অরেঞ্জ
জানরাঃ ড্রামা, সাই-ফাই, স্কুল, শৌজো, রোমান্স
ভলিউমঃ ৫
চ্যাপ্টারঃ ২৭
মাঙ্গাকাঃ তাকানো ইচিগো
মাইআনিমেলিস্ট র্যাঙ্কিং: ২৩
মাইআনিমেলিস্ট রেটিং: ৮.৮২
ব্যক্তিগত রেটিং: ৯/১০
অনুশোচনা-শব্দটি বলা যতটা সহজ অনুভব করা বোধ হয় ততটা সহজ নয়। প্রত্যেক মানুষই জীবনে ভুল করে। ছোট্ট একটা কর্ম বা সিদ্ধান্তই ভবিষ্যতের বড় একটা অংশ নির্ধারন করে ফেলতে পারে। কখনও তা হয় মঙ্গলজনক কখনও বা নিজের অজান্তেই আমরা জীবনটিকে অশুভ কিছুর দিকে ঠেলে দেই। তারপর অসহনীয় অনুশোচনার আগুনে পুড়ি। বারবার মনে হয়; যদি ফিরে যেতে পারতাম অতীতে, শুধরে নিতে পারতাম ভুলগুলো। দুঃখের বিষয় সময় একবার চলে গেলে আর ফিরে আসে না। কিন্তু কেমন হত যদি আপনার অতীতের সত্তাকে আগেভাগে জানিয়ে দিতে পারতেন সামনে কি আসতে যাচ্ছে, কি করা উচিৎ? কিংবা বলা যাক, আপনার ভবিষ্যতের সত্তা আপনাকে হঠাৎই জানিয়ে দিল সামনে কি হবে এবং আপনার কি করা উচিৎ?
তাকামিয়া নাহোর জীবনে ঠিক এমনটিই ঘটে। হঠাৎ একদিন নাহো তার ১০ বছর পরের ভবিষ্যতের নাহোর কাছ থেকে একটি চিঠি পায়। স্বাভাবিকভাবেই সে ধরে নেয় কেউ তার সাথে ঠাট্টা করছে। কিন্তু নাহো অবাক হয়ে লক্ষ্য করে চিঠির কথাগুলো অক্ষরে অক্ষরে ফলছে। চিঠির কথা মতই তার ক্লাসে আসে একজন নতুন ছেলে, যার নাম নারুসে কাকেরু। এবং সে নাহোর পাশের সিটে বসে ঠিক যেমনটা চিঠিতে বলেছে। এরপর একের পর এক ঘটনা সাক্ষ্য দিয়ে দেয় যে আর যাইহোক চিঠিটিতে মিথ্যা কিছু বলা নেই। কিন্তু তবু নাহোর মন থেকে সন্দেহ আর দ্বিধা দূর হয় না। ভবিষ্যতের নাহোর অনুরোধ সে শুরুতে রাখতে পারে না। এই চিঠি যেহেতু তার ভাগ্যের কথাই বলে দেয় তাই তার মনে চিঠিটি পড়তে এক প্রকার ভয় তৈরী হয়। কিন্তু কাকেরু যখন স্কুলে আসে না অনেক দিন তখন নাহো ভাবে চিঠিতে হয়ত এর উত্তর পাওয়া যাবে। এরপর চিঠিতে পাওয়া অনুরোধগুলো মেনে চলে নাহো দেখল এতে বরং ভালো ফলাফল পাচ্ছে সে। এভাবে চিঠি পড়তে পড়তেই সে আবিষ্কার করল কেন ভবিষ্যৎ থেকে সে নিজেকে এভাবে লিখেছে। ১০ বছর পরে কাকেরু আর তাদের সাথে থাকবে না। চিরতরে সে চলে যায় পৃথিবী ছেড়ে। কাকেরুকে চিরতরে হারিয়ে ফেলাসহ জীবনের ছোট ছোট কিন্তু মূল্যবান অনেক মুহুর্ত হেলায় হারিয়ে ফেলে নাহো অনুতপ্ত বোধ করে। তাই সে অতীতে নিজের কাছে চিঠি লেখে যাতে অতীতের নাহো ভবিষ্যতের নাহোর মত একই ভুলগুলো না করে। নিজের কাছেই নাহোর একটাই অনুরোধ, জীবনের মূল্যবান সময়গুলোকে আক্ষরিক অর্থেই মূল্য দিয়ে এবং কাকেরুকে রক্ষা করে নিজেকে অনুশোচনামুক্ত করা।
এ পর্যন্ত পড়ে যে কেউই বুঝতে পারবে অরেঞ্জ মাঙ্গাটির কেন এত সুনাম আর ভালো স্কোর। আর তা হল শৌজো মাঙ্গা হিসেবে এর গল্পে রয়েছে নতুনত্ব। আজব ধরণের মেয়ে সুন্দর ছেলের প্রেমে পড়বে কিংবা একটু দুঃখের অতীত, মানসিক আঘাত, বুলিং, বিষণ্ণতা ইত্যাদি হয়তোবা খুব অপরিচিত গল্প নয়। কিন্তু প্রধান চরিত্র ভাগ্য পরিবর্তনের চেষ্টা করছে আগেভাগে সামনে কি হবে জেনে এরকম গল্প অহরহ দেখা যায় না। আর দেখে গেলেও এ ধরণের গল্পগুলো হয় খুব আকর্ষণীয়। অরেঞ্জও তার বাইরে নয়। এই মাঙ্গার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হল এর কাহিনীটি। একদম শুরু থেকেই আপনি গল্পে বুঁদ হয়ে যাবেন। আর সামনে কি হতে যাচ্ছে এই প্রশ্নটা আপনাকে একের পর এক চ্যাপ্টার টানা পড়ে যেতে বাধ্য করবে। বিশেষ করে শেষের দিকের চ্যাপ্টারগুলো একটু বেশিই উত্তেজনাপূর্ণ। তাই শৌজো হলে কি হবে, অরেঞ্জকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে না পড়লে আপনি নিজেই পস্তাবেন। এই মাঙ্গাটি অনেক বেশি রোমাঞ্চকর।
তবে গল্পের কথাই যদি বলা হয় তো আমি কিছু কথা তুলতে চাই। মানুষকে শৌজো মাঙ্গা নিয়ে ‘শৌজো মাঙ্গায় কোন নতুনত্ব নেই’, ‘শৌজো মাঙ্গায় নাটকীয়তা বেশি’, ‘শৌজো মাঙ্গা একঘেয়ে”, শৌজো এই শৌজো সেই ইত্যাদি সমালোচনা করতে দেখা যায় খুব। শুধু অরেঞ্জের বেলায় সবার মুখে মুখে প্রশংসা শোনা যায়। ব্যাপারটা দেখে বরং আমার হাসিই পায়। কেন জানেন? কারণ অরেঞ্জ মোটেও নতুন কিছু না!! ভাবছেন কিভাবে এটা সম্ভব যখন একটু আগেও বললাম এটার গল্পে নতুনত্ব আছে? ব্যাখাটা এই যে এটার নতুনত্ব শুধু ভাগ্য পরিবর্তনের চেষ্টা করা এই অংশটুকু। বাদ বাকি নতুন কিছুই না। আপনি যদি যথেষ্ট পরিমাণ শৌজো মাঙ্গা পড়ে থাকেন তবেই এই কথাটার মর্ম বুঝবেন। কাকেরুর যে কাহিনী রয়েছে তা ইতিমধ্যেই আমার আও হারু রাইড, বকুরা গা ইতা, ওওকামি শৌজো তো কুরো ঔজি ইত্যাদি মাঙ্গায় পড়া শেষ। কাকেরুর পরিস্থিতি কৌ, ইয়ানো বা কিওয়ার থেকে একটুও আলাদা নয়। সে জনপ্রিয় শৌজো মাঙ্গার নায়কদের মতই ছকে বাঁধা। অন্য মাঙ্গায় এই অবস্থাটা মানিয়েছিল কিন্তু কাকেরুর গল্প যতটা রাশভারী ধরণের তাতে তার পেছনের গল্পটায় আরও গভীরতা থাকলে ভালো হত। তাই আপনি যদি হন শৌজো মাঙ্গার ভক্ত তবে একটু আশাহত হলেও হতে পারেন।
এই মাঙ্গার দ্বিতীয় বড় সমস্যাও এর গল্পে। পুরো কাহিনী শুরু হয় যেদিন নাহো প্রথম চিঠিটা পায়। ভবিষ্যতের নাহোর যদি এতটাই অনুশোচনা থাকে তবে কেন সে প্রথম দিনেই সবকিছু খোলাসা করে ঠিক মত যুক্তি দিয়ে বা জোর দিয়ে কাকুতিমিনতি করে অতীতের নাহোকে বোঝালো না যাতে সে তার কথা অনুযায়ী কাজ করে? শুরুতেই সব ঠিক করে দিলে হয়ত মাঙ্গার গল্পটাই আর থাকত না যেটা সত্য। কিন্তু তারপরেও ব্যাপারটা যুক্তিযুক্ত হত। তখন পুরোপুরি আলাদাভাবে অতীতের ঘটনাগুলো ঘটত যেটা মাঙ্গাটিকে আরও বেশি অনিশ্চিত আর রোমাঞ্চকর করে তুলত। এবং এই মাঙ্গার তৃতীয় ও সবচেয়ে বড় ত্রুটিও এর গল্পে!! চিঠিটা ভবিষ্যৎ থেকে অতীতে আসল কিভাবে? অরেঞ্জ পড়ার আগেই আমার সন্দেহ ছিল একটি শৌজো মাঙ্গায় আদৌ এটার ভালো ব্যাখা থাকবে না। অত্যন্ত দুঃখের সাথেই জানাচ্ছি যে আমার সন্দেহ শতভাগ সত্যি হয়েছে! এটার সাই-ফাই ব্যাখাটি ছিল নিতান্তই হাস্যকর। আর সাই-ফাইই যদি বানাবে তবে মাঙ্গাকা মাঙ্গাটি সম্পূর্ণরূপে সাই-ফাই করলেই পারত। কিংবা বিষয়টা ফ্যান্টাসি বা সুপারন্যাচারাল বানালেও হত। কিন্তু কাহিনী বানাতে হবে বলে গাঁজাখুরি যাচ্ছেতাই ঢুকানো আমার মোটেও পছন্দ নয়। গোঁড়ায় গলদ না থাকলে মাঙ্গাটি প্রায় ত্রুটিহীন হত।
চরিত্রায়নের দিক থেকে কাকেরু সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে যেহেতু পুরো গল্পটি তাকে ঘিরেই। তবে সেই গুরুত্ব এতই বেশি যে যত যাইহোক অন্যান্য চরিত্রদের অনেকটা উপেক্ষা করেই পুরো মনোযোগ তার উপরে দেওয়া হয়েছে। মাঝে মাঝে এতে একটু খারাপ লাগলেও কাকেরুকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টার কারণে বুঝাই যায় কেন বাকি চরিত্রগুলো গুরুত্ব পায়নি। চিনো, মুরাসাকা, হাগিতা প্রধান ফ্রেন্ড সার্কেলের অংশ হলেও এরা পার্শ্ব চরিত্র হিসেবেই ভূমিকা পালন করে। কিন্তু এদের বন্ধুত্বটা সত্যিই খুব সুন্দর। ওদের দেখলে ক্ষণে ক্ষণেই আপনার মনে হবে ‘এত বেশি ভালো বন্ধু যদি আমার জীবনেও থাকত!’। তবে নাহোকে আমার নায়িকা হিসেবে অযোগ্য লেগেছে বেশ। নিজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষটির জীবন যখন মৃত্যুর মুখে তখন এই মেয়ে কিভাবে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগে আর প্রায়ই কোন পদক্ষেপ না নিয়ে চুপচাপ থাকে তা আমি ভেবে পাই না।
এখন বলব এই মাঙ্গার সেই জিনিসটার কথা যেটা না বললেই নয়। কি সেটা? সুওয়া হিরোতো! সুওয়া হল এখানে তৃতীয় প্রধান চরিত্র এবং দ্বিতীয় নায়ক। তবে সেটা তার আসল পরিচয় না। তার আসল পরিচয় হল সে এই মাঙ্গার সেরা চরিত্র এবং খুব সম্ভবত শৌজো মাঙ্গার ইতিহাসেও সেরা একজন চরিত্র। আপনি হয়ত উসুই(মেইড-সামা), কেই(স্পেশাল এ), কুরোসাকি(ডেনগেকি ডেইযি) ইত্যাদি অবাস্তবতার কাছাকাছি সুদর্শন সব তথাকথিত “মিস্টার পার্ফেক্ট” ছেলে দেখেছেন। কিন্তু যা দেখেননি তা হল সুওয়ার মত ছেলে। সে সুদর্শন কোন নিখুঁত ছেলে না। কিন্তু তার মন এবং হৃদয়টা অনেক বড়। কথাটা শুনে এখন আহামরি কিছু নাও মনে হতে পারে কিন্তু মাঙ্গাটা পড়ার সময় বুঝতে পারবেন ব্যাপারটা আসলে কত বড়। সুওয়ার জন্য মেয়েরা হয়তবা সেই পরিমাণ পাগলামি করে না কিন্তু মন থেকে তার জন্য শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা চলে আসবে ঠিকই। আমি নিজে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যার জীবনে সুওয়ার মত মানুষ আছে তার কপালটা অনেক ভালো। সুওয়া এতটাই অসাধারণ! কাকেরুর জন্য নয় বরং সুওয়ার জন্যেই অরেঞ্জ পড়া উচিৎ।
অনেক কিছুই তো জানলেন অরেঞ্জ নিয়ে। এবার কি ভাবছেন এটা পড়বেন কি পড়বেন না? আপনি শৌজো ভক্ত হোন বা না হোন অরেঞ্জ অবশ্যই পড়বেন। কম হলেও খুঁত তো সবকিছুরই থাকে। অরেঞ্জের খুঁত এড়িয়ে যেতে পারলে মাঙ্গাটি অনেক উপভোগ করবেন। টাইম প্যারাডক্স, সুন্দর আর্ট, দারুণ বন্ধুত্ব, সুওয়ার মত চরিত্র, অল্প কিছু চ্যাপ্টার- আর কি লাগে?! সামনেই সামার ২০১৬ সিজনে আসছে এর আনিমে। আনিমে যে সাধারণত মাঙ্গার ধারের কাছেও যেতে পারে না তা তো এখন জানা কথা। তাই তাড়াতাড়ি পড়ে ফেলুন মাঙ্গাটি। আর ২৭ চ্যাপ্টার হলেও ২২ চ্যাপ্টারেই মূল গল্প শেষ। বাকি ৫টি চ্যাপ্টার এখনো স্ক্যানলেশনের অপেক্ষায়। তবে শেষটা কেমন হবে তা জিজ্ঞেস করবেন না। ওটার জন্যেই না এত প্রতীক্ষা! অরেঞ্জ পড়ে চোখের কোণে অশ্রু আসতেও পারে নাও আসতে পারে। কিন্তু অন্যরকম বিষাদময় ভালোলাগার এক তৃপ্তি অনুভব করবেন। কেননা “অরেঞ্জ” নামেই তো লুকিয়ে আছে এর ভাবার্থ। কমলা-শত হতাশার মাঝেও হার না মেনে ঝুঁকি নিয়ে হলেও আশাবাদী হয়ে, আস্থার সাথে, উদ্দ্যমতা নিয়ে জীবনে এগিয়ে চলার প্রতীকী রঙ!



























