মিলেনিয়াম একট্রেস ও একটি জাতির পুনর্জন্ম — Fahim Bin Selim

[সহযোগ
কন আর্ট – স্বপ্ন, বিভ্রম আর চলচ্চিত্রের প্রতি প্রেমপত্র: http://www.animeloversbd.com/satoshi-kon-fahim-bin-selim/]
 
তাইওয়ানিয় চলচ্চিত্র নির্মাতা এডওয়ার্ড ইয়াং-এর ২০০০ সালের চলচ্চিত্র Yi Yi-এর এক পর্যায়ে এর অন্যতম চরিত্র পাঙ্গজি বলে, “[…]we live three times as long since man invented movies.”
চিয়োকো ফুজিওয়ারা বেঁচে থাকলো এক সহস্রাব্দ – জীবন, স্মৃতি আর চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে – সেনগোকু কাল থেকে দূর ভবিষ্যৎ পর্যন্ত; যে সময়টায়, চন্দ্রমাসের চতুর্দশ দিন হোক আর পঞ্চদশ, চাঁদের পুরোটা জুড়েই মানুষের পদচারণা, আর অসীম মহাকাশের দিকে যাত্রা শুরুর জন্য তার উপর তৈরি পদ্মাকৃতির ঘাঁটি।
কোনো কোনো পদ্মফুল বেঁচে থাকতে পারে হাজার বছর। ঠিক যেমনটা জাপানিরা বিশ্বাস করে লালচাঁদি বা মাঞ্চুরিয়ান সারসের ক্ষেত্রে। তাই তো সারস নকশার কিমোনো জড়িয়ে জন্ম চিয়োকোর, ১৯২৩-এর বৃহৎ কান্টো ভূমিকম্পের সময়। ভূমিকম্পের সাথে জাপান আর চিয়োকোর যোগসূত্র চিরকালের। তার বাবার মৃত্যুও এসময়টায়। চিয়োকো বলে, একজনের জীবনের পরিবর্তে যেন আরেকজনের জন্ম।
 
 
চিয়োকোর তখনো বাইরের বিশ্বের সাথে সংযোগ হয়নি। ম্যাগাজিনের পাতায় নায়ক-নায়িকাদের ছবি দেখে অপার মুগ্ধতায় ডুবে থাকে। এই কৈশোরেই তার সাথে পরিচয় মুখে-ক্ষতওয়ালা একজন সেনার কিংবা একটি রাস্ট্রের, মাথায় টুপি-পড়া নাম-না-জানা একজন বিদ্রোহীর কিংবা একটি আদর্শের; আর প্রথম ভালোবাসার। তবে জাপান সাম্রাজ্যের কাছে তখন ভালোবাসার একমাত্র সংঙ্গা জাতীয়বাদ। আর তার একমাত্র লক্ষ্য সম্প্রসারণ। তারই প্রেক্ষিতে ১৯৩১-এ চীনের শাসনাধীন মাঞ্চুরিয়া দখল করে বসানো হলো মাঞ্চুকুয়ো পুতুল রাস্ট্র। শুরু হলো দ্বিতীয় চীন-জাপান যুদ্ধ। কোরীয় উপদ্বীপ আর দক্ষিণ মাঞ্চুরিয়ার রেল-এলাকা আগে থেকেই তাদের দখলে ছিলো। মাঞ্চুরিয়ার সাধারণ মানুষের উপর চালানো হলো নিপীড়ন; ভাগ্য ভালো থাকলে তাদের জোরপূর্বক শ্রমে কাজে লাগানো হবে, ভাগ্য খারাপ থাকলে হতে হবে জৈব-রাসায়নিক গবেষণার বস্তু। এখানেই বসানো হলো মাঞ্চুকুয়ো ফিল্ম এসোসিয়েশন, আর তার অধীনে নির্মিত হতে শুরু করলো সব প্রোপাগান্ডা চলচ্চিত্র। জাতীয়তাবাদের সুরায় তখনও নেশাগ্রস্থ সাধারণ জাপানিরা।
 
 
ভালোবাসার আশায় সেখানেই পদার্পণ চিয়োকোর। সময়ে সময়ে তার অভিনীত চলচ্চিত্র, স্মৃতিতে থাকা মাঞ্চুরিয়ার জীবন আর গেনিয়ার কাছে দেওয়া সাক্ষাৎকার – তিন স্তরের আখ্যান যেন একসাথে মিশে যায়। বিদ্রোহীর খোঁজে উত্তরের রেলযাত্রায় চিয়োকোর প্রথম দেখা মিলে প্রতিরোধশক্তির – দেশরক্ষায় ঝাঁপিয়ে পড়া চৈনিক সৈন্যদল। “জাতীয়তাবাদী নাকি সাম্যবাদী?” একজন যাত্রী জিজ্ঞেস করে। জীবনমরণের প্রশ্নে সেটায় কীইবা তফাত! দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে সময়। নানকিং, ওকিনাওয়া কিংবা হিরোশিমা-নাগাসাকি তখনো লাশের ভাগাড়ে পরিণত হয়নি।
 
সবশেষে পড়ে রইলো একটি বিধ্বস্ত বিশ্ব। আর একটি বিধ্বস্ত জাতি। সেই জাতির ফিরে আসার অবলম্বন হলো চলচ্চিত্র। গেনিয়ার স্বগোতক্তি,পঞ্চাশের দশক চিয়োকোর সেরা সময়। জাপানের চলচ্চিত্রেরও তো স্বর্ণযুগ এটাই। যুদ্ধপরবর্তী বাস্তবতায় একদল তরূণ আর মাঝবয়সী লোক নেমে পড়লো ক্যামেরা হাতে – কেঞ্জি মিযোগুচি, মাসাকি কোবায়াশি, আকিরা কুরোসাওয়া, মিকিও নারুসে, ইয়াসুজিরো ওযু – জাপানের বর্তমান আর অতীত সেলুলয়েডে তুলে ধরতে। তা যত তিক্তমধুরই হোক। একটি জাতির টিকে থাকার আশা-আকাঙ্খা, অনুভূতি আর অনুতাপের সাথে বহির্বিশ্বের পূনর্পরিচয় হলো কুরোসাওয়া আর কোবায়াশিদের প্রতিটি শট, প্রতিটি ফ্রেমে। আর এই নতুন জাপানি চলচ্চিত্রের মুখপাত্র হলো অদম্য কিছু নারী চরিত্র। চিয়োকো তো বেঁচে রইলো তাদের মাঝেই।
 
সঙ্গী হয়ে আকিরা কুরোসাওয়ার সাথে যাত্রায় প্রাচীন জাপানে। কখনো সে যেন ইসুযু ইয়ামাদা, তাকে তাড়িয়ে বেড়ায় এক প্রেতাত্মা। আর দেওয়ালের রক্তের ছোপ। প্রতিশোধ আর প্রতিহিংসার। সে অবলোকন করে অন্ধবিশ্বাস আর ঔদ্ধত্য, বিশ্বাসঘাতকতা আর পতন। কখনোবা মিসা উয়েহারার মত ঘোড়সওয়ার হয়ে তার খুঁজে বেড়ানো বিদ্রোহীর, আর পেছনে সবসময় লেগে থাকা মুখে-ক্ষতওয়ালা সেই ব্যক্তির; ভিন্ন বেশে, ভিন্ন সময়ে, সবসময়। সেনগোকু, এদো, মেইজি – প্রেতাত্মার অথবা সময়ের চরকার অনবরত ঘূর্ণন, আর বারবার ফিরে আসা একই জায়গায়। যুদ্ধ-বিগ্রহ, ক্ষমতালোভ, আর রক্তের ধারা। যুগে যুগে শান্তির এক নিরন্তর খোঁজ।
 
আকিরা কুরোসাওয়ার Throne of Blood

 

 

লেডি আসাজি চরিত্রে ইসুযু ইয়ামাদা; আকিরা কুরোসাওয়ার Throne of Blood

 

 

প্রিন্সেস ইউকি চরিত্রে মিসা উয়েহারা; আকিরা কুরোসাওয়ার The Hidden Fortress

 

মিকিও নারুসের দৃষ্টিপাত বরং নিকট অতীত আর বর্তমানে – যুদ্ধ-পূর্ববর্তী এক গ্রামীন স্কুল কিংবা যুদ্ধ-শেষে টোকিওর ধ্বংসস্তুপ। যুদ্ধের ভয়াবহতা যে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে দেশের ভিতরেও চলে এসেছিলো। আকাশে ভেসে বেড়ানো কালো মেঘের ভেতর থেকে বর্ষণ হলো গুলি-বোমা। তা বিদায় নিলে আবার হাজির দূর্ভিক্ষ, বাস্তুহরণ আর বেকারত্ব। আর নিজভূমে থেকেও পরাধীনতার স্বাদ পাওয়া প্রথমবারের মত। রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো আমেরিকান সেনারা জানান দেয় সেই নতুন বাস্তবতার। সে সময়টায় চিয়োকো মাথায় জড়ায় হিদেকো তাকামিনের স্কার্ফ। ভাঙ্গা কাঠ আর জঞ্জালের নিচে হাতড়ে ফিরে স্মৃতি আর স্বপ্ন। গলায় তখনো ঝুলতে থাকে সেই আরাধ্য চাবি।

ওইশি-সেনসেই চরিত্রে হিদেকো তাকামিনে; মিকিও নারুসের Twenty-four Eyes

 

 

ইউকিকো কোদা চরিত্রে হিদেকো তাকামিনে; মিকিও নারুসের Floating Clouds

 

কারণ তবুও তো জীবন থেমে থাকে না। ইয়াসুজিরো ওযু তাই আসন গাড়েন মেঝেতে, ক্যামেরা সাজান এমনভাবে যাতে ধরা পড়ে পুরো ঘর আর তাতে থাকা সব মানুষ। বাইরের সব কোলাহলমুক্ত, অন্তত ব্যক্তিগত এই জায়গা-ই তো শেষ সম্বল। অতীতকে পাশে রেখে সামনে এগিয়ে যাওয়ার মন্ত্রণা দেন। সেৎসুকো হারার হাসি জায়গা নেয় চিয়োকোর ঠোঁটে। নাকি তার পুরোটাই দখল করে নেয়! তাই কি ষাটের দশকের মাঝ থেকে দুজনেই হারিয়ে গেলো লোকচক্ষুর আড়ালে?

নোরিকো চরিত্রে সেৎসুকো হারা; ইয়াসুজিরো ওযুর Late Spring

 

সে-ও তো অনেক বছর আগের কথা। সবার স্মৃতিতেই কিছুটা মরচে পড়েছে। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে কীভাবে! চিয়োকো যে পান করেছে অমরত্বের সুধা। ফিল্মের ফিতা আর গেনিয়ার মুগ্ধতায় চিয়োকোর প্রতিটি সংলাপ আর অভিব্যক্তি টিকে আছে আগের মতই। তাই গেনিয়া হাজির হলো চাবি নিয়ে। ধুলোর আস্তরণ সরিয়ে খুলে বসলো বাক্সটা আবার। চিয়োকো, জাপান, সাতোশি কনের নিজের কিংবা আমাদের স্মৃতির। মুখে-ক্ষতওয়ালা লোকটা এখনো বিদ্যমান; নতুন চরিত্র নিয়ে, নতুন জায়গায় দখলদারিত্ব আর সাম্রাজ্যবিস্তারের সেই পুরনো নাটকের মঞ্চায়ন।

তাই চিয়োকো বাড়ির পশ্চাতে জন্মায় তার অতিপ্রিয় পদ্মফুল। কর্দমাক্ত মাটিতে শিকড় গেড়েও সেগুলো যখন পানির উপর ভেসে উঠে তখন থাকে শ্বেতশুভ্র। শত ঘাত-প্রতিঘাতের পরও আদর্শ থেকে বিচ্যুত না হওয়ার দর্শন নিয়ে প্রস্ফুটিত যেন: মানবসভ্যতার অন্ধরূপের সাথে সাক্ষাতের পরও তার উপর আশা না হারানোর প্রতিজ্ঞা, মাঝেমাঝেই সেই আশা দুরাশা বলে সাব্যস্ত হলেও; জীবন আর মৃত্যুর অনন্ত চক্রে বিদ্রোহীর খোঁজে সময় আর কাল পাড়ি দেওয়ার সংকল্প, তার চেহারা এখন বিস্মৃত হলেও। মাঞ্চুরিয়া কিংবা দূর মহাকাশে। শান্তির খোঁজে। ভালোবাসার খোঁজে। পথচলাটাই মুখ্য।
আর সেই পুনর্জন্ম কিংবা নির্বাণের যাত্রায় চলচ্চিত্রের চেয়ে ভালো মাধ্যম আর কী হতে পারে?

কন আর্ট – স্বপ্ন, বিভ্রম আর চলচ্চিত্রের প্রতি প্রেমপত্র — Fahim Bin Selim

১৮ মে, ২০১০।

টোকিওর মুশাশিনো রেডক্রস হাসপাতালে সাতোশি কনের মৃত্যুপাঠ পড়ে শোনানো হল। সাথে ড্রিমিং মেশিন-এরও – স্ক্রিপ্ট আর ১৫০০ এর মধ্যে ৬০০ শট সম্পূর্ণ হওয়ার পরও – কারণ কাপ্তান কন তখন আর তার হাল ধরে থাকার মত অবস্থায় ছিলেন না – তাঁর দর্শন নিয়ে,  নির্দেশনাশৈলী নিয়ে – যে জাহাজ একমাত্র তিনিই সৈকতে ভেড়াতে পারতেন। তিনি যদিও আরও ৩ মাস বেঁচে থাকবেন, কখনো হাসপাতাল বিছানায়, কখনো নিজের বাসার; ক্যান্সারের আক্রমনে ক্রমাগত হার মানতে থাকা অগ্ন্যাশয় নিয়ে। একেবারে কাছের আত্নীয় আর সহকর্মী ব্যতীত বাকিদের কাছ থেকে এ খবর অজানা থাকবে একেবারে শেষ দিন পর্যন্ত।

এই টোকিওর মুশাশিনো আর্ট ইউনিভার্সিটিতেই সাতোশি কনের হাতেখড়ি, গ্রাফিক ডিজাইনিং এর উপর। যদিও তার জন্ম আর বেড়ে ওঠা হোক্কাইদোর সাপ্পোরোতে। ছোটবেলায় কনের সময় কাটতো ফিলিপ কে. ডিক(Blade Runner) আর ইয়াসুতাকা সুতসুই(The Girl Who Leapt Through Time, Paprika) এর সাই-ফাই উপন্যাস পড়ে, আর দেশী-বিদেশী চলচ্চিত্র দেখে – বিদেশীই বেশি। ১৯৭৪ সালে, কন খুঁজে পেলেন তাঁর পছন্দের দুইটি জিনিসের সংমিশ্রণ – সাইন্স ফিকশনের অবাধ্য কল্পনাশক্তি আর তার সাথে অ্যানিমেশনের চলচ্চৈত্রিক স্বাচ্ছন্দ্যতা, একই কাপে – স্পেস ব্যাটলশীপ ইয়ামাতোতে। সাতোশি কন অ্যানিমের প্রেমে পড়ে গেলেন।

 

অবশ্য তাঁর পেশাদারিত্বের শুরুটা হয়েছিলো মাঙ্গা দিয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই কনের প্রথম মাঙ্গা – Toriko(১৯৮৪) – কোদানশার তেৎসুয়া চিবা অ্যাওয়ার্ডে রানারআপের পুরস্কার পেয়ে গেল। সাথে তাঁর সুযোগ মিলল কাৎসুহিরো ওতোমোর(Akira, Patlabor, Memories) সহকারী হয়ে যাওয়ার। কন পরবর্তীতে শুধু মাঙ্গাতেই না, স্ক্রিপ্টরাইটার, অ্যানিমেশন ডিরেক্টর হিসেবে ওতোমোর বেশ কয়েকটি অ্যানিমে চলচ্চিত্রের কাজেও সহযোগী ছিলেন। যার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ১৯৯৫ এর তিনখন্ডের ওভিএ Memories-এর Magnetic Rose অংশ। কন তার প্রথম সিরিয়ালাইজড মাঙ্গা প্রকাশ করে্ন ১৯৯০ তে; Kaikisen – এর কাগজে কাগজে, সাদাকালোর কালির আঁচড়েও তার অসাধারণ সিনেমাটোগ্রাফির পরিচয় পাওয়া যাবে, যা পরবর্তীতে তার অ্যানিমে চলচ্চিত্রগুলোর অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হিসেবে পরিচিতি পায়।

027 028

আর এর প্রথমটি ১৯৯৭ এর Perfect Blue। ইয়োশিকাজু তাকেউরার উপন্যাস অবলম্বনে তৈরী এ চলচ্চিত্র প্রথমে হওয়ার কথা ছিলো লাইভ-অ্যাকশনে। পরে কনের হাতে দায়িত্ব পরে ম্যাডহাউজের হয়ে এর অ্যানিমেটেড ওভিএ তৈরি করার। কন দায়িত্ব নিলেন ঠিকই, কিন্তু কাহিনীর মূল অংশ – আইডল, স্টকার আর হ্যালুশিনেশন – কেবল ঠিক রেখে গল্পের পুরো কাঠামোই বদলে নিলেন নিজের মত। যাতে যোগ হল সেসময়কার ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা পেতে থাকা ইন্টারনেট। নিজের প্রিয় Slaughterhouse-Five বই থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে  Perfect Blue-র গল্প কন বললেন অনেকটা অসংযুক্ত আখ্যানে। যেখানে সময় কেবল সরলরৈখিক না, আর এতে দেখানো ঘটনাও ধ্রুবসত্য না। তা ব্যক্তি আপেক্ষিক। কল্পনা, স্বপ্ন, অবচেতন – সবই ব্যক্তির সময়ের অংশ, বর্তমান-এর অংশ।  পরবর্তী চলচ্চিত্রগুলোতেও যা ঘুরেফিরে এসেছে।

ma

ওভিএ হিসেবে না, ম্যাডহাউজ Perfect Blue-কে মুক্তি দিলো প্রেক্ষাগৃহেই। প্রথম চলচ্চিত্র দিয়েই কন পেয়ে গেলেন দেশি-বিদেশি সমালোচকদের প্রশংসা, । Perfect Blue ডাক পেল বিভিন্ন দেশের ফিল্ম-ফেস্টিভ্যালগুলোয় – পেল তাৎক্ষনিক কাল্ট ক্লাসিকের মর্যাদা আর চিরদিনের জন্য কালজয়ী সব সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার মুভিদের পাশে স্থান।

2

চলচ্চিত্র-প্রেমিক কনের প্রথম মুভিতেই তুলে আনলেন বিনোদন-জগতের অন্ধকার দিক। যদিও ঠিক সামাজিক-ভাষ্য প্রদান  বা সমালোচনা   কখনোই তার মূল উদ্দেশ্য ছিলো না। Perfect Blue নিয়ে কনের চিন্তাভাবনা, আর মূলচরিত্র মি্মা কিরিগোয়ের পতন নিয়ে বরং সমান্তরাল টানা যায় । গল্পে মিমা সাধারন এক পপ-আইডল থেকে যতই বিনোদন জগতের উপরের তলায় আরোহণ করতে থাকে – মানসিক আর শারীরিক বিভিন্ন ত্যাগ সহ্য করে – ততই তার কাছে চেতন আর অবচেতনের বিভেদ ভাঙ্গতে শুরু করে। তার আকাংক্ষিত স্বপ্নালোক বিভীষিকায় রুপ নেয়।

আমি যখন Perfect Blue এর কাজ শুরু করি তখন আমার উদ্দেশ্য ছিল ইতিবাচক কিছু বানানো। কিন্তু আমি যতই সামনে আগাতে থাকলাম, ততই  গল্পটা আরো নেতিবাচক হয়ে যাচ্ছিলো, আর গম্ভীর হয়ে যাচ্ছিলো। একদিক দিয়ে এটা নিয়ে আমি বেশ অসন্তুষ্ট ছিলাম। [১]

 

চলচ্চিত্রের প্রতি কনের ভালোবাসার প্রকাশ তার অন্য মুভিগুলোতেও বারবার ঘুরে ফিরে এসেছে(Tokyo Godfathers একমাত্র ব্যতীক্রম)। Paprika(2005)-‘র স্বপ্ন আর বাস্তবতা একাকার হওয়ার গল্পে নায়ক কানোকাওয়া পেশায় গোয়েন্দা হলেও, ছিলো ফিল্মস্কুলের ছাত্র। তাই তো তার ঘুমের মাঝে হানা দেয় যৌবনের অপূর্ণ বাসনা – নিজেকে সে আবিষ্কার করে তার প্রিয় চলচ্চিত্রগুলোর নায়কের ভূমিকায় – কখনো Tarzan-এ, From Russia With Love-এ, অথবা Roman Holiday-তে; কখনো বা আবার পরিচালক হওয়ার প্রচেষ্টায় ব্যার্থ কানোকাওয়া নিজেকে কল্পনা করে স্ব্য়ং আকিরা কুরোসাওয়ার জায়গায়!paprika5

তবে চলচ্চিত্রের প্রতি কনের অকৃত্রিম ভালোবাসার সবচেয়ে বড় নিদর্শন তার দ্বিতীয় চলচ্চিত্র, তার সবচেয়ে সমালোচক-প্রশংসিত-ও, ২০০১ সালের Millennium Actress।

 

Perfect Blue নিয়ে কনের যে অসন্তুষ্টি ছিলো, তা দূর করার উদ্দেশ্যেই Millennium Actress-এর আগমন। এ দুটো মুভিকে যেন এক জোড়া, একই মুদ্রার দুই পিঠ। সাতোশি কন ফিরিয়ে আনলেন তার পুরোনো সেই মূল থিম – আইডল  আর অ্যাডমায়ারার-এর গল্প – কিন্তু এবার সম্পর্কটা অবশেসন এর না, বরং প্রকৃত ভালোবাসা আর শ্রদ্ধার। কনের  আকাংক্ষিত ইতিবাচক এক ছবি।

আমি যখন প্রযোজকের সাথে Millennium Actress এর কাজ হাতে নিলাম, তখনই আমার লক্ষ্য ছিল আইডল-অ্যাডমায়ারার নিয়ে আরেকটি গল্প বলা। যেন  এদুটি সহোদর চলচ্চিত্র হবে।

শুধু গল্পের দিক দিয়েই না, আখ্যানেও Millennium Actress ছিলো Paprika আর Perfect Blue-‘র মত আনঅর্থডক্স(Tokyo Godfathers এখানেও ব্যতীক্রম!)। পাশাপাশি ভিজুয়ালেও কন নিয়ে আসলেন সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী এক সিনেমাটিক টেকনিক – Trompe-l’œil. দ্বিমাত্রিক চলমান ছবি দিয়ে ত্রিমাত্রিক বিভ্রম তৈরী করার এর চেয়ে উৎকৃষ্ট উদাহরন হয়তো বড় পর্দায় আর খুব বেশি পাওয়া যাবে না। Millennium Actress তার ৮৭ মিনিটের ব্যপ্তীকাল জুড়ে এক অনবদ্য ট্যুর-ডি-ফোর্স। চিয়োকো ভেসে বেড়ায় স্থান-কাল আর বাস্তব-রুপালী পর্দার রেখার উপর দিয়ে – কুরোসাওয়ার[২] এডোতে, মাঞ্চুরিয়ার প্রোপাগান্ডায়, যুদ্ধের ধ্বংসস্তুপে পরিণত হওয়া শহরে, ওযুর[৩] কোন প্রথম-গ্রীষ্ম অথবা বসন্ত-শেষের টোকিওতে, আবার অনেক অনেক দূরের কোন ভবিষ্যতের এক মহাকাশযাত্রায়।

Millennium Actress, সেতসুকো হারা[৪] আর হিদেকো তাকেমিনে[৫] – জাপানের দ্বিতীয় সহস্রাব্দের কালজয়ী সব নায়িকাদের প্রতি সশ্রদ্ধ-স্বীকৃতি, একই সাথে জাপানের ইতিহাস, তার চলচ্চিত্রের ইতিহাসের প্রতি “অ্যাডমায়ার” কনের প্রেমপত্র। সাতোশি কনের আর বাকি সব চলচ্চিত্রগুলো মতই তাতে লজিক গুরুত্বপূর্ণ না, ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর মধ্য থেকে কোন বার্তা খুঁজে বের করা গুরুত্বপূর্ণ না – এখানে যাত্রাটাই মুখ্য বিষয়।  আর এ যাত্রা এক অতুলনীয় অভিজ্ঞতা – যা বইয়ের পাতায় পাওয়া সম্ভব না, গানের সুরে পাওয়া সম্ভব না, মানব অভিনীত চলচ্চিত্রেও পাওয়া সম্ভব না।

 

নিশ্চিতভাবেই এই ধারা Dreaming Machine-এও বজায় থাকতো – যেমন কন তার দর্শকদের আমন্ত্রন জানিয়েছিলেন Paprika-‘র শেষ দৃশ্যে।

drea

কিন্তু সেই সাতোশি কন কিনা ২০১০ এর আগষ্টে মারা গেলেন মাত্র ৪৭ বছর বয়সে!

Dreaming Machine  বের হওয়ার স্বপ্ন হয়তো স্বপ্নই থেকে যাবে। কিন্তু স্বপ্নই বা খারাপ কী? একটা জিনিস যদি  সাতোশি কনের মুভিগুলো শিখিয়ে দিয়ে থাকে, তবে তা হল: স্বপ্ন আর বাস্তবতা মিশে যেতে খুব বেশি কিছু লাগে না। তাই এখনই মাথায় স্বপ্ন-যন্ত্র চাপিয়ে বসুন আর ঝাঁপিয়ে পরুন কল্পনার জগতে; কে জানে, হয়তো আপনার স্বপ্নের সাথে কনের স্বপ্ন একাকার হয়ে বাস্তবে হানা দিবে টোকিওর রাস্তায় হাঁটতে থাকা কোন টেলিভিশনের পর্দায়।

Paprika-2

 

[১] http://www.midnighteye.com/interviews/satoshi-kon/

[২] আকিরা কুরোসাওয়া – কিংবদন্তী জাপানী চলচ্চিত্র নির্মাতা। উল্লেখযোগ্য কাজ – Seven Samurais, Ikiru, Rashomon.

[৩] ইয়াসুজিরো ওযু – কিংবদন্তী জাপানী চলচ্চিত্র নির্মাতা। উল্লেখযোগ্য কাজ – Late Spring, Early Summer, Tokyo Story.

[৪] সেতসুকো হারা – কিংবদন্তী জাপানী চলচ্চিত্র অভিনেত্রী। উল্লেখযোগ্য কাজ – Late Spring, Early Summer, Tokyo Story.

[৫] হিদেকো তাকামিনে – কিংবদন্তী জাপানী চলচ্চিত্র অভিনেত্রী। উল্লেখযোগ্য কাজ – Twenty-four Eyes, Floating Clouds.

Movie Time With Yami – 35

millennium

Name: Millennium Actress / Sennen Joyuu Chiyoko
Duration: 1 hr. 27 min.
MAL Score: 8.35
Ranked: 187
Genres: Action, Adventure, Drama, Fantasy, Historical, Romance

সাতোশি কন সম্পর্কে যারা জানেন, তারা কন এর কোন মুভি দেখার সময় জানেন কি ধরণের প্লট আশা করতে হয়। এই মুভিটিও তার ব্যতিক্রম নয়। ঘোর লাগানো কল্পনা এবং বাস্তবতার মিশেলে একজন অভিনেত্রীর সফলতার গল্প, ভালবাসার গল্প খুব চমৎকারভাবে তারই অভিনীত বিভিন্ন মুভির দৃশ্যায়নের চিত্রের মাঝ দিয়ে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

গল্পটি শুরু হয় একজন ফিল্মমেকারের তার ক্যামেরাম্যানকে নিয়ে একজন জনপ্রিয় প্রাক্তন অভিনেত্রীর বাড়িতে তার ইন্টারভিউ নিতে যাওয়ার মাধ্যমে। তারা যে স্টুডিওতে কাজ করে, এই অভিনেত্রী সেই স্টুডিওতে অনেক বছর যাবৎ সেরা অভিনেত্রী হিসেবে কাজ করেছেন। বৃদ্ধা, কিন্তু এখনও লাবণ্য ধরে রাখা অভিনেত্রী চিয়োকো বলতে থাকেন তার অভিনেত্রী হয়ে ওঠার গল্প। কাহিনী চলতে থাকে চিয়োকোর স্মৃতিচারণের গল্পের সাথে সাথে।

এই গল্পটির বর্ণনাশৈলী একেবারেই অন্যরকম, সচরাচর এ ধরণের বর্ণনাশৈলী পাওয়াই যায়না। গল্পটির প্রায় পুরোটাই চলে ফ্লাশব্যাকে, এবং তা দেখানো হয় চিয়োকোর বিভিন্ন বিখ্যাত মুভির শুটিং এর দৃশ্য দেখানোর মাধ্যমে। গল্পটি আমাদের কখনো নিয়ে যায় ফিউডাল জাপানে, কখনো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে, তো কখনো কল্পনার ভবিষ্যতে, যেখানে স্পেসশিপে করে মানুষ পাড়ি জমাচ্ছে মহাকাশে। ফিল্মমেকার এবং ক্যামেরাম্যান যে কখন এই ফ্ল্যাশব্যাকের অংশ হয়ে যান, টেরও পাওয়া যায়না। কোনটা মুভির অংশ এবং কোনটা বাস্তবতা, তা নিজের অজান্তেই অদৃশ্য হয়ে যায় একসময়।

মুভিটির আর্টওয়ার্ক পুরোনো, কিন্তু চমৎকার। একেকটি দৃশ্য একেকভাবে তৈরি করা হয়েছে, যা কাহিনীর সাথে একেবারে একাত্ম হয়ে মিশে যায়। ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের মানানসই ব্যবহার একে দিয়েছে অনন্যতা। আর সেইসাথে বর্ণনাশৈলী একে পরিণত করেছে মাস্টারপিসে।

তাই, হাতে তেমন কোন কাজ না থাকলে এই উইকএন্ডেই দেখে নিতে পারেন চমৎকার এই মুভিটি।

Movie Download Link-
http://kissanime.com/Anime/Millennium-Actress

Movie time with Yami প্রচারিত হচ্ছে প্রতি বৃহস্পতিবার। সেগমেন্ট সম্পর্কে আপনার যেকোন মতামত কমেন্টে জানাতে ভুলবেন না। আশা করি মুভির সাথে আপনার উইকএন্ড ভালো কাটবে !!