Legend of the Galactic Heroes/Ginga Eiyuu Densetsu(1988-1997) রিভিউ — Fahim Bin Selim

2

লেজেন্ড অফ দ্য গ্যালাক্টিক হিরোস/গিঙ্গা এইয়্যু দেনসেতসু(১৯৮৮-১৯৯৭)
Legend of the Galactic Heroes/Ginga Eiyuu Densetsu(1988-1997)

জনরাঃ স্পেস অপেরা, সাই-ফাই, ড্রামা, রোমান্স, মিলিটারী
প্রযোজকঃ আর্টল্যান্ড
মূলঃ ইয়োশিকি তানাকা
পরিচালকঃ নোবুরো ইশিগুরো (স্পেস ব্যাটলশীপ ইয়ামাতো(১৯৭৪))
সেন্সরঃ ভায়োলেন্স মাঝে মাঝে নৃশংস, খুব কম হলেও ন্যুডিটি আছে
মাইঅ্যানিমেলিস্ট রেটিংঃ ৯.০৬(#৮)

বাংলাদেশী এবং নিয়মিত অ্যানিমে দেখাটা গত ৪-৫ বছর থেকে শুরু হলে হয়তো বড় একটা সময় ধরে এই অ্যানিমে সাথে পরিচিতও ছিলেন না। তারপর একদিন মাইঅ্যানিমেলিস্ট-এর “টপ অ্যানিমে” পেজ এ গেলেন। “ফুলমেটাল…হুম, স্টাইন্স;গেট…আচ্ছা, গিন্তামা…হুম, ক্লানাড…, কোড গিয়াস…গি-গিঙ্গা-এ-এই-ইয়া…কী!!?”
নয় বছর, চার সিজন আর ১১০ পর্ব। মাইঅ্যানিমেলিস্ট-এ এত রেটিং, আইএমডিবিতে এত রেটিং(৮.৯)। তবুও এই অ্যানিমে (বাংলাদেশ/বর্তমান অ্যানিমে ফ্যানদের কাছে) এতো কম জনপ্রিয় হওয়ার কারণ কী? অনেক পুরান বলে?

“In every time, in every place, the deeds of men remain the same”
৩৫ শতাব্দী।
স্পেস ক্যালেন্ডার ৭৯৬। ৭৯৬ বছর হয়েছে মানুষ পৃথিবী ত্যাগ করেছে।
প্রায় আট শতাব্দী আগে পৃথিবী ত্যাগ করা মানুষ যে একত্রে সুখে-শান্তিতে বাস করছে তা কিন্তু না। ছায়াপথে ছড়ানো নক্ষত্রগুলোর শ’ শ’ গ্রহে তারা ছড়ানো, আর ভাবাদর্শ দিয়ে দুভাবে বিভক্ত। একদিকে যেমন “ওডিন” গ্রহকে কেন্দ্র করে একনায়কতন্ত্র আর আভিজাত্যের আদলে রাজা আর প্রজার ষ্পষ্ট বিভেদ থাকা “ইম্পেরিয়াল” সাম্রাজ্য। আরেকদিকে শত শত আলোকবর্ষ দূরে তেমন “হাইনেসেনপোলিস”-এ টিকে আছে “ফ্রি প্লানেটস অ্যালায়েন্স” সরকার আর তার জনগণ, সাম্যবাদের ঝান্ডা উড়িয়ে, গনতন্ত্রের ধারক ও বাহক হিসেবে।
আর দেড় শতাব্দী ধরে এই দুই মতবাদের যুদ্ধ চলে আসছে, মহাকাশে। দখলের লড়াই। গনতন্ত্র, না একনায়কতন্ত্র? কোনটা বেছে নিবেন আপনি? সমান অধিকার নাকি প্রজাত্ব? গণতন্ত্র অবশ্যই? আসলেই কী ব্যাপারটা এতো সহজ?

স্পেস ক্যালেন্ডার ৭৯৬। ইম্পেরিয়াল ক্যালেন্ডার ৪৮৭।
ব্যাটল অফ আসতার্তে-তে মুখোমুখি হল ইম্পেরিয়াল আর অ্যালায়েন্স সৈন্যদল।
ইম্পেরিয়াল সৈন্যদের নেতৃত্বে এক যুবক ফ্লিট কমান্ডার; সবকিছু হারানো, প্রতিশোধস্পৃহা যার জ্বালানী আর অনন্যসাধারন নেতৃত্ব যার অস্ত্র – রাইনহার্ড ভন মুসেল। প্রথমবারের মত দেখালো তার ঝলক।
অ্যালায়েন্স এর সৈন্যদের নেতা না হয়েও এই ব্যাটল অফ আসতার্তে-তে প্রথম প্রচারের আলোয় আসলো প্রায় ত্রিশ ছোঁয়া এক অ্যাডমিরাল; মিলিটারিতে যোগ দেওয়ার ইচ্ছা যার কখনোই ছিলো না, বরং ইতিহাসবেত্তা হওয়ার স্বপ্নদেখা, “মিরাকল ইয়াং” – ইয়াং ওয়েনলী।
তারা একে অপরের সরাসরি মুখোমুখি হল না। কিন্তু এই ব্যাটল অফ আসতার্তে-তে প্রথম বয়ে গেল এক পরিবর্তনের বাতাস। ঝড়ের পূর্ভাভাস নিয়ে।
আর এখান থেকেই তাদের গল্পের শুরু, সমান্তরালে।
তাদের দৈরত্ব্যের গল্প।
তাদের উত্থানের গল্প।
তাদের পতনের গল্প।
তাদের পুনোরুত্থানের গল্প।
রাইনহার্ড আর ওয়েনলী – এই দুই মহাকাশীয় নায়কের কিংবদন্তী।

ইয়োশিকি তানাকার লেখা উপন্যাস সিরিজের গল্প অবলম্বনে বের হওয়া লেজেন্ড অফ দ্য গ্যালাক্টিক হিরোস এর মূল গল্প হল ১১০ পর্বের ওভিএ (আর ডালাপালা ছড়ানো সাইডস্টোরি, প্রিকুয়াল নিয়ে আরো একটা ৫২ পর্বের সিরিজ আর ৫-৬টা মুভি, দেখা আবশ্যকীয় না)। যার চার সিজন, যথাক্রমে ২৬, ২৮, ৩২ ও ২৪ পর্বের এবং যা প্রচারিত হয়েছে যথাক্রমে ১৯৮৮-৮৯, ১৯৯১-৯২, ১৯৯৪-৯৫ ও ১৯৯৬-৯৭ সালে।

প্রতি দুই বছরে গড়ে মাত্র ২৮ পর্ব। লেজেন্ড অফ দ্য গ্যালাক্টিক হিরোসের অ্যানিমেশন তো বেশ উচ্চমানেরই আশা করা যায়, না? এদিকেই আপনি প্রথম আশাহত হবেন। ‘৮০-এর শেষ কিংবা ‘৯০-দশকের অন্যান্য সেরা অ্যানিমের সাথে তুলনা করলে লেজেন্ড অফ দ্য গ্যালাক্টিক হিরোস-এর অ্যানিমেশন পিছিয়েই থাকবে। যদিও প্রতি সিজনে ক্রমশ উন্নতি হয়েছে, কিন্তু শুধু আধুনিক অ্যানিমেশনের ভক্ত হলে তা আপনার তৃষ্ণা মেটানোর জন্য হয়তো যথেষ্ট না।

3

সাই-ফাই স্টোরি – রোবট, অটোমেটিক অস্ত্র, স্পেসশীপের অসাধারন অ্যাকশন সীন? আপনি তাও পাবেন না। স্পেসশীপ গুলো খুব সাধারন, যুদ্ধের দৃশ্যগুলো অধিকাংশ সময়ই শূধু মনিটর স্ক্রিনের কিছু ত্রিভুজ আর চতুর্ভুজের “ফর্মেশন”-এই সীমাবদ্ধ।

4

হার্ড সাই-ফাই হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা জন্য যদি আপনি বৈজ্ঞানিক যুক্তির আতশ-কাঁচের নিচে রাখেন তবুও হতাশ হবেন।
পেসিং? প্রতিটি সিজনই একটি ক্লোজার দিয়ে শেষ হয়, তাই প্রতিটি সিজনের প্রথম পর্বগুলো বেশ ধীর। বিশেষ করে প্রথম সিজনের গল্প ভালোভাবে শুরু হতে, লেজেন্ড অফ দ্য গ্যালাক্টিক হিরোস এর ইউনিভার্স সম্পর্কে ভালোভাবে ধারণা পেতে আপনাকে পার করতে হবে প্রায় ১৩-১৪ টি পর্ব।
লেজেন্ড অফ দ্য গ্যালাক্টিক হিরোস এর পরিচালনাতেও বিশেষ কিছু পাবেন না, অন্তত অন্যান্য “সেরাদের সেরা” অ্যানিমের তুলনায়। অ্যানিমেটোগ্রাফি খুবই সাধারন, মাঝে মাঝে একঘেঁয়ে। পর্বে পর্বে ক্লিফহ্যাঙ্গার নেই, নেই হঠাৎ কোন টুইস্টও। এর গল্পের বাঁক আপনি খুব সহজেই আঁচ করতে পারবেন এবং বেশ আগে থেকেই। অন্যান্য “সেরাদের সেরা” অ্যানিমের তুলনায় এর “মাইনাস পয়েন্ট”-এর সংখ্যা অনেক বেশি।

কিন্তু অন্যান্য যেকোন অ্যানিমের তুলনায়, “যেকোন” অ্যানিমের তুলনায় লেজেন্ড অফ দ্য গ্যালাক্টিক হিরোস এর “প্লাস পয়েন্ট” ও অনেক অনেক বেশি।

এর সবচেয়ে সেরা দিক? এর সংলাপ আর সংগীত। স্পেস অপেরার থেকে যা আশা করা করবেন, ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ, নাটুকে আর দার্শনিক।

5- democracy
6
7

কিন্তু লেজেন্ড অফ দ্য গ্যালাক্টিক হিরোস শুধু এখানেই সীমাবদ্ধ না। এই অ্যানিমে আপনাকে যেমন ভাবাবে, তেমন দিবে নির্মল বিনোদনও। সেন্স অফ হিউমার অসাধারন। বাস্তবিক আর সহজাত। অন্যান্য বর্তমান বেশিরভাগ অ্যানিমের মতই জোর করে হাসানোর (অপ)চেষ্টা না।

8
9
10

আবহ সংগীত মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখার মত। মোজার্ট, বেটোফেন, বাখদের ধ্রুপদী যন্ত্রসংগীত যুদ্ধের দৃশ্যগুলোর প্রাণসঞ্চারক।

আর এর আর্ট গুমোট, মধ্যযুগীয় পেইন্টিং এর মত। অ্যানিমেটার “আভিজাত্য”-এর প্রতিকও কি না?

এর সবচেয়ে সেরা দিক? এর চরিত্র। ১১০ পর্বের যেকোন অ্যানিমেতে সর্বোচ্চ কয়জন চরিত্র থাকতে পারে? লেজেন্ড অফ দ্য গ্যালাক্টিক হিরোস এর শুধু গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের সংখ্যাই প্রায় অর্ধশতাধিক। এবং তারা আপনার দেখা, বর্তমান, অতীতের আর সব মানুষের মতই বাস্তব আর ত্রুটিযুক্ত। কোড গিয়াসের মত ওয়ান-ম্যান-শো ও না, ডেথনোটেরর মত টু-ম্যান-শো ও না। হ্যাঁ, রাইনহার্ডের অসাধারণ নেতৃত্ব গুণ আপনাকে মুগ্ধ করতে পারে, আপনি অভিভূত হতে পারেন ওয়েনলী বুদ্ধিদীপ্ত রনকৌশল দেখে। রাইনহার্ড আর ওয়েনলী প্রধান হলেও গল্পে ইউলিয়ান, কিরকিয়াইস, গ্রীনহিল, রয়েন্টাল আর মিত্তারমায়ারদের অবদান আর প্রভাবও প্রবল। সিরিজের প্রথমে পার্শ্বচরিত্র মনে হওয়ারাও পরে বড় কিছুর অংশে জড়িয়ে যাবে। আমাদের নায়কদের পরিবর্তন আসবে, শারীরিকভাবে, মানসিকভাবে, ছয়টি বসন্তব্যাপী, বদল আসবে অন্যান্য চরিত্রদেরও। সিরিজের মাঝখানে যখন কেউ চার-পাঁচ বছর আগের কোন ঘটনার কথা উল্লেখ করবে তখন তা ফ্ল্যাশব্যাক না, আসলেই চার-বছর আগের ঘটা। আপনি তা দেখে এসেছেন, আপনি তার অংশ ছিলেন।
এটা শুধু এই দুজনের ভাবাদর্শগত পার্থক্যের যুদ্ধেরও গল্প না, সমগ্র মানব্জাতিরই যুগ যুগ ধরে চলে আসা যুদ্ধ-বিগ্রহের গল্প। আপনি এই গল্প দেখবেন রাজাদের চোখ থেকে, সরকারের উচ্চতর কর্মকর্তাদের চোখ থেকে, সৈন্যদের চোখ থেকে, সাধারণ মানুষের চোখ থেকে, কু আর অপসংষ্কারে আটকে থাকা গোঁড়াদের চোখ থেকেও। লেজেন্ড অফ দ্য গ্যালাক্টিক হিরোস পক্ষপাতবিহীন, মানবিক গল্প।

এর সবচেয়ে সেরা দিক? এর গল্প। যখন বলব অ্যানিমে মাধ্যমেরই সর্বসেরা গল্প, তখন হয়তো বিশ্বাস করতে কষ্ট হবে। মনস্টার, ফুলমেটাল ব্রাদারহুডরা এর থেকে ভালো “অ্যানিমে” হতে পারে, কিন্তু লেজেন্ড অফ দ্য গ্যালাক্টিক হিরোস এর গল্পের কাছে তারা হার মানবে। না এটাতে কোন মাথা ঘুরিয়ে দেওয়া কোন কনসেপ্ট নেই, প্রচন্ড প্যাঁচ লাগা কোন রহস্যও নেই – লেজেন্ড অফ দ্য গ্যালাক্টিক হিরোস বাস্তব আর সাধারন। সম্ভবত যুদ্ধ আর রাজনীতি নিয়ে টিভিতেই প্রচারিত হওয়া সবচেয়ে বাস্তব এবং সাধারন ফিকশনাল শো। গণতন্ত্র, একনায়কতন্ত্র, অভিজাততন্ত্র, নির্বাচন, সরকার, দূর্নীতি, ধর্মব্যবসা, টেরোরিজম, অভ্যুত্থান, আন্দোলন, গৃহযুদ্ধ, ষড়যন্ত্র – লেজেন্ড অফ দ্য গ্যালাক্টিক হিরোস হল সমাজ বই। রাজনীতি/অপরাজনীতির এত ভালো শিক্ষক আর পাবেন না। ইতিহাস আর যুদ্ধ? এতে মানুষ মারা যাবে, অগণিত; সম্ভবত যেকোন অ্যানিমের মধ্যে সংখ্যাটা সবচেয়ে বেশি। যুদ্ধে মারা যাবে, আত্নহত্যায় মারা যাবে, দূর্ঘটনায় মারা যাবে, টেরোরিজমে মারা যাবে, গণহত্যায় মারা যাবে, গুপ্তহত্যায় মারা যাবে।
“Heroes do not neccessarily die heroic deaths” – এই চরম সত্যটাও খুব ভালোভাবে বুঝিয়ে দিয়ে যাবে।
আগেই যেটা বলেছি পর্বে পর্বে ক্লিফহ্যাঙ্গার নেই, টুইস্টও। সময়ে সময়ে বুদ্ধিরখেলাটা শুধু দ্বিমুখীই না – ত্রিমুখী, চতুর্মুখী এমনকি পঞ্চমুখীও। কিন্তু তবুও গল্পের বাঁক আপনি খুব সহজেই আঁচ করতে পারবেন এবং বেশ আগে থেকেই। আর এখানেই এর অসাধারণ গল্পের মহাত্ব্য, আপনি অনিবার্যের অপেক্ষা করবেন্ অসহায়ভাবে। লেজেন্ড অফ দ্য গ্যালাক্টিক হিরোস একই সাথে “সাহসী” গল্পও।

এসব কিছুর পরও এই অ্যানিমেটা একটা নির্দির্ষ্ট দর্শকের কাছেই সীমাবদ্ধ কেন? কারণ লেজেন্ড অফ দ্য গ্যালাক্টিক হিরোস হল আমার দেখা সবচেয়ে “ম্যাচুর” অ্যানিমে। রাজনীতি, ইতিহাস আর যুদ্ধবিগ্রহ, যাতে আবার ভালো কোন অ্যাকশন নেই, নায়কদের অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা নেই – তা বেশির ভাগ মানুষের কাপেরই চা না। সংলাপ নির্ভর, কাহিনী নির্ভর, চরিত্র নির্ভর অ্যানিমের ভক্ত না হলে আপনাকে এই অ্যানিমে ১১০ পর্ব ধরে আকর্ষন করতে পারবে না।
কিন্তু আপনি যদি ভালো কিছু দেখতে চান, আসলেই খুব ভালো কিছু দেখতে চান, তাহলে প্রস্তুত হোন। এখন বেশ সস্তা হয়ে যাওয়া “এপিক” শব্দটার আদি ও অকৃত্রিমতার জন্য। ১১০ পর্ব আর ৬ বছর আর পুরো মহাকাশ জুড়ে চলা বিশাআআআআআল এক কাহিনীর জন্য। “কাইজার” রাইনহার্ড আর “মিরাকল” ইয়াং – ছায়াপথের ইতিহাস চিরদিনের জন্য বদলে দেওয়া এই দুই নায়কের ধ্রুপদী, অভিজাত আর মহাকাব্যিক এই কিংবদন্তীর জন্য। অ্যানিমের ইতিহাসের সর্বকালের সর্বসেরা গল্প আপনার জন্য প্রস্তুত।

রেটিংঃ ★★★★★

Comments

comments