কোইযোরাঃ সেতসুনাই কোইমোনোগাতারি [মাঙ্গা রিভিউ] — Fatiha Subah

koizora-setsunai-koimonogatari

কোইযোরাঃ সেতসুনাই কোইমোনোগাতারি
ইংরেজি নামঃ স্কাই অফ লাভ, লাভ স্কাই-স্যাড লাভ স্টোরি
জানরাঃ স্লাইস অফ লাইফ, ড্রামা, রোমান্স, শৌজো, ট্র্যাজেডি
চ্যাপ্টারঃ ৩০
ভলিউমঃ ১০
মাঙ্গাকাঃ হানেদা ইবুকি (অঙ্কন), মিকা (গল্প)
মাইআনিমেলিস্ট স্কোরঃ ৮.১৩
ব্যক্তিগত স্কোরঃ ৯/১০

শৌজো মাঙ্গা নিয়ে কমবেশি সবারই বিভিন্ন অভিযোগ শোনা যায়। যার মাঝে উল্লেখযোগ্য একটি হল আর যাই হোক, এসব মাঙ্গার কাহিনীতে বাস্তবতার ছোঁয়া নেই বললেই চলে। গল্প যখন অনেক দূর যাওয়ার পরে তাতে নাটকীয়তা আসে ঠিক ওই অংশগুলোর জন্যই স্লাইফ অফ লাইফ বলা হয়। কিন্তু কোইযোরা এমন একটি শৌজো মাঙ্গা যা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরোপুরি বাস্তব জীবনের ঘটনা তুলে ধরে গেছে। শুরুটুকু পড়ে অন্তত মনে হয় যেন একটি বাংলাদেশী মেয়েরই সুপরিচিত প্রেমকাহিনী নিয়ে মাঙ্গাটি তৈরি করা হয়েছে। এই একটা মাঙ্গা পড়ে আমার মনে হয়েছে হয়ত আমাদের দেশের কোন মেয়েও এই গল্পের সাথে নিজের জীবনের সাথে মিলে খুঁজে পাবে। যদিও মাঝ থেকে শেষ পর্যন্ত যা হয়েছে তার সাথে মিল খুঁজে পাবে কম মানুষ এবং এই সংখ্যাটা যত কম ততই আসলে ভালো…

তাহারা মিকা খুব সাধারণ একজন মেয়ে। হাইস্কুলে উঠার পর সেও আর দশটা মেয়ের মত স্বপ্ন দেখে তার একটা বয়ফ্রেন্ড হবে, তার সাথে ঘুরতে যাবে এবং আর বাকি যা যা নিয়ে ভাবতে পারে একজন টিনএজার মেয়ে। মিকার বান্ধবী আয়া তাদের স্কুলের প্লেবয় নোযোমির সাথে ফোন নাম্বার বিনিময় করে। কিন্তু নোযোমির মিকার প্রতি আগ্রহ তাই সে আয়ার কাছে থেকে মিকার নাম্বার নেয়। মিকার সাথে সে যোগাযোগ করলে মিকা ব্যাপারটা খুব অপছন্দ করে। তাও নোযোমি মিকাকে ঘনঘন মেসেজ দিতেই থাকে। এদিকে আয়াও তার বান্ধবীর উপর অসন্তুষ্ট হতে থাকে মিকা তার পছন্দের ছেলেকে কেড়ে নিচ্ছে বলে। এরকম এক টানাপোড়নের মধ্যে একদিন আরেকটি নাম্বার থেকে মিকার ফোনে কল আসে। নোযোমি মাতাল অবস্থায় মিকাকে তার বন্ধুর বাসা থেকে ফোন দেয়। ফোন কাড়াকাড়ি করে নোযোমির বন্ধু সাকুরাই হিরোকি মিকার সাথে কথা বলে। হিরোর কণ্ঠ মিকার কাছে অনেক শান্ত আর নম্র মনে হয়, যেটা নোযোমির পুরো উল্টা। একদম স্বেচ্ছায় মিকা হিরোকে ফোন নাম্বার দেয়, ফোনে কথা বলা শুরু করে এবং একপর্যায়ে দেখাও করে। দেখা করার সময় মিকা বুঝতে পারে যেহেতু হিরো নোযোমির বন্ধু তাই সেও অবশ্যই নষ্ট ধরণের ছেলে হবে। হিরোকে দেখে সে আবিষ্কার করে এই সেই ছেলে যে জুনিয়র হাইস্কুলে একজন ডেলিনকুয়েন্ট ছিল এবং যার বোন ইয়ানকী বলে গুজব শোনা যায়। হিরোকে দেখে মিকা অনেক ভয় পেয়ে গেলেও হিরোর কিছু স্নেহশীল আচরণ দেখে সম্পর্ক রাখবে ঠিক করে। ওই সময়ের ছোট্ট একটা সিদ্ধান্তই যে পরে তার জীবনটায় আমূল পরিবর্তন আনবে মিকা কি তা ঘুণাক্ষরেও টের পেয়েছিল?

অবশ্যই মিকা এটা তখন জানত না। জানলে হয়ত এই মাঙ্গাটাই আর আমরা পেতাম না। আপনি নিশ্চয়ই ভাবছেন তাহলে অন্য গল্প হত এখানে, আর তো কিছু না। কিন্তু তাহলে সেই গল্প নিয়ে মাঙ্গা তৈরি হওয়ার সম্ববনা থাকত না। কেননা মিকা তো এই মাঙ্গাতে সীমাবদ্ধ কোন চরিত্র না। সে যে রক্ত-মাংসেরই একজন সত্যিকারের মানুষ! জ্বী, কোইযোরা কোন লেখকের কল্পনায় মনের মাধুরী মিশিয়ে লেখা কোন গল্প না। এটি মিকা নামের একটি মেয়ের জীবনের সত্যিকারের ঘটনা অবলম্বনে লেখা। এ কারণেই শুরুতে “স্লাইফ অফ লাইফ” কথাটা তুলেছিলাম। তবে ভুলেও ভাববেন না এতে বাস্তবধর্মী উপাদান অনেক বেশি তাই নাটকীয়তা কম। এটায় যে পরিমাণ নাটকীয়তা আছে তা ১০টা কেন ১০০টা স্লাইফ অফ লাইফ, ড্রামা কিংবা শৌজো সিরিজ খুঁজলেও পাবেন না। সাধারণের তুলনায় এখানে এসব ১০ গুণ বেশি। আমার কষ্টের গল্প খুব ভালো লাগে কারণ তা মানুষের সত্যিকারের কষ্টগুলোকে তুলে ধরে। অনেকেই এসবকে “মেলোড্রামা” বলে উড়িয়ে দেয়। কিন্তু বাস্তবে যে এমন ঘটনা অল্প হলেও ঘটে তার সাক্ষাৎ উদাহরণ এই মাঙ্গাটি। একটা কথা আছে- “life is more than drama”। জীবন নাটকের চেয়েও বেশি কিছু। মিকার জীবনের গল্পটা এমনই যে সেটাকে বাস্তবের না বলে কোন নাটক কিংবা সিনেমার গল্প বলাটাই বেশি উপযুক্ত হত। এতদিন অনেক সিরিজকেই “ড্রামাটিক” উপাধি দিয়ে এসেছেন। তবে এই শব্দটার অর্থ আসলেই বুঝতে চাইলে কোইযোরা পড়ে দেখতে পারেন।

কোইযোরা কোনভাবেই স্বাভাবিক শৌজো মাঙ্গা ভেবে পড়তে যাবেন না। আর শৌজো হলেও কারও বয়স যদি ১৪/১৫ এরকম হয় তাহলেও এটা পড়া উচিৎ হবে না বলে আমি মনে করি। একটু ম্যাচিউরিটি আসার পরে এবং একটু বড় হলে পড়াটাই ভালো হবে। তার গুরুত্বটা উপরের কথা থেকে বুঝা সম্ভব না। এই মাঙ্গা পড়ার আগে কিছু বিষয়ে জেনে রাখা উচিৎ। তাই স্পয়লার হলেও সেগুলো বলতেই হচ্ছে। এখানে শারীরিক সম্পর্ক, ধর্ষণ, মাদক, প্রেগন্যান্সি এর মত অনেক বয়ঃপ্রাপ্তদের জিনিস রয়েছে। অতএব বুঝতেই পারছেন, এটা পড়তে হলে বুঝেশুনেই পড়তে হবে। আর আপনার নিতীবোধ যদি বেশি থাকে এবং টিনএজদের উল্টাপাল্টা পাগলামি, ছাগলামি দেখে বিরক্ত হন তবেও সাবধান থাকবেন। কেননা আমার মত আপনারও একদম শুরুতেই তাহলে মাঙ্গাটা ড্রপ করতে ইচ্ছা হবে। তবে এই মাঙ্গার এসব বড়দের জিনিসপাতি বিবেচনা করলে একে শৌজোর চেয়ে জোসেই বলাটাই ভালো হত। মিকা গল্পের শুরুতে হাইস্কুলে থাকে বলেই একে শৌজো ট্যাগ দেওয়া হয়েছে। যদিও পরে “জোসেই বয়সের” সময়ও আসবে।

চরিত্রগুলোর মধ্যে ইয়ূকে খুব ভালো লেগেছে। ইয়ূ অসাধারণ একজন মানুষ! এছাড়া আর কাউকে তেমন ভালো লাগেনি ওভাবে। কিন্তু ক্যারেক্টার ডেভেলপমেন্ট বেশি ভালো ছিল। মাঙ্গাটা একদম প্রথম চ্যাপ্টারেই গল্পের মধ্যে ঢুকে যায় এবং পুরা ৩০ চ্যাপ্টার জুড়েই একের পর এক ঘটনা চলতে থাকে। দম ফেলার সময় দেয় কম। তারপরেও কাহিনীতে তাড়াহুড়া লাগেনি। তার একটা কারণ এর চ্যাপ্টারগুলো (সব কিনা মনে নেই) সাধারণ শৌজো মাঙ্গার একেকটা চ্যাপ্টারের চেয়ে অনেক বড়। যেহেতু এই মাঙ্গাটি তৈরিই হয়েছে মিকার গল্পটা সবার সামনে তুলে ধরার জন্য শুধু বিনোদনের জন্য তৈরি করার বদলে তাই এখানে সাধারণ মাঙ্গার মত কেয়ার-ফ্রি, মজার অপ্রয়োজনীয় চ্যাপ্টার তেমন একটা ঢুকায়নি। কিন্তু গল্পের গভীরতা বুঝার জন্য এবং চরিত্রগুলোকে বুঝার জন্য যখন যেমন সিরিয়াস বা মিষ্টি মুহূর্ত দেখানো দরকার তার সবই দেখিয়েছে। তবে পড়ার সময় বিভিন্ন জায়গায় এত রাগ উঠে চরিত্রগুলোর কিছু কিছু আচরণে যে মনে হয় এটা পড়ার কোন মানে নেই। কিন্তু সময় হলে তাদের আচরণগুলোর পেছনের কাহিনী জানতে পারবেন। এজন্যই ক্যারেক্টার ডেভেলপমেন্ট বেশ পছন্দ হয়েছে। তারা নিজেদেরকে ব্যাখা করার সুযোগ পেয়েছে। আর তাই তাদের সাথে ইমোশনাল অ্যাটাচমেন্ট কাজ করে। ভালো লাগুক আর না লাগুক, তাদেরকে অনুভব করতে পারবেন।

এমন সিরিয়াস মাঙ্গাতে বড় বড় জ্বলজ্বলে চোখ আর চকচকে ব্যাকগ্রাউন্ড মানাবে না ঠিক। কিন্তু এর আর্ট যে একটু বেশিই বাজে! আর্ট নিয়ে খুঁতখুঁতে হলে আপনি ভুল জায়গায় চলে এসেছেন। দারুণ শারীরিক গঠন, সুন্দর চোখ, এলোমেলো চুল, ডিটেইল্ড ব্যাকগ্রাউন্ড এবং অন্যান্য মনোরম দৃশ্য এসবের কিছুই নেই এতে। একটা অ্যাভারেজ মাঙ্গার আর্টও এর থেকে ভালো হয়। তাই একটু কষ্ট করে আর্ট সয়ে নিতে হবে। শুধু গল্পটার স্বার্থে ব্যাপারটা মেনে নিয়ে পড়া চালিয়ে যেতে পারলে ভালো।

কোইযোরা প্রথম প্রকাশিত হয় ২০০৫ সালে সেল ফোন নভেল হিসেবে। শুধুমাত্র মোবাইলে পড়া যায় এমন এক ওয়েবসাইটে মিকা নিজেই তার আত্মজীবনী উপন্যাস হিসেবে লেখা শুরু করে। তখনই এটি জাপানের বেস্ট-সেলিং কামিং অফ এজ এবং রোমান্স উপন্যাসের খেতাব পায়। ২০০৬ এ এটি বই আকারে প্রকাশ হয় এবং এরপরে এর জনপ্রিয়তা এতই বেড়ে যায় যে এর একটি লাইভ অ্যাকশন মুভি, টিভি সিরিজ এবং মাঙ্গা আসে। উয়িকিপিডিয়াতে আবার মাঙ্গা ডেমোগ্রাফিক দেওয়া রয়েছে সেইনেন। যেটাই হোক এটার আনিমে আসেনি এটাই যা দুঃখ! লাইভ অ্যাকশন মুভিটি আমি দেখেছি। এখানে সব ঠিক থাকলেও মাঝে মিকার জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় দেখাতে পারেনি। তাই মুভি দেখতে ইচ্ছুক হলেও মাঙ্গাটাই আগে পড়ে ফেলবেন। কিন্তু অবশ্যই এটা সবার জন্য নয়। বিচার-বিবেচনা করে যদি আপনার রুচির সাথে মিলে বা মানিয়ে নিতে পারেন তাহলে পড়বেন। তবে হ্যাঁ, এত জনপ্রিয়তা তো শুধু শুধু পায়নি কোইযোরা। ট্র্যাজিক গল্প বলে না, এরকম সত্যিকারের ভালোবাসার দেখলে যে কারোরই মন ছুঁয়ে যাবে। মিকাকে কি আসলে দুর্ভাগ্যবতী না সৌভাগ্যবতী বলে উচিৎ কে জানে! তবে এরকম ভাগ্য ১০০০ এ ১ জনেরও যে হয় না তা বলার অপেক্ষা রাখে না। মিকা, তুমি যেখানেই থাকো আশা করি সুখেই আছো।

Comments