Kaiba রিভিউ — Fahim Bin Selim

6

কাইবা[Kaiba](২০০৮)
টিভি – পর্ব ১২
জনরাঃ সাইন্স ফিকশন, ফ্যান্টাসী, রোমান্স, মিস্টেরী
প্রযোজকঃ ম্যাডহাউস
মূলঃ মাসাকি ইউয়াসা
পরিচালনাঃ মাসাকি ইউয়াসা

২০০৬ এর কেমোনোজুমে দিয়ে টেলিভিশনে ইউয়াসার আত্নপ্রকাশ। আর ২০১০-এ তার সবচেয়ে জনপ্রিয় আর প্রশংসিত কাজ তাতামি গ্যালাক্সি। এখন কিছু সাধারন পার্থক্য থাকলেও মৌলিক দিক দিয়ে ইউয়াসার সব অ্যানিমের আর্টে মিল খুঁজে পাবেন। কিন্তু কেমোনো আর তাতামির মাঝে স্যান্ডুইজড হয়ে ২০০৮ সালে যে কাইবা বের হল, তা শুধু আর সব পরিচালকের সব অ্যানিমের থেকেই আলাদা না, ইউয়াসার যেকোন কাজের থেকেও আলাদা! আর কাইবা, তার রেট্রো আর্ট স্টাইল দিয়ে – অ্যানিমের সাথে যা কল্পনাও করা যায় না – ছোট পর্দায় ফুটিয়ে তুলল এক জাঁকালো, প্রাণবন্ত আর চাদর ঘেরা রহস্য গল্প। তার সাথে আবার সাইন্স ফিকশন আর রোমান্স!

কাইবা এক কল্পনার জগতের সাথে তুলনা করা যায়। সাইন্স ফিকশন অ্যানিমে সাধারণত যা হয় – অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, অত্যাধুনিক এক জগত। কিন্তু তবুও বর্তমান জগতের সাথে তার মিলটা স্পষ্টই থাকে। কাইবা আসলেই এক কল্পনার জগত; স্বপ্ন অথবা দুঃস্বপ্ন; পরাবাস্তব আর অপরিচিত; নিজ চোখে আশেপাশে যা দেখেন তার সাথে এর মিল খুঁজে পাওয়া প্রায় দুঃসাধ্য এক ব্যাপার।
আর কাইবার এই জগতে মানুষের স্মৃতিশক্তি জমিয়ে রাখা যায় বিভিন্ন নির্জীব বস্তুতে! স্থানান্তর করা যায় এক দেহ থেকে আরেক দেহ, এক বস্তু থেকে আরেক বস্তুতে; যোগ করা যায়, বদলানো যায়…মুছে ফেলা যায়। অমরত্বের এখানে এক নতুন সংজ্ঞা আছে – তা শারীরগত না, অস্তিত্বগত। কিন্তু এ ধরনের জগতে, কোন জিনিসটাকে প্রানী বলা যায়? কীভাবে জানবেন আপনার মাথায় ছোটকালের সুখের যে স্মৃতিগুলো আছে তা আসলেই ঘটেছে, যোগ করা কোন ব্যাপার না? কীভাবে বুঝবেন – আপনি আসলেই আপনি?
আকাশে ভেসে বেরাচ্ছে মেঘের দল, তার উপরে রাজকীয় জীবনের হাতছানি। কিন্তু যা পার হতে হওয়ার একটাই মূল্য – হারাতে হবে আপনার সব স্মৃতি।
আর তার নিচে বিশৃঙ্খলা, অরাজকতা আর প্রতারণার এক জগত। জায়গায় জায়গায় ফাঁদ পাতা, দারিদ্রতায় জর্জরিত মানুষগুলোর কাছে মূল্যবোধের চেয়ে বেঁচে থাকাটাই আসল।
আর এই স্মৃতির চরম বিশৃঙ্খলার জগতে আমাদের নায়ক, কাইবা, জেগে উঠল – স্মৃতিভ্রষ্ঠ হয়ে; একেবারেই ‘শুন্য মাথায়'; এমনকি নিজের নাম, পরিচয় সম্পর্কেও কোন ধারণা নেই। গলায় শুধু একটা হার ঝুলানো, আর তাতে এক মহিলার ছবি, অবশ্যই যার কোন স্মরণও তার নেই! শুরু হল নিজেকে খুঁজে পাওয়ার এক যাত্রা…

ক্লিশে, অ্যামনেশিয়া গল্প? শুধু আর্ট বাদ দিলেও কাইবা আর যেকোন সাই-ফাই থেকে আলাদা। রহস্য গল্পের অসাধারন এক সম্পাদনা আর তার নিখুঁত এক আখ্যান। প্রথম দুটো পর্ব হয়তো পুরোপুরি মাথার উপর দিয়ে যাবে। কিন্তু বাকানো!-র মত এলোমেলো পূর্বাভাসগুলো সবজায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। সময় দিন, ধাঁধার ছড়ানো টুকরা গুলো এক হতে শুরু করবে।

কাইবা উজ্জ্বল রঙ-এ ভরপুর, সম্মোহিত করে রাখা এক জগত। সিরিজের প্রথম অংশ, এপিসোডিক, মূশি-শির মত মন ঠান্ডা করা এক একটি পর্ব, আস্তে আস্তে এই অপরিচিত জগতের সাথে পরিচয় করিয়ে দিবে। হয়তো কয়েক পর্ব যেতেই আর অচেনা মনে হবে না; অর্থকষ্টে থাকায় নিজেদের দেহ বিক্রি করা(আক্ষরিক অর্থেই) এক পরিবার, দুঃখের স্মৃতি ভুলার চেষ্টারত এক বৃদ্ধা অথবা ক্রনিকোর আর তার পরিবারের গল্পে(পর্ব ৩ – আমার দেখা যেকোন অ্যানিমের অন্যতম সেরা পর্ব) আপনিও হয়তো সহমর্মী হবেন।
আর এই পর্বগুলো ভিত্তি করে দেবে পরবর্তী অংশের জন্য। যেখানে রহস্যের জট খুলতে শুরু করবে একে একে; নান্দনিক কায়দায়। সাধারন অ্যাডভেঞ্চার থেকে যা দ্রুতই বদলে যাবে বিদ্রোহ, রাজনীতি আর বিশ্বাসঘাতকতার এক গল্পে।

আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় এর আবহ সংগীত; এই আজানা, অদেখা জগতের পরাবাস্তবতা ফুটিয়ে তুলতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। আর তার সাথে আছে দুটি চমৎকার ওপেনিং আর এন্ডিং থিম। কাইবার সংগীত আবেগময়, বিষন্ন এক ভালো লাগার অনুভূতি দিয়ে যাবে।

সাধারন অ্যানিমে আর্টওয়ার্কের বাইরে কিছু পছন্দ না হলে, কাইবা আপনার জন্য না। অ্যানিমে স্টুডিওতে দিনরাত বসে বসে আর্টিস্টের সুনিপূণ হাতে আঁকা না, ঘরে বসে আনাড়ি হাতে মাইক্রসফট পেইন্টে আঁকা ছবির সাথেই এর মিল খুঁজে পাবেন বেশি। কিন্তু এতোটুক ‘অস্বস্তি’ কাটিয়ে উঠতে পারলে, পাবেন এক চমৎকার গল্প; সাই-ফাই, রহস্য আর ভালোবাসার এর অসাধারন মেলবন্ধন।
তাতামি গ্যালাক্সি, পিংপং অথবা মাইন্ড গেম দেখে ইউয়াসা সম্পর্কে নূন্যতম ধারনা থাকলেও তা ভুলে যান। কাইবা আরো চিত্রানুগ, বাস্তবতা বিচ্ছিন্ন আর অচেনা। আর তা আপনাকে নিয়ে যাবে ‘সমুদ্রের তলদেশ’, আর নিয়ে যাবে ‘মেঘের উপরে'; পুরো জগৎ উলট পালট করে দেওয়া, নিজেকে খুঁজে পাওয়ার এই যাত্রায়। আপনি প্রস্তুত?

মাইঅ্যানিমেলিস্ট রেটিংঃ ৮.৩২
আমার রেটিংঃ ৮৬/১০০

Comments

comments