তাতামি গ্যালাক্সিতে কিয়োটো — Fahim Bin Selim

তাতামি গ্যালাক্সি দেখতে গেলে প্রিয় চরিত্র খুঁজতে বেগ পেতে হবে না। ওয়াতাশি আর আকাশি তো প্রত্যাশিতই। ওয়াতাশির দুই বছরের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের টানাপোড়েনে আমরা পরিচিত হই ওযু, আর হিগুচি-সেনসেই, বা তাদের সাথে জুড়ে যাওয়া জৌগাসাকি আর হানুকির সাথে। একেক পর্বে একেক জনের সাথে কাটাই। তাদের সাথে পরিচিত হই দূর বা কাছ থেকে, নিজের চোখে আর মানুষের বর্ণনায়, ভিন্ন দৃষ্টিকোণ নিয়ে। শুধু পর্দায় থাকা কোন ছবি না, সম্পূর্ণ গভীরতা নিয়ে;স্ব স্ব আকাঙ্ক্ষা আর হতাশা থাকা, ভালো আর খারাপের মিশেলে, ত্রিমাত্রিক মানুষ হিসেবে। এমনকি স্বল্প সময়ে পর্দায় থাকলেও সবসময়ই নেকো রামেন বিক্রেতা, জ্যোতিষী বৃদ্ধা কিংবা কোহিনাতার উপস্থিতিও অনুভব করা যায়। তবে এই সবগুলো চরিত্রকে একসাথে জুড়ে আনার ক্ষেত্রে যেটার অবদান, অ্যানিমের মূল উপন্যাসের লেখক তোমিহিকো মোরিমির বাকি কাজেও(যেমন- উচুতেন কাযোকু) যেটার প্রভাব লক্ষণীয়, সেটা কোনো রক্তমাংসের মানুষও না – সব ঘটন আর অঘটনের মঞ্চ, একই সাথে আধুনিক আর পুরাণের জাপান যেখানে একত্রিত হয়, সেই কিয়োটো শহর!

কিয়োটোর একাংশ

ওয়াতাশির সাড়ে চার তাতামির ঘরটার কথাই চিন্তা করা যাক, এর অবস্থান শিমোগামো ইউসুইসৌ বোর্ডিং হাউজে। ওয়াতাশি যেটার তুলনা করে হংকং এর কোওলুন ওয়ালড সিটির সাথে। ১৯৯৩-এ ধ্বংসের আগে কোওলুন ওয়ালড সিটি তো ছিলো এরকম এক ঘিঞ্জি এলাকাই – আলো-বাতাসের প্রবেশ এখানে সীমিত, রঙচটা আর নোটিশ-বিজ্ঞাপনে ঢাকা দেওয়াল, আগোছালো আধোয়া জামাকাপড়ের স্তুপ, এবং তার মাঝে পরজীবী বিড়াল, তেলাপোকা আর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদের বসবাস।

এইযান দেমাচিইয়ানাগি স্টেশন

 

ওয়াতাশির ঘরের জানালার কাঁপন আর ভেসে আসা শব্দে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিয়ে যায় এইযান দেমাচিইয়ানাগি স্টেশনের আগত আর বিদায়ী ট্রেনেরা। কামো নদীর পূর্ব পাড়ের এইযান দেমাচিইয়ানাগি স্টেশনের নাম হয়েছে এপাশে ইয়ানাগি আর পশ্চিমে দেমাচি এলাকার নাম জুড়ে দিয়ে। এই স্টেশনের ভূতলে চলে কেইহান রেলওয়ে; বয়স আর অবস্থানে তার উচ্চাসনে এইযান ইলেকট্রিক রেলওয়ে। ১৯২৫ সালে বসানো এই এইযান ইলেক্ট্রিক রেলওয়ের যাত্রাপথ অবশ্য কেবল কিয়োটোর সাকিও ওয়ার্ডের ভিতরেই বিদ্যমান; দেমাচিইয়ানাগি থেকে উত্তরে গিয়ে তাকারাগাইকেতে দুইভাগে ভাগ হয়ে – পূর্বে ইয়াসে-হেইযানগুচি আর পশ্চিমে কুরামা স্টেশন – সর্বসাকুল্যে ১৪.৫ কিলোমিটার এর মধ্যে। ট্রেনেদের আনাগোনাও তাই খুব নিয়মিত।

শিমোগামো ইউসুইসৌ বোর্ডিং হাউজের আরেক বাসিন্দা আট বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ে পরে থাকা হিগুচি। কখনো বাড়ির পাশের রাস্তায়, কখনো বা দেমাচিইয়ানাগি স্টেশন থেকে ১০ মিনিটের হাঁটা দুরত্বে শিমোগামো মন্দিরের পাশের তাদাসু নো মোরিতে হাজির হয় রহস্যময় নেকো-রামেনের ফেরি; সেখানে সাক্ষাৎ মিলে তার। হিগুচি নিজের পরিচয় দেয় কামো তাকেৎসুনোমি হিসেবে, এই শিমোগামো মন্দিরের দেবতা। তাদাসু নো মোরি, শিমোগামো মন্দির আর কিছুটা উত্তরে তার যুগল কামিগামো মন্দিরের সাথে কিয়োটোর সম্পর্ক তো হাজার বছরের।

শিমোগামো মন্দির

 

সহস্রবর্ষী এক আদিবনের অবশেষ হিসেবে পরে আছে এই তাদাসু নো মোরি। মধ্যযুগ আর মেইজিকালের অনুশাসনের সময় এর আকৃতি কমে এলেও, কিয়োটোর সব যুদ্ধ আর ধ্বংসযজ্ঞের শিকার এবং সাক্ষী হিসেবে মানবহস্তের সাহায্য ছাড়াই বারবার পুনোরুত্থান ঘটেছে তার। এই বনের ভেতরেই ষষ্ঠ শতাব্দীতে শিমোগামো মন্দিরের সূচনা, তারও কিছুকাল পর কামিগামো মন্দিরের। এমনকি কিয়োটোও তো তখনো জাপানের প্রাচীন রাজধানী হয়ে ওঠেনি! শিমোগামো মন্দিরে এসে মানুষ অর্চনা করে দুজনের – তামাইয়োরি-হিমে আর তার পিতা দেবতা তাকেৎসুনোমির। তামাইয়োরি-হিমে আর আগুন-ও-বিদ্যুতের দেবতা হোনোইকাযুচি-নো-মিকোতোর ভালোবাসার ফসল কামো ওয়াকাইকাযুচির জন্য বিদ্যমান কামিগামো মন্দির। তামাইয়োরি-হিমে আর হোনোইকাযুচি-নো-মিকোতোর মিলনের এই পুরাকথার রেশ ধরেই রোজ পাণিপ্রার্থীদের আগমন শিমোগামো মন্দিরে।

তাদাসু নো মোরি
 
ভালোবাসার লাল বন্ধন জোড়া লাগাতে এমনকি অযাচিত সম্পর্কের বিচ্ছেদ ঘটাতে হলেও হাজির হওয়া যায় ইয়াসুই কনপিরাগু মন্দিরে, যার অবস্থান কিছুটা দক্ষিণে হিগাশিইয়ামা ওয়ার্ডের গিওন কর্ণারে। অন্যান্য মন্দিরে যেখানে এমা আকৃতির ফলকে নিজের মনোবাসনা লিখে ঝুলিয়ে দিতে হয়, সেখানে এই মন্দিরে আছে এমা আকৃতির বিশাল আকারের একটি এনমুসুবি(সম্পর্ক জোড়া লাগানো) পাথরই। সাদা কাগজে নিজের বাসনা লিখে এই পাথরের ভেতরে গর্ত দিয়ে একবার ঢুকে আবার বেরোতে হয়, তারপর আরো হাজার হাজার কাগজের পাশে নিজেরটা জুড়ে দিতে হয় পাথরের গায়ে, দেবতার প্রতি আবেদন হিসেবে। এই মন্দিরের মূল উৎসব হয় অক্টোবরে, শুকি কনপিরা তাইসাই(বৃহৎ কনপিরা শরৎ উৎসব)। এর এক উল্লেখযোগ্য অংশ হলো মিকোশি নামক কাঠের তৈরি নৌকা-সদৃশ বহনীয় মন্দির নিয়ে শহরের রাস্তাগুলো প্রদক্ষিণ করা।
 
 
ইয়াসুই কনপিরাগু মন্দির

 

এই কনপিরাগু আর শিমোগামো আর কামিগামোর, সর্বজাপানেরই দেবতাদের তাদের মন্দিরগুলোতে অবশ্য পাওয়া যাবে না দশম চন্দ্রমাসে, যেটাকে বলা হয় কান্নাযুকি(দেবতাশূন্য মাস)। দেবতারা তাদের ভক্ত আর উপাসকদের সকল ইচ্ছা-আকাঙ্খা-কামনা-বাসনা-আর্জি নিয়ে হাজির হয় ইযুমো শহরের ইযুমো-তাইশা মন্দিরে। পরবর্তী বছরের জন্ম-মৃত্যু আর বিয়ের ভাগ্য লিখন নিয়ে দেবতাদের সম্মেলন বসে সেখানে। সে শহরের অবশ্য এই মাসেরই নাম আবার কামিআরিযুকি(দেবতাদের মাস)। সম্পর্ক জুড়তে চাইলে এটাই তো সময়!

কিন্তু বারবার যে ভজকট পাকিয়ে ফেলে ওয়াতাশি! আকাশির সাথে কচ্ছপ-মাজনী খুঁজতে ঘুরে বেড়ায় কাওয়ারামাচিতে। শিমানামি বাইকরেস চলার মাঝে তাদের দেখা হয় কেয়াগে ঢালের পাশের রাস্তায়। আবার কখনো ওযুর ফাঁদে পরে, কখনো বা সত্যি সত্যিই চেরী সাইকেল ক্লিনার কর্পসের নেতা হিসেবে এখানেই ধরা পরে যায় আকাশির হাতে। মজার ব্যাপার হলো কেয়াগে ঢাল ঘুরতে যাওয়ার শ্রেষ্ঠ সময় হলো বসন্তকাল, যখন এই ৫৮২ মিটার দীর্ঘ আর উপর থেকে নিচে ৩৬ মিটার উঁচু ঢাল দিয়ে হেঁটে গেলে দেখা মিলবে সারি বেধে দাঁড়িয়ে থাকা গাছের ডালে ডালে ফুটতে থাকা চেরী ফুলের। ঢালটির উপর দিয়ে চলে গেছে রেললাইন, যাতে করে একসময় নিচে বিওয়া হ্রদের ক্যানেল থেকে উপরে কেয়াগে স্টেশন পর্যন্ত জলযান উঠানো নামানোর হতো। সেই পানিপথ অনেক কাল যাবত বন্ধ দেখেই কিনা বার্ডম্যান সঙ্ঘের উড়োজাহাজ চুরি করে নিয়ে যাওয়ার কাজে চেরী সাইকেল ক্লিনার্স কর্প সেটা ব্যবহার করা শুরু করলো! ঢাল বেয়ে নামতে নামতে উড্ডয়ন হলো ওয়াতাশির…তারপরই তো আবার পানিতে মুখ থুবড়ে পড়া।

কেয়াগে ঢাল
 
দুই বছরের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে একের পর এক ভুল সিদ্ধান্তে দগ্ধ ওয়াতাশিকে তাই বারবার ফিরে আসতে দেখি কিয়ামাচি সরণিতে। এক পাশে তাকাসে আর আরেক পাশে কামো নদীকে আলাদা করে রেখেছে এ সড়কটিই। তবে তার সকল সমস্যার সমাধানটাও বাতলে দেয় জ্যোতিষী বৃদ্ধা।
কিয়ামাচি সড়ক

 

কামো ওওহাশি ব্রিজ ও কামোগাওয়া ডেল্টা
 
চোখের সামনে দুলতে থাকা সুযোগটা হাত বাড়িয়ে নিতে হবে। তারপর পদক্ষেপ নিয়ে নদীকে পাশে রেখে সামনে এগিয়ে গেলেই তো হয়। সেখানেই তো – এই যে দেমাচিইয়ানাগির পাশেই কামোগাওয়া ডেল্টা; সাকিও ওয়ার্ড আর কামিগিয়ো ওয়ার্ডের মেলবন্ধন করতে এখানেই কোন এমার মত ঝুলে আছে কামো ওওহাশি ব্রিজ। হিগুচির গান কিংবা জীবন সম্পর্কিত গভীর বয়ান শুনতে হলে এখানেই ফিরে আসতে হবে চক্র পূরণ করে। গোজান উৎসবের রাতে পাঁচ-পাহাড়ে জ্বলা অগ্নি প্রতীক দেখতে শহরের মানুষজনও হামলে পড়বে এখানেই। আর নিচ দিয়ে কামো নদী বইতে বইতে তাদাসু নো মোরিকে সাক্ষী হিসেবে রেখে মিলিত হবে তাকাসে নদীর সাথে, তাকেৎসুনোমির আশীর্বাদেই কি?
হাতে মোচিগুমান নিয়ে আকাশির সাথে সাক্ষাতের জন্যও তো তাই আসা চাই এখানেই।
 

Comments

Leave a Reply