আকাগামি নো শিরায়ুকি-হিমে [মাঙ্গা রিভিউ] — Fatiha Subah

Akagami no Shirayuki-hime 1

আকাগামি নো শিরায়ুকি-হিমে
ইংরেজি নামঃ রেড-হেয়ারড স্নো হোয়াইট
জানরাঃ হিস্টোরিক্যাল, ফ্যান্টাসি, শৌজো, রোমান্স, ড্রামা
অবস্থাঃ চলমান
চ্যাপ্টারঃ ৭৪+
মাঙ্গাকাঃ আকিযুকি সোরাতা
মাইআনিমেলিস্ট রেটিং: ৮.৪১
ব্যক্তিগত রেটিং: ১০/১০

রূপকথার গল্প কার না ভালো লাগে? এমন কাউকে বোধ হয় খুঁজে পাওয়া যাবে না যে ছোটবেলায় রূপকথার গল্প পড়ে, শুনে কিংবা দেখে বড় হয়নি। সে সময় রাজকন্যা, রাজপুত্র, রাজা, রাণী, রাজপ্রাসাদের গল্পগুলো কতই না আকর্ষণীয় লাগত। শিশুমনের কল্পনার রাজ্যে এগুলোই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে থাকত। তবে ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠার পর সেই আকর্ষণটা আর তেমন থাকে না। এসব বর্তমানে অলীক ব্যাপার নিয়ে কল্পনার রাজ্যে গা ভাসানোর জন্য যে আমরা খুব বড় হয়ে গেছি! ওসব আর মানায় না। তবু বুকের গভীরে কোথাও হয়ত সেই ভালোলাগাটা রয়েই যায়। ছোট কাউকে গল্পের বই পড়তে দেখলে এখনো স্মৃতিকাতর করে তুলে। তবে যদি এমন এক রূপকথার গল্প পাওয়া যায় যা এই বয়সেও সমানে আপনার আকর্ষণ ধরে রাখতে পারে তাহলে নিশ্চয়ই মন্দ হয় না। আর মানের দিক থেকে তা যদি হয় আর দশটা সাধারণ গল্পের চেয়েও ভালো তাহলে তো সোনায় সোহাগা! এমনই এক রূপকথার মাঙ্গা আকাগামি নো শিরায়ুকি-হিমে।

তানবারুন রাজ্যে বাস করে শিরায়ুকি নামের এক মেয়ে। শিরায়ুকির চুল লাল বর্ণের যা অনেক বিরল। এই বিরল চুলই বিপক ডেকে আনে শিরায়ুকির জন্য। তানবারুনের পাগলাটে স্বভাবের রাজপুত্র রাজি লালচুলো শিরায়ুকির কথা জানতে পারে। তাকে প্রস্তাব দেয় কনকিউবাইন হবার। কিন্তু শিরায়ুকি যে কারো হাতের পুতুল নয়। স্বাধীনচেতা শিরায়ুকি নিজেকে রাজপুত্রের হাতে সঁপে দিতে রাজি নয়। সে বেঁচে থাকতে চায় নিজের মত করে। তাই সে এই বিপদ ডেকে আনা লম্বা লাল চুল কেটে ফেলে তার নিজের দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায় পাশের রাজ্য ক্লারিনেসে। সেখানে গভীর বনে দেখা পায় তারই সমবয়সী এক তরুণ ছেলে যেনে্র। সাথে যেনের দুই সঙ্গী মিতসুহিদে আর কিকি। শুরুতে সদাসতর্ক থাকা যেনের সাথে শিরায়ুকির সাথে ঝামেলা বাঁধলেও আস্তে আস্তে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তবু লাল রঙ যেন তার ভাগ্যের পিছু ছাড়ে না। শিরায়ুকির উদ্দেশ্যে রাজপুত্র রাজির পাঠানো আপেল খেয়ে বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হল যেন্। এখন যেনকে কিভাবে বাঁচাবে শিরায়ুকি? আর যেনে্র আসল পরিচয়ই বা কি? কি করছিল সে এই গভীর বনে?

শুরুর দিকে গল্পটি শিরায়ুকি আর যেনে্র দৈনন্দিন জীবন নিয়ে চলতে থাকে। শিরায়ুকির নিজের পায়ে দাঁড়ানোর দৃঢ় ইচ্ছা আর যেনে্র সাথে তার সম্পর্কের অগ্রগতিই থাকে গল্পের মূলবিন্দু। শুধু এতটুকুর জন্যেই মাঙ্গাটি চালিয়ে নেওয়া যায়। তবে একটু একটু করে আরো নতুন জিনিস যোগ হতে থাকে। ছোট ছোট ঘটনাগুলোকে আর্কে ভাগ করে নেওয়া যায়। এরপর থেকেই গল্পটি পরিপূর্ণ রূপ পায়। যেনে্র সাথে শিরায়ুকির সম্পর্কটার জন্যেই অন্তত মাঙ্গাটির একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য রয়েছে যেখানে গল্পটিকে পৌঁছাতে হবে। তাই বর্তমানে মাঙ্গাটি খুব সুন্দরভাবে আগাচ্ছে। কাহিনী দিনকে দিন আরো জমজমাট হয়ে উঠছে।

Akagami no Shirayuki-hime 2

আকা-শিরাকে অনন্য করে তুলেছে এর প্রতিটি চরিত্র। অবশ্যই এক্ষেত্রে সবার আগে শিরায়ুকির কথা বলতে হয়। শিরায়ুকি খুব ভালো, নম্র, ভদ্র একজন মেয়ে। কিন্তু তাই বলে সে সাধারণ শৌজো নায়িকাদের মত স্যাকারিন দেওয়া মিষ্টি মেয়ে না যে অল্পতেই প্রতারিত হবে আর ভেঙ্গে পড়বে। শিরায়ুকিকে রক্ষা করার জন্য আক্ষরিক অর্থেই রাজপুত্র আছে। কিন্তু সে কখনোই তাদের সাহায্যের অপেক্ষায় থাকে না। কারো কাছেই সে মাথা নোয়াবার নয়। নিজের জীবনের পথ সে নিজে বেছে নিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তবে শিরায়ুকির অন্য একটি দিক আমার তার চেয়েও বেশি ভালো লেগেছে। এখানে অন্য কোন মেয়ে হলে নিশ্চিত কোন এক সময় যেনকে বাংলা সিনেমার মত করে বলত ‘কিন্তু আমাদের সামাজিক অবস্থান যে যোজন যোজন দূরে। আমাদের এ সম্পর্ক কেউ মেনে নেবে না। না, আমি আর এ সম্পর্ক আগাতে দিতে পারি না। তুমি আমাকে ছেড়ে দাও যেন। তাহলে তুমি ভালো থাকবে!!’। শিরায়ুকি এ ধরণের কথাবার্তা কখনো বলেনি এবং সামনেও বলার সম্ভবনা নেই। তার মানে এও না যে সে নিজের সামাজিক অবস্থান ভুলে গিয়ে দাম্ভিকতার পরিচয় দিয়েছে। বরং সে তার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে এমন এক জায়গায় পৌঁছুতে চায় যাতে একদিন সে যেনে্র পাশে দাঁড়াতে পারে। তার হয়ত টাকাপয়সা, সামাজিক মর্যাদা বা জৌলুস নেই কিন্তু বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগিয়ে সে ঠিকই ওপরে উঠে আসে।

বাকি চরিত্রগুলোও কেউ কারো চাইতে কম যায় না। রাজপুত্র, প্রভু, ছোট ভাই বা প্রেমিক যেকোন ভূমিকাতেই যেন্ উয়িস্তালিয়া অনেক আন্তরিক, দায়িত্বশীল আর চিন্তাশীল। সেক্ষেত্রে ওবি একজন রহস্যময় ভৃত্য হলেও যেনে্র কাছে হেরে যায়নি। যেন্ এবং সবাইকে নিয়ে সবসময় দুষ্টামি করা কিন্তু বিশ্বস্ত ওবি বরং জনপ্রিয়তার দিক থেকে অনেক উপরেই আছে। কোন এক ব্যাখাতীত কারণে ওবিকে একটু বেশিই ভালো লাগে। মিতসুহিদে আর কিকির মজার অগ্রগতি দেখার জন্যেও অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করবেন। এই দলটার বাইরে আছে রাজপুত্র ইযানা। শুরুতে আমি শিরায়ুকি আর যেনে্র পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়াবে ভেবে ইযানাকে একটুও পছন্দ করিনি। কিন্তু মাঙ্গা যত এগিয়েছে তত বুঝেছি ইযানা আসলে কেমন মানুষ। সে কি পদক্ষেপ নিচ্ছে আর কেন নিচ্ছে তা বুঝতে পারার পর ইযানাকে তারিফ করতেই হয়। আসলে এখানে অপছন্দ করার মত এমন কোন চরিত্র নেই। আর রাজপুত্র রাজি? ধীরে ধীরে তার মাঝে এতটাই পরিবর্তন আসে যে তাকে নিয়েও আর হাসাহাসি করা যায় না।

আকা-শিরার আর্ট খুব বেশি সুন্দর। আনিমেতে মাঙ্গার একই আর্ট ব্যবহৃত হয়েছে। অ্যানিমেশন যথেষ্ট সুন্দর ছিল। তাও মাঙ্গাতে আর্ট দেখতে আনিমের চেয়ে অনেক গুণ বেশি সুন্দর লাগে। আর্ট দেখলে শুধু আর্টের জন্যেই মাঙ্গা পড়তে ইচ্ছে হবে। আকা-শিরাতে এর নিজস্ব জগতটার জন্য মাঙ্গাকা নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের বাড়ি-ঘর আর পোশাক-আশাকের নকশা করেছেন। এই দিকটি চোখে পরার মত।

এই মাঙ্গাটি এত বেশি ভালো আর নিখুঁত যে এতে দোষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। সমস্যার মধ্যে একটি রাজপ্রাসাদে যত সৈন্যসামন্ত, চাকর-বাকর আর হোমরাচোমরা ব্যক্তিদের ব্যস্ত চলাফেরা দেখা যাওয়ার কথা তা দেখা যায় না এটাই উল্লেখ করা যায়। সেই তুলনায় রাজপ্রাসাদ পুরা ফাঁকা ফাঁকা লাগে। কেউ কেউ রাজপরিবারের কথাও বলতে পারে। যেন আর ইযানা ছাড়া রাজপরিবারের কাউকে দেখা যায় না। কিন্তু সেটা শুধু শুরুতে। মাঙ্গা যত এগিয়েছে তত নতুন সব চমক এসেছে। কিন্তু পরে গিয়ে রোমান্স আগে যা ছিল তার চেয়ে অনেক কমে যায়। অনেকেই এটা নিয়ে অভিযোগ করে। তবে আমার মতে এভাবে শুধু মিষ্টি প্রেমের গল্পকে কেন্দ্র না করে বরং বাস্তবধর্মীভাবে কাহিনী আগাচ্ছে। এতে মাঙ্গাটি আরও বেশি সমৃদ্ধ হয়েছে।

এর আনিমের দ্বিতীয় সিজনটি কিছুদিন আগেই শেষ হল। দুটি সিজনই বেশ ভালোভাবেই মাঙ্গাকে অনুসরণ করেছে। তবু একজন মাঙ্গাপড়ুয়া হিসেবে মনে হয়েছে কিছু একটা নেই। আর দ্বিতীয় সিজন যেখানে শেষ ওখানেই আরও চমকপ্রদ সব ঘটনার শুরু। তাই আনিমে যাদের ভালো লেগেছে তাদের জন্য মাঙ্গা পড়া অত্যাবশ্যক। তবে আনিমেতে মাঙ্গার চ্যাপ্টার আগাপিছা করে অনেক চ্যাপ্টার মিলে একেকটি পর্ব বানান হয়েছে। তাই কোথা থেকে মাঙ্গা শুরু করা উচিত এটা বলা কঠিন। আনিমের শেষ পর্বটি ছিল চ্যাপ্টার ২৯, ৩০ থেকে। তবে চ্যাপ্টার ৩১, ৩২ থেকে আগেই আনিমে বানান হয়েছে। চ্যাপ্টার ৩৩-এ এরপরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ শুরু। তাই ওখান থেকেই শুরু করতে পারেন।

প্রতিটি জানরারই কোন কোন সিরিজ থাকে যা ওই জানরার সচরাচর সিরিজগুলোর থেকে আলাদা এবং অসাধারণ হয়। আকাগামি নো শিরায়ুকি-হিমে এমনই একটি মাঙ্গা। তথাকথিত জীবনের টুকরা শৌজো মাঙ্গা থেকে এই রূপকথার মাঙ্গা অন্য স্তরের। আনিমে আসার আগ পর্যন্ত এটি ছিল মাঙ্গা জগতের লুকান রত্ন। এখন আর চোখের আড়ালে না থাকলেও রত্নই রয়েছে। তাই সুযোগ পেলে অবশ্যই একবার এই কল্পনার রাজ্যে ডুব দিয়ে আসতে পারেন।

Akagami no Shirayuki-hime 3