নিনগিও শিরিযুউ (মারমেড ফরেস্ট) — Anirban Mukherjee

নিনগিও শিরিযুউ (মারমেড ফরেস্ট)
আনিমে টিভি সিরিজ পরিচালক:- মাসাহারু ওকুয়াকি

mf 1

পৃথিবীর প্রায় প্রত্যেক সভ্যতার মিথোলজির দিক থেকে দুটো মিল আমাদের চোখে পরে ।হোক না সেই সভ্যতা মূল ইউরেশিয়ান ভূপৃষ্ঠ থেকে হাজার হাজার বছর ধরে বিচ্ছিন্ন, তবুও মহাপ্লাবন আর মৎসকন্যা বা মারমেডের(মারপিপলস) মিথ সেখানকার মিথোলজিতে পাওয়া যাবে,হয়ত কিছু ব্যাতিক্রম থাকবে ।মহাপ্লাবনের মিথের কথাই ধরা যাক, প্রাচীন সুমেরদের “ইরিডু জেনেসিস”,প্রাচীন ব্যাবিলনে গিলগামেশের মহাকাব্যে বর্নিত মহাপ্লাবন,বাইবেলের নোয়ার আর্ক, গ্রীক পুরানে বর্নিত তিনটি মহাপ্লাবন, আইরিশদের লেবর গ্যাবালা স্যাসার এর বর্নিত মহাপ্লাবন,নর্সদের বের্গেল্মির দানব আর মহাপ্লাবনের কাহিনী, মধ্য আমেরিকায় মায়ানদের “পোপোল ভূ”তে বর্নিত মহাপ্লাবনের কাহিনী, দক্ষিন আমেরিকার উনু পাচাকুটি বা (ভিরাকোচার অভিশাপে)লেক টিটিকাকায় মহাপ্লাবন, হাওয়াই মিথোলজির নু’উ আর মহাপ্লাবনের কাহিনী, হোপিদের উপকথায় ,মাউরি উপকথায় -মহাপ্লাবনের মিথ আছে পৃথিবীর সব সভ্যতার প্রান্তে ,ভারতীয় উপমহাদেশেই আছে তিন চারটে আলাদা মহাপ্লাবনের কাহিনী (তারমধ্যে সবচেয়ে অবিশ্বাস্য হলো আন্দামানের আদিবাসীদের মিথটা ,যারা উপমহাদেশের মূল ভূপৃষ্ঠ থেকে হাজার হাজার বছর বিচ্ছিন্ন)।

সেই রকম মারমেড বা মৎসকন্যা জাতীয় প্রানীর মিথ,চিত্র বা দেওয়াল চিত্র কিংবা গুহাচিত্র গোটা পৃথিবীর সব সভ্যতার প্রান্তে প্রচলিত ,সেটা পেরুর কুসকোর প্রাচীন পাথুরে দেওয়ালে অঙ্কিত মারমেড রিলিফ হোক,বা প্রাচীন আসিরিয়ার উপকথা পুরানের দেবী আট্রাগেটিস,এমনকী আলেকজান্দারের বোন থেসালোনিকা , গ্রীক উপকথা মতে যে মরার আগে একটা মৎসকন্যায় রুপান্তর হয়।আরব্য রজনীর আবদুল্লাহর অদ্ভুত জলজগৎএ ভ্রমনের গল্প, বা ব্রিটেনের প্রাচীন উপকথায় ,যেখানে মৎসকন্যা অশুভ জিনিস,আবার সেই পশ্চিম ব্রিটেনের জেনোরের কোন এক গ্রামে,আটলান্টিকের তীরে,ম্যাথু নামে এক মানুষের সঙ্গে এক মৎসকন্যার প্রেম হয়, এই ভাবেই বিভিন্ন লোককথায় মৎসকন্যারা বেঁচে থাকে ।

জাপান সমুদ্র দিয়ে ঘেরা দেশ,সেখানে মৎসকন্যার উপকথা থাকবে না এমন নয়।”নিনগিও”(উচ্চারনটা আবার বিভিন্ন ভাষায় বিভিন্ন দেখলাম,ফ্রেঞ্চ এ একরকম,ইংরেজিতে অন্যরকম ,আমার এটাই সঠিক মনে হলো , “人魚”) হচ্ছে সেখানকার মৎসকন্যাদের জাপানিজ নাম, “人魚”কে যদি গুগল ট্রান্সলেটর এর সাহায্যে বাংলায় অনুবাদ করা হয় তবে ফলাফল দিচ্ছে মৎসনারী।
জাপানের বিখ্যাত মৎসকন্যার গল্প “ইয়াও কিকুনি”,যার সঙ্গে আজকের আলোচ্য বিষয় মারমেড ফরেস্ট (বা সাগার) মিল প্রচন্ড ।

“ইয়াও বিকুনি” বা “আটশ বছর বয়সী বৌদ্ধ সন্ন্যাসিনী” গল্পে একজন ধীবর জাপান সাগরের তীরে ওয়াকাসা এলাকায় থাকতো, একদিন সে একটা অদ্ভুত ধরনের মাছ ধরলো তার জালে ,এমন মাছ সে কোনদিনই ধরেনি ,দেখেওনি।সে তার বন্ধুদের আমন্ত্রণ জানালো তার বাড়িতে, মাছটা সবাই মিলে একসঙ্গে খাওয়ার জন্য ।

তার একজন বন্ধু একটু কৌতুহল হয়ে ধীবরের রান্নাঘরে ঢুকলো ,এবং দেখলো ঐ মাছটার মাথাটার জায়গায় পুরো একটা মানুষের মাথা, সে তো অবাক । তারাতারি তার অন্য বন্ধুদের বললো ঐ মাছটা যেন তারা না খায় ।

যথাসময়ে ধীবর লোকটা মাছটাকে রান্না করে নিয়ে এল এবং সাকের সঙ্গে আমন্ত্রিত অতিথি বন্ধুদের পরিবেশন করল।অতিথি বন্ধুরা বললো এই মাছটা তারা বাড়িতে নিয়ে গিয়ে খেতে চায়,সেইমত কাগজ দিয়ে মুড়ে দিতে ।ধীবর তাই করল এবং বন্ধুরা বাড়ি যাওয়ার পথে রাস্তাতে মাছগুলো ফেলে দিলো ।

কিন্তু একজন বন্ধু একটু বেশিই সাকে খেয়ে ফেলেছিলো,সে মদের ঘোরে মাছটাকে বাড়িতে নিয়ে এলো ।তার ছোট মেয়ে তার কাছ থেকে উপহার চেয়ে বসলে সে মদের ঘোরে কাগজে মোড়া মাছটা তাকে দিলো ।কিছুক্ষণ পরেই তার মদের ঘোর কেটে গেলে সে দেখল একি করলাম,তার মেয়েকে সঙ্গে সঙ্গে নিরস্ত করতে গেল যাতে সে মাছটা না খায়।কিন্তু কে কার কথা শোনে,নিষিদ্ধ বস্তুর প্রতি আগ্রহ সবার বেড়ে যায় ,সে ছোট হোক বা বড় ।বাচ্চা মেয়েটা মহাআগ্রহে মাছটা খাওয়ার পর তার বাবা মেয়েটা মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে লাগে ।সময় যায়,মেয়েটার কিছুই হয় না,বরং আরও বেশি সময় যায় ,বাচ্চা মেয়েটা যুবতী হয়,বিয়ে হয় এবং আরও সময় যায়, মেয়েটার স্বামী বুড়ো হতে থাকে এবং একসময় মরেও যায় ,কিন্তু মেয়েটার বয়স বাড়ে না ,যুবতীই থেকে যায় এবং এভাবে ক্রমশ আটশ বছর বহুবার বিধবা হওয়ার পর সে সংসারের প্রতি বিতৃষ্ণা চলে আসে,নিজের অমরতাকে বোঝা মনে হতে লাগে এবং শেষে একটু শান্তির খোঁজে বৌদ্ধ সন্ন্যাসিনী হয়ে যায়।

ইনুইয়াসা, রান্মা 1/2 এবং ওয়ান পাউন্ড গসপেল খ্যাত মাঙ্গাকার রুমিকো তাকাহাসি তার দেশেরই এই বিখ্যাত উপকথাকে তার তৃতীয় মাঙ্গার প্লট নির্মানের জন্য ব্যাবহার করলেন ,এবং মাঙ্গা শেষ হওয়ার নবছর পর আমরা পেলাম এর আনিমে এডাপশন ।মাসাহারু ওকুয়াকি যার পরিচালক ।

মারমেড ফরেস্টের মূল নায়ক ইয়োটা,ইয়াও বিকুনির সেই মেয়েটার মতোই অমরতার অভিশাপে সে জর্জরিত ।পাঁচশ বছর আগে সে ও তার কিছু বন্ধু ধীবর ছিলো ,তারাও মৎসকন্যা শিকার করেছিলো,একসঙ্গে খেয়েছিলো ।কিন্তু কয়েকজন বন্ধু সঙ্গে সঙ্গে বিষাক্রান্ত হয়ে মরে যায়,কিছু বন্ধু প্রচন্ড কুৎসিত এক দানবে পরিনত হয়,যাদের নাম আমরা দেখতে পায় “লস্ট সোল” হিসেবে ।ইয়োটা ভয় পেয়ে যায় তারও কিছু এরকম হবে একদিন ।কিন্তু সেই “একদিন ” কোন দিনও আসে না ।সময় যায় ,সে এসব কিছু ভুলে যায় ,বিয়ে করে সংসার পাতে ।আরও সময় যায়,তার স্ত্রী অভিযোগ করে সে বৃদ্ধ হচ্ছে কিন্তু ইয়োটা সেই একই যুবক আছে ।ক্রমশ সে উপলব্ধি করে সে অমর হয়ে গেছে,কিন্তু সে স্বাভাবিক ভাবে মরতে চায় ,সংসার ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে আবার মারমেডের সন্ধানে ।সে শুনেছে আবার যদি সে মারমেডের মাংস খায় তবে সে মরনশীল মানুষে পরিনত হবে ।
প্রথম এপিসোডে দেখি ,ইয়াটো পাঁচশ বছর পর এই আধুনিক জগৎ এ শেষ অবধি মারমেডদের এক আস্তানার সন্ধান পায়।জাপানের কোনও সূদূর কোনে এক সমুদ্র ঘেরা পাহাড়ি গ্রামে ,যেখানে একই রকম দেখতে যুবতী আর একই রকম বৃদ্ধারা গ্রামের অধিবাসী ।তারাই আসলে মারমেড ।মারমেডরাও ক্রমশ বৃদ্ধ হয়,কিন্তু তারা আবার যৌবন ফিরে পেতে কোনও মানুষের মেয়েকে ছোটবেলায় ধরে আনে,তাকে পনেরো বছর ধরে পায়ে বেড়ি পরিয়ে মানুষ করে ,এবং একসময় তাকে মারমেডের মাংস খাওয়ায় ।ফল হয় দুটো ,সে হয়ত বেঁচে যায় এবং অমর হয়ে যায় ,নাহলে বিষের কারনে মরে যায় কিংবা লস্ট সোলে পরিনত হয় ।

যে বেঁচে যায় সে কিন্তু আর অমরতার স্বাদ অনুভব করতে পারে না ।সে ঐ বৃদ্ধ মারমেডদের খাবারে পরিনত হয়,এবং ঐ বৃদ্ধ মারমেডরা আবার যৌবন ফিরে পায় ।

মানা,এইরকমই একজন মেয়ে ,যাকে মারমেডরা বন্দি করে রেখেছিলো খাবে বলে,ইয়োটা তাকে বাঁচায়,যদিও ততক্ষন সে অমর ।

দ্বিতীয় এবং তৃতীয় এপিসোডে,ইয়োটার অতীতকে আমরা দেখি,যেখানে সে টোবা দ্বীপের (নামেমাত্র) জলদস্যুদের নেতার মেয়ে রিনের সঙ্গে শাকাগামি দ্বীপের জলদস্যুদের বিরুদ্ধে যায়।দুপক্ষই মারমেড মাংসের জন্য একে অপরের উপর চরাও হয় ।রিনের বাবা , শাকাগামি দ্বীপের জলদস্যুদের প্রধানের স্ত্রী ইশাগো দ্বারা আহত হয়,রিন আর ইয়োটা মনে করে রিনের বাবা মারা যাবে ,সেজন্য মারমেড মাংসের খোঁজে সমুদ্রে পারি দেয় দুজনে ।তারা মারমেডের খোঁজ পেলেও ,শাকাগামি দ্বীপের জলদস্যুরা তা কেড়ে নেয় ,ইয়োটাকে মেরে ফেলে এবং মারমেডের মাংস আর রিনকে শাকাগামি দ্বীপের জলদস্যু প্রধানের কাছে নিয়ে আসে ।সবাই মাংস খায় এবং একে একে লস্ট সোলে পরিনত হয় ।অমর ইয়োটা মরেও মরে না! রিনকে উদ্ধার করে,এবং সব শেষে জানতে পারে ইশাগোও একজন মারমেড ।

এর পরের এপিসোড থেকে আবার বর্তমানে ফিরে আসে সিরিজের গতিপথ,আমরা ক্রমে মাসাতো, মিশা,ওমানাকো প্রভৃতি চরিত্রের সঙ্গে পরিচিত হয় ।মাসাতো,একজন সাতশো বছর বয়সী “বাচ্চা ছেলে”।যে খুব ছোট বয়সে মারমেডের মাংস খেয়েছিলো,তারপর তার আর বয়স বাড়েনি ।আসল বাবা মাকে হারানোর পর সে গত সাতশো বছরে বহু বাবা মা পেয়েছে,আবার তাদের হারিয়েছে বিভিন্ন যুদ্ধে,দুভিক্ষে অথবা স্বাভাবিক ভাবে ।ক্রমশ সে একজন ছোটখাটো স্যাইকোপ্যাথে পরিনত হয়েছে ,তবুও শেষ অবধি মিশাকে তার মা বানিয়েছে ।মিশাও তার আসল ছেলে এবং স্বামীকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হারিয়েছে ।এরপর তার সঙ্গে মাসাতোর আলাপ হয়,সে তাকে এক অদ্ভুত মাংস খেতে দেয় ।খাওয়ার অনেক দিন পর মিশা উপলব্ধি করে সে আর তার পালিত ছেলে মাসাতো কেউ বয়সে বাড়ছে না ।সে ভয় পেয়ে যায় ।

শেষের এপিসোডটা প্রচন্ড রক্তিম হিংস্র (ব্রুটাল)।মাসাতো শেষ এপিসোডে নিজের হিংস্রতাকে খুব শান্তভাবেই প্রদর্শন করেছে,যেটা যেকোনো সাইকোর খুব স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য । আবার এই শেষ এপিসোডেই এন্ডিং সংএর আগে শেষ তিন চার মিনিট প্রচন্ড ভালো লেগেছে ।
পরিচালক মাসাহারু ওকুয়াকি খুব ভালোভাবেই গোটা প্রজেক্টটা সামলেছেন ।সুন্দর অ্যানিমেশন,আমার বরাবরই গত দশকের প্রথমদিকের আনিমের অ্যানিমেশন ভালো লাগে ।কালারফুল ব্যাকগ্রাউন্ড, ব্যাকগ্রাউন্ডে প্রয়োজনমত প্রচুর নীল এবং গাঢ় নীল আর কমলা রঙের দুর্দান্ত ব্যাবহার আর প্রচন্ড ভালো ডিটেলিং যা প্রাচীন বা আধুনিক দু ধরনের জাপানকেই সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলেছে ।এবং প্রচন্ড ভালো চরিত্র রুপায়ন ।ইয়োটা আর মানা প্রাতেক্য এপিসোডে প্রয়োজন মত আলাদা আলাদা জামা কাপড় পড়েছিল,একটা জামা পড়ে গোটা সিরিজ কাটায় নি (এটা নিশ্চয়ই দেখেছেন কীভাবে লুফি বা নোবিতা বছরের পর বছর প্রায় একই জামা পড়ে কাটিয়ে দেয়) ।এটা বাস্তব বুদ্ধিযুক্ত ডিটেলিং এর একটা ছোট উদাহরণ ।

মারমেড বা মৎসকন্যা,এই ধরনের মিথোলজিক্যাল জীবের সঙ্গে বাচ্চা বয়সে আমরা পরিচয় হয় হানস এন্ডারসনের লিটিল মারমেড বা তার অতিসফল ডিজনির অ্যানিমেশন এডাপটেশনের সঙ্গে ,বা কোন শিশুপাঠ্য বাংলা পাক্ষিক পত্রিকার পাতায় রুপকথার গল্পে(আমার ছোটবেলায় আনন্দমেলাতে বা ঐ টাইপের ছোটদের পত্রিকাতে পড়া কিছু নাম ভুলে যাওয়া রুপকথা এক্ষেত্রে মনে আসছে) বা অবশ্যই মিয়াজাকির পোরনিওতে ।কিন্তু পরে বড় হয়ে একই মিথোলজিক্যাল জিনিসকে এইরকম হিংস্র অথবা ভয়ঙ্কর সুন্দর ভাবে পরিচয় লাভ করা যায় আনিমের পর্দাতে ।
এই আনিমেতে কিছু মারমেড হোমারের ওডিসির সাইরেনদের কথা মনে পড়িয়ে দেয়।শান্ত হিংস্র ।

ওপেনিং সংটাও দুর্দান্ত (ও প্লিজ কাম ডাউন লাইক এন অ্যাঞ্জেল)।

mf 2

Comments