ট্যাঙ্ক, ললি এবং মোয়ে — Anirban Mukherjee

 

Girls & Panzer 1

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দুনিয়া কাঁপানো ট্যাঙ্ক , আর একবিংশ শতকের দুনিয়া কাঁপানো মোয়ে এবং ললি চরিত্রগুলোর সংমিশ্রণ একটাই,গার্লস উন্দ পানজার । এম ফোর শের্মান,পানজার ফোর বা পানজারক্যাম্পফাওগেন এইট মাউস এর মতো শক্তিশালী ট্যাঙ্ক গুলোর পাশাপাশি মিশো,সাউরি বা হানার মতো কাওয়ায়ি চরিত্রগুলো কল্পনা করতে হয়ত এতদিন বেমানান লাগতো , কিন্তু গার্লস উন্দ পানজারে নয়। এনিমখোরে যেহেতু রিভুর একটা ভালো রিভিউ আছে, সেজন্য সেদিকে না গিয়ে আমি এই লেখাতে ট্যাঙ্ক, ট্যাঙ্ক সম্পকে ব্যাবহৃত পরিভাষা এবং গার্লস উন্দ পানজারে ব্যাবহৃত ট্যাঙ্ক গুলোর বৈশিষ্ট্য এবং ইতিহাস সম্পকে আলোকপাত করবো।

Girls & Panzer 2

ইতিহাসের দিকে……….

যারা প্রেমেন্দ্র মিত্রের সৃষ্টি ঘনাদা চরিত্রের একনিষ্ঠ ভক্ত তাদের বলতে হবে না ট্যাঙ্ক কার প্রথম আবিষ্কার ।ঘনাদা তখন বনমালী নস্কর লেনের মেসবাড়ির মজলিশ ছেড়ে লেকের ধারে জমিয়ে বসেছেন ।এখানে তিনি আর ঘনাদা নন,বরং ঘনশ্যাম বাবু ।এবং তার গল্পের বিষয় তার “তস্য তস্য পূর্বপুরুষ”গন ।সেইরকম এক পূর্বপুরুষ ঘনরাম দাস ওরফে গানাদো , বাংলা সাহিত্যে ক্লাসিক প্রতিম “সূর্য কাঁদলে সোনা” উপন্যাসে ইনকা সভ্যতার আর রাজা আতাহুয়াল্পার পতনে যোগ দেওয়ার আগে ,একটা ছোট গল্প “দাস হলেন ঘনাদা”তে তার পরিচয় পায় ।সেখানে দেখি মায়ানদের খপ্পর থেকে বাঁচার জন্য স্পেনীয় অভিযাত্রী এবং টেনচটিটলান বিজয়ী এর্নান কোর্তেস গানদোর হাতে পায়ে ধরছে।আর গানদো তৈরি করল “মান্টা” ।”রথের মত মোটা তক্তায় তৈরি দোতলা সাঁজোয়া গাড়ি ।সে ঢাকা সাজোঁয়া গাড়ির তলাতেই বন্দুক নিয়ে থাকবে সৈনিকরা ।নিজেরা কাঠের দেওয়ালের আড়ালে তীর বল্লম আর ইট পাটকেলের ঘা বাঁচিয়ে নিরাপদে বন্দুক ছুড়তে পারবে শত্রুপক্ষের উপর ।” ঘনাদার দাবী এই মান্টাই হলো পৃথিবীর প্রথম ট্যাঙ্ক ,যার সাহায্যে এর্নান কোর্তেস আর তার সৈনিকরা ,মায়ার দ্বীপ-নগরী টেনটচটিটলান থেকে জানে-প্রানে বেঁচেছিলো ।
কিন্তু ঘনাদা মানেই গুল,একেবারে শিল্পসম্মত গুল ।তাই ফিকশনের দুনিয়া ছেড়ে আমাদের খোঁজ করতে হবে বাস্তবের দুনিয়াতে । পৃথিবীর প্রথম ট্যাঙ্কের কনসেপ্ট সেই এর্নান কোর্তেস এর মেক্সিকো বিজয়ের কয়েক দশক আগেই আসে ।ইতালিয়ান পলিম্যাথ এবং মোনা লিসা বা লা জকোন্দা খ্যাত লিওনার্দো দা ভিঞ্চির নোটবই এ পাওয়া যায় তাঁবু বা ছুঁচলো ইএফও মতো এর কাঠের তৈরি এক ধরনের বাহনের নকশা ,সেটাই নাকী আদি ট্যাঙ্কের কনসেপ্ট ।

Tank 1

[লিওনার্দো দা ভিঞ্চির “আদি” ট্যাঙ্ক কনসেপ্ট]

আবার সায়েন্স ফিকশনের দুনিয়াতে গেলে পাবো 1903 খ্রিস্টাব্দে এইচ .জি ওয়েলসের লেখা ছোটগল্প “দ্যা ল্যান্ড আইরন ক্লাদ্স ” ,যেখানে বর্ননা দেওয়া আছে এমন একধরনের লোহার তৈরি ক্যানন আর মেশিনগান যুক্ত বাহনের ,যেটা লোহা আর ইস্পাতের শক্ত বর্ম দ্বারা আচ্ছাদিত ।

Tank 2

[এইচ.জি ওয়েলস এর গল্প অনুযায়ী ট্যাঙ্ক কনসেপ্ট]

তবে পৃথিবীকে বেশিদিন অপেক্ষা করতে হলো না ,এর তেরো চোদ্দ বছর পর ,দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ব্রিটিশ মার্ক ওয়ান,টু ,থ্রি থেকে আরম্ভ করে টেন পযন্ত সিরিজের ট্যাঙ্কের লড়াই দেখলো পৃথিবী ।ব্রিটেনের শত্রু-মিত্র সবার কাছে ছিলো এই সিরিজের ট্যাঙ্ক । ব্রিটেনের কাছে ছিলো মার্ক ওয়ান থেকে টেন অবধি সব শ্রেণীর ট্যাঙ্ক , জার্মানের কাছে ছিলো মার্ক ফোর শ্রেণীর ট্যাঙ্ক , জাপানের কাছেও ছিলো মার্ক ফোর শ্রেণীর ট্যাঙ্ক ।তবে ফরাসি ট্যাঙ্ক রেনাউল্ট এফ টি হচ্ছে পৃথিবীর প্রথম মর্ডান ট্যাঙ্ক ।এটাই পৃথিবীর প্রথম ট্যাঙ্ক ,যার মাথায় একটা 360○ ঘূর্ণমান উঁচু গান টারেট ছিলো ,যেখান থেকে 37 মিমি শর্ট ব্যারেলের একটা ক্যানন বন্দুক শত্রুর ঢেরা ছিন্নভিন্ন করে দিতো । রেনাউল্ট একটা হাল্কা শ্রেণীর ট্যাঙ্ক হলেও এটা ব্রিটেনের মার্ক সিরিজের ট্যাঙ্কগুলো থেকে একটা জায়গায় এগিয়ে ছিলো ,উঁচু গান টারেট ।

Tank 3[ব্রিটিশ মার্ক ওয়ান]

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের জার্মান এ সেভেন ভি(A7V) সিরিজের ট্যাঙ্ক গুলো ছিলো একটা ছোটখাটো চলন্ত দূর্গ,এরও কোন উঁচু টারেট ছিলো না ।

Tank 4

[জার্মান এ সেভেন ভি, যেন একটা চলন্ত দূর্গ]

পরিভাষাসমূহ…….

1. ট্যাঙ্ক টারেট:-
টারেট বা গান টারেট হচ্ছে ট্যাঙ্কের প্রচন্ড প্রয়োজনীয় অংশ ।এই শব্দটার বাংলা অনুবাদ করলে পাবো চূড়া অথবা কামান রাখিবার ঘূর্ণিমান মঞ্চবিশেষ ।প্রধানত ট্যাঙ্কের উপরে যে উঁচু অংশটায় ট্যাঙ্কের প্রধান কামানটি থাকে তাকে ট্যাঙ্কের টারেট বলে,এটি 360○ ঘুরতে পারে,ফলে ট্যাঙ্কের গতিমুখের সমকোনে ঘুরে গোলা দাগতে সক্ষম হয় ।প্রথম যে ট্যাঙ্কে টারেট ব্যাবহৃত হয় সেটি ফ্রান্সের রেনাউল্ট এফ টি,সেটা আগেই বলেছি ।টারেট এর ওজনও ট্যাঙ্কের একটা গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর, যেমন আধুনিক কালের জার্মানের লেপার্ড টুএফোর (2A4) এর টারেটের ওজন 16 টন এবং আরও কিছু ফাংশান (বৈশিষ্ট্য )যোগ হওয়া লেপার্ড টুএসিক্স(2A6) এর ওজন 21 টন।

Tank 5

[পৃথিবীর প্রথম আধুনিক ট্যাঙ্ক ,ফ্রান্সের রেনাউল্ট]

টারেট একবার 360○ ঘুরতে যতটা সময় নেয় সেটাও যুদ্ধের ময়দানে গুরুত্বপূর্ণ ।যেমন জার্মান লেপার্ড টু সিরিজের সমস্ত ট্যাঙ্কের টারেট একবার পূর্ণ 360○ ঘুরতে সময় নেয় নয় সেকেন্ড।

2. ট্যাঙ্ক আর্মর বা ট্যাঙ্কের বর্ম:-
ট্যাঙ্কের বর্ম ,ট্যাঙ্ককে বিভিন্ন গুলি,বোম ,শেলের হাত থেকে রক্ষা করে ।বিভিন্ন ধরনের বর্ম আবিষ্কার হয়েছে ট্যাঙ্ককে রক্ষা করার জন্য ।যেমন স্লোপেড আর্মর ,রিয়াকটিভ আর্মর , সল্ট আর্মর ইত্যাদি ।গোটা ট্যাঙ্ক আর্মর কে দুভাগে ভাগ করতে পারি,হুল আর্মর এবং টারেট আর্মর ।

3. হুল আর্মর :-
টারেট বাদে অন্য কাঠামোর আর্মর বা বর্ম ।যেমন পানজার ফোরের সামনে আর্মর আশি মিলিমিটার মোটা,দুপাশে ত্রিশ এবং পেছনে কুড়ি মিলিমিটার মোটা ।

4. টারেট আর্মর :-
শুধু টারেটকে আলাদা ভাবে বাঁচানোর জন্য একটা বর্ম আঁটানো হয় ।পানজার ফোরে সামনের টারেট আর্মরটা 50 মিলিমিটার ঘনত্বের এবং পাশের এবং পেছনের আর্মরের ঘনত্ব ত্রিশ মিলিমিটার ।

পানজারের ট্যাঙ্কসমূহ………
ভূমিকাতে কিছু আলোচনা করে এবার মূল বিষয়ে ফিরি । গার্লস উন্দ পানজারের জগতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ট্যাঙ্কগুলো এখন খেলা এবং প্রতিযোগিতার বিষয় ।একসময়ের বিভিষকা, বর্তমান সময়ে রোমাঞ্চ এবং উত্তেজনার বিষয় । গার্লস উন্দ পানজারে মোট আট ধরনের ট্যাঙ্ক, প্রধানত দেখা পেয়েছি ।নামগুলো হলো জার্মানের পানজার ফোর, পানজারক্যাম্পফাওগেন এইট “মাউস”, পোর্সে টাইগার, স্তুগ ত্রি,জাপানের টাইপ এইটটি নাইনবি আই গো অতসু, টাইপ নাইনটিন সেভেন চি হা,আমেরিকার এম ফোর শের্মান, ফ্রান্সের রেনাউল্ট বি ওয়ান ।এছাড়া আছে আরও কিছু ট্যাঙ্ক, যেগুলো নিয়ে পরবর্তীতে আলোচনা হবে ।

1. পানজার ফোর:-
পানজার ফোর বা পানজারক্যাম্পফাওগেন ফোর হচ্ছে জার্মান মাঝারি শ্রেনির ট্যাঙ্ক, যেটা 1930 থেকে 1945 অবধি বানানো হয়েছিলো ।এইসময় প্রায় 8569 টা পানজার ফোর বানানো হয়।এর মোট দশটা ভারসন ছিলো ।পোল্যান্ড আক্রমণের সময় এবং ফ্রান্সের যুদ্ধের সময় এই ট্যাঙ্ক প্রচন্ড ব্যাবহৃত হয় ।পোল্যান্ড আক্রমণের সময় 211 টা পানজার ফোর ব্যাবহার করে জার্মানি ।সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে কুর্স্কের যুদ্ধে 841 টা পানজার ফোর হারায় জার্মান ।সব মিলিয়ে পূর্ব সীমান্তে দুহাজারের উপর পানজার ফোর হারায় জার্মান ।

Tank 6

[পানজার ফোর]

2. পানজারক্যাম্পফাওগেন এইট “মাউস”:-
পানজারক্যাম্পফাওগেন এইট মাউস হচ্ছে জার্মানির “সুপার হেভি ট্রাঙ্ক” ।অনেকে একে এখনও পযন্ত সবচেয়ে ভারী “আর্মর ফাইটিং ভেহিকলস” বলে ।কিন্তু এর মাত্র দুটো প্রোটোটাইপ তৈরি হয়েছিলো(v1 আর v2)।188 টন ওজন নিয়ে সবচেয়ে বেশি কুড়ি কিলোমিটার গতিবেগে যেতে পারতো,গড়ে তেরো থেকে আঠরো কিলোমিটার ।এর আর্মরের ঘনত্বও ছিলো প্রচণ্ড ।হুল আর্মর আর টারেট আর্মরের সামনের দিকে ঘনত্ব ছিলো 220 মিলিমিটার ।

Tank 7

[অতিকায় “মাউস”]

3. পোর্সে টাইগার:-
আর একটা হেবি ট্যাঙ্ক যেটা জার্মানরা প্রোটোটাইপ অবধিই সীমাবদ্ধ রেখেছিলো সেটা হলো পোর্সে টাইগার ।এর সামনের হুল আর্মর আর টারেট আর্মর এর ঘনত্ব একশ মিলিমিটার ।

Tank 8

[অতিকায় “টাইগার”]

4. স্তুগ ত্রি:-
জার্মানের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সবচেয়ে বেশি বানানো ট্যাঙ্ক হচ্ছে স্তুগ ত্রি ।এগারো হাজারের উপর বানানো হয় ।দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ছাড়াও ইজরায়েল আর মিশরের মধ্যে 1964 এ সংগঠিত ছয় দিনের যুদ্ধেও এটা ব্যাবহৃত হয় ।নাজি জার্মান ছাড়াও বুলগেরিয়া,কিংডম অফ রোমানিয়া, কিংডম অফ বুলগেরিয়া ,ফিনল্যান্ড,ইটালি,সিরিয়া ব্যাবহার করে ।সোভিয়েত এটা টেস্টিং এর জন্য ব্যাবহার করে ।এর এগারোটা ভারসন বানানো হয় ।যেহেতু এটা একটা ট্যাঙ্ক ডেসট্রয়ার ,সেজন্য এখানে টারেট ব্যাবহৃত হয়নি ,সেজন্য এটা ট্যাঙ্ক কম ,বড় আর্টিলারী বন্দুক বেশি মনে হয়।

Tank 9

[স্তুগ থ্রি]

5. টাইপ এইটটি নাইন বি আই গো অতসু:-
জাপান এই ট্যাঙ্কটা ডিজাইন করেছিলো 1928 এ ।এটা দ্বিতীয় সিনো জাপান যুদ্ধে চীনের বিরুদ্ধে এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্যাবহৃত হয় ।এর দুটো ভারসন ছিলো ।

Tank 10

 

[টাইপ এটটি নাইন]

6. টাইপ নাইনটি সেভেন চি হা:-
এই ট্যাঙ্কটা ছিলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের জাপানের সবচেয়ে বেশি উৎপাদিত ট্যাঙ্ক ।একটা মেন গান ছাড়াও দুটো মেশিনগান থাকতো ।1162 টা ট্যাঙ্ক প্রস্তুত করা হয় মোট ।

Tank 11

 

[টাইপ নাইনটি সেভেন]

এম ফোর শের্মান :-
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মিত্রপক্ষের অন্যতম সেরা বাজি ছিলো এম ফোর শের্মান ।আসলে এটি পূর্বতন এম থ্রি লি এর উন্নত সংস্করন।এম থ্রি লি এর মাথার উপর একটা রোটিং টারেট বসিয়ে এবং সেখানে আরও উন্নত এম থ্রিফোর এ ওয়ান ক্যানন গান চরিয়ে তৈরি করা হয় এম ফোর শের্মান ।শুধু আমেরিকা নয়,ব্রিটিশরাও এই ট্যাঙ্ক ব্যাবহার করেছে ।তারা চাইছিলো শের্মান এর মত আমেরিকান ট্যাঙ্কের উপর ব্রিটিশ ট্যাঙ্ক গান বসাতে ।তো তৈরি হয়ে গেল এম ফোর শের্মান ফায়ার ফ্লাই ।এই ট্যাঙ্কের সবচেয়ে বিখ্যাত বৈশিষ্ট্যটি হচ্ছে, বিভিন্ন সময়ে এর ব্যাবহারকারী পরস্পরের শত্রু মিত্র দেশ ।যেমন দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর জাপান,ইতালি,বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটেন,কানাডা,ফ্রান্স এমনকী নাজি জার্মান ।এছাড়া বাংলাদেশ,ভারত,পাকিস্তান, ইরাক,ইরান,ইজরায়েল, লেবানন,ভিয়েতনাম ।দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ছাড়াও এই ট্যাঙ্ক লড়েছে 1965 এর ভারত পাকিস্তানের যুদ্ধে,1971 এ বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ এবং পশ্চিম ফ্রন্টে ভারত পাকিস্তানের যুদ্ধে ,ইজরায়েল এর সিক্স ডে ওয়ার বা বিখ্যাত ছদিনের যুদ্ধে,ইরান-ইরাক যুদ্ধে,কিউবান বিপ্লবে, সুয়েজ ক্যানেল ক্রাইসিসে ।

ইনফ্রানটি ট্যাঙ্ক মার্ক থ্রি মাটিলডা:-
সাধারনত ইনফ্রানটি বাহিনীর সহায়ক হিসাবে এই ট্যাঙ্ক তৈরি করে ব্রিটিশরা ।এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রথম দিকে জার্মান ট্যাঙ্ক যেমন পানজার থ্রির বিরুদ্ধে ভালো পারফর্ম করেছিল ।এর এর 78 মিলিমিটার ঘনত্বের সামনের হুল আর্মর আর 75 মিলিমিটার ঘনত্বের টারেট আর্মর খুব মজবুত হলেও এটি কাছের টার্গেটের বিরুদ্ধে ভালো পারফর্ম করতে পারতো না ।এর আর একটি নাম ছিলো,কুইন অফ ডেজার্ট বা মরুভূমির রানি ।প্রধানত 1940-41 এ আফ্রিকার অপারেশন এ ইটালিয়ান ট্যাঙ্কের বিরুদ্ধে ভালো পারফর্মের জন্য ।

টি চৌত্রিশ /টি থারট্রি ফোর/T-34:-
শুধু সোভিয়েত রাশিয়া নয়,দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সবচেয়ে বেশি যে ট্যাঙ্ক তৈরি করা হয়েছিলো ।এই ট্যাঙ্কের মহিমা বহু কথাতেও শেষ করা যাবে না ।1930 সালে ডিজাইন করা এই ট্যাঙ্কটা আজও বহু দেশের আর্মিতে ব্যাবহার হয় ।টি সিরিজের অন্য ট্যাঙ্ক যেমন টি -62,টি-72 এবং টি-90 এর দিশারী ছিল এই টি-34 ট্যাঙ্ক ।সম্ভবত এখনও অবধি সবচেয়ে বেশি তৈরি করা ট্যাঙ্ক এই টি-34 ,এমনকী হালে 1996 অবধি এই ট্যাঙ্ক উৎপাদন করা হয়েছে ।তৈরি হয়েছে বহু ভারসন,উৎপাদন করা হয়েছে আশি হাজারেরও বেশি ।তখনকার দিনে তৈরি হলেও অনেক বিষয়ে এগিয়ে ছিলো এই ট্যাঙ্ক, এর আর্মর ছিলো প্রচণ্ড মজবুত ,পশ্চিম সীমান্তে নাৎসিদের সম্পূন ভাবে রুখে দিয়েছিলো এই ট্যাঙ্ক।নাৎসিদের বিভীষকা স্বরুপ এই ট্যাঙ্ক ব্যাবহার করেছে নাৎসি এবং ইটালিরাই ।এছাড়া অস্ট্রিয়া,বসনিয়া, লাউস,কিউবা,তৎালীন ইস্ট জার্মানি, লিবিয়া,পাকিস্তান, উত্তর কোরিয়া,গনচীন,প্যালেস্তাইন ।

এম থ্রি লি:-
পানজার সিরিজে যে কিউট পিঙক কালারের ট্যাঙ্ক টা ছিলো,যেটা দেখতে অনেকটা শের্মান এর মত ,সেটাই এম থ্রি লি ।আসলে একেই উন্নত করে তৈরি করাহয় শের্মান ।এটি কর্নেল রবার্ট. ই. লি এর সম্মানে নাম দেওয়া হয় ।ব্রিটিশরা এর নাম দেয় ইউনিয়ন জেনারেল এবং আঠোরো তম আমেরিকান রাষ্ট্রপতি ইউলিসিস গ্রান্টের নামে,এম থ্রি গ্রান্ট ।

তথ্যসূত্র :- পানজারউইকি,ট্যাঙ্কগুরু

ভিডিও গার্ল আই :গান আর নব্বই দশকের রঙিন স্বপ্ন — Anirban Mukherjee

Video Girl Ai 1

শুরুর কথা……..

আমি কিছুদিন ধরেই বিভিন্ন দোচালাতে ভুগছি ।প্রথমে ভাবলাম একটা সেগমেন্ট নামাই,ফ্রেঞ্চ নিউওয়েভের বিভিন্ন টেকনিকের সঙ্গে আনিমের মিল সম্পকে ।কিছু গদার ,ত্রুফো,শাব্রল,রিভেট, রোমার আচ্ছাশে রিওয়াচও দিলাম ।তারপর একটা ভোরে লিখতে আরম্ভ করলাম সেগমেন্টের প্রথম পর্ব, কিছুটা লেখার পরই বুঝলাম সিনেমা দেখা আর সিনেমা বোঝার মধ্যে কী দুঃসহ পার্থক্য ! তো,তখনকার মতো লেখা শেষ ।
এরপর বিকেলে একটা পুরোনো সেগমেন্টের পরিকল্পনা করতে করতে চা নিয়ে বসলাম ,মাসখানেক আগে দেখা নব্বই দশকের ওএভিগুলোর কথা মনে পড়ছে,নব্বই দশক যেহেতু বেশ ভালোই লাগে ( নষ্টালজিক টাইপের আরকি) ,তখনই ভিডিও গান আই এর কথা মনে পড়ল ।(খুব তারাতারিই নব্বই দশকের ওএভি নিয়ে একটা সেগমেন্ট নামাবো )।এই ভিডিও গার্ল আই নিয়েই আজকে আমার আলোচনা ।

Video Girl Ai 2
প্রথমে ,আপনি গান কেন শোনেন ? কিছু সুন্দর শব্দ এবং কিছু ভাষার অর্থ আপনার কর্ণকুহর হয়ে মস্তিকে প্রবেশ করে আপনাকে আবেশ করে রাখে(আর আমার মতে আবেশ করে রাখাই যেকোনো আর্টের মূল বৈশিষ্ট্য ),সেখানে গানের লেখক এবং গায়ক- গায়িকার উভয় সমান অবদান থাকে ।কিন্তু ইংরেজি ছাড়া বিদেশি গানের ক্ষেত্রে জিনিসটা আলাদা হয় ।যারা নিয়মিত জে পপ,কে পপ বা স্প্যানিশ পপ গান নিয়মিত শোনেন তারা বিষয়টি আরো ভালো বুঝবে ।প্রথমে গানের সুরে আবেশ থাকা ,তারপর লিরিকের অর্থ উদ্ধার করে আর একবার গানের গভীরে প্রবেশ করা ।গান আপনাকে নষ্টালজিক করে দিতে পারে ,বিশেষ করে পুরোন দিনে যে গানটা আপনার শুনে প্রচণ্ড পছন্দ হয়েছিলো ,বহুবছর পরে আবার শুনলেন ,নতুন করে আবিষ্কার করলেন ।যেমন কদিন আগে একটা সূত্রে পেয়ে গেলাম 2002 এর “লেস কেচাপের” বিখ্যাত স্প্যানিশ পপ দ্যা কেচাপ সং।শূন্য দশকের প্রথম দিকে বিখ্যাত হওয়া এই গানটা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম ।আবিষ্কার করলাম নতুন ভাবে ।
কিন্তু কিছু গান হয়ত কোন দিনও শোনেননি , কিন্তু ব্যাকগ্রাউন্ড এনিমেশনের আর সুরের জন্য নব্বই দশকের প্রতি নষ্টালজিক করে তুললো ।সেই গ্রানজ পোষাক,এমটিভি,মম জিনস,জ্যিন সুট আর নীল -কমলার এক আশ্চর্য দুনিয়া।ভিডিও গার্ল আই তে এইরকমই কিছু গানের সন্ধান পেয়ে এই সিরিজটার প্রতি আমার আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দিলো ।

Video Girl Ai 3

গল্পের আরম্ভ…..

আমাদের গল্পের “বেচারা” নায়ক ইয়োটা প্রচণ্ড ভালোবাসে তারই স্কুলমেট মোয়েমি কে , কিন্তু মোয়েমির নজর অন্যদিকে ,তাকাশি,স্কুলের “টল , ডার্ক,হ্যান্ডস্যাম পপুলার গাই” ।কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার ,তারা তিনজনেই প্রচণ্ড ভালো বন্ধু, তাকাশি ইয়োটাকে নিজের ছোট ভাইয়ের মতো দেখে ।অন্যদিকে তাদের অজান্তেই তিনজনের মধ্যে ত্রিভুজ প্রেমের সম্পক তৈরি হচ্ছে ।
ওভিএর প্রথমে দেখব ইয়োটা যেনে যায় মোয়েমির আগ্রহ তাকাশির প্রতি,তার প্রিয় বন্ধু ।সেইদিনই ইয়োটা সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার পথে একটা রহস্যময় ভিডিও শপ দেখে,যেটা আগে কখনও সেখানে ছিলো ছিল না ।সেই ভিডিও শপের একটা বৈশিষ্ট্য হচ্ছে “ভিডিও গার্ল” ভিডিও টেপ ।যে কোন একটা ভিডিও টেপ থেকে একটা মেয়ে বেরিয়ে আসবে,যখন সেই ভিডিও টেপটা চালানো হবে ।”এ আবার হয় নাকি” এই ধরনের মনোভাব নিয়ে ইয়োটা ভাড়া নিয়েই ফেলল একটা ভিডিও ।সেদিন রাতেই তার ভিডিও রেকর্ডারে চালালো ভিডিওটা ,এবং যথারীতি ঘর কাঁপিয়ে বেরিয়ে এল “আই আমানো “।যে ইয়োটার দূঃখের সময়ে সঙ্গী হবে,তাকে চিয়ার করবে এবং “অন্যান্য”।
কিন্তু ইয়োটার ভিডিও রেকর্ডার ভাঙা থাকার কারনে আই এর মধ্যে চলে এলো “অনুভূতি “।ফলে সে আর চিয়ার ডল না থেকে পরিনত হলো ইয়োটার অন্যতম বন্ধু, পরামর্শদাতা এবং পরবর্তীতে প্রেয়সী ।

Video Girl Ai 4
জাতে কমেডি এবং ইচি হলেও এখানে আইএর মাধ্যমে ইয়োটার মধ্যে নারী সম্পকে অনেক ধারনার পরিবর্তন আসে ।বিশেষ করে মেয়ে মাত্রই কিছু বিশেষ অঙ্গসর্বস্ব পুতুল বা বস্তু নয়,এই ধরনের বার্তাই মাঙ্গাকার এবং ওভিএ পরিচালক দিতে চেয়েছেন ।
তবুও এই ওভিএর শেষ এপিসোড অতটা ভালো লাগেনি আমার।
কিন্তু কনসেপ্টটা ভালো লেগেছে। আই একজন এনার্জি বিইং ,আমাদের পদার্থগত অস্তিতের বিপরীতে ।
ওভিএতে টার্মেনটর টু সিনেমার একটা একটা ইস্টার এগ আছে,আগ্রহী দর্শকরা খুঁজে বার করতে পারেন ।সিনেমাটাও মুক্তি পেয়েছিলো 1991 এ ।

Video Girl Ai 5

এবং গানের কথা ও নব্বই এর স্বপ্ন…..

1992 সালে প্রচারিত এই ছয় পার্ট ওভিএর মধ্যে এর অন্যতম প্রধান সম্পদ হলো দুটো ওপেনিং এন্ডিং সং আর আটটা অন্যান্য গান ।ওপেনিং সং “উরেশি নামেদা” শুরু হয়েছে গ্রীষ্মের এক ছটফটে রঙীন দিন রাত্রের মধ্যে ,নব্বই এর চিহ্ন এখানে সব জায়গায়, তার মধ্যে আই নিজের পৃথিবীকে উপভোগ করছে ।এন্ডিং সং “আনো হি নি” বা “টু দ্যাট ডে” একটা বিগত দিনের নষ্টালজিয়ার স্বাদ নিয়ে আসে ।একদিকে একটা জানালার ছায়ার সামনে চার বন্ধু (আই সমেত)র “জীবন্ত”ফ্রেমে বাধানো ছবি আর তার চারপাশে কখনও গ্রীষ্ম বা বসন্তের লাল -হলুদ পাতাঝড়ার ছবি বা কখনও রাতের নীল বা গাঢ় নীল আবরন ।একেবারে মানানসই ব্যাকগ্রাউন্ড আর্ট।একেবারে শেষ এপিসোডে এন্ডিং ভিডিওটা পাল্টাবে আর দর্শকদের মনে একটা প্রশ্ন রেখে যাবে ।
অথবা ম্যাসেজ গানটা, ইয়োটার আর মোয়েমির বিমর্ষ নীল রাত্রের সঙ্গী হতে পারি আমরাও ,যেখানে আই শেষে ইয়োটাকে ভরসা দেবে ।ব্যাকগ্রাউন্ড অসাধারণ, একটা ক্যান পর্দার মধ্যে থেকে বেরিয়ে হাওয়ার তোরে দূরে চলে যাচ্ছে বা ছোট হিরের মত উজ্জ্বল শহর চীরে চলে যাচ্ছে ট্রেন এবং সেই সঙ্গে মোয়েমির হলুদ ঘরের বিমর্ষতা খুবই ক্যাচি ।প্রধানত সুন্দর গানের সঙ্গে সুন্দর ব্যাকগ্রাউন্ডের আধিক্য দেওয়ার জন্যই আমার এখানে ডিরেক্টর মিজুহো নিশিকুবোকে মাপ করা যায়,শেষ এপিসোড দুটো যতই খারাপ হোক না কেন ।হয়ত অন্যদের খারাপ নাও লাগতে পারে বা আমারই মত পরে বদলে যেতে পারে ।
মাঙ্গা পড়েও ভালো লাগবে ,বিশেষত এর ড্রয়িং গুলোর জন্য।

Video Girl Ai 6

নাইনটিন 19 — Anirban Mukherjee

“নাইনটিন 19”

রিভিউ নয়,সামান্য আলোচনা….

আশির বা নব্বই এর দশকগুলোতে আনিমের ওভিএ এর সবচেয়ে উন্নতি হয়েছিলো এটা মোটামুটি সবাই জানে। এই দশক গুলোতে হোমভিডিও টেকনোলজির প্রচুর উন্নতিই এটাকে সম্ভব করেছিলো ।1978 এ লেজার ডিস্কের বাজারজাতকরন অথবা তারও পরে 1995 এর ডিভিডির আবিষ্কার , ওভিএ বুমের জন্ম দিয়েছিলো ।সাধারনত একটা সিএলভি লেজার ডিস্কে ষাঠ মিনিট আর একটা সিএভি লেজার ডিস্কে ত্রিশ মিনিটের ভিডিও ধরত (কিছু লেজার ডিস্ক আমার কালেকশনে ছিলো)।সেজন্যই সম্ভবত আশির দশকের শেষ আর নব্বই দশকের শুরুতে ওভিএগুলো চল্লিশ থেকে ষাঠ মিনিটেই সীমাবদ্ধ থাকতো, এখনও রীতিটা কিছুটা থেকে গেছে ।সাধারনত এইসময় আনিমের দর্শক পাল্টায় ,যেটা আগে সাধারনত ছোটদের এবং কিশোর কিশোরীদের মাধ্যম ছিলো সেটাতে এবার বড়রাও চোখ রাখতে শুরু করে ।সেইসময় অফিসফেরত রাতে কোন লেজার ডিস্ক ভাড়া করে চল্লিশ মিনিটের একটা ওভিএ দেখার লোকের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছিলো ।সেই সঙ্গে তাদের রুচির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বিভিন্ন ম্যাচুয়র সাবজেক্ট দিয়ে ওভিএ বানানোও চলছিলো।
এই আশির দশকের শেষ আর নব্বই দশকের শুরুর দিকে কিছু ওভিএ আশির হলিউড পপুলার সিনেমা, সোপ ওপেরা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তৈরি হয়,যেগুলোর আর্ট কোয়ালিটি এবং সেই সঙ্গে নতুন নতুন এনিমেশন আর গল্প বলার পদ্ধতির জুরি আজও তৈরি হয়নি ।সেইরকম একটা ওভিএ সঙ্গে পরিচিত হবো,এর ব্লু রে ভারসন বেরিয়েছে কীনা জানি না ,তবে বার না করাটা অন্যায় ।ওভিএ এর বিষয়বস্তু আলাদা হলেও স্টাইলটা ওয়াঙ-কার-উই এর মাস্টারপিস চ্যাঙকিং এক্সপ্রেসের সমতুল্য লেগেছে।

উনিশ বছরের “ভার্জিন”……..

Nineteen 1

ডিরেক্টর কোইচি চিগিরার (ভেনাস ওয়ার,টোকিও ব্যাবিলন) করা নাইনটিনের সমতুল্য কিছু এখন আছে কিনা জানি না,বিশেষ করে এখন মোয়ে আর হারেম শাসিত আনিমে জগতে ,যেখানে গল্প অথবা এনিমেশন বা ম্যাচুয়ারিটিকে অতিক্রম করে কিউটনেস ,আর তাই দেখে আনিমে ফ্যানরা ওয়াইফু খুঁজে রাতে পাশবালিশের মাজা ভাঙে ।
প্রথমেই বলা দরকার এটা রোমান্টিক জঁরের কাজ,স্কুলবয়- গার্ল টাইপের নয়,বরং এখানকার মূল চরিত্র কোবুটা ,স্কুল থেকে অনেক আগেই গ্রাজুয়েট হওয়া একজন তরুন,বয়স উনিশ ,একটা রেস্টোরেন্টে কাজ করে ।বয়স উনিশ হলেও সে এখনও কোন মেয়ের সঙ্গে সিরিয়াস রিলেশনে জড়ায়নি(সবাই ধরে নিয়েছে বেচারা ভার্জিন) ।সেটা নিয়ে তার যতটা চিন্তা ,তার চেয়েও তার দুই বন্ধু আর বসের চিন্তা আরও বেশি ।বন্ধুরা কোবুটার জন্য বান্ধবী ধরার চেষ্টা চালায় , কিন্তু বেচারা কোথাও পাত্তা পায় না ।একসময় একটা বারে দেখা পায় তার পুরোনো জুনিয়র স্কুলের বান্ধবী মাসানার সঙ্গে ,যে এখন একজন উঠতি মডেল ,সদ্য এসেছে টোকিওতে ।কোবুতা এবার তার সঙ্গে একটা রিলেশন তৈরির চেষ্টা করে,সফলও হয় ।প্রথমে হোটেলের রাত ,তারপর মাসানার ফ্লাট..রিলেশনটা অনেক দুর গড়ালেও মাসানার ফ্লার্টে এ তার প্রাক্তন বয়ফ্রেনডের সঙ্গে কোবুতার ছোট হাতাহাতি টাইপের ঘটনা গল্পটা অন্যদিকে মোড় নেয়,এরপর আর পাঁচ মিনিট বাকী থাকতে ওভিএটা শেষ হয়ে যায় ।ফলে গল্পের পরিনতিটা দর্শককে একটু চিন্তা এবং কল্পনা করে নিতে হবে ।ফলে ওভিএটা দর্শকের প্রথম থেকে মনোযোগ অবশ্যই দাবী করে।

এবং রাতের টোকিওর লাল নীল আলো আর গান……

এই ওভিএ এর সবচেয়ে বড়ো সম্পদ এর এনিমেশন পরিচালনা আর সাউন্ডট্রাক ।এনিমেশন এর মধ্যে 2:13-15 মিনিটে কোবুটার এক্সপ্রেশন,2:22 মিনিটে আরম্ভদৃশ্য,3:28 এ কোবুটার কল্পনা,4:44 মিনিটে পাবের ভেতরে আলো আর নাচের দৃশ্য ,সঙ্গে অবশ্যই সাউন্ডট্রাক,16:00 মিনিটে কুবোটা আর মাসানার দেখা , 26:37 মিনিটে সী বিচের দৃশ্য,29:27 মিনিটে এ ভোরের শহরের দৃশ্য,21:42 এবং 22:20 মিনিটে মাসানার এক্সপ্রেশন ,37:20 মিনিটে রাতে চেরি ব্লসমের গোলাপি বৃষ্টি …এইরকম ভাবে আপনিও অনেক নতুন দৃশ্য খুঁজতে পারবেন ।
রঙের ব্যাবহার,পরিচালকের দেখার এবং দেখানোর দৃষ্টিকোন অবশ্যই প্রশংসাযোগ্য ।রঙের ব্যাবহার কে আরও ভালোভাবে উপলব্ধি করা যাবে এর একটা ব্লু রে ট্রিটমেন্টের পর ।তবে সেটা সময়ের অপেক্ষা ।

Nineteen 2

xxxHOLIC [রিভিউ] — Anirban Mukherjee

এক্স এক্স এক্স হোলিক-জাপানের অতিপ্রাকৃতিক জগতের অন্দরমহলে
আনিমে সিরিজের পরিচালক:- ত্সুতমু মিজুশিমা ।
সিরিজের গল্প লিখেছেন:- নানাসে ওকাওয়া এবংমিচিকো ইয়োকোতে(টিম ক্লাম্পের সদস্য)।
এপিসোড সংখ্যা:- 24 টি।

xxxHOLIC 1

জাপানে “ইয়োকাই” শব্দটির অর্থ বাংলায় আত্মা এবং বা ইংরেজিতে স্পিরিট খুব কাছাকাছি। “আয়াকাশি” হলো এমন এক ধরনের “ইয়োকাই” যারা জলে বা জলের উপরে অবস্থান করে।
হয়ত কোন সকালে পথে হাঁটতে হাঁটতে দেখছেন ,কেউ আপনার সামনে দিয়ে কোনো কারন ছাড়াই চিৎকার করতে করতে দৌড়ে পালাচ্ছে, যেন কেউ বা কারা তাকে তাড়া করেছে–( “ছেড়ে দে -আমি বলছি, ছেড়ে দে,আমি কী কোন হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালা ?” ইত্যাদি ইত্যাদি) এবং কোন কারন ছাড়াই ছুটতে ছুটতে রাস্তাতে পড়ে কাতরাতে লাগল,গড়াগড়ি খেতে লাগল ,যেন তার উপরে কোন জগদ্দল বোঝা চেপে আছে এবং সে বোঝা থেকে পরিত্রাণ পেতে চাইছে।স্বাভাবিক ভাবেই আপনি তাকে কোন পাগল -ছাগল- স্কিজোফ্রেনিক বলে পাশ কাটাবেন ।সত্যিই তো ,এমন কত পাগল আমাদের চারপাশে,হাওয়ার সঙ্গে কথা বলে ,হাওয়ায় বিনুনি কাটে আঙুল দিয়ে ।কিন্তু এই কেসটা সেরকম নয়,ইনি হচ্ছেন আমাদের কাহিনীর “বেচারা” নায়ক কিমিহিরো ওয়াতানুকি, সেইরকম বিরল মানুষের একজন যে শুধু নিয়মিত ইয়োকাই বা আয়াকাশি দেখতে পায় না ,বরং সেগুলো তার জীবনকে জ্বালিয়ে ছাড়ছে ।যেখানে যাচ্ছে ,জেলির মতো বিশাল বড় উদ্ভট আকৃতির ইয়োকাইগুলো তার পিছু ছাড়ে না ।তো সেদিনও সেই কাহিনীর রিপিট হচ্ছে, বেচারা ওয়াতানুকি দৌড়াচ্ছে, পেছনে সেই ইয়োকাইগুলো দৌড়াচ্ছে ,একসময় তার উপর চেপে বসল ইয়োকাইগুলো,বেচারা ওয়াতানুকি মাটিতে শুয়ে গড়াগড়ি খাচ্ছে ,মাটিতে হাত ঠুকছে ।মাটিতে হাত ঠুকতে ঠুকতে তার হাতটা গেয়ে পড়ল একটা বড় কাঠের প্রাচীরের গায়ে ।ব্যাস,সঙ্গে সঙ্গে জেলির মত আকৃতিহীন ইয়োকাইগুলও ভ্যানিশ !!মাঝ রাস্তা থেকে সে কীভাবে এখানে টপকে পড়ল ?
ওয়াতানুকি তো অবাক ।

xxxHOLIC 2
হাত ঝেড়ে ওঠে সে দেখল ,একটা বড় উদ্ভট ডিজাইনের বাড়ির সামনে সে দাঁড়িয়ে ।বাড়িটার ডিজাইন না ইউরোপীয়ান ,না জাপানি কায়দায় ,আবার বাড়ির দুটো ছাদে অর্ধগোলাকৃতি
চাঁদের প্রতীক ।ওয়াতানুকি সদর্পনে একটু উঁকি দিতেই দেখল বাড়িটা তাকে চুম্বকের মত টানছে ,প্রচণ্ড টান ,সত্যিই টান।এমন সময় বাড়ির সদর দরজা খুললো এবং দুজন অদ্ভুত হেয়ারস্টাইলের ছোট মেয়ে বেড়িয়ে এল,বয়স হবে হয়ত বারোর কাছাকাছি ,একজনার বিশাল গোটানো চুল মাটি ছুঁয়েছে , আর একজনের ছোট গোলাপি কালারের চুল কাঁধ ছাড়ায়নি ।তারা ওয়াতানুকিকে ওয়েলকাম করল ,এটা একটা কোনও দোকান !!
সেই রহস্যময় মেয়েদুটো ওয়াতানুকিকে টানতে টানতে বাড়ির ভেতরে নিয়ে গেল । তারা বিশাল সৌজি দরজাটা খুললো এবং ওয়াতানুকি ওপার থেকে একরাশ ধোঁয়া ছাড়িয়ে একটা বড় কেদারার উপর ধূমপানরত ,লাল কিমোনো পড়া ইউকো সানের দেখা পেলো ।সে তার জন্যই অপেক্ষা করছিলো

xxxHOLIC 3

এবার ইউকোর পরিচয় কীভাবে দি ? পুরোনো বঙ্গিম-কালীদাস মার্কা বাংলাতে বললে “বৃহৎবক্ষা-ক্ষীনকটি-গুরু নিতম্ব” ইত্যাদি ইত্যাদি অথবা আমার চলিত চিন্তাতে বললে ইউকো একজন কঠিন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মেয়ে ,যে আবার সময়ে সময়ে মেজাজের দিক থেকে ছোট বাচ্চাদের মত হয়ে যায় । চেন -স্মোকার পর্যায়ে ,পান করে প্রচুর,ওয়াতানুকিকে খাটিয়ে মারে কিন্তু গোটা সিরিজের একাংশে তার অন্যতম সেরা বন্ধু,পোশাক,খাবার এবং স্টাইল সচেতন ,নিজের জীবনটা ভালোভাবে উপভোগ করে,স্বাধীন । আবার এই ইউকোই তার ম্যাজিকের দোকানের কাস্টমারদের সামনে হয়ে যায় নম্র,বিনয়ী এবং নিজের রহস্যপূর্ণ দিকটা কাস্টমারের সামনে রেখে তাদের সমস্যার সমাধান যথাসম্ভবভাবে করে ।ইউকো ডাইমেনশন ভাঙার ক্ষমতা রাখে ,সেজন্য হোলিক সিরিজ ছাড়াও ৎসুবাসা সিরিজেও তার দেখা মেলে ।ইউকো কিন্তু অনেক দিন আগেই মারা গেছে ,ৎসুবাসা ইউনিভার্সের এক যাদুকর ইউকোর নিজস্ব বাস্তবতার টাইম জোনকে থামিয়ে দিয়েছে,সেজন্য সে হোলিক দুনিয়ায় বেঁচে আছে ।যদিও শেষ অবধি সে আর থাকবে না ,যাকে ম্যাজিকের ভাষাতে বলে ভ্যানিশ ।মৃত্যু ।

টিম ক্লাম্প ইউকোকে বানানোর পর মনে করেছিলো সেই হবে সিরিজের প্রধান চরিত্র ।তারপর মনে করে ,আরও একটা চরিত্র তৈরি করা যাক ,যে ইউকোর মতই আত্মা,দেবতা,অতিপ্রাকৃতিক জিনিস দেখতে পারে ।তো ,সেইমত তৈরি হলো ওয়াতানুকি ।ইউকো আর ওয়াতানুকির মধ্যে সম্পকটা অনেকটা ডোরিমনের ডোরিমন-নোবিতার সম্পকের মত ।যদিও ডোরিমন ছোটদের জন্য বানানো ।
ওয়াতানুকি ,অনেকটা সেইরকম চরিত্রের ,যে নিজের ইমোশনকে নিজের মনের মধ্যে বেঁধে রাখে না,বাইরে প্রকাশ করে দেয় ।আর তার ইমোশনকে প্রকাশ করে বিভিন্ন উদ্ভটভাবে হাত পা শরীর নাড়ানোর মাধ্যমে, জোরে কথা বলে ।যাতে ওয়াতানুকিকে হাস্যকর লাগে ।কিন্তু ওয়াতানুকির সহজাত বুদ্ধির দিকটা ঝলসে ওঠে কোন চরম বিপদের সময় ..আবার প্রচণ্ড কৌতুহলী মন,তার চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ।

xxxHOLIC 4
হিমাওয়ারি, যার বাংলা অর্থ হবে সূর্যমুখী , ওয়াতানুকির ক্রাশ ।সে যদিও ইউকোর থেকে অনেকটা আলাদা ,এইরকম সরল,সাধাসিধে মেয়ে চরিত্র অনেক আনিমে সিরিজেই থাকে ।ওয়াতানুকি, দৌমেকি এবং ইউকোর ভালো বন্ধু হিমাওয়ারি, যখনই কোনও খাবার আনে দৌমেকি আর ওয়াতানুকির মধ্যে ভাগ করে দেয়,দৌমেকির অন্যতম প্রীয় বান্ধবী হওয়ার জন্য তারও কেয়ার নেয়, তীরন্দাজী প্রতিযোগিতায় তাকে চিয়ারস করে ,এবং এসব দেখে ওয়াতানুকির জ্বলে ।
দৌমেকি আবার ওয়াতানুকির চেয়ে অনেকটা আলাদা , একেবারে বিপরীত মেরুর । হ্যান্ডসাম ,কুল এবং কম সিরিয়াস ।যেখানে ওয়াতানুকি প্রচুর বকে,সেখানে দৌমেকি খুবই কম কথা বলে। সে বহু মেয়ের আকর্ষণের কেন্দ্র, যেটা দেখেও ওয়াতানুকির জ্বলে ।কিন্তু দৌমেকি ওয়াতানুকির খুব ভালো বন্ধু, কেয়ার নেয় অনেক ,যার প্রমান সিরিজের বহু এপিসোডে ।
আর যার কথা ছাড়া হোলিক গ্যাং এর কথা শেষ হয় না ,অবশ্যই মোকোনা ।খরগোশের মত দেখতে কালো আর সাদা রঙের এই দুটো কিউট প্রানীটা হোলিক ইউনিভার্স ছাড়াও ক্লাম্পদের বানানো আরও দুটো ইউনিভার্সে হাজির,ৎসুবাসা সিরিজ আর ম্যাজিক নাইট রেআর্থ ।দেখলে মনে হয় চোখ বন্ধ করে আছে,লম্বা লম্বা কান আর মাথার কাছে বড় একটা নীল রঙের গোলাকৃতি বস্তু -এই হচ্ছে প্রধান বৈশিষ্ট্য মোকোনার ।কালো মোকোনা ওরফে লার্গ বা রাগু হচ্ছে ইউকো-সানের অন্যতম প্রিয় বন্ধু,দাবা খেলা আর ড্রিঙ্কস পার্টনার ।

 

হোলিক ইউনিভার্স প্রচণ্ড রহস্যময় ,ওয়াতানুকি প্রতি এপিসোডে নতুন নতুন অতিপ্রাকৃতিক জিনিসের সঙ্গে মুখোমুখি হয়,কখনও রহস্যময় আঙটি আর তার ইয়োকাই ,কখনও এমন কিছু অতিপ্রাকৃতিক উপাদান যা স্কুলে উদ্ভট ঘটনা ঘটাচ্ছে ,কখনও মানুষের মত কথাবলা শিয়াল পরিবার,বৃষ্টি আত্মা, আত্মা আর অতিপ্রাকৃতিক প্রানীদের দীর্ঘ মিছিল অথবা এমন এক পূর্ণিমার চাঁদ, যা ওয়াতানুকিকে এই বাস্তবতার গভীরে ঢুকতে সাহায্য করবে ।
কোন পূর্ণিমার রাত্রে,যখন বিশাল বড় বহুরঙা চাঁদ একদিকে ওঠে,তাদের মধ্যে দিয়ে কোন ঝাঁটায় উড়ন্ত যাদুকর ছাতা হাতে নেমে আসে বা মৃতদের উদ্ভট মিছিল দিগন্ত পেরোয় অথবা অমাবস্যার শেষে যখন অন্ধকার দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয় ,সেই পথ দিয়ে ইয়োকাইরা জেলির মত ওয়াতানুকির পেছন নেয় অথবা বসন্তের চেরিব্লসম ঝড়া সন্ধ্যায়, কোন শিন্তো শ্রাইনের চত্বরে উদ্ভট প্রানীদের আনাগোনা শুরু হয়,এ রকমই হোলিকের প্রকৃতি, সঙ্গে অবশ্যই কমেডির মিশেল একে অন্য একটা চেহারা দেয়।

হোলিক আমাদের এটাও দেখায় যে সবার একটা নিজস্ব বাস্তবতা আছে,হয়ত কারও সেটা প্রচণ্ড একান্ত ,কোন গ্র্যান্ড ন্যারেটিভ দিয়ে সবার বাস্তবতা এবং বোধ এক কাতারে ফেলা যায় না ।

xxxHOLIC 5

হোলিক হচ্ছে আনিমে জগতের ছোট্ট আরব্য রজনী ,সঙ্গে অবশ্যই কমেডির মিশেল ।অথবা হোলিককে কোনও কিছুর সঙ্গে তুলনাই করা উচিত নয়,হোলিক ইউনিভার্স এবং এর প্রত্যেক লৌকিক এবং অতিপ্রাকৃতিক চরিত্রগুলো অথবা গল্পের চরিত্রগুলো এবং দিকপ্রকৃতি এটতাই আলাদা আলাদা,উদ্ভট যে একে অন্য কোন কিছুর সঙ্গে তুলনা করতে ইচ্ছা করে না,এমনকী টিম ক্লাম্প এর অন্য কাজগুলোর সঙ্গে ও নয় ।

আনিমে সিরিজের অন্যতম অর্জন হচ্ছে এর এনিমেশন, পরিচালক ৎসুতমু মিজুশিমা একেবারে ক্লাম্পের মেজাজে পরিচালনা করেছেন ।
এছাড়া এর ওপেনিং আর এন্ডিং থিমও ব্যাপক ।বিশেষ করে এপিসোড 24 অবধি চলা ওপেনিং সং “19 সাই” আমার অন্যতম প্রিয় আনিমে ওপেনিং ,গান সমেত ভিডিওতে একটা যাদু বাস্তবতার আবেশ আছে ।এছাড়া এপিসোড 37 অবধি চলা “নোবডি নোওজ” ও খুব প্রিয় ।দুটোই গেয়েছে শুনা(শুগা) শি(ই)কো ।তেমনি 37 এপিসোড ধরে চলা এন্ডিং সং “রিসন” যেন সিরিজ সম্পকেই কথা বলে ।

যারা পরাবাস্তব,অ অথবা অতিপ্রাকৃতিক অথবা যাদু বাস্তবতাধর্মী এবং কমেডি ধাঁচের কাজ পছন্দ তার অবশ্যই এক্স এক্স এক্স হোলিক সিরিজ ভালো লাগবে,আশা করি ।এরপরও এর একটা ভালো সিনেমাও আছে ।
ব্যাক্তিগতভাবে এই সিরিজটা আমার প্রিয় দশটা আনিমে সিরিজের অন্যতম ।পাঁচ বছর আগে আনিম্যাক্সে দেখার পরও অনলাইনে একাধিক বার দেখেছি ।আর হ্যাঁ, ড্রয়িং আর এনিমেশনে সরু সরু হাত পা টিম ক্লাম্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ।

xxxHOLIC 6

কামিচু! [রিভিউ] — Anirban Mukherjee

কামিচু!
আনিমে টেলিভিশন সিরিজের পরিচালক :- কোজি মাসুনারী
এপিসোড সংখ্যা:- 16 টি ।

Kamichu 3

গল্পের আরম্ভ অনেক আগে, যখন আমাদের জীবনটা কোন স্মার্ট ফোনের হাতে ফেলে দিয়নি, ফেসবুক আমাদের আর একটা জীবন হয়ে ওঠেনি, পার্সোনাল কম্পিউটারে ছেয়ে যায়নি পৃথিবী ।অথবা আমাদের তখন অস্তিতই ছিলো না, গল্পের শুরু যে বছরে, সে বছরে মোটোরোলা প্রথম বানিজ্যিক মোবাইল ফোন মোটোরোলা ডায়না টিএসি ৮০০০এক্স বাজারে ছাড়ে,আবার অ্যাপলের ম্যাকিনটোশ পার্সোনাল কম্পিউটার আসতেও একবছর দেরী, সেই বছরই আবার ইন্টারনেটের অফিসিয়াল জন্মবছর,সেই বছরই পৃথিবীর চ্যালেঞ্জার মহাকাশ ফেরির প্রথম যাত্রা, যা ছয়বছর তার শেষ যাত্রা সমাপ্ত করবে তার দশ নম্বর উড়ানে, সাত জন মহাকাশচারীর জীবন সঙ্গে নিয়ে। জাপানের প্রথম টোকিও ডিজনিল্যান্ড সেই বছরেই খোলে, বছরটা 1983 ।আরও ভালো করে বলতে গেলে 1983 এর এক রঙিন বসন্ত গল্পের শুরু, শেষ হয় পরের বসন্তে।

জাপানের শিন্তো ধর্ম খুবই প্রাচীন। অন্যসব প্যাগান ধর্মের মতই এই শিন্তো ধর্মও প্রকৃতি থেকে নিজের উপাদান, দার্শনিক মত, মিথোলজি নিয়েছে। অন্য সব ধর্মের মতনও শিন্তো প্রভাবিত করেছে জাপানের অন্যান্য কালচারাল মাধ্যমকে, প্রভাবিত করেছে জাপানের চিত্রকলা, উপকথা, কবিতা বা বর্তমানে আনিমে, ভিডিওগেম, মাঙ্গা, সাহিত্য সব জায়গায়। শিন্তো ধর্মে দেবতা এবং দেবী, উভয়দেরই কামি বলা হয়। এটা একটি উভয় লিঙ্গ শব্দের উদাহরন। আবার আত্মা, সর্বোচ্চ ঈশ্বর বোঝাতেও কামি শব্দটা ব্যাবহার হয়। একটা শব্দের অনেক অর্থ।

Kamichu 4

টোকিও থেকে সাতশো চৌত্রিশ কিলোমিটার দূরে হিরোসিমা প্রিফেকচারে শিটো ইনল্যান্ড সমুদ্রের ধারে অনমিচি একটা সুন্দর শহর। শহরকে দুভাগ, তিনভাগ করেছে নদীর মতো সমুদ্রের কয়েকটা অংশ, সৃষ্টি করেছে ছোটবড় বেশ কয়েকটা সুন্দর দ্বীপের। দ্বীপগুলোর মধ্যে যাওয়া আসার জন্য আছে ফেরি সার্ভিস।
গল্পের মূল চরিত্র, ইয়ুরি হিতত্সুবাসী,শহরের একটা মিডল স্কুলের ছাত্রী ,হটাৎ একদিন টিফিনের সময়ে, তার অন্যতম প্রিয় বান্ধবী মাত্সুরিকে বলেই ফেলল কথাটা “সে একজন কামি(দেবী)।”

নিজের হাতে দুধের প্যাকেটের মধ্যে স্ট্র ঢোকাতে ঢোকাতে মাৎসুরি অতি স্বাভাবিকভাবে জিজ্ঞাসা করলো “কিসের দেবী ?”

আনিমের এই শুরুটা যেকোনো মনোযোগী এনিমখোরকে অবাক করে দিতে পারে ।অথবা সিরিজে দুই বান্ধবীর মধ্যে কথোপোকথন দিয়ে শুরুটা অনেকটা ফ্রান্ৎস কাফকার মেটামরফোসিসের প্রথম বাক্যটা মনে করিয়ে দিতে পারে, গ্রেগর সামসার এক স্বপ্নবহুল ঘুম থেকে জেগে উঠে নিজেকে এক বিশাল পোকায় পরিনত লাভ করা যেমন গ্রেগরের কাছে অতি স্বাভাবিক ব্যাপার,তবুও সে অফিসের যাওয়ার জন্য ভেবে যাচ্ছে। সেইরকমই নিজেকে বা কোন বান্ধবীকে একজন দেবী হিসাবে জানা অতি স্বাভাবিক, রোজকেরে ব্যাপার ।

Kamichu 2

প্রথম এপিসোডে দেখব , ইয়ুরি তার দুই প্রিয় বান্ধবী মাত্সুরি আর মিত্সুএ এর সঙ্গে মাৎসুরিদের পারিবারিক শিন্তো মঠে যায় ,সে কোন বিষয়ের দেবী জানার জন্য ।আবার নিজেদের স্কুলের ছাদেও চলে তিন বন্ধু র পরীক্ষা ,তারা দেখতে চায় ইয়ুরির কীরকম শক্তি, টিভির সুপারহিরোদের মত পরীক্ষার ব্যবস্থা, কিন্তু কিছুই হয়না ।যদিও তখনই পরিচালক আমাদের দৃষ্টিকে শিটো উপসাগরের তীরের শহর থেকে দূর প্রশান্তের বুকে নীল জলের উপর ভাসমান একটা নৌকাতে নিয়ে গিয়ে ফেলে, কোনও অজানা কারনে সেই নৌকার পালে টাঙানো একটা কাপড়ের টুকরো দুলে ওঠে, কাকতালীয় ভাবে, হয়ত হাওয়ায়!!!!
সেই ছাদেই পরিচয় হয় কেনজি আর ইয়ুরির।কেনজি স্কুলের ক্যালিগ্রাফি ক্লাবের একমাত্র সদস্য (এবং প্রেসিডেন্ট)।
সেই রাত্রিতেই ইয়ুরি তার দেবীত্বের পরিচয় পেয়ে যায়, তৈরি করে ফেলে বিশাল একটা টাইফুন,কেনজি আবার সেই টাইফুনের কবলে পড়লে তাকে ইয়ুরি বাঁচায়।

পরের এপিসোডে, মাত্সুরি, আর তার বোন ঠিক করে তাদের নতুন দেবীর সম্মানে একটা উৎসব আয়োজন করবে তাদের শিন্তো মঠে। কিন্তু দেখে মঠের আরাধ্য দেবতা য়াশিমা নেই!! তো, ইয়ুরি যায় দেবতাদের জগতে, য়াশিমাকে ফিরিয়ে আনতে।

Kamichu 5

এইরকম আরও ভালো ভালো গল্প দিয়ে এগিয়েছে 2005 এ তৈরি কামিচুর পরবর্তী এপিসোডগুলো, এসেছে নতুন নতুন চরিত্রের সঙ্গে। যেমন য়াশিমা সামা, শহরের লোকাল কামি বা দেবতা। বা বিন চান, আর এক কামি, যে ইয়ুরির বিড়াল তামার শরীরে আশ্রয় নেবে।
গোটা আনিমেটা আমার কাছে মিথোলজি, ম্যাজিক রিয়ালিজম আর কমেডির সুন্দর সংমিশ্রণ লেগেছে। এনিমেশন খুবই ভালো, বেশ সুন্দর ব্যাকগ্রাউন্ড দৃশ্য। ঐ ব্যাকগ্রাউন্ড দৃশ্যে যেসব শিন্তো মঠ মন্দির, প্রতিষ্ঠান দেখা গেছে সেগুলো অনমিচি শহরে আজও দেখা যাবে।
ইয়ুরির গলা দিয়েছে ভয়েস একট্রেস মাকো, এটা তার প্রথম কাজ ছিলো।
আনিমেটা কোনও মাঙ্গা থেকে তৈরি নয় বরং আনিমে সিরিজ থেকেই একট সমনামী মাঙ্গা তৈরি হয়েছে। শিন্তো ধর্মের মিথ ব্যাবহার করে কামিসামা কিস, নোরোগামীর মত জনপ্রিয় আনিমে তৈরি হয়েছে। যাদের এগুলো পছন্দ, তাদের আশাকরি অবশ্যই কামিচু পছন্দ হবে।

Kamichu 1

নিনগিও শিরিযুউ (মারমেড ফরেস্ট) — Anirban Mukherjee

নিনগিও শিরিযুউ (মারমেড ফরেস্ট)
আনিমে টিভি সিরিজ পরিচালক:- মাসাহারু ওকুয়াকি

mf 1

পৃথিবীর প্রায় প্রত্যেক সভ্যতার মিথোলজির দিক থেকে দুটো মিল আমাদের চোখে পরে ।হোক না সেই সভ্যতা মূল ইউরেশিয়ান ভূপৃষ্ঠ থেকে হাজার হাজার বছর ধরে বিচ্ছিন্ন, তবুও মহাপ্লাবন আর মৎসকন্যা বা মারমেডের(মারপিপলস) মিথ সেখানকার মিথোলজিতে পাওয়া যাবে,হয়ত কিছু ব্যাতিক্রম থাকবে ।মহাপ্লাবনের মিথের কথাই ধরা যাক, প্রাচীন সুমেরদের “ইরিডু জেনেসিস”,প্রাচীন ব্যাবিলনে গিলগামেশের মহাকাব্যে বর্নিত মহাপ্লাবন,বাইবেলের নোয়ার আর্ক, গ্রীক পুরানে বর্নিত তিনটি মহাপ্লাবন, আইরিশদের লেবর গ্যাবালা স্যাসার এর বর্নিত মহাপ্লাবন,নর্সদের বের্গেল্মির দানব আর মহাপ্লাবনের কাহিনী, মধ্য আমেরিকায় মায়ানদের “পোপোল ভূ”তে বর্নিত মহাপ্লাবনের কাহিনী, দক্ষিন আমেরিকার উনু পাচাকুটি বা (ভিরাকোচার অভিশাপে)লেক টিটিকাকায় মহাপ্লাবন, হাওয়াই মিথোলজির নু’উ আর মহাপ্লাবনের কাহিনী, হোপিদের উপকথায় ,মাউরি উপকথায় -মহাপ্লাবনের মিথ আছে পৃথিবীর সব সভ্যতার প্রান্তে ,ভারতীয় উপমহাদেশেই আছে তিন চারটে আলাদা মহাপ্লাবনের কাহিনী (তারমধ্যে সবচেয়ে অবিশ্বাস্য হলো আন্দামানের আদিবাসীদের মিথটা ,যারা উপমহাদেশের মূল ভূপৃষ্ঠ থেকে হাজার হাজার বছর বিচ্ছিন্ন)।

সেই রকম মারমেড বা মৎসকন্যা জাতীয় প্রানীর মিথ,চিত্র বা দেওয়াল চিত্র কিংবা গুহাচিত্র গোটা পৃথিবীর সব সভ্যতার প্রান্তে প্রচলিত ,সেটা পেরুর কুসকোর প্রাচীন পাথুরে দেওয়ালে অঙ্কিত মারমেড রিলিফ হোক,বা প্রাচীন আসিরিয়ার উপকথা পুরানের দেবী আট্রাগেটিস,এমনকী আলেকজান্দারের বোন থেসালোনিকা , গ্রীক উপকথা মতে যে মরার আগে একটা মৎসকন্যায় রুপান্তর হয়।আরব্য রজনীর আবদুল্লাহর অদ্ভুত জলজগৎএ ভ্রমনের গল্প, বা ব্রিটেনের প্রাচীন উপকথায় ,যেখানে মৎসকন্যা অশুভ জিনিস,আবার সেই পশ্চিম ব্রিটেনের জেনোরের কোন এক গ্রামে,আটলান্টিকের তীরে,ম্যাথু নামে এক মানুষের সঙ্গে এক মৎসকন্যার প্রেম হয়, এই ভাবেই বিভিন্ন লোককথায় মৎসকন্যারা বেঁচে থাকে ।

জাপান সমুদ্র দিয়ে ঘেরা দেশ,সেখানে মৎসকন্যার উপকথা থাকবে না এমন নয়।”নিনগিও”(উচ্চারনটা আবার বিভিন্ন ভাষায় বিভিন্ন দেখলাম,ফ্রেঞ্চ এ একরকম,ইংরেজিতে অন্যরকম ,আমার এটাই সঠিক মনে হলো , “人魚”) হচ্ছে সেখানকার মৎসকন্যাদের জাপানিজ নাম, “人魚”কে যদি গুগল ট্রান্সলেটর এর সাহায্যে বাংলায় অনুবাদ করা হয় তবে ফলাফল দিচ্ছে মৎসনারী।
জাপানের বিখ্যাত মৎসকন্যার গল্প “ইয়াও কিকুনি”,যার সঙ্গে আজকের আলোচ্য বিষয় মারমেড ফরেস্ট (বা সাগার) মিল প্রচন্ড ।

“ইয়াও বিকুনি” বা “আটশ বছর বয়সী বৌদ্ধ সন্ন্যাসিনী” গল্পে একজন ধীবর জাপান সাগরের তীরে ওয়াকাসা এলাকায় থাকতো, একদিন সে একটা অদ্ভুত ধরনের মাছ ধরলো তার জালে ,এমন মাছ সে কোনদিনই ধরেনি ,দেখেওনি।সে তার বন্ধুদের আমন্ত্রণ জানালো তার বাড়িতে, মাছটা সবাই মিলে একসঙ্গে খাওয়ার জন্য ।

তার একজন বন্ধু একটু কৌতুহল হয়ে ধীবরের রান্নাঘরে ঢুকলো ,এবং দেখলো ঐ মাছটার মাথাটার জায়গায় পুরো একটা মানুষের মাথা, সে তো অবাক । তারাতারি তার অন্য বন্ধুদের বললো ঐ মাছটা যেন তারা না খায় ।

যথাসময়ে ধীবর লোকটা মাছটাকে রান্না করে নিয়ে এল এবং সাকের সঙ্গে আমন্ত্রিত অতিথি বন্ধুদের পরিবেশন করল।অতিথি বন্ধুরা বললো এই মাছটা তারা বাড়িতে নিয়ে গিয়ে খেতে চায়,সেইমত কাগজ দিয়ে মুড়ে দিতে ।ধীবর তাই করল এবং বন্ধুরা বাড়ি যাওয়ার পথে রাস্তাতে মাছগুলো ফেলে দিলো ।

কিন্তু একজন বন্ধু একটু বেশিই সাকে খেয়ে ফেলেছিলো,সে মদের ঘোরে মাছটাকে বাড়িতে নিয়ে এলো ।তার ছোট মেয়ে তার কাছ থেকে উপহার চেয়ে বসলে সে মদের ঘোরে কাগজে মোড়া মাছটা তাকে দিলো ।কিছুক্ষণ পরেই তার মদের ঘোর কেটে গেলে সে দেখল একি করলাম,তার মেয়েকে সঙ্গে সঙ্গে নিরস্ত করতে গেল যাতে সে মাছটা না খায়।কিন্তু কে কার কথা শোনে,নিষিদ্ধ বস্তুর প্রতি আগ্রহ সবার বেড়ে যায় ,সে ছোট হোক বা বড় ।বাচ্চা মেয়েটা মহাআগ্রহে মাছটা খাওয়ার পর তার বাবা মেয়েটা মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে লাগে ।সময় যায়,মেয়েটার কিছুই হয় না,বরং আরও বেশি সময় যায় ,বাচ্চা মেয়েটা যুবতী হয়,বিয়ে হয় এবং আরও সময় যায়, মেয়েটার স্বামী বুড়ো হতে থাকে এবং একসময় মরেও যায় ,কিন্তু মেয়েটার বয়স বাড়ে না ,যুবতীই থেকে যায় এবং এভাবে ক্রমশ আটশ বছর বহুবার বিধবা হওয়ার পর সে সংসারের প্রতি বিতৃষ্ণা চলে আসে,নিজের অমরতাকে বোঝা মনে হতে লাগে এবং শেষে একটু শান্তির খোঁজে বৌদ্ধ সন্ন্যাসিনী হয়ে যায়।

ইনুইয়াসা, রান্মা 1/2 এবং ওয়ান পাউন্ড গসপেল খ্যাত মাঙ্গাকার রুমিকো তাকাহাসি তার দেশেরই এই বিখ্যাত উপকথাকে তার তৃতীয় মাঙ্গার প্লট নির্মানের জন্য ব্যাবহার করলেন ,এবং মাঙ্গা শেষ হওয়ার নবছর পর আমরা পেলাম এর আনিমে এডাপশন ।মাসাহারু ওকুয়াকি যার পরিচালক ।

মারমেড ফরেস্টের মূল নায়ক ইয়োটা,ইয়াও বিকুনির সেই মেয়েটার মতোই অমরতার অভিশাপে সে জর্জরিত ।পাঁচশ বছর আগে সে ও তার কিছু বন্ধু ধীবর ছিলো ,তারাও মৎসকন্যা শিকার করেছিলো,একসঙ্গে খেয়েছিলো ।কিন্তু কয়েকজন বন্ধু সঙ্গে সঙ্গে বিষাক্রান্ত হয়ে মরে যায়,কিছু বন্ধু প্রচন্ড কুৎসিত এক দানবে পরিনত হয়,যাদের নাম আমরা দেখতে পায় “লস্ট সোল” হিসেবে ।ইয়োটা ভয় পেয়ে যায় তারও কিছু এরকম হবে একদিন ।কিন্তু সেই “একদিন ” কোন দিনও আসে না ।সময় যায় ,সে এসব কিছু ভুলে যায় ,বিয়ে করে সংসার পাতে ।আরও সময় যায়,তার স্ত্রী অভিযোগ করে সে বৃদ্ধ হচ্ছে কিন্তু ইয়োটা সেই একই যুবক আছে ।ক্রমশ সে উপলব্ধি করে সে অমর হয়ে গেছে,কিন্তু সে স্বাভাবিক ভাবে মরতে চায় ,সংসার ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে আবার মারমেডের সন্ধানে ।সে শুনেছে আবার যদি সে মারমেডের মাংস খায় তবে সে মরনশীল মানুষে পরিনত হবে ।
প্রথম এপিসোডে দেখি ,ইয়াটো পাঁচশ বছর পর এই আধুনিক জগৎ এ শেষ অবধি মারমেডদের এক আস্তানার সন্ধান পায়।জাপানের কোনও সূদূর কোনে এক সমুদ্র ঘেরা পাহাড়ি গ্রামে ,যেখানে একই রকম দেখতে যুবতী আর একই রকম বৃদ্ধারা গ্রামের অধিবাসী ।তারাই আসলে মারমেড ।মারমেডরাও ক্রমশ বৃদ্ধ হয়,কিন্তু তারা আবার যৌবন ফিরে পেতে কোনও মানুষের মেয়েকে ছোটবেলায় ধরে আনে,তাকে পনেরো বছর ধরে পায়ে বেড়ি পরিয়ে মানুষ করে ,এবং একসময় তাকে মারমেডের মাংস খাওয়ায় ।ফল হয় দুটো ,সে হয়ত বেঁচে যায় এবং অমর হয়ে যায় ,নাহলে বিষের কারনে মরে যায় কিংবা লস্ট সোলে পরিনত হয় ।

যে বেঁচে যায় সে কিন্তু আর অমরতার স্বাদ অনুভব করতে পারে না ।সে ঐ বৃদ্ধ মারমেডদের খাবারে পরিনত হয়,এবং ঐ বৃদ্ধ মারমেডরা আবার যৌবন ফিরে পায় ।

মানা,এইরকমই একজন মেয়ে ,যাকে মারমেডরা বন্দি করে রেখেছিলো খাবে বলে,ইয়োটা তাকে বাঁচায়,যদিও ততক্ষন সে অমর ।

দ্বিতীয় এবং তৃতীয় এপিসোডে,ইয়োটার অতীতকে আমরা দেখি,যেখানে সে টোবা দ্বীপের (নামেমাত্র) জলদস্যুদের নেতার মেয়ে রিনের সঙ্গে শাকাগামি দ্বীপের জলদস্যুদের বিরুদ্ধে যায়।দুপক্ষই মারমেড মাংসের জন্য একে অপরের উপর চরাও হয় ।রিনের বাবা , শাকাগামি দ্বীপের জলদস্যুদের প্রধানের স্ত্রী ইশাগো দ্বারা আহত হয়,রিন আর ইয়োটা মনে করে রিনের বাবা মারা যাবে ,সেজন্য মারমেড মাংসের খোঁজে সমুদ্রে পারি দেয় দুজনে ।তারা মারমেডের খোঁজ পেলেও ,শাকাগামি দ্বীপের জলদস্যুরা তা কেড়ে নেয় ,ইয়োটাকে মেরে ফেলে এবং মারমেডের মাংস আর রিনকে শাকাগামি দ্বীপের জলদস্যু প্রধানের কাছে নিয়ে আসে ।সবাই মাংস খায় এবং একে একে লস্ট সোলে পরিনত হয় ।অমর ইয়োটা মরেও মরে না! রিনকে উদ্ধার করে,এবং সব শেষে জানতে পারে ইশাগোও একজন মারমেড ।

এর পরের এপিসোড থেকে আবার বর্তমানে ফিরে আসে সিরিজের গতিপথ,আমরা ক্রমে মাসাতো, মিশা,ওমানাকো প্রভৃতি চরিত্রের সঙ্গে পরিচিত হয় ।মাসাতো,একজন সাতশো বছর বয়সী “বাচ্চা ছেলে”।যে খুব ছোট বয়সে মারমেডের মাংস খেয়েছিলো,তারপর তার আর বয়স বাড়েনি ।আসল বাবা মাকে হারানোর পর সে গত সাতশো বছরে বহু বাবা মা পেয়েছে,আবার তাদের হারিয়েছে বিভিন্ন যুদ্ধে,দুভিক্ষে অথবা স্বাভাবিক ভাবে ।ক্রমশ সে একজন ছোটখাটো স্যাইকোপ্যাথে পরিনত হয়েছে ,তবুও শেষ অবধি মিশাকে তার মা বানিয়েছে ।মিশাও তার আসল ছেলে এবং স্বামীকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হারিয়েছে ।এরপর তার সঙ্গে মাসাতোর আলাপ হয়,সে তাকে এক অদ্ভুত মাংস খেতে দেয় ।খাওয়ার অনেক দিন পর মিশা উপলব্ধি করে সে আর তার পালিত ছেলে মাসাতো কেউ বয়সে বাড়ছে না ।সে ভয় পেয়ে যায় ।

শেষের এপিসোডটা প্রচন্ড রক্তিম হিংস্র (ব্রুটাল)।মাসাতো শেষ এপিসোডে নিজের হিংস্রতাকে খুব শান্তভাবেই প্রদর্শন করেছে,যেটা যেকোনো সাইকোর খুব স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য । আবার এই শেষ এপিসোডেই এন্ডিং সংএর আগে শেষ তিন চার মিনিট প্রচন্ড ভালো লেগেছে ।
পরিচালক মাসাহারু ওকুয়াকি খুব ভালোভাবেই গোটা প্রজেক্টটা সামলেছেন ।সুন্দর অ্যানিমেশন,আমার বরাবরই গত দশকের প্রথমদিকের আনিমের অ্যানিমেশন ভালো লাগে ।কালারফুল ব্যাকগ্রাউন্ড, ব্যাকগ্রাউন্ডে প্রয়োজনমত প্রচুর নীল এবং গাঢ় নীল আর কমলা রঙের দুর্দান্ত ব্যাবহার আর প্রচন্ড ভালো ডিটেলিং যা প্রাচীন বা আধুনিক দু ধরনের জাপানকেই সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলেছে ।এবং প্রচন্ড ভালো চরিত্র রুপায়ন ।ইয়োটা আর মানা প্রাতেক্য এপিসোডে প্রয়োজন মত আলাদা আলাদা জামা কাপড় পড়েছিল,একটা জামা পড়ে গোটা সিরিজ কাটায় নি (এটা নিশ্চয়ই দেখেছেন কীভাবে লুফি বা নোবিতা বছরের পর বছর প্রায় একই জামা পড়ে কাটিয়ে দেয়) ।এটা বাস্তব বুদ্ধিযুক্ত ডিটেলিং এর একটা ছোট উদাহরণ ।

মারমেড বা মৎসকন্যা,এই ধরনের মিথোলজিক্যাল জীবের সঙ্গে বাচ্চা বয়সে আমরা পরিচয় হয় হানস এন্ডারসনের লিটিল মারমেড বা তার অতিসফল ডিজনির অ্যানিমেশন এডাপটেশনের সঙ্গে ,বা কোন শিশুপাঠ্য বাংলা পাক্ষিক পত্রিকার পাতায় রুপকথার গল্পে(আমার ছোটবেলায় আনন্দমেলাতে বা ঐ টাইপের ছোটদের পত্রিকাতে পড়া কিছু নাম ভুলে যাওয়া রুপকথা এক্ষেত্রে মনে আসছে) বা অবশ্যই মিয়াজাকির পোরনিওতে ।কিন্তু পরে বড় হয়ে একই মিথোলজিক্যাল জিনিসকে এইরকম হিংস্র অথবা ভয়ঙ্কর সুন্দর ভাবে পরিচয় লাভ করা যায় আনিমের পর্দাতে ।
এই আনিমেতে কিছু মারমেড হোমারের ওডিসির সাইরেনদের কথা মনে পড়িয়ে দেয়।শান্ত হিংস্র ।

ওপেনিং সংটাও দুর্দান্ত (ও প্লিজ কাম ডাউন লাইক এন অ্যাঞ্জেল)।

mf 2

জীরোর স্বপ্ন অথবা রাগী বাতাসের কাহিনী — Anirban Mukherjee

ফুজিওকা শহর থেকে একটু দূরে ,যখন ভোরের সাদা কুয়াশাগুলো সবুজ শস্যক্ষেতের উপর গাঢ় হয়ে ভাসতে ,কাছেই একটা বাড়িতে,এক কিশোরের স্বপ্ন আর বাস্তবের সীমারেখা ধংস হয়ে যায় ।গাঢ় সাদা কুয়াশার সমুদ্রের মধ্যে বনেদি জাপানি বাড়িটা একটা বিচ্ছিন্ন ভাসমান দ্বীপের মতো লাগে ,যার বিশাল ত্রিকোনাকার ছাদের একপ্রান্তে ছেলেটাকে চড়তে দেখি ,চোখে একটা এভিয়েসন গ্লাস।সে ছাদের একপ্রান্তে একটা কাঠের এরোপ্লেনে চড়ে বসে ।প্লেনটা বেমানান, ছোট ইঞ্জিন,ডানাদুটো বাঁকানো ,শেষ প্রান্তে আবার পাখির পালকের মতো কারুকার্য করা ।ছেলেটা ইঞ্জিনটা চালু করে,প্লেনের প্রোপেলার ঘোরে ।দূরে সূর্যের প্রথম লাল আলো পড়া হলুদ -সবুজ পাহাড়গুলো ঘুরন্ত প্রপেলারের মধ্যে দেখলে মনে হবে একটা গলন্ত সুন্দর লাল – হলুদ কিছু পদার্থ ।প্লেনটা পাখির মতো ডানা ছাড়ে, আর ছেলেটা প্লেনের সঙ্গে ওড়ে ।সূর্যের প্রথম লাল -হলুদ আলো ,আর নীচের সবুজ উপত্যকা ,শস্যক্ষেত ।প্লেনটা যত এগোয় ,সেই শস্যক্ষেত থেকে অন্ধকার দ্রুত পেছনে সড়ে যেতে থাকে ।যেন প্লেনটা একটা বাজপাখি আর অন্ধার কোন ভীতু ইঁদুর ।নীচের ছোট-বড় নদী,সবুজ নদীদ্বীপ ছাড়িয়ে প্লেনটা এসে পৌছয় ফুজিওকা শহরের মধ্যে ,যেখানে কাঠের সাঁকো, রেল লাইন,মেয়েদের বোডিং হাউস পেরিয়ে দেখতে পায় কালো সারসের মতো অসংখ্য ছোট বেলুন শহরে ঢুকছে ,যার মধ্যে অদ্ভুতদর্শন কালো কাপড় পড়া মানুষ দাঁড়িয়ে ,বেলুনগুলো আবার একটা বিশাল কালো বেলুন থেকে ঝুলছে ।ছেলেটা সেগুলোকে বিপদ মনে করে লড়তে যায় ,পারেনা ,ছোট প্লেনটা ভেঙে যায়,তার এভিয়েসন গ্লাস ভেঙে পড়ে যায়,সেও পড়তে থাকে এবং একসময় তার স্বপ্ন ভেঙে যায় ।ছেলেটা জীরো হোরিকোশি ,আর দৃশ্যটা হায়াও মিয়াজাকির শেষ মাস্টারপিস উইন্ড রাইজেসের প্রথম স্বপ্নদৃশ্য ।তার সিনেমাগুলোকে প্রায়ই সিনেমার ম্যাজিক রিয়ালিজম জঁরের অন্যতম সেরা সাক্ষর মনে করা হয়,উইন্ড রাইজেসও এর বাইরে নয় ,এই সিনেমাতে বারবার স্বপ্ন আর বাস্তবের সীমানাটাকে মুছে ফেলা হয়েছে ।যেমন এর পরের স্বপ্নদৃশ্য,কায়ো,জীরোর ছোট বোন যখন জীরোর সঙ্গে বাড়ির ছাদে গাঢ় নীল রাত্রিআকাশে উল্কাবৃষ্টি দেখছিলো ,তখন জীরোর চোখ চলে যায় ইতালির রঙিন আকাশে ,একগাদা কাপ্রোনি কা 31 প্লেন ,যার পাখার রঙ ইতালির পতাকার মতো লাল-সাদা-সবুজে রাঙানো ,হয়ত কোনও যুদ্ধে যাচ্ছিল , আমরা পরে জানতে পারি এর ডিজাইনার জিয়োভাননি কাপ্রোনির মুখে ,ঐ প্লেনগুলো কেউ ফিরে আসবে না।পরের দৃশ্যে দেখব একটা শহরের ছবি ,যার গোটাটা প্লেনগুলোর বোমের লাল আগুনের শিখাতে গিলে ফেলেছে,প্লেনগুলোও বাঁচতে পারছে না ।এখানেই জীরো অনুপ্রেরনা পায় কাপ্রোনির কাছে ,পাইলট নয়,প্লেনের ডিজাইনার হওয়ায় উচিত তার লক্ষ ।আর অবশ্যই , “প্লেন কোনো যুদ্ধের যন্ত্র নয়,সেগুলো কোন টাকা কামাবার জিনিস নয়।এয়ারপ্লেন হচ্ছে সুন্দর স্বপ্ন,যার ইঞ্জিনগুলো স্বপ্নকে বাস্তবে পরিনত করে”।
পাঁচ বছর পর,জীরো নিজের স্বপ্নগুলোকে সত্যি দেখার জন্য ট্রেনে করে যাচ্ছে টোকিওতে,এরোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং শিখতে টোকিও ইউনিভার্সিটিতে ।ট্রেনে দেখা হয় নায়োকোর সঙ্গে।দুজনেই ইটালিয়ান ভাষা জানে ।
Le vent se leve
Il faut tenter de vivere.
(The wind is rising ,we must try to live)

wind rises 1
এই আসার পথেই জীরো পরিচিত হয় প্রকৃতির ধংসের মুখের দিকে ,1923 সালের টোকিওর ভয়ঙ্কর ভূমিকম্প, মিয়াজাকি তার সিনেমাতে ভূমিকম্পকে এক ভয়ঙ্কর সুন্দর মাত্রায় দেখিয়েছেন ।ভূমিকম্প যেন এক জীবন্ত সরীসৃপ, বিশাল বড় নিশ্বাস ফেলে স্থলভাগের দিকে ধেয়ে আসছে ,তারপর এক বিশাল শব্দ, মাটির উপর দিয়ে যেন এক বিশাল বড় ঢেউ খেলে গেল,টোকিওর বাড়িগুলো,রেলপথ আর ট্রেনটাও ও সেই ঢেউএর তালে নেচে উঠল ।দানবীয় শব্দের সঙ্গে মিয়াজাকি আমাদের পরিচয় করিেছেন ভূমিকম্প পরবর্তী বিশাল অগ্নিকান্ডের,টোকিওর রাস্তায় লক্ষ জনার ভীড়,বিশাল লাল-কালো মাশরুমের মতো আগুনের ধোঁয়া ঢেকে ফেলেছে টোকিওর আকাশ ।নায়োকোর আয়াকে বাঁচানোর পর জীরো দেখে তার বিশ্ববিদ্যালয় জ্বলে গেছে,তার বন্ধু কিরো হোনজো আরও কিছু বন্ধুদের নিয়ে কিছু বই আর গবেষনা পত্র বাঁচাতে সক্ষম হয়েছে ।উপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে আগুনে পোড়া কাগজ,কাঠের দরজা,পোড়া গাছের ছোট ডাল ।টোকিও শেষ ।প্রায়।
“কে জানে,সেখানে হয়ত কোনও আগুনের সমুদ্র ছিলো”
1927 সালে জীরো আর কিরো গ্রাজুয়েট হয় টোকিও ইউনিভার্সিটি থেকে ,তারপর তারা মিৎসুবিসি কোম্পানির হয়ে ফ্যালকন নামে একটা ফাইটারের ডিজাইনের উপর কাজ করতে থাকে ,যেটা পরে পরিত্যক্ত হয় ।এরমধ্যে তারা দুজনা জার্মানি যায়,সেই সঙ্গে উপলব্ধি করে যুদ্ধখাতে ব্যায় বারানোর জন্য কী দারিদ্র্যের মধ্যে যাচ্ছে জাপান ।জীরো সবসময় কাপ্রোনির কথা মনে রাখতো ,যে তাকে অনেক স্বপ্নদৃশ্য এ দেখা দিয়েছে,” এই পৃথিবীটা আরো ভালো হয়ে উঠতে পারে ,সুন্দর প্লেনের সাহায্যে”।
সিনেমার শেষ স্বপ্নদৃশ্য খুব সুন্দর, একগাদা মিৎসুবিসি এ ফাইভ সিক্সের ধংসাবশেষ পেরিয়ে জীরো এগিয়ে যাচ্ছে একটা নীল আকাশ আর সবুজ ঘাসের উঁচু প্রান্তে ,যেখানে কাপ্রোনি দাঁড়িয়ে আছে কথা বলার জন্য ।কথার ফাঁকে দেখতে পারি কিছু এ ফাইভ সিক্স উড়ে যাচ্ছে নীল আকাশে ,ফরিঙের মতো ,কিংবা অসংখ্য কাগজের প্লেনের মতো ।নীচে একটা ছাতা নিয়ে নায়োকো আসছে ।

উইন্ড রাইজেসের প্লেনগুলি:-

ক্যাপ্রোনি কা 1 বা ক্যাপ্রোনি কা 31:-
জীরোর দ্বিতীয় স্বপ্ন দৃশ্যে যে বাইপ্লেনগুলো আমরা দেখতে পায়,সেগুলো সম্ভবত ক্যাপ্রোনি কা 31 সিরিজের ।এগুলো আসলে বোমারু বিমান ,দিনের বেলায় শত্রু দেশে বোম ফেলার জন্য প্রথম বিশ্বযুদ্ধ নাগাদ তৈরি হয় ।মোট 162 থেকে 166 টা তৈরি করা হয়েছিলো।এর প্রথম প্রটোটাইপের নাম ছিলো ক্যাপ্রোনি কা ওয়ান,যেটা প্রথম উড়ানেই ক্রাশ খেয়েছিলো ।প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ইতালির হারের পর কিছু এই সিরিজের বিমান যাত্রী পরিবহনে ব্যাবহার হতো ।মোট ছয় থেকে চারজন যাত্রী ধরতো এখানে ।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এগুলো অস্ট্রিয়া -হাঙ্গেরি, লিবিয়া এবং ফ্রান্সে বোমাবর্ষণের কাজে ব্যাবহার করেছিলো ইতালি ।

ফ্যালকন প্রোটোটাইপ:-
সিনেমাতে দেখি জীরো হোরিকোশি আর কিরো হৌনজো ,দুজনেই একটা এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার বেসড প্লেন তৈরি করার চেষ্টা করে ,মিৎসুবিসির হয়ে,জাপানি নেভির জন্য ।সেই প্রজেক্টটার নাম ফ্যালকন, মাত্র দুটো তৈরি হয়েছিলো ।আর এটাই ছিলো জাপানের প্রথম ক্যারিয়ার বেসড এয়ার ক্রাফট তৈরির উদ্যোগ ।এই প্লেনটা নেভির দ্বারা প্রতাখ্যাত হয়,তার বদলে জাপানি নেভি বেছে নেয় নাকাজিমা এ ওয়ান এন ।যেটা 1935 অবধি জাপানিজ নেভির সঙ্গে ছিলো ।মোট একশ একান্নটা তৈরি করা হয় ।

মিৎসুবিসি এ ফাইভ এম :-
জীরো হোরিকোশির অন্যতম পিয়েটা,যে প্লেনকে দেখে সিনেমাতে তার বন্ধু কিরো বলেছিলো একটা “আঁভা গার্দ” ডিজাইন ।আমেরিকার মিত্রপক্ষ এর নাম দিয়েছিলো ক্লাউড ।
1934 সালে যখন জাপানের নেভি একটি এমন এক ডিজাইন চাইলো দুই কোম্পানি, মিৎসুবিসি আর নাকাজিমার কাছে যেটা 350 কিলোমিটার প্রতিঘন্টা গতিবেগ নিয়ে উড়তে পারবে,আর 6.5 মিনিটে পাঁচ হাজার মিটার উচ্চতায় উঠতে পারবে ।আগের 1927 সালের প্রতিযোগিতায় নাকাজিমা জেতে ,মিৎসুবিসির ফ্যালকনকে হারিয়ে ।কিন্তু এবার জেতে মিৎসুবিসি ।
মোট দশটা ভারসন ছিলো,প্রথম প্রটোটাইপের ডানা অনেকটাই বাঁকানো ছিলো ।এ ফাইভ এম ফোর ভারসনের সবচেয়ে বেশি 440 কিলোমিটার প্রতিঘন্টা গতিবেগে যেতে পারতো আর 1200 কিমি এর রেনজ ছিলো ।

মিৎসুবিসি এ সিক্স এম জিরো :-
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ডগফাইটে যে আমেরিকার মিত্রপক্ষের শিরঁদাড়া কাঁপিয়ে দিয়েছিলো ,সেটা নেভির টাইপ জিরো ক্যারিয়ার ফাইটার ওরফে মিৎসুবিসি এ সিক্স এম জাপানিজ জিরো ।মোট দশ হাজারের উপর বানানো হয়েছিলো ।
জাপানিজ নেভি চাইছিল এমন এক ফাইটার, যেটা সাড়ে তিন মিনিটে তিন হাজার মিটার যেতে পারে এবং “600 কিলোমিটার প্রতি ঘন্টা” সবচেয়ে বেশি গতিবেগ হয় ।
প্রচণ্ড হালকা করা হয়েছিলো একে,যাতে শত্রুপক্ষের প্লেনকে ডগফাইটে নাস্তানাবুদ করতে পারতো সহজে ।অথবা দ্রুত দুটো ষাঠ কেজির বোম শত্রু পক্ষের ঘাঁটির উপর ফেলে চলে আসতে পারতো ।
কিন্তু এই অতিরিক্ত হালকা করার জন্য কিছু অনেক জিনিজ বাদ দিতে হয়েছিলো ।আর সেটাই হয় জিরোর দুর্বলতা ।
1942 এর 4 টা জুন,আমেরিকার ডাচ হারবারের উপর হামলা চালানোর সময় একটা জিরো তেলের অভাবে ল্যান্ডিং করে ,ডাচ হারবারের কুড়ি মাইল দূরে ।পিছলে গিয়ে ল্যান্ডিং টা ক্রাশ ল্যান্ডিং এ পরিনত হয়,পাইলট মাথার আঘাতে মারা যায় আর আমেরিকা প্রশান্ত মহাসাগরের উপর তার অন্যতম ত্রাসের অপারেশনের সুযোগ পায় ।ভালোভাবে যাচাই করার পর দেখে ওজন কমানোর জন্য জিরোর পাইলট , ইঞ্জিন বা অন্য ক্রিটিক্যাল পয়েন্টের চারপাশে কোন বর্ম দেওয়া নেই,যেটা সেযুগের প্লেন এবং পাইলটের অন্যতম রক্ষাকবচ ।

মিৎসুবিসি জিথ্রিএম :-
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানের অন্যতম সেরা বোমারু বিমান তথা পরিবহন বিমান ।এটা ডিজাইন করেছিলো জীরোর বন্ধু কিরো হৌনজো। হাজারের উপরে তৈরি করা হয় এই বোমারু বিমান ।সিক্স এম জিরোর মতো,এটাও ওজন কমানোর জন্য বেশি বর্ম (আর্মর ) দেওয়া হয়নি ।সাতজন লোক এবং আটশ কেজি বোম অথবা একটা এরিয়াল টর্পেডো নিয়ে পাড়ি দিতে পারতো চার হাজার চারশ কিলোমিটার দুরত্ব ।পার্ল হারবারের উপর আক্রমণের সময় এটার অবদান অনেক ।

ক্যাপ্রোনি কা ফোর :-
অনেকগুলো(মূলত তিনটে) মূল ডানা যুক্ত বাইপ্লেন সিনেমাতে দেখা যায়। এগুলো ক্যাপ্রোনি কা ফোর সিরিজের প্লেন, মূলত বোমারু অথবা যাত্রীবাহী এরোপ্লেন হিসাবে তৈরি করার কথা ভেবেছিলেন ডিজাইনার জিয়োভাননি ক্যাপ্রোনি ।এর যাত্রীবাহী মডেল ক্যাপ্রোনি কা 48 ,প্রথম উড়ানেই ক্রাশ করে,ইটালির ভেরনা নামক জায়গায়, চোদ্দ থেকে সতেরো জন মারা যায় ।এটা ইতালির প্রথম বিমান দুর্ঘটনা ,সিনেমাতে এই ঘটনার একটা রেফারেন্স সম্ভবত আছে ।

সব শেষে-
ক্যাপ্রোনি কা 309 জিবলি :-
সম্ভবত মিয়াজাকির সবচেয়ে প্রিয় প্লেন, যার নামানুসারে নিজের (অথবা নিজেদের) কোম্পানির নামকরণ করেন ।

wind rises 2

পোরকোর প্লেনের দুনিয়া — Anirban Mukherjee

মিয়াজাকির মতো আমারও প্লেন সম্পকে আগ্রহ অনেক দিনের ।যখন ইন্টারনেট হাতে পায় তখন এরোপ্লেন সম্পকে আমার আগ্রহকে খোরাক দি ,নাহলে তার আগে কিছু বাংলা-ইংরেজি বিশ্বকোষ ছিলো ভরসা ।ইন্টারনেট আসার পর মিয়াজাকির সিনেমা জগত সম্পকেও পরিচিত হয়,দেখি পোরকো রোসো , আড্রিয়াটিকের নীল ফেনিল জল আর ততোধিক নীল আকাশ মাতাচ্ছে একটা লাল স্যাভোয়া এস-21, একটা কুরটিস আর থ্রি সি জিরো আর একটা অজানা ডাবোহায এবং আরও আরও নাম না জানা সীপ্লেন আর তাদের পাইলটরা ।
এই লেখাতে পোরকো ,মিস্টার কুরটিস এবং সি পাইরেটদের প্লেন গুলোর সঙ্গে পরিচিত হওয়ার আগে আমাদের উচিত কিছু পরিভাষার সঙ্গে পরিচিত হওয়া যা এভিয়েশন জগতে প্রচণ্ড প্রচলিত ।

Porco 1

1. ফিউজিলাজ:-
ডানা বা উইং ছাড়া বিমানের মূল কাঠামো ।

2. ফিক্সড উইং এয়ারক্রাফট:-
পৃথিবীতে সব ধরনকে এরোপ্লেনই হচ্ছে ফিক্সড উইং এয়ারক্রাফট । সব সব ফিক্সড উইংএয়ারক্রাফটের উইং বা ডানা আছে । এই প্লেনের ডানা ,প্লেনের সামনে দিয়ে আসা বাতাসের সাহায্যে,প্লেনকে উপরে তোলে ।এছাড়া ফিক্সড উইং এয়ারক্রাফটের উদাহরণ হতে পারে ঘুড়ি, গ্লাইডার,ভেরিয়েবল স্যুঈপ উইং এয়ারক্রাফট বা পরিবর্তনশীল ডানাওয়ালা বিমান ।এই স্যুঈপ উইং এয়ারক্রাফট নিজের ডানাকে মূল বিমানের কাঠামো বা ফিউজিলাজের সমান্তরালে ছড়িয়ে দিতে পারে অথবা গুটিয়ে নিতে পারে । এই ধরনের বিমানের সবচেয়ে বিখ্যাত উদাহরণ হলো আমেরিকা বিমানবহরে আধুনা রিটায়ার্ড গ্রুম্যান এফ-14 টমক্যাট,যা টম ক্রুজের “টপগান” সিনেমার জন্য মোটামুটি সবার কাছে পরিচিত । এছাড়া ইউরোপের পানাভা টর্নেডো ,সোভিয়েত(এবং বর্তমানের রাশিয়ার) বিমান বহরের মিগ -23,মিগ-27 ইত্যাদি যুদ্ধবিমান ।

3. মনোপ্লেন এবং বাইপ্লেন :-
সব ফিক্সড উইং এয়ারক্রাফটের মূল ডানা আছে, কিন্তু তা একটা হতে পারে অথবা দুটো (কিংবা কিছু পুরনো ডিজাইনে ততোধিক) হতে পারে । মনোপ্লেন হচ্ছে সেই ধরনের প্লেন যার একটি মূল ডানা আছে ,যা প্লেনের মূল কাঠামো বা ফিউজিলাজের দুদিক বরাবর অবস্থান করে । যে প্লেনের ডানা মূল কাঠামো বা ফিউজিলাজের উপরের দিক বরাবর থাকে তাকে হাই উইং প্লেন ,মূল কাঠামোর মধ্য বরাবর থাকলে মিড উইং প্লেন আর নিচের দিকে থাকলে তাকে লো উইং প্লেন বলে ।
বাইপ্লেন এর মূল ডানা দুটো । একটা থাকে মূল কাঠামোর নিচের দিকে আর একটা উপরের দিকে ।উপরের মানে অনেকটা উপরে, মূল কাঠামো বা ফিউজিলাজ ছাড়িয়ে বাইপ্লেন বিখ্যাত হয়েছিল কুড়ি আর ত্রিশের দশকে, এখন কিছু যাত্রী পরিবহনকারী প্লেন বা সীপ্লেন হচ্ছে বাইপ্লেন শ্রেনির ,নাহলে এখন মোনোপ্লেনের রাজত্ব ।

4. সীপ্লেন বা সমুদ্রবিমান :-
আমরা সবাই জানি এই ধরনের প্লেনগুলো জল থেকে উড়তে(টেকিং অফ) এবং নামতে (ল্যান্ডিং)
এ সক্ষম। সীপ্লেন বা সমুদ্র বিমানকে দুভাগে ভাগ করা যায় , ফ্লোটপ্লেন আর ফ্লাইং বোট ।

5. ফ্লোটপ্লেন :-
যে ধরনের সীপ্লেনের ফিউজিলাজের নিচে ফ্লোট নামে একধরনের বায়ুর থেকে হালকা ফাঁপা কাঠামো থাকে( মূলত একাধিক) তাকে ফ্লোটপ্লেন বলে । এই ফ্লোট হতে পারে কিছু নির্দিষ্ট ফাঁপা বস্তু, মূলত প্লেনকে জলের উপর ভাসিয়ে রাখার জন্য এবং উড়তে পারা বা টেক অফ করার জন্য কাজে লাগে ।
এই ধরনের প্লেনগুলো জলে এবং স্থলে নামতে পারে,সেজন্য এগুলোকে উভচর বিমান বা এমফিবিয়াস এয়ারক্রাফটও বলে।

6. ফ্লাইং বোট:-
ফ্লাইং বোট হচ্ছে এমন এক ধরনের সী প্লেন ,যার ফিসজিলাজ বা মূল কাঠামোটা জলে ভাসে ,কাঠামোর দুপাশে বড় বড় ডানা থেকে ঝোলানো “হূল” (hull) এর সাহায্যে ।এই হূলের আক্ষরিক অর্থ হলো “জাহাজের কাঠামো”। মূলত যেকোনো ফ্লাইং বোট বা সীপ্লেনে ব্যাবহার করা হূলগুলো জাহাজের কাঠামো আকৃতিই হয় ।ল্যান্ডিং এর সময় মূল কাঠামোর সঙ্গে হূলও জলে ভাসে ।

Porco 2

এবার পোরকো রোসো সিনেমাতে ব্যাবহার করা প্লেনগুলোর দিকে চোখ বোলানো যাক ।

1. স্যাভোয়া এস -21:-
সিনেমার মূল হিরো পোরকোর লাল রঙের প্লেনটা হচ্ছে স্যাভোয়া এস-21। পোরকো যখন ইতালীয়ান এয়ার ফোর্স ছেড়ে আসে তখন এই প্লেনটাকে ফোর্স থেকে কিনে নেয় ।তার অনেক প্রিয় এই লাল রঙের প্লেনটার ইঞ্জিন হচ্ছে রোলস রয়েস ক্রেসট্রল (ক্রেসট্রল হচ্ছে বাজ জাতীয় এক ধরনের শিকারি পাখি,সেই থেকে নাম)।বারো সিলিন্ডারের আর সাতশো কুড়ি হর্স পাওয়ারের মোটর যুক্ত এই লাল “এড্রিয়াটিকের রানি”র সর্বোচ্চ গতিবেগ তিনশো কুড়িকিলোমিটার প্রতি ঘন্টা ।অস্ত্র হচ্ছে দুটো এমজি 08 টাইপের মেশিনগান ,যা প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মান এবং তার মিত্র সেনারা ব্যাবহার করত ।পোরকোর প্লেনের পেছনে যে R চিহ্নটা আছে সেটা রোসো আর রিপাবলিক ,এই দুটোর প্রতীক ।পোরকো ফ্যাসিবাদ ঘৃণা করত ।
এই শ্রেণীর প্লেন বাস্তবে সত্যিই ছিলো ,এবং মাত্র একটাই তৈরি করা হয়েছিলো ।রেসের জন্য বানানো এই প্লেনটাকে কনট্রোল করা ছিলো খুবই মুশকিল ।তো,প্রজেক্ট বাতিল ।
দুটোই ফ্লাইং বোট হলেও মিয়াজাকি পোরকোর স্যাভোয়া এস-21তে কিছু পরিবর্তন আনে,যা আসল স্যাভোয়া এস-21 থেকে আলাদা ।পোরকোর এস-21 টা মোনোপ্লেন আর আসলটা ছিলো বাইপ্লেন ।

2. কুরটিস আর থ্রি সি জিরো:-
ডোনাল্ড কুরটিস, যার সঙ্গে সিনেমার শেষের দিকে পোরকোর রেস এবং ডগফাইট হয়,তার প্লেনটা ছিলো আর থ্রি সি জিরো সিরিজের । বারোটা টা সিলিন্ডার যুক্ত ছশো দশ হর্স পাওয়ারের মোটর সর্বোচ্চ তিনশো আটচল্লিশ কিলোমিটার প্রতিঘন্টা বেগে যেতে পারতো ।এর অস্ত্র হচ্ছে দুটো এম টু ব্রওনিং মেসিনগান,যা আমেরিকাতে তৈরি ।
পোরকোর প্লেনের মতোই ,এই শ্রেণীর প্লেনও সত্যি ছিলো,যা 1925 সালে আমেরিকায় তৈরি হয় ,মূলত রেসিং এর জন্য ।তৈরি করে “কুরটিস এরোপ্লেন এন্ড মোটর কোম্পানি”, যার প্রতিষ্ঠতা গ্লেন হ্যামনড কুরটিস, আমেরিকার এরোপ্লেন জগতের অন্যতম পায়োনিয়ার ।

3. ডাবোহায (যে) :-
এটা সিনেমার সী পাইরেটদের ফ্লাইং বোট ,যা একটা মোনো প্লেন।এর বডি স্টিলের তৈরি, যেখানে স্যাভোয়া এস -21 আর কুরটিস আর থ্রি সি জিরোর বডি কাঠের তৈরি ।দুটো রোলস রয়েস ঈগল ফোর ইঞ্জিন,বারোটা সিলিন্ডার যুক্ত তিনশো ষাঠ হর্স পাওয়ারের ক্ষমতা দিয়ে সর্বোচ্চ একশ তিরানববই কিলোমিটার প্রতি ঘন্টা গতিবেগ দিতে পারে ।
এটি একটি কাল্পনিক প্লেন, সম্ভবত মিয়াজাকির মস্তিকপ্রসূত।

Porco 3

আকিরা: জাপানের ইতিহাসের আয়না — Anirban Mukherjee

আকিরা নিয়ে আমার দু-পয়সা

প্রথমত ,”সিনেমা vs মাঙগা ” এটা সম্পূন ফালতু তুলনা আমার কাছে,কারন যে জিনিসটাকে বেস করে সিনেমা বানানো হয়(সাহিত্য অথবা মাঙগা) সেটা অনেকটা আর্ট ক্লাসের ছবি আঁকার জন্য সাজানো মডেলের মত,সিনেমা হচ্ছে মডেল দেখে আঁকা চিত্রটা । আর অবশ্যই, আমরা যদি একই মডেল দিয়ে ,তিশিয়ান, পিকাসো এবং কোন পোস্ট মর্ডান চিত্রকরকে বসিয়ে দি ছবিটা আঁকতে ,তবে আউটপুট তিনটিতেই আলাদা হবে ।এখানেই সিনেমা পরিচালকের কৃতিত্ব,যেমনটা মডেল দেখে আঁকা কোন চিত্রকরের ।সেজন্য কলা মাধ্যম হিসাবে ,সিনেমাকে ,সাহিত্যের চেয়ে চিত্রশিল্পের সবচেয়ে কাছের মনে হয়,আমার ।

দুটো আলাদা মাধ্যম ,এবং দুটো আলাদা মাধ্যমে পরিচালক এবং লেখক (দুজনা একই লোক) দুটো আলাদা ভাবে জিনিসটা দেখাতে চেয়েছে ।
আমার মনে হয় কাটসুও ওতোমো সিনেমাতে সেটা সবচেয়ে ভালো সফল হয়েছে ,
আসলে গোটা সিনেমাটা হচ্ছে জাপানের ইতিহাসের আয়না। জিনিসটা ব্যাখ্যা করা যাক ,

1/সিনেমার প্রথমে আকিরার ধংস হয়ে যাওয়া হচ্ছে হিরোসিমা আর নাগাসাকির রুপক(মেটাফোর)।
2/তারপর নিউ টোকিও গঠন, সেখানে একটা আপাত উন্নত কিন্তু ভেতরে ধংস হওয়া ভোগবাদী সমাজ গঠন হচ্ছে,সেটা 1945 থেকে 19985 এর জাপানের প্রচণ্ড উন্নত অর্থনীতি অগ্রগতির প্রতীক(লক্ষ রাখবেন সিনেমাতে যে 2019 সালে অলিম্পিক দেখানো হয়েছে সেটা 1964 টোকিও অলিম্পিক এর প্রতীক)।

3/আপাত গনতন্ত্রের প্রভাব থাকলেও নিউ টোকিও এবং জাপানে মিলিটারির প্রভাব খুব ছিলো,এই মিলিটারি আবার আকিরাকে সৃষ্টির জন্য দায়ী ।এই মিলিটারি হচ্ছে আমেরিকার প্রতীক,যে আবার হিরোসিমা, নাগাসাকির জন্য দায়ী কিন্তু যুদ্ধে জিতে যাওয়ার জন্য পোস্ট দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ জাপানের মিলিটারি গঠন ,সংবিধান প্রনয়ন এবং অন্য অনেক ক্ষেত্রেই ভূমিকা নেয়,যেমন নিউ টোকিওর মিলিটারি আকিরার জন্য দায়ী হয়েও পোস্ট আকিরা ঘটনার পর সেখানকার রাজনৈতিক নেতাদের নির্ভর যোগ্যতা পেয়েছিল ।
4/ তেটসুও এর বিশাল মাংসের ডেলাতে পরিনত হওয়া এবং তার জন্য হওয়া ক্ষতি এগুলো হচ্ছে 1980s এর জাপানের অর্থনৈতিক বাবলস ধংস হওয়ার প্রতীক,যে অর্থনৈতিক বাবলসটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তৈরি হয় ।এবং তেটসুও- পরবর্তী নিউ টোকিও এর সঙ্গে আমরা দর্শকরা 1990 দশক এর জাপানকে মিলিয়ে দিতে পারি,যাকে জাপানের লস্ট জেনারেশন বলে,যেটা 1980 দশকের অর্থনৈতিক অস্তিরতা থেকে উঠছে এবং কিন্তু চারিদিকে রুগন চেহারা।
মাঙগাতে অনেক ঘটনা আছে যেগুলো গল্প হিসাবে শুধুই গল্প, কোন বাস্তব ঘটনাকে দেখতে পাচ্ছি না ।সেজন্য সিনেমাটা হয়ে উঠেছে জাপানের ইতিহাসের আয়না ।

Akira

সিনেমাতে অনেক ধর্মীয় রেফারেন্স আছে , অন্য সিনেমার রেফারেন্সও ।যেমন প্রথম দিকে blade runner এর রেফারেন্স বা শেষে কুরবিকের 2001 এর সঙ্গে সঙ্গতি রাখা ।
সব ধরনেই ধর্মে এইরকম একটা মত আছে ,যে ধর্মে বিশ্বাসী প্রবল ভাবে ঈশ্বরের অনুসন্ধান চালাতে লাগল তখন দেখল সে আর ঈশ্বর আলাদা নয়,যেমন সুফিবাদ ।ফেসবুকে সুফিবাদ নিয়ে একটা পোস্টে কদিন আগে একজন লিখেছিলো যে সুফিবাদকে পাখির রুপক দিয়ে ব্যাখা করা যায়, পাখিরা সবাই তাদের বাদশা সী মোরগের কাছে যাচ্ছিল তাদের দলপতি হুদহুদের নেতৃত্বে ,যখন পৌছল তখন দেখল তারা নিজেরাই সবাই এক এক জন সী মোরগ হয়ে গেছে ।
কল্প বিজ্ঞানের জগতে একটা জনপ্রিয় অংশ হচ্ছে পোস্টহিউম্যানের কনসেপ্ট ।বাঁদর জাতীয় প্রানী থেকে মানুষের বিবর্তন ,এবং সেখান থেকে আরও আরও সুপিরিয়র কিছু ঈশ্বর প্রতীম এনট্রিটিতে বিবর্তন ।সেজন্য কুরবিকের 2001 এ ডেভিড ব্যোওম্যান ,আর একটা ঈশ্বর প্রতীম সভ্যতার সাহায্যে অসীম শক্তিশালী স্টার চাইল্ডে পরিনত হয়, যা আকিরাতে, আকিরার সাহায্যে তেটসুও এর ঈশ্বর হওয়ার মতনই ।মাঝে সিনেমার যা বিষয়বস্তু ,আকিরাকে খোঁজা,সেটা আমাদের মানতিকুত তৈয়ায়ের পাখিদের সী মোরগের খোঁজকেই মনে করায়,অথবা আমাদের রক্ত পিচ্ছিল মানবসভ্যতাকে ।

লেখাটা লিখতে একটা ভালো ভিডিও রিভিউ এর সাহায্য পেয়েছিলাম,যেটা অনেকদিন আগে দেখার হেতু হারিয়ে ফেলেছি ।নাহলে ভিডিওটার লিংক দিতাম ।