91 Days(২০১৬)
★★★★☆
পরিচালনাঃ কাবুরাকি হিরো(Tonari no Kaibitsu-kun, Kimi ni Todoke, Hoozuki no Reitetsu)
মৌলিক গল্প
পর্ব সংখ্যাঃ ১২
জনরাঃ অ্যাকশন, ড্রামা, হিস্টোরিকাল
প্রযোজনাঃ স্টুডিও শুকা(Durarara x2, Natsume Go)
১৯২০; আমেরিকায় প্রোহিবিশন এরার শুরু। ১৮তম সংশোধনীর প্রেক্ষিতে “ড্রাই ক্রুসেডার”-দের নেতৃত্বে দেশজুড়ে অ্যালকোহলিক পানীয়ের তৈরি, আমদানী, পরিবহন কিংবা বিক্রি নিষিদ্ধ করে দেওয়া হলো। পন্য খোলাবাজারে নিষিদ্ধ হওয়া মানে স্বভাবতই তার জায়গা হলো কালোবাজারে। আর তখন পর্যন্ত মাফিয়াদের মূল ব্যবসা পতিতালয় আর জুয়াড় আসরকে ফেলে প্রথম স্থান দখল করলো মদ্যপানের চালান। যার কাছে যত স্থায়ী, শক্তিশালী পানীয়ের মজুত, তাদের হাতেই শহরের দায়িত্ব!
ল’লেস, ইলিনয়। নামের স্বার্থকতা রক্ষার্থেই তাতে আইনের কোন বাধা ধরা নেই, অন্তত প্রচলিত অর্থে। বরং এখানকার আইনের বিধানকর্তা তার মাফিয়া পরিবারগুলো – ভানেত্তি আর অর্কো। তার ব্যাত্যয় ঘটলেই লাশ পরা সুনিশ্চিত; দিন-রাতে, খোলা রাস্তায়, পাব, নিজের ঘরে। ‘পরিবার’-কথাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই পরিবারের জন্যই ভানেত্তি পরিবারের অংশ অ্যাঞ্জেলো লাগুসা ছোটবেলায় বাবাকে খুন হতে দেখলো তার বাবার নিজের বন্ধু ভিনসেন্ট ভানেত্তির হাতে। সাথে তার মা আর ছোটভাইকেও – পুরো পরিবার একসাথে! ভাগ্যক্রমে একমাত্র বেঁচে যাওয়া অ্যাঞ্জেলো সাতবছর পর ফিরে আসলো ল’লেস-এ। প্রতিশোধের নেশায়, ব্রুনো আভিলিও ছদ্মনামে। এই ভানেত্তি পরিবারের ঢুকে যেতে। ভেতর থেকে একে একে খুন করতে, তালিকা ধরে, যারা খুন করেছিলো তার পরিবারকে। তার প্রবেশপত্র? ল’লেস হেভেন, শহরের সেরা মদ। যার প্রস্তুতকারক তার বাল্যকালের বন্ধু কর্তেও।
৭ বছর অপেক্ষার পর অ্যাঞ্জেলোর – আভিলিওর…৯১ দিনের শীতল প্রতিশোধ পরিবেশনের গল্প!
আমেরিকা আর ত্রিশের দশক, মাফিয়া, প্রতিশোধ গল্প – কোন অ্যানিমের আগে বরং স্করসেসি[১] কিংবা কোপোলার[২] চলচ্চিত্রের কথাই মাথায় আসার কথা সবার আগে! এবং তারপর যখন দ্বিতীয় পর্বে শিকাগোর গালাসিয়া পরিবারের রোনালদোর সাথে ভিনসেন্টের মেয়ে ফিও ভানেত্তির বিয়ের অনুষ্ঠানে অ্যাঞ্জেলো উপস্থিত হয়, নাচের দৃশ্য আর ভেতর অন্ধকার রুমে বসে থাকা ভিনসেন্ট ভানেত্তিকে দেখে ডন কর্লেওনি(Godfather[৩]) ভেবে ভুল হওয়া অস্বাভাবিক না। অথবা টাইটল স্ক্রিনের লোগোটার কথাই ধরা যাক। হেনরি হিলের(Goodfellas[৪]) মত সিসেরোর…না, না, কস্টিগানের(The Departed[৫]) মত কস্তেওদের সাথে অ্যাঞ্জেলোর মিশে যাওয়া! 91 Days এর অনুপ্রেরণা তো কোপোলা আর স্করসেসিতেই। এবং গল্পবর্ণনাতেও এই প্রভাব লক্ষনীয়। পর্বে পর্বে ক্লিফহ্যাঙ্গার আর একের পর এক অননুমেয় গল্প উপাদান, টিভি সিরিজের তুলনায় বরং সাড়ে চার ঘন্টার একটার মুভির সাথেই একে তুলনা করা যায়।
আর অ্যাঞ্জেলোর যাত্রাটা শুধু ক থেকে চন্দ্রবিন্দুতে গিয়েই শেষ না, নিজের অজান্তেই ল’লেস-এর অন্ধকার মাফিয়া জগতের মাকড়সার জালে ধীরে ধীরে পেঁচিয়ে যাওয়ায়। লম্বা সময় ধরে মিথ্যা অভিনয় করতে থাকো, সেটা একসময় বাস্তবতা হয়ে দাঁড়াবে। অ্যাঞ্জেলোর রেইসন দে’ত(Raison d’etre), বেঁচে থাকার একমাত্র অনুপ্রেরণা এই প্রতিশোধই, আর সেটা ছাড়া সে যেন এক অন্তস্বারশুন্য খোলের মত। সেও অংশ হয়ে যায় ল’লেস-এর মাফিয়া যুদ্ধে। লাল পানি আর রক্তের খেলায় – প্রতিশোধ সেখানে মধ্যবিরতির আকর্ষন কেবল। কাটা পরতে থাকে তালিকার বাইরের অনেক নামও।
গল্পের মূলচরিত্র, কিন্তু অ্যাঞ্জেলোর মাথার ভেতরে কখনো আমরা ঢুকতে পারি না, তার মনোলোগের অংশ হই না, কিংবা জানিনা তার পরবর্তী পরিকল্পনা কী। প্লেহাউসের উপর তলায় বসে কোন অপেরার মত অ্যাঞ্জেলোর এই অভিনয় আমরা দেখি বাইরে থেকে। গল্পের মূলচরিত্র, কিন্তু কোন পর্যায়েই অ্যাঞ্জেলো গল্পের ‘নায়ক’ না, বরং ফিল্ম-নয়ারের নিয়ম মেনে আর বাকিসব চরিত্রের মতই অ্যাঞ্জেলোর বিবেকবিচার আর কার্যক্রম প্রশ্নবিদ্ধ। এটাই গল্পের অননুমেয়তা আর বিষ্মিত করার প্রধান অস্ত্র। কস্টিগানের মত অ্যাঞ্জেলোর এই অভিনয় ‘খেলার’ পেছনে কোন ‘গ্রেটার গুড’ নীহিত নেই। তার পুরো যাত্রাটাই ব্যক্তিগত, স্বার্থপরতার। একাকীত্বের।
কস্টিগান – অ্যাঞ্জেলোর এই প্রতিশোধ চক্রের ব্যাসের অপর পাশেও একজন কলিন আছে – নেরো ভানেত্তি, ভিনসেন্টের ছেলে। নেরো বরং অ্যাঞ্জেলোর চেয়ে আরো বেশি জীবন্ত এক চরিত্র। অ্যাঞ্জেলোর প্রতিশোধ তালিকায় কাটা যেতে থাকা নামের সংখ্যা বাড়তে থাকার মানে হলো তার পরিচিতদের মৃত্যুর তালিকা ক্রমাগত বড় হওয়া। তবে এই তিনমাসের গল্প নেরোর জীবনটা উল্টেপাল্টে যাওয়ার, অ্যাঞ্জেলোর সাপের মত আষ্টেপৃষ্ঠে ধরা পরিকল্পনার কেন্দ্রে তো সে নিজেই! তার ছলচাতুরির ফাঁদে পরা সবচেয়ে বড় শিকার। তার দাবার গুটির শেষ পর্যন্ত টিকিয়ে রাখা স্যাক্রিফাইসিং পন। বরং নেরোকেই গল্পের ট্র্যাজিক হিরোর উপাধি দেওয়া যায়। তার অভিনয়টা অবশ্য তিনমাসের জন্য না, সারাজীবন ধরে চলা। বারুদ আর রক্তের গন্ধ। বিশ্বাসঘাতকতা আর অবিশ্বাসের এক জগতে। পরিবারের সাথে মিশে যাওয়ার…টিকে থাকার জন্য। পরিবারের জন্য। তার যাত্রাটা সম্পূর্ণ বিপরীত – আত্নবিসর্জনের। তবে একাকীত্বেরও!
স্করসেসির মাফিয়াদের মত অ্যাঞ্জেলোর জীবনটা অবশ্য অতটা অবশ্য জাঁকজমকের না, অনেক বেশি গ্রাউন্ডেড। তার পতনটা যে অনিবার্যতায় ঘেরা। 91 Days-এর পরিবেশনাও সাধারণ। বেশিরভাগ সময় আবহসঙ্গীতবিহীন, জ্যাজ আর অর্কেস্ট্রা সেখানে প্রবেশ করে কদাচিৎ। বরং তার স্থানে জায়গা করে নেওয়া বাইরের যান-বাহন আর কোলাহলের শব্দ ল’লেস-এর মাফিয়াদের বাইরেরও আলাদা সাধারণ জীবনটা সম্পর্কে জানান দেয়। রক্তপাত, বিশ্বাসঘাতকতা আর ছলচাতুরিবিহীন, আসলেই পরিবারের সাথে একসাথে থাকা এক জীবন।
কিন্তু উপরতলার বিধান কর্তাদের সেখানে প্রবেশ করা নিষেধ। প্রতিশোধের নেশায় পাগল হওয়া মানুষদেরও।
১ – [https://en.wikipedia.org/wiki/Martin_Scorsese]
২ – [https://en.wikipedia.org/wiki/Ford_coppola ]
৩ – [https://en.wikipedia.org/wiki/The_Godfather]
৪ – [https://en.wikipedia.org/wiki/The_Departed]
৫ – [https://en.wikipedia.org/wiki/Goodfellas]


