Paradox Paradigm (Kara no Kyoukai, EP 5) [অ্যানালাইসিস] — Amor Asad

KnK 5

গার্ডেন অফ সিনারস দেখতে গিয়ে মনে হলো এটা নিয়ে big pile of shit লিখবো কোন এক সময়, তবে পাঁচ নম্বর এপিসোড Paradox Paradigm বিশেষ নজরে আসায় স্থগিত করতে মন চাইলো না। সিরিজটা দেখে ফেলেছি এবং পুরো সিরিজে এটা সবচেয়ে পছন্দের এপিসোড। কারণ সমেত এটা তাই—মাঝারি pile of shit.

প্রথমত, পুরো সিরিজে এটা সম্পূর্ণ একটা গল্প। এর আগের এপিসোডগুলো একটার সাথে একটা জড়িত মনে হয়েছে, স্বতন্ত্র মনে হয়নি। প্যারাডক্স প্যারাডাইম ওই গল্পগাথার সাথে জড়িত হলেও, একে আলাদা ভাবে দাঁড় করানো যায়। অন্যতম মূল চরিত্র Tomoe-এর পরিচয় পর্ব, মূল গল্পের সাথে তাঁর সম্পৃক্ততা, তাঁর সাথে Shiki-র যোগাযোগ পর্ব এবং একই সময়কালে Tauko এবং Kokutou এর অবস্থান, শিকির উধাও পর্বের সাথে তাঁর কমরেডদের পদক্ষেপ, মূল অ্যান্টাগনিস্টের পরিচয় পর্ব ও পুরো ব্যাপারে তাঁর ভূমিকা সবকিছু একটা গল্পের নানা অংশ যা অন্য এপিসোডগুলোর উপর নির্ভরশীল না। শিকি হয়তো সিরিজের প্রোটাগনিস্ট কিন্তু এই গল্পের চাবিকাঠি ছিলো Tomoe.
এছাড়া গল্পটা যে চমৎকার, এটা আলাদা করে বলছি না।

মেকার নন-লিনিয়ার স্টোরিটেলিং ব্যবহার করে ভালো কাজ করেছেন। সোজা সাপ্টাভাবে গল্প এগোলে ভালো লাগতো ঠিকই, কিন্তু এখন যেমন মনে হয়েছে, অতটা হয়তো লাগতো না।

দ্বিতীয়ত, মন্টেজ এর সঠিক ব্যবহার। মন্টেজ ফিল্মমেকিং এর একধরনের টেকনিক, যেখানে একাধিক এলোমেলো ছবি যোগ করে কোন অর্থ প্রকাশ করা হয়। যেমন, কারো পা দেখা গেলো, এর পর একটা রোড দেখানো হলো, ক্লোজ শটে একটা গাড়ি দ্রুত বেগে ধেয়ে আসা দেখানো হলো, আরেকটা শটে দেখান হলো একজন রাস্তায় পড়ে আছে, গায়ে রক্ত। এই এলোমেলো শটগুলো দিয়ে বোঝানো যায় রোড-অ্যাকসিডেন্ট ঘটেছে।

মন্টেজের ব্যবহার অ্যানিমেতে প্রচুর দেখা যায়। বিশেষ করে মাকোতো শিনকাই একদম খামোখা ব্যবহার করেন। স্রেফ একটা বিশেষ আবহ আনতে। এই কাজ অবশ্য Garden of Sinners-এও আছে, হাবিজাবি শট এক করে একটা আবহ আনার চেষ্টা। কিন্তু এর মাঝেও একটা অংশ আছে যখন মন্টেজের ভালো ব্যবহার ছিলো।

Tomoe শিকির ঘরে থাকা শুরু করলো, দিন পার হয়ে যাওয়া বোঝাতে দরজার হ্যান্ডেল ঘোরানো, বেসিনে কাপের পর কাপ আইসক্রিম জমা হওয়া আবার ফাঁকা হওয়া এরকম একগাদা সদৃশ ফ্রেম ব্যবহার করা হয়েছে।

এখানে সফলতাটা হচ্ছে, যে সময়ের ভিতর দেখানো হয়েছিলো সেই সময়ে স্রেফ কোন একটা চরিত্রকে দিয়ে বলানো যেত, ‘অনেকদিন পার হয়ে গেছে।’— কিন্তু মন্টেজ দিয়ে আক্ষরিকভাবে সময়পার হবার একটা আপেক্ষিক রূপ দর্শককে দেখানো হচ্ছে। এতগুলো আইসক্রিম খেতে কতদিন সময় লাগতে পারে একটা খসড়া হিসেব হয়ে যায় মনে মনে।

তৃতীয়ত, পয়েন্ট অফ ভিউ শট। প্রথমার্ধের শেষে যখন শিকি বন্দি হলো আরায়া সৌরেন এর দেহরুপী ইমারতে, তার পরের কিছু অংশে সরাসরি শিকি-কে না দেখিয়ে পয়েন্ট অফ ভিউ স্টাইল ব্যবহার করা হয়েছে। ব্যাপারটা অনেকটা ফার্স্ট-পার্সন-শুটার গেম এর ভিউ এর মতো। শিকির চোখ এখানে ক্যামেরা, তাঁর চোখে দর্শক দেখছে, কথা শুনছে, কিন্তু তাঁকে দেখতে পাচ্ছে না। প্রথমার্ধের পর শিকিকে না দেখিয়ে কেবল পয়েন্ট অফ ভিউতে দর্শকের মধ্যে এক ধরণের প্রবল কৌতুহল আর টেনশন সৃষ্টি করা হয়। আমি জানি না গল্পের এই পর্যায়ে কাজটা ইন্টেনশনাল ছিলো কিনা, ইনটেনশনাল হলে সত্যিই ব্রিলিয়ান্ট কাজ।

চতুর্থত, ম্যাচ কাট। প্রথমার্ধে বেশ কটা ম্যাচ কাট ছিলো, বিশেষ করে আপাত মূল চরিত্র Tomoe-কে নিয়ে। ম্যাচ কাট বিশেষ ধরণের সিন-ট্রানজিশন, যেখানে একটা দৃশ্যপটের সাথে ভিন্ন আরেকটা দৃশ্যের মিল করা হয় পারিপার্শ্বিকতা মিল করে। এই কাজটা সুচারুরূপে অ্যানিমেতে প্রথম এবং শেষ যাকে করতে দেখেছি, তিনি ক্ষণজন্মা মাস্টারমাইন্ড, সাতোশি কন। ম্যাচ কাট নিয়মিত ব্যবহার করে অনেকেই, কিন্তু স্টাইলিস্ট সিন ট্রানজিশন এর উপায় হিসেবে খুব কমই করে। প্যারাডক্স প্যারাডাইমের কয়েকটা অংশ হুট করে কন-এর কথা মনে করিয়ে দিয়েছিলো।

এটা অবশ্য অ্যানিমের পক্ষে খুব শক্তিশালী কোন প্রমাণ নাও হতে পারে, হতে পারে কেবলই কনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থেকে অযথাই মেলাচ্ছি।

যাই হোক, কেবল এই এপিসোডের জন্যে আমার রেটিং ৯/১০
ভালো থাকুন, ভালো অ্যানিমে দেখুন।

Shiki [রিভিউ] — Amor Asad

Shiki

সোতোবা নামের গ্রামটা মোটামুটি নিরিবিলি, অল্প কিছু মানুষের বাস। দেশ উন্নত বলে সভ্যতার ছোঁয়া পৌঁছেছে, যতটুকু না হলেই নয়। তবুও সবুজ ঠিকরে বেরোয়। শহুরে জোম্বিদের আশ্রম, অনেকেই বায়ু পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে আসে। চাষাবাদ করে গ্রামের অধিবাসীরা। অবসরে ভুড়ি এলিয়ে এর ওর নামে উড়ো কথা ছড়ায়।
শহুরে জোম্বিরা এরকম গ্রামে গেলে বিহবল হবে। প্রথমে আনন্দের আতিশয্যে, পরেরবার করার মত কাজ খুঁজে না পেয়ে।
কিন্তু সোতোবায় কেউ বসে নেই। গ্রামে মড়ক লেগেছে। একের পর এক গ্রামবাসী মারা যাচ্ছে। মৃত্যুর আগে সবার লক্ষণ এক।
মহামারী নয়তো? — স্থানীয় ডাক্তার ভাবে।
দু’চারজন মৃত ব্যক্তিকে আবার চলতে ফিরতে দেখা গেলো। এ কী করে সম্ভব? ডাক্তারের ব্যাখ্যার জন্যে বসে নেই স্থানীয় ওঝা। প্রচার করে বেড়ালো, গ্রামের এক কোণে বড় প্রাসাদ। নতুন অধিবাসী এসেছে শহর থেকে। ওরাই সব মৃত্যুর কারণ, ওরাই মৃতদের জাগিয়ে তুলছে।

মিস্টেরি/ভ্যাম্পায়ার ঘরানার এই সিরিজখানা নিজের বক্তব্যে নিশ্চিত না। খেলো দর্শন কপচানো বড় একটা অংশ জুড়ে। ভ্যাম্পায়ারদের মানুষ হত্যাকে বেচে থাকার জন্যে অত্যাবশ্যক হিসেবে দেখায় মানুষের পশু ভক্ষণের উদাহরণ দিয়ে। মিথোলজিতে ভ্যাম্পায়ার অশুভের প্রতীক, ইশ্বরবিমুখতার প্রতীক। শিকি সিরিজখানা মিথ এড়িয়ে প্রাকৃতিক বাস্তুসংস্থান দিয়ে একটা দর্শনগত দোটানা তৈরী করতে চায়। কিন্তু এভাবে দেখলে, ভ্যাম্পায়ার আলাদা প্রজাতি না। বিদ্যমান প্রজাতিতে বিকৃতি। প্রাকৃতিক বাস্তুসংস্থানে কোন প্রজাতির সদস্য বিকৃতির স্বীকার হলে অন্যেরা তাঁকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়। পাখির ঝাক বা পিঁপড়া দিয়ে উদাহরণ দেয়া যাবে। মানুষেরাও এর বাইরে না।

সিরিজের গল্পকথন অবশ্য ভাবনার দাবীদার। অনেকাংশে ব্রুটাল। প্রচুর চরিত্রের সমাগম, স্ক্রিনে সময় নিয়ে আসীন হবার দাবীদারও অনেক। ফলে ঘটনা বেশ ধীর গতিতে এগোয়, কিন্তু গল্প সাজানোর ঢঙ্গ আকর্ষণ ধরে রাখতে সক্ষম। এক বসায় দেখে ওটার মত গতিশীলও মনে হতে পারে।

৭.৫/১০

Golgo 13 [রিভিউ] — Amor Asad

Golgo 13 - 01

পেলে পুষে রাজকীয় ঘোড়াটাকে বড় করেছে তরুনী। রেসের ঘোড়া। কিন্তু তরুনীর চাচা মেরে ফেলতে চায় ঘোড়া, পিওর ব্লাড না বলে। একরকম অনার কিলিং বলা যায়। ভাড়া করে হিটম্যান। ঘটনাক্রমে তরুণী জেনে ফেলে হিটম্যানের নাম। তাঁর হোটেলরুমে গিয়ে চেষ্টা করে কনট্রাক্ট বাতিল করার, টাকা-পয়সাসহ সবরকম প্রলোভন দেখিয়ে। প্রিয় পোষ্যর জীবন বাচাতে মরিয়া তরুণী। তাঁর মুখখানি দেখলে যে কারও মায়া লাগবে।
হিটম্যান কী করে? ঘোড়া, ঘোড়ার মালকিন—তরুণী এবং তরুণীর চাচা, তিনজনকেই পরপারে।
.
হিটম্যান জাতীয় সিনেমার সাজেশন খুঁজতে গিয়েছিলাম Reddit-এ। রিকমেন্ডেশনে আসা সিনেমাগুলো সব দেখা থাকলেও, একজন Golgo 13 অ্যানিমে সাজেস্ট করলেন, বেশ জোর দিয়ে। তখনই দেখতে বসেছিলাম। ৫০ পর্ব, একটানা দেখে চারদিনেই শেষ করে ফেলেছি।
.
প্রোটাগনিস্ট Golgo 13 বা Duke Togo বিশ্বসেরা হিটম্যান, এক নম্বর স্নাইপার। তাঁর স্কিলের কাছে ক্রিস কাইলেরা নস্যি। রহস্যময় চরিত্র, চাইলেই খোঁজ পাওয়া যাবে না। তাঁকে ভাড়া করতে চাইলে সেই হাজির হবে। মূল্যও চড়া, প্রতিটা চুক্তির বিনিময়ে গুণতে হবে ৩ মিলিয়ন ডলার।
বিশ্বজোড়া সবাই তাঁর ক্লায়েন্ট। হোক সে মাফিয়া, CIA, FBI, লোকাল কোন বস বা প্রতারিত স্ত্রী। মিশন পছন্দ হলেই গ্রহণ করবে।
.
সিরিজের বৈশিষ্ট্য হলো, পুরোটাই এপিসোডিক, একটা এপিসোডের গল্প ওই এপিসোডেই শেষ। প্রায় প্রতিটা এপিসোডেই কোন না কোন খুনের কনট্রাক্ট এবং তাঁর বাস্তবায়ন দেখানো হয়।
সুতরাং খুব দ্রুতই একঘেয়ে লাগবার কথা। প্রথম দুই/তিন এপিসোডের পরের পাঁচ/ছয়টা এপিসোড লাগেও। সম্ভবত ক্রিয়েটরও বুঝতে পেরেছিলেন। এর পরের এপিসোডগুলোতে অ্যাসাসিনেশনের গল্প থাকলেও বিভিন্ন শর্ত আর জটিলতা যোগ করে গল্পে বিভিন্ন মাত্রা দেয়া হয়েছে। দেখতে ভালোই লাগে তখন। এছাড়া এপিসোডিক সিরিজের প্রতি বিশেষ পছন্দ কাজ করে। ধারাবাহিক গল্পের চেয়ে এপিসোডিক কিছু বিঞ্জ করতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি।
.
এছাড়াও গলগো ১৩ এর চরিত্রায়ন পছন্দ করেছি। “নো উইটনেস” কথাটাকে আক্ষরিকভাবেই নেয়, কনট্রাক্ট কিলিং তাঁর কাছে বাস্তবিকই পেশা, ভালো-খারাপ, শুভ-অশুভের পার্থক্য বা পাপবোধ নিয়ে খুব একটা চিন্তিত নয় গলগো। মানবরচিত নিয়মের সাথে সে কতখানি অসম্পর্কিত, সেটা ভালোভাবে টের পাওয়া যায় সিরিজের ৪৯ নম্বর এপিসোডে।
স্পাইদের মতো রোমাঞ্চকর জীবনে অভ্যস্ত নয় সে, ওম্যানাইজারও নয়। তবে কোন এক অদ্ভুত কারণে প্রায়শই নারীরা তাঁর শীতল, নির্লিপ্ত, পাথরে খোঁদাই মূর্তির প্রেমে পড়ে যায়।
এছাড়া আরেকটা কথা বলে নেয়া উচিৎ হবে, এই সিরিজে এক্সপ্লিসিট সিনের অভাব নেই, হুটহাট হাজির হয়। তাও একদম খুল্লাম-খুল্লা এবং এক দুই সেকেন্ডের নয়। । দর্শকের ব্যাপারটায় সমস্যা থাকলে একা দেখতে হবে।
.
অ্যানিমেশন স্টাইল দেখে মনে হয় কেউ যেন গামার নবটা ধরে জোরে ঘুল্লি দিয়েছে। অনেকটা Kino no tabi-র মতো সাদাটে ভাব। তবে কিনো থেকে কম ডিটেইল্ড ফ্রেমগুলো। চরিত্রগুলোর ডিজাইন কাউবয় বিবপ ঘরানার এবং আবহগত ভাবে মুশিশির সাথে মিল আছে খানিকটা, নৈশব্দ নির্লিপ্ততা বলা যায়।
.
গ্রেট সিরিজ? নাহ। স্ক্রিনপ্লেতে বড় ধরণের সমস্যা আছে।
তবে উপভোগ্য অবশ্যই। এই সিরিজ থেকে মূল পাওনা আসলে Golgo 13 চরিত্র। তাঁকে 47 এর অলটার ইগো বলা যায়।

Golgo 13 - 02

Spirited Away বন্দনা অথবা Roger Ebert-এর চোখে Spirited Away [Translated by Amor Asad]

Spirited Away কেন অ্যানিমেশন জগতের (কেবল জাপানিজ নয়) সেরা ৫ টার একটা, কেন এত রেটিং বেশী— এই প্রশ্নগুলো যদি আপনার মনে জাগে কখনও; তবে এই পোস্ট আপনার জন্যে।
.
দেড় বছর অ্যানিমে কম্যুনিটি গুলোতে ঘোরাঘুরি করার পর বিভিন্ন ফ্যানবেইজ সম্পর্কে হালকা পাতলা ধারণা হয়েছে। বিশেষ করে অ্যানিমে মুভি এবং অ্যানিমে সিরিজের দর্শকদের পার্থক্য চোখে পড়ার মত। দু-ক্ষেত্রেই সমান বিচরণ করে এমন দর্শকের সংখ্যা আনুপাতিক হারে বেশ কম। আবার অনেক সিরিজ দর্শক মুভি একদমই দেখে না। এধরণের কিছু কারণে কোন কোন গ্রেট অ্যানিমে মুভি আলোচিত কম হয়েছে। বিশেষ বাংলাদেশী দর্শকদের ক্ষেত্রে, বাইরের কথা বলা কঠিন। তবে সিনেমাপাড়ায় এই মুভিগুলোর কদর অনেক। অনেক মানে অনেক।
এত কথা বলা এই কারণে যে, লক্ষ্য করেছি এনিমখোরের কেউ কেউ Spirited Away পছন্দ করেননি। ‘কেমন কেমন’ যেন লেগেছে। স্বাভাবিক, স্পিরিটেড অ্যাওয়ে মডার্ন অ্যানিমেটেড ফিল্মে বিশাল পরিবর্তন এনেছিলো এবং যেকোন অ্যানিমেটেড মুভি বা সিরিজ থেকে আলাদা। পশ্চিমা বিশ্ব মিয়াজাকিকে তথা জিবলি স্টুডিওকে চোখ বড় বড় করে দেখেছে এবং তাঁর কাছ থেকে শিখতে চেয়েছে কিভাবে এই সিনেম্যাটিক মাস্টারমাইন্ড কাজ করেন।

ফেসবুকের অন্য আরেকটা অ্যানিমে গ্রুপে তাই স্পিরিটেড অ্যাওয়ে নিয়ে নেতিবাচক মনোভাব আমলে না নিলেও, ‘এনিমখোরে’ এমন ভাবনা থাকাটা আপত্তিকর মনে হয়েছে। বিশেষ করে সপ্তাহখানেক আগে একটা পোস্ট দেখে খানিকটা কষ্ট পেয়েছি। তাই স্পিরিটেড অ্যাওয়ে নিয়ে লেখার ইচ্ছে একদিনের নয়। লিখতে বসে কিন্তু ঝামেলায় পড়েছি, নিরপেক্ষ অবস্থানে থেকে ঔদ্ধত্যপূর্ণ কথা ছাড়া কিভাবে লেখা যায় কেবল সিনেমাটিক সৌন্দর্য নিয়ে তা বুঝে উঠতে পারিনি।
যার কারণে বরেণ্য ফিল্ম ক্রিটিক, যার হাত ধরে ফিল্ম ক্রিটিসিজম জনপ্রিয়তা পেয়েছে, সিনেমা সমালোচনার প্রবাদ পুরুষ রজার ইবার্টের Spirited Away রিভিউ অনুবাদ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। যে কথাগুলো আমার মুখে ঔদ্ধত্য মনে হবে, সেগুলো ইবার্টের মুখে বাস্তবতা। যাই হোক, তাঁর রিভিউটা বেশ বড়ই ছিলো, তবে আগ্রহীরা পড়ে মজা পাবেন মনে করি।

spirited-away-roger-ebert

============
Spirited Away
Roger Ebert
July 11, 2012

হায়াও মিয়াজাকির “Spirited Away” তৃতীয় বারের মত দেখার পর, প্রাচুর্যতা আর ঢেলে দেয়া যত্নের মাঝামাঝি কোন এক শিল্পগুণ আমাকে তাড়িত করেছিলো।
এর আগে যখন দেখেছি তখন গল্পের সীমাহীন কল্পনায় আটকে গিয়েছিলাম। আর এবার যখন দেখতে বসি তখন এমন সব সিনেম্যাটিক উপাদান খেয়াল করতে শুরু করি যেগুলো সিনেমায় না থাকলেও চলত। অ্যানিমেশন আসলে খুব কষ্টসাধ্য একটা প্রক্রিয়া তাই এতে ভিজুয়াল এলিমেন্টস সরজ সরল করে ফেলার একটা চল দেখা যায়। অন্যদিকে মিয়াজাকি বরঞ্চ জটিলতায় বিশ্বাসী। তাঁর অ্যানিমেশনের ব্যাকগ্রাউন্ডগুলো খুঁটিনাটি বিষয়ে ভর্তি, নিঃসঙ্কোচে বিস্তৃত ক্যানভাসে কাজ করেন এবং সবকিছুই গভীর মনোযোগ দিয়ে আঁকা। আমরা সাধারণত সচেতনভাবে কোন মুভির ক্যানভাসের (সম্পূর্ণ স্ক্রিন) কোণার দিক গুলো দেখি না, আমরা না দেখলেও সেগুলো কিন্তু ঠিকই কোণায় থাকে এবং মিয়াজাকির সিনেমায় এই কোণার কাজগুলি তাঁর কল্পনার জগতকে অসাধারণরকম নিখুঁত করে তোলে।

“Spirited Away” নিশ্চিতভাবেই সমগ্র অ্যানিমেশন ফিল্মের মধ্যে সেরাদের একটা এবং এর ভিত্তিপ্রস্তর নির্মিত হয়েছে ট্রাডিশনাল অ্যানিমেশন প্রক্রিয়ার কঠিনতম পদ্ধতিতে, অর্থাৎ ফ্রেম-বাই-ফ্রেম আঁকা। মিয়াজাকি নিজের ক্যারিয়ার এই অ্যানিমেশন স্টাইলে শুরু করেন বটে, কিন্তু তিনি বাস্তববাদী এবং অ্যানিমেশনের কিছু কুঁড়ে কাজ কম্পিউটারে করে থাকেন। কিন্তু তিনি ব্যক্তিগত ভাবে হাজার হাজার ফ্রেম নিজ হাতে আঁকেন।
“আমরা হাতে আঁকা একক অ্যানিমেশন ফ্রেমগুলো নিয়ে পরবর্তীতে ডিজিটাইজ করি ভিজুয়াল দিকটা সমৃদ্ধ করতে। কিন্তু সবকিছুর শুরুটা হয় মনুষ্য হাতে আঁকা ফ্রেম থেকে।”— ২০০২ সালে আমাকে বলেন মিয়াজাকি।

“Spirited Away” থেকে একটা দৃশ্য ধরা যাক যেখানে কিশোরী নায়িকা জাদুময় বাথহাউজ থেকে বের হবার ব্রিজের উপর দাঁড়িয়ে থাকে। এখানে সিনেমার অনেকটাই দেখানো হয়েছে। গল্পের নাট্যক্রিয়া এবং চরিত্রগুলো দৃশ্য চালিয়ে নিতে যথেষ্ট, আর কিছু দরকার নেই, কিন্তু বাথহাউজের বারান্দা আর জানালা দিয়ে দেখতে থাকা অনেকেই বাথহাউজের অধিবাসী। এদের কেবল চলমান কিছু অস্পষ্ট ছায়ার মত দেখালেই চলত, কিন্তু মিয়াজাকি যত্নের সাথে এমন কিছু চরিত্র আঁকেন যাদের আমরা চিনতে পারি এবং সবগুলোই গতিশীল। এবং এক্ষেত্রে এটা কিন্তু রিপিটেটিভ অ্যানিমেশন না যেক্ষেত্রে আইডিয়াটা হচ্ছে একই কাছাকাছি ফ্রেমের পুনরাবৃত্তি যা দিয়ে কোন আকৃতি নড়াচড়া করছে এমনটা বোঝানো হয়। বরঞ্চ স্পিরিটেড অ্যাওয়ের ক্ষেত্রে এটা বাস্তবধর্মী, পরিবর্তনশীল তাও একগাদা ডিটেইলস সহকারে।

বেশীরভাগ মানুষ মুভিটা দেখার সময় এই নড়াচড়াকে স্রেফ “নড়াচড়া” হিসেবেই ধরে নিবে। কিন্তু আমরা খেয়াল করে দেখি যে আসলেই কী কী ঘটছে। আর এটা দিয়েই আমি প্রাচুর্যতা আর ঢেলে দেয়া যত্ন বুঝিয়েছি।
প্রতিটা ফ্রেমের কম গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোতে এতটা শ্রম ঢেলে দেয়ার মত আন্তরিক মিয়াজাকি আর তাঁর সহকর্মীগণ। খেয়াল করুন বাথহাউজের কতখানি আপনি দেখতে পান। কেবল একটা ব্রিজ আর একটা বড় প্রবেশদ্বার দেখিয়ে দিলে সহজ এবং তাড়াতাড়ি হতো। কিন্তু মিয়াজাকি বাথহাউজকে বাস্তব যায়গায় রূপ দিতে ফ্রেমগুলো জটিল করে সমৃদ্ধতা দেন, যা তাঁর ঠিক পরবর্তী গল্পে কাজে লাগবে নাকি লাগবে না, সেই বৈশিষ্ট্যবহন করে।

Spirited Away-এর গল্পে চরিত্রের সমাগম হয়েছে অসীম সৃষ্টিশীলতার মাধ্যমে। এর আগে এমন কোন মুভি তৈরী হয়েছে কী, যেখানে এত বৈচিত্রময় ভিন্ন ভিন্ন সত্ত্বা আছে যা আমরা আগে কখনও দেখিনি? আসলেই মিয়াজাকির কল্পনার যেন শেষ নেই। একটা দৃশ্য আছে যেখানে নায়িকা এবং তাঁর সঙ্গী জলাভূমির মাঝখানে ট্রেইন থেকে নামে। দূরের বন থেকে একটা আলো কাছে আসছে, তাঁরা দেখতে পায়। পরে দেখা যায়, জিনিসটা পুরনো ধাঁচের আলোক মশাল যা কিনা এক পায়ে লাফিয়ে লাফিয়ে আসছে। এটা কাছে এসে তাঁদের কুর্নিশ করে এবং যে পথে যেতে হবে সে পথ নির্দেশ করতে আলো জ্বালিয়ে দেয়। যখন তাঁরা কুড়েঘরে পৌঁছায়, মশালটা নিজে নিজে দরজার উপরে নিজেকে ঝুলিয়ে নেয়। এই জীবন্ত আলোক মশালটার দরকার ছিলো না গল্পে। আমাদের উদ্দেশ্যে এটা মিয়াজাকির দেয়া উপহার।

সিনেমার গল্পটা ১০ বছর বয়সী মেয়ে ‘চিহিরো’কে কেন্দ্র করে। চিহিরো বিভিন্ন অ্যানিমেশন ফিল্মের উৎফুল্ল, উচ্ছ্বল পিচ্চি একটা যন্ত্রের মতো নয়। অনেক সিনেমা সমালোচক তাকে গোমড়া, অধৈর্য এবং হুট করে কাজ করে ফেলে বলে আখ্যায়িত করেছেন। চিহিরো তাঁর বাবা-মায়ের সাথে লং-ড্রাইভে গাড়ির পিছনে বাধ্য হয়ে বসে ছিলো এবং তাঁর বাবা-মা যাচ্ছিলো পুরনো এক বাড়ি সম্পর্কে খোঁজ খবর নিতে। তাঁর বাবা পথ হারিয়ে ঘন এক বনে ঢুকে যান এবং পথটা শেষমেষ এক টানেলের মুখে এসে শেষ হয়। টানেল বা সুরঙ্গ ধরে এগোলে তাঁরা দেখতে পায় টানেলের শেষ মাথায় পরিত্যক্ত একটা অ্যামিউজমেন্ট পার্ক। কিন্তু সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে কিছু কিছু দোকানের ঝাপটা খুলতে থাকে, বিশেষ করে একটা খাবারের দোকান যার গন্ধ বাতাসে ময়ময় করতে থাকে। চিহিরোর বাবা-মার আর তর সয় না, তাঁরা পড়িমরি করে খাবারে ভরপুর কাউন্টারের সামনে চেয়ার টেনে বসে পড়েন এবং দেদারসে গিলতে থাকেন। এদিকে চিহিরো গোঁয়ার মেয়ে, খিদে লাগেনি, খিছু খাবে না — জানিয়ে দেয়। তাঁর বাবা-মা এত বেশী খেয়ে ফেলে যে তাঁরা সাইজে দুই বা তিনগুণ হয়ে যায়। একদম শূয়রের মত খেতে থাকে তাঁরা এবং শেষে তাঁরাই শূয়র হয়ে যায়। তাঁরা ঠিক অ্যামেরিকান অ্যানিমেশনের বাবা-মার মত না, বরঞ্চ এমন বাবা-মা যাদের কাজকামে বাচ্চারা ভয় পেয়ে যেত পারে।

অ্যামিউজমেন্ট পার্কের মাধ্যমে চিহিরো বিশালাকার এক ভাসমান বাথহাউজে উপস্থিত হয়, যার বুরুজ এবং জানালা এবং কার্নিশ ইত্যাদি যেন একটার উপর আরেকটা জুড়ে আছেই, কোন সীমাটিমা নেই। অচেনা অজানা বন্ধুভাবাপন্ন এক কিশোর তাকে সতর্ক করে এবং ফিরে যেতে বলে। কিন্তু ততক্ষণে দেরী হয়ে গেছে, বাথহাউজটা কূল থেকে ভাসতে ভাসতে দূরে চলে এসেছে। অগত্যা চিহিরো সাহস করে ভিতরে ঢোঁকে বাথহাউজের এবং অসীম বৈচিত্রময় এক দুনিয়ার সম্মুখীন হয়। কিন্তু সে ফিরে যাবার পথ খুঁজে পায় না আর। কিশোরটা বলে, বাথহাউজের সবাইকে কোন না কোন কাজ করতেই হবে, এবং সে চিহিরোকে কামাজির কাছে পাঠায়। কামাজি একজন বৃদ্ধ, বড় দাড়িওয়ালা লোক যার আটখান লম্বা, দির্ঘায়িত হাত আছে। তাঁর কাজ বয়লার রুম সামলানো। কামাজি এবং একজন তরুনী চিহিরোকে বলে ইউবাবার কাছে যেতে, সে বাথহাউজের মালিক, কাজ পেতে হলে তাঁর সাথে কথা বলতে হবে। এদিকে ইউবাবা হচ্ছে ভয়ংকর এক ডাইনি, যার খড়মড় বিকট হাসিতে ধোঁয়ার তাল বের হয়।

এই হচ্ছে অসাধারণ এক অ্যাডভেঞ্চারের শুরু। চিহিরো বাথহাউজে কোন মানুষের দেখা পাবে না। সে ইউবাবার জাদুতে বশ হবে— ইউবাবা তাঁর নাম চুরি করে তাকে নতুন নাম দিবে, বাথহাউজে সে পরিচিতি পাবে “সেন” নামে। যদি না সে তাঁর পুরনো নাম ফিরে না পায়, কখনও বাথহাউজ ছেড়ে যেতে পারবে না। একটার পর একটা অদ্ভুত যায়গা দেখা যায় বাথহাউজে, যেখানে অগুনতি, বৈচিত্রময় স্বত্বারা বাস করে; যাদের আমরা কখনও দেখিনি বা কল্পনা করিনি। এখানে আশওয়ালা ছোট ছোট কালো রঙের দুই চোখওয়ালা বল আছে, যারা সেন বা চিহিরোর জুতো চুরি করে। অর্ধস্বচ্ছ এক স্বত্বা আছে যার কোন মুখমণ্ডল নেই এবং সে তাঁর ভৌতিক শরীরে একটা মুখোশ ব্যবহার করে মুখের অস্তিত্ব বোঝাতে। তিনটা আজব মাথা আছে, যাদের কোন শরীর নেই— এরা মাথা দিয়ে লাফিয়ে চলে। এদের দেখতে রাগী রাগি লাগে এবং চেহারাতেও কার্ল মার্ক্সের সাথে মিল খুঁজে পাওয়া যায়। কালো আঠালো বিকট গন্ধওয়ালা স্তূপাকৃতির অবয়ব আছে, আছে সামুদ্রিক প্রাণী যার সারা শরীর পানি দূষণের ফলে ময়লা আবর্জনা দিয়ে ভর্তি। শেপ-শিফটিংও আছে এখানে, অবশ্য এটা জাপানিজ রুপকথায় কমন জিনিষ। এবং যে কিশোর প্রথমে চিহিরোর বন্ধু ছিলো, পরবর্তীতে দেখা যায় সে আসলে ভয়ঙ্কর ফণাওয়ালা সাগরের ড্রাগন।

সেন এই দুনিয়ায় মানিয়ে নেয়। কারো কারো বন্ধু হয় সে, কেউ কেউ তাকে এড়িয়ে চলে, আর সাথে ইউবাবার রাঙ্গাচোখ তো আছেই—চলতে ফিরতে শেখে সেন। তাঁর আর “ভদ্র মেয়ে” হয়ে ওঠা হয়না, বরং তাঁর তেজ এবং দৃঢ়চরিত্র আমাদের অনুরাগে ভাগ বসায়। সেন সঙ্কল্প করে নিজের নাম ফিরে পেতে এবং কূলে ফিরে যেতে। সঙ্কল্প করে নিজের বাবা-মা’কে আবার ফিরে পেতে।

মিয়াজাকি বলেন তিনি এই সিনেমা দশ বছর বয়সী মেয়েদের জন্যে নির্দিষ্ট করে বানিয়েছেন। এ জন্যে এটা এত শক্তিশালী প্রভাব ফেলে প্রাপ্তবয়স্ক দর্শকের মনে। কারণ “সবার” উদ্দেশ্যে বানানো সিনেমা আসলে নির্দিষ্ট করে কারো জন্যেই বানানো না। বিষদ, বিশাল দুনিয়ায় নির্দিষ্ট চরিত্রকে নিয়ে নির্মিত সিনেমাগুলো মন্ত্রমুগ্ধকর হয় কারণ এই সিনেমাগুলো আমাদের মুখে চামচ তুলে দেয়ার চেষ্টা করে না; এই সিনেমাগুলো স্পষ্টভাবে, সফলভাবে স্বতন্ত্র। সিনেমাটা আবার যখন দেখলাম, আমি যে মুভি গুলোকে ‘সেরা’ হিসেবে বিবেচনা করি সেগুলোর মত করে মন্ত্রমুগ্ধ হয়েছি। যার ফলে ধারণা পাওয়া যায় কেন “Spirited Away” জাপানে “Titanic” থেকে বেশী কামাই করেছে এবং প্রথম বিদেশী সিনেমা যা অ্যামেরিকায় মুক্তি পাওয়ার আগে যার ঝুলিতে ইতোমধ্যেই ২০০ মিলিয়ন ডলারের বেশী ছিলো।

আমি ভাগ্যবান, ২০০২ সালে টরন্টো ফিল্ম ফেস্টিভালে মিয়াজাকির সাথে সাক্ষাৎ হয়েছিলো। আমি তাকে বলেছিলাম, আমি তাঁর সিনেমার গল্পের জন্যে দরকারি সিকোয়েন্স থেকে “অদরকারী অংশগুলো” বেশী পছন্দ করি, যেমন মাঝে মাঝে সিনেমায় চরিত্রগুলি অল্পক্ষণের জন্যে বসবে, হাই তুলবে অথবা স্রোতশীল জলরাশির দিকে তাকিয়ে থাকবে অথবা এটা সেটা করবে— ঠিক গল্প আগাতে না, বরঞ্চ সিনেমার দিনক্ষণ বা চরিত্রগুলোর পরিচয় তুলে ধরতে।

“জাপানিজ ভাষায় এই ব্যপারটার একটা নাম আছে”, মিয়াজাকি বলেন। “এটাকে বলে ‘মা’। এর অর্থ শূন্যতা। এটা ইচ্ছে করেই রাখা হয়েছে।” তিনি কয়েকবার নিজের হাতে তালি বাজালেন। “আমার প্রত্যেক তালির মাঝের সময়টা হলো ‘মা’। যদি বিরতিহীন গল্প টেনে নিয়ে যান নিঃশ্বাস ফেলার ফুসরত না দিয়ে, সবটাই কেবল ব্যস্ততা হয়ে যায়।”

আমার মনে হয় ব্যপারটা ব্যাখ্যা করে কেন বেশীরভাগ দ্রুতগতির অ্যামেরিকান অ্যানিমেশন থেকে মিয়াজাকির মুভিগুলো অধিকতর চিত্তগ্রাহী। মিয়াজাকি বলেন, “যারা সিনেমা বানায়, ওরা সিনেমায় নিরবতাকে ভয় পায়। তাই ওরা নিরবতাকে ঢাকতে চেষ্টা করে। তাঁরা শঙ্কিত থাকে হয়ত দর্শকেরা বোরড হয়ে যাবে। কিন্তু সিনেমার সবটুকু জুড়ে ৮০ ভাগই ইন্টেন্স থাকলেই যে বাচ্চারা তাঁদের মনোযোগ দিয়ে তোমাকে ধন্য করবে এমনটা কিন্তু নয়। সত্যিকার দরকারি বিষয় হচ্ছে অন্তর্নিহিত আবেগ—যেগুলো কারো মধ্য থেকে কখনও নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় না।”

“আমি এবং আমার বন্ধুরা মিলে ৭০’এর দশক থেকে যা করতে চেষ্টা করে যাচ্ছি তা হলো, সিনেমার গল্পে কিছুটা নিরবতা আনতে; কেবলই ধুমধারাক্কা আর চিত্তবিনোদন না দিতে। এবং সেই সাথে ফিল্ম বানানোর পাশাপাশি বাচ্চাদের আবেগ অনুভূতির পথে হাঁটতে। যদি তুমি আনন্দ, উৎফুল্লতা এবং সহমর্মিতার প্রতি মনোনিবেশ করেন তবে ভায়োলেন্সও দরকার হবে না, অ্যাকশনেরও দরকার হবে না। এগুলো এমনিতেই তোমাকে অনুসরণ করবে। এটাই আমাদের নীতি।”, মিয়াজাকি যোগ করেন।

তিনি বলেন লাইভ-একশন সুপারহিরো মুভিতে প্রচুর অ্যানিমেশন দেখে তিনি আমোদিত হয়েছেন। “এক হিসেবে, লাইভ একশন মুভি অ্যানিমেশন নামক স্যুপের অংশ হয়ে যাচ্ছে। অ্যানিমেশন এমন এক শব্দে পরিণত হয়ে যা অনেক বেশী কিছুকে পরিবেষ্টন করে রাখে, আর আমার অ্যানিমেশন কেবল ছোট্ট একটা ফোঁটা এক কোণায়। আমার জন্যে কিন্তু তা যথেষ্ট,”

মিয়াজাকির সাথে আমি একমত, আমার জন্যেও যথেষ্ট।
— Roger Ebert (1942-2013)

==============

মূল ইংরেজি রিভিউ এর লিঙ্কঃ http://www.rogerebert.com/re…/great-movie-spirited-away-2002
==============

তো এই ছিলো রজার ইবার্টের রিভিউ। ইবার্ট বিভিন্ন সময়ে মিয়াজাকির এবং জিবলি স্টুডিওর প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছেন। বিশেষ করে তাঁর গ্রেভ অফ দ্য ফায়ারফ্লাইস রিভিউ পড়লে মনে হতে পারে তিনি আকাশে ভেসে ভেসে রিভিউ লিখেছেন। রজার ইবার্টের থেকে এমন অ্যাফেকশন আসলে বিস্ময়কর। তিনি যেই মাপের ক্রিটিক ছিলেন, তাঁর সামান্য প্রশংসা যে কোন সিনেমার জন্যে আশীর্বাদ স্বরুপ। তাঁর সার্টিফাইড কিছু মুভি আছে যা তিনি তাঁর “Great Movies” তালিকায় যোগ করেছেন। Spirited Away সে তালিকায় বহাল তবিয়তে নিজ যায়গা জুড়ে বসে আছে।

যাই হোক, এই লেখার উদ্দেশ্য সফল হলেই আমি খুশি। যারা Spirited Away দেখে অবাক হয়েছেন, আশা করি আবার দেখবেন। যারা দেখেননি, এখনই সময় বসে পড়ার।
তবু যদি এই সিনেমা ভালো না লাগে, আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি এটা আপনার ব্যর্থতা। মিয়াজাকির স্পিরিটেড অ্যাওয়ের পাহাড়সম ভার তাতে সামান্য কমছে না। স্পিরিটেড অ্যাওয়ে সেরাদের সেরা অ্যানিমের একটা, এই সত্যও বিন্দুমাত্র খর্ব হচ্ছে না, হবেও না।

Sword of the Stranger [মুভি রিভিউ] — Amor Asad

Sword of the Stranger 2

Sword of the Stranger সামুরাই গল্প, আনুমানিক ১৩৬৮ হতে ১৬৪৪ সালের কোন এক সময়ে।
সোর্ড অফ দ্য স্ট্রেঞ্জার একই সাথে টানাপোড়েন ছিন্ন সামুরাই, রক্তলোলুপতা আর অমরত্বের পেছনে ছোঁটার গল্প। —
প্রোটাগনিস্ট নামহীন সামুরাই Nanashi পোড়ো মন্দিরে কুলহীন ছোট্ট Kotaru আর তাঁর কুকুরের সাথে পরিচিত হয়। পরবর্তীতে Kotaru’কে নির্দিষ্ট এক মন্দিরে পৌঁছে দিতে সফরসঙ্গী এবং বডিগার্ড হিসেবে যাত্রা শুরু করলে ঘটনাক্রমে মিং-ডাইনাস্টি এবং তৎকালীন কোন এক জাপানিজ প্রদেশের মাঝে বিদ্যমান অস্থিতিশীল এক পরিবেশে আঁটকে পড়ে। জানতে পারি, পিচ্চি Kotaru ব্যপারটার সাথে ভালোভাবে জড়িত।

মুভির গল্প আহামরি নতুন না— তবে গল্পের রুপায়ন প্রশংসার দাবী রাখে। বিশেষ করে সোর্ড ফাইটগুলো নান্দনিক; সচরাচর এমন সোর্ড ফাইট এবং অন্যান্য সামুরাই অস্ত্রের প্রদর্শনীর দেখা মিলে না। সিনেমার নাম অনেকটা ভিতরের বিষয়বস্তুকে প্রকাশ করে দেয়, তাই দেখতে বসে সোর্ড ফাইট আশা করবেন এ লিখে দেয়া সম্ভব। কথা হচ্ছে, হতাশ হবেন না। তাছাড়া মুভির প্রথম কয়েক মিনিটের ধাওয়া, হত্যা তথা নির্বিচারে রক্তারক্তি গোটা সিনেমার ভাষারীতির জানান দিয়ে দেয়। আপনার পছন্দের সাথে যাচ্ছে কিনা তা শুরুতেই বুঝে ফেলবেন।
অ্যানিমেশন পরিষ্কার এবং ডিটেইল্ড। মাকোতো শিনকাই লেভেলের না হলেও আর্টস্টাইল চমৎকার।

মুভির শর্টকামিং হচ্ছে কিছুটা প্রেডিক্টেবল এবং অ্যামবিয়েন্ট মিউজিকের অতিব্যবহার বা ভুল ব্যবহার। আবহকে দর্শকের মনে গেথে দিতে এপিক কোন চোখ ধাঁধানো দৃশ্যে এ-ধরনের ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক ভালো মানায়, কিন্তু থেকে থেকেই একটুক্ষণ পরপর সাধারণ দৃশ্যে ব্যবহার করলে ভার কমে যায়, বেমানান লাগে। এছাড়া, প্রোটাগনিস্টকে নির্দিষ্ট প্রোফাইলে না ফেলে দিলে ভালো হত।
আমার রেটিং ৭.৫/১০

Sword of the Stranger 1

Ayakashi ~ Japanese Classic Horror [রিভিউ] — Amor Asad

Ayakashi 1

রূপকথার সাথে ভৌতিক রূপকথার সাধারণ একটা পার্থক্য আছে, দুটো ধারাই সব সভ্যতায় সমান ভাবে জনপ্রিয় হলেও। ভৌতিক রূপকথায় সাধারণত নীতিকথার উপস্থিতি দেখা যায় না। আবার উপকথার “অতঃপর তাঁরা সুখে শান্তিতে বসবাস করিতে লাগিলো” ভৌতিক উপকথার শেষাংশ সবসময় রঞ্জিত করেনা।
মায়েরা রূপকথা ব্যবহার করে বাচ্চা খেতে না চাইলে — ভৌতিক রূপকথা ব্যবহার করে ভয় দেখিয়ে ঘুম পাড়াতে। তবে দিনশেষে দুটো গল্প ধাঁরাই যে কোন সভ্যতার ইতিহাস আর কল্পনাশক্তির নিদর্শন।

জাপানিজ সংস্কৃতির ভূতুড়ে গল্পগুলোর সাথে আমাদের কতখানি মিল আছে তা সাংস্কৃতিক তুলনামূলক বিশ্লেষণই বলতে পারবে, তবে Ayakashi’র গপ্পো গুলো চেনাজানা মনে হয়। দর্শক হিসেবে গ্রহণ করতে পারি সহজেই — সুদূর কোন কল্পনাপ্রসূত জায়গায় নিজেকে নিতে হয় না।

১১ পর্বের অ্যানিমে সিরিজ Ayakashi, যার মধ্যে তিনটা স্টোরি আর্ক, প্রতি আর্কে ৩-৪টা করে এপিসোড। এ পর্যায়ে জনপ্রিয় এক জনরার ভক্তগণ ঢোঁক গিলবেন বিস্ময়ে।
তিনটা গল্প তিন ধরণের। একটা মঞ্চস্থ নাটকের মতো, একটা সহজ সরল রূপকথা, আরেকটা মিস্টেরি ঘরানার।

প্রথম গল্পটার নাম Yotsuya Kaidan — বিখ্যাত জাপানিজ লোককথা অবলম্বনে। ন্যারাটিভ স্টাইলের গল্পকথন। ১৮ শতকের যাত্রা নির্মাতা Nanboku Tsuruya গল্পটাকে নতুন করে সাজিয়েছিলেন। Ayakashi অ্যানিমেতে তাঁকেই ন্যারেটর হিসেবে দেখানো হয়।
Yotsuya Kaiden একজন প্রতিশোধপরায়ণ গৃহবধূর গল্প। স্বামী Tamiya Iemon এর ছলনা, বেইমানী এবং শেষমেষ খুনের স্বীকার হয়ে যার আত্মা ফিরে আসে অভিশাপের বার্তা নিয়ে। গল্পটা শুরুতেই ন্যারেটর কাহিনীটা দর্শককে জানিয়ে রাখেন মোটা দাগে— পর্বগুলো কেবল সেই গল্পের দৃশ্যায়ন করে। তাই গল্প জেনে ফেললেও স্পয়লারের ভয় নেই।

দ্বিতীয় গল্পটা ঠিক হরর বললে ভুল হবে, রূপকথার কাতারেই দাঁড় করানো যায়। তবে রূপকথার সুখি সুখি ভাবটা অনুপস্থিত। মানুষ যুবকের সাথে ইশ্বরীর প্রণয় কাহিনী। ভুল করলে চলবে না, এই ধরণের গল্প অ্যানিমেতে প্রচলিত হলেও Tenshu Monogatari’তে প্রচলিত ক্লিশেগুলো নেই। অতিরঞ্জিত আবেগ এবং বিরক্তিকর/সক্রেটিস কিশোর-কিশোরী চরিত্রও অনুপস্থিত। তদুপরি গল্পকথন জিবলি স্টুডিওর কথা মনে করিয়ে দেয়।

Ayakashi 2

সবশেষে Bake Neko— বাকে নেকোর অর্থ Changed Cat. গল্পটাও ভূতুড়ে বিড়াল নিয়ে। কন্যাদায়গ্রস্থ বুনিয়াদী পরিবারের টিকে থাকার একমাত্র উপায় যখন ঢলে পড়ে মাটিতে, বিয়ে বাড়িতে হুলস্থূল বেঁধে যায়। কে, কেন, কিভাবে হত্যা করেছে— তাঁর পেছনের গল্প মোটেই সাধারণ কিছু নয়। অ্যানিমের তিন গল্পের মধ্যে এটা রহস্য গল্প।
Bake Neko বাস্তবিকই ভয়ংকর। হরর একটা কনফিউজিং জনরা, কাটাছেড়াকেও হরর হিসেবে গণ্য করা হয়। কিন্তু এটা পিওর হরর, একদম সমার্থক শব্দ বলা যায়।
সত্যি বলতে এই আর্কের কারণে Ayakashi দেখতে বসেছিলাম। Mononoke প্রচণ্ড প্রিয় একটা অ্যানিমে। জানতে পারি Mononoke আসলে Ayakashi তথা Bake Neko-র স্পিন অফ।
আয়াকাশি দেখার পর মনে হচ্ছে মনোনোকের অ্যানিমেশন স্টাইলটা ভালোবেসে ফেলেছি। খসখসে আর্টপেপারের উপর আঁকা ছবির মতো দৃশ্যগুলো মিস করেছি মন থেকে।
Bake Neko আর্ক আর Mononoke অ্যানিমে নিয়ে একসাথে আলাদা লেখার দরকার আছে। সেখানে পিছনের গল্প, প্রোটাগনিস্ট, আর্ট স্টাইল নিয়ে আলাপ করা যাবে।

Ayakashi 3

Ayakashi ~ Japanese Classic Horror অনন্য সাধারণ অ্যানিমে।
হলিউডি/টার্কি নতুন কিছু হরর মুভির সস্তা জাম্প-স্কেয়ার দেখে চোখ উল্টানো মহামতিদের আয়াকাশির ভাব বোঝানো গেলে ভালো হত— ঈশান কোণের শ্যাওড়া গাছের মড়মড় শব্দ আর কোন শব্দ সপ্তাহখানেক কানে ঢুকতো না।

আমার রেটিং ৮.৫/১০

Ayakashi 4

Basilisk [রিভিউ] — Amor Asad

Basilisk

জেনারেশনের পর জেনারেশন একে অপরকে ঘৃণা করার ইতিহাস পর্দায় দেখলে না-চাইতেই বাস্তব দুনিয়ায় মিলেনিয়াম ধরে চলে আসা সংঘর্ষগুলোর কথা মনে পড়ে যায়। এসব দ্বন্দ্বের অনেকগুলিই এখনও বর্তমান এবং সমানে ঘৃণা ছড়িয়ে যাচ্ছে।
একটা পর্যায়ে সংঘর্ষের পিছনে আদর্শগত কারণগুলোকে আর বাটিচালান দিয়েও খুঁজে পাওয়া যায় না, কালের বিবর্তনে হারিয়ে যায় বা পরিবর্তিত হয়ে যায় — থেকে যায় কেবল সংঘর্ষটুকু।
ভায়োলেন্সে আনন্দ পাওয়া মানুষের লং ফরগটেন আদিমতম বৈশিষ্ট্যগুলোর একটা। সংঘর্ষের উদ্দেশ্য শেষ পর্যন্ত পুলক লাভে গিয়ে দাঁড়ায়, তা সে অবচেতনে আদিপুরুষের ঘাড়ে কাঁঠাল ভেঙ্গে হলে হলেও।
উদাহরণ দিতে চাচ্ছি না, তবুও কিছু একটা ভিজুয়ালাইজ করতে চৌধুরী বাড়ি আর মির্জা বাড়ির দ্বন্দ্ব ধরে নিন।
.
ব্যাসিলিস্ক-এ এমন দুটো আলাদা গোষ্ঠীর মধ্যে কয়েক শতাব্দীর পুরনো দ্বন্দ্ব রয়েছে। তবে দুটো গোষ্ঠীই কল্পিত পৃথিবীর প্রসিদ্ধ দুটো নিনজা-ক্লান। দুপক্ষই মোটাদাগে সেরা দশজন নিনজা নিয়ে গঠিত এবং কোন অজানা এক কারণে দশ-দশ মোট বিশজন বাদে এই দুই ক্লানে আর কোন দক্ষ নিনজা নেই। নিনজারা সবাই অদ্ভুত ক্ষমতা সম্পন্ন। ক্ষমতাগুলোর প্রদর্শনী ঠিক সুপারপাওয়ারের কথা মনে করায় না — বরঞ্চ মিউটেশনের সাথে ঢের মিল আছে। এসব যদিও নিনজা আর্ট বা নিনজুৎসু হিসেবে দেখানো হয়েছে — ক্ষমতাগুলো আপন করে নেয়ার দুর্ভাবনা কুক্ষণেও আসে না মাথায়। কদাকার, নিষ্ঠুর এবং ভয়ানক কিছু ক্ষমতা। এছাড়া চাইলেই একজন অন্যের নিজস্ব নিনজুৎসু শিখতে পারে না। সবার ক্ষমতা আর তাঁর কার্যকারণ আলাদা — কিভাবে কে কোন ক্ষমতা পেয়েছে তাঁরও কোন ব্যাখ্যা নেই। না, একে সিরিজের নেতিবাচক নয় বরং ইতিবাচক দিক হিসেবেই ধরছি।
জাপানিজ কালচারে নিনজাদের কেমন দেখা হয় হাতে-কলমে জানতে পারলে ভালো লাগতো, কিন্তু নারুতো আর ব্যাসিলিস্ক দ্যাখার পর মনে হয়েছে তাঁদের কাছে নিনজারা মানুষ যোদ্ধা থেকে বেশী কিছু ছিলো।
গল্পে ফিরে আসি — এই দুই ক্লান বিভিন্ন সময়ে দ্বন্দ্বের সমাধান করার চেষ্টা করেছে কিন্তু পুরোপুরি সফল হয়নি; উল্টো সংঘাতের ইতিহাসে নতুন রক্তের ছোপ লেগেছে। তবু যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে আসা গেছে, সমাধানের পথ খোঁজা হচ্ছে। অ্যানিমের গল্পের সময়টাতে দুই-ক্লান সমাধানের দ্বারপ্রান্তে চলে আসে। কিন্তু এত বছরের খুনোখুনি চাইলেই ভুলে গিয়ে হাতে হাত, কাঁধে কাঁধ মেলানো যায়? দু-পক্ষের জন্যে অবস্থা জটিলতর হয়ে যায় যখন ঘটনাক্রমে যুদ্ধবিরতি যুক্তি বরবাদ হয়ে যায়। এসব প্রথম এপিসোডের প্লট — বাকিটা জানতে অ্যানিমে দেখতে হবে।
.
ব্যাসিলিস্ক বাস্তবিকই ডার্ক এবং পুরোদস্তুর ম্যাচিউরড অ্যানিমে – ভাবগত এবং চরিত্রগত দুভাবেই। চরিত্রগুলোর সবকটি পূর্ণবয়স্ক মানুষ। অনড় ন্যায়নীতি আর মূূল্যবোধের মত বালখিল্যতার পরিবর্তে নিজ নিজ ক্লানের প্রতি চির আনুগত্য আর অপর ক্লানের প্রতি ঘৃণাই তাঁদের পরিচালিত করে। গল্পে প্রটাগনিস্ট অবশ্যই আছে — কিন্তু তাঁর বা তাঁদের চোখে মাঙ্গাকা কোন মেসেজ দেয়ার চেষ্টা করেন না। ব্যাসিলিস্ক দেখার সময় কোন চরিত্রের প্রতি আলাদা আকর্ষণ বা বিকর্ষণ কাজ করে না — উপরন্তু মোটিভেশন গুলো আমলে নিলে সবার অবস্থানকে ব্যাখ্যা করা যায়, তাঁদের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করা যায়। অর্থাৎ অমক চরিত্র পটল তুললে সব শেষ — এই অনুভূতি দর্শককে তাড়িত করে না।
থিম ছাড়াও সিরিজে গ্রাফিক ভায়োলেন্স অত্যাধিক বেশী যে, গোর বললে ভুল হবে না। সেই সাথে সেক্সুয়াল ভায়োলেন্স আর এক্সপ্লিসিটনেস উল্লেখ করার মত। সিরিজ দেখার ইচ্ছে থাকলে এটায় মাথায় রেখে বসতে হবে।
.
ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে ঘটনাগুলোর তীব্রতা ভালভাবে ফুটিয়ে তুলতে। অ্যানিমেশন আর আর্টস্টাইলের প্রশংসা করা যাক। ব্যাকগ্রাউন্ড অ্যানিমেশন দেখতে অনেকটা জিবলি স্টুডিওর অ্যানিমেশনের মত লাগে। আলোচনা করার চেয়ে দেখালে বোধহয় ভালো হবে। অ্যানিমে থেকে কিছু স্ক্রিনশটের লিঙ্ক দিচ্ছি, চাইলে ক্লিক করে দেখা যাবে।
https://imgur.com/gallery/Zg3pW/
.
ডার্ক ফ্যান্টাসি অ্যানিমের তালিকায় উপরের দিকে রাখতে চাই ব্যাসিলিস্ককে। ভালোবাসা, বিরহগাথা, স্বজনপ্রীতি, প্রতিশোধ, ক্রোধ – সবকিছু এক মোড়কে। এখানে কোন কিছুর কোন নিশ্চয়তা নেই। দপদপে কোন হৃদয়ের আর কোন প্রতিশ্রুতির কানাকড়ি মূল্য নেই। তাই গল্পের ব্যপ্তি খুব বেশী না হলেও, ব্যাসিলিস্ক-এর দুনিয়া প্রভাবিত করে। দিনশেষে দু-পক্ষের অতীতের সবটুকু জানার ইচ্ছে যাগে মনে।
আমার রেটিং ৮/১০

Kabaneri of the Iron Fortress [রিএকশন/রিভিউ] — Amor Asad

Kabaneri

আসুন, Kabaneri of the Iron Fortress কে কয়েক বাক্যে প্রকাশ করি —
অভিমান জমিয়ে রাখা, চুলে আলতা মাখা, ফাদার-কমপ্লেক্সে ভোগা ভালোবাসাহীন তরুণ, যে পোস্ট অ্যাপাক্যালিপ্টিক যুগের ডারউইন হতে চায়;
ডারউইন তরুণকে কাঁচকলা দেখাতে বেদুইনদের উত্তরসূরি-স্টাইলিশ-নার্ড কিশোরের ওয়ান ম্যান অ্যর,
এনিমখোরের ললিখোরদের উস্কে দিতে মারকুটে পিচ্চি বালিকা, যার আবার ব্রাদার কমপ্লেক্স আছে,
সুন্দরী প্রিন্সেস আর তাঁর লজ্জ্বাবতী বডিগার্ড,
টাইটানদের উত্তরসূরি লটস অফ লাভাখোর মরা মানুষ, ব্যাডঅ্যাস ট্রেইন।

মানে, হেটাররা এমনটাই ভাবে। আমি ভাবিনা। কাবানেরি অফ দ্য আয়রন ফোর্ট্রেস আমার দারুণ ভাল্লাগছে। এইতো ওপেনিং সংটা ডাউনলোড করে রিপিট দিয়ে শুনছি। পিসি আর ফোনের ওয়ালপেপার চেঞ্জাইলাইছি। স্বয়নে স্বপনে ইউকিনাকে দেখতেছি। ফ্যান না হইলে এই কাজ কেউ করে?

এবারে Kabaneri of the Iron Fortress এর প্লট কয়েক বাক্যে প্রকাশ করি —
জোম্বি ভাইরাস অ্যাপোক্যালিপ্স,
মানব সভ্যতা বিলুপ্তির পথে,
সারভাইভাররা নিজস্ব অর্ডার বানিয়ে নিয়েছে,
কিন্তু না — আশার বাত্তি নিভে নাই, ডালমে কুছ কালা হ্যায়, মিশ্র একদল শক্তিশালী আদমি আছে।
তাগো ভীতর একজন আবার এক্সট্রা ব্যতিক্রম। দুনিয়ার যাবতীয় দায়িত্ব তেনার ঘাড়ে নিয়ে বাকীদের তিনি দায়মুক্তি দ্যান।

অ্যাগেইন, এসব হেটারদের কথা। আমার না।
===
2013 সালে একটা সাই-ফাই মুভি রিলিজ পেয়েছিলো, Snowpiercer. ওই বছরের দারুণ ফিল্ম হলেও তেমন সাড়া পায়নি। স্নোপিয়ার্সারের গল্পটাও ট্রেনে। মানব সভ্যতা চিরস্থায়ী শীতকালের বশবর্তী, পৃথিবী বাসের অনুপযোগী। সারভাইভাররা সবাই একটা জায়ান্ট ট্রেনে উঠে বছরের পর বছর ঘুরতে থাকে। যদিও ওই মুভির বাকি সব গল্প আলাদা, কাবানেরি দেখতে গিয়ে প্রথমেই ওটার কথা মনে পড়েছিলো।

এরকম দ্রুতলয়ের কিছু দেখতে আলাদারকম ভাল্লাগে। অনেকদিন পর কোন অ্যানিমে এক বসায় শেষ করেছি। তাই হয়তোবা শেষের দিকে গোঁজামিল বা রাশড হবার পপুলার দাবীর যথাযথতা নিয়ে সন্দেহ আছে। আমার কাছে পুরো অ্যানিমেই সমান ভালো লেগেছে। সত্যি বলতে, ক্লিশে গুলো বাদ দিলে কাবানেরি দারুণ উপভোগ্য। চমৎকার অ্যানিমেশন, উত্তেজনাকর অ্যাকশন সিকোয়েন্স, সেই সাথে রক্ত গরম করা মিউজিক স্কোর। বিশেষ করে গল্পকথনের সাথে ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোরের এমন সামঞ্জ্যতা সহসাই দেখা যায় না। শেষবার এই টালমাতাল অনুভূতি পেয়েছিলাম ম্যাড ম্যাক্স ফিউরি রোডে। কাবানেরির ওএসটি নামিয়েছি, কিন্তু কেবল OP টাই শোনা হয় কেন যেন।
সেই সাথে সিনেম্যাটোগ্রাফি ছিলো বোনাস, ফাঁকা দুনিয়ার মাঝখান দিয়ে ট্রেইন ছোঁটার, বিশেষ করে এপিসোড শেষে স্টেশন থেকে কোন মতে জান নিয়ে বের হয়ে যাওয়ার অংশটুকু যেন অনেকটাই পোয়েটিক – দেয়ার গোজ দ্য লাস্ট হোপ অফ সারভাইভাল।

কাবানেরি পছন্দ হবার আরেকটা কারণ হচ্ছে, আডিওলোজির কনফ্লিক্ট দেখলে ভাল্লাগে, যতই পুরনো হোক না কেন। আমাতরি বিবার দর্শনটা ফেলে দিতে পারিনি। বিভিন্ন সিচুয়েশনে তাঁর ভাবনার ধরণই বেশী গ্রহণযোগ্য মনে হয়। আবার শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ইকোমা নিজ অবস্থানে ঠিক আছে, ইকোমা সেটা ইঁদুরের মতো চিঁ চিঁ করে বললেও।

Attack on Titan এর সাথে Kabaneri of the Iron Fortress এর মিল আছে, তবে অমিলই বেশী। এটা ওটার ছোট ভার্সন, ছোট ভাই, সেকেন্ড ভার্সন – ইত্যাদি বক্তব্য ভিত্তিহীন মনে হয়। AOT থেকে Kabaneri কোন দিক দিয়েই লেসার অ্যানিমে না, বরঞ্চ কিছু দিক দিয়ে এগিয়েই থাকবে।

আমার রেটিং ৮/১০

Ajin [এনিমে রিভিউ] — Amor Asad

Ajin 1

Ajin: অসাধারণ! মাইন্ডব্লোয়িং!
*** (স্পয়লার নেই ) ***

মানবজাতির টলারেন্সের ইতিহাস খুব একটা সুখকর নয়। যেকোন যুগে যখনই কোন অজ্ঞাত সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে, কঠোর, ভয়াবহ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অর্ধযুগ আগে ইউরোপজুড়ে উইচ হান্টের স্বীকার হয়েছিল হাজারে হাজারে নারী; বিভিন্ন নতুন নতুন রোগ আর মহামারীর পিছে জাদুটোনার কালোহাত দেখিয়ে পুড়িয়ে মেরেছে তাঁদের – তাও চার্চের সম্মতি বা ইশারা থাকায় পবিত্র দায়িত্ব মনে করে।
বিজ্ঞানের যাত্রার শুরু থেকেই প্রাচীন বিজ্ঞানী এবং দার্শনিকদের অত্যাচার থেকে হত্যা পর্যন্ত করা করেছে। এ উপমহাদেশেও অতীতে বহুত প্রচলিত রীতি ছিলো যা এখন শুনলে গা শিউড়ে ওঠে। বর্তমান পৃথিবীতে এমনকি আমাদের দেশেই কাছাকাছি ঘটনা থেকে সাদৃশ্যতা দেখানো যাবে – সেদিকে আর না যাই।

মোট কথা, মানুষ যেটা বোঝে না – সেটাকে দুমড়ে মুচড়ে ধ্বংস করে ফেলতে উপক্রম হয়; অনেকে এতে তুষ্টিও খুঁজে পায়। ব্যপারটা আপাতদৃষ্টিতে নিষ্ঠুর আর অবিবেচক বলে মনে হলেও; এই রেসপন্সের মূল কারণ হচ্ছে – ভয়।
অগ্রসরমান সভ্যতা আর সামাজিক শুভবোধের দোঁহাই দিয়ে নিজেদের আসল বৈশিষ্ট্য ধামাচাপা দিয়ে রাখি বটে, কিন্তু আদতে আমরা এই গ্রহের টপ প্রিডেটর। তাই যদি অন্য কোন স্পেসিস বা এনটিটি আমাদের অবস্থানের জন্যে হুমকিস্বরূপ হয়ে দাঁড়ায় – সম্মিলিত ভয় থেকে সমস্বরে ‘kill them all” উচ্চারিত হওয়া আমাকে অবাক করবে না।

এধরণের একটা প্লটে নির্মিত Ajin, পার্থক্য হচ্ছে এখানে মানবজাতির জন্যে হুমকিস্বরূপ প্রজাতি আসলে মানুষের বিবর্তিত একটা রূপ, যেখানে এই আলাদা মানুষরা অমরনশীল – না, ঠিক অমর নয়, মৃত্যুর পর পরই পুনঃজীবন লাভ করে। এদের আলাদা একটা ক্ষমতাও রয়েছে।

ইমরটালিটি বা অমরনশীলতা অর্জনের চেষ্টা প্রাচীনকাল থেকে বহু সভ্যতার বিভিন্ন কাল্ট, ব্লাক ম্যাজিক চর্চাকারীদের মধ্যে প্রচলিত। স্বভাবতই সাহিত্য, সিনেমা বা অন্যান্য শিল্প মাধ্যমেও উঠে এসেছে। স্রেফ অ্যানিমে ইন্ডাস্ট্রিতে থেকেই বহুত রেফারেন্স দেয়া যাবে। Ajin কোন দিক দিয়ে আলাদা?

ইমরটালিটির বেশীরভাগ চিত্রায়নের সাথে আজিনের পার্থক্য হচ্ছে এটা ভিত্তিহীন ফ্যান্টাসি না; বরঞ্চ সাইন্স ফিকশন – এবং গল্পকথন একেবারেই স্বতন্ত্র। পরিচালক এবং লেখক খুব যত্নের সাথে সবকিছু ব্যাখ্যা করতে না গিয়ে অর্ধেকটা দর্শকের দুয়ে দুয়ে চার মেলানোর ক্ষমতার উপর ছেঁড়ে দিয়ে গল্পের প্রয়োজন অনুসারে কাহিনী এগিয়েছেন। এধরণের অ্যানিমেতে এই চর্চাটা খুব উপভোগ্য হয়।
সেই সাথে প্রতি এপিসোডের মেকিং প্রায় নিখুঁত বলা যায় – সাসপেন্স/মিস্টেরি আর সাই-ফাই সিরিজ হিসেবে প্রতি এপিসোডে টান টান উত্তেজনা বজায় রেখেছে Ajin. সেই সাথে যোগ হয়েছে রক্তে দোলা দেয়া ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক।

এছাড়াও Ajin পছন্দ করার আরো কিছু কারণ আছে।
অপ্রয়োজনীয় চরিত্র একেবারেই নেই বলতে গেলে, পার্শ্ব চরিত্রগুলোর প্রতি ফোকাস করা হয়নি বিনা দরকারে, প্রধান চরিত্রকে দুনিয়ার সেরা মানব আর শুভবুদ্ধির ডিপো হিসেবে দেখানো হয়নি, হাঁটতে চলতে দুধের বাচ্চাদের কড়া জীবনবোধ মার্কা দর্শন চিপকাতেও দেখা যায় না। এসব জিনিষ অ্যানিমেতে কষ্ট করে সহ্য করে যাই; বলাই বাহুল্য Ajin দেখতে গিয়ে তৃপ্তির হাঁসি কান পর্যন্ত পৌঁছেছে।

আমার রেটিং – ৮.৫/১০

পুনশ্চঃ সিরিজের ভিলেনকে আমার কাছে অ্যান্টিহিরো মনে হয়। তাঁর দৃষ্টিকোণ একেবারে ফেলনা না এবং টিকে থাকার লড়াইয়ে একাত্মতা ঘোষণা করতে পারি।
পুনশ্চ ২ঃ Don’t care about the art style, never did, never will. This is a trivial issue and we really don’t watch animes to praise animation style, do we?

Ajin 2

Code Geass রিভিউ — Amor Asad

Code Geass: কেবলই কী অ্যানিমে? নাকি অননুভূত অভিজ্ঞতার রূপকও?
▬▬
Code Geass সম্পর্কে লেখার আগে একবার উইকি আর MAL’এ ঢুঁ মেরেছিলাম প্রোডাকশন সম্পর্কে খোঁজ খবর নিতে। অতীত অভিজ্ঞতার কারণেই জেনে নেয়া দরকার ছিল কোড গিয়াস অরিজিনাল সিরিজ নাকি মাঙ্গা অ্যাডাপশন। যেহেতু কোড গিয়াসের কোন মাঙ্গা ছিল না, তাই আলাদা কোন মানদণ্ড নিয়ে চিন্তা করতে হবে না।

CG1Ichirō Ōkouchi এবং Gorō Taniguchi’র প্রশংসা করতে হবে। গোপন এক সংস্থা, নেপথ্যের ভিজিলান্টে নায়ক এবং গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রগুলির মাঝে মূল্যবোধের পার্থক্য – বলা চলে সাদামাটা প্লট নিয়ে আগাচ্ছিলেন দুজন। অথচ সেই সাদামাটা প্লটকেই ব্যপক রূপ দিয়ে সিরিজকে এন্টারটেইনমেন্ট ভ্যালু তো দিয়েছেনই, সেই সাথে বিচ্ছিন্ন ভাবনার উদয় হবার সুযোগও রেখেছেন। এই লেখায় আমার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কিছু হাইপোথিসিস এবং কাউন্টার হাইপোথিসিস প্রস্তাব করব। এছাড়াও থাকবে ব্যক্তিগত ভালোলাগা মন্দলাগার কিছু টুকরো কথা।

Code Geass এর ঘটনাবলী অল্টারনেট টাইমলাইনের, যেখানে ব্রিটানিয়ান এম্পায়ার গোটা পৃথিবীর উপর একছত্র, একনায়কতন্ত্র কায়েমের তালে আছে। এটা স্পষ্টত যে এই ব্রিটানিয়ান এম্পায়ার আমাদের পৃথিবীতে অ্যামেরিকা; মানচিত্রে খেয়াল করলে দেখা যায়, USA এবং Latin America দুটো মিলেই ব্রিটানিয়ান এম্পায়ার। সুতরাং ব্যপারখানা দাঁড়াচ্ছে, অ্যামেরিকা ঔপনিবেশিকের ভূমিকায় আসীন এবং এক পর্যায়ে জাপান দখল করে নেয়।

CG2

 

এই দৃশ্যপটের পেছনে কিছু ব্যপার থাকতে পারে।
এক, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে এশিয়ানদের উজ্জ্বীবিত করতে এবং দলে টানতে সত্য-মিথ্যার মিশেলে কিছু অ্যর প্রোপাগান্ডা ছড়ায় জাপান। সাংস্কৃতিক আগ্রাসন, পুঁজিবাদ ছিল যার উপজীব্য বিষয় এবং ডিকটেটরশিপটুকু বাদ দিলে ব্রিটানিয়ান এম্পায়ার পুঁজিবাদী এবং ঐপনিবেশিক মনোভাবের কোন এক জাতির অর্জনের চুড়ান্তরূপ হিসেবে ধরা যায়। যুদ্ধ পরবর্তী অবস্থায় যদি পরাশক্তিরা পৃথিবী ভাগের তালে থাকত তবে হয়ত এরকমই হতো। এই থিওরীর পিছে আরেকটা ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল Nagasaki Arch, সম্ভবত পঞ্চম বা ষষ্ঠ এপিসোডে ক্ষণিকের জন্য দেখানো হয়, ব্রিটানিয়ান এম্পায়ারের জাপান আক্রমণের সময়কালে। এটা সেই আর্ক যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের নাগাসাকিতে ফেলা অ্যাটমিক তাণ্ডবের মাঝেও আস্ত ছিল। কোড গিয়াস ওয়ার্ল্ডেও চারপাশে ধ্বংসলীলা নিয়ে সদর্পে টিকে আছে। সোজা কথায়, ডিফরেন্ট টাইমলাইন, অ্যামেরিকা ইনভেডার, জাপান নির্দোষ। (পয়েন্ট টু বি নোটেডঃ আমি নিউক্লিয়ার অ্যাটাককে জাস্টিফাই করছি না, ক্রাইম অনুযায়ী জাপানকে খুব বেশিরকম আর নিষ্ঠুর মূল্য দিতে হয়েছে) তবে এই থিওরীতে যে ত্রুটি নেই সে দাবী করছি না, কারণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপান-জার্মান-ইতালি জোট হেরে গেলেও, জাপানের প্রোপাগান্ডা অনুযায়ী প্রস্তাবিত সিস্টেম (ব্রিটানিয়ান) বাস্তবে রূপ নেয়ার সুযোগ ছিল না। এটা ছিল স্রেফ দলভারী করার প্রয়াসমাত্র, নিদেনপক্ষে যুদ্ধচলাকালীন সময়ে। ওই সেন্টিমেন্ট এতদিন পর কেউ অ্যানিমেতে তুলে ধরবে বলে মনে হয়না। তাছাড়া সেসময় আরেক পরাশক্তি ছিল USSR, কোড গিয়াসের দুনিয়ায় রাশিয়ার অস্তিত্ব নেই।

দুই, একবিংশ শতাব্দীর কিছু আগে থেকে এবং তারও আগে কোল্ড অ্যর চলাকালীন সময়ে অ্যামেরিকা কাগজে কলমে সাধু সাজলেও নানা ছুতোয় বিভিন্ন দেশের অ্যাফেয়ার্সে বাগড়া দিয়েছে এবং দিচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের অনেকাংশ বিভিন্ন সময়ে ইউএস সরকারের দখলে ছিল এবং এখনও আছে। সেই সাথে বন্ধু রাষ্ট্রের উপরও বড়ভাইয়ের মতো আচরণ অদৃশ্য এক কলোনিস্ট জায়ান্টের কথা মনে করিয়ে দেয়। হতে পারে Code Geass’এ এই জায়ান্টের ফিজিকাল এবং ভবিষ্যৎ এক্সট্রিম রূপ ব্রিটানিয়ান এম্পায়ার। ২০০৬ সালে নির্মিত কোড গিয়াসের প্লট সময়কাল ২০১৭ করাটা কেবলমাত্র সাইফাই রূপ দেয়নি, এই ভীতিটার খসড়া একটা রূপও প্রদান করেছে। আবারও, ডিকটেটরশীপটুকু বাদ দিয়ে। সরাসরি আঙ্গুল তোলা থেকে বিরত থাকতে এবং সাইফাই/ফ্যান্টাসি রূপদানে গিয়াস পাওয়ার আর একনায়কতন্ত্র গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন ছিল।
অ্যানিমে সিরিজ কম দেখা হলেও অ্যানিমে মুভি দেখা হয়েছে বেশ, এবং আনুপাতিক হারে দেখলে এমন সুপ্ত কোন প্লট থাকার সম্ভাবনা খুব কম হলেও একেবারে বাদ দেয়া যায় না। এমনকি জিবলি স্টুডিও এর বাইরে নয়। গেলো বছর দুয়েক আগে, জাপানিজ এয়ারক্রাফট এঞ্জিনিয়ার জিরো হোরিকোশির বায়োপিক The Wind Rises এ আমরা দেখেছি তরুন এক ইঞ্জিনিয়ারের স্বপ্ন সফল করার আপ্রাণ প্রয়াস আর সেই সাথে নিখাদ দেশপ্রেম আর জাতিগত আত্মসম্মানবোধের মিশ্রণ। কিন্তু পর্দার আড়ালে এই সত্যটুকু চাপা পড়ে গেছে যে, জিরো হোরিকোশির ফাইটার প্লেনগুলো ঠিক শান্তি বজায় রাখতে যায়নি, বরং জার্মান অ্যালায়েন্সের অংশ হিসেবে জাপান আক্রমণকারীই ছিল। গ্রুপে Md Asiful Haque ভাইয়ের ব্যপক এক রিভিউ আছে এই অ্যানিমে নিয়ে।

তিন, আবারও সেকেন্ড ওয়ার্ল্ড অ্যরের দারস্থ হতে হবে তবে ভিন্ন দৃষ্টিকোণে। হিটলার, তার নাৎসি সাম্রাজ্যের সাথে ব্রিটানিয়ান সম্রাট চার্লসের ব্রিটানিয়ান এম্পায়ারের সেন্টিমেন্ট প্রায় সদৃশ বলা চলে। হিটলারের আরিয়ানদের মতই ব্রিটানিয়ানরা অন্য জাতিকে অস্পৃশ্য এবং নীচু মনে করে। আরিয়ানিজমের (Aryanism) সূতিকাগার ছিল জার্মানি, ব্রিটানিয়ান এম্পায়ারও তাই। লেখক ও পরিচালক Ichirō Ōkouchi এবং Gorō Taniguchi’কী তবে কোড গিয়াসে অ্যান্টি-নাজিজম সেন্টিমেন্ট রেখেছেন? এই সেন্টিমেন্টের জন্ম কি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের পক্ষে যুদ্ধ করার অপরাধবোধ থেকে? কে জানে।
আমি স্রেফ পয়েন্টগুলো উল্লেখ করলাম, গ্রহণ বা বর্জন করতে বলা আমার উদ্দেশ্য না। এগুলো হাইপোথিসিস, আগেই বলেছি। আবার অনেকটা স্বগতোক্তির মত। বাকিটা পাঠকের উপর নির্ভর করবে।

►দর্শক প্রতিক্রিয়া◄
এই অংশ সম্পূর্ণই অ্যানিমের স্টোরি রিলেটেড। এবং কিছু মাইল্ড স্পয়লার থাকবে, যিনি এখনও কোড গিয়াস দেখেননি, সামনে না এগোতে অনুরোধ করছি।

–**স্পয়লার অ্যালার্ট**–

কোড গিয়াস দেখতে গিয়ে এক ধরণের নতুন অনুভূতির সাথে পরিচিত হয়েছি। যখন দেখা শুরু করেছি, একের পর এক এপিসোড দেখে গিয়েছি বিরতিহীন। যখন বিরতি নিয়েছি, আবার দেখতে ইচ্ছে করেনি, একরকম অনীহা কাজ করেছে। আবার যখন দেখতে বসেছি, বিরতিহীন ভাবে দেখেছি। ইন এ সেন্স, কোড গিয়াস মাদকের মত ছিল।
সবচেয়ে যে ব্যপারটা দোলা দিয়েছে, তা হল গল্পের আনপ্রেডিক্ট্যাবিলিটি। কিছু কিছু ইভেন্ট আন্দাজ করতে পারলেও বেশীরভাগেই চমকে গিয়েছি। সুপার থ্রিলিং আর টুইস্ট ভর্তি শো’ হিসেবে কোড গিয়াস সবার শীর্ষে থাকবে কোন সন্দেহ নেই। সেই সাথে ক্যারেক্টার গুলোর তারিফ করতে হবে, এক্কেবারে নিখুঁত চিত্রায়ন। যেমন, Suzaku’কে হটাৎ করে পিষে ফেলতে চাওয়ার মত পাওয়ারফুল ইমোশন এমনি এমনি তৈরী হয়না। অথচ আইডিওলজিকালি সুজাকুর স্ট্যান্ড কোনভাবেই ফেলনা ছিল না। রক্তারক্তি থামানোই মূল ইচ্ছে ছিল সুজাকুর, তাতে সার্ভোভৌমত্ব যায় যাক। কাপুরুষত্ব? হতে পারে; কিন্তু ভুল নয়।
আচ্ছা, ভিন্ন একটা কোড গিয়াস ওয়ার্ল্ড বিবেচনা করা যাক যেখানে বর্তমান পৃথিবীর দেশসমূহের বদলে ফিকশনাল কিছু ল্যান্ড রয়েছে এবং এরিয়া ১১ শুরু থেকেই ব্রিটানিয়ান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত। তাহলে এরিয়া ১১’কে স্বাধীন করতে গড়ে ওঠা ব্লাক নাইট অর্গানাইজেশন আর জিরো আদতেই টেররিস্ট এবং সুজাকু আদতেই হিরো। স্রেফ ন্যাশনালিস্ট সেন্টিমেন্ট দর্শকের মনে সুজাকুর অবস্থান পাল্টে দিয়ে জিরোকে হিরো হিসেবে দাঁড় করিয়েছে।
এই পর্যায়ে প্রশ্ন করতে হবে, জিরো আদতেই হিরো ছিল কিনা। জিরো বা ‘লুলুচ ভাই ব্রিটানিয়া’র (ধন্যবাদ ইয়ামি আপু, নামটা পছন্দ হইছে) কোন ইচ্ছেই ছিলো না পাবলিক সার্ভিস দেয়ার, তার সবগুলো মোটিভ পারসোনাল এবং পারসোনাল গেইনেই তার সব প্লান। হ্যাঁ, সেগুলো হারানো জাপানের দমিত জনসাধারণের পক্ষেই গেছে কিন্তু সেটা জিরোর উদ্দেশ্য ছিল না এটা পরিস্কার। তাই, জিরো আসলে ভিলেইন। একেবারে শেষে আত্মাহুতি দিয়ে ভিজিলান্টিজম আর জাস্টিস আপহোল্ড করার চিহ্ন হিসেবে জিরো চরিত্রকে হিরোর মর্যাদায় উঠিয়ে দিয়ে গেলেই লুলুচের ক্রাইমগুলো মাফ হয়ে যায় না। ইনফ্যাক্ট, গিয়াস ব্যবহার করাটাই ক্রাইম, সুপারপাওয়ার নয়। জিরো তাই আমার চোখে সুপারহিরো তো নয়ই, হিরোও নয়।
হিরো সুজাকুও নয়। সেও ব্যক্তিগত আবেগের বশবর্তী হয়ে আনুগত্য পাল্টেছে বারংবার। একজন ন্যাশনালিস্টের চোখে সুজাকু রাজাকার, একজন অ্যানারকিস্টের চোখে সুজাকু অ্যান্টিহিরো, একজন ইউটোপিয়ানিস্টের চোখে সুজাকু হিরো।

লেখক ও পরিচালকের উদ্দেশ্য ছিলো মূল দুই ক্যারেক্টারের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের অন্তর্দ্বন্দ্ব তুলে ধরা।
স্যালুট দিয়ে বলতে হবে, তারা দারুণভাবে সফল।

তবে মেকিং এ কিছু ত্রুটি ছিল। কিছু দৃশ্যের ব্যাখ্যা না চাইতেই গরুর রচনা পেশ করা হয়েছে, কিছু দৃশ্য গ্যাপ দিয়ে দেখিয়ে দর্শকের কল্পনাশক্তির উপর ভরসা করা হয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে খুঁটিনাটি বিষয়গুলি লক্ষ্য করতে পছন্দ করি – তাও আমার কাছে রোলো, ভিলেটা আর জিরোর চুক্তির ব্যপারটা ঝাপসা – কোত্থেকে হুট কী হয়ে গেল। এরকম উদাহরণ আরো দেয়া যাবে।
আবার গল্পের উত্তেজনা যখন তুঙ্গে, হটাৎ করেই কাহিনীর রেশ চেপে ধরে ধীরে ধীরে এগোনো হয়েছে। এইরকম ছন্দপতনগুলি পছন্দ করতে পারিনি। সবচেয়ে বড় উদাহরণ হবে প্রথম সিজনের শেষ এবং দ্বিতীয় সিজনের শুরুর সময়টা। এতই বিরক্ত হয়েছিলাম, কোড গিয়াস দেখা বন্ধ করে অ্যাটাক অন টাইটান দেখতে বসেছিলাম।

তবে এসব ট্রিভিয়াল ব্যপার ওভারলুক করতে রাজী আমি। অন্তত সম্পূর্ণ সিরিজ শেষ করার পর সেটার আফটার ইফেক্ট হিসেবে যে ঘোরের ভীতর ছিলাম, তার জন্যে হলেও। খুব বেশি মোশন পিকচার দর্শককের অবচেতনকে আপন করে নিতে পারে না। এইটুকু ক্রেডিট দিতেই হবে কোড গিয়াসকে।

আমার রেটিং ৮.৭/১০

CG3