Berserk manga review by Farsim Ahmed

 

কিছু সাহিত্যকর্ম পাবেন, যেগুলো শুরু করলে শেষ না করে আর কিছু করার জো নেই। বাংলায় এগুলোকে বর্ণনা করার মত ভালো কোন শব্দ আপাতত মনে আসছে না, তবে ইংরেজিতে দারুন একটা শব্দ আছে, আনপুটডাউনেবল [Unputdownable]। তো কখনো কি শুনেছেন, জনাথান ক্যাথরিন রাওলিং বা জন রোনাল্ড রুয়েল তল্কিনকে কেউ গালিগালাজ করছে? না। কিন্তু এমন এক মাঙ্গাকা আছেন, যিনি মোটামুটি অবিসংবাদিতভাবে প্রতিষ্ঠিত সর্বকালের সেরা মাঙ্গার স্রষ্টা হওয়া সত্ত্বেও নিয়মিত গালি খাচ্ছেন। কেন? কারণ ভদ্রলোক মাঙ্গাটা ভয়াবহ এক ক্লিফহ্যাঙ্গারে ফেলে গত দুই বছর ধরে আইডলমাস্টার নামের একটা গেম খেলছেন, যে গেমে তার ভুমিকা হচ্ছে কতগুলো সুন্দরী আইডলের ম্যানেজারের। সুখের কথা হল, উনি এপ্রিল থেকে আবার মাঙ্গাটা কনটিনিউ করবেন।

যারা মাঙ্গা নিয়ে কিছুটা হলেও ঘাটাঘাটি করেন, তারা ইতিমধ্যে বুঝে গিয়েছেন আমি কিসের কথা বলছি। এটা সেই অসাধারণ মাঙ্গার ছোটখাটো স্পয়লারযুক্ত রিভিউ।মাঙ্গার নাম?

বার্সার্ক!

আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় দীর্ঘদেহী লোকটা যাযাবর, উদ্দেশ্যবিহীনভাবে ঘুরে বেড়ানো যার কাজ। তাঁর দিকে দ্বিতীয়বার চোখ যেতো না, যদি না তার কাঁধে ঝোলানো তলোয়ারটা চোখে পড়ত, যার দৈর্ঘ্য লোকটার চেয়েও বেশি। এক পানশালায় সে দেখিয়ে দিল, তলোয়ারটাকে ভালই ব্যবহার করতে পারে সে। এক চোখো যান্ত্রিক হাতের লোকটা যেন মূর্তিমান আতঙ্ক, মানুষের কাছেও, প্রেতের কাছেও। এক নামে তাকে সবাই চেনে, কৃষ্ণ অসিচালক[Black Swordsman] কিন্তু কার বিরুদ্ধে সে তার এই বিপুল প্রতিহিংসা ধারন করে রেখেছে?

 

ছেলেটার জন্ম হয়েছিল মৃত মায়ের গর্ভে, দুর্ভাগ্যের প্রতীক হিসেবে তাকে চিহ্নিত করল সবাই। পাশবিক নির্যাতনের শিকার হল সে, খুন করল তার নির্যাতনকারী আর পালক পিতাকে। সে বুঝল, The earth means struggle. বেরিয়ে পড়ল সে শক্তির সন্ধানে, পরিণত হল এক দুর্বিনীত তরুনে, যে কাউকেই ভয় পায় না, সাধারণ কোন লড়াই হলেও জীবনবাজি রাখতে তার কোন আপত্তি নেই। দেখা হয়ে গেল তার গ্রিফিথের সাথে, এক দুর্দমনীয় তরুন, আত্মবিশ্বাসে টগবগ করছে। গ্রিফিথের বাহিনী ব্যান্ড অব দ্য হক্সে ইচ্ছার বিরুদ্ধে যোগ দিল সেই ভাগ্যাহত তরুণ। সে দেখা পেল বন্ধুত্বের, ভালবাসার। কিন্তু সব ভেঙে চুরমার হয়ে গেলো, যখন গ্রিফিথ তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ করার জন্য পুরো বাহিনীকে বলি দিল শয়তানের কাছে, ধর্ষণ করল ভাগ্যাহত তরুণের ভালবাসার মানুষকে তার চোখের সামনে। কোনমতে বাঁচতে পারল সে, কিন্তু সর্বনাশ যা হবার টা তো হয়েই গিয়েছে। তার পিছনে ধাওয়া করছে অন্ধকারের প্রেতরা সারাক্ষন, মানুষ কি আর পারে অলৌকিক ক্ষমতার মুখোমুখি হতে? কিন্তু তরুণ দেখিয়ে দিল, তার প্রতিহিংসার তেজ কত ভয়াবহ, তার হিম্মত আছে, এই ভয়াবহ শত্রুর মোকাবেলা করার।
তরুণের নাম?

কৃষ্ণ অসিচালক, গাটস!

প্রথমেই বলতে হয়, মিউরা কেনতারো এক অসাধারণ মাঙ্গাকা। ভীষণ গ্রিপিং এবং থ্রিলিং স্টোরিলাইন, ভদ্রলোক জানেন কিভাবে পাঠকদের ধরে রাখতে হয়। আর তাঁর আঁকা? নিঃসন্দেহে আমার এ পর্যন্ত পড়া মাঙ্গাগুলোর মধ্যে সেরা। বিশাল বিশাল প্রাসাদের প্রতিটা ইট, ক্যারেক্টারদের প্রতিটা চুল, ঘামের ফোঁটা, এক্সপ্রেশন, অ্যাকশান সিকোয়েন্স, ঘোড়ার কেশর, বিশাল সৈন্যবাহিনীর প্রতিটি সদস্য, এত ডিটেইল এর কাছাকাছি কাজ আমি দেখেছি আর শুধু ওয়ান পাঞ্চ ম্যানে আর তাকেহিকো ইনউয়ের মাঙ্গায়[ভ্যাগাবনড, স্ল্যাম দাঙ্ক]। অসাধারণ ভিজুয়াল ওয়ার্কস, প্যানেলগুলো দারুন সুন্দর, কোন জায়গাই মেসি[Messy] নয়। এতে মহা সমস্যায় পড়েছি, বার্সার্কের পর যে মাঙ্গাই পড়ি, পানসে লাগে, অমন শক্তিশালী ভিজুয়ালাইজেশন পাইনা, রুরউনি কেনশিনের মত মাঙ্গা পড়তে গিয়েও এই অবস্থা। সহজ কথায়, বার্সার্ক এমন এক মাঙ্গা, যার আনিমের আদৌ কোন প্রয়োজন নেই।

আনিমের কথা যখন আসলই, তখন বলেই ফেলি, বার্সার্ক মাঙ্গার তুলনায় আনিমে রীতিমত থার্ড ক্লাস। আনিমেতে রাখা হয়েছে মূলত ব্ল্যাক সোরডস্ম্যান আর্ক আর গোল্ডেন এজ আর্ক, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বহু কিছু বাদ দেয়া হয়েছে। আমার নিজের খুব পছন্দের কিছু চ্যাপ্টার হল গার্ডিয়ানস অব দ্য ডিসায়ারস, বাকিরাকা, আর ডিমন ডগ এর অংশটুকু, যেটা আনিমেতে নেই। গোল্ডেন এজ আর্কের পরে যখন আপনি ভাববেন, এর চেয়ে ভালো আর কি হতে পারে? তখনি মিউরা নিয়ে এসেছেন [মাইলড স্পয়লার] গ্রিফিথের পুনর্জন্ম, বিস্ট সোরডস্ম্যান ভারসাস ব্ল্যাক সোরডস্ম্যান, গাটসের ড্রাগন স্লেয়ার আর বার্সার্ক আরমার, রাজা গানিশকার সাথে গ্রিফিথের লড়াই, এবং সম্ভবত আমার সবচেয়ে পছন্দের আর্ক, গানিশকার বাহিনীর সাথে গাটসের লড়াই। পারফেক্ট এক্সিকিউশন।

[মাইলড স্পয়লার] আমার গাটসের লোন উলফ পারসোনালিটিটা দারুন লাগত, তাই যখন দেখেছিলাম তাঁর একটা গ্রুপ হয়েছে, তখন বেশ ঘাবড়ে গিয়েছিলাম, আরেকটা ইনু ইয়াশা হয়ে যায় কিনা। কিন্তু মিউরাকে ধন্যবাদ, সেরপিকোর মত একটা ক্যারেক্টারকে তিনি হাজির করেছেন।

যদি ক্যারেক্টার ডেভেলপমেন্টের কথা বলতে হয়, বার্সার্ক একটা ওয়ান ম্যান শো, কোন সন্দেহ নেই। মুল ফোকাস গাটসের উপর।এত “কুল” আর কোন মেইল প্রটাগনিসট হতে পারবে না, হওয়া সম্ভব না।[প্রসঙ্গত, সোরড আর্ট অনলাইন এর একটা ক্যারেক্টার আছে, যে গাটসের প্রচলিত নাম ব্যবহার করে, আমি নিশ্চিত করছি, সেই ক্যারেক্টার “ভুয়া”। শুধু তাই না, গাটসের কুলনেসের কাছে আর যে শউনেন/সেইনেন আনিমের মেইন ক্যারেক্টারকেই আনুন, তারা সবাই “ভুয়া”।]

এর পরেই আসে গ্রিফিথ, মূল এনটাগনিসট, গডহ্যান্ডের একজন, অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী ফেমটো। সে দিন দিন যত শক্তিশালী হচ্ছে, গাটস তাকে কিভাবে হারাবে তাই সন্দেহ।
গাটস আর গ্রিফিথ, এরা যেন একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। ইয়িন-ইয়াং এর পারফেক্ট এগজাম্পল। তারা একজন আরেকজনের পরিপূরক, ”None can live while the other survives”.

এর আগে একটা রিভিউতে বলেছিলাম, এপিক শব্দটা বহু ব্যবহারে ক্লিশে হয়ে গিয়েছে। বার্সার্ক আর এপিক, এই দুটো শব্দ সমার্থক। বার্সার্ক হল মাঙ্গা জগতের মহাকাব্য। এর জন্য কোন প্রশংসাই যথেষ্ট নয়।

এখন কিছু ড্রব্যাক। বার্সার্ক প্রচণ্ড গোর, এবং ডার্ক একটা মাঙ্গা। গ্রাফিক আর ম্যাচিউর কন্টেন্ট প্রচুর, অবশ্যই প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য। কিন্তু এই মাঙ্গা না পড়া মানে আপনার আনিমে/মাঙ্গা জগতে বিচরন অসম্পূর্ণ থাকা।

ম্যাল রেটিং-৯.১৭
আমার রেটিং-
গল্প-৯/১০
আর্ট-১২/১০
ক্যারেক্টার-৯/১০
এনজয়মেন্ট-১৫/১০

গাটস-এক অনুপ্রেরণার নাম।গাটস-শত প্রতিকূলতার মধ্যেও দৃঢ় সংকল্প থাকার নাম। গাটস-কখনোই হার না মানার নাম। গাটস-হার নিশ্চিত জেনেও লক্ষ্যের দিকে অবিচল থাকার নাম।

সম্মুখ পানে এগিয়ে চল গাটস! পাহাড় সমান বাধাকেও বাধা মনে কর না, দেখিয়ে দাও মানবতার শক্তি কত বেশি হতে পারে! কখনো গ্রিফিথকে ক্ষমা কর না! আর বিসর্জন দিও না তোমার মনুষ্যত্বকে!

 

Comments