Honey and Clover [Reaction] — Shifat Mohiuddin

Honey and Clover 1

(প্রচুর স্পয়লারযুক্ত পোস্ট, আসলে পুরো পোস্টটাই স্পয়লার। তাই এনিমে যারা দেখেননি তাদের না পড়ার অনুরোধ রইলো)

“বাথবিহীন ছয় তাতামির একটি রুম, কলেজ থেকে দশ মিনিটের হাঁটা দূরত্ব। পঁচিশ বছরের পুরনো বাসা, ভাড়া ৩৮০০০ ইয়েন। দেয়ালগুলো যথেষ্ট পুরু নয় এবং শব্দনিরোধকও নয়। বাসিন্দারা সবাই ছাত্র। পূর্বমুখী হওয়ার কারণে সূর্যের আলোও ভাল পাওয়া যায়। আর্ট কলেজে ভর্তির সুবাদে গতবছর থেকে আমি টোকিওর বাসিন্দা। ক্যাম্পাসের চারদিকটা অনেক খোলা জায়গা দিয়ে ঘেরা থাকায় আমি যারপরনাই অবাক হয়েছি। আরও অবাক হয়েছি আমার নিজের হাতের রান্নার বাজে স্বাদ দেখে। অবাক হয়েছি পাবলিক বাথহাউসের উচ্চমূল্য দেখে এবং গাদা গাদা হোমওয়ার্কের স্তূপ দেখে। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় এসব এখন আমার নিত্য জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।”

*

আর্ট কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র তাকেমতো ইউতার জীবনের সারসংক্ষেপ হয়তো এটাই। জীবন নিয়ে শূন্য প্রত্যাশাধারী এই সদ্য কৈশোরত্তীর্ণ এই যুবক কিছু একটা খুঁজে পাওয়ার জন্য ভর্তি হয় স্থাপত্যবিদ্যা বিভাগে। কিন্তু সেই মানে আর খুঁজে পাওয়া হয়ে উঠে না। তাকেমতো মনে করে সে প্রতিভাহীন। মধ্যবিত্ত সন্তান হওয়ার কারণে কোন ধরণের বিশাল সাহায্যও তার পেছনে নেই। গ্র‍্যাজুয়েট হয়ে বের হওয়ার পরে নিজের পায়ে দাঁড়াবে এই প্রত্যাশাই তাকেমতোর মফঃস্বলবাসী বাবা-মার।

*

তাকেমতো কিন্তু আবার পিতৃহীন। শীর্ণকায় তাকেমতোর পিতা ছিলেন অনুপ্রেরণাদায়ী। তাকেমতোর শৈশব তাই পিতার স্নেহের ছায়াতলেই কেটে যায়। কিন্তু হাসপাতালে দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকা তাকেমতোর পিতা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তাকেমতোর হাত ধরা অবস্থাতেই। চলে যাওয়ার আগে এগিয়ে যাওয়ার শেষ উপদেশ দিয়ে যান নিজ সন্তানকে। তাকেমতো তাই মাঝেমাঝেই সাইকেলে চড়া অবস্থায় চিন্তা করে সে পেছন দিকে না তাকিয়ে প্যাডাল ঘুরিয়ে কতটুকু আগাতে পারবে। তাকেমতোর মানসপটে তাই বারবার চলে আসে বিকেলের সোনালী আলোতে ঘুরতে থাকা সাইকেলের চাকা। মানসপটে এই দৃশ্য আসার সাথে সাথে তাকেমতো এগিয়ে যেতে না পারার আফসোসে নিমজ্জিত হয়।

*

মেসে থাকা আপারক্লাসম্যান মোরিতা শিনোবু এক রহস্যময় মানুষ। সেই সাথে সে প্রতিভাধরও বটে। ভাষ্কর্য বিভাগের ছাত্র মোরিতা পড়াশুনায় চরম অমনোযোগী। ঠিকঠাকমত প্রথম ক্লাসে উপস্থিত না থাকা এবং গ্র‍্যাজুয়েট থিসিস জমা দেওয়াতে গাফিলতি করায় চার বছরের কোর্স করতে তার আজ সাত বছর লাগছে। এ বছরও তার পাস করা নিয়ে শিক্ষক-সহপাঠী সবাই সন্দিহান। হুটহাট করে উধাও হয়ে যাওয়া এই মানুষটিকে ঘুম থেকে জাগানোর সাধ্য কারোর নেই। প্রতিবার নিরুদ্দেশ অবস্থা থেকে ফিরে আসার পর আশ্চর্যজনকভাবে তার পকেটে মোটা অংকের টাকার অস্তিত্ব পাওয়া যায়। নিজের চারপাশের মানুষদের নিয়ে আবার ভালই সচেতন এই খেয়ালী মানুষটি। কিন্তু এই সচেতনতার বিন্দুমাত্রও খাবার শেয়ার করার সময় বরাদ্দ থাকে না!

*

তাকেমতোর পাশের রুমে থাকা আরেক আপারক্লাসম্যান তাকুমি মায়ামা। চতুর্থ বর্ষের ছাত্র মায়ামা ঠান্ডা মাথার অধিকারী। তাদের আরেক শুভাকাঙ্ক্ষী হল মৃৎশিল্পের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী আয়ুমি ইয়ামাদা। মেস থেকে অনতিদূরে বসবাস করেন চিত্রকলার অধ্যাপক হানামতো শুজি। ঘনিষ্ঠতার কারণে তার বাসায় নিয়মিত যাতায়াত তাকেমতো-মায়ামা-আয়ুমিদের। মোরিতাও খুব প্রিয়পাত্র হানামতো-সানের। একদিন হানামতো-সান তার কাজিনের মেয়ে হাগুমি হানামতোর সাথে সবার পরিচয় করিয়ে দেন। আসল বয়সের চেয়ে দেখতে কয়েক বছর কম মনে হওয়া হাগু-চানের সাথে সবার ঘনিষ্ঠতা হতে সময় লাগে না। ঘটনাস্থলেই তাকেমতোর চেহারায় সদ্য প্রেমে পড়ার চিহ্ন দেখতে পায় মায়ামা। তৈলচিত্রের প্রথম বর্ষের এই ছাত্রীর চেহারা যেন তার মানসপটে তৈলচিত্রের মতই স্থায়ী হয়ে যায়।

তাকেমতো যেন তার অন্যান্য অপ্রস্তুত গুণাবলীর মতে প্রেম প্রকাশেও সদ্য অপ্রস্তুত। তবে আমতা আমতা করে সবার আগে হাগু-চানের সাথে বন্ধুত্ব করে ফেলে সেই সবার আগে। ঘটনাস্থলে তখনই আগমন মোরিতা-সানের। মোরিতার জোরালো আবেদনের কাছে তাকেমতো যেন খড়কুটো মাত্র। আর এখানেই যেন তাকেমতোর থেকে মোরিতার স্বতন্ত্রতা। তাকেমতো যেখানে নিজের পছন্দের কথা বলতে অপারগ মোরিতা সেখানে প্রথম থেকেই স্বতঃস্ফূর্ত। প্রথম থেকেই সে হাগু-চানের সাথে আচরণ করতে থাকে নিজের ইচ্ছেমত। হাগু-চানকে বহুদিনের পরিচিত মানুষের মত সাজাতে থাকে ইচ্ছেমত। ফলে তাকেমতো বিরতিহীনভাবে নিজের ক্ষমতাহীনতা উপলদ্ধি করতে থাকে। সে না পারে মোরিতা সানের মত ৩২০০০ ইয়েনের একজোড়া জুতো উপহার দিতে, না পেরে উঠে এক টুকরো কাঠ থেকে মনে রাখার মত একটা শিল্পকর্ম বানিয়ে হাগু-চানকে দিতে। তাকেমতো বুঝতে পারে তার না আছে অগাধ প্রতিভা, না আছে অর্থনৈতিক প্রাচুর্য। অথচ এই দুটো জিনিসই থাকা মোরিতা-সানের প্রবল উপস্থিতি তাকেমতোর মনে সেই পুরনো প্রশ্নের অবতারণা ঘটায়, “ব্যর্থ প্রেমের কি কোন অর্থ আছে বাস্তবে”।

Honey and Clover 2
*

তাকেমতোর মানসপটে ফিরে আসে আবার সেই সাইকেলের চাকার ছবি। অস্বস্তি কাটানোর জন্য তাকেমতো মফঃস্বলে তার বাড়িতে ফিরে আসে। তাকেমতো তার শৈশবের স্মৃতিচারণ করতে থাকে। এর মধ্যে হুট করে তাকেমতোর সৎ পিতা এই মৌনাবস্থা ভেঙ্গে দেয়। তাকেমতো তার এই পিতাটির মধ্যে মৃত পিতার উপস্থিতি বিন্দুমাত্র অনুভব করে না। শীর্ণকায় দেহের বদলে এই লোকটি যথেষ্ট শক্তসামর্থ্য, তার পিতার স্বল্পভাষীতার তুলনায় এই লোক যথেষ্ট বাচাল। আড্ডা-গল্পের মাধ্যমে তাকেমতোকে জিইয়ে রাখার চেষ্টা করেন ভদ্রলোক। এত কিছুর পরও বিচলিত তাকেমতোর মনে একটি ঋণাত্মক মনোভাব এসেই যায়, “হাহ, এবার আমার মা একজন শক্তিশালী জীবনসঙ্গীকেই বেছে নিয়েছেন। আগের মত ভুল তিনি আর করেন নি।”

*

এদিকে কেটে যায় দু-দুটো বছর। হানামতো সানের তত্ত্বাবধানে হাগু-চানের প্রতিভার পূর্ণ বিকাশ ঘটে। তাকেমতো শেষ বর্ষে পদার্পণ করে। নিজের সামর্থ্য নিয়ে এখনো সন্দীহান সে। মোরিতা-সান এক জরুরী কাজ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যায়। কিছুটা হলেও স্বস্তি আসে তাকেমতোর মনে। হাগু-চানের ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুযোগ বাড়ে তাতে। হাগু-চানের প্রতিভা আর শিল্পের প্রতি একনিষ্ঠতা দেখে চমকিত হয় তাকেমতো। নিজের গ্র‍্যাজুয়েট থিসিস নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে তাকেমতো। কিন্তু লক্ষ্যহীন সে ঘোড়াকে ছোটাতে গিয়ে ব্যর্থ হয় তাকেমতো। শিক্ষকদের আন্তরিকতার পরও নিজের তৈরি ‘কৈশোরের মিনার’ নামক স্থাপনাকে তাকেমতো নিজের হাতেই গুড়িয়ে দেয়! অস্তিত্ব সংকটে ভোগা তাকেমতো পুনরায় থিসিস জমার ডেডলাইন পূরণ করতে চাইলে শরীর তাতে আর সায় দেয় না। তাকেমতোকে ভর্তি হতে হয় হাসপাতালে আর অন্যদিকে মোরিতা আমেরিকা থেকে অস্কার নিয়ে চলে আসে! আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার জন্য তাকেমতো তাই কাউকে কিছু না জানিয়েই ঘর ছাড়ে। সাইকেলে প্যাডেল মারতে মারতে তাকেমতো জাপানের একের পর এক এলাকা প্রদক্ষিণ করতে থাকে। অনেক সময়ই বিশুদ্ধ পানির মত প্রয়োজনীয় জিনিস সংগ্রহ করার জন্য তাকেমতোকে বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের কাছে অনুরোধ করতে হয়। অনেকে অবশ্য সন্দেহের চাওনি দেয়, তবে বেশিরভাগ মানুষের কাছেই তাকেমতো পায় আন্তরিক ভালবাসা। এক দোকানি মহিলা তো তাকেমতোকে দুপুরের খাবার খাইয়েই তবে ছাড়ে। ব্রিজের গোড়া, পার্কের বেঞ্চ ইত্যাদি হয়ে উঠে তাকেমতোর রাত কাটাবার জায়গা। নদীর তীরে কাপড় শুকাতে দেওয়া ভবঘুরে তাকেমতোর মনে সরল উপলদ্ধি জাগে “হয়তো জাপানে জায়গার অভাব নেই তবে বসবাসের মত ভাল জায়গা কমই আছে।”

*

ক্লান্ত-শ্রান্ত তাকেমতোর সাইকেল একপর্যায়ে মহাসড়কের মাঝপথেই ভেঙ্গে পড়ে। সাইকেল ঠেলে ক্লান্ত তাকেমতো একপর্যায়ে এক শিন্তো মন্দিরের সামনেই ঘুমিয়ে পড়ে। কিছুক্ষণ পরে শ্রমিক শ্রেণির মানুষের কোলাহলে তার ঘুম ভেঙ্গে যায়। তাকেমতো পরিচিত হয়ে একদল চিরন্তন ভবঘুরে মানুষের সাথে যারা ঘুরে ঘুরে জাপানের বিভিন্ন বৌদ্ধ আর শিন্তো মন্দিরগুলোর সংষ্কারের কাজ করে। দিনে ৪২০০ ইয়েনের বদলে তাকেমতো কাজ জুটিয়ে নেয় এই দলের সাথে। আর্কিটেকচারের ছাত্র হওয়ায় তাকেমতোর মনে কিছুটা হলেও আকাঙ্ক্ষা ছিল নির্মাণকাজে দক্ষতা দেখানোর ব্যাপারে। কিন্তু সেই আশায় গুড়ে বালি, তাকেমতোর প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশুনা তেমন কোন কাজে আসে না তাদের। তাই তাকেমতো দায়িত্ব নেয় রান্নাঘরের। তাকেমতোর হাতের রান্নায় যেন অমৃত খুঁজে পায় নির্মাণশ্রমিকরা। বিশেষ করে বৃদ্ধ লোকগুলার আবেগ তো অতিরিক্ত বেশি ছিল! ফলে কিছুদিনের মধ্যেই তাকেমতো সবার আপন হয়ে যায়। দশদিনের চুক্তিতে কাজ নেওয়া তাকেমতো তাই কোন ফাঁকে চৌদ্দদিন কাটিয়ে ফেলেছে তা উপলদ্ধিই করতে পারে না। পাওনা পঞ্চাশ হাজার ইয়েন নিয়ে সাইকেল মেরামত করতে চাইলে সহৃদয় ম্যানেজার তাকেমতোকে সেই টাকাসহ একটা নতুন সাইকেলই দিয়ে দেন। তিনি টাকা ফেরত নিতে চান না বরং তাকেমতোকে অনুরোধ করেন ভ্রমণ শেষে যেন তাকেমতো যেন তাদের দলের সাথে দেখা করে যায়। একগুচ্ছ ভাল লাগা অনুভূতিকে সম্বল করে তাকেমতো তার উত্তরমুখী যাত্রা আবার শুরু করে। প্যাডাল মারতে মারতে তাকেমতো উপলদ্ধি করে যে, তার মানসপটে থাকা চলতে থাকা সাইকেলের চাকার চিত্র যেন এই চিরভবঘুরে দলেরই প্রতিচ্ছবি। সেখানেই তাকেমতো তার আজীবনের গন্তব্য খুঁজে পায়।
প্যাডাল মারতে মারতে তাকেমতো এক পর্যায়ে জাপানের উত্তর দিকের একেবারে শেষ পয়েন্টে এসে হাজির হয়। সামনে এগুনোর আর জায়গা তাই আর রইলো না, প্যাডেল মেরে কতটুকু যাওয়া সম্ভব তারও যাচাই হয়ে গেল। সুদূর টোকিও থেকে হোক্কাইডো প্রদেশ পর্যন্ত সাইকেল চালিয়ে আসা তাকেমতো এক অদ্ভুত প্রশান্তি নিয়ে বাড়ির পথে প্যাডাল মারতে থাকে। সঙ্গী হল একরাশ বর্ণীল অভিজ্ঞতা এবং কষ্টার্জিত পরিণতবোধ। তাকেমতো তাই আর সেই আগের অগোছানো তরুণ রইলো না।

*

বাড়ি ফেরত তাকেমতোকে পেয়ে সবাই উল্লাসে মাতোয়ারা। মোরিতা সানের অত্যাচারের দিন শেষ, তাকেমতো এখন তার সাথে সমানে পাল্লা দেয়। হাগু-চান মুগ্ধ নতুন এই তাকেমতোকে দেখে। তাকেমতো ব্যস্ত হয়ে পড়ে তার গ্র‍্যাডুয়েট থিসিস নিয়ে। এক বছর পড়াশুনা পিছিয়ে যাওয়া তাকেমতো যত দ্রুত সম্ভব পড়াশুনা শেষ করে কর্মক্ষেত্রে যোগদান করতে চায়। অন্যদিকে মোরিতা-সান পৃথিবীর অষ্টমাশ্চর্য ঘটিয়ে ফেলেন! দীর্ঘ আট বছর পর অবশেষে তিনি পাস করেই ফেলেন তাও আবার থিসিস জমার ডেডলাইন শেষ হওয়ার বিশ মিনিট আগে! ঘটনার আকস্মিকতায় মোরিতার শিক্ষক, ভাষ্কর্য বিভাগের ইমিরেটাস অধ্যাপক তাঙ্গে-সেনসেই প্রায় স্ট্রোক করে বসেন। ভূপাতিত হওয়া অধ্যাপকের সেবায় যখন সবাই নিয়োজিত মোরিতার মুখে তখন স্মিত হাসি। অধ্যাপক তখন শিক্ষক সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে দারুণ এক আবেগী উক্তি করেন, “আসলে আমরা শিক্ষকরা অনেক দুর্ভাগা। যত কিছুই করি না কেন আমরা, ছাত্ররা একদিন ঠিকই পাশ করে বেরিয়ে যায়। একবার পাশ করে গেলেই হল, কবে যে তাদের সাথে আমাদের আর দেখা হবে তার কোন ঠিকঠিকানা থাকে না।”

*

তাকেমতোর গ্র‍্যাজুয়েট থিসিস শেষের পর্যায়ে, মোরিতা-সান নিখোঁজ এইদিকে। আসে প্রত্যাশিত সামার ফেস্টিভাল আর তাকেমতো নিজের ভালোবাসার কথা সরাসরি স্বীকার করে হাগু-চানের কাছে। বলতে গেলে প্রত্যাখ্যাতই হয় তাকেমতো কিন্তু দুঃখ পায় না সে। বরং বুকের উপর থেকে একটা বিশাল ভার নেমে যায় তাকেমতোর। তাকেমতো জানতো ঘটনাটা এভাবেই ঘটবে, সে প্রত্যাখ্যাতই হবে। কিন্তু অব্যক্ত ভালোবাসার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়ার স্বস্তি তাকেমতোর কাজে নতুন উদ্যম যোগায়। তাকেমতো আর কাপুরুষ রইলো না।

চারদিকে যখন সবকিছু সহজ-সরল গতিতে চলমান তখনই দুর্ঘটনার আবির্ভাব। হাগু-চানের উপর বিশাল বড় কাঁচের পাত আছড়ে পড়ে তুমুল বাতাসের কারণে। থিসিসের যত্ন-আত্তিতে ব্যস্ত তাকেমতো তাই খবর পায় কিছুটা বিলম্বে। ঘটনাস্থলে পৌছে তাই রক্তমাখা কাঁচ ছাড়া কিছুই খুঁজে পায় না তাকেমতো। আতংকের শিহরণ ছড়িয়ে পড়ে তাকেমতোর সারাদেহে। অন্যদিকে হানামতো সেন্সেই তখন হাগু-চানকে নিয়ে হাসপাতালে। হাগু-চানের ডানহাতের আঙুলগুলো সাময়িকভাবে অবশ হয়ে যায়। একজন্য শিল্পীর জন্য হাতের চেয়ে মূল্যবান কিছু হতে পারে না, তাই হাগু-চান সুস্থতার জন্য যেকোন ধরণের চিকিৎসাপদ্ধতির আশ্রয় নিতে রাজী। হানামতো সেনসেই তাই রিহ্যাবের সময় সারাদিন পাশে থাকেন হাগু-চানের। তাকেমতোর থিসিসের কথা মনে করিয়ে তাকে তিনি তাড়িয়ে দেন শিক্ষকসুলভ আচরণ দেখিয়ে। প্রিয় মানুষের আপদকালীন সময়ে পাশে থাকার তাড়না বোধ করে সদাঅপ্রস্তুত তাকেমতো। বাসায় ফেরার সময় ফুলের দোকানে চোখ পড়ে তাকেমতোর। রোগীকে ফুল উপহার দেওয়ার রীতির কথা মনে পড়ে যায় তাকেমতো। কিন্তু ফুলের দাম দেখে হতাশ হয় তাকেমতো। একেকটা ফুলের দামই ৩০০ ইয়েন, তিনটা ফুল কিনতেই ১০০০ ইয়েন চলে যায়। একতোড়া ফুল কিনতে কত লাগতে পেরে ভেবে তাকেমতো দীর্ঘশ্বাস ফেলে। আর্থিক সমস্যা থাকায় তাকেমতো ভাবে মানসিক সাহায্য দিয়েই সেই হাগু-চানের প্রতি দায়িত্ব পালন করবে। কিন্তু এক পর্যায়ে এই ক্ষেত্রেও বাঁধার সম্মুখীন হতে হয় তাকেমতোকে। কমপক্ষে দুই মাস রিহ্যাবে থাকতে হবে হাগু-চানকে আর তাকেমতোরও গ্র‍্যাজুয়েশনের দিন ঘনিয়ে এসেছে। পড়াশুনায় অতিরিক্ত মনযোগ দেয়ার সাথে সাথে এপ্রিল মাসে তাকে নতুন কর্মক্ষেত্রেও যোগদান করতে হবে। তাকেমতোর মস্তিষ্কে ভেসে উঠে তার বাবা-মার ছবি যারা কিনা স্বভাবতই তাকেমতোর গ্র‍্যাজুয়েশনের পর স্বাবলম্বী তাকেমতোকে প্রত্যাশা করছেন। অন্যদিকে ভেসে উঠে শয্যাশায়ী হাগু-চানের ভয়ার্ত চেহারার ছবি। কাজে যোগদান করা মানেই হাগু-চানের কাছ থেকে দীর্ঘ সময়ের জন্য আলাদা হয়ে যাওয়া। এইরকম বহুমাত্রিক সমস্যায় ভোগা তাকেমতো এক সময় হাগু-চানের পাশে থাকার কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়।

*

তখনই দৃশ্যপটে মোরিতা-সানের আগমন। এক বিকেলে হুট করে হাগু-চানকে নিয়ে মোরিতার অন্তর্ধান। চিন্তিত হানামতো সেন্সেইকে আশ্বস্ত করে তাকেমতো। আবেগঘন এক রাত্রি যাপনের পর হাগু-চান ভালবাসার উপরে হয়তো শিল্পপ্রেমকেই বেছে নেয়। হানামতো সেন্সেই তাই আজীবন হাগু-চানের পাশে থাকার সিদ্ধান্ত নেয়। তাকেমতোর মত তাই মোরিতাও হয় প্রত্যাখ্যাত। নদীর তীরে দুইজনের মধ্যে হয়ে যায় তাই তীব্র বাদানুবাদ। তাকেমতো যেন ব্যর্থ প্রেমের ভার চাপিয়ে দিতে চায় মোরিতার উপরেও, মোরিতা আবার এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে চায় না। এক পর্যায়ে দুইজনেই বুঝতে পারে যে তারা একই গোয়ালের গরু এবং হাঁপাতে হাঁপাতে ক্লান্ত হয়ে শুয়ে থাকা অবস্থায় সন্ধি করে নেয়।

*

সময় গড়িয়ে যায় এবং এক পর্যায়ে তাকেমতোর কর্মক্ষেত্রে যোগ দেওয়ার সময় ঘনিয়ে আসে। এক আবেগঘন পার্টির মাধ্যমে যাত্রার আগের রাতে তাকেমতো সকলের কাছ থেকে বিদায় নেয়। সকালে ট্রেনে চেপে বসে তাকেমতো। বগিতে অন্য কোন যাত্রীর অস্তিত্ব না দেখে তাকেমতো দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তখনই স্টেশনে হাগু-চানের ছোট্ট দেহের অবয়ব দেখা যায়। তাকেমতো দৌড়ে ট্রেনের দরজার কাছে পৌছে। হাগু-চান একটা বেন্তো বক্স ধরিয়ে দেয় তাকেমতোর হাতে। অনেক কিছু বলতে চায় হাগু-চান কিন্তু অটোমেটেড দরজার লক হয়ে যাওয়ার শব্দে হাগু-চানের অব্যক্ত অনুভূতি ঢাকা পড়ে যায়। প্ল্যাটফর্মের গোড়া পর্যন্ত হাগু-চান দৌড়ে এসে তাকেমতোকে হাত নেড়ে বিদায় জানায়। এই পাগলামির কোন অর্থ খুঁজে না পেয়ে তাকেমতো স্মিত হাসি হেসে বেন্তো বক্সটা খুলতে থাকে। একগাদা পাউরুটি দেখে তাকেমতো অবাক হয়। উপরের পাউরুটিটা সরানোর পর তাকেমতো নিচের স্তরে মধু মাখানো দেখে আনমনে হেসে উঠে। কিন্তু ভাল করে লক্ষ্য করার পরে তাকেমতো পাউরুটির মধ্যে একটা ফোর-লিফড ক্লোভার দেখতে পায়। একটার পর একটা পাউরুটি উল্টানোর পর তাকেমতো একটা করে মধুমাখানো ফোর-লিফ ক্লোভারের দেখা পায়। আনমনা সেই হাসি রূপ নেয় আবেগের কান্নায়। হাগু-চানের ভালবাসার নিদর্শন সেই পাউরুটি হাতে নিয়ে কান্নাজর্জরিত তাকেমতো সেই মুহূর্তেই ব্যর্থ প্রেমের স্বার্থকতা খুঁজে পায়। জন লেননের সেই উক্তিটাই হয়তো তখন নেপথ্যে বাজতে থাকে,
“The Time you enjoyed wasting, is not wasted”.

*

আমাদের জীবনটা হয়তো এই হানি আর ক্লোভারের মতোই। মধুর প্রলেপ দেয়া সুখকর অনুভূতির সমান্তরালে আমাদের জীবনে আগাছাময় ভুলে যেতে চাওয়া মুহূর্তও আসে। মাত্র ৩৬ পর্বের এনিমেটাতে রীতিমতো কাব্যিকভাবে সাত-আটটি প্রধান চরিত্রের মধু-আগাছাময় জীবনগাথা পরিবেশন করা হয়েছে। এক তাকেমতো-হাগু-মোরিতার ত্রিভুজ সম্পর্ককে নিয়েই এত বকবক করতে হয়েছে! মায়ামা-আয়ুমি-নোমিয়া, মায়ামা-রিকা, রিকা-হানামোতো-হারাদা, মোরিতা ভাতৃদ্বয়ের ব্যাপারে কিছু বলতে গেলে একেবারে থিসিস পেপার নিয়ে বসা লাগবে। মাঙ্গাকা উমিনো চিকাকে মন থেকে আন্তরিক অভিনন্দন এত নাটকীয়, ভালোবাসাপূর্ণ একটি জগতের সাথে দর্শকদের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য। এনিমেজীবনের অন্যতম সেরা একটা এনিমে দেখে শেষ করে ফেললাম।

Comments

comments