
পৃথিবীর আকর্ষন থেকে বেরিয়ে মহাকাশের অসীমতায় পা রাখা মানুষের আজীবন স্বপ্ন। “To see what no one has seen before, to go where no one has gone before”।
২০৭৫ সাল। মানুষ এখনো পৃথিবীর কাছের প্রতিবেশীদেররও মোটামুটি আপন করে নিয়েছে। পৃথিবী আর চাঁদের কক্ষপথজুড়ে ঘুরছে সব স্যাটেলাইট আর স্পেস স্টেশন। এমনকি চাঁদে আছে বিশাল এক শহর; চিকিৎসাকেন্দ্রের পাশাপাশি যা মহাকাশে ভেসে বেড়ানো মানুষদের অবকাশযাপনের বেশ জনপ্রিয় এক জায়গা! বিভিন্ন মহাকাশযানে করে পৃথিবী, চাঁদ আর এসব স্টেশনের মাঝে মানুষের যাতায়াত এখন নিত্তনৈমত্তিক ঘটনা। মঙ্গলেও পরেছে মানবপদরেখা!
কিন্তু যেখানে এতোশত জিনিস, সেখানে আবর্জনা তো থাকবেই। মহাকাশীয় সংঘর্ষে তৈরী হওয়া এসব আবর্জনা স্পেস ডেভেলপমেন্টে এক বিশাল বাধা। আর এসব আবর্জনা পরিষ্কারের দায়িত্বে যারা নিয়োজিত, তারাই – ডিব্রি(Debris) কালেক্টর।
স্পেস স্টেশনগুলোতেই আছে হাজারো কোম্পানী। তারই একটি – “টেকনোরা”-‘র ডিব্রি সেকশনে নতুন যোগদান করল আই তানাবে, অত্যুৎসাহী এক জাপানী যুবতী। তার নতুন কর্মক্ষেত্র সম্পর্কে যা ধারনা ছিল তা প্রথম দেখায়ই আমূল বদলে গেল। জীবনের ঝুঁকি রেখে মহাকাশের সব বিপদ আপদ থেকে মানুষকে বাঁচানোর দায়িত্বে উজাড় করে দেওয়া সব মানুষ – নায়কোচিত সম্মানই তো পাওয়ার কথা! কিন্তু মানুষের প্রেজুডিস মনে হয় কখনই বদলায় না। আর সেরকমই “গার্বেজ কালেক্টর”-দের প্রতি মানুষের নাক সিটকানোটাও স্বভাবটাও হয়তো বদলায়নি, তা একবিংশ শতাব্দীর তিন-চতুর্থাংশ পার করার পরই হোক আর পৃথিবীর অভিকর্ষকে উপেক্ষা করা এক জগতেই হোক।
এই নতুন জায়গায় তানাবের তার সহকর্মীদের, অচেনা অনেক মানুষ, মহাকাশের জিরো গ্র্যাভিটি আর নিজেকে নতুন ভাবে আবিষ্কার করা; রাজনীতি, জীবন, স্বপ্ন আর ভালোবাসার গল্প – প্লানেটিস।
প্লানেটিস সাই-ফাই অ্যানিমে। হার্ড সাই-ফাই। আগের সব সাইন্স-ফিকশন অ্যানিমেগুলো যেখানে সুপারহিউম্যান, রোবট-অ্যান্ড্রয়েড, স্পেস অপেরা আর টাইমট্রাভলের “ফিকশন”-এই সীমাবদ্ধ। সেখানে প্লানেটিস অনেকাংশেই বাস্তব! প্লানেটিসকে অবশ্য টাইম ট্রাভেলের উপাধি দেওয়াই যায়। কোন টাইম মেশিনে করে ৬১ বছর পরের পৃথিবীতে গেলে হয়তো প্লানেটিসের জগতটাতেই আপনি পা রাখবেন।
বাস্তবতার কথা বলা হচ্ছিল, সে সম্পর্কে বলা যাক। ওজনহীন পরিবেশ বা মহাকাশে ভেসে বেড়ানোর চিত্রায়ন আবার হেটে চলার উপযোগী কৃত্রিম গ্র্যভিটি তৈরী করা ঘুড়ন্ত স্পেস স্টেশন, স্পেস অর্বিটাল পরিবর্তনের ভেক্টর, বায়ুশুন্য স্থানের শব্দহীনতা, চাঁদের ১/৬ গ্র্যাভিটিতে অধিক বর্ধন অথবা বিভিন্ন স্পেস ডিজিস মাত্র কয়েকটি উল্লেখ করা বিষয়। জাক্সার(JAXA) সহায়তা নেওয়ায় তাই এই অ্যানিমে প্রায় নিখুঁত এক মহাকাশ জীবনের অভিজ্ঞতা দিবে। এটা তো গেল টেকনিক্যাল বিষয়।
প্লানেটিস ড্রামা-রোমান্স অ্যানিমে। এবং অনেকাংশে স্লাইস অফ লাইফও বলা যায়। শুধু সাইন্সের এতো চমৎকার এক্সিকিউশনের জন্য যদি এটা মনে রাখার মত একটা অ্যানিমে হতে পারে তাহলে এর জীবনঘনিষ্ঠতা বৈজ্ঞানিক ব্যাপার-স্যাপারকেও ছাড়িয়ে যায়। বিশাল এক আনসাম্বলের, এতগুলো চরিত্রের, এত বাস্তবিক ক্যারেক্টার ডেভেলপমেন্ট আমার দেখা অন্যতম, যদি না সবচেয়ে সেরা হয়। প্রথম কোরের এপিসোডিক পর্বগুলোর(যার সব চরিত্রই কোন না কোনভাবে মূল কাহিনীকে আরো শক্তিশালী করেছে) ভিত্তিকে কাজে লাগিয়ে তৈরি হয়েছে দ্বিতীয়াংশের ইনট্রিগিং স্টোরি আর্কটা। সবকিছুর শেষে আছে মনে রাখার মত এক এন্ডিং।
প্লানেটিস বেশ চিন্তাদ্দীপকও। তানাবে আর হাচিমাকির নিজ নিজ স্বপ্নের পেছনে ছোটা আর তার মাঝে ভালোবাসার ছোয়া; ফি, ইউরি, এডেল আর অন্যান্য ডিব্রি সেকশনের সহকর্মীদের জীবন অভিপ্রায়; একদিকে অজানা আর নতুন শক্তি-বাসস্থানের খোঁজে মহাকাশের দূরে আরো দূরে যাওয়ার গল্প আর তার আড়ালে ক্যাপিটালিজম, টেরোরিজম আর রাজনীতির কালো ছায়া। প্লানেটিস আপনাকে ভাবাবে। বেশ ভালোমতই।
পৃথিবীর আকর্ষন থেকে বেরিয়ে মহাকাশের অসীমতায় পা রাখা মানুষের আজীবন স্বপ্ন। “To see what no one has seen before, to go where no one has gone before”।
শৌনেন, সুপারন্যাচারাল আর টিন-ড্রামা রোমান্সের ক্লিশের বাইরেও অ্যানিমে মাধ্যম যে ভিন্নধর্মী সব অভিজ্ঞতার সুযোগ করে দিতে পারে তার উৎকৃষ্ট এক উদাহরন প্লানেটিস। বলে রাখতে পারি, প্লানেটিস “is nothing like what you have seen before” আর প্লানেটিস “went where no anime has gone before.”
কাহিনীঃ ৯;১৩ পর্ব এপিসোডিক, ১৩ পর্বের আর্ক
মিউজিকঃ ৮;২৬ পর্বে একটা মাত্র ওপেনিং আর একটা এন্ডিং; ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের ব্যবহার অসাধারন।
আর্ট/অ্যানিমেশনঃ অসাধারন আর্ট। ভিসুয়্যালি স্টানিং। হলিউডের গ্র্যাভিটি দেখে যদি আপনার চোখ চকচক করে তাহলে মনে রাখুন অ্যানিমেশনে লাইভ অ্যাকশনের মত কোন বাধাধরা নেই।
ক্যারেকটার ডেভেলপমেন্টঃ আমার দেখা অন্যতম সে।
ইনট্রিগঃ প্রথম কোর ৭ – দ্বিতীয় কোর ৯।
এন্ডিংঃ নিখুঁত।
প্লানেটিস
পর্বঃ ২৬ (২৫ মিনিট/পর্ব)
জনরাঃ সাই-ফাই, রোমান্স, ড্রামা, স্পেস
সালঃ ২০০৩-২০০৪
প্রোযজকঃ সানরাইজ
সেন্সরঃ পিজি-১৩
মাই অ্যানিমে লিস্ট রেটিংঃ ৮.৪২ (#১৪৪)
আমার রেটিংঃ ৯১/১০০ (#৩)
