The Big O [রিভিউ] — Nudrat Mehraj Sadab

The Big O 1

মনে করুন আপনি কোন এক ডিস্টোপিয়ান পৃথিবীতে বাস করছেন। রোজকার অভ্যেস মত ঘুম থেকে উঠে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন বিশাল জানালার সামনে আর পেছনে জ্যাজের হালকা সুর ভেসে আসছে। সুউচ্চ দালান থেকে পিপীলিকার মত ছোট ছোট গাড়ি আর এ্যান্ড্রয়েডের ছোটাছুটি দেখে হয়ত নস্টালজিক হয়ে যাবেন স্মৃতিকাতরতায় যে স্মৃতির অস্তিত্ব নিয়ে নিজেই সন্দিহান। এমন এক পৃথিবীতেই রচিত হয়েছে Big O’র প্লট।
ফিল্ম নয়ের, সাইফাই, মেকা ও সাইকোলজিক্যাল জন্রার অদ্ভুত সুন্দর মিশেলে ২৬ টি এপিসোডের এনিমেটি আপনাকে একাধারে ব্যাটম্যানের স্বভাবসুলভ এলেগ্যান্স, কাউবয় বিবপের হালকা চালের ভারী দর্শন বা নিওন জেনেসিসে শিঞ্জির প্রলাপের কথা মনে করিয়ে দিবে।

Paradigm City, a city of amnesia. চল্লিশ বছর আগে কোন এক ঘটনায় সবার স্মৃতি হারিয়ে যায়। মুছে যায় শহরের ও সব স্মৃতি। তবে কিছু ফ্র‍্যাগমেন্ট আজও মানুষের মনে রয়ে গেছে। তাছাড়া স্মৃতি হারানোর পরও মানুষ দিব্যি জীবন চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিনকার স্বভাবমতো কাজে যাচ্ছে, কিন্তু কেন ও কীভাবে তারা আজ এখানে সেটি পুরোই অজানা। শহরের প্রতিটি লোকালয় একেকটি ডোমে আবদ্ধ। ডোমের ভেতর নানা ধরণের মানুষের বাস।
এই শহরের জনপ্রিয় নেগোশিয়েটর রজার স্মিথ। কিডন্যাপিং থেকে শুরু করে বিজনেস বা পলিটিকাল ডিল সব ক্ষেত্রেই রজার স্মিথ এক জনপ্রিয় নাম। ব্যাটম্যানের মত মাল্টিবিলিয়নিয়ার হয়ত না, তবে পারিশ্রমিক হিসেবে যে চেক পায় তাতে শূন্যের অংক নেহাত কম নয়। আছে স্মিথ ম্যানশন আর নরমান নামের বাটলার। আরও আছে বিশালাকায় মেগাডিউস এবং প্রতিদিনের সঙ্গী গ্রিফিন। মেগাডিউসকে এক ধরণের উইপন বলা যায়। সোজা ভাষায় নিওন জেনেসিসের এভা। প্রথম দুটো এপিসোডের পর তাদের সাথে যোগ দেয় ডরোথি নামের এক এন্ড্রয়েড। প্রথম সিজন এপিসোডিক। রজার বিভিন্ন কেস হাতে নেয়। বেশিরভাগ সময় নেগোশিয়েশন শেষ হয় মেগাডিউসদের মধ্যকার যুদ্ধে। তবে দ্বিতীয় সিজনে কাহানী অন্যদিকে মোড় নেয়। মেকার চেয়ে বরং ফিলোসফিকাল এনিমেতে রূপ নেয় আর তার সাথে আছে ধর্মীয় রেফারেন্স।
এনিমের প্রতিটা রিকারিং চরিত্রই গুরুত্বপূর্ণ।
প্যারাডাইম সিটির মিলিটারি পুলিশের চিফ ডাস্টিন। পুলিশের বিভিন্ন কেসে রজার তাকে সাহায্য করে। রজার নিজেও একসময় মিলিটারিতে ছিল। তাই তাদের মধ্যে ভাল সম্পর্ক বিরাজ করে।
প্যারাডাইম সিটির কর্ণধার এ্যালেক্স রোজওয়াটার। ক্ষমতার লোভে মানুষ যে কী করতে পারে তার উদাহরণ এ্যালেক্স। নিজেকে ‘গড’ প্রমাণের জন্য নিজের শহর ধ্বংস করতেও দ্বিধা হয়না তার।
গর্ডন রোজওয়াটার হলেন এ্যালেক্সের বাবা। তার বিশাল ক্ষেত আছে টমেটোর। তবে তার মানসিক ভারসাম্য দ্রুতই লোপ পেতে থাকে। এই প্যারাডাইম সিটি তার হাতে গড়া। অন্তত লোকে যা বলে আর কি। অনেক বছর আগে কিছু বাচ্চাদের উপর একটা এক্সপেরিমেন্ট চালানো হয়েছিল। রজার, এ্যালেক্স ও এঞ্জেল ঐ এক্সপেরিমেন্টেরই ফসল। কিন্তু তাদের মন থেকে এই স্মৃতি একদম মুছে ফেলা হয়েছে। এনিমে জুড়ে টমেটো উৎপাদন নিয়ে নানান কথা আছে। খুব ভাল করে খেয়াল করলে বোঝা যায় এগুলো আসলে মেটাফোর ঐ ভয়ংকর স্মৃতির। মূলত চল্লিশ বছর আগে গর্ডন রোজওয়াটার ই মানুষের স্মৃতিগুলো মুছে ফেলে। তার ভাষ্যমতে স্বপ্নে পাওয়া আদেশক্রমে এই কাজটি করেছেন। কিন্তু কার আদেশ?
এঞ্জেল একজন স্পাই। তার উদ্দেশ্য হল ৪০ বছর আগের স্মৃতি সংগ্রহ করা। বিভিন্ন সময় রজারের বিভিন্ন কেসের সাথে সে কেমন করে যেন জড়িয়ে যায়। এনিমে জুড়ে রজার আর এঞ্জেলের কেমিস্ট্রি উপভোগ করার মত।

The Big O 2
এনিমের আরেক চরিত্র বেক একজন রিকারিং ক্রিমিনাল। রজারের সাথে সে প্রায়ই ঝামেলা করতে আসে। আর আছে ম্যানিয়াক এলান গ্যাব্রিয়েল। অর্ধেক মানুষ, অর্ধেক এন্ড্রয়েড।
তবে এনিমের অন্যতম এক চরিত্র মাইকেল সিবাক/শোয়ার্জওয়াল্ড। একজন জার্নালিস্ট যে সারাজীবন সত্যের খোঁজ করে গেছে। সে নামমাত্র কয়েকটি এপিসোডে ছিল। কিন্তু তার ইমপ্যাক্ট ছিল ভয়াবহ! বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে তার ন্যারেটিভ এনিমেতে এক নতুন মাত্রা দেয়। মানুষ, ধর্ম আর প্যারাডাইম সিটির প্রকৃত রূপ সে সবাইকে জানিয়ে গেছে। কিন্তু বিশ্বাস করেনি কেউই। শেষ এপিসোড দেখার পরেই আসলে বুঝতে পারি তার স্পিচ ও ন্যারেটিভ কতটা মূল্যবান ছিল। আর সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং ব্যাপার ছিল তার লিফলেট বিতরণ। উইলিয়াম ব্লেকের এর Illustrations of the Book of Job এ Behemoth ও Leviathan কে নিয়ে যে আর্টওয়ার্ক ছিল, তার ছবিই থাকে ঐ লিফলেটে।
এতো গেল চরিত্রের ছোটখাটো পরিচয়। এবার আসি কাহিনীতে। আগেই বলেছি এটি এপিসোডিক এনিমে। কিন্তু চল্লিশ বছর আগের ঐ ঘটনা নিয়ে একটু একটু রহস্য জমতে থাকে সিজন ১ এ। দ্বিতীয় সিজন ফোকাস করে রজারের উপর। “A megadeus chooses its dominus.” রজারের সাথে তার মেগাডিউস Big 0’র সম্পর্ক নিয়ে অনেক কিছু জানতে পারি। তাদের পরস্পর বোঝাপড়া অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি এলিমেন্ট। এই মেগাডিউসদের সাথে ডরোথির সম্পর্ক পরে বুঝতে পারি। এঞ্জেলের প্রকৃত পরিচয় জানা যায় শেষের আগের এপিসোডে। শেষ এপিসোডে এসে কাহিনী অন্য উচ্চতায় চলে যায়। এঞ্জেল আর রজারের আবেগঘন নেগোশিয়েশনের পরিসমাপ্তি কোথায়, তা নিয়েই সব ধরণের বিতর্ক। শেষের আগের দৃশ্যে রজারের কিছু মেমোরি ফ্র‍্যাগমেন্টস দেখি যা আমার নিজের জন্যও চপেটাঘাত। আর শেষ দৃশ্যে নতুন আরেক রিয়েলিটির সৃষ্টি হয় যেখানে রজার স্মিথ পুনরায় একজন নেগোশিয়েটরের রোল প্লে করে। অনেকের মতে পুরো এনিমেটি হল শেষ দৃশ্যের লুপে চলতে থাকা এক কোনানড্রাম। আর সবচেতে মজার ব্যাপার হল শেষের আগের এপিসোডে গর্ডন রোজওয়াটার একটা ছবি দেখায় রজারকে। রজারের সাথে তার চল্লিশ বছর আগের ছবি। কিন্তু রজারের তখন জন্মই হয়নি। চল্লিশ বছর আগে রজার গর্ডনকে প্রমিজ করে প্যারাডাইম সিটির ডিরেক্টরের সাথে নেগোশিয়েট করার, যাতে একটা সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ পৃথিবীবাসীকে উপহার দিতে পারে। প্রশ্ন হল প্যারাডাইম সিটির ডিরেক্টর কে? গর্ডন রোজওয়াটার একটি বই লিখে যেখানে তার স্মৃতি লিপিবদ্ধ করে। আর এই বই সে পায় অন্য আরেকজনের কাছ থেকে। অর্থাৎ বইটির প্রকৃত লেখক সে নয়। এই বই অনেকের হাত ঘুরে এসেছে । প্রশ্ন হল গর্ডন যদি তার লেগ্যাসি অন্য কাউকে হস্তান্তর করে, তবে ঐ লেগ্যাসি সর্বপ্রথম কার ছিল? আরও কিছু বলে ফেলি, চল্লিশ বছর পর পর মেমোরি রিসেট করা হয়। অর্থাৎ এনিমের টাইমলাইনের চল্লিশ বছর আগে মেমোরি মুছে ফেলা হয়। যার কারণে মানুষের কোন আইডিয়াই থাকেনা নিজের অস্তিত্বের ব্যাপারে। আর প্রতিবার রিসেটে মানুষদের চরিত্র এবং রোল ভিন্ন হতেও পারে, নাও পারে। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত কার?
এনিমের শেষ দুটো এপিসোড নিয়ে অনেক কন্ট্রোভার্সি আছে। অনেকখানি রাশড অবশ্যই। কিন্তু আমার একটুও খারাপ লাগে নি। অনেক ধরণের থিওরি আছে এন্ডিং নিয়ে। তবে ভাল লেগেছে এই ওপেন এন্ডেড এন্ডিং। দর্শক তার ইচ্ছেমত কল্পনা করবে। সিমুলেটেড রিয়েলিটি না
চোখে দেখা সত্য, বাছাই করার দায়িত্ব দর্শকদের উপরেই ছেড়ে দেয়া হয়।
বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডে এই পৃথিবী একটি মঞ্চ আর আমরা কিছু ক্ষুদ্র অভিনেতা যারা প্রতিদিনই বিভিন্ন চরিত্রে, বিভিন্ন রূপে হাজির হচ্ছি, প্রশ্ন হল কোন সময়ে, কোন কালে? সত্যি বলতে এটিই পুরো এনিমের সারাংশ।
**কেন দেখবেন না?
– অনেকের কাছে এটাকে ব্যাটম্যানের কপি মনে হতে পারে, যদিও আকাশপাতাল তফাৎ। আর্ট নিয়েও অনেকের কমপ্লেইন থাকতে পারে। কিন্তু নয়ের এনিমেতে এই আর্ট খুব ভালই মানিয়ে গেছে। তাছাড়া একই স্টুডিও এর আগেই ওয়ার্নার ব্রসের ব্যাটম্যান এনিমেটেড সিরিজে কাজ করেছিল। খুব স্বাভাবিক আর্টে তার ইনফ্লুয়েন্স থাকবে। তবে কারও কাছে ক্লিশে মনে হলে না দেখাই ভাল। আর যেহেতু এটি মেকা এনিমে, অনেকেই আকর্ষণীয় ফাইটের আশা করবেন। তবে ফাইটগুলো এতটা আহামরি কিছু না।
**কেন দেখবেন?
– কারণ এটি পটেনশিয়াল কাল্ট ক্লাসিক। কাউবয় বিবপ ভাল লাগলে এই এনিমেও ভাল লাগার কথা। আর সাথে আছে অসাধারণ সব মিউজিকাল স্কোর। যদি সাইকোলজিক্যাল মারপ্যাঁচে ডুবতে চান, বিব্লিওকাল রেফারেন্স আপনার কাছে ইন্টারেস্টিং মনে হয় কিংবা ডিভাইন জাস্টিস নিয়ে আপনার কৌতূহল থাকে, তবে এ এনিমে আপনার জন্য।
আর আছে ভয়েস এ্যাক্টরদের কারিশমা। এই এনিমের ডাব হাইলি রিকমেন্ডেড। আমি প্রথম ৪/৫ টা এপিসোড জাপানিজে দেখেছিলাম। পরে ভাবলাম ডাব ট্রাই করি। শুনেই দেখি এ যে স্পাইক আর ফে’! স্টিভ ব্লাম ও ওয়েন্ডি লি এর ভয়েস একদম পারফেক্ট ছিল। শোয়ার্জওয়াল্ডের ডাব ভয়েস অনেক বেশি ভাল এবং তা আবেগটাকে খুব ভালভাবে ক্যাপচার করতে পেরেছে। তবে অন্যতম আকর্ষণ হল এলান গ্যাব্রিয়েলের ভয়েস। এরপর ক্রিস্পিন ফ্রিম্যানের ফ্যান হয়ে গেলাম। পরে তার বায়ো তে গিয়ে দেখলাম কোতোমিনে কিরেই বা শিজুও’র মত ভারী কিছু চরিত্রের নাম।
এতকিছু চিন্তা না করে শুধু মজার জন্যেই নাহয় দেখে ফেলুন Big O.

Comments

comments