তাতামি গ্যালাক্সিতে কিয়োটো — Fahim Bin Selim

তাতামি গ্যালাক্সি দেখতে গেলে প্রিয় চরিত্র খুঁজতে বেগ পেতে হবে না। ওয়াতাশি আর আকাশি তো প্রত্যাশিতই। ওয়াতাশির দুই বছরের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের টানাপোড়েনে আমরা পরিচিত হই ওযু, আর হিগুচি-সেনসেই, বা তাদের সাথে জুড়ে যাওয়া জৌগাসাকি আর হানুকির সাথে। একেক পর্বে একেক জনের সাথে কাটাই। তাদের সাথে পরিচিত হই দূর বা কাছ থেকে, নিজের চোখে আর মানুষের বর্ণনায়, ভিন্ন দৃষ্টিকোণ নিয়ে। শুধু পর্দায় থাকা কোন ছবি না, সম্পূর্ণ গভীরতা নিয়ে;স্ব স্ব আকাঙ্ক্ষা আর হতাশা থাকা, ভালো আর খারাপের মিশেলে, ত্রিমাত্রিক মানুষ হিসেবে। এমনকি স্বল্প সময়ে পর্দায় থাকলেও সবসময়ই নেকো রামেন বিক্রেতা, জ্যোতিষী বৃদ্ধা কিংবা কোহিনাতার উপস্থিতিও অনুভব করা যায়। তবে এই সবগুলো চরিত্রকে একসাথে জুড়ে আনার ক্ষেত্রে যেটার অবদান, অ্যানিমের মূল উপন্যাসের লেখক তোমিহিকো মোরিমির বাকি কাজেও(যেমন- উচুতেন কাযোকু) যেটার প্রভাব লক্ষণীয়, সেটা কোনো রক্তমাংসের মানুষও না – সব ঘটন আর অঘটনের মঞ্চ, একই সাথে আধুনিক আর পুরাণের জাপান যেখানে একত্রিত হয়, সেই কিয়োটো শহর!

কিয়োটোর একাংশ

ওয়াতাশির সাড়ে চার তাতামির ঘরটার কথাই চিন্তা করা যাক, এর অবস্থান শিমোগামো ইউসুইসৌ বোর্ডিং হাউজে। ওয়াতাশি যেটার তুলনা করে হংকং এর কোওলুন ওয়ালড সিটির সাথে। ১৯৯৩-এ ধ্বংসের আগে কোওলুন ওয়ালড সিটি তো ছিলো এরকম এক ঘিঞ্জি এলাকাই – আলো-বাতাসের প্রবেশ এখানে সীমিত, রঙচটা আর নোটিশ-বিজ্ঞাপনে ঢাকা দেওয়াল, আগোছালো আধোয়া জামাকাপড়ের স্তুপ, এবং তার মাঝে পরজীবী বিড়াল, তেলাপোকা আর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদের বসবাস।

এইযান দেমাচিইয়ানাগি স্টেশন

 

ওয়াতাশির ঘরের জানালার কাঁপন আর ভেসে আসা শব্দে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিয়ে যায় এইযান দেমাচিইয়ানাগি স্টেশনের আগত আর বিদায়ী ট্রেনেরা। কামো নদীর পূর্ব পাড়ের এইযান দেমাচিইয়ানাগি স্টেশনের নাম হয়েছে এপাশে ইয়ানাগি আর পশ্চিমে দেমাচি এলাকার নাম জুড়ে দিয়ে। এই স্টেশনের ভূতলে চলে কেইহান রেলওয়ে; বয়স আর অবস্থানে তার উচ্চাসনে এইযান ইলেকট্রিক রেলওয়ে। ১৯২৫ সালে বসানো এই এইযান ইলেক্ট্রিক রেলওয়ের যাত্রাপথ অবশ্য কেবল কিয়োটোর সাকিও ওয়ার্ডের ভিতরেই বিদ্যমান; দেমাচিইয়ানাগি থেকে উত্তরে গিয়ে তাকারাগাইকেতে দুইভাগে ভাগ হয়ে – পূর্বে ইয়াসে-হেইযানগুচি আর পশ্চিমে কুরামা স্টেশন – সর্বসাকুল্যে ১৪.৫ কিলোমিটার এর মধ্যে। ট্রেনেদের আনাগোনাও তাই খুব নিয়মিত।

শিমোগামো ইউসুইসৌ বোর্ডিং হাউজের আরেক বাসিন্দা আট বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ে পরে থাকা হিগুচি। কখনো বাড়ির পাশের রাস্তায়, কখনো বা দেমাচিইয়ানাগি স্টেশন থেকে ১০ মিনিটের হাঁটা দুরত্বে শিমোগামো মন্দিরের পাশের তাদাসু নো মোরিতে হাজির হয় রহস্যময় নেকো-রামেনের ফেরি; সেখানে সাক্ষাৎ মিলে তার। হিগুচি নিজের পরিচয় দেয় কামো তাকেৎসুনোমি হিসেবে, এই শিমোগামো মন্দিরের দেবতা। তাদাসু নো মোরি, শিমোগামো মন্দির আর কিছুটা উত্তরে তার যুগল কামিগামো মন্দিরের সাথে কিয়োটোর সম্পর্ক তো হাজার বছরের।

শিমোগামো মন্দির

 

সহস্রবর্ষী এক আদিবনের অবশেষ হিসেবে পরে আছে এই তাদাসু নো মোরি। মধ্যযুগ আর মেইজিকালের অনুশাসনের সময় এর আকৃতি কমে এলেও, কিয়োটোর সব যুদ্ধ আর ধ্বংসযজ্ঞের শিকার এবং সাক্ষী হিসেবে মানবহস্তের সাহায্য ছাড়াই বারবার পুনোরুত্থান ঘটেছে তার। এই বনের ভেতরেই ষষ্ঠ শতাব্দীতে শিমোগামো মন্দিরের সূচনা, তারও কিছুকাল পর কামিগামো মন্দিরের। এমনকি কিয়োটোও তো তখনো জাপানের প্রাচীন রাজধানী হয়ে ওঠেনি! শিমোগামো মন্দিরে এসে মানুষ অর্চনা করে দুজনের – তামাইয়োরি-হিমে আর তার পিতা দেবতা তাকেৎসুনোমির। তামাইয়োরি-হিমে আর আগুন-ও-বিদ্যুতের দেবতা হোনোইকাযুচি-নো-মিকোতোর ভালোবাসার ফসল কামো ওয়াকাইকাযুচির জন্য বিদ্যমান কামিগামো মন্দির। তামাইয়োরি-হিমে আর হোনোইকাযুচি-নো-মিকোতোর মিলনের এই পুরাকথার রেশ ধরেই রোজ পাণিপ্রার্থীদের আগমন শিমোগামো মন্দিরে।

তাদাসু নো মোরি
 
ভালোবাসার লাল বন্ধন জোড়া লাগাতে এমনকি অযাচিত সম্পর্কের বিচ্ছেদ ঘটাতে হলেও হাজির হওয়া যায় ইয়াসুই কনপিরাগু মন্দিরে, যার অবস্থান কিছুটা দক্ষিণে হিগাশিইয়ামা ওয়ার্ডের গিওন কর্ণারে। অন্যান্য মন্দিরে যেখানে এমা আকৃতির ফলকে নিজের মনোবাসনা লিখে ঝুলিয়ে দিতে হয়, সেখানে এই মন্দিরে আছে এমা আকৃতির বিশাল আকারের একটি এনমুসুবি(সম্পর্ক জোড়া লাগানো) পাথরই। সাদা কাগজে নিজের বাসনা লিখে এই পাথরের ভেতরে গর্ত দিয়ে একবার ঢুকে আবার বেরোতে হয়, তারপর আরো হাজার হাজার কাগজের পাশে নিজেরটা জুড়ে দিতে হয় পাথরের গায়ে, দেবতার প্রতি আবেদন হিসেবে। এই মন্দিরের মূল উৎসব হয় অক্টোবরে, শুকি কনপিরা তাইসাই(বৃহৎ কনপিরা শরৎ উৎসব)। এর এক উল্লেখযোগ্য অংশ হলো মিকোশি নামক কাঠের তৈরি নৌকা-সদৃশ বহনীয় মন্দির নিয়ে শহরের রাস্তাগুলো প্রদক্ষিণ করা।
 
 
ইয়াসুই কনপিরাগু মন্দির

 

এই কনপিরাগু আর শিমোগামো আর কামিগামোর, সর্বজাপানেরই দেবতাদের তাদের মন্দিরগুলোতে অবশ্য পাওয়া যাবে না দশম চন্দ্রমাসে, যেটাকে বলা হয় কান্নাযুকি(দেবতাশূন্য মাস)। দেবতারা তাদের ভক্ত আর উপাসকদের সকল ইচ্ছা-আকাঙ্খা-কামনা-বাসনা-আর্জি নিয়ে হাজির হয় ইযুমো শহরের ইযুমো-তাইশা মন্দিরে। পরবর্তী বছরের জন্ম-মৃত্যু আর বিয়ের ভাগ্য লিখন নিয়ে দেবতাদের সম্মেলন বসে সেখানে। সে শহরের অবশ্য এই মাসেরই নাম আবার কামিআরিযুকি(দেবতাদের মাস)। সম্পর্ক জুড়তে চাইলে এটাই তো সময়!

কিন্তু বারবার যে ভজকট পাকিয়ে ফেলে ওয়াতাশি! আকাশির সাথে কচ্ছপ-মাজনী খুঁজতে ঘুরে বেড়ায় কাওয়ারামাচিতে। শিমানামি বাইকরেস চলার মাঝে তাদের দেখা হয় কেয়াগে ঢালের পাশের রাস্তায়। আবার কখনো ওযুর ফাঁদে পরে, কখনো বা সত্যি সত্যিই চেরী সাইকেল ক্লিনার কর্পসের নেতা হিসেবে এখানেই ধরা পরে যায় আকাশির হাতে। মজার ব্যাপার হলো কেয়াগে ঢাল ঘুরতে যাওয়ার শ্রেষ্ঠ সময় হলো বসন্তকাল, যখন এই ৫৮২ মিটার দীর্ঘ আর উপর থেকে নিচে ৩৬ মিটার উঁচু ঢাল দিয়ে হেঁটে গেলে দেখা মিলবে সারি বেধে দাঁড়িয়ে থাকা গাছের ডালে ডালে ফুটতে থাকা চেরী ফুলের। ঢালটির উপর দিয়ে চলে গেছে রেললাইন, যাতে করে একসময় নিচে বিওয়া হ্রদের ক্যানেল থেকে উপরে কেয়াগে স্টেশন পর্যন্ত জলযান উঠানো নামানোর হতো। সেই পানিপথ অনেক কাল যাবত বন্ধ দেখেই কিনা বার্ডম্যান সঙ্ঘের উড়োজাহাজ চুরি করে নিয়ে যাওয়ার কাজে চেরী সাইকেল ক্লিনার্স কর্প সেটা ব্যবহার করা শুরু করলো! ঢাল বেয়ে নামতে নামতে উড্ডয়ন হলো ওয়াতাশির…তারপরই তো আবার পানিতে মুখ থুবড়ে পড়া।

কেয়াগে ঢাল
 
দুই বছরের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে একের পর এক ভুল সিদ্ধান্তে দগ্ধ ওয়াতাশিকে তাই বারবার ফিরে আসতে দেখি কিয়ামাচি সরণিতে। এক পাশে তাকাসে আর আরেক পাশে কামো নদীকে আলাদা করে রেখেছে এ সড়কটিই। তবে তার সকল সমস্যার সমাধানটাও বাতলে দেয় জ্যোতিষী বৃদ্ধা।
কিয়ামাচি সড়ক

 

কামো ওওহাশি ব্রিজ ও কামোগাওয়া ডেল্টা
 
চোখের সামনে দুলতে থাকা সুযোগটা হাত বাড়িয়ে নিতে হবে। তারপর পদক্ষেপ নিয়ে নদীকে পাশে রেখে সামনে এগিয়ে গেলেই তো হয়। সেখানেই তো – এই যে দেমাচিইয়ানাগির পাশেই কামোগাওয়া ডেল্টা; সাকিও ওয়ার্ড আর কামিগিয়ো ওয়ার্ডের মেলবন্ধন করতে এখানেই কোন এমার মত ঝুলে আছে কামো ওওহাশি ব্রিজ। হিগুচির গান কিংবা জীবন সম্পর্কিত গভীর বয়ান শুনতে হলে এখানেই ফিরে আসতে হবে চক্র পূরণ করে। গোজান উৎসবের রাতে পাঁচ-পাহাড়ে জ্বলা অগ্নি প্রতীক দেখতে শহরের মানুষজনও হামলে পড়বে এখানেই। আর নিচ দিয়ে কামো নদী বইতে বইতে তাদাসু নো মোরিকে সাক্ষী হিসেবে রেখে মিলিত হবে তাকাসে নদীর সাথে, তাকেৎসুনোমির আশীর্বাদেই কি?
হাতে মোচিগুমান নিয়ে আকাশির সাথে সাক্ষাতের জন্যও তো তাই আসা চাই এখানেই।
 

দা তাতামি গ্যালাক্সি [রিভিউ] — Safin Zaman

The Tatami Galaxy

The Tatami Galaxy Review
পর্ব সংখ্যাঃ ১১
জনরাঃ মিস্টেরি, সাইকোলজিকাল, রোমান্স

প্যারালাল ওয়ার্ল্ড। বেশ ইন্টারেস্টিং একটা কনসেপ্ট। ভাবতে মজাই লাগে আমাদের এই জগতের বাইরেও আরো অনেক জগত আছে যেখানে প্রায় সবকিছু একই, দুই একটা ক্ষুদ্র জিনিস ছাড়া। হয়তো আপনি এখন এই রিভিউ পড়ছেন, কিন্তু অন্য জগতের আরেক আপনি এই রিভিউ দেখেই স্ক্রল করে চলে গেছে। তার মানে বলা যায় এখন দুইটা জগত বিদ্যমান। একটাতে আপনি রিভিউ পড়ছেন, আরেকটাতে পড়ছেন না। হয়তো এমনও একটা জগত আছে যেইখানে আমি এই রিভিউই লেখি নাই। সব মিলিয়ে মজার হলেও বেশ জগাখিচুড়ি একটা অবস্থা। কিন্তু এই জগাখিচুড়ি কনসেপ্টকে এতটা সুন্দর আর উপভোগ্যভাবে দর্শকের সামনে উপস্থিত করেছে তাতামি গ্যালাক্সি তার প্রশংসা না করলেই নয়।

তাতামি গ্যালাক্সি তোমিহিকো মোরিমির লেখা এক উপন্যাসের অ্যাডাপ্টেশন যা স্টুডিও ম্যাডহাউজ ২০১০ অ্যাডাপ্ট করে। উপন্যাসের পুরোটাই ফার্স্ট পারসন ন্যারেটিভে লেখা । তাই হয়তো এনিমের কোথাও প্রোটাগনিস্টের নাম উল্লেখ করা হয় নি। লেখার স্বার্থে ধরি প্রোট্যাগনিস্টের নাম ‘ওয়াতাশি’। এই ওয়াতাশি এক কলেজ ছাত্র। অন্যসব কলেজ ছাত্রদের মতও তার স্বপ্ন এক পার্ফেক্ট কলেজ লাইফের যেখানে বন্ধুবান্ধব, ভালবাসার মানুষ নিয়ে কাটবে তার দিনকাল। তার ভাষায় এক “গোলাপী রঙ এর ক্যাম্পাস জীবন”। এই পরম আরাধ্য ক্যাম্পাস জীবনের জন্য সে বিভিন্ন সার্কেল বেছে নেয় আর স্বপ্ল দেখে সে বন্ধুবান্ধব ঘেরা থাকবে, কৃষ্ণকালো চুলের এক রমণী তার প্রেমে পড়বে… কিন্তু ফ্যান্টাসি তো ফ্যান্টাসিই। বাস্তব জীবনের সাথে তার আকাশ পাতাল তফাৎ। কৃষ্ণকালো চুলের রমণী তো দূরের কথা, পুরো ক্যাম্পাস লাইফে তার পরিচয়ই হয় দুইজন মেয়ের সাথে। আর বন্ধুবান্ধব ঘেরা থাকার বদলে তার সংগী ‘ওযু’ নামক এক আজব প্রাণীর যাকে দেখলেই পাতাল থেকে বের হওয়া এক ভূতের কথা মনে পরে।

তাতামি গ্যালাক্সির স্পেশালিটি এর গল্পকথন। কিংবা সোজা ভাষায় বললে, এর ন্যারেটিভ। এনিমের ১১টা এপিসোড ১১ রকমের পরিস্থিতি দেখায়, যার মুখোমুখি ওয়াতাশি হতে পারে। শেষ দুই পর্ব বাদে প্রত্যেক পর্ব শেষেই গল্প রিওয়াইন্ড হয়ে একটা নির্দিষ্ট সময়ে ফেরত যায় যেইখানে ওয়াতাশি কোন গুরুত্বপূর্ণ ডিসিশন নিচ্ছিল। ফলাফল হিসেবে একেক এপিসোডে দর্শক ওয়াতাশির নেওয়া একেক ডিসিশনের ফলাফল দেখতে পারে। উদাহারণ হিসেবে এক এপিসোডে ওয়াতাশি ইংলিশ ক্লাবের সদস্য আরেক এপিসোডে সিনেমা ক্লাব। এই ডিসিশনের ভিন্নতার কারণে তৈরী ওয়াতাশির ভিন্ন ভিন্ন জীবন , আরেক কথায় প্যারালাল ওয়ার্ল্ড। এক প্যারালাল ওয়ার্ল্ডের ওয়াতাশি ইংলিশ ক্লাবের সদস্য, তার পরিচিত মানুষজন এক রকম, তার চিন্তাভাবনা এক রকম। আবার আরেক প্যারালাল ওয়ার্ল্ডের ওয়াতাশি সিনেমা ক্লাবের সদস্য।তার জীবন ইংলিশ ক্লাবের ওয়াতাশি থেকে ভিন্ন। এইভাবে নয় এপিসোডে ওয়াতাশির নেওয়া নয় রকম ডিসিশনের ফলাফল হিসেবে নয় রকমের জীবন দেখানো হয়। কিন্তু একটা জীবনও ওয়াতাশির পছন্দ নয়। তার চাই সেই কল্পনার “Rose colored campus life”।ওয়াতাশি তার পরম আরাধ্য ক্যাম্পাস জীবনের পিছনে আজীবনই ছুটে যেত যদি না ৪.৫ তাতামির লুপহোলে পড়ে সে জীবনের চরম সত্যটা অনুধাবন না করত, “যা আছে, তা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকা”।

ন্যারেটিভ বাদে তাতামি গ্যালাক্সির চরিত্রগুলো আর এর আর্টস্টাইলের কথা না বললেই নয়। চরিত্র এতে কম কিন্তু যেইগুলো আছে প্রত্যেকেই তাদের নিজস্বতায় পরিপূর্ণ। এমন কোন চরিত্র নাই যেইটা কেবল থাকার জন্য ছিল। প্রত্যেক চরিত্রেরই গল্পের পেছনে কিছুনা কিছু অবদান ছিল আর সেইটা চমৎকারভাবেই উপস্থাপন করেছে তাতামি গ্যালাক্সি।

তার পর আছে এর আর্টস্টাইল। এর আর্টস্টাইল শুরুতে কিছুটা অন্যরকম লাগলেও কাহিনী যত আগাবে তত মনে হবে এইরকম গল্পের জন্য এর চেয়ে ভালো আর্টস্টাইল হতেই পারে না। ডার্ক শেডেড কালার থেকে ভাইব্রেন্ট কালারের আর্টস্টাইলে শিফটগুলো অনেক সুন্দর ছিল। আর শেষ দুই পর্বে রিয়েল লাইফ ইম্যাজারি যোগ করেছে নতুন মাত্রা। সব মিলিয়ে এক অনবদ্য রঙের খেলা যেন এটা।

আমার কাছে এটা ১০/১০ এনিমে। তাই নেগেটিভ কোন পয়েন্ট থাকলেও খুঁজে পাচ্ছি না।আমার মতে এই এনিমে খারাপ লাগতে পারে একমাত্র যদি এই ধরণের এনিমে আপনার টেস্টের না হয়ে থাকে। এছাড়া তাতামি গ্যালাক্সি উপভোগ না করার কোন কারণ নেই। যদিও এর ন্যারেটিভ সাধারণ এনিমের তুলনায় একটু বেশিই দ্রুত তবে প্রথম ১০/১৫ মিনিটের পর অভ্যস্ত হয়ে যাবেন। আর অভ্যস্ত না হলে স্লো করে দেখার অপশন তো আছেই।

সব মিলিয়ে এক কথায় মাস্টারপিস লেভেলের এক এনিমে তাতামি গ্যালাক্সি। একটা বড় পাজল অনেকখন ধরে মেলানোর চেষ্টা করার পর মিলালে যেমন আনন্দময় একটা অনুভূতি হয় ঠিক তেমন অনুভূতি পেয়েছি এই এনিমে শেষ করে। যাদের কাছে ব্রেইন টিজার টাইপের শো পছন্দ তাদের জন্য অবশ্যই রেকমেন্ডেড।

এনিমে রিভিউঃ The Tatami Galaxy — Rezo D. Skylight

এনিমে রিভিউঃ
The Tatami Galaxy
পর্ব সংখ্যা: ১১
জনরা: Mystery, Psychological, Romance
স্টুডিও: Madhouse
মাইএনিমেলিস্ট রেটিং: ৮.৬৫
আমার রেটিং: ৯/১০

Tatami Galaxy

আমরা মনে মনে প্রায়ই বলি, “ইশ!! আজ যদি এই কাজটা না করে অই কাজটা করতাম তাহলে আজ আমার এই পরিণতি হত না।” বিশেষ করে আমাদের জিবনে হতাশা নেমে আসলে আমরা এই ধরণের কথা বার্তা বেশি বলি। এখন প্রশ্ন হল হতাশা কি? হতাশা আসলে কিছুই না। মানুশের নিজস্ব অসন্তুষ্টি থেকেই হতাশার উৎপত্তি। আমরা যদি অন্য রাস্তা ধরে হাঁটতাম আমাদের ভাগ্যের কি কোন পরিবর্তন হত? নাকি শেষ পরিনতি একই হত? মানুষের এই ধরণের আকাঙ্খা, অশান্তি আর হতাশাকে কেন্দ্র করেই ‘The Tatami Galaxy’ এনিমের কাহিনী রচিত।

এনিমের কেন্দ্রিয় চরিত্র ওয়াতাশি। সে তার কলেজের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। কিন্তু তার মনে নেই কোন সুখ, নেই কোন শান্তি। সে তার অতিতকে পরিবর্তন করতে চায়। তার ধারণা সে যদি অন্য ক্লাবে যোগ দিত বা অন্য কাজ করত তাহলে তার এই হাল হত না; সে হয়তবা খুঁজে পেত তার ‘rose colored life’। তার এই ইচ্ছা পুরন হয় এবং সে পুনরায় ফিরে যায় তার দুই বছর আগের জিবনে। কিন্তু প্রতিবারই তার এই অসন্তুষ্টি থেকে যায়। মনে হয় যেন সে একটা গালাক্সির মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে, যে গালাক্সি তার ৪.৫ টাটামি দিয়ে তৈরি ঘরের গালাক্সি। এইজন্যেই মনে হয় এনিমের নাম ‘The Tatami Galaxy’ দেয়া হয়েছে। যাই হোক এই ওয়াতাশিসহ আকাশি, অজু, হিগুচি নামের আরও অনেক ক্যারেক্টারকে কেন্দ্র করেই টাটামি গালাক্সির কাহিনী শুরু।

আমার কাছে টাটামি গালাক্সি খুব ভাল লেগেছে। যদিও আর্টস্টাইল কিছুতা অদ্ভুত ছিল। তারপরেও কয়েকটা এপিসোড দেখার পর সমস্যা হয় নেই। আর কমেডি হিসেবেই এনিমেটা চমৎকার ছিল। ওয়াতাশি আর অজুর কাজকর্ম দেখে অনেক হেসেছি। টাটামি গালাক্সি দেখে যে কেউই মজা পাবেন। আর কাহিনীর শেষটাও অত্যন্ত চমৎকার। তাই সময় পেলে দেখে ফেলুন স্টুডিও ম্যাডহাউস প্রযোজিত ১১ এপিসোডের এই অসাধরন এনিমেটি।

The Tatami Galaxy রিভিউ — Asfina Hassan Juicy

4

The Tatami Galaxy
Episodes: 11

জনৈক দার্শনিক বলেন “মানুষ মাত্রই অসন্তুষ্ট।” মানুষ এক মূহুর্ত হাসে,পরমূহুর্তেই নাসিকা দিয়ে ফোঁস করে কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণ করে বলে “হুম,আমি অসন্তুষ্ট।” মানুষের মনের এই অসন্তোষের কক্ষে এসে যোগ দেয় অতীতকে দোষারোপ,নিজেকে দোষারোপ,মানুষকে দোষারোপের এক ধরণের প্রবণতা এবং একটি ‘যদি’র কাল্পনিক কোর্ট।‘যদি এই কাজটা না করতাম’, ‘যদি এই জিনিসটা না হইত’, ‘যদি এই ব্যাটা এই আকাম না করত’…কিন্তু এই ‘যদি’ই যদি বাস্তব হত তবে কি জীবনের সব অসন্তোষ ঘুঁচে গিয়ে চিরকাঙ্খিত ‘rose coloured life’ এর আগমন ঘটত?
গল্পের ন্যারেটর কলেজের নতুন জীবনের দ্বারকোঠায়।আর দশজন স্বাভাবিক যুবকের মত সেও এক গ্যালন বসন্তপূর্ণ ফুলেল জীবনের আশা নিয়ে প্রবেশ করে তার ক্যাম্পাসে।অজস্র নব নব ক্লাব বা অতিরঞ্জিত করে বললে ‘জীবনের দরজা’র মধ্যে থেকে সে পছন্দ করে নিল টেনিস ক্লাব।কিন্তু হ্যাঁ, জীবন তাকে স্বভাবতই কচু দেখিয়ে সব আকাঙ্খা পণ্ড করে দিল।আর কচু দেখাতে সাহায্য করল টেনিস ক্লাবের নিন্দনীয় এক চরিত্র Ozu। তবে যদি সে প্রথমে টেনিস ক্লাব না নিয়ে অন্য কোন ক্লাব বেছে নিত? যদি তার জীবনের choice এবং activity ভিন্ন হত? সে কি পেত চিরকাঙ্খিত ‘rose coloured life’ ?

মানুষ আকাশের দিকে তাকালে তার জীবন নিয়ে ভাবে,ঘুমানোর সময় তার জীবন নিয়ে ভাবে,খামোখা বসে থাকলেও তার জীবন নিয়ে ভাবে।ভাবে নিজের choice এর কথা আর পাল্টে দিতে চায় অতীতের হতাশাময় ব্যাপারগুলোকে।ঘরের বাইরের ঘাসের উপর শিশির না দেখে আকাশ পাতাল ঘুরাঘুরির মতই আমরা আমাদের আশেপাশের রঙ্গিন ব্যাপারগুলো না দেখে খুঁজে বেড়াই এক অস্তিত্বহীন ঝলমলে জীবনকে।কিন্তু আমরা ভুলে যাই চিরসত্যটি।১০০০/২০০০ প্যারালাল পৃথিবী ঘুরে আসলেও,শত শতবার নিজের choice, অতীত পরিবর্তন করলেও সর্বশেষে আমাদের অবস্থান অপরিবর্তনীয়।সব ক্ষেত্রেই আমাদের হতাশা,কষ্ট সমানুপাতিক। যেখানে জীবন আছে সেখানে হাসির কলরব আছে,আবার যেখানে জীবন আছে সেখানে সমপরিমাণে অবশ্যই আছে অসন্তোষ এবং ব্যর্থতা।
জীবনের এই চিরন্তন ব্যাপার এবং জীবনের দর্শনপাত না করা সুন্দর জিনিসগুলিই এই এনিমেতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে চমৎকার স্টোরি ন্যারেশন, চমৎকার ভয়েস অ্যাক্টিং, চমৎকার ইলাস্ট্রেশন(পড়ুন মাসাকি ইয়ুয়াসার হা করে দেয়া ব্যাপার স্যাপার) এবং আটকে রাখা এন্টারটেইনমেন্টের মাধ্যমে।

MAL rating: ৮.৬১
আমার রেটিং : ১০ বললে কম মনে হচ্ছে।
http://myanimelist.net/anime/7785/Yojouhan_Shinwa_Taikei

5