কন আর্ট – স্বপ্ন, বিভ্রম আর চলচ্চিত্রের প্রতি প্রেমপত্র — Fahim Bin Selim

১৮ মে, ২০১০।

টোকিওর মুশাশিনো রেডক্রস হাসপাতালে সাতোশি কনের মৃত্যুপাঠ পড়ে শোনানো হল। সাথে ড্রিমিং মেশিন-এরও – স্ক্রিপ্ট আর ১৫০০ এর মধ্যে ৬০০ শট সম্পূর্ণ হওয়ার পরও – কারণ কাপ্তান কন তখন আর তার হাল ধরে থাকার মত অবস্থায় ছিলেন না – তাঁর দর্শন নিয়ে,  নির্দেশনাশৈলী নিয়ে – যে জাহাজ একমাত্র তিনিই সৈকতে ভেড়াতে পারতেন। তিনি যদিও আরও ৩ মাস বেঁচে থাকবেন, কখনো হাসপাতাল বিছানায়, কখনো নিজের বাসার; ক্যান্সারের আক্রমনে ক্রমাগত হার মানতে থাকা অগ্ন্যাশয় নিয়ে। একেবারে কাছের আত্নীয় আর সহকর্মী ব্যতীত বাকিদের কাছ থেকে এ খবর অজানা থাকবে একেবারে শেষ দিন পর্যন্ত।

এই টোকিওর মুশাশিনো আর্ট ইউনিভার্সিটিতেই সাতোশি কনের হাতেখড়ি, গ্রাফিক ডিজাইনিং এর উপর। যদিও তার জন্ম আর বেড়ে ওঠা হোক্কাইদোর সাপ্পোরোতে। ছোটবেলায় কনের সময় কাটতো ফিলিপ কে. ডিক(Blade Runner) আর ইয়াসুতাকা সুতসুই(The Girl Who Leapt Through Time, Paprika) এর সাই-ফাই উপন্যাস পড়ে, আর দেশী-বিদেশী চলচ্চিত্র দেখে – বিদেশীই বেশি। ১৯৭৪ সালে, কন খুঁজে পেলেন তাঁর পছন্দের দুইটি জিনিসের সংমিশ্রণ – সাইন্স ফিকশনের অবাধ্য কল্পনাশক্তি আর তার সাথে অ্যানিমেশনের চলচ্চৈত্রিক স্বাচ্ছন্দ্যতা, একই কাপে – স্পেস ব্যাটলশীপ ইয়ামাতোতে। সাতোশি কন অ্যানিমের প্রেমে পড়ে গেলেন।

 

অবশ্য তাঁর পেশাদারিত্বের শুরুটা হয়েছিলো মাঙ্গা দিয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই কনের প্রথম মাঙ্গা – Toriko(১৯৮৪) – কোদানশার তেৎসুয়া চিবা অ্যাওয়ার্ডে রানারআপের পুরস্কার পেয়ে গেল। সাথে তাঁর সুযোগ মিলল কাৎসুহিরো ওতোমোর(Akira, Patlabor, Memories) সহকারী হয়ে যাওয়ার। কন পরবর্তীতে শুধু মাঙ্গাতেই না, স্ক্রিপ্টরাইটার, অ্যানিমেশন ডিরেক্টর হিসেবে ওতোমোর বেশ কয়েকটি অ্যানিমে চলচ্চিত্রের কাজেও সহযোগী ছিলেন। যার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ১৯৯৫ এর তিনখন্ডের ওভিএ Memories-এর Magnetic Rose অংশ। কন তার প্রথম সিরিয়ালাইজড মাঙ্গা প্রকাশ করে্ন ১৯৯০ তে; Kaikisen – এর কাগজে কাগজে, সাদাকালোর কালির আঁচড়েও তার অসাধারণ সিনেমাটোগ্রাফির পরিচয় পাওয়া যাবে, যা পরবর্তীতে তার অ্যানিমে চলচ্চিত্রগুলোর অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হিসেবে পরিচিতি পায়।

027 028

আর এর প্রথমটি ১৯৯৭ এর Perfect Blue। ইয়োশিকাজু তাকেউরার উপন্যাস অবলম্বনে তৈরী এ চলচ্চিত্র প্রথমে হওয়ার কথা ছিলো লাইভ-অ্যাকশনে। পরে কনের হাতে দায়িত্ব পরে ম্যাডহাউজের হয়ে এর অ্যানিমেটেড ওভিএ তৈরি করার। কন দায়িত্ব নিলেন ঠিকই, কিন্তু কাহিনীর মূল অংশ – আইডল, স্টকার আর হ্যালুশিনেশন – কেবল ঠিক রেখে গল্পের পুরো কাঠামোই বদলে নিলেন নিজের মত। যাতে যোগ হল সেসময়কার ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা পেতে থাকা ইন্টারনেট। নিজের প্রিয় Slaughterhouse-Five বই থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে  Perfect Blue-র গল্প কন বললেন অনেকটা অসংযুক্ত আখ্যানে। যেখানে সময় কেবল সরলরৈখিক না, আর এতে দেখানো ঘটনাও ধ্রুবসত্য না। তা ব্যক্তি আপেক্ষিক। কল্পনা, স্বপ্ন, অবচেতন – সবই ব্যক্তির সময়ের অংশ, বর্তমান-এর অংশ।  পরবর্তী চলচ্চিত্রগুলোতেও যা ঘুরেফিরে এসেছে।

ma

ওভিএ হিসেবে না, ম্যাডহাউজ Perfect Blue-কে মুক্তি দিলো প্রেক্ষাগৃহেই। প্রথম চলচ্চিত্র দিয়েই কন পেয়ে গেলেন দেশি-বিদেশি সমালোচকদের প্রশংসা, । Perfect Blue ডাক পেল বিভিন্ন দেশের ফিল্ম-ফেস্টিভ্যালগুলোয় – পেল তাৎক্ষনিক কাল্ট ক্লাসিকের মর্যাদা আর চিরদিনের জন্য কালজয়ী সব সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার মুভিদের পাশে স্থান।

2

চলচ্চিত্র-প্রেমিক কনের প্রথম মুভিতেই তুলে আনলেন বিনোদন-জগতের অন্ধকার দিক। যদিও ঠিক সামাজিক-ভাষ্য প্রদান  বা সমালোচনা   কখনোই তার মূল উদ্দেশ্য ছিলো না। Perfect Blue নিয়ে কনের চিন্তাভাবনা, আর মূলচরিত্র মি্মা কিরিগোয়ের পতন নিয়ে বরং সমান্তরাল টানা যায় । গল্পে মিমা সাধারন এক পপ-আইডল থেকে যতই বিনোদন জগতের উপরের তলায় আরোহণ করতে থাকে – মানসিক আর শারীরিক বিভিন্ন ত্যাগ সহ্য করে – ততই তার কাছে চেতন আর অবচেতনের বিভেদ ভাঙ্গতে শুরু করে। তার আকাংক্ষিত স্বপ্নালোক বিভীষিকায় রুপ নেয়।

আমি যখন Perfect Blue এর কাজ শুরু করি তখন আমার উদ্দেশ্য ছিল ইতিবাচক কিছু বানানো। কিন্তু আমি যতই সামনে আগাতে থাকলাম, ততই  গল্পটা আরো নেতিবাচক হয়ে যাচ্ছিলো, আর গম্ভীর হয়ে যাচ্ছিলো। একদিক দিয়ে এটা নিয়ে আমি বেশ অসন্তুষ্ট ছিলাম। [১]

 

চলচ্চিত্রের প্রতি কনের ভালোবাসার প্রকাশ তার অন্য মুভিগুলোতেও বারবার ঘুরে ফিরে এসেছে(Tokyo Godfathers একমাত্র ব্যতীক্রম)। Paprika(2005)-‘র স্বপ্ন আর বাস্তবতা একাকার হওয়ার গল্পে নায়ক কানোকাওয়া পেশায় গোয়েন্দা হলেও, ছিলো ফিল্মস্কুলের ছাত্র। তাই তো তার ঘুমের মাঝে হানা দেয় যৌবনের অপূর্ণ বাসনা – নিজেকে সে আবিষ্কার করে তার প্রিয় চলচ্চিত্রগুলোর নায়কের ভূমিকায় – কখনো Tarzan-এ, From Russia With Love-এ, অথবা Roman Holiday-তে; কখনো বা আবার পরিচালক হওয়ার প্রচেষ্টায় ব্যার্থ কানোকাওয়া নিজেকে কল্পনা করে স্ব্য়ং আকিরা কুরোসাওয়ার জায়গায়!paprika5

তবে চলচ্চিত্রের প্রতি কনের অকৃত্রিম ভালোবাসার সবচেয়ে বড় নিদর্শন তার দ্বিতীয় চলচ্চিত্র, তার সবচেয়ে সমালোচক-প্রশংসিত-ও, ২০০১ সালের Millennium Actress।

 

Perfect Blue নিয়ে কনের যে অসন্তুষ্টি ছিলো, তা দূর করার উদ্দেশ্যেই Millennium Actress-এর আগমন। এ দুটো মুভিকে যেন এক জোড়া, একই মুদ্রার দুই পিঠ। সাতোশি কন ফিরিয়ে আনলেন তার পুরোনো সেই মূল থিম – আইডল  আর অ্যাডমায়ারার-এর গল্প – কিন্তু এবার সম্পর্কটা অবশেসন এর না, বরং প্রকৃত ভালোবাসা আর শ্রদ্ধার। কনের  আকাংক্ষিত ইতিবাচক এক ছবি।

আমি যখন প্রযোজকের সাথে Millennium Actress এর কাজ হাতে নিলাম, তখনই আমার লক্ষ্য ছিল আইডল-অ্যাডমায়ারার নিয়ে আরেকটি গল্প বলা। যেন  এদুটি সহোদর চলচ্চিত্র হবে।

শুধু গল্পের দিক দিয়েই না, আখ্যানেও Millennium Actress ছিলো Paprika আর Perfect Blue-‘র মত আনঅর্থডক্স(Tokyo Godfathers এখানেও ব্যতীক্রম!)। পাশাপাশি ভিজুয়ালেও কন নিয়ে আসলেন সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী এক সিনেমাটিক টেকনিক – Trompe-l’œil. দ্বিমাত্রিক চলমান ছবি দিয়ে ত্রিমাত্রিক বিভ্রম তৈরী করার এর চেয়ে উৎকৃষ্ট উদাহরন হয়তো বড় পর্দায় আর খুব বেশি পাওয়া যাবে না। Millennium Actress তার ৮৭ মিনিটের ব্যপ্তীকাল জুড়ে এক অনবদ্য ট্যুর-ডি-ফোর্স। চিয়োকো ভেসে বেড়ায় স্থান-কাল আর বাস্তব-রুপালী পর্দার রেখার উপর দিয়ে – কুরোসাওয়ার[২] এডোতে, মাঞ্চুরিয়ার প্রোপাগান্ডায়, যুদ্ধের ধ্বংসস্তুপে পরিণত হওয়া শহরে, ওযুর[৩] কোন প্রথম-গ্রীষ্ম অথবা বসন্ত-শেষের টোকিওতে, আবার অনেক অনেক দূরের কোন ভবিষ্যতের এক মহাকাশযাত্রায়।

Millennium Actress, সেতসুকো হারা[৪] আর হিদেকো তাকেমিনে[৫] – জাপানের দ্বিতীয় সহস্রাব্দের কালজয়ী সব নায়িকাদের প্রতি সশ্রদ্ধ-স্বীকৃতি, একই সাথে জাপানের ইতিহাস, তার চলচ্চিত্রের ইতিহাসের প্রতি “অ্যাডমায়ার” কনের প্রেমপত্র। সাতোশি কনের আর বাকি সব চলচ্চিত্রগুলো মতই তাতে লজিক গুরুত্বপূর্ণ না, ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর মধ্য থেকে কোন বার্তা খুঁজে বের করা গুরুত্বপূর্ণ না – এখানে যাত্রাটাই মুখ্য বিষয়।  আর এ যাত্রা এক অতুলনীয় অভিজ্ঞতা – যা বইয়ের পাতায় পাওয়া সম্ভব না, গানের সুরে পাওয়া সম্ভব না, মানব অভিনীত চলচ্চিত্রেও পাওয়া সম্ভব না।

 

নিশ্চিতভাবেই এই ধারা Dreaming Machine-এও বজায় থাকতো – যেমন কন তার দর্শকদের আমন্ত্রন জানিয়েছিলেন Paprika-‘র শেষ দৃশ্যে।

drea

কিন্তু সেই সাতোশি কন কিনা ২০১০ এর আগষ্টে মারা গেলেন মাত্র ৪৭ বছর বয়সে!

Dreaming Machine  বের হওয়ার স্বপ্ন হয়তো স্বপ্নই থেকে যাবে। কিন্তু স্বপ্নই বা খারাপ কী? একটা জিনিস যদি  সাতোশি কনের মুভিগুলো শিখিয়ে দিয়ে থাকে, তবে তা হল: স্বপ্ন আর বাস্তবতা মিশে যেতে খুব বেশি কিছু লাগে না। তাই এখনই মাথায় স্বপ্ন-যন্ত্র চাপিয়ে বসুন আর ঝাঁপিয়ে পরুন কল্পনার জগতে; কে জানে, হয়তো আপনার স্বপ্নের সাথে কনের স্বপ্ন একাকার হয়ে বাস্তবে হানা দিবে টোকিওর রাস্তায় হাঁটতে থাকা কোন টেলিভিশনের পর্দায়।

Paprika-2

 

[১] http://www.midnighteye.com/interviews/satoshi-kon/

[২] আকিরা কুরোসাওয়া – কিংবদন্তী জাপানী চলচ্চিত্র নির্মাতা। উল্লেখযোগ্য কাজ – Seven Samurais, Ikiru, Rashomon.

[৩] ইয়াসুজিরো ওযু – কিংবদন্তী জাপানী চলচ্চিত্র নির্মাতা। উল্লেখযোগ্য কাজ – Late Spring, Early Summer, Tokyo Story.

[৪] সেতসুকো হারা – কিংবদন্তী জাপানী চলচ্চিত্র অভিনেত্রী। উল্লেখযোগ্য কাজ – Late Spring, Early Summer, Tokyo Story.

[৫] হিদেকো তাকামিনে – কিংবদন্তী জাপানী চলচ্চিত্র অভিনেত্রী। উল্লেখযোগ্য কাজ – Twenty-four Eyes, Floating Clouds.

পিংপং দ্য অ্যানিমেশন – ব্যর্থতা, সংগ্রাম আর জীবনের শৈল্পিকতা — Fahim Bin Selim

[Ping Pong the Animation স্পয়লার সতর্কতাঃ নিজ দায়িত্বে পড়ুন]

পিংপং দ্য অ্যানিমেশন গতবছর দেখা অংগোয়িং অবস্থায়, সপ্তাহে এক পর্ব করে , এপ্রিল থেকে জুন অবধি। আর এটা ছিলো আমার গতবছরের সবচেয়ে প্রিয় অ্যানিমে। গত মাসে এর ডাব বের হওয়ায় কিছুদিন আগে পুনরায় দেখা শুরু করেছিলাম। আমি কি এখনোও মনে করি, পিংপং দ্য অ্যানিমেশন ২০১৪-এর সেরা অ্যানিমে? Does it hold up?

 

“There are no heroes.”

-Kazama

                      vlcsnap-2015-07-14-17h09m11s124
হোশিনো ইউতাকা – পেকো। পিংপং খেলায় অসাধারন প্রতিভাবান, আঞ্চলিক বয়সভিত্তিক প্রতিযোগীতায় দুর্জেয়, চারিদিক সমাদৃত। অত্যুৎসাহী, খামখেয়ালী। আর উদ্ধত। ছোট পুকুরের বড় মাছ।
কিন্তু একেবারেই প্রথম পর্বে কং-এর কাছে পরাজয়ে পেকো প্রথম এক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পায় – সম্ভবত সবার জীবনেরই কোন না কোন এক মুহূর্তে যার সমুক্ষীন হতে হয় – “You are not the center of the Universe.” এতদিন পেকোর কাছে পিংপং ছিলো শুধু সাফল্যগাঁথা। কিন্তু এই প্রথম পেকো মুদ্রার অপর পিঠটাও দেখে। এতদিন যে শুধু বিজয়কেই অবশ্যম্ভাবী বলে ধরে নিয়েছিল, যার সন্তরণ জল ছিল স্থির আর অগভীর – সে অনাকাঙ্খিত এক ব্যর্থতার স্বাদ পায়, সমুদ্রের প্রথম স্পর্শেই খেই হারায়। প্রথম বুঝতে পারে তার আপাত উজ্জ্বল, ঈর্ষনীয়, গুরুত্বপূর্ণ অস্তিত্ব মহাকালের প্রবাহে খুবই ম্রীয়মান, তুচ্ছ, আর গুরুত্বহীন। তার পরিচিত জগৎ তাসের ঘরের মত দুমড়ে পরে। ১১-০ তে হারা এক ম্যাচ, শুধুমাত্র একটি ম্যাচের ব্যর্থতা পেকোর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়, তার জীবন সম্পর্কে ধারণা আমূল বদলে দেয়।

                   vlcsnap-2015-07-14-17h19m14s26
আর এই ব্যর্থতা হল পিংপং দ্য অ্যানিমেশনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং বারবার ফিরে আসা প্রসঙ্গ। ব্যর্থতা, সংগ্রাম, বাস্তবতার সাথে মানিয়ে নেওয়া। কোন অত্যুক্তি  না, কোন লুকাছাপা না। আর এখানেই মনে হয় এই গল্প আর বেশিরভাগ  স্পোর্টস অ্যানিমে থেকে আলাদা। পিংপং দ্য অ্যানিমেশনের গল্প জীবনের সামগ্রিকতা নিয়ে, সকল ক্ষেত্রে সংগতিপূর্ণ। এর কাহিনী প্রত্যেক চরিত্রের কাছে খেলাটার আলাদা আলাদা অর্থ নিয়ে, তাদের জীবনাভিপ্রায়ের বৈপরিত্য নিয়ে। অবশ্যই পিংপং দ্য অ্যানিমেশন, পিংপং খেলা নিয়ে অ্যানিমে। কিন্ত এখানে খেলাটা সবসময়ই নেপথ্য বিষয়, কেবলই অন্তর্নিহিত বক্তব্যের বাহক মাত্র। পিংপং দ্য অ্যানিমেশন কখনই তার চরিত্রদের ভুলে যায় না, তাদের খেলার বাইরের জীবনটাকে ভুলে যায় না – তাদের পরিবার, তাদের পারিপার্শ্বিকতা, তাদের বেড়ে ওঠা।
এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ অ্যানিমের দুই পার্শ্বচরিত্র – ক্যাপ্টেন ওতা আর সাকুমা। ওতা, ছোটবেলার থেকেই সে পিংপং খেলার প্রতি প্রবল ভালো লাগা নিয়ে বড় হয়েছে। কিন্তু হাইস্কুলের পিংপং ক্লাবে যোগ দিয়ে পেকো আর স্মাইলের দেখা পাবার পর, বাস্তবতা বুঝতে তার খুব বেশি বেগ পেতে হয় না। তাদের সাথে তার পার্থক্যটা যে আকাচচুম্বী! কং এর কাছে পেকোর হারে যা আরো সুসংহত হয়। বড় মাছেরাই যেখানে হাবুডুবু খায়, ছোট পুকুরের ছোট মাছদের অসম্ভবত স্বপ্ন দেখাটা তো রীতিমত অপরাধের পর্যায়ে পরে। আর একারণেই তার কাছে পিংপং খেলাটা কেবলই উপভোগের জন্য, হাইস্কুলের শেষ সময়টায় কিছু স্মৃতি রেখে যাওয়ার জন্য। সে আর নামকরা পিংপং খেলোয়াড় হওয়ার স্বপ্ন দেখে না, পারিবারিক ব্যবসার হাল ধরাই জীবনের একমাত্র নিয়তি হিসেবে মেনে নেয়।

                 vlcsnap-2015-07-14-17h10m18s213
সাকুমার জন্য অবশ্য ব্যাপারটা এতটা সহজ না। সাকুমা, খেলার প্রতি যার আবেগ আর কারো চেয়ে কম না; যে বড় হয়েছে পেকো আর স্মাইলের মত প্রতিভাদের সাথে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বীতায়; যে দুর্দম, দৃঢ়কল্প। কিন্তু পরিশ্রম, অধ্যবসায় আর আবেগ কতটা দূর পর্যন্ত নিয়ে যাবে যদি প্রতিভাটাই না থাকে? যদি পরাস্ত হতে হয় অপরিবর্তনীয় কোন নিয়তির কাছে? ওতা যেটা আগে থেকেই জানতো, আকুমার তা উপলব্ধি করতে লাগে ছয় পর্ব; যখন তাৎপর্যবহুল, ষ্মরনীয় এক ম্যাচে সে স্মাইলের কাছে বিপুল ব্যবধানে পরাজিত হয় – অতঃপর তার পিংপং ক্লাব থেকে বহিষ্কৃত হয়। সাকুমা আগে অনেকবারই ব্যর্থতার মুখোমুখি হয়েছে, কিন্তু কখনোই এভাবে না। পারতপক্ষে তার ছোটবেলা কেটেছে পেকোর কাছে বারবার হার মেনে নেওয়ার পরিচিত অনুভূতি নিয়ে। পেকো ছিল অস্পৃশ্য। যাকে হারানোই ছিল তার কাছে অভিষ্ট লক্ষ্য, পরম সাফল্যের প্রতিরূপ। সাকুমা, যে এতদিন শুধু পেকোকেই সাফল্যের দুর্দমীয় চূড়া হিসেবে ভেবে এসেছে, এবং তা অবশেষে জয় করেছে, কিন্তু তাতে এতোটাই বিভোর ছিলো যে বাকি কোন কিছুর প্রতি কোন ভ্রুক্ষেপ করেনি, বুঝতে পারে স্মাইল তাদের দুজনকে বেশ আগেই অতিক্রম করে গেছে, এবং বেশ ভালোভাবেই। বাস্তবতা আকুমাকে অবশেষে অপ্রীতিকর সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। সে বুঝতে পারে নিজের অনেক পছন্দের এই খেলায় সে কখনোই সাফল্য পাবেনা, অনেক আরাধ্য এক স্বপ্ন তার কখনোই বাস্তবায়িত হবে না।

               vlcsnap-2015-07-14-17h12m00s28
কিন্তু তবুও সাকুমার গল্পটাই এই অ্যানিমের সবচেয়ে করুণ হতাশার গল্প নয়। কং ওয়েঙ্গার গল্পটা স্বর্গ থেকে মর্ত্যে পতনের। তার জন্ম পিংপং-এর দেশে। খেলোয়াড় জীবন কতটা কঠিন আর নিষ্ঠুর হতে পারে, তা নিয়ে কং এর কখনোই কোন বিভ্রম ছিলো না।  প্রতিভা কোন অভাব তার ছিলো না, দৃঢ়তারও – বরং তার একমাত্র শত্রু ছিলো ভালো করার চাপ, ব্যর্থ হবার আতঙ্ক। শুধুমাত্র একটি হারের কারণেই তাকে কিনা আসতে হল জাপানের মত ছোট এক দ্বীপরাষ্ট্রে, প্রতিভার প্রমাণ দেওয়ার জন্য! পিংপং হয়ে উঠলো তার বাড়ি ফেরার টিকেট।  কিন্তু সেই সাধারন জাপানী-দের কাছেই যখন তাকে হার মানতে হল – প্রথমে স্মাইলের সাথে না হেরেও হেরে, আর তারপর ষোলকলাপূর্ণ করতে কাজামার কাছে নাস্তানাবুদ হয়ে – তখন তার সামনে নতুন এক বাস্তবতার আগমন ঘটল। কিন্তু সেটা ছিলো তার শিক্ষার অর্ধেক মাত্র।

                  vlcsnap-2015-07-14-17h12m58s91

অনবদ্য ঘটনাপ্রবাহে, প্রচারকালের মাত্র ১৩০ মিনিটের মাথায়, এক নাকউচুঁ অভিজাত থেকে সে পরিণত হল সবচেয়ে ভালো লাগার চরিত্রে। কং নতুন উদ্দ্যমে শুরু করে, নতুন আদর্শ আর দর্শনে দীক্ষিত হয়ে। কিন্তু পরপর দ্বিতীয়বারও কং-কে পরাজয়ের গ্লানি বইতে হয় – এবার পেকোর কাছে। প্রতিযোগীতা নিষ্ঠুর – অনেক সময় কেবল ভালো আর খারাপের পার্থক্যকারী না, ভালো আর অধিকতর ভালোর নিরূপণেরও মঞ্চ।

                 vlcsnap-2015-07-14-17h13m48s118
কাজামা যতই “হিরো”-তে অবিশ্বাসী হোক, তার একজন ত্রানকর্তার প্রয়োজন ছিলো আর যে কারোর চেয়ে বেশি। সে বড় হয়েছে পিংপং-কেন্দ্রিক এক পরিবারে। পারিবারিক চাপ তাকে বাধ্য করেছে পিংপং খেলতে, সে খেলায় ভালো হতে। কারণ তাতে মিশে আছে পরিবারের সম্মান, তাদের কম্পানীর বানিজ্যিক ভবিষ্যৎ। নিজস্ব  ইচ্ছা যেখানে পারিবারিক দাবির কাছে বন্দী। পিংপং কং-এর কাছে আর বাকিদের মত ভালোবাসার কোন স্থান না, স্বপ্নপুরনের মঞ্চ না, বরং বেঁচে থাকা, পরিবারকে টিকিয়ে রাখার জন্য আবশ্যকীয় বিষয়। চিরচেনা গল্প?

স্মাইলেরও বড় হওয়া ভাঙন ধরা পরিবারে, কিন্তু তার অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীত।  তার জীবনে এমনিতেই হতাশার অনেক কারণই উপস্থিত, সেখানে নতুন করে পিংপং যোগ করার কোন ইচ্ছা তার কখনোই ছিলো না। প্রতিভা যতটাই থাকুক। পিংপং তার কাছে আর সবার মত প্রতিযোগীতা না, বরং মুখে “হাসি” ফুটানোর নিয়ামক। এবং ততোটুকুই। পিংপং-ই তাকে মানুষের সান্নিধ্যে এনেছে, তাকে যান্ত্রিকতা থেকে মুক্তি দিয়েছে, তাকে শিখিয়েছে লোহার মত স্বাদ হলেও তার ধমনী-শিরা দিয়ে বয়ে যাওয়া তরলপ্রবাহ, রক্তই, আর সবার মত লাল। স্মাইলের নতুন কোন হিরো-র প্রয়োজন ছিলো না, তার যে ইতিমধ্যেই একজন আছে। পুরো অ্যানিমে জুড়ে তার খোলসের মধ্যে চলে যাওয়া, সেই নায়কে পুনরাবির্ভাবের জন্য সংকেত হিসেবে পাঠানো – ব্যাটসিগনাল। কারণ সেই নায়কই  তখন বিধ্বস্ত, পথহারা।

                 vlcsnap-2015-07-14-18h00m01s170

সাকুমা পিংপং খেলা ছেড়ে দেয় কিন্তু যাওয়ার আগে সে তার আগে সে তার আগে “মুক্ত” করে দিয়ে যায় পেকোকে। পেকোর সহজাত প্রতিভা, তার নিজের যেটা কখনোই ছিলো না, ধ্বংস না করার পরামর্শ দেয়। আর পেকো, সে যখন তার অধপতনের চূড়ান্তে পৌছেছে, তখনই তার অতীত দিনে কথা মনে পড়ায়, খেলার প্রতি তার অগাধ ভালোবাসার কথা মনে পড়ায়, নতুন শুরুর মন্ত্রণা পায়। মাঝে মাঝে নায়কদেরও রক্ষাকর্তা দরকার হয়!

বারবার ব্যর্থতার কথা বললেও পিংপং দ্য অ্যানিমেশন শুধু নিরাশার গল্প না। বরং সম্পুর্ণ বিপরীত। বাস্তব ঘেঁষা, পতনের অনিবার্যতার কথা বলা; কিন্তু তা মেনে নিয়ে উত্তরনের, হার না মানার, এর সবটুকু উপভোগ করার বার্তাবাহী। পেকো ফিরে আসে, ভষ্ম থেকে, দুর্নিবার অগ্নিস্ফুলিঙ্গ নিয়ে; সে নিজে কং-কে মুক্তি দেয়, কাজামাকে মুক্তি দেয়। উড়তে শেখায়। কং জাপানকে আপন করে নেয়, কাজামা  নিজেকে ছাড়িয়ে নেয় প্রত্যাশা আর পারিবারিক চাপের দাসত্ব শিকল থেকে। সেই সাথে পিংপং দ্য অ্যানিমেশনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন বার্তাটা দিয়ে যায়।

জীবন কোন অঙ্কের সমীকরণ না, যে নির্দিষ্ট পদক্ষেপ অনুসারে চললে আকাংক্ষিত ফলাফল পাওয়া যাবে। জীবন আরো বেশি কিছু, আরো জটিল কিছু। হয়তো তা পিংপং খেলার মতই। জীবনে “জয়ী” হওয়া কখনোই সম্ভব না। এখানে সাফল্য কখনোই চিরস্থায়ী না। এখানে ব্যর্থতাও কখনোই চিরস্থায়ী না। কারণ জীবনের মহাত্ব্য কখনোই না পরাতে নয়, তা অবশ্যম্ভাবী, বরং পুনরোড্ডয়নের দৃঢ়কল্পতায়; তা থেকে শিক্ষালাভটাই আসল। জীবন সবকিছু নিয়েই, চিরবহমান, ধুসর।

                    

                 vlcsnap-2015-07-14-17h21m52s80        


vlcsnap-2015-07-14-17h21m19s1

আসলেই বাস্তব জীবনে নেই কোন কোন সুপারম্যান, ব্যাটম্যান; নেই কোন সুপার সেন্তাই, কামেন রাইডার। নেই কোন অতিপ্রাকৃত ক্ষমতাসম্পন্ন, অজেয় অতিমানব – যে বিপদের সময় রক্ষা করবে অবিশ্বাস্য দক্ষতায়; যার নাম ঘুরবে মানুষের মুখে মুখে, আর ত্রাস ছড়াবে দুর্বৃত্তদের হৃদয়ে। কিন্তু একজন “হিরো”, ত্রানকর্তা, অনুপ্রেরণার উৎস হওয়ার জন্য সেগুলোই একমাত্র গুণ? বাস্তব জীবনের নায়কেরা সম্ভবত কমিক বই আর চলচ্চিত্রের মত সার্বজনীন না; অনেকটা ব্যক্তিগত। হয়তো একজন বন্ধু, একজন শিক্ষক, হয়তো বাবা-মা বা কোন এক সহচর। বাস্তব জীবনের নায়করা আর যে কারোর মতই সাধারন, মানবিক আর অনেকাংশে ত্রুটিপূর্ণ।

                   vlcsnap-2015-07-14-17h19m03s163

মাত্র ১১ পর্বে – ২২০ মিনিটের প্রচারকালে পিংপং দ্য অ্যানিমেশন বলেছে কিছু উদীয়মান পিংপং খেলোয়াড়, অবিস্মরনীয় চরিত্রদের তারুন্য, তাদের বিশ্বাস, তাদের স্বপ্ন, তাদের সংগ্রাম, তাদের বেড়ে ওঠা,  “কামিং-অফ-এজ”-এর গল্প। এক বছর আগে পিংপং দ্য অ্যানিমেশন দেখা আমার কাছে যে অভিজ্ঞতা ছিল, ভালো লাগার জায়গাটা এক থাকলেও, এখন তা সম্পূর্ণ ভিন্ন।  সহজে বোধগম্য, আপাত দৃষ্টিতে সাধারন এক গল্প, কিন্তু অনেক বেশি ঘনিষ্ট, অনেক বেশি পরিচিত। অনেক বেশি অনুপ্রেরণার – এক “হিরো”।

আমি কি এখনো মনে করি পিংপং দ্য অ্যানিমেশন ২০১৪ সালের সবচেয়ে সেরা অ্যানিমে?
পিংপং দ্য অ্যানিমেশন আমার দেখা সবসময়ের সবচেয়ে প্রিয় অ্যানিমেরগুলোর তালিকায় একেবারে উপরের সারিতে থাকবে।

Legend of the Galactic Heroes/Ginga Eiyuu Densetsu(1988-1997) রিভিউ — Fahim Bin Selim

2

লেজেন্ড অফ দ্য গ্যালাক্টিক হিরোস/গিঙ্গা এইয়্যু দেনসেতসু(১৯৮৮-১৯৯৭)
Legend of the Galactic Heroes/Ginga Eiyuu Densetsu(1988-1997)

জনরাঃ স্পেস অপেরা, সাই-ফাই, ড্রামা, রোমান্স, মিলিটারী
প্রযোজকঃ আর্টল্যান্ড
মূলঃ ইয়োশিকি তানাকা
পরিচালকঃ নোবুরো ইশিগুরো (স্পেস ব্যাটলশীপ ইয়ামাতো(১৯৭৪))
সেন্সরঃ ভায়োলেন্স মাঝে মাঝে নৃশংস, খুব কম হলেও ন্যুডিটি আছে
মাইঅ্যানিমেলিস্ট রেটিংঃ ৯.০৬(#৮)

বাংলাদেশী এবং নিয়মিত অ্যানিমে দেখাটা গত ৪-৫ বছর থেকে শুরু হলে হয়তো বড় একটা সময় ধরে এই অ্যানিমে সাথে পরিচিতও ছিলেন না। তারপর একদিন মাইঅ্যানিমেলিস্ট-এর “টপ অ্যানিমে” পেজ এ গেলেন। “ফুলমেটাল…হুম, স্টাইন্স;গেট…আচ্ছা, গিন্তামা…হুম, ক্লানাড…, কোড গিয়াস…গি-গিঙ্গা-এ-এই-ইয়া…কী!!?”
নয় বছর, চার সিজন আর ১১০ পর্ব। মাইঅ্যানিমেলিস্ট-এ এত রেটিং, আইএমডিবিতে এত রেটিং(৮.৯)। তবুও এই অ্যানিমে (বাংলাদেশ/বর্তমান অ্যানিমে ফ্যানদের কাছে) এতো কম জনপ্রিয় হওয়ার কারণ কী? অনেক পুরান বলে?

“In every time, in every place, the deeds of men remain the same”
৩৫ শতাব্দী।
স্পেস ক্যালেন্ডার ৭৯৬। ৭৯৬ বছর হয়েছে মানুষ পৃথিবী ত্যাগ করেছে।
প্রায় আট শতাব্দী আগে পৃথিবী ত্যাগ করা মানুষ যে একত্রে সুখে-শান্তিতে বাস করছে তা কিন্তু না। ছায়াপথে ছড়ানো নক্ষত্রগুলোর শ’ শ’ গ্রহে তারা ছড়ানো, আর ভাবাদর্শ দিয়ে দুভাবে বিভক্ত। একদিকে যেমন “ওডিন” গ্রহকে কেন্দ্র করে একনায়কতন্ত্র আর আভিজাত্যের আদলে রাজা আর প্রজার ষ্পষ্ট বিভেদ থাকা “ইম্পেরিয়াল” সাম্রাজ্য। আরেকদিকে শত শত আলোকবর্ষ দূরে তেমন “হাইনেসেনপোলিস”-এ টিকে আছে “ফ্রি প্লানেটস অ্যালায়েন্স” সরকার আর তার জনগণ, সাম্যবাদের ঝান্ডা উড়িয়ে, গনতন্ত্রের ধারক ও বাহক হিসেবে।
আর দেড় শতাব্দী ধরে এই দুই মতবাদের যুদ্ধ চলে আসছে, মহাকাশে। দখলের লড়াই। গনতন্ত্র, না একনায়কতন্ত্র? কোনটা বেছে নিবেন আপনি? সমান অধিকার নাকি প্রজাত্ব? গণতন্ত্র অবশ্যই? আসলেই কী ব্যাপারটা এতো সহজ?

স্পেস ক্যালেন্ডার ৭৯৬। ইম্পেরিয়াল ক্যালেন্ডার ৪৮৭।
ব্যাটল অফ আসতার্তে-তে মুখোমুখি হল ইম্পেরিয়াল আর অ্যালায়েন্স সৈন্যদল।
ইম্পেরিয়াল সৈন্যদের নেতৃত্বে এক যুবক ফ্লিট কমান্ডার; সবকিছু হারানো, প্রতিশোধস্পৃহা যার জ্বালানী আর অনন্যসাধারন নেতৃত্ব যার অস্ত্র – রাইনহার্ড ভন মুসেল। প্রথমবারের মত দেখালো তার ঝলক।
অ্যালায়েন্স এর সৈন্যদের নেতা না হয়েও এই ব্যাটল অফ আসতার্তে-তে প্রথম প্রচারের আলোয় আসলো প্রায় ত্রিশ ছোঁয়া এক অ্যাডমিরাল; মিলিটারিতে যোগ দেওয়ার ইচ্ছা যার কখনোই ছিলো না, বরং ইতিহাসবেত্তা হওয়ার স্বপ্নদেখা, “মিরাকল ইয়াং” – ইয়াং ওয়েনলী।
তারা একে অপরের সরাসরি মুখোমুখি হল না। কিন্তু এই ব্যাটল অফ আসতার্তে-তে প্রথম বয়ে গেল এক পরিবর্তনের বাতাস। ঝড়ের পূর্ভাভাস নিয়ে।
আর এখান থেকেই তাদের গল্পের শুরু, সমান্তরালে।
তাদের দৈরত্ব্যের গল্প।
তাদের উত্থানের গল্প।
তাদের পতনের গল্প।
তাদের পুনোরুত্থানের গল্প।
রাইনহার্ড আর ওয়েনলী – এই দুই মহাকাশীয় নায়কের কিংবদন্তী।

ইয়োশিকি তানাকার লেখা উপন্যাস সিরিজের গল্প অবলম্বনে বের হওয়া লেজেন্ড অফ দ্য গ্যালাক্টিক হিরোস এর মূল গল্প হল ১১০ পর্বের ওভিএ (আর ডালাপালা ছড়ানো সাইডস্টোরি, প্রিকুয়াল নিয়ে আরো একটা ৫২ পর্বের সিরিজ আর ৫-৬টা মুভি, দেখা আবশ্যকীয় না)। যার চার সিজন, যথাক্রমে ২৬, ২৮, ৩২ ও ২৪ পর্বের এবং যা প্রচারিত হয়েছে যথাক্রমে ১৯৮৮-৮৯, ১৯৯১-৯২, ১৯৯৪-৯৫ ও ১৯৯৬-৯৭ সালে।

প্রতি দুই বছরে গড়ে মাত্র ২৮ পর্ব। লেজেন্ড অফ দ্য গ্যালাক্টিক হিরোসের অ্যানিমেশন তো বেশ উচ্চমানেরই আশা করা যায়, না? এদিকেই আপনি প্রথম আশাহত হবেন। ‘৮০-এর শেষ কিংবা ‘৯০-দশকের অন্যান্য সেরা অ্যানিমের সাথে তুলনা করলে লেজেন্ড অফ দ্য গ্যালাক্টিক হিরোস-এর অ্যানিমেশন পিছিয়েই থাকবে। যদিও প্রতি সিজনে ক্রমশ উন্নতি হয়েছে, কিন্তু শুধু আধুনিক অ্যানিমেশনের ভক্ত হলে তা আপনার তৃষ্ণা মেটানোর জন্য হয়তো যথেষ্ট না।

3

সাই-ফাই স্টোরি – রোবট, অটোমেটিক অস্ত্র, স্পেসশীপের অসাধারন অ্যাকশন সীন? আপনি তাও পাবেন না। স্পেসশীপ গুলো খুব সাধারন, যুদ্ধের দৃশ্যগুলো অধিকাংশ সময়ই শূধু মনিটর স্ক্রিনের কিছু ত্রিভুজ আর চতুর্ভুজের “ফর্মেশন”-এই সীমাবদ্ধ।

4

হার্ড সাই-ফাই হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা জন্য যদি আপনি বৈজ্ঞানিক যুক্তির আতশ-কাঁচের নিচে রাখেন তবুও হতাশ হবেন।
পেসিং? প্রতিটি সিজনই একটি ক্লোজার দিয়ে শেষ হয়, তাই প্রতিটি সিজনের প্রথম পর্বগুলো বেশ ধীর। বিশেষ করে প্রথম সিজনের গল্প ভালোভাবে শুরু হতে, লেজেন্ড অফ দ্য গ্যালাক্টিক হিরোস এর ইউনিভার্স সম্পর্কে ভালোভাবে ধারণা পেতে আপনাকে পার করতে হবে প্রায় ১৩-১৪ টি পর্ব।
লেজেন্ড অফ দ্য গ্যালাক্টিক হিরোস এর পরিচালনাতেও বিশেষ কিছু পাবেন না, অন্তত অন্যান্য “সেরাদের সেরা” অ্যানিমের তুলনায়। অ্যানিমেটোগ্রাফি খুবই সাধারন, মাঝে মাঝে একঘেঁয়ে। পর্বে পর্বে ক্লিফহ্যাঙ্গার নেই, নেই হঠাৎ কোন টুইস্টও। এর গল্পের বাঁক আপনি খুব সহজেই আঁচ করতে পারবেন এবং বেশ আগে থেকেই। অন্যান্য “সেরাদের সেরা” অ্যানিমের তুলনায় এর “মাইনাস পয়েন্ট”-এর সংখ্যা অনেক বেশি।

কিন্তু অন্যান্য যেকোন অ্যানিমের তুলনায়, “যেকোন” অ্যানিমের তুলনায় লেজেন্ড অফ দ্য গ্যালাক্টিক হিরোস এর “প্লাস পয়েন্ট” ও অনেক অনেক বেশি।

এর সবচেয়ে সেরা দিক? এর সংলাপ আর সংগীত। স্পেস অপেরার থেকে যা আশা করা করবেন, ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ, নাটুকে আর দার্শনিক।

5- democracy
6
7

কিন্তু লেজেন্ড অফ দ্য গ্যালাক্টিক হিরোস শুধু এখানেই সীমাবদ্ধ না। এই অ্যানিমে আপনাকে যেমন ভাবাবে, তেমন দিবে নির্মল বিনোদনও। সেন্স অফ হিউমার অসাধারন। বাস্তবিক আর সহজাত। অন্যান্য বর্তমান বেশিরভাগ অ্যানিমের মতই জোর করে হাসানোর (অপ)চেষ্টা না।

8
9
10

আবহ সংগীত মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখার মত। মোজার্ট, বেটোফেন, বাখদের ধ্রুপদী যন্ত্রসংগীত যুদ্ধের দৃশ্যগুলোর প্রাণসঞ্চারক।

আর এর আর্ট গুমোট, মধ্যযুগীয় পেইন্টিং এর মত। অ্যানিমেটার “আভিজাত্য”-এর প্রতিকও কি না?

এর সবচেয়ে সেরা দিক? এর চরিত্র। ১১০ পর্বের যেকোন অ্যানিমেতে সর্বোচ্চ কয়জন চরিত্র থাকতে পারে? লেজেন্ড অফ দ্য গ্যালাক্টিক হিরোস এর শুধু গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের সংখ্যাই প্রায় অর্ধশতাধিক। এবং তারা আপনার দেখা, বর্তমান, অতীতের আর সব মানুষের মতই বাস্তব আর ত্রুটিযুক্ত। কোড গিয়াসের মত ওয়ান-ম্যান-শো ও না, ডেথনোটেরর মত টু-ম্যান-শো ও না। হ্যাঁ, রাইনহার্ডের অসাধারণ নেতৃত্ব গুণ আপনাকে মুগ্ধ করতে পারে, আপনি অভিভূত হতে পারেন ওয়েনলী বুদ্ধিদীপ্ত রনকৌশল দেখে। রাইনহার্ড আর ওয়েনলী প্রধান হলেও গল্পে ইউলিয়ান, কিরকিয়াইস, গ্রীনহিল, রয়েন্টাল আর মিত্তারমায়ারদের অবদান আর প্রভাবও প্রবল। সিরিজের প্রথমে পার্শ্বচরিত্র মনে হওয়ারাও পরে বড় কিছুর অংশে জড়িয়ে যাবে। আমাদের নায়কদের পরিবর্তন আসবে, শারীরিকভাবে, মানসিকভাবে, ছয়টি বসন্তব্যাপী, বদল আসবে অন্যান্য চরিত্রদেরও। সিরিজের মাঝখানে যখন কেউ চার-পাঁচ বছর আগের কোন ঘটনার কথা উল্লেখ করবে তখন তা ফ্ল্যাশব্যাক না, আসলেই চার-বছর আগের ঘটা। আপনি তা দেখে এসেছেন, আপনি তার অংশ ছিলেন।
এটা শুধু এই দুজনের ভাবাদর্শগত পার্থক্যের যুদ্ধেরও গল্প না, সমগ্র মানব্জাতিরই যুগ যুগ ধরে চলে আসা যুদ্ধ-বিগ্রহের গল্প। আপনি এই গল্প দেখবেন রাজাদের চোখ থেকে, সরকারের উচ্চতর কর্মকর্তাদের চোখ থেকে, সৈন্যদের চোখ থেকে, সাধারণ মানুষের চোখ থেকে, কু আর অপসংষ্কারে আটকে থাকা গোঁড়াদের চোখ থেকেও। লেজেন্ড অফ দ্য গ্যালাক্টিক হিরোস পক্ষপাতবিহীন, মানবিক গল্প।

এর সবচেয়ে সেরা দিক? এর গল্প। যখন বলব অ্যানিমে মাধ্যমেরই সর্বসেরা গল্প, তখন হয়তো বিশ্বাস করতে কষ্ট হবে। মনস্টার, ফুলমেটাল ব্রাদারহুডরা এর থেকে ভালো “অ্যানিমে” হতে পারে, কিন্তু লেজেন্ড অফ দ্য গ্যালাক্টিক হিরোস এর গল্পের কাছে তারা হার মানবে। না এটাতে কোন মাথা ঘুরিয়ে দেওয়া কোন কনসেপ্ট নেই, প্রচন্ড প্যাঁচ লাগা কোন রহস্যও নেই – লেজেন্ড অফ দ্য গ্যালাক্টিক হিরোস বাস্তব আর সাধারন। সম্ভবত যুদ্ধ আর রাজনীতি নিয়ে টিভিতেই প্রচারিত হওয়া সবচেয়ে বাস্তব এবং সাধারন ফিকশনাল শো। গণতন্ত্র, একনায়কতন্ত্র, অভিজাততন্ত্র, নির্বাচন, সরকার, দূর্নীতি, ধর্মব্যবসা, টেরোরিজম, অভ্যুত্থান, আন্দোলন, গৃহযুদ্ধ, ষড়যন্ত্র – লেজেন্ড অফ দ্য গ্যালাক্টিক হিরোস হল সমাজ বই। রাজনীতি/অপরাজনীতির এত ভালো শিক্ষক আর পাবেন না। ইতিহাস আর যুদ্ধ? এতে মানুষ মারা যাবে, অগণিত; সম্ভবত যেকোন অ্যানিমের মধ্যে সংখ্যাটা সবচেয়ে বেশি। যুদ্ধে মারা যাবে, আত্নহত্যায় মারা যাবে, দূর্ঘটনায় মারা যাবে, টেরোরিজমে মারা যাবে, গণহত্যায় মারা যাবে, গুপ্তহত্যায় মারা যাবে।
“Heroes do not neccessarily die heroic deaths” – এই চরম সত্যটাও খুব ভালোভাবে বুঝিয়ে দিয়ে যাবে।
আগেই যেটা বলেছি পর্বে পর্বে ক্লিফহ্যাঙ্গার নেই, টুইস্টও। সময়ে সময়ে বুদ্ধিরখেলাটা শুধু দ্বিমুখীই না – ত্রিমুখী, চতুর্মুখী এমনকি পঞ্চমুখীও। কিন্তু তবুও গল্পের বাঁক আপনি খুব সহজেই আঁচ করতে পারবেন এবং বেশ আগে থেকেই। আর এখানেই এর অসাধারণ গল্পের মহাত্ব্য, আপনি অনিবার্যের অপেক্ষা করবেন্ অসহায়ভাবে। লেজেন্ড অফ দ্য গ্যালাক্টিক হিরোস একই সাথে “সাহসী” গল্পও।

এসব কিছুর পরও এই অ্যানিমেটা একটা নির্দির্ষ্ট দর্শকের কাছেই সীমাবদ্ধ কেন? কারণ লেজেন্ড অফ দ্য গ্যালাক্টিক হিরোস হল আমার দেখা সবচেয়ে “ম্যাচুর” অ্যানিমে। রাজনীতি, ইতিহাস আর যুদ্ধবিগ্রহ, যাতে আবার ভালো কোন অ্যাকশন নেই, নায়কদের অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা নেই – তা বেশির ভাগ মানুষের কাপেরই চা না। সংলাপ নির্ভর, কাহিনী নির্ভর, চরিত্র নির্ভর অ্যানিমের ভক্ত না হলে আপনাকে এই অ্যানিমে ১১০ পর্ব ধরে আকর্ষন করতে পারবে না।
কিন্তু আপনি যদি ভালো কিছু দেখতে চান, আসলেই খুব ভালো কিছু দেখতে চান, তাহলে প্রস্তুত হোন। এখন বেশ সস্তা হয়ে যাওয়া “এপিক” শব্দটার আদি ও অকৃত্রিমতার জন্য। ১১০ পর্ব আর ৬ বছর আর পুরো মহাকাশ জুড়ে চলা বিশাআআআআআল এক কাহিনীর জন্য। “কাইজার” রাইনহার্ড আর “মিরাকল” ইয়াং – ছায়াপথের ইতিহাস চিরদিনের জন্য বদলে দেওয়া এই দুই নায়কের ধ্রুপদী, অভিজাত আর মহাকাব্যিক এই কিংবদন্তীর জন্য। অ্যানিমের ইতিহাসের সর্বকালের সর্বসেরা গল্প আপনার জন্য প্রস্তুত।

রেটিংঃ ★★★★★

Kaiba রিভিউ — Fahim Bin Selim

6

কাইবা[Kaiba](২০০৮)
টিভি – পর্ব ১২
জনরাঃ সাইন্স ফিকশন, ফ্যান্টাসী, রোমান্স, মিস্টেরী
প্রযোজকঃ ম্যাডহাউস
মূলঃ মাসাকি ইউয়াসা
পরিচালনাঃ মাসাকি ইউয়াসা

২০০৬ এর কেমোনোজুমে দিয়ে টেলিভিশনে ইউয়াসার আত্নপ্রকাশ। আর ২০১০-এ তার সবচেয়ে জনপ্রিয় আর প্রশংসিত কাজ তাতামি গ্যালাক্সি। এখন কিছু সাধারন পার্থক্য থাকলেও মৌলিক দিক দিয়ে ইউয়াসার সব অ্যানিমের আর্টে মিল খুঁজে পাবেন। কিন্তু কেমোনো আর তাতামির মাঝে স্যান্ডুইজড হয়ে ২০০৮ সালে যে কাইবা বের হল, তা শুধু আর সব পরিচালকের সব অ্যানিমের থেকেই আলাদা না, ইউয়াসার যেকোন কাজের থেকেও আলাদা! আর কাইবা, তার রেট্রো আর্ট স্টাইল দিয়ে – অ্যানিমের সাথে যা কল্পনাও করা যায় না – ছোট পর্দায় ফুটিয়ে তুলল এক জাঁকালো, প্রাণবন্ত আর চাদর ঘেরা রহস্য গল্প। তার সাথে আবার সাইন্স ফিকশন আর রোমান্স!

কাইবা এক কল্পনার জগতের সাথে তুলনা করা যায়। সাইন্স ফিকশন অ্যানিমে সাধারণত যা হয় – অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, অত্যাধুনিক এক জগত। কিন্তু তবুও বর্তমান জগতের সাথে তার মিলটা স্পষ্টই থাকে। কাইবা আসলেই এক কল্পনার জগত; স্বপ্ন অথবা দুঃস্বপ্ন; পরাবাস্তব আর অপরিচিত; নিজ চোখে আশেপাশে যা দেখেন তার সাথে এর মিল খুঁজে পাওয়া প্রায় দুঃসাধ্য এক ব্যাপার।
আর কাইবার এই জগতে মানুষের স্মৃতিশক্তি জমিয়ে রাখা যায় বিভিন্ন নির্জীব বস্তুতে! স্থানান্তর করা যায় এক দেহ থেকে আরেক দেহ, এক বস্তু থেকে আরেক বস্তুতে; যোগ করা যায়, বদলানো যায়…মুছে ফেলা যায়। অমরত্বের এখানে এক নতুন সংজ্ঞা আছে – তা শারীরগত না, অস্তিত্বগত। কিন্তু এ ধরনের জগতে, কোন জিনিসটাকে প্রানী বলা যায়? কীভাবে জানবেন আপনার মাথায় ছোটকালের সুখের যে স্মৃতিগুলো আছে তা আসলেই ঘটেছে, যোগ করা কোন ব্যাপার না? কীভাবে বুঝবেন – আপনি আসলেই আপনি?
আকাশে ভেসে বেরাচ্ছে মেঘের দল, তার উপরে রাজকীয় জীবনের হাতছানি। কিন্তু যা পার হতে হওয়ার একটাই মূল্য – হারাতে হবে আপনার সব স্মৃতি।
আর তার নিচে বিশৃঙ্খলা, অরাজকতা আর প্রতারণার এক জগত। জায়গায় জায়গায় ফাঁদ পাতা, দারিদ্রতায় জর্জরিত মানুষগুলোর কাছে মূল্যবোধের চেয়ে বেঁচে থাকাটাই আসল।
আর এই স্মৃতির চরম বিশৃঙ্খলার জগতে আমাদের নায়ক, কাইবা, জেগে উঠল – স্মৃতিভ্রষ্ঠ হয়ে; একেবারেই ‘শুন্য মাথায়’; এমনকি নিজের নাম, পরিচয় সম্পর্কেও কোন ধারণা নেই। গলায় শুধু একটা হার ঝুলানো, আর তাতে এক মহিলার ছবি, অবশ্যই যার কোন স্মরণও তার নেই! শুরু হল নিজেকে খুঁজে পাওয়ার এক যাত্রা…

ক্লিশে, অ্যামনেশিয়া গল্প? শুধু আর্ট বাদ দিলেও কাইবা আর যেকোন সাই-ফাই থেকে আলাদা। রহস্য গল্পের অসাধারন এক সম্পাদনা আর তার নিখুঁত এক আখ্যান। প্রথম দুটো পর্ব হয়তো পুরোপুরি মাথার উপর দিয়ে যাবে। কিন্তু বাকানো!-র মত এলোমেলো পূর্বাভাসগুলো সবজায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। সময় দিন, ধাঁধার ছড়ানো টুকরা গুলো এক হতে শুরু করবে।

কাইবা উজ্জ্বল রঙ-এ ভরপুর, সম্মোহিত করে রাখা এক জগত। সিরিজের প্রথম অংশ, এপিসোডিক, মূশি-শির মত মন ঠান্ডা করা এক একটি পর্ব, আস্তে আস্তে এই অপরিচিত জগতের সাথে পরিচয় করিয়ে দিবে। হয়তো কয়েক পর্ব যেতেই আর অচেনা মনে হবে না; অর্থকষ্টে থাকায় নিজেদের দেহ বিক্রি করা(আক্ষরিক অর্থেই) এক পরিবার, দুঃখের স্মৃতি ভুলার চেষ্টারত এক বৃদ্ধা অথবা ক্রনিকোর আর তার পরিবারের গল্পে(পর্ব ৩ – আমার দেখা যেকোন অ্যানিমের অন্যতম সেরা পর্ব) আপনিও হয়তো সহমর্মী হবেন।
আর এই পর্বগুলো ভিত্তি করে দেবে পরবর্তী অংশের জন্য। যেখানে রহস্যের জট খুলতে শুরু করবে একে একে; নান্দনিক কায়দায়। সাধারন অ্যাডভেঞ্চার থেকে যা দ্রুতই বদলে যাবে বিদ্রোহ, রাজনীতি আর বিশ্বাসঘাতকতার এক গল্পে।

আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় এর আবহ সংগীত; এই আজানা, অদেখা জগতের পরাবাস্তবতা ফুটিয়ে তুলতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। আর তার সাথে আছে দুটি চমৎকার ওপেনিং আর এন্ডিং থিম। কাইবার সংগীত আবেগময়, বিষন্ন এক ভালো লাগার অনুভূতি দিয়ে যাবে।

সাধারন অ্যানিমে আর্টওয়ার্কের বাইরে কিছু পছন্দ না হলে, কাইবা আপনার জন্য না। অ্যানিমে স্টুডিওতে দিনরাত বসে বসে আর্টিস্টের সুনিপূণ হাতে আঁকা না, ঘরে বসে আনাড়ি হাতে মাইক্রসফট পেইন্টে আঁকা ছবির সাথেই এর মিল খুঁজে পাবেন বেশি। কিন্তু এতোটুক ‘অস্বস্তি’ কাটিয়ে উঠতে পারলে, পাবেন এক চমৎকার গল্প; সাই-ফাই, রহস্য আর ভালোবাসার এর অসাধারন মেলবন্ধন।
তাতামি গ্যালাক্সি, পিংপং অথবা মাইন্ড গেম দেখে ইউয়াসা সম্পর্কে নূন্যতম ধারনা থাকলেও তা ভুলে যান। কাইবা আরো চিত্রানুগ, বাস্তবতা বিচ্ছিন্ন আর অচেনা। আর তা আপনাকে নিয়ে যাবে ‘সমুদ্রের তলদেশ’, আর নিয়ে যাবে ‘মেঘের উপরে’; পুরো জগৎ উলট পালট করে দেওয়া, নিজেকে খুঁজে পাওয়ার এই যাত্রায়। আপনি প্রস্তুত?

মাইঅ্যানিমেলিস্ট রেটিংঃ ৮.৩২
আমার রেটিংঃ ৮৬/১০০

Kyousou Giga (TV) 2013 রিভিউ — Fahim Bin Selim

 

giga

কিয়োসৌগিগা(২০১৩) [Kyousou Giga(TV) 2013]
পর্বঃ ১০(+২+১)
জনরাঃ ফ্যান্টাসি, অ্যাকশন, সুপারন্যাচারাল
প্রযোজকঃ তোয়েই অ্যানিমেশন
মূলঃ মারুও মিহো
পরিচালকঃ রিয়ে মাতসুমোতো
থিমঃ ফ্যামিলী, লোকগাথা, প্যারালাল ইউনিভার্স
মাইঅ্যানিমেলিস্ট রেটিংঃ ৮.০২(#৪৭৩)

আপনি যদি কিয়োটো যান তাহলে সেখানে উমেগাহাতা তোগানোচোতে কৌযানজি(Kouzanji) বৌদ্ধ মন্দির এর দেখা পাবেন। পুরোহিত মিওয়ে-এর হাতে প্রতিষ্ঠিত এই মন্দির জাপানের অন্যতম সুন্দর দর্শনীয় স্থানই না, এর মহাত্ব্য সাংস্কৃতিকভাবেও অমূল্য। এর ভেতরে গেলে আপনি দেখবেন চারটি স্ক্রোলের সমন্বয়ে তৈরি একটি চিত্রপুস্তক। যাতে আছে ব্যাং-এর ছবি, খরগোশের ছবি, আর বানরের ছবি। এর নাম চৌজুগিগা(Choujuu Giga)। আর এই চৌজুগিগাই হল ইতিহাসের সর্বপ্রথম “মাঙ্গা”।

২০১১ সালে কোদোচা(Kodocha), কালারফুল(Colorful), স্কুল রাম্বল(School Rumble)-খ্যাত চিত্রনাট্যলেখিকা মারুও মিহো(Maruo Miho) চৌজুগিগার ছবিগুলো নিয়েই ফেঁদে বসলেন একটি গল্প, ২৫ মিনিটের ওভিএ। তোয়েই অ্যানিমেশনের প্রযোজনায়, নবাগত রিয়ে মাৎসুমোতোর(Rie Matsumoto) পরিচালনায় – কিয়োসৌগিগা(Kyousou Giga)। পরের বছর ১০ মিনিটের আরো ছয়টি পর্বের সিকুয়েল। আর সম্পূর্ণ গল্প নিয়ে অবশেষে ২০১৩ সালে ১০ পর্বের অ্যানিমে টিভি সিরিজ।

“Once when many planets intermingled and the boundary between human and Gods was vague, this is a story about a particular family, a tale of love and rebirth”

কিয়োটোর(Kyoto) এক কোনায় কৌযানজি মন্দির। আর তার ভেতর গুপ্ত আরেকটি শহর, “মিরর ক্যাপিটাল(Mirror Capital)”(জাপানীতে কিয়োটো, একই উচ্চারন, ভিন্ন কানজি)। কিয়োটোতে মানুষ বাস করে, ইয়োকাইরা বাস করে। আর কেউ কখনো মারা যায় না। আর এখানে নতুন কেউ প্রবেশ করতে পারে না। আর পারে না কেউ বের হতে। আর এখানে কোন কিছু ভেঙ্গে গেলে তা আপনাআপনি আবার জোড়া লেগে যায়। এই মনোমুগ্ধকর জগতের দেখভাল করার দায়িত্ব তিন ভাইবোনের উপর বর্তানো, দ্য কাউন্সিল অফ থ্রি – বড় ভাই কুরামা(Kurama), তাদের বোন ইয়াসে(Yase) আর সবচেয়ে ছোট ভাই মিওয়ে(Myoue)। যারা আছে তাদের বাবা-মা, প্রিস্ট মিওয়ে(Myoue Jonin) আর লেডি কোতো(Lady Koto)-‘র ফেরার অপেক্ষায়।
অনেক অনেক দিন ধরে কিয়োটো ছিল শান্তিপূর্ণ। অঘটনমুক্ত। ঘটনমুক্ত। অনাকর্ষনীয়।
তারপর একদিন একটি মেয়ে হঠাৎ মাত্রিক বিভেদ ভেঙ্গে চলে আসলো কিয়োটোতে, সাথে তার ছোট দুই ভাই, আ(A)(শুরু) আর উন(Un)(শেষ)। মজার ব্যাপার হল, এই মেয়েটার নামও, যা তাদের মায়ের নাম ছিল, কোতো(Koto)(একই উচ্চারন, ভিন্ন কানজি)। কোতো তার তার বিশাল হাতুড়ি দিয়ে সবকিছু ভেঙ্গে তছনছ করা শুরু করল, কিন্তু সেগুলা আর নতুন করে জোড়া লাগলো না! তারপর একটা বিশাল “মেকা”-র সাথে তুমুল লড়াইয়ে নেমে গেলো!
হঠাৎ করেই কিয়োটোতে একের পর এক ঘটনা ঘটা শুরু করল। অঘটন ঘটা শুরু করল। আর সবকিছু হয়ে উঠল আরো অনেক আকর্ষনীয়।

সিনোপ্সিস নিয়ে মাথা ঘামানোর কোন প্রয়োজন নেই। প্রথম কয়েক পর্ব দেখার পর কিয়োসৌগিগা বেশ জটিল আর অগোছালো মনে হবে। এর কাহিনী এগুবো অতীত আর বর্তমানে সমান্তরালে। নন-লিনিয়ার ন্যারেটিভ, বুঝতে কষ্ট হওয়ারই কথা। তাই প্রথমে সবকিছু মাথার উপর দিয়ে গেলেও অসুবিধা নেই। সব জটিলতার পেছনে কিয়োসৌগিগার গল্প খুবই সহজ সরল, পারিবারিক ভালোবাসা। এক কোরের অনেক অরিজিনাল অ্যানিমেই ভালো শুরুর পর শেষে প্যাঁচ লাগিয়ে ফেলে বা পেসিং এ গড়বড় হয়ে যায়। মাত্র ১০ পর্বে যেকোন গল্প বলতেই কষ্ট হওয়ার কথা। তার উপর এই অ্যানিমের মত একটা গল্প। কিন্তু বিষ্ময়করভাবে শুধু ১০ পর্ব ধরে আখ্যানে অসাধারন সমন্বয় দেখানোই নয়, কিয়োসৌগিগা পুরো ১০ পর্ব ধরে দূর্দান্ত পেসিং-এ চলে সবশেষে সন্তোষজনক এক সমাপ্তী উপহার দিবে।
আর অন্যান্য অনেক “ভিজুয়ালি এনটাইসিং” অ্যানিমের মত “স্টাইল ওভার সাবস্টেন্স” না, কিয়োসৌগিগার স্টাইল যত মনোমুগ্ধকর, তার সাবস্টেন্সও ততই চিন্তাদ্দীপক। বিনোদনময়ীও। বেশিরভাগ সময়ই হালকা আবহের, ক্লাইম্যাক্সে কিছুটা ডার্ক, কিন্তু কখনোই সম্পূর্ণ গম্ভীর না।

তোয়েই অ্যানিমেশনের কাছে সাধারনত ভালো প্রোডাকশন ভ্যালু আশা করা যায় না। কিন্তু কিয়োসৌগিগা এর ব্যতীক্রম। প্রথম যে জিনিসটা হয়তো চোখে পরবে তা হল এর অসাধারন ভিজুয়াল, আর্টস্টাইল আর অ্যানিমেশন। রঙ্গিন আর ভাইব্রেন্ট। ফ্লুইড আর ফ্লেক্সিবল। কিয়োসৌগিগা চোখ জুড়ানো, ছবির বইয়ের মত। হাতে আঁকা অ্যানিমেশনের নিঁখুত উদাহরন। আর সাথে আছে এর অসাধারন পরিচালনা। মনে রাখার মত ওপেনিং আর এন্ডিং, এবং ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক আর ইন্সার্ট সং-এর চমৎকার ব্যবহার। চমকপ্রদ সিনেমাটোগ্রাফি। আর জমকালো, অ্যাড্রেনালীন তুঙ্গস্পর্শী করা সব অ্যাকশন সীন।

একদিক দিয়ে চিন্তা করলে কিয়োসৌগিগা ইতিহাসের প্রথম “মাঙ্গা”-‘র অ্যানিমে অ্যাডাপ্টেশন। কিন্তু আসলে কিয়োসৌগিগার চৌজুগিগার প্রাণহীন ছবিগুলোতে প্রাণ দিয়েছে; তার দ্বারা কেবল অনুপ্রাণিত হয়ে ধর্ম, ইতিহাস আর লোকগাঁথার সমন্বয়ে যে অসাধারন এক গল্প তৈরী করেছে, যে অনন্য একটি জগৎ তৈরি করেছে, তার ভেতরে চরিত্রগুলোকে জীবন্ত করে ফুটিয়ে তুলেছে – তা মিহো আর মাতসুমোতো, দুই রমণীর সৃজনশীল কল্পনার এক অনবদ্য উদাহরন। প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রগুলোর জন্য একটি করে পর্ব বরাদ্দ করা, তাই প্রথম অংশ এপিসোডিক। তাদের চোখে জগতটা দেখানো, তাদের ভালোলাগা, মূল্যবোধের প্রকাশ; যা দ্বিতীয়াংশে সবগুলো চরিত্রের ক্যারেক্টার ডেভেলপমেন্টের সহায়ক।

এক কথায় বর্ণনা করতে গেলে কিয়োসৌগিগা হল পাগলাটে। এই অ্যানিমে দেখার অভিজ্ঞতার সাথে খুব কম অ্যানিমেরই মিল খুঁজে পাবেন। কিয়োসৌগিগা আমার দেখা অন্যতম সেরা ফ্যান্টাসি অ্যানিমে। (উচুতেন কাযোকুর পাশাপাশি) ২০১৩ সালের সেরা অ্যানিমেও।
কিয়োসৌগিগা হল জাত অ্যানিমেশন। লাইভ অ্যাকশন বা বই – আর কোন বিনোদন মাধ্যমেই যা ফুটিয়ে তোলা সম্ভব হতো না। শুধু “অ্যানিমে” বা “টিভি বিনোদন” না, “অ্যানিমেশন”-এর ভক্ত হলে এখনই দেখতে বসে যান। কিয়োসৌগিগা আপনাকে মুগ্ধ করবে, বারবার মুগ্ধ করবে, অনেকদিন চোখে লেগে থাকবে, মনে গেঁথে থাকবে, আর আবারো মনে করিয়ে দিবে অ্যানিমেশনের সব কিছু যা এই মাধ্যমকে অনন্য আর আলাদা করেছে আর সবকিছু থেকে।

আমার রেটিংঃ ৮৯/১০০

[ বিদ্রঃ যেভাবে দেখবেন –

পর্ব ০০ – প্রথম ওভিএ। প্রথম ৪-৫ পর্বের সামারির মত, একটি নির্দিষ্ট গুরুত্বপূর্ন ক্লিফহ্যাঙ্গারে গিয়ে শেষ। অবশ্য প্রথম দেখায় কিছু বুঝার কথা না।
পর্ব ০১-১০ – মূল কাহিনী
পর্ব ৫.৫ – সত্যিকারের কৌযানজি মন্দিরের উপর একটি ডকুমেন্টারি ধাঁচের পর্ব, অ্যানিমের তিন ভয়েস অ্যাকটরের উপস্থাপনায়।
পর্ব ১০.৫ – পুরো কাহিনীর একটি সামারি/রিভিউ ]

Ima, Soko ni Iru Boku রিভিউ — Fahim Bin Selim

Now and Then, Here and There (今、そこにいる僕 Ima, Soko ni Iru Boku)
প্রচারকাল: ১৯৯৯-২০০০
জনরা : সাইফাই, মিলিটারি, ডিস্টোপিয়া, ওয়ার ড্রামা
পরিচালক : আকিতারো দাইচি
লেখক(অ্যানিমে অরিজিনাল) : হিদেইয়ুকি কুরাতা
প্রযোজক : এ.আই.সি.
পর্ব : ১৩
মাই অ্যানিমে লিস্ট রেটিং : ৭.৮

শুজুও “শু” মাতসুতানি সাধারন এক হাইস্কুল পড়ুয়া বালক। সে থাকে জাপানের ছোট এক শহরে, যার এক কোনায় আছে অনেকগুলো পরিত্যক্ত ফ্যাক্টরির চিমনী, মধ্য দিয়ে বয়ে চলা সুন্দর একটা নদী, যা এক পাশে গিয়ে মিশেছে সাগরে, যেখানে বিকেলে সূর্যাস্তের গাঢ় লাল আভা ছড়িয়ে পড়ে। শু বেসবল খেলে, বল মেরে প্রতিবেশীর জানলার কাঁচ ভেঙ্গে ফেলে। স্কুলে কেন্দো ক্লাবের সদস্য সে;আবার যে মেয়েটাকে সে পছন্দ করে, সেই মেয়েটা পছন্দ করে তার রাইভালকে। শু ছিল সাধারন এক বালক।

তারপর একদিন স্কুল ছুটির পর সে লালা-রু নামের অদ্ভুত একটা মেয়েকে দেখতে পায় পরিত্যক্ত সেই চিমনীর উপর বসে থাকতে। শু সেখানে উঠে তার সাথে কথা বলার চেষ্টা করে। আর তখনই যেন ভোজবাজির মত হাওয়া থেকে উদয় হয় কিছু অদ্ভুতদৃশ্য অস্ত্রসজ্জার মানুষ। যেভাবে এসেছিল সেভাবেই তারা লালা-রুকে তুলে নিয়ে উধাও হয়ে যায়। আর ঘটনাক্রমে তাদের সাথে শু-ও এসে হাজির হয় অন্য এক জগতে।

বিশাল এক দূর্গস্বরুপ জায়গায়, যার পুরোটাই কংক্রিট আর লোহার বিশাল এক গোলকধাঁধাঁ। যার রাজত্বে রক্তপিপাসু এক স্বৈরশাসক, কিং হামদো। আর দূর্গজুড়ে ছড়ানো ছিটানো তার অধীন সৈন্যদল। যাতে আছে প্রাপ্তবয়স্ক, যুবক, কিশোর এমনিক শিশু সৈন্যরাও! শু আটকা পরল কিং হামদোর হাতে। আটকা পরল এই অপার্থিব জগতে, দূর্ভেদ্য এক দূর্গে, যার চারপাশে যতদুর চোখ যায় শুধু ধু-ধু মরুভূমি। নদী আর সাগর তো দুরের কথা, এক ফোঁটা পানি পাওয়াও যেখানে দুঃসাধ্য ব্যাপার!

এই অ্যানিমের ব্যাপারে কথা বলার আগে প্রথম পর্বটার কথা বলা বেশ জরুরী। প্রথম পর্ব দেখে দুটো জিনিস হওয়া স্বাভাবিকঃ (১) নরমাল ফ্যান্টাসি, শৌনেন ভাইব, শৌনেন হিরো দেখে যদি আশাহত হোন, তবে ফিরে আসুন, হাল ছাড়বেন না। আর (২) যদি নরমাল ফ্যান্টাসি, শৌনেন ভাইব দেখে অ্যাকশন প্যাকড, “হিরো সেভস দ্য ওয়ার্ল্ড” অ্যানিমে আশা করেন, তাহলে দেখা বাদ দিন, এটা আপনার জন্য না।

শু আসলেই এক সাধারন শৌনেন হিরো। সে লড়াইয়ে বুদ্ধি ব্যবহার করে না, বরং বেপরোয়া ভাবে আক্রমনই তার সম্বল। কিন্তু পার্থক্য হল আর সব শৌনেন হিরোর মত তার উল্লেখযোগ্য কোন শক্তি নেই;সে অত্যাচারিত হয়, নির্যাতিত, নিষ্পেষিত হয়, কিন্তু তার কোন “নায়কোচিত” জবাব দিতে পারেনা। সে চরম দুর্দশার মূহুর্তেও আশার বাণী শোনায়, “বন্ধুত্ব”-এর ফাঁকা বুলি আওড়াও। কিন্তু পার্থক্য হল কেউ তার কথায় খুব একটা কান দেয় না, তার কথায় শত্রু বন্ধুতে পরিণত হয় না, বরং অনেকাংশে তার ছেলেমানুষিই অন্যের বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

শু বিশ্বজয়ী কোন নায়ক না, কিন্তু শু সাধারন এক বালক। এই অ্যানিমের আর সব চরিত্রের মতই। কাউকেই ভালো-খারাপের মানদ্বন্দে বিচার করা সম্ভব হবে না, কিন্তু এমনকি পার্শ্বচরিত্রগুলোও মনে রাখার মত। শুধু হাতে আঁকা কোন ছবি নয়, তারা সবাই-ই যেন নিজস্ব গল্প থাকা, নিজস্ব জীবনঅভিপ্রায় থাকা, বাস্তব এক একজন মানুষ। Now and Then, Here and There যতটা শু এর এই অভিযানের গল্প, ততটাই তার বন্দীসংগী সারা ‘র নিষ্পাপ কৈশোর থেকে নির্মম বাস্তবতার সাথে পরিচয়ের গল্প, বাস্তুহারা কিশোর সৈন্য নাবুকার অসম্ভব স্বপ্ন বুকে নিয়ে অস্ত্র হাতে তুলে নেওয়ার গল্প। এমনকি যেই অ্যান্টাগনিস্টকে দেখে প্রতি মূহুর্তে তাকে গলা টিপে খুন করার কথা মাথায় আসবে, সেই অবিশ্বাস্য নিষ্ঠুর কিং হামদোর অসাধারন চরিত্রায়নও অভিভুত হওয়ার মত। আর ভয়েস অ্যাক্টরদের অভিনয় বিশেষ প্রশংসার দাবিদার।

গত শতাব্দীর অ্যানিমে হওয়ায় স্বভাবতই আর্ট বেশ গুমোট, সাদামাটা; অ্যানিমেশন বিশেষ কিছু না। কিন্তু এর গল্পের সাথে মানিয়ে যাওয়ার মত। আর Now and Then, Here and There-এর গল্প হচ্ছে এর সবচেয়ে শক্তিশালী দিক। অসাধারন অর্কেস্ট্রাল আবহসঙ্গিতের মূর্ছনায় এর সুনিপুণ-নির্মিত দুনিয়ায় একবার হারিয়ে গেলে শেষ না করে উঠতে পারবেন না। ফ্যান্টাসি, শৌনেন ভাইব দেখে হাল ছাড়বেন না; কিন্তু দেখার আগে সতর্ক থাকুন।

Now and Then, Here and There ডার্ক, খুবই ডার্ক অ্যানিমে। হাসির দৃশ্য তো দুরের কথা, সাধারন খুশি করে দেওয়ার মত দৃশ্যও হাতেগোনা। উল্লেখযোগ্য কোন গোর কিংবা ন্যুডিটি নেই, কিন্তু এর ভায়োলেন্স সীমাহীন। তা অত্যাচার আর রক্তপাত থেকে শুরু করে শিশু নির্যাতন, দাসত্ব, হত্যা, গনহত্যা, আত্নহত্যা, এমনকি ধর্ষন পর্যন্ত বিস্তৃত। কিন্তু এর ভায়োলেন্স কখনোই কুরুচিপূর্ন না, শক-ভ্যালুর জন্য না; তা ভয়ংকর কিন্তু বাস্তব।

যুদ্ধের ভয়াবহতা, নির্মমতা নিয়ে এরকম বাস্তব আর হৃদয়বিদারী ভিজুয়াল ফিকশন হয়তো আর খুব বেশি নেই। Legend of the Galactic Heroes যদি শাসক আর নেতাদের দৃষ্টি থেকে যুদ্ধ-রাজনীতির গল্প হয়, তবে Now and Then, Here and There হল সাধারন মানুষের চোখে দেখা যুদ্ধের গল্প। নির্দিষ্ট করে বললে The Boy In The Stripped Pajamas-এর মত শিশুদের চোখে দেখানো যুদ্ধের গল্প, কিন্তু পার্থক্য হল এর বর্বরতা ব্যাকগ্রাউন্ডে না;বরং Schindler’s List আর The Pianist-এর সাথে তুলনীয় – বারবার চোখ ভিজিয়ে দেওয়া, গলা বাষ্পরুদ্ধ করা আর রাগে হতবিহবল করে দেওয়া।

কিন্তু এই অচেনা জগতের আড়ালেই সবচেয়ে ভয়াবহ আর দুঃখজনক বিষয় হল, Now and Then, Here and There-এর মূলগল্প অতিরঞ্জিত কিছু না। এটা যুদ্ধ বিগ্রহের গল্প, আমাদের চারপাশে হওয়া যুদ্ধ-বিগ্রহের গল্প; যা হাজার হাজার বছর আগেও হয়েছে, এবং এখনোও হচ্ছে। এখন আর তখন, এখানে আর সেখানে। সবসময়, সবজায়গায়। কিন্তু তারপরও Now and Then, Here and There শুধু নিরাশার গল্প না, মানবতার সৌন্দর্যের গল্পও, ভালোবাসার গল্প, পরিবারের গল্প। সকল হতাশার পরও হাল না ছাড়ার, নতুন শুরুর গল্প।
Now and Then, Here and There সম্ভবত একবার দেখা শেষ করলে আর দ্বিতীয়বার দেখতে চাইবেন না, কিন্তু একবার দেখা শেষ করলে আর কোনদিন ভুলতে পারবেন না।

সাজেস্টেড অডিয়েন্স : প্রাপ্তবয়স্ক (এবং শুধু বয়সের দিক দিয়ে না); ট্র্যাজেডি, হিউম্যান ড্রামা প্রেমীদের।
সামগ্রিক : চুম্বকাকর্ষী গল্প, ধীর কিন্তু ঘটনাবহুল, চিরদিন মনে রাখার মত চরিত্র, ‘৯০ এর আর্ট অ্যানিমেশন, চমৎকার আবহ সংগীত।
আমার রেটিং : A+

অ্যানিমের ইতিহাস ২ – ১.৯৯ তম পর্বঃ এ স্পেস অডিসি

ষাটের দশকে Astroboy প্রথম অ্যানিমে হিসেবে টেলিভিশনে প্রচার হওয়ার পর অনেকটাকাল সাই-ফাই আর ফ্যান্টাসী অ্যানিমে ছোটপর্দা শাসন করেছে। অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা সম্পন্ন অথবা আদর্শবান সব মূল চরিত্র। ভালো আর খারাপের স্পষ্ট ব্যাবধান থাকা গল্প। অ্যানিমে ছিল বিনোদনের এক ভিন্নধর্মী মাধ্যম যা উপভোগ করতে পারতো পরিবারের সবাই।

যার ধারাবাহিকতায় ১৯৬৯ সালে শুরু হল “ওয়ার্ল্ড মাস্টারপিস থিয়েটার”। Dororo, Moomin’, Anderson Monogatari, Rocky Chuck অথবা তাকাহাতার Heidi – প্রথমে Zuiyo Eizo আর পরে Nippon TV তে প্রতি রবিবার সন্ধ্যা ৭ঃ৩০ বরাদ্ধ ছিল Mushi Production এর অ্যানিমেশনে তৈরি বিশ্বের জনপ্রিয় সব ধ্রুপদী গল্পের জন্য।

সত্তরের শুরুতে আরো একটা জিনিস যা জনপ্রিয়তা পাওয়া শুরু করল তা হল, স্পোর্টস অ্যানিমে। TIger Mask, Kyojin no Hoshi-’র পর, ১৯৭০ সালে ওসামু দেজাকির পরিচালনায় শুরু হল Ashita no Joe. ইকি কাজিওয়ারার মাঙ্গা অবলম্বনে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত চলা ৭৯ পর্বের প্রথম মৌসুমে ছিল জো ইয়াবুকির শুন্য থেকে শীর্ষে ওঠার এক অনবদ্য কাহিনী। কিন্তু অ্যানিমের পরবর্তী বিশাল জাগরনটা আরো তিন বছর পরের।

১৯৭৩ সালে প্রযোজক ইয়োশিনোবু নিশিজাকি প্রথম সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী এক অ্যানিমের পরিকল্পনা শুরু করেন। যার গল্প হবে গতানুগতিক অ্যানিমে থেকে তুলনামূলক জটিল আর পরিণত। প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী এই অ্যানিমের হওয়ার কথা ছিল “Lord of the Flies”-এর আন্তঃমহাকাশীয় পূনর্বণনা। যাতে পৃথিবী রক্ষার এক অন্তীম মহাকাশীয় যাত্রায় সঙ্গী হবে বিভিন্ন দেশের ছোট ছোট বাচ্চারা। কিন্তু পরবর্তীতে মাঙ্গাকা লেইজি মাৎসুমোতো এই প্রকল্পে যোগদান করায় প্রাথমিক গল্পের প্লট আমূল বদলে গেল ১৯৭৪ এ প্রচার শুরু হওয়া অ্যানিমেতে।

“ ২১৯৯ সাল। পৃথিবী দূর মহাকাশের অ্যালিয়েন জাতি “গামিলাস”-দের আক্রমনের শিকার। পৃথিবীপৃষ্ট বসবাসের অনুপযোগী হয়ে যাওয়া এখন মানবজাতি আবাস গেড়েছে ভূতলে, কিন্তু সেখানেও ক্রমশ বিকিরনের কারণে তাদের সমাপ্তী ক্ষনীয়ে আসছে। এমন সময় সাহায্যের হাত বাড়ালো ইস্কান্দার গ্রহের রাণী স্টারশা। পথ বাতলে দিলো পরিত্রানের। মানবজাতিকে মোকাবেলা করতে হবে গ্রহে গ্রহে ওঁত পেতে থাকা শত্রুর আক্রমন, পাড়ি দিতে হবে হাজার হাজার আলোকবর্ষ, আর সময়-কালের বাধা; পৌছতে হবে বৃহৎ ম্যাজেলানিক মেঘ-এর কাছে থাকা ইস্কান্দার গ্রহে। যেখানে অতিবুদ্ধিমান ইস্কান্দারিয়ানদের কাছে আছে গ্রহ পূনর্জীবিত করার ক্ষমতা থাকা – কসমো ডিএনএ। “

ডার্ক, ইমোশোনালি ড্রামাটিক, কাহিনীপ্রবাহে ধারাবাহিক;বাস্তব-ত্রুটিপূর্ণ, মোরালি অ্যাম্বিগিউয়াস চরিত্রের আনসাম্বল – জায়ান্ট রোবট, সুপার রোবট আর সুপার হিউম্যান থেকে বের হয়ে এসে Space Battleship Yamato সাই-ফাই অ্যানিমে জগতে প্রথম এক নতুন ধারার সূচনা করলো – স্পেস অপেরা। ইয়ামাতো পেল তুমুল জনপ্রিয়তা। এবং তা শুধু জাপানেই না।

১৯৭৭ এ বের হওয়া Star Wars-এর রেষ কাটতে না কাটতেই ১৯৭৯ সালে ইয়ামাতো আমেরিকায় প্রচার শুরু হল “Star Blazers” নামে। ইউরোপীয়ান আর লাতিন দেশগুলোও পিছিয়ে ছিলো না। ইতালীতে একই নামে, গ্রীসে “Spaceship Argo”, স্পেন আর লাতিন আমেরিকায় “Starship Intrepid” আর ব্রাজিলে “Star Petrol” নামে প্রচার হওয়া ইয়ামাতো অ্যানিমের জনপ্রিয়তা নিয়ে গেল বিশ্বব্যাপী, নতুন এক প্রজন্মের কাছে।

প্রথম প্রচারিত ২৬ পর্বের সিজনের পর সিকুয়াল হিসেবে বের হয়েছে আরো দুটি সিজন এবং চারটি মুভি। আর এর পর তৈরি করার চেষ্টা হয়েছে আরো কয়েকটি রিবুট। প্রথম প্রচারের তিন দশক পরও ইয়ামাতোর জনপ্রিয়তার রেশ কমেনি একটুও। ২০১২ প্রথম ২৬ পর্বের মূল গল্পের পূনর্বর্ণনা হয়ে ইয়ামাতো ফিরে এসেছে, Space Battleship Yamato 2199 নামে।

শুধু অ্যানিমের জনপ্রিয়তা বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত করায় ইয়ামাতো্র অবদান সীমাবদ্ধ ছিল না, অ্যানিমে ইন্ড্রাস্ট্রিতে এক বিশাল পরিবর্তনের সূচনা এর মাধ্যমেই। ইয়ামাতোই প্রথম অ্যানিমে বা মুভি যা জাপানের Seiun Award জয়লাভ করেছিল। Gundam, Macross, Legend of the Galactic Heroes, Space Runaway Ideon কিংবা একই মাঙ্গাকার Galaxy Exoress 999 Space Pirate Harlock-এর মত স্পেস অ্যাডভেঞ্চার আর স্পেস অপেরা অ্যানিমে ‘৭০ আর ‘৮০ জুড়ে জাপানের টিভি শাসন করেছে। যে পথটা বাতলে দিয়েছিল ইয়ামাতোই।

Gundam আর Macross-এর আগে, Harlock আর Legend of the Galactic Heroes-এর আগে, Star Wars আর Battlestar Galactica-’র আগে ইয়ামাতো সাই-ফাই ভক্তদের জন্য দিয়ে গেছে মহাকাশে মহাকাব্যিক এক যাত্রার গল্প। আর ইয়ামাতো দেখে বড় হওয়া, অনুপ্রানিত হওয়া এক প্রজন্ম আর কয়েক দশক পর অ্যানিমের হাল ধরেছে নিজেরাই। যার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য নামটা সম্ভবত আনো হিদেয়াকি।

11169559_959241624107655_3981340516219597846_o

 

অ্যানিমের ইতিহাস (অথবা অমরত্বের অপ্রত্যাশিত বর্ত্ম) – ১.৯৮৯ তম পর্বঃ আমরা কী নিয়ে কথা বলি, যখন আমরা কথা বলি ওসামু তেজুকাকে নিয়ে

শিন তাকারাজিমার সাফল্যের পর তেজুকা পেশাদার মাঙ্গাকা হওয়ার পথে পা বাড়ালেন।
১৯৪৯ সালে তেজুকা লিখলেন এক সাই-ফাই, গোয়েন্দা গল্প। Metropolis. যা পরবর্তীতে হয়েছে ২০০১ সালের একই নামের অ্যানিমে ফিল্ম এর অনুপ্রেরণা।

পরবর্তী বছর বেরোল তার অন্যতম জনপ্রিয় কাজ, Jungle Emperor. আমেরিকায় যা Kimba The White Lion নামে পরিচিত। এটাই ছিল তেজুকার সর্বপ্রথম “সিরিয়ালাইজড” মাঙ্গা। ১৯৫০ থেকে ১৯৫৪, চার বছরে এই মাঙ্গার বের হয়েছিল তিনটি ভলিয়্যুম। কিম্বা হয়ে উঠল আইকনিক এক চরিত্র।

১৯৫১ সালে তেজুকা লিখলেন Captain ATOM. এই মাঙ্গাতেই প্রথম আবির্ভাব ঘটে তেতসুয়ান অ্যাটমের। পরবর্তী বছর তিনি লিখলেন এর সিক্যুয়েল, Tetsuwan Atom. তেতসুয়ান অ্যাটমের সাফল্য ছাড়িয়ে গেল তাঁর আগের সব কাজকে। যেকোন মাঙ্গার আগের সব সাফল্যকে। অনেকটা হঠাৎ করেই মাঙ্গা হয়ে ঊঠল যেন জনসাধারনের গ্রহনযোগ্য একটি বিনোদনের মাধ্যম। ছোটবড় সবাই অপেক্ষা করত সপ্তাহের সেই দিনের জন্য যখন নতুন চ্যাপ্টার মুক্তি পাবে। এই সাফল্যের জোয়াড়ে চড়েই তেতসুয়ান অ্যাটম প্রকাশিত হয়েছে টানা ১৬ বছর ধরে।

প্রায় একই সময়, ১৯৫৩ সালে প্রথম প্রকাশ হওয়া শুরু হয় তেজুকার আরেকটি উল্লেখযোগ্য কাজ, Princess Knight. তাকারাজুকা গীতিনাট্যের কথা মনে আছে? যেখানে নারী-পুরুষ সব চরিত্রে অভিনয় করত মহিলারা? মেয়েদের ছেলের মত পোশাক পড়া, রাজকন্যা আর রাজপুত্রের গল্প, প্রিন্সেস নাইট হল সর্বপ্রথম শৌজো মাঙ্গার। প্রিন্সেস নাইটে তেজুকা বললেন এক “জেন্ডার বেন্ড”
প্রোটাগনিস্ট প্রিন্সেস স্যাফায়ারের গল্প, যার দেহে ছিল একই সাথে দুটো আত্নার সহাবস্থান, একটি ছেলে এবং একটি মেয়ের। যার প্রভাব লক্ষনীয় তার অনুগামী জনপ্রিয় শৌজো মাঙ্গায়, অ্যানিমেতে।

সময় যত যেয়েছে তেজুকার চোখ বড় বড় চরিত্রের, “কার্টুনীয়”, সাধারণ বিনোদনের গল্প গুলো হয়েছে আরো গভীরতা পূর্ণ, কখনো ডার্ক, আর তাঁর আঁকা হয়েছে আরো বাস্তবিক।
১৯৫৬ সালে তেজুকা আঁকা শুরু করলেন, তাঁর নিজের মতে যা তাঁর সেরা এবং সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী কাজ, Hi no Tori(Phoenix). নিজের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত যা তেজুকা লিখে গেছেন এবং তা এখনো অসম্পুর্ণ। ফিনিক্সের গল্প; স্থান-কালের এক অনবদ্য যাত্রা, ভিন্ন যুগ আর ভিন্ন পরিবেশে, ভিন্ন সব মানুষের গল্প; যাদের যোগ সূত্র অমরত্ব লাভের আকাঙ্ক্ষা।

তেজুকার আরেকটি সমালোচকদের দ্বারা প্রশংসিত কাজ হল, Buddha. বৌদ্ধ ধর্মের প্রতিষ্টাতা গৌতম বুদ্ধের জীবনি, যাতে অবশ্যই ছিল তেজুকার নিজস্ব ছোঁয়া। ২০০৪-২০০৫, টানা দুই বছর বুদ্ধ জিতেছে আইসনার অ্যাওয়ার্ডস, আন্তর্জাতিক বিভাগে।
ড.ওসামু তেজুকা তার চিকিৎসা বিদ্যার জ্ঞান কাজে লাগালেন তার পরবর্তী কাজে। Black Jack, এক প্রতিভাবান শল্য চিকিৎসকের গল্প। ১৯৭৩ থেকে ১৯৮৩ পর্যন্ত টানা দশ বছর ব্ল্যাক জ্যাক প্রকাশিত হয়েছে।
আশির দশকের আরেকটি উল্লেখযোগ্য কাজ, Adolf. ত্রিশের দশকের জার্মানীর তিন অ্যাডলফের গল্প; যাদের একজন এক সাধারণ জার্মান, একজন ইহুদী আর একজন স্বয়ং স্বৈরশাসক!

তেজুকা কাজ করতেন সপ্তাহে ৫ দিন, তার নিজস্ব এক অ্যাপার্টমেন্ট ভবনে;যেখানে ঢুকতে পারত কেবল তার স্ত্রী। এমনকি তার এডিটরও না। বছরে মাত্র গড়ে ৬০ দিন থাকতেন নিজের বাসায়, পরিবারে সাথে। তিনিই শুরু করেন মাঙ্গাকাদের অ্যাসিটেন্ট রাখার প্রচলন, যা একই সাথে যেমন সাপ্তাহিক সিরিয়ালাইজেশনের কাজ সহজ করে দিলো, তেমনি উদীয়মান মাঙ্গাকাদের পেশাদার কাছ থেকে শেখার সু্যোগ করে দিলো। যা আজো অনুসরন করা হয়।

১৯৮৯ সালে পাকস্থলীর ক্যান্সারে মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত ওসামু তেজুকা লিখেছেন ৭০০ ভলিয়্যুম আর প্রায় দেড় লাখ পৃষ্ঠার মাঙ্গা! ১৯৮৫ তে তার ৪০ বছরের মাঙ্গাকা জীবন উপলক্ষে এনএইচকে তে প্রচারিত এক ডকুমেন্টারিতে তিনি বলেছিলেন তিনি লিখে যেতে চান আরো চল্লিশ বছর। কারণ তার এখনো অনেক, অনেক গল্প বলা বাকি। ওসামু তেজুকা আরো চল্লিশ বছর বাঁচেন নি, ফিনিক্সের অমরত্বের গল্পও শেষ করে যেতে পারেননি, কিন্তু তার মাত্র ৬১ বছরের জীবনে তিনি মাঙ্গার ইতিহাসকে যতটা বদলে দিয়েছেন, তাতে কি তিনি নিজে অমরত্ব নিশ্চিত করে যাননি?

“Foreign visitors to Japan often find it difficult to understand why Japanese people like comics so much. One explanation for the popularity of comics in Japan is that Japan had Osamu Tezuka, whereas other nations did not.”

10959489_913106612054490_6674192471629459510_n

 

অ্যানিমের ইতিহাস যোকু শৌ – ১.৯৪৮ তম পর্বঃ ওসামুশি(-শি)

“You should work doing the thing you like most of all.”

২০ বছর বয়সে যখন ওসামু তেজুকা জীবনের এক সন্ধিক্ষনে পৌছলেন, চিকিৎসক না মাঙ্গাকা, কোন নেশাটাকে পেশা হিসেবে নিবেন তা নিয়ে দোদুল্যমান, তখন এটাই ছিল তাঁর মায়ের উপদেশ। দুই পেশার প্রতিই তার ভালোবাসা আর সম্মান ছিল। যদিও সামাজিকভাবে মাঙ্গাকা হওয়া সেসময় যেমন খুব একটা সম্মানের পেশা ছিল না, আর সম্মানীটাও ছিল সেরকমই কম। কিন্তু যদি আসলেও পারিবারিক চাপে তুলনামূলক ভালো আর্থিক ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে মাঙ্গাকা হওয়ার স্বপ্ন বিসর্জন দিতেন, তাহলে ভাবুন তো মাঙ্গার ইতিহাসটা কতটা বদলে যেত?
অ্যানিমের ইতিহাস?
জাপানের ইতিহাস, তাদের পুরো সংস্কৃতিও কি না?

তিন সন্তানের সবচেয়ে বড়, ওসামু তেজুকার জন্ম ৩ নভেম্বর, ১৯২৮; ওসাকা প্রিফেকচারের তোয়োনাকা শহরে। কিন্তু তাঁর বেড়ে ওঠা হিয়োগো প্রিফেকচারের তাকারাযুকা শহরে। ছোট ওসামু তেজুকার ভালোবাসার বিষয় ছিল তিনটি।

পোকা সংগ্রহ।
থিয়েটার। তার মায়ের সাথে তাকারাযুকা থিয়েটারে তাকারাযুকা গিতীমঞ্চনাটক দেখতে যাওয়া। তাকারাযুকা থিয়েটারের মঞ্ছস্থ হত রোমান্টিক সব গল্প, রাজকন্যা আর রাজপুত্রের গল্প। কিন্তু মজার বিষয় এর অভিনেত্রী-“অভিনেতা” সবাই ছিলেন মেয়ে। এমনকি পুরুষ চরিত্রেগুলোতেও।
আর বাসায় তার বাবার সংগ্রহের কমিকস আর কার্টুন। তেজুকার আগ্রহী চোখ নিবিদ্ধ থাকতো ওয়াল্ট ডিজনী আর ম্যাক্স ফ্লাইসার(পপাই, বেটি বুপ, সুপারম্যান) এর অনবদ্য অ্যানিমেশনে। তার দুই অনুপ্রেরণা।
জ্বলজ্বল করা বড় বড় সব চোখের চরিত্রের কার্টুন।
বাম্বি, মিকি মাউস, পপাই।

তেজুকা কমিকস দ্বারা এতটাই মুগ্ধ হলেন যে এলিমেন্টারি স্কুলের দ্বিতীয় বর্ষেই নিজে তা আঁকা শুরু করলেন। কিন্তু বাদ সাধল ভাগ্য। যে হাত দুটো দিয়ে তিনি বছর বছর পরে আঁকবেন Black Jack, সেই হাতদুটোই সংক্রমণের ফলে এত ফুলে গেল যে তা হারানোর যোগাড়। চিকিৎসকের নিবিড় পরিচর্যায় তেজুকা সুস্থ হয়ে উঠলেন। তবে এ ঘটনা তার মনে বড় একটা প্রভাব ফেলল। তেজুকা মাঙ্গা লেখা চালিয়ে গেলেন ঠিকই, কিন্তু একই সাথে ভর্তি হলেন ওসাকা ইউনিভার্সিটির মেডিক্যাল ফ্যাকাল্টিতে। কলেজের প্রথম দিকেই, মাত্র ১৭ বছর বয়সে তার প্রথম মাঙ্গা প্রকাশ পেল ছোটদের পত্রিকায়, চার-প্যানেলের এক মাঙ্গা, The Diary of Ma-chan.
[http://i.imgur.com/OqWZzNk.jpg]

তার কাজে পশ্চিমের অনুপ্রেরণা ভালোভাবে প্রকাশ পেল তার পরবর্তী মাঙ্গায়, ১৯৪৭ এ। ছোটবেলায় যেসব ধ্রুপদী গল্প পড়ে বড় হয়েছেন, তেমনই একটি, Tressure Island এর গল্পে নিজের ছোঁয়া লাগিয়ে তিনি লিখলেন The New Tressure Island/Shin Takarazima। যা আগের সব মাঙ্গার থেকে আলাদা ছিল তার অসাধারন গল্পবুঁনট, সিনেমাটিক দৃশ্যায়ন আর দ্রুতগতির কাহিনীর কারণে। Shin Takarazima জনপ্রিয়তা জাপান জুড়ে ছড়াল, তা বিক্রি হল হটকেকের মত। প্রায় ৪ লাখ কপি!
[http://i.imgur.com/DWoL60k.jpg]

“পোকা সংগ্রাহক” তেজুকা অবশ্য তার এই ভালোবাসাটাও ভুললেন না। Osamushi বা Ground Beetle এর নামে রাখলেন নিজের ছদ্মনাম।
মেডিকেল স্কুলের পাঠ শেষ হল। কিন্তু “ডক্টর ওসামু তেজুকা” চিকিৎসাবিদ্যা বাদ দিয়ে যুদ্ধ-পরবর্তী জাপানের মানুষের জীবনকে পরিবর্তনের দায়িত্ব নিলেন।
মাঙ্গার প্যানেলে।

10451023_911098545588630_673127875041019372_n

 

Mind Game review by Fahim Bin Selim

মাইন্ড গেম[Mind Game](২০০৪)
অ্যানিমে ফিল্ম
১ ঘন্টা ৪৪ মিনিট
জনরাঃ অ্যাডভেঞ্চার, কমেডি, রোমান্স, সাইকোলজিক্যাল, দেমেন্তিয়া
মূল(মাঙ্গা): রবিন নিশিকি
প্রযোজকঃ স্টুডিও ফোর সি
পরিচালকঃ মাসাকি ইউয়াসা

ছোটবেলা থেকেই নিশি মিয়নকে পছন্দ করে। আর এখন এই ২০ বছরের জীবনে তার স্বপ্ন দুটো – নামকরা মাঙ্গাকা হওয়া আর মিয়নের ভালোবাসা পাওয়া করা।
কিন্তু সমস্যাও দুটো – বড়, নামকরা মাঙ্গাকা হওয়ার পথটা অনেক বন্ধুর; পদে পদে মুখ থুবড়ে পরা। আর এক বর্ষাস্নাত সন্ধ্যায় ছোটবেলার ভালোবাসা মিয়নের সাথে দেখা হওয়ার পর যখন সে অবশেষে তার অস্ফুট ভালো লাগার কথা ব্যক্ত করল, তখন জানতে পারল যে মিয়ন ইতিমধ্যেই আরেকজনের বাগদত্তা! ব্যার্থতা আর গ্লানিতে অভিভূত নিশির রাতটা এখানে শেষ হলেও চলত।
মিয়নদের ইয়াকিতোরি রেস্টুরেন্টে যাওয়ার পর ঘটনাচক্রে সে মুখোমুখি হয়ে গেল দুই ইয়াকুজার সাথে।
তারপর “কামিসামা”-র সাথে।
আর এক বৃদ্ধ লোকের সাথে। এমন এক জায়গায় যেখানে সাধারনত বৃদ্ধ লোকেরা থাকে না। কোন মানুষই থাকে না…

“হার মেনো না; বাঁচো!” – এটা হল মাইন্ড গেমের উপজীব্য। খুবই পরিচিত লাগছে? পরিচিত লাগারই কথা। সেই আশির দশকের ফ্রিজার সামনে দাঁড়ানো গোকু আর হালের পেইনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নারুতো; আর মাঝখানে শ’খানেক গতানুগতিক অ্যানিমে হার না মানার জয়গান গেয়ে গেছে; আর জীবলীর ফিল্মগুলো জীবনের সৌন্দর্য দেখিয়েছে বারবার। কিন্তু মাইন্ড গেম আর যাই হোক গতানুগতিক না। ধারেকাছেও না। বরং যদি আপনি “এঞ্জেল’স এগ” বা “তেক্কোন কিনক্রেট” দেখে না থাকেন, তাহলে বলতে হবে এর মত অ-গতানুগতিক, ভিন্নধারার ফিচার লেংথ অ্যানিমে ফিল্ম হয়তো আপনি দেখেননি।

মাইন্ড গেম হয়তো জীবন পাঠ শেখাবে;সূক্ষ্ণভাবে। আর তার মূল কাহিনীর আবহ ডার্ক। কিন্তু এটা আর যাই হোক কোন গুরু-গম্ভীর ফিল্ম না। বরং ইতিমধ্যেই যদি তাতামি গ্যালাক্সিতে ইউয়াসার ডার্ক হিউমারের সাথে পরিচিত হয়ে থাকেন, তবে জানুন এক দশক আগেও তার রসাত্ববোধ কোন অংশে কম ছিল না। এই মুভিতে মানুষ মারা যাবে, ইয়াকুজাদের তাড়া খাবে আর নিগির্ণ হবে বড় এক তিমি দ্বারা – কিন্তু আগাগোড়া এর কৌতুকাবহ বজায় থাকবে। সবসময়।

আর এই উদ্ভট, অ-সাধারন অ্যানিমের সাথে ইউয়াসার উদ্ভট, অ-সা্ধারন আর্টস্টাইল যেন নিঁখুত সামঞ্জস্যতাপূর্ণ। ইউয়াসার পরিচালনার প্রথম অ্যানিমে। আর সময়ে সময়ে সেই আর্টস্টাইলও বদলাবে; নন-অ্যান্থোলজিক্যাল অ্যানিমে বা স্পেস ড্যান্ডির মত ব্যতীক্রম বাদে যা কল্পনাও করা যায় না; তাও আবার একটি নির্দিষ্ট কাহিনী নিয়ে গড়ে ওঠা ফিচার লেংথ ফিল্মে! স্টূডিও ফোর ডিগ্রি সেলসিয়াসের জগতে স্বাগতম!

মাইন্ড গেম শুরু হবে জমকালো ভাবে আর শেষ হবে – সম্ভবত অ্যানিমে ফিল্মের ইতিহাসে সবচেয়ে রক্তগরম আর অ্যাড্রেনালিন তুঙ্গস্পর্শী করা – এক ফিনালে দিয়ে। আর এর মাঝখান সময়টা জুড়ে এক ভূতূড়ে জগৎ। হয়তো কিছুটা ধীর গতির। আর লাইভ-অ্যাকশন ছাড়িয়ে অ্যানিমেশনে সিনেমাটোগ্রাফির অসাধারনত্ব আর বাক্স ভরা সৃজনশীলতায় পূর্ণ।
এড আর অ্যালের ট্রুথের সাথে দেখা হওয়ার দৃশ্য দেখেছেন – এখানে দেখবেন খুব আলাদা, কৌতুকপ্রদ আর চিন্তাদ্দীপক এক সাক্ষাত, ‘দ্য ওয়ান’-এর সাথে। অনেক “ভালোবাসা”-‘র দৃশ্য দেখেছেন, আদিমতার – আর এখানে তার উপস্থাপনা সৌন্দর্য, শৌল্পিকতার।

মাইন্ড গেম সবার ভালো লাগার মত জিনিস না। ইউয়াসা সবার ভালো লাগার মত জিনিস না। আর তাই তার অন্যান্য সব কাজের মতই মুক্তির ১০ বছর পরও এটার কোন ডাব বের হয়নি। বিগত দশকের অন্যতম প্রভাব রাখা অ্যানিমে ফিল্ম হওয়ার পরও, অন্যতম শ্রেষ্ট ডেব্যু ফিল্ম হওয়ার পরও। মাইন্ড গেম – তার নামের যথার্থতা পুরণে অবশ্য আপনার মাথার সাথে কোন জটিল দাবা খেলায় নেমে পরবে না; মাইন্ড গেমের কাহিনী জটিলতা নিয়ে না। বরং মাইন্ড গেম জীবন নামক খেলার গল্প, বেঁচে থাকার গল্প – স্বপ্ন ভাঙা, ভালোবাসা হারানো, ইয়াকুজাদের হাতে পরা…মরে যাওয়া এবং তারপরও বেঁচে থাকার গল্প।

সম্মাননাঃ
* ওফুজি নোবুরো অ্যাওয়ার্ড – মানচিনি ফিল্ম অ্যাওয়ার্ড
* গ্র্যান্ড প্রাইজ – জাপান মিডিয়া আর্টস ফেস্টিভাল (হাউল’স মুভিং ক্যাসলকে হারিয়ে)
* সেরা ফিল্ম, সেরা পরিচালক, সেরা স্ক্রিপ্ট (জ্জুরি) – ফ্যান্টাসিয়া ফিল্ম ফেস্টিভাল ২০০৫, কানাডা
* সেরা ফিল্ম, সেরা গ্রাউন্ডব্রেকিং ফিল্ম (অডিয়েন্স) – ফ্যান্টাসিয়া ফিল্ম ফেস্টিভাল ২০০৫, কানাডা

রেটিংঃ
মাইঅ্যানিমেলিস্টঃ ৭.৯৫
রটেন টমেটোসঃ ৯৪% ফ্রেশ
আমার রেটিংঃ ৮২/১০০

‪#‎ইউয়াসা‬