Redline [মুভি রিভিউ] — Shifat Mohiuddin

Redline 1

REDLINE
জনরা: সাইন্স-ফিকশন, কার-রেসিং 
স্টুডিও: ম্যাডহাউজ
সাল: ২০১০
দৈর্ঘ্য: ১০২ মিনিট

দেখে ফেললাম রেডলাইন। ২০১০ সালের মুভি তবে আলোচনা কমই হতে দেখেছি মুভিটা নিয়ে। মুভিটার খোঁজ কোন রিভিউ-ব্লগ থেকে পাই নি। পেয়েছিলাম এনিমে ইউটিউবার Gigguk এর একটা মজার ভিডিও থেকে। গিগাকের একটা ভিডিওতে দেখা যায় মিয়াজাকিরূপী স্টুডিও জিবলি ম্যাডহাউজকে ব্যঙ্গ করছে একটা goddamn মুভি বানানোর পেছনে সাত বছর পার করা নিয়ে। আমি তখনই ভাবলাম যে, ম্যাডহাউজের মত শক্তিশালী স্টুডিওকে সাত বছর ঘোরাতে পারে এমন কী জিনিস থাকতে পারে! নেট-টেট ঘেঁটে জানলাম সেই জিনিস হল ‘রেডলাইন’ আর মুভির পোস্টারের বাহার দেখেই চোখ কপালে উঠলো। অবশেষে দেখেই ফেললাম আর ম্যাডহাউজের সাত বছরের পরিশ্রম যে উশুল হয়েছে তা না বলে উপায় নাই। ‘রেডলাইন’ কোন মুভি নয় বরং একে একটা বিস্ফোরক অভিজ্ঞতা বলা উচিত।

প্লট: রেডলাইনের দুনিয়াটা সুদূর ভবিষ্যতের যেখানে কার রেসিং খুব জনপ্রিয়। তবে সেখানকার রেসিং কারের সাথে আমাদের রেসিং কারের আকাশ-পাতাল তফাত। ভয়ানক রকমের দ্রুতগতিসম্পন্ন বিশাল বিশাল যান্ত্রিক দেহওয়ালা সেই রেসিং কারগুলোকে মানুষ-এলিয়েন সবাই সমানতালেই চালায়। আর সেই দুনিয়ার কার রেসিং এর সবচেয়ে বড় টুর্নামেন্টের নাম হল ‘রেডলাইন’। গল্পের নায়ক
JP কে দেখা যায় সেই টুর্নামেন্টের বাছাইপর্ব ‘ইয়োলো লাইনে’ অংশগ্রহণ করতে। ভয়ানক রকমের বিপদজনক কিছু স্টান দেখিয়ে JP রেস জয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌছে যায়। কিন্তু JP ইতোমধ্যেই মাফিয়া বসদের সাথে ম্যাচ পাতানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছে। তাই তাকে রেসে প্রথম স্থান বিসর্জন দিতে হয়। কিন্তু প্রথম না হওয়ার পরও JP রেডলাইনে অংশগ্রহণের সুযোগ পায় দর্শকদের ভোটের কারণে! রেডলাইনের ভেন্যু হিসেবে ঘোষণা করা হয় ‘রোবোওয়ার্ল্ডকে’ যেখানকার সাইবর্গ সরকার আবার রেডলাইন রেসকে দুচোখে দেখতে পারে না। সেই সরকার তাই সচেষ্ট হয়ে উঠে রেস বানচাল করার জন্য কিন্তু এর মধ্যেই রেসে নেমে পড়ে রেসের আট প্রতিযোগী। JP এর সাথে রেসে আছে চারবারের রেডলাইন চ্যাম্পিয়ন ‘মেশিন হেড’ ও ইয়োলো লাইন চ্যাম্পিয়ন সুন্দরী ‘সোনোশি’। রেসটা একপর্যায়ে JP এর জন্য পরিণত হয় মাফিয়া, রোবট সেনাবাহিনী আর নিজের উচ্চাকাঙ্ক্ষার মধ্যকারের লড়াইয়ে।

আগেই একবার বলেছি রেডলাইন কোন এনিমের নাম নয়, এটি একটি ‘অভিজ্ঞতার’ নাম। মুভিটা দেখলে কথাটা আপনাদের একটুও অত্যুক্তি মনে হবে না। রেডলাইন ডিরেক্টর Takeshi Koike এর প্রথম পূর্ণাঙ্গ কাজ। প্রথম কাজেই তিনি সৃজনশীলতার পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে দিলেন। রেডলাইনের অ্যানিমেশনের কথাই প্রথমে বলি। এমন অ্যানিমেশন যে জাপানে তৈরি হতে পারে তা সহজে বিশ্বাস হতে চাইবে না। রেডলাইনের পুরো দুনিয়াটা আশি আর নব্বইয়ের দশকের কমিকবুকের আদলে তৈরি। আকাশ-বাতাস, ল্যান্ডস্কেপ, পাহাড়-পর্বত সবকিছুতেই একটা অদ্ভুত তারল্য লক্ষ করা যায়। মনে হয় পিসির স্ক্রিনটা একটুখানি নড়ালেই সবকিছু ভেঙ্গে পড়ে যাবে। পুরো এনিমের প্রতিটা ফ্রেমেই একটা কালচে আউটলাইনার ছিল অবজেক্টগুলার গায়ে যার ফলে সবকিছুকে অনেক জান্তব মনে হচ্ছিল। আসলে রেডলাইনের অ্যানিমেশনকে ব্যাখ্যা করতে গেলে হয়তো শব্দের অভাবেই ভুগতে হবে। পুরো এনিমেটাই ছিল ভয়ানক রকমের রঙিন। রেসিং কারগুলার বডির কালার ছিল চোখে পড়ার মত আর চরিত্রগুলোর দেহে নানা রঙের আউটফিট থাকায় একটা গ্রাফিটি গ্রাফিটি ভাব ছিল। গাড়িগুলো যখন রেস করতে থাকে তখন মনে হয় পেছনে একটা রঙের বন্যা বুঝি বয়ে গেছে। নিট্রো জিনিসটা গেইমে-টিভিতে অনেকবার দেখেছি কিন্তু রেডলাইনের নিট্রো দেখিয়ে দিল দেহের রক্তচাপ কিভাবে বাড়াতে হয়।

অ্যানিমেশনের ধারণা মানুষের মধ্যে কিভাবে এল? আমার মতে মানুষ যখন তার মনের আপাত অবাস্তব ও অসম্ভব ধারণাগুলো বাস্তব দুনিয়াতে বাস্তবায়ন/দৃশ্যায়ন করতে পারলো না তখনই অ্যানিমেশনের সাহায্য নিল। রেডলাইনকে এই হিসেবে অ্যানিমেশন জগতের অ্যানিমেশন বলা যায়। মানে একই সাথে এত এত পাগলাটে ঘটনার দৃশ্যায়ন ১০২ মিনিটে হয়েছে যে একে এনিমের মত অস্বাভাবিক জিনিসের মাপকাঠিতেও মাপা যাবে না। রেস বাদ দিয়েও স্পেইসশিপ ব্যাটল, প্রোজেক্টাইল ওয়েপনের মহড়া, ব্যাটলের ফলে পাহাড়-পর্বত কাগজের মত গুড়ো হয়ে যাওয়া, হ্যান্ড টু হ্যান্ড কমব্যাট এমনকি ঐতিহ্যবাহী কাইজু ব্যাটলও (Battle between monsters) ঠেসে ঢোকানো হল একটা রেসে। রেসের ল্যান্ডস্কেপ এত উল্টাপাল্টা রকমের ছিল যে পেইন ভার্সাস নারুতোর ফাইটের বিক্ষিপ্ত ল্যান্ডস্কেপও হার মানবে। গাড়ির স্পিড বাড়ানোর মুহূর্তগুলো এত উজ্জ্বল ছিল যে আলোর ঝলকানির কারণে চোখ পুরো ঝলসে যাওয়ার মত অবস্থা! নিট্রো দেওয়ার সময় চারপাশের স্পেইস মুভিতে এত ভয়ানকভাবে বেন্ড করছিল যে এক দৃশ্যের থেকে আরেক দৃশ্যে তাল মেলাতে পারছিলাম না। মেশিন হেডের সাথে ফাইনাল মুখোমুখির সময় দৃশ্যায়ন এত দ্রুত হয়েছিল যে কয়েকবার পজ করে স্ক্রিন আগুপিছু করিয়েছি শুধুমাত্র এটা বোঝার জন্য যে চারদিকে এসব ঘটছে! মুভি রেসিং কার নিয়ে তৈরি ঠিক আছে কিন্তু এর ফলে দৃশ্যায়নও যে রেসিং কারের গতিতে হবে তা কে জানতো! তাতামি গ্যালাক্সির মত এনিমেগুলাতে প্লেবেক স্পিড কমিয়ে দেখতে হয় সাবটাইটেল পড়ার জন্য, আর রেডলাইনে প্লেবেক স্পিড কমাতে হয়েছে জাস্ট what the hell is going on তা অনুধাবন করার জন্য।

এত দ্রুতলয়ের এনিমেতে যদি দ্রুতলয়ের মিউজিক না থাকে তাহলে তো উত্তেজনা ধরে রাখা সম্ভব না। সেই দিক দিয়েও হতাশ হই নি। টেকনো ধাঁচের দুর্দান্ত মিউজিক কম্পোজ করেছেন মিউজিক ডিরেক্টর James Shimoji. ইঞ্জিনের গর্জনকে দুর্দান্ত সঙ্গ দিয়েছে ট্র‍্যাকগুলো।Redline ও Yellow Line ট্র‍্যাকদুটো রেসের ইনটেনসিটির সাথে পুরোপুরি মানিয়েছিল। তবে সবচেয়ে বেশী অ্যাড্রেনালিন রাশ হয়েছিল ‘Machine Head’ ট্র‍্যাকটা শোনার পর। চারবারের চ্যাম্পিয়নের ভাবমূর্তির যথোপযুক্ত ট্র‍্যাক। চারটে দুর্দান্ত ইংরেজি গানও ছিল মুভির পশ্চিমাভাবের সাথে তাল মেলাতে। And it’s so beautiful গানটাতে আবেদনের মাত্রা বেশীই ছিল আর Redline Day গানটা যেন পুরো মুভির ভাবই বহন করছিল।

রেডলাইন মুভির যে জিনিসটা সবার চোখে পড়তে পারে তা হল এর গল্পের অগভীরতা। যদিও JP এর পাতানো খেলা সংক্রান্ত অন্ধকার অতীত ও উচ্চাকাঙ্ক্ষার ব্যাপারগুলো আরো গভীরতা পেতে পারতো তবে মুভির দ্রুতলয়ের কারণে তা আর বোঝা যায় নি। মেশিনহেড মেইন রাইভাল হওয়ার পরেও তার দর্শনের একটু-আধটূ ইঙ্গিত পাওয়া যায় মাত্র। সোনোশি আর JP এর সম্পর্কটা আরেকটু বিস্তৃত হতে পারতো। রোবোওয়ার্ল্ডের সরকারের বিরোধিতার পেছনের ideology কে হয়তো ইচ্ছে করেই হাস্যকরভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। আসলে সিরিয়াস কোন রেসিং স্টোরি দেখতে চাইলে হয়তো রেডলাইন প্রথম চয়েস নাও হতে পারে। কিন্তু এন্টারটেইনমেন্টকে মাথায় রাখলে রেডলাইনই হবে এক নাম্বার রেসিং মুভি। হয়তো এসব জিনিস ডিটেইলে ব্যাখ্যা করা হলে মুভিটা এত উপভোগ্য হত না।

সাত বছর ধরে একটি মুভির পেছনে খাটাখাটির ফলাফল কী হতে পারে তা রেডলাইনের অ্যানিমেশন দেখে বুঝলাম। প্রায় ১০০০০০ এর মত হাতে আঁকা ফ্রেমের সমন্বয়ে রেডলাইকে পর্দায় আনা সম্ভব হয়েছে! যেখানে একটা ৪৫ মিনিটের মুভির জন্য চাহিদাভেদে ৯০০-১২০০ ফ্রেম লাগে। একদল অসম্ভব রকমের প্যাশন থাকা মানুষের কারণেই রেডলাইনের মহাকাব্যিক অ্যানিমেশন তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। রেডলাইন আধুনিক অ্যানিমেশনের চূড়া সেই ২০১০ সালেই এঁকে দিয়েছে। যারা OPM এর সাইতামা ভার্সাস বোরোসের ফাইট দেখে চোখ কপালে তুলেছেন তারা রেডলাইন মুভিটা দেখে থাকলে পুরো ১০২ মিনিটই চোখ কপালে তুলে রাখবেন।

রেডলাইনের কিছু কিছু মুহূর্ত আজীবন মনে রাখার মত। নিট্রো দেওয়ার পর JP এর দাঁত-কপাটি লেগে যাওয়া চেহারা কে ভুলতে পারবে! রেডলাইন রেসের শেষমুহূর্তে JP এর বলা, I have got the goddess on my side” কথাটা চমৎকার ছিল। মেশিনহেডের বারবার ট্রান্সফর্ম হওয়া দেখে হালই ছেড়ে দিয়েছিলাম। ফ্রিসবি আর বুড়ো মোল আর অন্য সব চরিত্রের কৌতুকগুলাও ভাল ছিল। পুরো মুভিটাতেই একটা আবেদনময়ী ভাব প্রকট ছিল যা লক্ষ্য করেছিলাম কাউবয় বিবপ আর সামুরাই চ্যাম্পলুতে।

সবমিলিয়ে রেডলাইন যেন একটা বোমার মত এসে অ্যানিমেশন দুনিয়াকে কাঁপিয়ে দিয়ে গেল। তাই নিছক কোন মুভি নয়; বিস্ফোরক, রঙিন, আবেদনময়ী এবং ভয়ানক দ্রুতগতির এক অভিজ্ঞতার নাম রেডলাইন। চাদরে জড়সড়ো হয়ে থাকা যুবকের দেহে রেসিং কারের ইঞ্জিনের উন্মুক্ততা এনে দেওয়ার নাম রেডলাইন। দুর্দান্ত সব কার স্টান্টের মাধ্যমে দর্শকের চোখে স্বপ্ন এঁকে দেওয়ার নাম রেডলাইন।

MAL রেটিং: ৮.৩৩/১০ (জনগণের ভালই লেগেছে বোঝা গেল)
আমার রেটিং: ৯/১০

Redline 2

Comments

comments