ে উচ্চাকাংক্ষীদের একটা বড় অংশের কাছে অবশ্য আর্টস্টাইলটা বেশ পরিচিত। কারণ কী? কারণ হল মাসাকি ইউয়াসা।

১৯৬৫ সালে জন্মানো ইউয়াসা, ১৯৯০-এ অ্যানিমেশন ডিরেক্টিং-এর কাজ শুরু করলেও ২০০৪ পর্যন্ত তার বলার মত কাজ ছিলো ক্রেয়ন শিন-চান, মাই নেইবার ইয়ামাদাস-এর অ্যানিমেশন ডিরেকশন আর ক্যাট সুপ অ্যানিমের স্ক্রিপ্ট রাইটিং। ২০০৪ সালে মাইন্ডগেম অ্যানিমে মুভি দ্বারা সর্বপ্রথম তার পরিচালনার জগতে প্রবেশ। তার সেই “বাচ্চাদের হাতে আঁকা আর্ট” আর পাগলাটে এক কাহিনী নিয়ে যা বানালেন তা আমঅ্যানিমেজনতার কাছে খুব একটা জনপ্রিয় না হলেও সমালোচকদের কাছে হয়েছিল বেশ সমাদৃত; মাইন্ডগেম জয় করল ২০০৪ সালের জাপান মিডিয়া আর্টস অ্যাওয়ার্ড আর স্বল্পসংখ্যক কিছু সমঝদার ভক্ত। দুই বছর পর তিনি পা রাখলেন টিভির দুনিয়ায়। ২০০৬ এর কেমোনোজুমে আর ২০০৮ এর কাইবা শুধু তার ভক্ত সংখ্যা বৃদ্ধিই করল না, কাল্ট স্ট্যাটাস এনে দিল। গ্র্যান্ড প্রাইজটা না পেলেও এক্সিলেন্স প্রাইজ জেতা কাইবা আর তার প্রতিগামী কেমোনোজুমে সমালোচকদের বাহবাটাও পেল।
কিন্তু ইউয়াসা ততোদিনে মাত্র হাত মকশোয় ব্যাস্ত ছিলেন। ২০১০ সালে তোমিহিকো মরিমির উপন্যাস অবলম্বনে বানালেন তার এখন পর্যন্ত সবচেয়ে জনপ্রিয় ও শ্রেষ্ঠ কাজ – ইয়োজোহান শিনওয়া তাইকেই – তাতামি গ্যালাক্সি!

আমাদের মূল চরিত্র কলেজ ড্রপ আউট। তার নাম আপাতত না জানলেও চলবে। মূল চরিত্র যুবক এক মধ্যরাতে রামেন স্ট্যান্ডে খেতে গেলে তার সাথে সাক্ষাত হল স্বঘোষিত এক “বিবাহের দেবতা”-র সাথে। দুই বছর আগে “রোজ-কালার্ড” সময়ের স্বপ্নে বিভোর হয়ে কলেজ জীবনে পদার্পণ, কিন্তু বাস্তবে পদেপদে ব্যার্থতায়
বিধ্বস্ত, নস্টালজিয়ায় দগ্ধ আর হয়ত বা স্থান-কালের পরবাস্তবতায় অভিভূত যুবক তখন শুরু করে তার বিগত দুই বছরের স্মৃতিচারন। যার অংশ এক বিচিত্র বন্ধু, এক সিনিওর বড় ভাই, এক জুনিওর ইঞ্জিনিয়ারিং ইস্টুডেন্ট আর “বিবাহের দেবতা” নিজেই! আর পুরো অ্যানিমে জুড়েই তারা ফিরে আসবে ভিন্ন আঙ্গিকে, চরম বৈচিত্র্যে…বারবার। কাহিনী এর থেকে বেশি না জানাটাই শ্রেয়।
আচ্ছা তাতামি গ্যালাক্সীর মূল চরিত্রের নামে আসা ফিরে আসা যাক। তা না জানলেও চলবে কারণ আসলে অ্যানিমে/উপন্যাস কোন জায়গায়ই সেটার উল্লেখ নেই! আর এটাই গল্পের ন্যারেটিভের সবচেয়ে চমতকার দিক – উত্তম পুরুষে বর্ণণা! ১১ পর্বের অ্যানিমে, যেখানে স্মৃতিচারক হিসেবে প্রতিটি ঘটনায়ই মূল চরিত্র উপস্থিত, সেখানে একবারও তার নামের উল্লেখ নেই, আর তা “ওয়াতাশি(আমি)”-তেই সীমাবদ্ধ। উপন্যাসীয় গল্প বর্ণণার ছাপ স্পষ্ট।

10455125_783679804997172_1716562847502976753_n

এর প্রেক্ষিতে আরেকটি ব্যাপারও না বললেই নয়। ইউয়াসা অরিজিনাল ক্রিয়েশনে(কাইবা) যেমন সিদ্ধহস্ত তেমনি সোর্সের অ্যাডাপটেশনে নিজের ছাপ রেখে যাওয়া কিন্তু একই সাথে সোর্স ম্যাটেরিয়ালের অরিজিনালিটি বজায় রাখাতেও সমান পারদর্শী(তাতামি, মাইন্ডগেম, পিং পং)। তবে তা শুধু পারফেক্ট এক্সিকিউশনেই সীমাবদ্ধ না। সকল বিনোদন মাধ্যমে দেখা যায় ৯০% ক্ষেত্রে কোন অ্যাাডাপটেশন তার সোর্সের সম্পুর্ণ মহাত্ব ফুটিয়ে তুলতে পারে না। সেখানে চমতকার সব কাহিনীর সোর্সের অসাধারনত্বকে ছাড়িয়ে যাওয়ার একটা বদঅভ্যাস ইউয়াসার মাঝে বিদ্যমান।

আর এখানেই তার সেই নিজস্ব “ছাপ রেখে যাওয়া”। প্রথমত অবশ্যই সেই “বাচ্চাদের আঁকা” আর্ট স্টাইল, ইউয়াসা আর্ট স্টাইল – ফ্রি ফ্লোয়িং, ফ্লেক্সিবল আর পাগলাটে – তার বানানো সব অ্যানিমেগুলোর জন্য এর থেকে আলাদা আর কিছু হয়ত চিন্তাও করা যায় না।
ভিজুয়ালাইজেশন, মোটিফ আর বিজিএমের সুনিপুন ব্যবহার। বিশেষ করে কাইবার ওএসটিটা শুনে দেখতে পারেন। এরকম ঘোরলাগা, জেঁকে ধরা শান্তিময় বিষণ্ন ওএসটি খুব বেশি পাবেন না।
সাধারণ সব দৃশ্যকে অসাধারন করে দেখানোর অনন্যসাধারন ক্ষমতা – তার সিনেমাটোগ্রাফি আপনাকে বারবার মুগ্ধ করবে।

সবার সবকিছু ভালো না লাগাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু শুধু আর্টস্টাইলের জন্যই যদি তাতামি গ্যালাক্সী আর পিং পং -এর মত অ্যানিমে আপনার ড্রপলিস্টে পরে তাহলে বলতে হয় খুবি দুর্ভাগ্য। বর্তমান সময়ের অন্যতম সেরা এবং প্রতিভাবান অ্যানিমে পরিচালকের আন্ডাররেটেড আর আন্ডারএপ্রিশিয়েটেড একগুচ্ছ অ্যানিমে থেকে নিজেকে বঞ্চিত করা মানুষের বিশাল তালিকায় নিজের নামটাও যোগ করলেন শুধু।

তাতামি গ্যালাক্সি(২০১০)
পর্ব সংখ্যা: ১১
ব্যাপ্তি: ২৩ মিনিট/পর্ব
মূল: তোমিহিকো মোরিমি
পরিচালক: মাসাকি ইউয়াসা
প্রযোজক: ম্যাড হাউস
মাই,অ্যানিমে,লিস্ট রেটিং: ৮.৫৮(#৭০)
আমার রেটিং: ৮৮/১০০

* শুধু তাতামি গ্যালক্সীর রেকমেন্ডেশন লেখতে বসলেও, বাকিগুলোর কথা না বললে সেগুলোর অপমানই হয়।

মাইন্ডগেম(২০০৪): এরকম ইনোভ্যাটিভ অ্যানিমে মুভি আর একটাও পাবেন না। শেষ ২০ মিনিটে আপনার টেস্টোস্টেরোন আকাশচুম্বী না হলে বলতেই হবে আপনি জীবনে অনেক বেশিই রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার সম্মুক্ষীন হয়েছেন। ৮৫/১০০

কাইবা(২০০৮-১২ পর্ব): সাইফাই রোমান্সের এমন মেলবন্ধনে শুধু স্টাইনস;গেইটৈ হয়ত এর সাথে তুলনীয় হতে পারে। ৮৬/১০০

পিং পং(২০১৪-১১ পর্ব): পিং পং ‘খেলা’ নিয়ে অ্যানিমে। কিন্তু স্পোর্টস জনরার চেয়েও বেশি কিছু। ৮৩/১০০(আপাতত)