মুভি: Children Who Chase Lost Voices ( Hoshi o Ou Kodomo)
জনরা: অ্যাডভেঞ্চার, ফ্যান্টাসি
সাল: ২০১১
স্টুডিও: CoMix Wave Films
দৈর্ঘ্য: ১১৫ মিনিট
MAL রেটিং: ৭.৮
IMDB রেটিং: ৭.৩
মৃত্যুর পরের দুনিয়া নিয়ে আমাদের বরাবরই একটা নিষিদ্ধ আগ্রহ রয়েছে। ছোট বেলায় এই নিষিদ্ধ সত্য থেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য বাবা-মা আমাদের মানুষ মারা যাওয়ার পর তারা অথবা চাঁদে চলে যায় এধরণের গল্প শোনাতেন। বড় হওয়ার পর যখন এই ছেলেভুলানো কথার ভ্রান্ততা সম্পর্কে অবগত হই তখন আবার মৃত মানুষকে ইহধামে ফিরিয়ে আনার অনিয়ন্ত্রিত ফ্যান্টাসি মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। এই সারমর্মকেই কেন্দ্র করে রচিত হয়েছে Fullmetal Alchemist এর মত কালজয়ী এনিমে।
শিল্প-সাহিত্য-কল্পকথায় প্রিয় মানুষকে ফিরিয়ে আনার জন্য অনেকবারই মানুষের পাতালে যাওয়ার কথা বর্ণিত আছে। যেমন: সাপের দংশনে মারা যাওয়া স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনার জন্য অর্ফিয়ুসের পাতাল গমন এবং সন্তান জন্মদানের সময় পরলোকগামী হওয়া স্ত্রী ইজানামিকে ফিরিয়ে আনার জন্য দেবতা ইজানাগির পাতাল অভিযান। তো ডিরেক্টর মাকাতো শিনকাই সাহেব বরাবরই তার সিনেমাতে দুটো মানুষের দূরত্বকে আলোকপাত করেন। কিন্তু Children Who Chase Lost Voices এ তিনি সেই দূরত্বকে দুনিয়াবি সীমানা থেকে বের করে এনেছেন। অন্য সিনেমাগুলোতে তিনি মানুষের মধ্যে দূরত্বের মাধ্যম হিসেবে টেনে এনেছেন মহাকাশ, শারীরিক অসক্ষমতা, যোগাযোগব্যবস্থার অপ্রতুলতা, বয়স ও মানসিকতার পার্থক্য এবং খোদ টাইম ও স্পেসকে। কিন্তু এই মুভিতে শিনকাই সাহেব দুটো মানুষের মধ্যে দূরত্ব হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন ইহকাল ও পরকালের মধ্যের সীমাকে!
প্লট: কাহিনী আবর্তিত হয়েছে পনের বছর বয়সের বালিকা আসুনা ওয়াতাসেকে ঘিরে। অন্য অনেক এনিমে মুভির মত আসুনাও মফস্বল এলাকার মেয়ে। আসুনা পিতৃহীন, তার মাও নার্সিং পেশার কারণে মেয়েকে বেশি সময় দিতে পারেন না। স্কুল ছুটির পরের অবসর সময়গুলা আসুনা কাটায় পাহাড়ের গায়ে আবিষ্কৃত তার সিক্রেট প্লেসে। আসুনার বাবার উপহার দেওয়া একটা ক্রিস্টাল রেডিওর মাধ্যমে শুধুমাত্র ঐ হাইডআউটেই আসুনা একটি রহস্যময় সুর শুনতে পায়। একদিন স্কুল থেকে হাইডআউটে ফেরার সময় আসুনা এক ভয়ংকর জন্তুর আক্রমণের শিকার হয়। কিন্তু রহস্যময় এক কিশোর এসে ঘটনাক্রমে আসুনাকে ঐ জন্তুর হাত থেকে উদ্ধার করে। পরে ঐ কিশোর নিজেকে Shun নামে পরিচয় দেয় এবং জানায় যে সে Agartha নামক এক ভিনদেশ থেকে এসেছে। শুন আসুনাকে আশীর্বাদ করে এবং বলে যে তার ইচ্ছা যে, আসুনা যেন দীর্ঘদিন বেঁচে থাকে। শুনের অদ্ভুত আচরণে লজ্জিত আসুনা প্রতিশ্রুতি দেয় দেয় যে সে পরের দিন একই জায়গায় দেখা করবে শুনের সাথে। শুন তারার দিকে তাকিয়ে থাকে এবং পাহাড়ের ঢাল থেকে ঝাপ দেয়!
পরের দিন আসুনা তার মার কাছ থেকে জানতে পারে পাহাড়ি নদীর তীরে এক ছেলের মৃতদেহ পাওয়া গেছে। অবিশ্বাস আর দুশ্চিন্তাভরা চাহনি নিয়ে আসুনা স্কুলের দিকে রওয়ানা দেয়। ক্লাসে আসুনার নতুন শিক্ষক মিঃ মোরিসাকি পরকালের কিছু স্থানের নাম উল্লেখ করেন। সেই স্থানগুলোর নামের মধ্যে Agartha নাম দেখে আসুনা যারপরনাই অবাক হয় এবং ক্লাস ছুটির পরই মিঃ মোরিসাকির সাথে দেখা এই বিষয় নিয়ে আলাপ করার জন্য। আলাপ শেষে আসুনা পাহাড়ের হাইড আউটে গিয়ে আসুনা শুনকে আবিষ্কার করে আশ্বস্ত হয়। কিন্তু এই শুন আসুনাকে চিনতে পারে না এবং পূর্ব সম্পর্কের কথা অস্বীকার করে। তখনই সেখানে আক্রমণ করে একদল সশস্ত্র যোদ্ধা এবং তারা ধাওয়া করে আসুনা আর শুনকে। তারা পাহাড়ের তলদেশে লুকায় একপর্যায়ে আগার্থার প্রবেশপথে চলে আসে। শুন জানায় যে সে আগার্থার নাগরিক এবং আগার্থার মধ্যেই আছে Gate of death and life যার মধ্য দিয়ে মৃত মানুষকে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা যায়। কিন্তু দূর্ভাগ্যক্রমে সশস্ত্র দলের কমান্ডার আসুনাকে জিম্মি করে আগার্থার গেইট দিয়ে প্রবেশ করে। কে এই কমান্ডার? কিবা তার উদ্দেশ্য? সে কি শুধুমাত্র আগার্থার ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে নিজের সংস্থার শক্তিবৃদ্ধি করতে চায় নাকি তার অন্য কোন
লক্ষ্য আছে? আর আসুনারই বা কি হবে এই পাতাল জগতে!
এটি মাকাতো শিনকাইয়ের চতুর্থ মুভি এবং আমার দেখা তার বানানো মুভিগুলোর মধ্যে সর্বশেষ। শিনকাইয়ের বানানো ছয়টি মুভির মধ্যে এই মুভিটি যথেষ্ট স্বতন্ত্র। বরাবরের মত এই মুভির ভিজুয়ালও ঝকঝকে ছিল। তবে এই মুভির দৃশ্যগুলাতে কিছুটা জিবলি জিবলি ভাব রয়েছে। বিশেষ করে আগার্থার দৃশ্যগুলার অ্যানিমেশনে এক টুকরো জিবলিকে খুঁজে পেয়েছি। শিনকাইয়ের মুভিতে যেইরকম কিছু কমন দৃশ্যপট থাকে তা এই মুভিতেও রয়েছে। ফিনিস টেরার যে ছবিটা আপলোড করেছি সেটার সাথে কিমি নো নাওয়ার গোধূলিলগ্নের দৃশ্যের সম্পূর্ণ মিল পাওয়া যায়। এই মুভির ক্যারেকটার ডিজাইনও বরাবরের মত চকচকে তবে আসুনার ডিজাইনে জিবলির ছাপ আবারো খুঁজে পেলাম। খেয়াল করে দেখলাম When Marnie Was There(2014) এর Annar এর চেহারার সাথে আসুনার চেহারার ভাল মিল আছে। মুভির মিউজিক আগেরগুলার মতই ভাল ছিল। অন্য মুভিগুলোর মতই এই মুভির শেষেও ছিল একটি অসাধারণ থিম সং ‘Hello Goodbye & Hello’.
আর এই মুভির ঘটনাপ্রবাহ নিয়েও বলার কিছু আছে। মানে আমি কাহিনী কোনদিকে যাবে তা নিয়ে যে সিদ্ধান্তেই পৌছেছি, কাহিনী ঠিক তার উল্টোদিকে গড়িয়েছে। জায়গায় জায়গায় ধরা খেয়ে আমি শেষপর্যন্ত প্রিডিকশন করা ছেড়েই দিয়েছিলাম। কিছু জায়গায় এসে ঠাহর করতে পারছিলাম না যে এই মুভির এন্ডিং দেওয়া যাবে কী করে!
তাই এই মুভির এন্ডিং নিয়ে কিছু কথা বলা যেতে পারে। শিনকাইয়ের অনেক মুভিতে অস্পষ্ট এন্ডিং দেওয়া হয় এবং প্রধান চরিত্রগুলোর নিয়তি দর্শকদের উপরে ছেড়ে দেওয়া হয়। কিন্তু এই মুভিতে একটি সলিড এন্ডিং রয়েছে যা না হলে আমি কম খুশি হতাম না। মানে, সেন্সেইয়ের ইচ্ছা পূরণ হলেই আমি বেশি খুশি হতাম। কিন্তু কাহিনী অন্যদিকে চলে যাওয়ায় কিছুটা ক্ষুদ্ধই হয়েছি। তবে শেষে সেন্সেইয়ের উদ্দেশ্যে শিনের বলা কথাগুলো ভাল ছিল।
এই মুভিতে Shakana Vimana (রাবণের পুষ্পরথ) বা Quetzalcoatl (মেসোআমেরিকান/অ্যাজটেক দেবতা) এর মত কিছু পৌরাণিক টার্ম ব্যবহার করা হয়েছে। ব্যাপারটা ডিরেক্টর হিসেবে শিনকাইয়ের অগাথ জ্ঞানেরই পরিচয় দেয়। জিনিসগুলা একেবারেই অপরিচিত ছিল আমার কাছে তবে মুভিটা দেখার মাধ্যমে কিছু জিনিস জানারও সুযোগ হল।




