চরিত্র বিশ্লেষন এবং উৎস অনুসন্ধান -৫ – Atlanta [Fate/Apocrypha] — Shifat Mohiuddin

Atlanta 1

চরিত্র: আটলান্টা/Atlanta
উপাধি: আর্চার অফ রেড
এনিমে: Fate/Apocrypha
ভূমিকা: মধ্যমপন্থী
জাতীয়তা: গ্রীক
জন্ম ও মৃত্যু: জানা যায় নি
মৃত্যুর ধরণ: জানা যায় নি

ছোটবেলা হয়তো আমরা অনেকেই এমন একটা গল্প পড়েছি যে, একবার এক রাজকন্যা বিয়ের সময় শর্ত জুড়ে দেন যে তাকে বিয়ে করতে চাইলে তার সাথে পাণিপ্রার্থীকে একটা দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে হবে। জিততে পারলে রাজকন্যা মিলবে, হেরে গেলে প্রতিযোগীর শিরশ্ছেদ করা হবে। অনেক জায়গা থেকে বড়বড় বীরগণ ভিড় করলেও কাটা মাথার সংখ্যা বাড়তেই থাকে ক্রমান্বয়ে কারণ রাজকন্যা অত্যন্ত দ্রুতগতির ছিলেন। অবশেষে এক প্রতিযোগী রেসের মধ্যে একটা করে সোনার আপেল নিক্ষেপ করেন রাজকন্যাকে বিভ্রান্ত করার জন্য। স্বর্ণের আপেল জিনিসটা অনেক চিত্তাকর্ষক হওয়ায় রাজকন্যা ঝুঁকে দেখতে গেলে এই সুযোগে ঐ প্রতিযোগী রেস জিতে যান এবং ঐ রাজকন্যার স্বামী হবার সুযোগ লাভ করেন। আজকে Fate/Apocrypha এর চার নম্বর এপিসোড দেখার সময় এই কাহিনীর কথা মনে পড়ে গেল। হ্যাঁ, রেড সেকশনের আর্চার আটলান্টাই ছিলেন সেই রাজকন্যা। জটিলতা এড়ানোর জন্য রূপকথার বইয়ে কঠিন কঠিন গ্রীক নাম দেওয়া হত না আরকি। প্রায় দুই বছর আগে আমি ফেইট সিরিজের কতিপয় চরিত্রের ব্যাকগ্রাউন্ড নিয়ে ধারাবাহিক কিছু লেখা লিখেছিলাম। মধ্যে হুট করে লেখার আগ্রহ চলে যায়। আজ আবার হুট করে কীবোর্ডের গায়ে কিছু আগাছা জন্মানোর ইচ্ছা হল।

আটলান্টার পিতৃপরিচয় নিয়ে বিশেষ কিছু জানা যায় না। রাজা Iasus এর ঘরে তার জন্ম এই ধারণাটাই বেশি জনপ্রিয়। আটলান্টাকে জন্মের পরপরই মারাত্মক প্রতিকূল পরিবেশের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। তার পিতা পুত্র সন্তানের আশা করেছিলেন, আটলান্টাকে দেখে তিনি আশাহত হন। কন্যাসন্তান পালনের ইচ্ছা না থাকায় তিনি আটলান্টাকে জঙ্গলে রেখে আসেন। একটি বন্য ভাল্লুক আটলান্টাকে প্রতিপালন করে। (এইসব ঘটনা গ্রীক পুরাণে নিত্যনৈমিত্তিক!) বয়ঃপ্রাপ্তির সাথে সাথে আটলান্টা শিকারিদের সাথে মেশা শুরু করেন এবং কিছুদিনের মধ্যেই নিজের দক্ষতা প্রদর্শন করে অন্য সবার থেকে শ্রেষ্ঠ হয়ে উঠেন। সভ্য সমাজের সাথে না চলা নিয়ে আটলান্টার মনে কোন দুঃখ ছিল না। আটলান্টা দেবী আর্টিমেসের অনুসারী হয়ে কুমারীব্রত গ্রহণ করেন। নিজের নারীত্ব নিয়ে তার মনে বিন্দুমাত্র দুশ্চিন্তা ছিল না এবং জীবনযাত্রায় পুরুষকে তিনি নিতান্তই অপ্রয়োজনীয় মনে করতেন। তাছাড়া তার বিয়ে নিয়ে অমঙ্গলজনক ভবিষ্যৎবাণী ছিল।

আটলান্টার বীরত্বের প্রথম নিদর্শন পাওয়া যায় ‘ক্যালিডোনিয়ার বন্য শূকর’ শিকারের সময়। ঠিকমত পূজা না করায় দেবী আর্টেমিস ক্যালিডোনিয়া রাজ্যে একটা বন্য শূকর পাঠান সেখানের মানুষকে শায়েস্তা করার জন্য। ক্যালিডোনিয়ার রাজপুত্র মেলিয়েগারের নেতৃত্বে একদল শিকারি প্রস্তুত হয় শিকারের জন্য। আটলান্টা এই শিকারি দলে যোগ দিতে চাইলে নারী হওয়ার কারণে অনেকেই এর বিরোধিতা করে। মেলিয়েগার বিবাহিত হওয়ার পরও আটলান্টার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে এবং তার চাপাচাপিতেই আটলান্টাকে দলে নিতে সবাই রাজী হয়। আটলান্টার ছোঁড়া তীরই সর্বপ্রথম শূকরটার গায়ে আঘাত হানতে সমর্থ হয়। অবশেষে মেলিয়েগার তার বর্শা দিয়ে শূকরটাকে হত্যা করেন। পরবর্তীতে মেলিয়েগার প্রথম আঘাতের কৃতিত্বস্বরূপ আটলান্টাকে শূকরের ছাল উপহার দিতে চাইলে মেলিয়েগারের মামারা এর বিরোধীতা করে। তারা আটলান্টার কাছ থেকে পুরষ্কার কেড়ে নিতে চাইলে মেলিয়েগার রেগেমেগে তার দুই মামাকে হত্যা করেন। ভাতৃদ্বয়ের মৃত্যুর কারণে রাগে অন্ধ হয়ে তাই মেলিয়েগারের মা আলথিয়া একটি জাদুর কাষ্ঠখণ্ডকে আগুনে নিক্ষেপ করে যাতে মেলিয়েগারের জীবনীশক্তি অবস্থান করছিল। ফলে মেলিয়েগার মারা যান এবং কিছুক্ষণ পরে জঙ্গল থেকে আরেকটা বন্য শূকর এসে আলথিয়াকে হত্যা করে।

¤

আটলান্টা কলচিস (Fate/stay night এর ক্যাস্টার মিডিয়ার রাজ্য) অভিযানে যেতে চাইলেও জ্যাসন (মিডিয়ার স্বামী) তাতে রাজী হন নি। কারণ হিসেবে আবারও সেই নারী হয়ে জন্ম নেওয়াটাকেই দাঁড়া করানো হয়। তবে কলচিস অভিযান নিয়ে তৈরি হওয়া একাধিক কাহিনীর একটি অনুযায়ী আটলান্টা অভিযানে ঠিকই যোগ দিয়েছিলেন। তিনি যুদ্ধে আহতও হন এবং কথিত আছে যে মিডিয়া তাকে সেবাশুশ্রূষা দিয়ে সারিয়ে তোলেন।
(ফেইট সিরিজ বড়ই বিশাল ব্যাকগ্রাউন্ডওয়ালা একটা সিরিজ। অনেককিছুর সাথেই অনেককিছুর কানেকশান পাওয়া যায়!)

¤

Atlanta 2

আটলান্টাকে নিয়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় যে কাহিনী সেটা হল রূপকথার সেই দৌড় প্রতিযোগিতার গল্প। ক্যালিডোনিয়ার শূকর শিকারের পর আটলান্টার বাবা নিজের মেয়েকে স্বীকৃতি দেন। তিনি নিজের মেয়েকে রাজ্যে ফিরিয়ে নেন এবং বিয়ের জন্য চাপ প্রয়োগ করতে থাকেন। সরাসরি বিরোধিতা করা বোকামি হবে ভেবে আটলান্টা শর্ত জুড়ে দেন যে তাকে রেসে পরাজিত করতে পারলেই বিয়ের অনুমতি মিলবে। আটলান্টা তার সময়ের সর্বাধিক গতি সম্পন্ন মানুষ ছিলেন তাই তার কুমারীত্ব অক্ষুণ্ণ থাকে। কথিত আছে যে, আটলান্টা নানাভাবে তার প্রতিযোগীদের সুযোগ করে দিতেন। যেমন: বর্ম পরিধান করে অংশগ্রহণ অথবা প্রতিযোগীকে অর্ধেক পথ এগিয়ে দেওয়ার পর দৌড় দেওয়া। এরপরও কেউই তাকে পরাজিত করতে পারছিল না। তখনই দৃশ্যপটে আসেন মেলানিওন। (হিপ্পোমেনেস নামেও পরিচিত) মেলানিওন আটলান্টাকে ভালবাসতেন। তাই তিনি ভালবাসার দেবী আফ্রোদিতির কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেন। আফ্রোদিতি প্রেমিকদের প্রতি দয়াশীল হওয়ায় মেলানিওনকে তিনটি সোনার আপেল দেন আটলান্টাকে বিভ্রান্ত করার জন্য। নির্দিষ্ট সময়ে রেস শুরু হওয়ার পর আটলান্টা কিছুক্ষণের মধ্যেই মেলানিওনকে পেরিয়ে যান। তখনই মেলানিওন প্রথম আপেলটি নিক্ষেপ করেন। সোনার সেই আপেল দেখতে এতই চিত্তাকর্ষক ছিল যে আটলান্টা সেটা তুলে নিতে গিয়ে দেখেন যে মেলানিওন তাকে পেরিয়ে গেছে। তারপরও আটলান্টা আত্মবিশ্বাসী ছিলেন রেসে জয়লাভ করার ব্যাপারে। এবং এর প্রমাণ দেন তিনি আবারও মেলানিওনকে পেরিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে। তখনই মেলানিওন দ্বিতীয় আপেলটি নিক্ষেপ করেন। আত্মবিশ্বাসী আটলান্টা আবারও সেই আপেলটি কুড়িয়ে নেন। লক্ষ্যসীমার নিকটবর্তী হওয়ার পর যখন আটলান্টা মেলানিওনকে আবার পেরিয়ে যাচ্ছিলেন তখন মেলানিওন শেষ আপেলটি নিক্ষেপ করে আটলান্টাকে বিভ্রান্ত করে দেন এবং রেসে জয়লাভ করে আটলান্টাকে জিতে নেন।

কুমারীব্রত ভেঙ্গে গেলেও আটলান্টা এবং মেলানিওনের সংসার ঠিকমতই চলছিল। আনন্দের স্রোতে ভাসতে ভাসতে মেলানিওন আফ্রোদিতির প্রতি তার দায়বদ্ধতা ভুলে যান। তাই রাগান্বিত হয়ে আফ্রোদিতি সুযোগের অপেক্ষা করতে থাকেন। একবার জিউসের মন্দিরের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার আফ্রোদিতি দম্পতির মাথায় নিষিদ্ধ কিছু করার প্ররোচনা ঢুকিয়ে দেন। ফলে মেলানিওন আটলান্টাকে নিয়ে মন্দিরে প্রবেশ করেন এবং সেখানে তারা মিলিত হন। মন্দিরের পবিত্রতা নষ্ট হওয়ায় জিউস ক্ষুদ্ধ হয়ে মেলানিওন ও আটলান্টাকে সিংহ বানিয়ে দেন। গ্রীকদের ধারণা অনুযায়ী ব্যাপারটা অত্যন্ত কাব্যিক এবং ট্র‍্যাজিক ছিল কারণ তারা বিশ্বাস করতো সিংহরা নিজেদের মাঝে প্রজনন করতে পারে না, তারা মনে করতো সিংহরা শুধুমাত্র চিতাদের সাথে প্রজনন করে। ফলে মেলানিওন এবং আটলান্টা চিরদিনের জন্য আলাদা হয়ে যান।
(প্রথমে আটলান্টার বিড়ালের মত কান আর লেজ দেখে অবাক হয়েছিলাম। এখন ব্যাপারটা খাপে খাপে মিলে যাচ্ছে। সিংহী অবস্থায় মৃত্যুবরণ করার কারণে হয়তো সামনিংয়ে এর প্রভাব পড়েছে। নভেল পড়ি নি তাই জানি না সামনে এই ব্যাপারে কিছু বলা হবে কিনা। তবে টাইপ-মুনের প্রশংসা করতেই হবে, মিথের অনুসরণ আর ওয়াইফু চার্মের কাজ দুটোই একসাথে হয়ে গেল।

অ্যাকিলিসের আটলান্টাকে বড় বোন ডাকার ব্যাপারটা একটু ধোয়াটে লেগেছিল। এই ব্যাপারের সাথে একটা ঘটনার সংযোগ ঘটানো যায়। একবার এক শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে অ্যাকিলিসের বাবা পেলেয়ুসের সাথে আটলান্টার একটা কুস্তি ম্যাচ হয়েছিল। ম্যাচে আটলান্টা জয়লাভ করে ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেন। হয়তো অ্যাকিলিস এই ঘটনার কথা জানতো। তবে আন্টি না ডেকে সিস ডাকার ব্যাপারটা এখনো পরিষ্কার হচ্ছে না।

আটলান্টা এক সন্তানের মা হয়েছিলেন। তবে সেই সন্তানের বাবা মেলানিওন নাকি মেলিয়েগার তা নিয়ে মতভেদ আছে। সেই সন্তান, পার্থেনোপাসকে নিয়েও অনেক বীরত্বের কাহিনী প্রচলিত আছে।

সোর্স: উইকিপিডিয়া, এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা, greekmythology.com

Comments

comments