Hibike! Euphonium:নো-ওয়েইস্টেড-শট! — Fahim Bin Selim

 

hibike__euphonium_wallpaper_hd_by_corphish2-d8ngduu

একটা ভালো অ্যাডাপ্টেশন হওয়ার জন্য কী প্রয়োজন? অনেক বেশি সংখ্যক অ্যানিমে ফ্যান, এবং সামগ্রিকভাবেই ভিজুয়াল ফিকশনের ফ্যানরাই ভালো অ্যাডাপ্টেশন বলতে সম্ভবত বুঝে তার সোর্স ম্যাটেরিয়ালকে পুরোপুরিভাবে অনুসরণ করাকে। কিন্তু সেটা কি তার গল্প বলায় একটা সীমাবদ্ধতা সৃষ্টি করে না? কারণ শেষ পর্যন্ত, “অ্যাডাপ্টেশন” মানেই তো নতুন পরিস্থীতি, নতুন মাধ্যমের সাথে মানিয়ে নেওয়া – গল্পের বিন্যাস, কাঠামো আর বর্ণনা পদ্ধতিতে পরিবর্তন এনে হলেও। কারণ, অবশ্যই, বইয়ের পাতার লেখার মাধ্যমে গল্প বলা, আর টেলিভিশন, সিনেমার পর্দায় ছবি আর শব্দের মিলনে তা বলার মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য আছে। একই সাথে পার্থক্য আছে, আসলেই গল্প “বলাতে”, এবং তা  কেবল “দেখানো”-র মাঝেও। ছবি আর শব্দের মেলবন্ধন – আর তা যদি ভালোভাবে ব্যবহার করা যায়, অ্যানিমেশনের সম্ভাবনা অসীম, তৈরি হয় আসলেই ত্রিমাত্রিক অনুভূতির এক জগৎ। কিন্তু অবশ্যই এক্ষেত্রে গল্প বলার ক্ষেত্রে পরিচালকের কল্পনাশক্তির প্রাচুর্য্য থাকা জরুরী, যেহেতু  ছবি এবং শব্দের উপস্থিতি দর্শকদের নিজেদের কল্পনাশক্তি ব্যবহারের সুযোগ অনেকাংশে কেড়ে নিচ্ছে। এবং এটা আরো বিশেষভাবে, যখন একটা উপন্যাসকে অ্যাডাপ্ট করা হয়। কারণ এখানে মাঙ্গার মত আর চরিত্রদের চেহারা, তাদের অঙ্গভঙ্গি কিংবা তাদের আশেপাশের জায়গাগুলোর টেমপ্লেট আগে থেকেই দেওয়া থাকেনা। পুরোপুরিই পরিচালকের নিজের ইন্টারপ্রেটেশনের উপর নির্ভর করে। একজন পরিচালকের প্রতিভার পরিচায়ক তো কেবল সুন্দর কোন গল্প বলাতে নয়, কোন গল্পকে সুন্দরভাবে বলাতেই!

vlcsnap-2016-11-05-01h07m20s868

এখানে আর বাকি সব কিয়োঅ্যানির অ্যানিমের মত সুন্দর অ্যানিমেশন আর ভিজুয়াল উপস্থিত, হয়তো মাঝে মাঝে তুলনামূলক কম ভালোও। কিন্তু Hibike-’র শক্তি বরং এর গল্পবর্ণনায়। এর মূল গল্প বড় এক নভেল সিরিজ থেকে নেওয়া, একারণে গল্প আর চরিত্র – উভয়ের গভীরতাই তুলনামূলক বেশি। কিন্তু এই কারণেই বরং তার পুরোটা টিভির পর্দায় ফুটিয়ে তোলা আরো অনেক, অনেক বেশি কঠিন! কিয়োঅ্যানির ফ্ল্যাগশিপ পরিচালক তাৎসুইয়া ইশিদার কাছ থেকে আসায় যদিও এর সাফল্য নিয়ে আশাবাদী হওয়াটা যুক্তিসঙ্গত। কিন্তু তার পরও, ইশিদার বাকি সব অ্যানিমের চেয়ে Hibike আলাদা। Air, Clannad, Haruhi -‘র মত Hibike-তে বড় এনসাম্বলের কাস্ট থাকলেও, এর গল্প অনেক বেশি কানেক্টেড, কমপ্যাক্ট…বাস্তবিক! ফ্যান্টাসি জনরা গায়ে না লেগে থাকা একটা বড় কারণ, কিন্তু এটা বাদ দিলেও Hibike-’র প্রতিযোগীতা, সাফল্য আর ব্যর্থতার গল্প পরিচিত। গল্পবর্ণতাতে আছে আলাদা একটা নিজস্বতা। কেবল “দেখানো”-তেই সীমাবদ্ধ না, Hibike তার গল্পের বড় একটা অংশ “বলে” তার ভিজুয়াল দিয়ে।

“ক্যামেরা”-’র ব্যবহারটাই চিন্তা করা যাক, Hibike-তে ফোকাসিংকে কাজে লাগানো হয়েছে শিল্পের পর্যায়ে। পুরোটা সময় ঘোলাটে ব্যাকগ্রাউন্ড আর চরিত্রদের চেহারার উপর পূর্ণাঙ্গ ফোকাসই বলে দিবে মনোযোগটা কোথায় রাখা জরুরী। কিয়োঅ্যানিমের আর বাকি সব অ্যানিমে থেকেও তো একে এই এক বিষয় দিয়ে আলাদা করা যায়! কুমিকো গল্পের ন্যারেটর, তার স্বগোক্তিতেই সব বলা, প্রতি পর্ব শুরু আর শেষও তা দিয়ে। তার মাথার ভেতর, বিক্ষিপ্ত চিন্তাভাবনা আর স্মৃতি, কুইক-কাট ট্রানজিশনে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে নিয়ে যায়। কুমিকো যদিও বেশিরভাগ সময়ই আশেপাশে চলমান ঘটনার পার্শ্বচরিত্র; প্রভাবক, নীরব দর্শক আর গুপ্ততথ্যের রক্ষক। She sees everything and she understands. একজন ওয়ালফ্লাওয়ার! যার জন্য উপন্যাসের পাতা ভর্তি লেখা প্রয়োজন, তার জন্য এখানে একটি শব্দেরও প্রয়োজন হয় না; চরিত্রদের মুখের অভিব্যক্তি আর প্রতিক্রিয়া অনুসরণ করলেই হবে। নো-ওয়েইস্টেড-শট!

vlcsnap-2016-11-05-01h07m20s868

দ্বিতীয় সিজনের তৃতীয় পর্ব এর একটি ভালো উদাহরণ। এই পর্বের শুরুটা কুমিকোর মনোলোগ দিয়ে, কানসাই কম্পিটিশনের আগে শেষ প্রস্ততি পর্ব। কুমিকো আর আসুকার ছোট কথোপকথনের পরবর্তী ৩ঃ১৬-৩ঃ১৬ এ তিন সেকেন্ডের ট্রানজিশন, আর তার সাথে সাথে কুমিকোর এক্সপ্রেশন, সম্পূর্ণ ভিন্ন দুইটি সময় আর জায়গার মধ্যে সংযুক্তি। কোন এবরাপ্ট কাট না যেটা গল্পের গতি নষ্ট করে দিবে, অথবা কোন দীর্ঘায়িত অপ্রয়োজনীয় শট না, বরং দুটো একত্রে মিলিয়ে দেওয়া, গল্পের প্রবাহ বজায় রাখার জন্য! অথবা তার পরবর্তী দৃশ্য, আসল পারফর্মেন্সের আগে শেষবারের মত সব পারফর্মারদের একসাথে থাকা শেষ দৃশ্য। নিয়ামা আর হাশিমোতো-সেনসেই এর বিদায়ী ভাষন, উপদেশ। ক্যামেরা একজনের থেকে আরেকজনের পারস্পেকটিভে বদলাতে থাকে অনবরত, কার কোন কোন দূর্বলতা জানান দেয়, এবং তার সাথে সাথে পারফর্মারদের প্রতিক্রিয়া। কুমিকোর চেহারার অবিশ্বাস, আনন্দ, ভয় এবং একই সাথে অস্থিরতা ইউফোনিয়াম সোলোর অংশ হওয়ার খবর পাওয়ায়, রেইনার সন্তুষ্টির অভিব্যক্তি। কিংবা ইয়োরোইযুকার চোখে হাতের ওবোর দিকে স্থির, রোবোটিক দৃষ্টি, যখন হাশিমোতো তাকে যান্ত্রিকভাবে বাজানো বাদ দিয়ে আরো বেশি “এক্সপ্রেসিভ” হওয়ার নির্দেশ দেয়। কিন্তু তার জন্য তো “এক্সপ্রেস” করা সব সময়ই কষ্টকর ছিলো, সংগীত কিংবা শব্দ দিয়েও। তা তার গতবাঁধা জবাবেই আটকানো, “I’ll try to do better.” ব্যাকগ্রাউন্ড ফোকাসে ইউকোর চেহারায় অনিশ্চয়তা! প্রিয় মানুষের জন্য!

vlcsnap-2016-11-08-11h43m53s360  vlcsnap-2016-11-08-11h44m53s455vlcsnap-2016-11-05-01h13m11s868

গল্পটা কুমিকোর মাথার ভেতরে, তাই তো সবকিছু সামনে থেকে দেখা হয় না। রেইনা যখন তাকি-সেনসেইকে নিয়ামা-সেনসেইয়ের সাথে তার সম্পর্কের কথা জানতে চেয়ে প্রশ্ন করে, আগুনের অপর পাশে। তাদের কথা শোনা যায় না, পর্দায় কেবল দূর থেকে রেইনা আর তাকির শব্দহীন অভিব্যক্তি। কিন্তু অবশ্যই Hibike এই মুহূর্তটা অপচয় করবে না। বরং এপাশে সমান্তরালে হাশিমোতো-সেনসেইয়ের সাথে কুমিকোর কথোপকথন চলতে থাকে। তাকি-সেনসেই এরই অতীত নিয়ে! একই সাথে শব্দ আর ছবি দিয়ে দুটো আলাদা গল্প বলা! কনসার্টেশনে, কোনভাবেই ইনফরমেশনের ওভারফ্লো না, ইকোনমিক! কিংবা আসুকাকে আঁকড়ে ধরা নস্টালজিয়ার প্রতিটি মুহূর্ত, হাইস্কুলের শেষ বছরে এসে। যদিও তা মুখ ফুটে কেবল বেরোয় না সরাসরি। ক্লাবকে আগলে রাখার প্রতিটি চেষ্টায়, প্রতিটি ধাপ পেরোনোর আনন্দের বিহবল হওয়ার পরবর্তী নীরবতায়, অবশ্যম্ভাবী বিদায়ের কথা মনে পড়ায়, গ্রাস করা বিষাদ ঠিকড়ে বেরোয় তার হাসির পেছন থেকে, আর যখন সে বলে,  “I wish this summer would never end”।

vlcsnap-2016-11-05-01h34m13s058 vlcsnap-2016-11-05-01h31m48s174

কিন্তু সবচেয়ে বড় উদাহরণ অবশ্যই এর পারফর্মেন্সের দৃশ্যগুলো! মিউজিক অ্যানিমের সাফল্যের জন্য তো অসাধারণ সঙ্গীতেরই দরকার সবার আগে! Hibike এইক্ষেত্রে বরং Showa Genroku-’র সাথে তুলনীয়। Hibike-’র সঙ্গীতের বিচারক দর্শক নিজেরাই! কোন শর্টকাট না, এমনকি ৮ মিনিটের লম্বা পারফর্মেন্সেও! প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি বিট অ্যানিমেটেড। আর মনে রাখার মত ব্যাপার, অন্যান্য আর বেশিরভাগ অ্যানিমের মত Hibike-’র সঙ্গীত একক পরিবেশনা না, দলীয়! কন্ডাকটরের হাতের নির্দেশনা, প্রতিটি পারফর্মারের চলমান হাত অথবা মুখ, অথবা দুটোই, সঙ্গীতের সাথে মূর্ছনায়; নড়তে থাকা, সামনে, ব্যাকগ্রাউন্ডে একসাথে; ট্রামবোন, ট্রামপেট, টিউবা, ক্ল্যারিনেট, হর্ন, ট্রিমপানি, চাইম, টামবুরিন, ওবো, ফ্লুট, বেস, ইউফোনিয়াম! একসাথে চলতে থাকা! কোন স্ট্যাটিক শট না! আবার যখন রেইনার সোলোর দৃশ্য আসে, তখন পর্দায় রেইনার কল্পনায় ভেসে স্টেজ আর পাহাড়ের কিনারায় মিশে এক হয় কুমিকোর সাথে ফেস্টিভালের সেই রাতের দৃশ্য, কারণ এই পারফর্মেন্স তো তার জন্যই! অথবা ইয়োরোইযুকার কল্পনায় নোজোমি। কাওশিমার সামনে রাখা স্ট্যান্ডে বন্ধুদের সাথে তার ছবি। তাকি-সেনসেইয়ের সামনে তার স্ত্রীর। সবারই আলাদা আলাদা গল্প!

vlcsnap-2016-11-13-02h22m50s007

সামনে বসে থাকা দর্শকরা ফোকাসের বাইরে, পেছনে ব্যাকস্ট্যাজে বন্ধুদের বিচলিত পায়ের নড়াচড়া কেবল। আর এই দূর্দান্ত পরিবেশনার পরের দৃশ্যটাই কী? প্রথমে সবার হাঁপাতে থাকা চেহারা, বন্ধুদের কান্নার দৃশ্য, আর সবার শেষে দর্শকদের করতালি। আর তা ক্ষীন হতে হতে সরাসরি এন্ড ক্রেডিট। কারণ শেষ পর্যন্ত এটা তো তা-ই ছিলো, যা উপন্যাসের পাতায় কখনোই বোঝানো সম্ভব না, পাতার পর পাতা বাক্য দিয়ে ভরে ফেললেও, একইসাথে শব্দ আর চিত্রের পরিবেশনায়ঃ শ্বাসরুদ্ধ, চিত্তসম্মোহিত আর হতবিহবল করা।

নো-ওয়েইস্টেড-শট!

আসানো ইনিও – মাঙ্গায় সাহিত্য-বাস্তবতা — Fahim Bin Selim

সাধারণভাবে কমিকবই অথবা মাঙ্গাকে সম্ভবত সবসময়ই হালকা শিল্প হিসেবে ধরা হয়ে এসেছে। একই সাথে সাহিত্য আর চিত্রকর্মের সংযোগ, কিন্তু কোনটাই পুরোপুরি না। লেখা ও ছবি দুটোই ব্যবহার করায়, কমে যাওয়া পাঠকের উপর অর্পিত ভাবনা আর কল্পনার সুযোগও। আমেরিকার সুপারহিরো কিংবা জাপানের কিশোর-নায়ক – বরং প্রচলিত কমিকবই, মাঙ্গার সাথে টেলিভিশন সিরিজ অথবা ম্যাগাজিনের ধারাবাহিক গল্পের তুলনাটা বেশি যুক্তিযুক্ত; নির্দিষ্ট কিস্তিতে অনেক সময় ধরে প্রকাশ হয় বলে বাজারে কাটতি ধরে রাখা অপরিহার্য ব্যাপার যেখানে, শিল্পের পাশাপাশি টিকে থাকার জন্য ব্যবসায়িকও চিন্তাটাও। বাস্তবতা থেকে টেনে নিয়ে বিমোহিত করা ফ্যান্টাসি গল্প, কিংবা পাতার পর পাতা লোমখাঁড়া করা অ্যাকশন দৃশ্য – এমনকি ভালোবাসা, বেড়ে ওঠা আর জীবন সংগ্রাম নিয়ে স্লাইস-অফ-লাইফ গল্পের ঘাটতিও জাপানের কখনো ছিলো না। কিন্তু আসানো ইনিওর রীতি ভাঙ্গার চেষ্টাটা তার গল্পের জনরাতেও না, গল্পের ধরনেও না — তা আরো সুক্ষ্ণ — গল্প বর্ণনায়, তার চরিত্রের উপস্থাপনায় লুকানো।

ইনিওর মাঙ্গায় বারবার ঘুরে ফিরে আসে পুরোপুরি কালো প্যানেলে কেবল ন্যারেশন কিংবা মোনোলোগ, সাহিত্যের কাছাকাছি যাওয়া সবসময়ই হয়তো তার চেষ্টা ছিলো। শুরুটাও সাহিত্যিকদের মত ছোট ব্যপ্তীতে, কতগুলো ওয়ান-শট মাঙ্গা দিয়ে। ধীরে ধীরে হাত শানিয়ে নেওয়া, নিজের জীবন থেকে টেনে আনা গল্পতে। এই সময় ইনিও মাত্র বিশের ঘরে পা রাখা যুবক। বেশিরভাগ গল্পতেই তাই স্লাইস-অফ-লাইফ, সেইনেন, এই দুই জনরা উপস্থিত। প্রথম দিকের ধারাবাহিক মাঙ্গা Solanin(২০০৫-২০০৬) আর Hikari no Machi[City of Lights](২০০৪)-তে আধুনিক শহুরে জীবনকে কাছ থেকে তুলে আনার চেষ্টা। ঘটনাকেন্দ্রিক না হয়ে ইনিওর মূল দৃষ্টি বরং তার চরিত্রদের উপর, চ্যাপ্টার ভেদে গল্প-বর্ণনার পয়েন্ট-অফ-ভিউ পরিবর্তিত হওয়া, ওমনিবাস ন্যারেটিভে হালকাভাবে সংযুক্ত অনেকগুলো সুতো দিয়ে ধীরে ধীরে মাকড়সার জালের মত শক্ত একটা গল্প-কাঠামো তৈরিতে।

005

Solanin-এর মূলচরিত্র মেইকো যেমন জীবনের যান্ত্রিকতা থেকে মুক্তি পেতে দুই বছরের চাকরি ছেড়ে দেওয়া ২৪ বছরের এক যুবতী, ইনিওর বয়সটাও এসময় ২৪-ই। কৈশোর আর তারুণ্যের নদী পেরিয়ে জীবনসমুদ্রের অথৈজলে প্রথম অভিগমনের অভিজ্ঞতা এ মাঙ্গার পাতায় পাতায় — ভালোবাসা আর জীবন নিয়ে উদ্বেগ আর আশংকা, যখন প্রথমবারের মত নৌকাটার দাঁড়টা নিজের হাতেই, আর তার প্রতিটি টানের পরিণামও। নিজের স্বপ্ন আর সামর্থ্য নিয়ে চিরন্তন অন্তর্দ্বন্দ্বে আটকা থাকা। “Freedom without purpose feels a whole lot like a burden” – কালো প্যানেলের ন্যারেশনে মেইকোর স্বগতোক্তি আঁকা থাকে। মেইকোর সাথে সাথে হয়তো ইনিওর নিজেরও। শিল্পী হওয়ার চেষ্টাটা যখন সবসময়ই অনিশ্চয়তার এক পথ। “Maybe what you really want is something dreamy and unreal, and you are hesitating because of that.”

সাহিত্য-বাস্তবতা নিয়ে কাজ করলেও এই ড্রিমী এবং আনরিয়েল সুরা আর পরাবাস্তবতার ইনিওর গল্পে প্রবেশ করেছে হরহামেশাই। তার অ্যাবসার্ডিস্ট কমেডির হাত ধরে। Subarashi Sekai![What a Wonderful World!](২০০২-২০০৪) আর Sekai no Owari to Yokomae[Before Sunset and the End of the World](২০০৫-২০০৮), তার দুই গল্প-সংকলন, এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ। প্রতি চ্যাপ্টারে আলাদা আলাদা চরিত্র আর তাদের গল্প। সদ্য মৃত্যু বরণ করা উড়ে বেড়ানো কোন আত্নার নতুন চোখে জীবনকে দেখা। কিংবা স্কুলে যাওয়ার পথে কাকের সাথে কোন মেয়ের কথোপকথন। আবার কোন তরূণীর বৃষ্টিস্নাত তন্দ্রায় এসে হাজির হয় মুরাকামির ব্যাঙ। ব্যর্থ এক মাঙ্গাকার অনেক বছর পর স্কুলের পূণর্মিলনীতে গিয়ে দেখা হয় ছোটবেলার প্রথম ভালোবাসার সাথে, এখন যখন সে অন্য এক বন্ধুর স্ত্রী।

007

“Sometimes I think if I open my eyes, I’ll be a kid again and none of this will have happened.
But this has happened. And this is the only me there is,” গ্রাস করা অনুশোচনা অথবা হতাশা।
জীবন কখন ছকে বাঁধা ছিলো? অথবা অনুমিত?
ইনিওর গল্প থেকে ঠিকরে বেড়োয় স্মৃতিকাতরতা। কৈশোরের বন্ধুত্ব আর প্রেম নিয়ে।

Umibe no Onnanoko[A Girl on the Shore](২০০৯-২০১৩)-র মত হয়তো তা কেবলই দৈহিক। র’ আর অনেস্ট। ভেঙ্গে পড়া মানুষের মাথার ভেতর ঢুকে যাওয়া। ভালোবাসার সংঙ্গাটাকে পুনর্নির্ধারনের চেষ্টায়। সোফিয়া কোপোলার Lost in Translation এর প্রাপ্তবয়স্ক হ্যারিস আর শার্লটের নিষ্পাপ ভালোবাসার সাথে বৈপরিত্য টানতেই যেন তখন ইনিওর হাতের কলম এঁকে বেড়ায় কৌশরে পা রাখা ইসোবে আর সাতৌর ব্যক্তিগত সব মূহুর্তে; Kafka on the Shore-এর কাফকা তামুরার মত সেক্সুয়ালিটি নিয়ে কৌশোরের দূর্নিবার কৌতুহলে। তাদের একাকীত্ব আর অবসন্নতায় ভর করা কোন দুপুরে, কানের হেডফোনে যখন বাজতে থাকে Kaze wo Atsumette.
Nijigahara Holograph(২০০৩-২০০৫)-এ সেটা আবার সাইকোলজিক্যাল হররে রূপ নেওয়া। নিষিদ্ধ কোন সম্পর্কে। আপাত সাধারণ জীবনের মাঝে হঠাৎ মাটি খুঁড়ে বের হওয়া কোন পুরনো, লুকানো, স্মৃতি। যেন সাদা কালো কালিতে আঁকা ডেভিড লিঞ্চের কোন ফিল্ম। টুইস্টেড আর আননার্ভিং। কিন্তু বাস্তব আর জীবন্ত।

dass

Oyasumi Punpun[Goodnight Punpun](২০০৭-২০১৩)-এ পুনপুন আর আইকোর ভালোবাসাটা শৈশবের শুভ্র সাদা কাপড়ে মোড়ানো, সহজ এবং সরল। তাদের প্রথম শপথের মত, “Punpun, if you ever betray me, I’ll kill you.” এবং পুনপুনেই প্রথমবারের মত “সাহিত্যিক” ইনিওর বড় গল্পের পথে পা বাড়ানো। ১৪৭ চ্যাপ্টার আর ১৩ ভলিউমে, পুনপুন তো একটা উপন্যাসই! Oyasumi Punpun পুনপুনের জীবনের পিছে ঘুরে বেড়ায় একেবারে শৈশব থেকে। কোন রাতে আকাশের দিকে তাকিয়ে নভোচারী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা জন্মানোর মূহুর্তে, স্কুলে নতুন বদলি হয়ে আসা কোন বালিকার প্রেমে পরে যাওয়াতে, অথবা বন্ধুদের সাথে ঘুরতে বেড়োনো কোন সন্ধ্যায় পরিত্যক্ত এক দালানের ছাদে অতিপ্রাকৃতের মুখোমুখি হওয়ায়। আবারো কালো প্যানেলে ন্যারেশন লেখা উঠে, কিন্তু কখনো পুনপুনকে আমরা কথা বলতে দেখি না, অথবা দেখি না তার আসল চেহারা। পুনপুনের ভাবনাগুলো জানতে পারি মধ্যম পুরুষে। পুনপুনের বুলিতে আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায় আফ্রো চুলের জাপানী এক ঈশ্বর! হয়তো অনির্ভরযোগ্য সত্যতায়। পুনপুনই যেখানে চুপচাপ, লাজুক এক ওয়ালফ্লাওয়ার, তখন সেটাই তো স্বাভাবিক! মাঙ্গাতে উত্তর-আধুনিক আখ্যানের আবির্ভাব!

ইনিও অনুসরণ করে পুনপুনের স্বপ্নগুলোকেও। ছোটোবেলার নভোচারী হওয়া থেকে যা কৈশোরে বদলে যাওয়া মাঙ্গাকা হওয়ার ইচ্ছায়। অথবা আরো পরে, যখন চোখে অগুণিত সম্ভাবনার স্বপ্নালুতার বদলে জায়গা করে নিয়েছে ব্যর্থতার শূন্যতা। থাকে পুনপুনের ভাঙন ধরা পরিবার, হারানো ভালোবাসা আর আলগা হওয়া বন্ধুত্বের গল্পে।
বেড়ে ওঠা কখন সহজ ছিলো? অথবা নিখুঁত?
এবং পুনপুন বেড়ে ওঠার গল্প, কামিং-অফ-এজ এর অনবদ্য উদাহরণ; শুধু মাঙ্গা না, সাহিত্য…শিল্পের যেকোন মাধ্যমেই অন্যতম সেরা।

oyasumi-punpun-239358

ইনিও তার চরিত্রদের চিন্তাভাবনার ব্যবচ্ছেদ করে। পাঠকদেরও। তার গল্পগুলো কখনোই এসকেপিস্ট ফ্যান্টাসী না। ব্যাকগ্রাউন্ডে ব্যবহার করা তার নিজের ক্যামেরায় তোলা আসল রাস্তাঘাট আর ঘরবাড়ির ছবিগুলো বারবার বাস্তবতায় টেনে আনবে। সব উদ্ভট রসিকতা আর সুরা-পরা-বাস্তবতার আড়ালে ইনিওর চরিত্ররা চিন্তা করে সত্যিকারের মানুষের মত, কথা বলে সত্যিকারের মানুষের মত। তাদের সংগ্রামগুলোও সত্যিকারের মানুষের। মেইকো, ইসোবে অথবা পুনপুনের জীবনে – তাদের বেড়ে ওঠায়, বেড়ে ওঠার পর পেছনে ফিরে তাকানোয়, অথবা অনিশ্চয়তায় ঘেরা ভবিষ্যতে; স্কুলের টিফিনে বন্ধুদের আড্ডায়, প্রথম প্রেমে পরায়, অথবা তারূণ্যের জটিলতায়; বন্ধুত্বের ভাঙ্গা-গড়ায়, অনেক কাছের মানুষকে ভুলতে শেখায়; স্বপ্ন দেখায়, তা ভাঙতে জানায়, নতুন স্বপ্নে বিভোর হওয়ায়; মন্ত্র পড়ে ঈশ্বরকে ডাকার চেষ্টায়, পৃথিবীর সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কামনায়; ছোটবেলায় বড় হওয়ার বাসনায়, বড় হয়ে স্মৃতিকাতরতায় ভোগায়; মৃত্যুকে কাছ থেকে দেখায়, নতুন জীবনের সাথে পরিচিত হওয়ায় – নিজেদের খুঁজে না পাওয়াটা দুষ্কর।

এবং তারপর তার ব্ল্যাক-কমেডি, অ্যাবসার্ডিসিজম আর সিনিসিজমের ভেতরে ইনিও যখন মাঙ্গার পাতায় জীবনের গল্প বলে আদি-অকৃত্রিমতায়, তার আঁকায় তুলে আনে সাধারণে লুকিয়ে থাকা সৌন্দর্য্য, অথবা সাধারণে লুকিয়ে থাকা অন্ধকার, হতাশ করে, বিদ্ধ করে বাস্তবতার ছুড়ি দিয়ে, বলে মানুষের ব্যর্থতা আর সীমাবদ্ধতা নিয়ে, আবার শেষ পাতায় এসে লিখে যায়, “As long as you are alive, something good is bound to happen”, আমাদের আটকে ফেলে পুনপুনের পাখির অবয়বে, আইকোর সাথে ভালোবাসায় অথবা আরো পরে সাচির সাথে সাক্ষাতে, কিংবা মেইকোর সাথে অনেক দিন আগে ফেলে রাখা গিটার তুলে নেওয়ায়, আর তা যখন ভাবতে শেখায় – নতুন জিনিস এবং পুরনো জিনিস নতুন করে, আর মনে গেঁথে থাকে, চিরদিনের জন্য গেঁথে থাকে, একই সাথে লেখা আর আঁকার ভাষায় – তখন তা সাহিত্য…শিল্প, উঁচুদরের শিল্পই।

Chapter121pg7

 

 

[১] Lost in Translation: https://en.wikipedia.org/wiki/Lost_in_Translation_(film)

[২] Kaze wo Atsumette: https://www.youtube.com/watch?v=k2SPeEeCj3I

[৩] Kafka on the Shore: https://en.wikipedia.org/wiki/Kafka_on_the_Shore

Penguindrum-এ ট্রেনযাত্রাঃ হারানো দশক অথবা টোকিওর ত্রানকর্তা — Fahim Bin Selim

mawaru-penguindrum-large-end-card-characters-2091613238 (1)

Mawaru Penguindrum-এর অজনপ্রিয়তা সম্পর্কে সবচেয়ে বড় কারণ ধরা হয় এর দূর্বোধ্যতাকে – রূপক আর সাহিত্য-ঐতিহাসিক ঘটনার যোগসূত্র ব্যবহারে কুনিহিকো ইকুহারার স্বেচ্ছাচার। এক্ষেত্রে আপাত দৃষ্টিতে ব্যাপারটাকে ইডিওসিনক্রেসির কাতারে ফেলা যায়। যা একই সাথে এই অ্যানিমের সবচেয়ে বড় সমালোচনাগুলোর একটি। কিন্তু ইকুহারার Revolutionery Girl Utena-তেও তো রূপকের ছড়াছড়ি ছিলো, তারপরও কেন সেটাকে অবিসংবাদিতভাবে ধ্রুপদী অ্যনিমের কাতারে ফেলা হয়, Penguindrum-এর ক্ষেত্রে যা কেবল কাল্ট স্ট্যাটাসেই সীমাবদ্ধ? সম্ভবত পশ্চিম, তথা জাপানের বাইরের অ্যানিমে দর্শকদের আপ্রোচটাই ভুল। বার্থেসের “ডেথ অফ দ্য অথর”-এর অনুসারে বলা যায়, “একটি লেখার সঙ্গতি তার উৎসের – লেখকের উপর নির্ভর করে না, বরং তা নির্ভর করে তার গন্তব্য – পাঠকের উপর।” Mawaru Penguindrum কোন বৈশ্বিক গল্প না, তা পুরোপুরি জাপানের ইতিহাসের উপর ভর করা, এর মানুষ আর তাদের অতীত, তাদের পরিস্থিতি, তাদের দূর্দশার মনোসমীক্ষণ। Utena-তে থাকা ধর্ম, পরিবার, বেড়ে ওঠা, জেন্ডার-রোল নিয়ে দেওয়া সামাজিক-ভাষ্য এখানেও উপস্থিত, কিন্তু কনটেক্সটটা সেটার মত জেনারালাইজড না। স্থান, কাল আর পাত্রে সুনির্দিষ্ট।

grimripper_revolutionary_girl_utena_ep34_remastered_r2j_dual_audio_9f960d6f-mkv_snapshot_03-22_2014-02-08_18-10-15

Penguindrum-এর ট্রেন যাত্রায় সঙ্গী হতে হলে আপনার যাত্রা শুরুর প্রথম স্টেশন হবে ১৯৮০-এর শেষ ভাগের জাপান। বিশ্বযুদ্ধ যখন প্রায় ভুলে যাওয়া এক স্মৃতি, চার দশক পেছনে। জাপান দাঁড়িয়ে গেছে শক্তিশালী এক ভিত্তির উপর; সামাজিক, সংষ্কৃতিক আর অর্থনৈতিক – সব দিক থেকেই জাপানের বিস্তৃতি হতে লাগলো ক্রমাগত ফুলাতে থাকা এক বুদুবুদের মত। মানুষের জীবনযাত্রার মান বাড়তে থাকলো, তাদের চাহিদা বাড়তে থাকলো, সেই সাথে ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋনও। এবং এক্ষেত্রে যা হওয়া স্বাভাবিক, পুরোটাই ঘটলো অদূরদর্শী পরিকল্পনায়। এর পরের ব্যাপারটা হয়তো অর্থনীতিতে বিশেষজ্ঞ কেউ ভালো বুঝাতে পারবে, কিন্তু সাহিত্য আর রূপকের ব্যবহারে বলা যায় জাপানের অর্থনীতির বুদবুদটা, আর সব বুদবুদের অনিবার্য সমাপ্তীর সাথে মিলিত হলো। আর সেই বুদবুদের ভেতর থাকা মানুষেরা নতুন এক বাস্তবতার সম্মুক্ষীন হল। পরিণামটা হলো ভয়াবহ। পরিবর্তনটা হল বিপরীত। চাকরীর সংখ্যা কমলো, মানুষের আয় কমে গেলো, ইয়েনের দাম গেলো তলানিতে – কিন্তু নির্দিষ্ট একটা জীবন-ধাঁচের সাথে পরিচিত হয়ে যাওয়া মানুষেগুলোর চাহিদা কমলো না, তাদের প্রত্যাশাও। এক্ষেত্রে সরাসরি প্রথম আঘাতটা লাগলো সামাজিকভাবে – পরিবারে।

gg_mawaru_penguindrum_-_01_b8c345e7-mkv_snapshot_06-34_2011-07-11_17-16-19

প্রথম যাত্রাবিরতি বিংশ শতাব্দীর শেষ দশকে – জাপানের ক্ষেত্রে এই সময়টার জন্য বেশ গালভরা একটা নাম আছে – লস্ট ডেকেইড, হারানো দশক। ঐতিহাসিকভাবে জাপানের পারিবারিক কাঠামোটা বেশ শক্ত গাঁথুনির ছিলো, একসাথে কয়েক প্রজন্মের বসবাস ছিলো প্রথাগত। আশির শেষ আর নব্বইয়ের শুরুতে এই প্রথায় ভাঙন ধরতে শুরু করলো, পারিবারিক সম্পর্কগুলোতেও। আর্থিক সামর্থ্য বজায় রাখার চেষ্টায় মা-বাবারা উভয়ই কর্মক্ষেত্রে যাওয়া শুরু করলো। এবং অনুমিতভাবেই পশ্চিমের অনুরূপ জাপানে পরিবার বিচ্ছেদের সংখ্যাটাও হঠাৎ করেই বেড়ে গেলো(অগিনোমে পরিবার)। সন্তানেরা শৈশব থেকেই অপরিচিত, একাকী একটা পরিবেশে বেড়ে উঠতে লাগলো। “সফল” হওয়ার একটা চাপ তাদের উপরে বর্তালো। মা-বাবার অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণ করার চাপও(তাবুকি, ইউরি পরিবার) – তা নিজেদেরটা বিসর্জন দিয়ে হলেও। ডানা কেটে দেওয়ার পাখির মত, সাঁতার না পারা মাছের মত – অথবা দুটোই – স্থলে আটকে পড়া পেঙ্গুইনের মত! আর এই ধারণাটাকে এগিয়ে নিতে পরিবারের সাথে জোট বাঁধলো সমাজের নিষ্ক্রিয়তা আর ঘুনে ধরা এক শিক্ষাব্যবস্থা। ব্যাক্তিস্বাতন্ত্রবিহীন, যান্ত্রিক একটা জীবন। চাইল্ড ব্রয়লার!

ch

কিন্তু পরিবারের নিঃস্বার্থ ভালোবাসার সম্পর্কে যখন শর্ত জুড়ে দেওয়া হলো, তখন পরিবারের সংজ্ঞা নিয়ে নতুন করে ভাবার একটা সময় এসে পড়াটা স্বাভাবিক। জাপানের পদার্পন পোস্ট-মডার্নিস্ট এক জগতে। আর পোস্ট মডার্নিজমের কথা বলতে গেলে ট্রেনে নতুন এক যাত্রীর আসাটা জরুরী। হারুকি মুরাকামি।

দ্বিতীয় স্টেশন – জানুয়ারী, ১৯৯৫। জাপানে আঘাত হানলো ৬.৯ মাত্রার এক ভূমিকম্প – দ্য গ্রেট হানশিন আর্থকোয়াক। জাপানীদের মনোবলের ভিতটা নড়ে গেলো। আর মুরাকামি লিখলেন তার “after the quake” ছোটগল্প সংকলনের কালজয়ী গল্প “Super Frog Saves Tokyo”. গল্পের শুরুতেই আমরা মূলচরিত্র কাতাগিরিকে দেখি একদিন কাজ থেকে ফিরে নিজের ঘরে এক বিশাল বড় ব্যাঙকে আবিষ্কার করতে। “আমাকে ব্যাঙ বলবেন”, ব্যাঙটা বলে নিস্পৃহভাবে, ম্যাজিক রিয়ালিজমের ব্যাকরণ মেনে। কাতাগিরির উপর দায়িত্ব বর্তায় টোকিওকে রক্ষা করার। কাতাগিরি সারাজীবনই নিঃস্বার্থভাবে দায়িত্ব পালন করে গেছে। তার পরিবারের বাকিদের জন্য নিজের স্বপ্নকে বিসর্জন দিয়েছে, চাকরীর কঠিন দায়িত্ব নির্দ্বিধায় পালন করেছে। কিন্তু বদলে সে কখনোই কোন স্বীকৃতি পায়নি, তদ্বিপরীত, কাতাগিরির জীবনটা বরং একাকীত্বের। এখানেই যুক্তির ফাটল ধরে। পরিবার যদি তার সদস্যদের অসম্পূর্ণতাকে মেনে নিতে ব্যর্থ হয়, আব্র একই সাথে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যতার পায়ে শিকল পরিয়ে দেয়, তাহলে তার কার্যকারিতা কোথায়? কেবলই রক্তের সম্পর্কে? আপনি কী জন্য আরেকজন ব্যক্তির জন্য নিজের ভালোকে বিসর্জন দিবেন? জৈবিক তাড়নায়, পার্থিব উন্নতির লক্ষ্যে? নাকি পুরো ব্যাপারটাতেই ঐশ্বরিক পুরষ্কারের আকাঙ্ক্ষা নিহিত?

Penguindrum-এ ইকুহারা এই ধারণাটাকে আমূল বদলে দিলেন। কাতাগিরির পরিবারের সম্পূর্ণ বিপরীত, আমরা তাকাকুরা পরিবারের তিন ভাই-বোনের সাথে পরিচিত হই, যারা প্রকৃতপক্ষে কেউ কারো সাথে সরাসরি রক্ত-সম্পর্কিত না! কিন্তু তাদের সম্পর্কের গভীরতা একটি “আসল পরিবার”-এর তুলনায় কোন অংশেই কম না। একজন আরেকজনের জন্য জীবন বাজি রাখতে প্রস্তুত!

vlcsnap-2016-06-08-14h28m50s130

ট্রেনের কামরায় নতুন একজনের অতিথির আগমন – কেনজি মিয়াজাওয়া। কেনজি মিয়াজাওয়া তার “Night on the Galactic Railroad” গল্পে এই আত্নত্যাগের বিষয়টা বারবার ফিরিয়ে এনেছেন। মিয়াজাওয়ার মতে জীবনের সব গুলো ঘটনাই সম্পর্কযুক্ত, তা যত ছোটই হোক না কেন। নিয়তির বিচারে সব অংকের যোগফল শুন্য। এবং আপনি কেবল বড় একটা নাটকের অংশ মাত্র, যার চিত্রনাট্য আপনার হাতে নেই; তার লাল-সুতায় সবাই বাঁধা, এবং এর থেকে মুক্ত হওয়ারও কোন উপায় নেই। ভালো সবসময়ই থাকবে, খারাপ সবসময়ই থাকবে। বৃশ্চিক হওয়ার নিয়তি যদি অনিবার্যও হয়, কিন্তু তার প্রক্রিয়া আর কার্যকারণ আপনার হাতে, তা কুয়োয় পরে জীবন হারাবেন, নাকি আকাশে নক্ষত্রমন্ডল হয়ে জ্বলতে থাকবেন। জীবনের সমাপ্তী কেবল বেঁচে থাকাতেই না।

vlcsnap-2016-06-08-14h25m19s100

কাতাগিরির যেমন দায়িত্ব পরে “ওয়ার্ম”-এর হাত থেকে টোকিওকে বাঁচানোর – যাকে ব্যাঙ বর্ণনা করে, “মানুষের মনের সব অন্ধকারের সমষ্টি” হিসেবে, কিন্তু “ওয়ার্ম”-কে সরাসরি ভালো-খারাপের মানদন্দে ফেলা যায় না। “ওয়ার্ম” বরং জাপানের মানুষের সমষ্টিগত চেতনার অনুরূপ। কেউই তার জন্য দায়ী নয়, এবং একই সাথে সবাই দায়ী।

ট্রেনের চেয়ারগুলোতে কি কতগুলো খেলনা ভাল্লুক দেখা যাচ্ছে? আমাদের যাত্রার শেষ গন্তব্য ২০ মার্চ, ১৯৯৫। জাপান যখন লস্ট ডেকেইড পার হচ্ছিল, তখন তার ছায়ায় বেড়ে উঠেছে এক ভয়ংকর টেরোরিস্ট সংগঠন – ওম শিনরিকিও(পিং গ্রুপ!)। ওম শিনরিকিওর শুরুটা বুদ্ধিজম আর হিন্দুইজমের যোগসূত্র স্থাপনের চেষ্টায়। কিন্তু এক পর্যায়ে সেটা হয়ে গেল তাদের নেতা শোকো আসাহারার ব্যক্তিগত এক কাল্ট, যখন সে নিজেকে দাবি করলো “ক্রাইস্ট” হিসেবে। এ ধরনের পাগলাটে সংগঠনে যোগ দেওয়ার মত বোকামি কে করবে! কিন্তু সেটা করলো জাপানের সেরা, সেরা সব বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা, শিক্ষকরা, শিক্ষিত ব্যক্তিরাই! তাদের মতে জাপানকে এর যুদ্ধ-পূর্ববর্তী নির্মোহ, নির্জীব অবস্থা থেকে বাঁচাতে একটা “ধাক্কা”-’র প্রয়োজন ছিলো। ধাক্কাটা হবে টোকিওর নিচ দিয়ে চলে যাওয়া সুদীর্ঘ পাতাল-রেলপথে। হয়তো এতে অনেক মানুষ মারা যাবে – কিন্তু জাপানের সামগ্রিক “শুদ্ধির” জন্য এই বিসর্জনটা মেনে নেওয়াই যায়।

vlcsnap-2016-06-08-14h34m37s72

Penguindrum-এ ইকুহারা ওম শিনরিকিও-’র চিন্তাধারাটা বোঝার চেষ্টা করেছেন।তিন মূলচরিত্রের বাবা-মা-ই ওম শিনরিকিওর সদস্য! মুরাকামিকেও এই ব্যাপারটা ভাবিয়েছে, তিনি কেবল থট এক্সপেরিমেন্ট দিয়ে ফিকশনের “ওয়ার্ম”-এই পরে থাকেননি, সারিন গ্যাস অ্যাাটাক দ্বারা প্রভাবিত মানুষদের গল্প শুনেছেন, ওম শিনরিকিওর সদস্যদেরও। তারপর ১৯৯৭ সালে লিখলেন প্রায় শ’খানেক মানুষের সাক্ষাৎকার সম্বলিত নন-ফিকশন “Underground”. এই বইয়ের সাক্ষাৎকারগুলোতে জাপানের সেই সময়কার মানুষদের মানসিক অবস্থার একটা ধারণা পাওয়া। কেউ কেউ ছিলো যারা সকালবেলা এই দূর্ঘটনার মুখে পরেও, পরবর্তীতে কর্মস্থলে গেছে যেন কিছুই হয়নি, নির্দিষ্ট প্রোগ্রামে আটকে থাকা রোবটের মত। কারো কারো আবার জীবন বদলে গেছে, পরিবারে বিচ্ছেদ ঘটেছে, সবকিছু নতুন করে দেখতে শিখায়(“after the quake”-এর “UFO in Kushiro” পড়তে পারেন)। মানুষের মূল্যবোধকে ভেতর থেকে খাওয়া অ্যাপ্যাথেটিক এক সমাজব্যবস্থা আর সরাসরি মানুষ হত্যা করতে প্রস্তুত এক ডুম’স ডে কাল্টের মধ্যে আপনি কীভাবে তুলনা করবেন?

“And the opposite of life is not death, it’s indifference.”
― Elie Wiesel

এই কাল্ট যখন আবার সেই সমাজব্যবস্থার কারণেই বেড়ে ওঠা, সেই সমাজেরই “সব অন্ধকারের সমষ্টি”? পাতালপথের নিচে বাড়তে থাকা “ওয়ার্ম”, কাধের পেছনে ভর করা এক ভূত, একটি অভিশাপ – “সানেতোশি”। কেউই তার জন্য দায়ী নয়, এবং একই সাথে সবাই দায়ী। এর ফলাফলটাও ভোগ করবে সবাই। “ওয়ার্ম” অথবা “সানেতোশি”-’র হাত থেকে টোকিওকে বাঁচানোর দায়িত্বটাও কাতাগিরি বা মোমোকোর একার নয়, কিন্তু কাতাগিরি এবং মোমোকোরও দায়িত্ব। তার বদলে কোন স্বীকৃতি না পেলেও। একটি ব্যাঙ অথবা একটি ডাইরী বাদে কেউ তাদের বীরত্বের কথা না জানলেও। শোকো আসাহারার মত কেবল ফাঁকা বুলিতেই না, ক্রুশেও যে বিঁধতে হবে একজন “ক্রাইস্ট”-কে।

চিরস্থায়ী ভালোর আশা করাটা বোকামি, কিন্তু খারাপের বিপক্ষে ভালোর লড়াইটাও চিরস্থায়ীই। বারবার ফিরে আসা – চাক্রিক। টোকিওর পাতালপথের রেললাইনের মত! তাই তো মোমোকোর পর আবার কানবা আর শৌমার জন্ম হয়। অংকের যোগফল শুন্য হলেও তা বের করার পথটা বদলে দেওয়াই যায়।

শুধু জাদুমন্ত্রটা মনে থাকলেই হবে।

mawaru_penguindrum_24_5

[১] কুনিহিকো ইকুহারা – অ্যানিমে পরিচালক; Penguindrum, Utena, Sailor Moon S, Yuri Kuma Arashi
[২] Revolutionary Girl Utena – ১৯৯৭ https://en.wikipedia.org/wiki/Revolutionary_Girl_Utena
[৩] লস্ট ডেকেইড – https://en.wikipedia.org/wiki/Lost_Decade_(Japan)
[৪] হারুকি মুরাকামি – জাপানী সাহিত্যিক; https://en.wikipedia.org/wiki/Murakami_Haruki
[৫] দ্য গ্রেট হানশিন আর্থকোয়াক – ১৯৯৫; https://en.wikipedia.org/wiki/Great_Hanshin_earthquake
[৬] after the quake – ২০০০, ছোটগল্প সংকলন; https://en.wikipedia.org/wiki/After_the_quake
[৭] কেনজি মিয়াজাওয়া – জাপানী সাহিত্যিক; https://en.wikipedia.org/wiki/Kenji_Miyazawa
[৮] টোকিও সাবওয়ে সারিন গ্যাস অ্যাটাক – ১৯৯৫; https://en.wikipedia.org/wiki/Tokyo_subway_sarin_attack
[৯] ওম শিনরিকিও – https://en.wikipedia.org/wiki/Aum_Shinrikyo
[১০] Underground – ১৯৯৭; https://en.wikipedia.org/wiki/Underground_(Murakami_book)

Shouwa Genroku-তে আত্নহত্যা, আর রাকুগোর মঞ্চায়ন — Fahim Bin Selim

 

[Shouwa Genroku Rakugo Shinjuu স্পয়লার সতর্কতা]

ShouwaGen 2

রাকুগো [落語, Rakugo] – আক্ষরিক অর্থ “পড়ন্ত শব্দ(Falling Words)”। মূলতঃ মঞ্চে বসে কেবল এক-দুটো সরঞ্জাম দিয়ে(অধিকাংশ সময়ই একটা কাগজের পাখা একটা ছোট কাপড়ের টুকরো) গল্পবর্ণনার বাচনিক শিল্পমাধ্যম। যদিও এই ধারা বেশ আগে থেকেই জাপানে চলে আসছিলো, তবে মেইজি এরাতে এসে প্রথম “রাকুগো” শব্দটার প্রচলন হয় আর শৌয়া পিরিয়ডে এসে সাধারণের বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে জনপ্রিয়তা পায়। যদিও শেষ পর্যন্ত রাকুগো একটি নিশ(Niche) বিনোদন মাধ্যমই থেকে গেছে, বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের কাছে। একাকীই পুরো অভিনয়টা করতে হয় বলেই রাকুগো করার জন্য প্রয়োজন বেশ বড় পরিসরের কন্ঠবৈচিত্রতা আর বডি-ফেস এক্সপ্রেশনের ছোটখাটো পরিবর্তন দিয়ে বড় ধরনের ভাব আদানের দক্ষতা। এই রাকুগো পারফর্মারদের – যাদের ডাকা হয় “Deshi” বলে – বড় থিয়েটারগুলোতে, বড় উপলক্ষগুলোতে সুযোগ পাওয়ার জন্য পার হয়ে আসতে হয় বেশ কয়েকটি ধাপ। পেতে হয় কমিটির অন্যান্য রাকুগো মাস্টারদের সমর্থন। বিভিন্ন ঘরানার রাকুগো দেখা গেলেও একে সাধারণভাবে ভাগ করা যায় কমেডি, হরর(কাইদান) আর ট্র্যাজেডিতে।

আর Shouwa Genroku-’র গল্পটাতে যে ট্র্যাজিক-ড্রামা তা প্রথম পর্বেই ভালোভাবে বুঝিয়ে দেওয়া হয়, যা লাফিয়ে বেড়ায় শৌয়া পিরিয়ডের সময়টাতেই, একই সাথে অতীত(চল্লিশের দশক) আর বর্তমানে(সত্তরের দশক)। গল্পের শুরুটা উদীয়মান রাকুগো “অভিনেতা” ইয়োতারোকে দিয়ে ‘৭০ এ হলেও, অন্তত অ্যানিমের প্রথম সিজনের অধিকাংশ সময়টাই তার গুরু কিকুহিকোর সাথে কাটানো, ‘৪০ এর যুদ্ধকালীন আর যুদ্ধপরবর্তী জাপানে। Shouwa Genroku-’র প্রথম পর্বটা, যেটা আগে বেরোনো দুটো OAD-’র পুনর্বণনা আর ৪০ মিনিটেরও বেশি দীর্ঘ, একটা আদর্শ “পাইলট” এপিসোড, পুরো অ্যানিমেটারই একটা খন্ডচিত্র; তা এসথেটিক দিক দিয়েও, গল্পের মেজাজ আর গতির দিক দিয়েও। আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এর সমাপ্তী, যা আগে থেকেই বলে দেওয়া; বারবার শোনা কোন রাকুগোর মত যেন। আর একারণেই Shouwa Genroku-’র মূল বিশেষত্ব “কী হবে” তাতে নয়, বরং “কীভাবে হবে”-তে আবদ্ধ। মাঙ্গার প্যানেল-বাই-প্যানেল থেকে বেরিয়ে অ্যানিমেশন/সিনেমা মাধ্যমে গল্পের মঞ্চায়নে পরিচালকের নিজস্বতার শুরুটা এখান থেকেই। অনেকটা পার্থক্য তুলে ধরার চেষ্টাতেই যেন, “ভার্বাল স্টোরিটেলিং”-কে কেন্দ্র করে আবর্তিত এক গল্পে তার চরিত্ররা প্রথম থেকেই ভাব প্রদানে ব্যবহার করেছে খুবই কম শব্দ। রহস্য আর নাটকীয় মুহূর্তে সংলাপগুলোকে দমিয়ে দিয়ে বরং মনোযোগ দেওয়া হয়েছে ভিজুয়াল স্টোরিটেলিং আর নুয়ান্সের উপর।

vlcsnap-2016-04-20-21h11m08s220

vlcsnap-2016-04-20-21h11m14s20

 

পিরিয়ড ড্রামা হিসেবে Shouwa Genroku-’র অর্ধেক আকর্ষন যুগ পরিবর্তনের সাথে সময় রাকুগোর টিকে থাকা, তার সাথে জড়িত মানুষদের টিকে থাকার গল্প; প্রতিভা, সাফল্য, ব্যর্থতা, ভালোবাসা, তাদের টানাপোড়েনের গল্প। আগের থেকেই জনপ্রিয়তা নিয়ে ধুঁকতে থাকা এই মাধ্যম বড় একটা ধাক্কা খায় টেলিভিশন, রেডিও আর সিনেমার মত নতুন বিনোদন মাধ্যমগুলোর আবির্ভাবে। আরও একটা বড় কারণ সম্ভবত এর ঐতিহ্য আর প্রচলিত ধারার বাইরে যাওয়ার বিপক্ষে একগুঁয়েমি। অ্যানিমের পুরোটা জুড়েই শিল্পের এই চিরচেনা অন্তর্দ্বন্দ্ব চলতে থাকে। দুই মূলচরিত্র সুকেরেকু আর কিকুহিকোর রাকুগো পরিবেশনার বৈপরীত্যটা সামগ্রিক রাকুগো জগতের অবস্থার সাথেই সমান্তরাল টানার চেষ্টা। কিকুহিকো, একজন সহজাত অভিনেতা; সূক্ষ্ণ আর নিখুঁত, ক্রিটিকালি অ্যাক্লেইমড, পিয়ার(peer)-দের ঈর্ষা আর অগ্রজদের প্রশংসার পাত্র; কিন্তু দর্শকদের সাথে তার সংযোগটা, যেটা আর যেকোনো মঞ্চপ্রদর্শনের মতই রাকুগো পারফর্মেন্সের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কখনোই তার কাছে সহজাত ছিলো না। সুকেরেকুর অবস্থানটা পুরো বিপরীত। তাকে বলা যায় জনগণের রাকুগো পারফর্মার। কমেডি ধারাতেই তার বিচরণ, আর দর্শকদের বিনোদনের জন্য, তাদের সখ্যতা পাওয়ার জন্য কমেডির চেয়ে ভালো আর কী হতে পারে! কিন্তু প্রতিভা থাকলেও তা টিকিয়ে রাখার চাপ সামলাতে সুকেরেকু বারবার ব্যর্থ হয়।

sho Shouwa Genroku Rakugo Shinjuu 09.mkv_snapshot_11.52_[2016.03.10_17.08.26]

Shouwa Genroku বেশ বড় একটা সময় মঞ্চের বাইরের জীবনের নাটকীয়তা নিয়ে কাটালেও, এর বাকি সময়টা কেবলই মঞ্চের রাকুগো নিয়ে। রাকুগো, এমন একটা শিল্পমাধ্যম যা ধৈর্য্যের পরীক্ষা নেয় বেশ ভালোভাবেই – তা যেমন তার পারফর্মারের, তেমনি এর শ্রোতারও। আর Shouwa Genroku প্রথম থেকেই আমাদের থিয়েটারের ভেতর বসিয়ে দেয়, বেশ কয়েকটি রাকুগো পারফর্মেন্সের পুরোটা দেখিয়ে, যার সবচেয়ে বড়টি প্রায় ১৫ মিনিট।

গঠনগতভাবে, রাকুগো শুরুটা হয় বড় একটা বিল্ডআপের নিয়ে, আর তার শেষটা হয় হঠাৎ কোন সমাপ্তী নিয়ে – কমেডির ক্ষেত্রে কোন রানিং জোক অথবা ওয়ার্ডপ্লে আর ট্র্যাজেডির ক্ষেত্রে পতনের অনিবার্যতার নিয়ে। বিল্ড-আপের মূহুর্তটা ধীরে ধীরে শ্রোতাকে গল্পের ভেতর টেনে আনার প্রচেষ্টা। বক্তা, কেবল শব্দের মাধ্যমেই যে কিনা সকল শ্রোতার কল্পনাশক্তিকে একসাথে চালিত করে ইনডিভিজুয়াল কনশাসনেসকে ছড়িয়ে দিবে সবার মাঝে। Shouwa Genroku-’র পারফর্মেন্সের দৃশ্যগুলোকে এক্ষেত্রে নিখুঁতই।

shogen

পারফর্মেন্সগুলো আমরা দেখতে পাই বক্তা-শ্রোতা দুই পরিপ্রেক্ষিত থেকেই। রাকুগো পারফর্মারকে দূর থেকে দেখা যায়, দর্শকের চোখ দিয়ে, আসন গেড়ে বসা, বিচলিত অথবা আত্নবিশ্বাসী, স্পটলাইটের কেন্দ্রবিন্দুতে। দর্শকের দেখা যায়, বক্তার চোখ দিয়ে, অনিশ্চয়তা অথবা আগ্রহ নিয়ে তাকানো, আধো আলো-ছায়ায়। কিন্তু যতই গল্প এগোতে থাকে, আর যতই গল্পের আবহ আচ্ছন্ন করা শুরু করে, ততই বাস্তবতা বিলীন হয় আর প্রবেশ ঘটে পরাবাস্তবতার জগতে। আমাদের চোখের সামনেই দর্শকরা হারিয়ে যায় অন্ধকারে। অথবা বক্তার নিয়মিত বদলে যাওয়া গলা আর বৈচিত্র্যতা থাকা অঙ্গভঙ্গিগুলো প্রাণ নিয়ে যেন মঞ্চে হাজির হ্য় আলাদা আলাদা সব চরিত্র হিসেবে। শৌয়া পিরিয়ডের টোকিওর কোন থিয়েটারের মঞ্চ রুপান্তরিত হয় এডোর কোন পতিতালয়ের ঘরে। আমরা শ্বাসবন্ধ করে বসে থাকি, দর্শকদের সাথেই, তার যখন হঠাৎ কোন কৌতুকে হেসে ঊঠে তখন আমরাও হাসি। অথবা আঁতকে উঠি শিনিগামির আগমনে।

vlcsnap-2016-04-20-21h10m34s128

কিন্তু কেবল রাকুগোর নিখুঁত মঞ্চায়নই না, তার চেয়েও বেশি কিছু, Shouwa Genroku এক অনবদ্য সিনেমাও। সামনে থেকে না দেখতে পাওয়া পারফর্মারের দেহের অঙ্গভঙ্গিগুলো আমরা দেখি, পারফর্মারের পাশে বসে, আসলেই মিশে একাকার হই, শুধু রাকুগোগুলোর গল্পের সাথেই না, তার পেছনের মানুষটার গল্পগুলোতেও। কোন মোনোলোগ না, কোন আলাদা সংলাপ না – কিন্তু পারফর্মারের মনের ভেতর ঢুকে যেতে খুব একটা বেগ পেতে হয় না। হয়তো ছোট একটা শট-ফ্রেমিং – পায়ের আড়ষ্টতা বা ঠোটের কোনের সূক্ষ্ণ হাসি – Shouwa Genroku-’র ছোট ছোট দৃশ্যগুলোই হাজার শব্দের একটা ভাব বহন করে।

Shouwa Genroku-’র মূল গল্পের পুরোটাতেও আমরা বসে থাকি অধীর আগ্রহে, এর অনিবার্য ট্র্যাজেডির জন্য। তার চিরচেনা ভাব-গাম্ভীর্য নিয়েই কিকুহিকো যখন বলে যায় আত্নহত্যা অথবা পতনের গল্প – সুকেরেকু, মিয়োকিচি আর…রাকুগোর।

Cat Soup-এ মৃত্যু-ভাবনাঃ ভালোবাসা এবং অনিবার্যতা — Fahim Bin Selim

মানুষের জ়ীবনের সবচেয়ে বড় ভয়গুলোর মধ্যে একটা সম্ভবত পরিবর্তন; চেনা-পরিচিত জগৎটার পালটে যাওয়া। তা পরিস্থিতির বদলে হতে পারে, স্থান-কালের বদলে হতে পারে, হতে পারে পাত্রের বদলে; কিংবা অনুপস্থিতিতে। এক্ষেত্রে পরিবারের কথাই কি সবার আগে মাথায় আসে না, যেখানে মোটামুটি পরিবারকে ঘিরেই পরিচিত জগৎ-টার শুরু, এবং বড় একটা সময় জুড়ে সেটাই পুরো জগৎ হয়ে থাকে? শিশুদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা আরো বেশি।

নিয়াত্তার যুদ্ধটা এই পরিবর্তনের বিপক্ষে – পরিণতি আর অনিবার্যতার বিপক্ষে। স্রষ্টা-সর্বপরিচালকের বিপক্ষেও কি না? Cat Soup-এর শুরুটা মাসাকি ইউয়াসার[১]  ট্রেডমার্কড পারস্পেকটিভ শট দিয়ে। ক্যামেরা বাথটাবের ভিতর পরে থাকা, তার উপরে জলের আবরণ – স্থির – আপাত পরিস্থিতির মত। কিন্তু এরপরই নিয়াত্তার আগমন, খেলনা নিয়ে পানির ভেতর হাত ডুবিয়ে খেলতে থাকা, অতঃপর তাতে উপুড় হয়ে পরে যাওয়া, জলের আবরণে আন্দোলন এবং হ্যালুশিনেশনের শুরু। পরাবাস্তবতারও।

vlcsnap-2016-02-21-18h04m26s131

একটা মরা পোকার খোলস দেখা যায়, দেখা যায় বাইরের ঘরে শুয়ে থাকা অসুস্থ নিয়াকোকে। এবারের পারস্পেকটিভ শটটা তার চোখ দিয়ে দেখা – উপরের সিলিং, ক্রমশ জট পাকিয়ে যাওয়া, বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া, ক্রমশ অন্ধকার হয়ে যাওয়া দৃষ্টি। বারান্দায় মৃত্যু দেবতার আগমন। কাছাকাছি দুটি মৃত্যু এবং মহাবৈশ্বিক চিন্তাভাবনায় কোনটাই কোনটার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়। নিয়াত্তার যুদ্ধটা এখান থেকেই শুরু। সে মৃত্যু দেবতার হাত থেকে নিজের বোনের আত্নাকে একরকম টানাটানি করেই ফিরিয়ে আনে। তারপর তার মৃতদেহের ভেতর তা পুরে দেয় – আর জাদুর মত তার বোনও মৃত্যুর কোল থেকে ফিরে আসে! জাদুবাস্তবতা অথবা শিশুমনের অলীক কামনা। কিন্তু এভাবেই তাদের অভিযাত্রার সূত্রপাট।

তাদের প্রথম বিরতি এক রঙ্গমঞ্চে – দ্য বিগ হোয়াইট সার্কাস। আরো ভালোভাবে বলতে গেলে স্রষ্টা -‘র সার্কাসে। সবার সামনে একটা মেয়েকে কেটে টুকরো টুকরো করা হয় এবং তার হাতের ছোঁয়ায় তারপর ভোঁজ়বাজির মত তা আবার জুড়েও দেওয়া হয়! দর্শকদের মধ্য থেকে এবার অনুরোধ নেওয়া পালা, প্রথমে চেয়ার, তারপর মাছ, এবং সবশেষে এক হাতি – এবং আর্শ্চর্যজনকভাবে এবারও জাদুর মত সে শুধু বলে – এবং তা হয়ে যায়! তবে দর্শকদের মনোরঞ্জনের পর্ব শেষ হলে স্রষ্টা-‘রটা শুরু। এক প্রবল স্রোতের বন্যায় সবার ভেসে যাওয়া, “নোয়া’হ ফ্লাড” যেন। চারিদিক যতদুর চোখ যায় কেবল পানি আর পানি, কিন্তু নিয়াত্তা আর নিয়াকোর “আর্ক”-এ প্রাণীকূলের প্রতিনিধি হিসেবে কেবল তারা ভাইবোন দুজন বিড়াল আর তাদের “প্রিয়” পোষ্য শুকর(Cat Soup Original দ্রষ্টব্য)। লৌহ-পাখার এক প্রজাপতি উড়ে যায়। নিয়াত্তা আবারো বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হতে থাকায় তার বোনের পরিচর্যা করা শুরু করে, তাকে খাইয়ে দেয়, এমনকি পোষ্য শুকরের ক্ষতি করে হলেও – নৈতিকতা আর ভাবাদর্শ চুলোয় যাক(আক্ষরিকভাবেই!), পরিবারই সবার আগে অবশ্যই!

Screenshot_2016-02-21-11-00-12

এই নৌকায়ই নিয়াত্তার দেখা পানিতে ভাসতে থাকা মৃত পশুর জীবনচক্র – তার মৃতদেহের পাখিদের পেটে যাওয়া, শিশুপাখির মল হিসেবে পানি-বাতাস পেরিয়ে আবার ভুপৃষ্ঠে ফিরে আসা, অতঃপর পুষ্টি হিসেবে কাজ করে গাছের ডালে ফুল হিসেবে ফোটা। “Adventure Time” কার্টুন সিরিজের মাসাকি ইউয়াসা পরিচালিত পর্ব Foodchain-এ এই থিম পরবর্তীতে আরো বিশেষভাবে ব্যক্ত হয়েছে।

Screenshot_2016-02-21-11-02-09

অনেক তো সুখের সময় গেল – এপর্যায়ে স্রষ্টা-‘র পুনরাগমন। এবং তার খাওয়ার দৃশ্য। এবং অনেকটা তার খামখেয়ালীপনার কারণেই চারিদিক পানিতে ভেসে যাওয়া জায়গাগুলোরই এখন ধুঁ ধুঁ মরুভূমি হওয়ার পালা। “নোয়া’স ফ্লাড” হয়েছে আর “জোসেফ’স ফেমাইন” হবে না? প্রথমে পোষ্য-শুকর এবং পরে মরুভুমির নিচ থেকে বের করা জল-হস্তীর মৃত্যুর পর জলের অভাবে ধুঁকতে থাকা দুই ভাইবোনের এবার আশ্রয় হয় এক স্যাডো-ম্যাসোকিস্ট বুড়োর দূর্গে। আর এখানেই মুভির অন্যতম সেরা দৃশ্যের অবতারনা। খাবার টেবিলে বুড়ো নিয়াত্তা আর নিয়াকোর জন্য আয়োজন করে রাজকীয় ভোজ়ন আর তার পূর্বের রন্ধনদৃশ্যও! মৃত্যু নিয়ে Cat Soup-এর গাঢ়-রসিকতার চূড়ান্ত প্রদর্শনী। নিশ্চিতভাবেই নিয়াত্তার জন্য তা বেশ উপভোগ্যও ছিলো। যতক্ষন পর্যন্ত না তারা নিজেই আবার এর অংশ হয়ে যায় – ক্যাটস্যুপ-এর উপকরণ হিসেবে বিড়ালই তো লাগবে সবার আগে! নিয়াত্তা আর নিয়াকো কোনমতে বেঁচে ফিরে। তবে এবার স্রষ্টা-‘র খামখেয়ালীপনার দ্বিতীয় পর্বের শুরু।
Screenshot_2016-02-21-11-10-34

গড-এর হাত থেকে পরে যাওয়া খাবারের টুকরো ঘড়ির কল-কব্জা আটকে দেয়। আটকে যায় সময়ও। নিয়াত্তার নিজের বোনকে ফিরিয়ে আনার যুদ্ধটা যতটাই স্রষ্টা-‘র বিপক্ষে হোক না কেন, এক্ষেত্রে তাঁর ভ্রুক্ষেপ নেই বললেই চলে – পুরোটাই তার উপভোগের বিষয়, এখানে কেউ তাঁর সহযোগী নয়, কেউ তার শত্রু নয়। আটকে থাকা সময়ে নিয়াত্তা ঘুরে বেড়ায় পৃথিবীর বুকে। তার দেখা হয় আপাতত সময়ে আটকে থাকা, শীঘ্রই ট্রেনের নিচে চাপা পরে মরতে যাওয়া এক নারীর সাথে। নিয়াত্তা তার চোখে লেগে থাকা শক্ত হয়ে যাওয়া দুঃখ মুঁচড়ে খুলে নেয় এবং নিচে আছড়ে ফেলে। তা ভেঙ্গে চুরমার হয়। জীবনের সব সৌন্দর্য আর ভালোলাগার দেখা পাওয়ার জন্য কষ্টগুলো পার হওয়া খুবই তুচ্ছ। যাত্রাটা দুর্গম কিন্তু অসম্ভব নয়। লজ্জা, অপমান, ব্যর্থতা – সবকিছুর কষ্ট সহ্য করে হলেও কি বেঁচে থাকাটাই গুরুত্বপূর্ণ না?

Screenshot_2016-02-21-11-12-19

ঘড়ির কাঁটা সামনে এবং তারপর পিছে আগায়। এবার একগাদা অসংযুক্ত ভিনিয়েট পর্দায় খেলা করে। Mind Game[৩]-এর অনুরূপ! বিড়াল-সহোদর সময়ের চক্রে বুড়ো হয়ে যায়, আবার ফিরে আসে। মানুষেরা পেছনে দুপায়ে হাঁটতে হাঁটতে আদি-বানরের চারপায়ে নেমে আসে, সরীসৃপেরা ডাঙ্গা ছেড়ে নেমে যায় প্রাগৈতিহাসিক জলে। ডাইনোসরদের নির্বংশ করা উল্কাপিন্ড তার অধিবৃত্ত পথে অভিকর্ষ ত্যাগ করে ফিরে যায় মহাকাশে। “উন্নত” মানুষের হিংস্রতার খন্ডচিত্র দেখা যায় – মানুষ মারা যায়; যুদ্ধের মিসাইলে, বন্দুকের গুলিতে, দালানের ধ্বসে, গাড়ি দূর্ঘটনায়। আর এ সবকিছুই হয় নিস্পৃহ স্রষ্টা-‘র ভোজনামোদের অংশ। বিড়াল-সহোদর আবার তাদের নৌকায় ফিরে আসে। কর্দমাক্ত নোংরা জলে যান্ত্রিক মানুষের দেখা মেলে। পুনরাগমন ঘটে লৌহ-ডানার প্রজাপতির। ভাইবোনকে সে পথ দেখায়। আর দেখা মেলে সেই ফুলের, চক্রশেষে যার জন্ম হয়েছিল তাদের থেকেই। নিয়াকো তার প্রাণ ফিরে পায়। সুখী সমাপ্তী!

Screenshot_2016-02-21-11-18-05

অথবা শিশুমনের অলীক কামনা। নিয়াত্তার জীবনের সুখের স্মৃতিগুলো হারাতে থাকে একেক করে – তার বাবা, তার মা, সব শেষে তার বোন। এমনকি সে নিজেও হারিয়ে যায়। মৃত্যুর পর সবই সমান। অন্ধকার।

তাই প্রতিটি মূহুর্তই গুরুত্বপূর্ণ। জীবনে টিকে থাকা, তা যত কষ্ট সহ্য করেই হোক, সবসময়ই তা বিলিয়ে দেওয়ার চেয়ে সুন্দর। কারণ জীবনের প্রতিটি স্মৃতিই, প্রতিটি মূহুর্তই গুরুত্বপূর্ণ। জীবনের অংশ হও। তা এমনকি ছোটবেলায় পরিবারসহ সৈকতে গিয়ে তোলা কোন ছবিতে হলেও

vlcsnap-2016-02-21-17h47m20s104

 

 

[১] – [https://en.wikipedia.org/wiki/Masaaki_Yuasa]

[২] – [http://kisscartoon.me/Cartoon/Adventure-Time-with-Finn-Jake-Season-06/Episode-007-008?id=3768]

[৩] – [https://en.wikipedia.org/wiki/Mind_Game_(film)]

কন আর্ট – স্বপ্ন, বিভ্রম আর চলচ্চিত্রের প্রতি প্রেমপত্র — Fahim Bin Selim

১৮ মে, ২০১০।

টোকিওর মুশাশিনো রেডক্রস হাসপাতালে সাতোশি কনের মৃত্যুপাঠ পড়ে শোনানো হল। সাথে ড্রিমিং মেশিন-এরও – স্ক্রিপ্ট আর ১৫০০ এর মধ্যে ৬০০ শট সম্পূর্ণ হওয়ার পরও – কারণ কাপ্তান কন তখন আর তার হাল ধরে থাকার মত অবস্থায় ছিলেন না – তাঁর দর্শন নিয়ে,  নির্দেশনাশৈলী নিয়ে – যে জাহাজ একমাত্র তিনিই সৈকতে ভেড়াতে পারতেন। তিনি যদিও আরও ৩ মাস বেঁচে থাকবেন, কখনো হাসপাতাল বিছানায়, কখনো নিজের বাসার; ক্যান্সারের আক্রমনে ক্রমাগত হার মানতে থাকা অগ্ন্যাশয় নিয়ে। একেবারে কাছের আত্নীয় আর সহকর্মী ব্যতীত বাকিদের কাছ থেকে এ খবর অজানা থাকবে একেবারে শেষ দিন পর্যন্ত।

এই টোকিওর মুশাশিনো আর্ট ইউনিভার্সিটিতেই সাতোশি কনের হাতেখড়ি, গ্রাফিক ডিজাইনিং এর উপর। যদিও তার জন্ম আর বেড়ে ওঠা হোক্কাইদোর সাপ্পোরোতে। ছোটবেলায় কনের সময় কাটতো ফিলিপ কে. ডিক(Blade Runner) আর ইয়াসুতাকা সুতসুই(The Girl Who Leapt Through Time, Paprika) এর সাই-ফাই উপন্যাস পড়ে, আর দেশী-বিদেশী চলচ্চিত্র দেখে – বিদেশীই বেশি। ১৯৭৪ সালে, কন খুঁজে পেলেন তাঁর পছন্দের দুইটি জিনিসের সংমিশ্রণ – সাইন্স ফিকশনের অবাধ্য কল্পনাশক্তি আর তার সাথে অ্যানিমেশনের চলচ্চৈত্রিক স্বাচ্ছন্দ্যতা, একই কাপে – স্পেস ব্যাটলশীপ ইয়ামাতোতে। সাতোশি কন অ্যানিমের প্রেমে পড়ে গেলেন।

 

অবশ্য তাঁর পেশাদারিত্বের শুরুটা হয়েছিলো মাঙ্গা দিয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই কনের প্রথম মাঙ্গা – Toriko(১৯৮৪) – কোদানশার তেৎসুয়া চিবা অ্যাওয়ার্ডে রানারআপের পুরস্কার পেয়ে গেল। সাথে তাঁর সুযোগ মিলল কাৎসুহিরো ওতোমোর(Akira, Patlabor, Memories) সহকারী হয়ে যাওয়ার। কন পরবর্তীতে শুধু মাঙ্গাতেই না, স্ক্রিপ্টরাইটার, অ্যানিমেশন ডিরেক্টর হিসেবে ওতোমোর বেশ কয়েকটি অ্যানিমে চলচ্চিত্রের কাজেও সহযোগী ছিলেন। যার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ১৯৯৫ এর তিনখন্ডের ওভিএ Memories-এর Magnetic Rose অংশ। কন তার প্রথম সিরিয়ালাইজড মাঙ্গা প্রকাশ করে্ন ১৯৯০ তে; Kaikisen – এর কাগজে কাগজে, সাদাকালোর কালির আঁচড়েও তার অসাধারণ সিনেমাটোগ্রাফির পরিচয় পাওয়া যাবে, যা পরবর্তীতে তার অ্যানিমে চলচ্চিত্রগুলোর অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হিসেবে পরিচিতি পায়।

027 028

আর এর প্রথমটি ১৯৯৭ এর Perfect Blue। ইয়োশিকাজু তাকেউরার উপন্যাস অবলম্বনে তৈরী এ চলচ্চিত্র প্রথমে হওয়ার কথা ছিলো লাইভ-অ্যাকশনে। পরে কনের হাতে দায়িত্ব পরে ম্যাডহাউজের হয়ে এর অ্যানিমেটেড ওভিএ তৈরি করার। কন দায়িত্ব নিলেন ঠিকই, কিন্তু কাহিনীর মূল অংশ – আইডল, স্টকার আর হ্যালুশিনেশন – কেবল ঠিক রেখে গল্পের পুরো কাঠামোই বদলে নিলেন নিজের মত। যাতে যোগ হল সেসময়কার ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা পেতে থাকা ইন্টারনেট। নিজের প্রিয় Slaughterhouse-Five বই থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে  Perfect Blue-র গল্প কন বললেন অনেকটা অসংযুক্ত আখ্যানে। যেখানে সময় কেবল সরলরৈখিক না, আর এতে দেখানো ঘটনাও ধ্রুবসত্য না। তা ব্যক্তি আপেক্ষিক। কল্পনা, স্বপ্ন, অবচেতন – সবই ব্যক্তির সময়ের অংশ, বর্তমান-এর অংশ।  পরবর্তী চলচ্চিত্রগুলোতেও যা ঘুরেফিরে এসেছে।

ma

ওভিএ হিসেবে না, ম্যাডহাউজ Perfect Blue-কে মুক্তি দিলো প্রেক্ষাগৃহেই। প্রথম চলচ্চিত্র দিয়েই কন পেয়ে গেলেন দেশি-বিদেশি সমালোচকদের প্রশংসা, । Perfect Blue ডাক পেল বিভিন্ন দেশের ফিল্ম-ফেস্টিভ্যালগুলোয় – পেল তাৎক্ষনিক কাল্ট ক্লাসিকের মর্যাদা আর চিরদিনের জন্য কালজয়ী সব সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার মুভিদের পাশে স্থান।

2

চলচ্চিত্র-প্রেমিক কনের প্রথম মুভিতেই তুলে আনলেন বিনোদন-জগতের অন্ধকার দিক। যদিও ঠিক সামাজিক-ভাষ্য প্রদান  বা সমালোচনা   কখনোই তার মূল উদ্দেশ্য ছিলো না। Perfect Blue নিয়ে কনের চিন্তাভাবনা, আর মূলচরিত্র মি্মা কিরিগোয়ের পতন নিয়ে বরং সমান্তরাল টানা যায় । গল্পে মিমা সাধারন এক পপ-আইডল থেকে যতই বিনোদন জগতের উপরের তলায় আরোহণ করতে থাকে – মানসিক আর শারীরিক বিভিন্ন ত্যাগ সহ্য করে – ততই তার কাছে চেতন আর অবচেতনের বিভেদ ভাঙ্গতে শুরু করে। তার আকাংক্ষিত স্বপ্নালোক বিভীষিকায় রুপ নেয়।

আমি যখন Perfect Blue এর কাজ শুরু করি তখন আমার উদ্দেশ্য ছিল ইতিবাচক কিছু বানানো। কিন্তু আমি যতই সামনে আগাতে থাকলাম, ততই  গল্পটা আরো নেতিবাচক হয়ে যাচ্ছিলো, আর গম্ভীর হয়ে যাচ্ছিলো। একদিক দিয়ে এটা নিয়ে আমি বেশ অসন্তুষ্ট ছিলাম। [১]

 

চলচ্চিত্রের প্রতি কনের ভালোবাসার প্রকাশ তার অন্য মুভিগুলোতেও বারবার ঘুরে ফিরে এসেছে(Tokyo Godfathers একমাত্র ব্যতীক্রম)। Paprika(2005)-‘র স্বপ্ন আর বাস্তবতা একাকার হওয়ার গল্পে নায়ক কানোকাওয়া পেশায় গোয়েন্দা হলেও, ছিলো ফিল্মস্কুলের ছাত্র। তাই তো তার ঘুমের মাঝে হানা দেয় যৌবনের অপূর্ণ বাসনা – নিজেকে সে আবিষ্কার করে তার প্রিয় চলচ্চিত্রগুলোর নায়কের ভূমিকায় – কখনো Tarzan-এ, From Russia With Love-এ, অথবা Roman Holiday-তে; কখনো বা আবার পরিচালক হওয়ার প্রচেষ্টায় ব্যার্থ কানোকাওয়া নিজেকে কল্পনা করে স্ব্য়ং আকিরা কুরোসাওয়ার জায়গায়!paprika5

তবে চলচ্চিত্রের প্রতি কনের অকৃত্রিম ভালোবাসার সবচেয়ে বড় নিদর্শন তার দ্বিতীয় চলচ্চিত্র, তার সবচেয়ে সমালোচক-প্রশংসিত-ও, ২০০১ সালের Millennium Actress।

 

Perfect Blue নিয়ে কনের যে অসন্তুষ্টি ছিলো, তা দূর করার উদ্দেশ্যেই Millennium Actress-এর আগমন। এ দুটো মুভিকে যেন এক জোড়া, একই মুদ্রার দুই পিঠ। সাতোশি কন ফিরিয়ে আনলেন তার পুরোনো সেই মূল থিম – আইডল  আর অ্যাডমায়ারার-এর গল্প – কিন্তু এবার সম্পর্কটা অবশেসন এর না, বরং প্রকৃত ভালোবাসা আর শ্রদ্ধার। কনের  আকাংক্ষিত ইতিবাচক এক ছবি।

আমি যখন প্রযোজকের সাথে Millennium Actress এর কাজ হাতে নিলাম, তখনই আমার লক্ষ্য ছিল আইডল-অ্যাডমায়ারার নিয়ে আরেকটি গল্প বলা। যেন  এদুটি সহোদর চলচ্চিত্র হবে।

শুধু গল্পের দিক দিয়েই না, আখ্যানেও Millennium Actress ছিলো Paprika আর Perfect Blue-‘র মত আনঅর্থডক্স(Tokyo Godfathers এখানেও ব্যতীক্রম!)। পাশাপাশি ভিজুয়ালেও কন নিয়ে আসলেন সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী এক সিনেমাটিক টেকনিক – Trompe-l’œil. দ্বিমাত্রিক চলমান ছবি দিয়ে ত্রিমাত্রিক বিভ্রম তৈরী করার এর চেয়ে উৎকৃষ্ট উদাহরন হয়তো বড় পর্দায় আর খুব বেশি পাওয়া যাবে না। Millennium Actress তার ৮৭ মিনিটের ব্যপ্তীকাল জুড়ে এক অনবদ্য ট্যুর-ডি-ফোর্স। চিয়োকো ভেসে বেড়ায় স্থান-কাল আর বাস্তব-রুপালী পর্দার রেখার উপর দিয়ে – কুরোসাওয়ার[২] এডোতে, মাঞ্চুরিয়ার প্রোপাগান্ডায়, যুদ্ধের ধ্বংসস্তুপে পরিণত হওয়া শহরে, ওযুর[৩] কোন প্রথম-গ্রীষ্ম অথবা বসন্ত-শেষের টোকিওতে, আবার অনেক অনেক দূরের কোন ভবিষ্যতের এক মহাকাশযাত্রায়।

Millennium Actress, সেতসুকো হারা[৪] আর হিদেকো তাকেমিনে[৫] – জাপানের দ্বিতীয় সহস্রাব্দের কালজয়ী সব নায়িকাদের প্রতি সশ্রদ্ধ-স্বীকৃতি, একই সাথে জাপানের ইতিহাস, তার চলচ্চিত্রের ইতিহাসের প্রতি “অ্যাডমায়ার” কনের প্রেমপত্র। সাতোশি কনের আর বাকি সব চলচ্চিত্রগুলো মতই তাতে লজিক গুরুত্বপূর্ণ না, ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর মধ্য থেকে কোন বার্তা খুঁজে বের করা গুরুত্বপূর্ণ না – এখানে যাত্রাটাই মুখ্য বিষয়।  আর এ যাত্রা এক অতুলনীয় অভিজ্ঞতা – যা বইয়ের পাতায় পাওয়া সম্ভব না, গানের সুরে পাওয়া সম্ভব না, মানব অভিনীত চলচ্চিত্রেও পাওয়া সম্ভব না।

 

নিশ্চিতভাবেই এই ধারা Dreaming Machine-এও বজায় থাকতো – যেমন কন তার দর্শকদের আমন্ত্রন জানিয়েছিলেন Paprika-‘র শেষ দৃশ্যে।

drea

কিন্তু সেই সাতোশি কন কিনা ২০১০ এর আগষ্টে মারা গেলেন মাত্র ৪৭ বছর বয়সে!

Dreaming Machine  বের হওয়ার স্বপ্ন হয়তো স্বপ্নই থেকে যাবে। কিন্তু স্বপ্নই বা খারাপ কী? একটা জিনিস যদি  সাতোশি কনের মুভিগুলো শিখিয়ে দিয়ে থাকে, তবে তা হল: স্বপ্ন আর বাস্তবতা মিশে যেতে খুব বেশি কিছু লাগে না। তাই এখনই মাথায় স্বপ্ন-যন্ত্র চাপিয়ে বসুন আর ঝাঁপিয়ে পরুন কল্পনার জগতে; কে জানে, হয়তো আপনার স্বপ্নের সাথে কনের স্বপ্ন একাকার হয়ে বাস্তবে হানা দিবে টোকিওর রাস্তায় হাঁটতে থাকা কোন টেলিভিশনের পর্দায়।

Paprika-2

 

[১] http://www.midnighteye.com/interviews/satoshi-kon/

[২] আকিরা কুরোসাওয়া – কিংবদন্তী জাপানী চলচ্চিত্র নির্মাতা। উল্লেখযোগ্য কাজ – Seven Samurais, Ikiru, Rashomon.

[৩] ইয়াসুজিরো ওযু – কিংবদন্তী জাপানী চলচ্চিত্র নির্মাতা। উল্লেখযোগ্য কাজ – Late Spring, Early Summer, Tokyo Story.

[৪] সেতসুকো হারা – কিংবদন্তী জাপানী চলচ্চিত্র অভিনেত্রী। উল্লেখযোগ্য কাজ – Late Spring, Early Summer, Tokyo Story.

[৫] হিদেকো তাকামিনে – কিংবদন্তী জাপানী চলচ্চিত্র অভিনেত্রী। উল্লেখযোগ্য কাজ – Twenty-four Eyes, Floating Clouds.

পিংপং দ্য অ্যানিমেশন – ব্যর্থতা, সংগ্রাম আর জীবনের শৈল্পিকতা — Fahim Bin Selim

[Ping Pong the Animation স্পয়লার সতর্কতাঃ নিজ দায়িত্বে পড়ুন]

পিংপং দ্য অ্যানিমেশন গতবছর দেখা অংগোয়িং অবস্থায়, সপ্তাহে এক পর্ব করে , এপ্রিল থেকে জুন অবধি। আর এটা ছিলো আমার গতবছরের সবচেয়ে প্রিয় অ্যানিমে। গত মাসে এর ডাব বের হওয়ায় কিছুদিন আগে পুনরায় দেখা শুরু করেছিলাম। আমি কি এখনোও মনে করি, পিংপং দ্য অ্যানিমেশন ২০১৪-এর সেরা অ্যানিমে? Does it hold up?

 

“There are no heroes.”

-Kazama

                      vlcsnap-2015-07-14-17h09m11s124
হোশিনো ইউতাকা – পেকো। পিংপং খেলায় অসাধারন প্রতিভাবান, আঞ্চলিক বয়সভিত্তিক প্রতিযোগীতায় দুর্জেয়, চারিদিক সমাদৃত। অত্যুৎসাহী, খামখেয়ালী। আর উদ্ধত। ছোট পুকুরের বড় মাছ।
কিন্তু একেবারেই প্রথম পর্বে কং-এর কাছে পরাজয়ে পেকো প্রথম এক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পায় – সম্ভবত সবার জীবনেরই কোন না কোন এক মুহূর্তে যার সমুক্ষীন হতে হয় – “You are not the center of the Universe.” এতদিন পেকোর কাছে পিংপং ছিলো শুধু সাফল্যগাঁথা। কিন্তু এই প্রথম পেকো মুদ্রার অপর পিঠটাও দেখে। এতদিন যে শুধু বিজয়কেই অবশ্যম্ভাবী বলে ধরে নিয়েছিল, যার সন্তরণ জল ছিল স্থির আর অগভীর – সে অনাকাঙ্খিত এক ব্যর্থতার স্বাদ পায়, সমুদ্রের প্রথম স্পর্শেই খেই হারায়। প্রথম বুঝতে পারে তার আপাত উজ্জ্বল, ঈর্ষনীয়, গুরুত্বপূর্ণ অস্তিত্ব মহাকালের প্রবাহে খুবই ম্রীয়মান, তুচ্ছ, আর গুরুত্বহীন। তার পরিচিত জগৎ তাসের ঘরের মত দুমড়ে পরে। ১১-০ তে হারা এক ম্যাচ, শুধুমাত্র একটি ম্যাচের ব্যর্থতা পেকোর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়, তার জীবন সম্পর্কে ধারণা আমূল বদলে দেয়।

                   vlcsnap-2015-07-14-17h19m14s26
আর এই ব্যর্থতা হল পিংপং দ্য অ্যানিমেশনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং বারবার ফিরে আসা প্রসঙ্গ। ব্যর্থতা, সংগ্রাম, বাস্তবতার সাথে মানিয়ে নেওয়া। কোন অত্যুক্তি  না, কোন লুকাছাপা না। আর এখানেই মনে হয় এই গল্প আর বেশিরভাগ  স্পোর্টস অ্যানিমে থেকে আলাদা। পিংপং দ্য অ্যানিমেশনের গল্প জীবনের সামগ্রিকতা নিয়ে, সকল ক্ষেত্রে সংগতিপূর্ণ। এর কাহিনী প্রত্যেক চরিত্রের কাছে খেলাটার আলাদা আলাদা অর্থ নিয়ে, তাদের জীবনাভিপ্রায়ের বৈপরিত্য নিয়ে। অবশ্যই পিংপং দ্য অ্যানিমেশন, পিংপং খেলা নিয়ে অ্যানিমে। কিন্ত এখানে খেলাটা সবসময়ই নেপথ্য বিষয়, কেবলই অন্তর্নিহিত বক্তব্যের বাহক মাত্র। পিংপং দ্য অ্যানিমেশন কখনই তার চরিত্রদের ভুলে যায় না, তাদের খেলার বাইরের জীবনটাকে ভুলে যায় না – তাদের পরিবার, তাদের পারিপার্শ্বিকতা, তাদের বেড়ে ওঠা।
এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ অ্যানিমের দুই পার্শ্বচরিত্র – ক্যাপ্টেন ওতা আর সাকুমা। ওতা, ছোটবেলার থেকেই সে পিংপং খেলার প্রতি প্রবল ভালো লাগা নিয়ে বড় হয়েছে। কিন্তু হাইস্কুলের পিংপং ক্লাবে যোগ দিয়ে পেকো আর স্মাইলের দেখা পাবার পর, বাস্তবতা বুঝতে তার খুব বেশি বেগ পেতে হয় না। তাদের সাথে তার পার্থক্যটা যে আকাচচুম্বী! কং এর কাছে পেকোর হারে যা আরো সুসংহত হয়। বড় মাছেরাই যেখানে হাবুডুবু খায়, ছোট পুকুরের ছোট মাছদের অসম্ভবত স্বপ্ন দেখাটা তো রীতিমত অপরাধের পর্যায়ে পরে। আর একারণেই তার কাছে পিংপং খেলাটা কেবলই উপভোগের জন্য, হাইস্কুলের শেষ সময়টায় কিছু স্মৃতি রেখে যাওয়ার জন্য। সে আর নামকরা পিংপং খেলোয়াড় হওয়ার স্বপ্ন দেখে না, পারিবারিক ব্যবসার হাল ধরাই জীবনের একমাত্র নিয়তি হিসেবে মেনে নেয়।

                 vlcsnap-2015-07-14-17h10m18s213
সাকুমার জন্য অবশ্য ব্যাপারটা এতটা সহজ না। সাকুমা, খেলার প্রতি যার আবেগ আর কারো চেয়ে কম না; যে বড় হয়েছে পেকো আর স্মাইলের মত প্রতিভাদের সাথে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বীতায়; যে দুর্দম, দৃঢ়কল্প। কিন্তু পরিশ্রম, অধ্যবসায় আর আবেগ কতটা দূর পর্যন্ত নিয়ে যাবে যদি প্রতিভাটাই না থাকে? যদি পরাস্ত হতে হয় অপরিবর্তনীয় কোন নিয়তির কাছে? ওতা যেটা আগে থেকেই জানতো, আকুমার তা উপলব্ধি করতে লাগে ছয় পর্ব; যখন তাৎপর্যবহুল, ষ্মরনীয় এক ম্যাচে সে স্মাইলের কাছে বিপুল ব্যবধানে পরাজিত হয় – অতঃপর তার পিংপং ক্লাব থেকে বহিষ্কৃত হয়। সাকুমা আগে অনেকবারই ব্যর্থতার মুখোমুখি হয়েছে, কিন্তু কখনোই এভাবে না। পারতপক্ষে তার ছোটবেলা কেটেছে পেকোর কাছে বারবার হার মেনে নেওয়ার পরিচিত অনুভূতি নিয়ে। পেকো ছিল অস্পৃশ্য। যাকে হারানোই ছিল তার কাছে অভিষ্ট লক্ষ্য, পরম সাফল্যের প্রতিরূপ। সাকুমা, যে এতদিন শুধু পেকোকেই সাফল্যের দুর্দমীয় চূড়া হিসেবে ভেবে এসেছে, এবং তা অবশেষে জয় করেছে, কিন্তু তাতে এতোটাই বিভোর ছিলো যে বাকি কোন কিছুর প্রতি কোন ভ্রুক্ষেপ করেনি, বুঝতে পারে স্মাইল তাদের দুজনকে বেশ আগেই অতিক্রম করে গেছে, এবং বেশ ভালোভাবেই। বাস্তবতা আকুমাকে অবশেষে অপ্রীতিকর সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। সে বুঝতে পারে নিজের অনেক পছন্দের এই খেলায় সে কখনোই সাফল্য পাবেনা, অনেক আরাধ্য এক স্বপ্ন তার কখনোই বাস্তবায়িত হবে না।

               vlcsnap-2015-07-14-17h12m00s28
কিন্তু তবুও সাকুমার গল্পটাই এই অ্যানিমের সবচেয়ে করুণ হতাশার গল্প নয়। কং ওয়েঙ্গার গল্পটা স্বর্গ থেকে মর্ত্যে পতনের। তার জন্ম পিংপং-এর দেশে। খেলোয়াড় জীবন কতটা কঠিন আর নিষ্ঠুর হতে পারে, তা নিয়ে কং এর কখনোই কোন বিভ্রম ছিলো না।  প্রতিভা কোন অভাব তার ছিলো না, দৃঢ়তারও – বরং তার একমাত্র শত্রু ছিলো ভালো করার চাপ, ব্যর্থ হবার আতঙ্ক। শুধুমাত্র একটি হারের কারণেই তাকে কিনা আসতে হল জাপানের মত ছোট এক দ্বীপরাষ্ট্রে, প্রতিভার প্রমাণ দেওয়ার জন্য! পিংপং হয়ে উঠলো তার বাড়ি ফেরার টিকেট।  কিন্তু সেই সাধারন জাপানী-দের কাছেই যখন তাকে হার মানতে হল – প্রথমে স্মাইলের সাথে না হেরেও হেরে, আর তারপর ষোলকলাপূর্ণ করতে কাজামার কাছে নাস্তানাবুদ হয়ে – তখন তার সামনে নতুন এক বাস্তবতার আগমন ঘটল। কিন্তু সেটা ছিলো তার শিক্ষার অর্ধেক মাত্র।

                  vlcsnap-2015-07-14-17h12m58s91

অনবদ্য ঘটনাপ্রবাহে, প্রচারকালের মাত্র ১৩০ মিনিটের মাথায়, এক নাকউচুঁ অভিজাত থেকে সে পরিণত হল সবচেয়ে ভালো লাগার চরিত্রে। কং নতুন উদ্দ্যমে শুরু করে, নতুন আদর্শ আর দর্শনে দীক্ষিত হয়ে। কিন্তু পরপর দ্বিতীয়বারও কং-কে পরাজয়ের গ্লানি বইতে হয় – এবার পেকোর কাছে। প্রতিযোগীতা নিষ্ঠুর – অনেক সময় কেবল ভালো আর খারাপের পার্থক্যকারী না, ভালো আর অধিকতর ভালোর নিরূপণেরও মঞ্চ।

                 vlcsnap-2015-07-14-17h13m48s118
কাজামা যতই “হিরো”-তে অবিশ্বাসী হোক, তার একজন ত্রানকর্তার প্রয়োজন ছিলো আর যে কারোর চেয়ে বেশি। সে বড় হয়েছে পিংপং-কেন্দ্রিক এক পরিবারে। পারিবারিক চাপ তাকে বাধ্য করেছে পিংপং খেলতে, সে খেলায় ভালো হতে। কারণ তাতে মিশে আছে পরিবারের সম্মান, তাদের কম্পানীর বানিজ্যিক ভবিষ্যৎ। নিজস্ব  ইচ্ছা যেখানে পারিবারিক দাবির কাছে বন্দী। পিংপং কং-এর কাছে আর বাকিদের মত ভালোবাসার কোন স্থান না, স্বপ্নপুরনের মঞ্চ না, বরং বেঁচে থাকা, পরিবারকে টিকিয়ে রাখার জন্য আবশ্যকীয় বিষয়। চিরচেনা গল্প?

স্মাইলেরও বড় হওয়া ভাঙন ধরা পরিবারে, কিন্তু তার অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীত।  তার জীবনে এমনিতেই হতাশার অনেক কারণই উপস্থিত, সেখানে নতুন করে পিংপং যোগ করার কোন ইচ্ছা তার কখনোই ছিলো না। প্রতিভা যতটাই থাকুক। পিংপং তার কাছে আর সবার মত প্রতিযোগীতা না, বরং মুখে “হাসি” ফুটানোর নিয়ামক। এবং ততোটুকুই। পিংপং-ই তাকে মানুষের সান্নিধ্যে এনেছে, তাকে যান্ত্রিকতা থেকে মুক্তি দিয়েছে, তাকে শিখিয়েছে লোহার মত স্বাদ হলেও তার ধমনী-শিরা দিয়ে বয়ে যাওয়া তরলপ্রবাহ, রক্তই, আর সবার মত লাল। স্মাইলের নতুন কোন হিরো-র প্রয়োজন ছিলো না, তার যে ইতিমধ্যেই একজন আছে। পুরো অ্যানিমে জুড়ে তার খোলসের মধ্যে চলে যাওয়া, সেই নায়কে পুনরাবির্ভাবের জন্য সংকেত হিসেবে পাঠানো – ব্যাটসিগনাল। কারণ সেই নায়কই  তখন বিধ্বস্ত, পথহারা।

                 vlcsnap-2015-07-14-18h00m01s170

সাকুমা পিংপং খেলা ছেড়ে দেয় কিন্তু যাওয়ার আগে সে তার আগে সে তার আগে “মুক্ত” করে দিয়ে যায় পেকোকে। পেকোর সহজাত প্রতিভা, তার নিজের যেটা কখনোই ছিলো না, ধ্বংস না করার পরামর্শ দেয়। আর পেকো, সে যখন তার অধপতনের চূড়ান্তে পৌছেছে, তখনই তার অতীত দিনে কথা মনে পড়ায়, খেলার প্রতি তার অগাধ ভালোবাসার কথা মনে পড়ায়, নতুন শুরুর মন্ত্রণা পায়। মাঝে মাঝে নায়কদেরও রক্ষাকর্তা দরকার হয়!

বারবার ব্যর্থতার কথা বললেও পিংপং দ্য অ্যানিমেশন শুধু নিরাশার গল্প না। বরং সম্পুর্ণ বিপরীত। বাস্তব ঘেঁষা, পতনের অনিবার্যতার কথা বলা; কিন্তু তা মেনে নিয়ে উত্তরনের, হার না মানার, এর সবটুকু উপভোগ করার বার্তাবাহী। পেকো ফিরে আসে, ভষ্ম থেকে, দুর্নিবার অগ্নিস্ফুলিঙ্গ নিয়ে; সে নিজে কং-কে মুক্তি দেয়, কাজামাকে মুক্তি দেয়। উড়তে শেখায়। কং জাপানকে আপন করে নেয়, কাজামা  নিজেকে ছাড়িয়ে নেয় প্রত্যাশা আর পারিবারিক চাপের দাসত্ব শিকল থেকে। সেই সাথে পিংপং দ্য অ্যানিমেশনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন বার্তাটা দিয়ে যায়।

জীবন কোন অঙ্কের সমীকরণ না, যে নির্দিষ্ট পদক্ষেপ অনুসারে চললে আকাংক্ষিত ফলাফল পাওয়া যাবে। জীবন আরো বেশি কিছু, আরো জটিল কিছু। হয়তো তা পিংপং খেলার মতই। জীবনে “জয়ী” হওয়া কখনোই সম্ভব না। এখানে সাফল্য কখনোই চিরস্থায়ী না। এখানে ব্যর্থতাও কখনোই চিরস্থায়ী না। কারণ জীবনের মহাত্ব্য কখনোই না পরাতে নয়, তা অবশ্যম্ভাবী, বরং পুনরোড্ডয়নের দৃঢ়কল্পতায়; তা থেকে শিক্ষালাভটাই আসল। জীবন সবকিছু নিয়েই, চিরবহমান, ধুসর।

                    

                 vlcsnap-2015-07-14-17h21m52s80        


vlcsnap-2015-07-14-17h21m19s1

আসলেই বাস্তব জীবনে নেই কোন কোন সুপারম্যান, ব্যাটম্যান; নেই কোন সুপার সেন্তাই, কামেন রাইডার। নেই কোন অতিপ্রাকৃত ক্ষমতাসম্পন্ন, অজেয় অতিমানব – যে বিপদের সময় রক্ষা করবে অবিশ্বাস্য দক্ষতায়; যার নাম ঘুরবে মানুষের মুখে মুখে, আর ত্রাস ছড়াবে দুর্বৃত্তদের হৃদয়ে। কিন্তু একজন “হিরো”, ত্রানকর্তা, অনুপ্রেরণার উৎস হওয়ার জন্য সেগুলোই একমাত্র গুণ? বাস্তব জীবনের নায়কেরা সম্ভবত কমিক বই আর চলচ্চিত্রের মত সার্বজনীন না; অনেকটা ব্যক্তিগত। হয়তো একজন বন্ধু, একজন শিক্ষক, হয়তো বাবা-মা বা কোন এক সহচর। বাস্তব জীবনের নায়করা আর যে কারোর মতই সাধারন, মানবিক আর অনেকাংশে ত্রুটিপূর্ণ।

                   vlcsnap-2015-07-14-17h19m03s163

মাত্র ১১ পর্বে – ২২০ মিনিটের প্রচারকালে পিংপং দ্য অ্যানিমেশন বলেছে কিছু উদীয়মান পিংপং খেলোয়াড়, অবিস্মরনীয় চরিত্রদের তারুন্য, তাদের বিশ্বাস, তাদের স্বপ্ন, তাদের সংগ্রাম, তাদের বেড়ে ওঠা,  “কামিং-অফ-এজ”-এর গল্প। এক বছর আগে পিংপং দ্য অ্যানিমেশন দেখা আমার কাছে যে অভিজ্ঞতা ছিল, ভালো লাগার জায়গাটা এক থাকলেও, এখন তা সম্পূর্ণ ভিন্ন।  সহজে বোধগম্য, আপাত দৃষ্টিতে সাধারন এক গল্প, কিন্তু অনেক বেশি ঘনিষ্ট, অনেক বেশি পরিচিত। অনেক বেশি অনুপ্রেরণার – এক “হিরো”।

আমি কি এখনো মনে করি পিংপং দ্য অ্যানিমেশন ২০১৪ সালের সবচেয়ে সেরা অ্যানিমে?
পিংপং দ্য অ্যানিমেশন আমার দেখা সবসময়ের সবচেয়ে প্রিয় অ্যানিমেরগুলোর তালিকায় একেবারে উপরের সারিতে থাকবে।