অ্যানিমের ইতিহাস (অথবা অমরত্বের অপ্রত্যাশিত বর্ত্ম) – ১.৯৮৯ তম পর্বঃ আমরা কী নিয়ে কথা বলি, যখন আমরা কথা বলি ওসামু তেজুকাকে নিয়ে

শিন তাকারাজিমার সাফল্যের পর তেজুকা পেশাদার মাঙ্গাকা হওয়ার পথে পা বাড়ালেন।
১৯৪৯ সালে তেজুকা লিখলেন এক সাই-ফাই, গোয়েন্দা গল্প। Metropolis. যা পরবর্তীতে হয়েছে ২০০১ সালের একই নামের অ্যানিমে ফিল্ম এর অনুপ্রেরণা।

পরবর্তী বছর বেরোল তার অন্যতম জনপ্রিয় কাজ, Jungle Emperor. আমেরিকায় যা Kimba The White Lion নামে পরিচিত। এটাই ছিল তেজুকার সর্বপ্রথম “সিরিয়ালাইজড” মাঙ্গা। ১৯৫০ থেকে ১৯৫৪, চার বছরে এই মাঙ্গার বের হয়েছিল তিনটি ভলিয়্যুম। কিম্বা হয়ে উঠল আইকনিক এক চরিত্র।

১৯৫১ সালে তেজুকা লিখলেন Captain ATOM. এই মাঙ্গাতেই প্রথম আবির্ভাব ঘটে তেতসুয়ান অ্যাটমের। পরবর্তী বছর তিনি লিখলেন এর সিক্যুয়েল, Tetsuwan Atom. তেতসুয়ান অ্যাটমের সাফল্য ছাড়িয়ে গেল তাঁর আগের সব কাজকে। যেকোন মাঙ্গার আগের সব সাফল্যকে। অনেকটা হঠাৎ করেই মাঙ্গা হয়ে ঊঠল যেন জনসাধারনের গ্রহনযোগ্য একটি বিনোদনের মাধ্যম। ছোটবড় সবাই অপেক্ষা করত সপ্তাহের সেই দিনের জন্য যখন নতুন চ্যাপ্টার মুক্তি পাবে। এই সাফল্যের জোয়াড়ে চড়েই তেতসুয়ান অ্যাটম প্রকাশিত হয়েছে টানা ১৬ বছর ধরে।

প্রায় একই সময়, ১৯৫৩ সালে প্রথম প্রকাশ হওয়া শুরু হয় তেজুকার আরেকটি উল্লেখযোগ্য কাজ, Princess Knight. তাকারাজুকা গীতিনাট্যের কথা মনে আছে? যেখানে নারী-পুরুষ সব চরিত্রে অভিনয় করত মহিলারা? মেয়েদের ছেলের মত পোশাক পড়া, রাজকন্যা আর রাজপুত্রের গল্প, প্রিন্সেস নাইট হল সর্বপ্রথম শৌজো মাঙ্গার। প্রিন্সেস নাইটে তেজুকা বললেন এক “জেন্ডার বেন্ড”
প্রোটাগনিস্ট প্রিন্সেস স্যাফায়ারের গল্প, যার দেহে ছিল একই সাথে দুটো আত্নার সহাবস্থান, একটি ছেলে এবং একটি মেয়ের। যার প্রভাব লক্ষনীয় তার অনুগামী জনপ্রিয় শৌজো মাঙ্গায়, অ্যানিমেতে।

সময় যত যেয়েছে তেজুকার চোখ বড় বড় চরিত্রের, “কার্টুনীয়”, সাধারণ বিনোদনের গল্প গুলো হয়েছে আরো গভীরতা পূর্ণ, কখনো ডার্ক, আর তাঁর আঁকা হয়েছে আরো বাস্তবিক।
১৯৫৬ সালে তেজুকা আঁকা শুরু করলেন, তাঁর নিজের মতে যা তাঁর সেরা এবং সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী কাজ, Hi no Tori(Phoenix). নিজের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত যা তেজুকা লিখে গেছেন এবং তা এখনো অসম্পুর্ণ। ফিনিক্সের গল্প; স্থান-কালের এক অনবদ্য যাত্রা, ভিন্ন যুগ আর ভিন্ন পরিবেশে, ভিন্ন সব মানুষের গল্প; যাদের যোগ সূত্র অমরত্ব লাভের আকাঙ্ক্ষা।

তেজুকার আরেকটি সমালোচকদের দ্বারা প্রশংসিত কাজ হল, Buddha. বৌদ্ধ ধর্মের প্রতিষ্টাতা গৌতম বুদ্ধের জীবনি, যাতে অবশ্যই ছিল তেজুকার নিজস্ব ছোঁয়া। ২০০৪-২০০৫, টানা দুই বছর বুদ্ধ জিতেছে আইসনার অ্যাওয়ার্ডস, আন্তর্জাতিক বিভাগে।
ড.ওসামু তেজুকা তার চিকিৎসা বিদ্যার জ্ঞান কাজে লাগালেন তার পরবর্তী কাজে। Black Jack, এক প্রতিভাবান শল্য চিকিৎসকের গল্প। ১৯৭৩ থেকে ১৯৮৩ পর্যন্ত টানা দশ বছর ব্ল্যাক জ্যাক প্রকাশিত হয়েছে।
আশির দশকের আরেকটি উল্লেখযোগ্য কাজ, Adolf. ত্রিশের দশকের জার্মানীর তিন অ্যাডলফের গল্প; যাদের একজন এক সাধারণ জার্মান, একজন ইহুদী আর একজন স্বয়ং স্বৈরশাসক!

তেজুকা কাজ করতেন সপ্তাহে ৫ দিন, তার নিজস্ব এক অ্যাপার্টমেন্ট ভবনে;যেখানে ঢুকতে পারত কেবল তার স্ত্রী। এমনকি তার এডিটরও না। বছরে মাত্র গড়ে ৬০ দিন থাকতেন নিজের বাসায়, পরিবারে সাথে। তিনিই শুরু করেন মাঙ্গাকাদের অ্যাসিটেন্ট রাখার প্রচলন, যা একই সাথে যেমন সাপ্তাহিক সিরিয়ালাইজেশনের কাজ সহজ করে দিলো, তেমনি উদীয়মান মাঙ্গাকাদের পেশাদার কাছ থেকে শেখার সু্যোগ করে দিলো। যা আজো অনুসরন করা হয়।

১৯৮৯ সালে পাকস্থলীর ক্যান্সারে মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত ওসামু তেজুকা লিখেছেন ৭০০ ভলিয়্যুম আর প্রায় দেড় লাখ পৃষ্ঠার মাঙ্গা! ১৯৮৫ তে তার ৪০ বছরের মাঙ্গাকা জীবন উপলক্ষে এনএইচকে তে প্রচারিত এক ডকুমেন্টারিতে তিনি বলেছিলেন তিনি লিখে যেতে চান আরো চল্লিশ বছর। কারণ তার এখনো অনেক, অনেক গল্প বলা বাকি। ওসামু তেজুকা আরো চল্লিশ বছর বাঁচেন নি, ফিনিক্সের অমরত্বের গল্পও শেষ করে যেতে পারেননি, কিন্তু তার মাত্র ৬১ বছরের জীবনে তিনি মাঙ্গার ইতিহাসকে যতটা বদলে দিয়েছেন, তাতে কি তিনি নিজে অমরত্ব নিশ্চিত করে যাননি?

“Foreign visitors to Japan often find it difficult to understand why Japanese people like comics so much. One explanation for the popularity of comics in Japan is that Japan had Osamu Tezuka, whereas other nations did not.”

10959489_913106612054490_6674192471629459510_n

 

Comments

comments