শিকড়ের সন্ধানেঃ পর্ব ৫

আজকের নাতিদীর্ঘ এপিসোডে আলোচিত হচ্ছে ফেইট স্টে নাইট আর ফেইট জিরোর হলি গ্রেইল আর সেবার, গিলগামেশ আর বার্সার্কারের ঐতিহাসিক ও মিথিক্যাল ব্যাকগ্রাউন্ড।

(কনটেন্ট কারটেসিঃ বিখ্যাত এনিমখোর ফারসিম আহমেদ।)

আলোচিত এনিমেঃ ফেইট জিরো, ফেইট স্টে নাইট, আনলিমিটেড ব্লেইড ওয়ার্কস, কার্নিভাল ফ্যান্টাজম (প্যারোডি)

হলি গ্রেইলঃ 

হলি গ্রেইল আসলে কি সেটা নিয়ে অনেক ধরণের মত রয়েছে, কারো মতে এটা হলো পাত্র, কাপ যা দিয়ে যিশু কোন কিছু পান করতেন, আবার কারো মতে এ হলো সেই পাত্র যাতে সেইন্ট পিটার যিশুর রক্ত সংগ্রহ করেছিলেন। গ্রেইলের তাৎপর্য আর ক্ষমতা নিয়েও মতভেদ রয়েছে, ধারণা করা হয় এটি যেকোন রোগ নিরাময় করতে পারে, আবার যে কাউকে অমরত্ব দিতে পারে, আবার কোন এক লিজেন্ড অনুযায়ী হলি গ্রেইল যার কাছে থাকবে তার কোন অমঙ্গল সম্ভব নয়, খ্রিষ্টপর প্রথম শতক থেকেই গ্রেইল হান্টিং খ্রিষ্টান কমিউনিটির কাছে খুব জনপ্রিয় একটা ব্যাপার, কিং আর্থার আর তার বিখ্যাত নাইটরাও অংশ নিয়েছিল গ্রেইল কোয়েস্টে, অংশ নিয়েছিল ১২-১৩ শতকের দিকে হঠাৎ করে প্রভাবশালী হয়ে উঠা নাইট টেম্পলাররা।

কিছু মুভি যেখানে হলি গ্রেইলকে ফিচার করা হয়েছেঃ

দ্যা কোয়েস্ট অব দ্যা হলি গ্রেইল (১৯১৫)

মন্টি পাইথন এন্ড দ্যা হলি গ্রেইল, কমেডি মুভি (১৯৭৫)

এক্সক্যালিবার (১৯৮১)

সেইবার/ কিং আর্থার 

ফেইট স্টে নাইট- ফেইট জিরো এনিমের বিপুল আলোচিত সেবার, চোখ ঝলসানো রুপবতী দুর্ধর্ষ এই যোদ্ধার পাস্ট লিংকেজ হিসাবে এসেছে আর্থার, ‘দ্যা ওয়ান্স এন্ড ফিউচার’ কিং অব ইংল্যান্ড। ব্রিটোনিয়ান হিস্ট্রিতে প্রায় ৬০০ শতকে কিং আর্থারের লিজেন্ড পাওয়া যায়। অর্ধেক রোমান, অর্ধেক ব্রিটিশ রক্তের অধিকারী আর্থার রোমান সাম্রাজ্য পরবর্তী ব্রিটেনকে রক্ষা করেন স্যাক্সন আগ্রাসন থেকে। আর্থার আর তার দুঃসাহসী নাইটদের বীরত্ব, সাহসিকতা, মহানুভবতার গল্প ছড়িয়ে আছে ব্রিটেনের অলিগলিতে।

আর্থার আর বিখ্যাত তরবারী এক্স-ক্যালিবার (যা কোন আঘাতেই ভাঙ্গে না) মোটামুটি সর্বজনবিদিত, কিং আর্থার তার জ্ঞানী উপদেষ্টা (কোন বর্ণনায় ম্যাজিশিয়ান) মার্লিনের পরামর্শে রহস্যময় লেকে খুঁজে পান এই এক্স-ক্যালিবার, আর এর স্ক্যাবার্ড যেকোন আঘাতের বিরুদ্ধে শিল্ড হিসাবে কাজ করতে পারে। আর্থার সর্বমোট ১২টি যুদ্ধ জয়ে নেতৃত্ব দেন ব্রিটেনকে। তার সবচেয়ে ট্রাস্টেড নাইট ল্যান্সিলট আর আত্মীয় মরড্রেডের বিদ্রোহ দমনে গুরুতর আহত আর্থার, তখন তাকে একটি ভেলায় করে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়, তারপর আর কেউ তার খোঁজ পায় নি, কেউ বলে তিনি মারা গেছেন, আর কেউ বলে আর্থার এখনো জীবিত, ব্রিটেনের ভবিষ্যত কোন দূর্যোগে আবার ফিরে আসবেন তিনি ব্রিটেনকে জয়ের পথ দেখাতে, তাই তাকে বলা হয় ওয়ান্স এন্ড ফরেভার কিং

কিন্ত ফিরে আসার সময় যে তিনি সেবারের মত পরমাসুন্দরী রুপে আসবেন সেটা কিন্তু কোথাও বলা হয় নি !!

কিং আর্থার নিয়ে কিছু মুভিঃ

এক্সক্যালিবার (১৯৮১)

কিং আর্থার (২০০৪)- খুব ভালো, দেখা উচিত…

কেমেলট (টিভি সিরিজ, ২০১০)

লিজেন্ড অব কিং আর্থার (টিভি সিরিজ ১৯৭৯)

সিজ অব দ্যা সেক্সন্স (১৯৬৩)

দ্যা লাস্ট লিজিয়ন (২০০৭)

বার্সারকার/ হারকিউলিসঃ 

সম্ভবত আমাদের সবাই কমবেশি শুনেছি হারকিউলিসের নাম, মিথ, নাটক, মুভি, সিরিয়াল, গেইম বিভিন্নক্ষেত্রে অতি জনপ্রিয় শক্তিমত্তা আর বীরত্বের প্রতীক এই গ্রিক ডেমিগডকে তুলে আনা হয়েছে ফেইট স্টে নাইটের বার্সারকাররুপে…

হারকিউলিস মূলত গ্রীক ডেমিগড হেরাক্লসের রোমান নাম, কুইন অব আরগসের গর্ভে জন্ম নেওয়া দেবতাপুরী অলিম্পাসের অধিপতি বজ্রদেব জিউসের সর্বশেষ মনুষ্য সন্তান, অপ্রতিদ্বন্দ্বী শারীরিক শক্তির জন্য বিখ্যাত। হারকিউলিসের সর্বপ্রথম লিজেন্ড ছিল সম্ভবত কুখ্যাত মানুষখেকো নেমিয়ান লায়নকে খালি হাতে দমন করা, এছাড়াও হারকিউলিসের আছে বিখ্যাত ১২ লেবার (১২ টি কোয়েস্ট) যার মধ্যে অন্যতম হলো বহুমাথাওয়াল দানব হাইড্রা আর ভয়ংকর মিনাটর নিধন।

বার্সারকার চরিত্রে যেভাবে দেখানো হয়েছে হারকিউলিস তেমনই মাথামোটা, বদরাগী ছিল, তার বেশিরভাগ দুর্ভোগের কারণ তার বদমেজাজ আর বুদ্ধিশুদ্ধির অভাব, তবে বন্ধুবাৎসল আর মহানুভব হিসাবেও তার পরিচিতি রয়েছে। হারকিউলিস একমাত্র ডেমিগড যে মৃত্যুর পর পূর্ণ দেবতার স্থানে অধিষ্ঠিত হয়।

হারকিউলিসের কিছু মুভি ও টিভি সিরিজঃ 

হারকিউলিস ইউনিভার্সাল টেলিভিশন মুভিস (৫ টা মুভি, ১৯৯৪)

হারকিউলিস (১৯৯৭)

লিজেন্ড অব হারকিউলিস (২০১৪)

দ্যা লিজেন্ডারি জার্নিস অব হারকিউলিস (টিভি সিরিজ, ১৯৯৮)

ইয়াং হারকিউলিস (টিভি সিরিজ, ৯৮-৯৯)

গিলগামেশ/দ্যা কিং অব হিরোসঃ 

গিলগামেশ, ফেইট সিরিজের অন্যতম প্রভাবশালী চরিত্র কিন্তু সরাসরি গ্রীক-এশিয়ান মিথ থেকে এসেছে, খ্রিষ্টপূর্ব ২৫০০ সালের দিকে রাজত্ব করা উরুকের (ব্যবিলন, বর্তমান ইরাক-দামেস্ক-সিরিয়া) রাজা। কথিত আছে, গিলগামেশ পুরো পৃথিবী জুড়ে তার রাজত্বকে সম্প্রসারিত করতে পেরেছিল, ইসলামী হিস্ট্রিতে একই টাইমলাইনে এরকম এক অত্যাচারী পুরো পৃথিবীর রাজা বখত-নসরের (কিংবা নমরুদ) উল্লেখ পাওয়া যায় যার সাথে খুব মিলে যায় এই গিলগামেশের।

গিলগামেশ আসুরিক শক্তির অধিকারী, তীব্র অহংকারী ও অত্যাচারী রাজা ছিল, তার অত্যাচারের নমুনা বলতে গেলেঃ উরুকের সমস্ত তরুণদের ধরে এনে বাধ্যতামূলক অসহ্য কায়িক পরিশ্রম করাত সে, আর তরুণীদের বিয়ের রাতে তার সাথে থাকতে হত, দেব-দেবীদের ও মানত না সে। দেবতারা তাকে শায়েস্তা করার জন্য পাঠান বনমানুষ এনকিদোকে, কিন্তু প্রচন্ড যুদ্ধের পর এনকিদো গিলগামেশের সবচেয়ে কাছের বন্ধুতে পরিণত হয়, দু’জনে মিলে তারা বেরিয়ে পড়ে ভয়ংকর সব এডভেঞ্চারে, এর মধ্যে রয়েছে বুল অব হেভেন আর বনের অপদেবতা শামাস দমন।

ঘটনাক্রমে এনকিদো মারা গেলে গিলগামেশ শোকে অভিভূত হয়ে পরে, সে সমস্ত রাজত্ব-অহংকার-সৈন্যসামন্ত ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে জীবনের অর্থ অন্বেষণে আর অমরত্বের খোঁজে (এইখানে আবার আরেক পৃথিবীবিজয়ী সিকান্দার জুলকারনাইনের সাথে মিল রয়েছে), কিন্তু দীর্ঘ সাধনার পরও অমরত্বের সন্ধানে ব্যর্থ হয়ে অবশেষে ১২৬ বছর রাজত্ব করার পর মারা যায় গিলগামেশ।

সমসাময়িক সমস্ত বীরদের চাইতে বেশি শক্তিশালী ছিল গিলগামেশ, আর সব ধনীর ধন এক করলেও তার সমান হত না, তাই তাকে বলা হয় কিং অব হিরোজ…।

 

Comments