Fate/Zero – Review by Farsim Ahmed

বৃহত্তর স্বার্থে ক্ষুদ্রতর স্বার্থ বিসর্জন- এই দর্শন অনেক পুরনো, এবং বিতর্কিত। দুটো জাহাজে যদি ৩০০ আর ২০০ জন লোক থাকে, আর যদি কাউকে যদি বলা হয় এর মধ্যে যে কোন একটা জাহাজের মানুষ বাঁচতে পারবে, আর এই জাহাজ বেছে নেয়ার দায়িত্ব দেয়া হয় তাঁর উপর, তাহলে তাঁর চয়েস কি হওয়া উচিত? ৩০০ জনের জাহাজ? কিন্তু সে কিভাবে ২০০ লোকের মৃত্যু পরোয়ানা লিখতে পারবে? ওই ২০০ লোকের জীবনও তাঁর হাতে ছিল, এই চিন্তাটা কি তাকে পীড়া দেবে? 

উড়োবুচি গেন এর ডাক নাম হয়ে গেছে উড়োবুচার। কারন ভদ্রলোক যে আনিমেরই স্ক্রিপ্ট লেখেন তার সবগুলোতেই শেষে ভয়াবহ একটা টুইস্ট থাকে, যা পুরো আনিমের ব্যাপারেই দর্শকের পার্সপেকটিভ পুরো ১৮০ ডিগ্রি চেঞ্জ করে দেয়[মাদোকা ম্যাজিকাতে উইচদের আসল পরিচয়, সাইকো পাসে সিবিল সিস্টেম এর পিছনের রহস্য বা সুইসেই নো গারগান্তিয়াতে হিদিয়াজদের অরিজিন]। তো এহেন উড়োবুচার যখন টাইপ মুনের সবচেয়ে ব্যবসাসফল ভিজুয়াল নভেল ফেইট/স্টে নাইটের প্রিকুয়েল ফেইট/জিরোর লাইট নভেল নিখলেন, শেষমেশ ভয়াবহ কোন টুইস্ট থাকবে তা জানা ছিল, হয়েছেও তাই, তবে সমস্যাটা হল এই টুইস্ট সম্পর্কে যারা ফেইট/স্টে নাইট অলরেডি দেখে ফেলেছে তারা সবাই অবগত ছিলেন। এখানেই ফেইট/জিরোর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা, এর এন্ডিঙ সম্পর্কে সবাই জানে। এ যেন লুলুচ সবার লাস্ট পর্বে মারা যাবে জেনে কোড গিস দেখতে বসা। তাহলে এত বড় দুর্বলতা থাকা সত্ত্বেও কিভাবে ফেইট/জিরো পরিণত হল ইনস্ট্যান্ট ক্লাসিকে? 

ফেইট/জিরোর প্লট এক কথায় দারুন ইনোভেটিভ, ৭ জন ম্যাজিশিয়ান[মাস্টার] ইতিহাসের পাতায় বিখ্যাত হয়ে থাকা চরিত্রদের[সারভেনট] জাদুর সাহায্যে ডেকে আনবে। এরা সাতটা ক্লাসে বিভক্ত, প্রতিটি ক্লাসের রয়েছে ডিফরেন্ট ট্রেইট। তাদের মধ্যে হবে ব্যাটল রয়্যাল, যাকে বলা হচ্ছে হলি গ্রেইল ওয়ার, আর এতে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকা মাস্টার-সারভেনট জুটি হবে বিজয়ী। তাদের পুরস্কার? স্বয়ং হলি গ্রেইল, যা কিনা পুরন করবে তাদের যে কোন একটা ইচ্ছা। ৭+৭ জন নেমে পড়ল ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী এক যুদ্ধে, যে যুদ্ধের মধ্যে কোন সৌন্দর্য নেই, কোন মহত্ত্ব নেই, আছে শুধু জেতার তাগিদ, আর এর জন্য যা দরকার হয় তাই করা। আইঞ্জবারন পরিবারের প্রতিনিধি মেইজ কিলার এমিয়া কিরিতসুগু, অভিজাত আর্চিবোল্ড পরিবারের কেনেথ, তার আন্ডারএচিভিং ছাত্র ওয়েভার ভেলভেট, তোসাকা পরিবারের তকিয়মি, বিকৃত রুচির এক খুনি উরিউ রিউনোসকে, মাতউ পরিবারের কারিয়া, তকিওমির শিস্য কতোমিনে কিরেই-সবারই নীতি একটাই, বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচ্যগ্র মেদিনী। 

ক্যারেক্টার ডিসাইন সম্ভবত আনিমেটার সবচেয়ে শক্তিশালী দিক। ২৫ পর্বের এমন খুব বেশি আনিমে দেখা যায় না যেখানে ৬-৭টা আইকনিক এবং প্রচণ্ড রকম জনপ্রিয় ক্যারেক্টার আছে, ফেইট/ জিরো এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। যেখানে বাংলাদেশে খুব বিখ্যাত আনিমেগুলো ক্যারেক্টার ডেভেলপমেন্ট করতে ২৫ পর্বের বেশি নেয়, সেখানে ফেইট/জিরো নিপুণভাবে সবগুলো চরিত্রের এম্বিশন, তাদের মনের অন্ধকার জায়গাটুকু, তাদের আশা-আকাঙ্খা-অনুভূতি প্রকাশ করেছে। এমিয়া আর কতোমিনের ইয়িন-ইয়াং পার্সোনালিটি, গিল্গামেশের এরোগেন্স, রাইডারের বক্তৃতা, সেবারের অতীতের প্রায়শ্চিত্ত করতে চাওয়া, এই সব সবকিছুই ছোটখাটো কিন্তু শক্তিশালী সিকোয়েন্স, আর সেই সাথে উপযুক্ত ডায়লগ থ্রোইং দিয়ে দেখানো হয়েছে। 

ফেইট/জিরোর এনিমেশনে ইউফোটেবল যে কাজ দেখিয়েছে, এক কথায় আমার দেখা বেস্ট, এর কাছাকাছি কাজ দেখেছিলাম কারা নো কিওকাই(এটাও ইউফোটেবলের) আর কতোনোহা নি নিওয়াতে। অবশ্যই কমপক্ষে ৭২০ পিতে দেখবেন।

ওপেনিং আর এন্ডিং সংগুলো পারফর্ম করেছে কালাফিনা আর হারুনা লুনা, যথেষ্ট শ্রুতিমধুর কাজ, আর ব্যাকগ্রাউনড মিউজিকগুলো ইয়ুকি কাজিউরার করা। ভদ্রমহিলার কাজ নিয়ে আশলে বলার আর কিছু নেই, শুনলেই বোঝা যায় এগুলো তাঁর তৈরি, এবং যে কোন দৃশ্যকে মিউজিকগুলো কমপ্লিমেন্ট করে গেছে দারুনভাবে। কয়েকটা লিঙ্ক দিয়ে দিচ্ছি-

http://www.youtube.com/watch?v=e499spqrIwU
http://www.youtube.com/watch?v=aHPXTnCSzJw
http://www.youtube.com/watch?v=mhK9Xt2rxes

ভয়েস একটিং হয়েছে অসাধারন, বিশেষ করে এমিয়া আর কতোমিনের। গিল্গামেশের রাজকীয় এক্সেনট শোনা বরাবরই খুব বড় ট্রিট ছিল, আর তকিওমির ভয়েস দিয়েছে স্বয়ং আইজেন, একদম কেইকাকু মত[আসলেই কি তাই?]

শুরু করেছিলাম ফেইট/জিরোর দুর্বলতা দিয়ে। সম্ভবত এন্ডিঙ এর সবচেয়ে দুর্বল দিক। কিন্তু একই সাথে এটাও সত্যি, যেহেতু গেনকে মনে রাখতে হয়েছে যে এর পরে একটা সিকুয়েল আছে যেটা আগেই রিলিজ পেয়ে গেছে, উনি এর চেয়ে ভাল আর কোন ফিনিশিং টাচ দিতে সম্ভবত পারতেন না। 

ফেইট/জিরো আসলে কেন ইউনিক? এটা একটা পরিপূর্ণ প্যাকেজ, বিখ্যাত আনিমেগুলো যেখানে মাঝে মাঝে বিরক্তিকর মনে হয়[মনস্টার, ডেথ নোট(লাইটের স্মৃতি হারানোর পর) ইত্যাদি], সেখানে ফেইট/জিরোর প্রতিটি পর্ব প্রচুর ম্যাটেরিয়ালে ভরপুর, আর উত্তেজনায় ঠাসা। ক্যারেক্টারদের ফিলসফি, অসাধারণ সব ফাইটিং সিকোয়েন্স[সোরড ফাইট তো আছেই, সেই সাথে মোটরসাইকেলের সাথে রথের রেস, গানফাইট, জলপথে যুদ্ধ, এমনকি ডগফাইটও আছে], ঐতিহাসিক ক্যারেক্টারদের মোটামুটি একুরেট রেফারেন্স[পুরোপুরি একুরেট নয়], যথেষ্ট সিরিয়াস কাহিনি হওয়া সত্ত্বেও কাহিনি কোথাও অবোধ্য মনে হয়নি, যে কোন বয়সের দর্শক এটা উপভোগ করতে পারবে।

ফ্র্যাঙ্কলি, ইদানিং একটা বাজে ট্রেনড চালু হয়েছে, মাঙ্গার একটা চ্যাপ্টার বের হলেই বলা হচ্ছে এপিক চ্যাপ্টার, এর মাধ্যমে এপিক শব্দটা তাঁর আসল অর্থ হারিয়ে ফেলছে। আনিমে জগতে যদি লিটারালি কোন এপিক কাহিনি থাকে, তাহলে সেটা হচ্ছে বারসারক, আর ফেইট/জিরো। 

আর একটা কথা অবশ্যই পয়েন্ট আউট করতে হবে, ফেইট/ জিরো খুব ভাল টিভি সিরিয়াল ম্যাটেরিয়াল। গেম অব থ্রনস এর মত খরচ করলে আর পাকা অভিনেতা/অভিনেত্রি থাকলে এটা সর্বকালের সেরা সিরিয়ালগুলোর একটা হতে পারে। 

তো হাতে যদি কোন আনিমে থাকে, আপাতত সেটা অন হোলড রেখে ফেইট/জিরো দেখা শুরু করে দিন। যদি দেখা শেষ করে কমপক্ষে ৮ না দিতে পারেন, তাহলে বুঝতে হবে আপনি এর চেয়ে অনেক বেশি ভাল কিছু আনিমে দেখেছেন, কষ্ট করে আমাকে মেসেজ করবেন বা এই পোস্টে কমেন্ট করে যাবেন। অনেক দিন ভাল আনিমে দেখা হচ্ছে না। আপনার সাজেশনগুলো দিয়ে আমাকে চিরকৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ করবেন।

রিভিউর এখানেই শেষ, এবার আমার নিজস্ব কিছু রানটিং। 

আমি আসলে রিভিউ লিখতে পারি না, কারণ মূলত এত বড় কিছু লেখার মত তেল নেই। কিন্তু যখন কোন বাংলাদেশী আনিমে গ্রুপের থ্রেডে দেখি ১০ এ ১০ ম্যাটেরিয়াল আনিমে নিয়ে আলাপ চলছে, আর তাতে কোড গিস, মনস্টার, ডেথ নোট, ফুল্মেতাল আল্কেমিষ্ট এর রাজত্ম(কিছু বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী আবার এখানেও লাফিয়ে এসে বলে নারুতো/ব্লিচ/ড্রাগনবল জি সর্বকালের সেরা, এবং আশঙ্কার কথা হল এদের সংখ্যাটা রীতিমত বড়), ফ/জ এর তেমন কোন উল্লেখ নেই(কোন এক অজানা কারনে ফ/জ বাংলাদেশে তুলনামুলকভাবে কম আলোচিত) তখন হতাশ দৃষ্টিতে মনিটরের দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না। তো তাদের জন্যই, Please do yourselves a favor, watch the epicness that is Fate/Zero, “epic” in both literal meaning and the meaning used in daily life these days.

fate zero

 

Comments