অ্যানিমের কাছে আসার গল্প — রুফিয়াস মিলেনিয়াম

অ্যানিমের কাছে আসার গল্প
(লাইক এনিবডি কেয়ারস্‌)

আমার একটা সমস্যা আছে। আমার সহজে ঘুম ভাঙ্গে না। যখন আমি অনেক ছোট, কেবল নার্সারিতে অথবা ক্লাস ওয়ানে পড়ি, তখন থেকেই সকালে ঘুম থেকে উঠতে দেরি হত, এবং স্কুলে যাওয়ার সময় হলে আমাকে ঘুম থেকে উঠানোর জন্য যথারীতি পীড়াপীড়ি করতে হত। এখনো করতে হয়। যাইহোক, তা একদিন সকালে আমাকে ঘুম থেকে উঠানোর খুব সহজ এক পদ্ধতির আবিষ্কার করা হল। সকাল বেলায় বিটিভি তে স্যামুরাই এক্স প্রচার করা হত। টিভি ছেড়ে দেয়া হল আর উদো জিনে নামের সেই ভিলেন কে দেখে আমি যে ভয় পেয়েছিলাম তাতে আমার ঘুম শেষ। আর কামিয়া কাওরু কে কেনশিন কিভাবে উদ্ধার করবে সেটা দেখার জন্য আর তর সইছিল না। এর পর অনেক দিন বিটিবি তে প্রতি বৃহস্পতিবার বিকাল ৩ টার সময় স্যামুরাই এক্স দেখার জন্য বসে থাকতাম।

আমাদের বাসায় তখনও ক্যাবল নেটওয়ার্ক নেয়া হয়নি, ক্লাস টু/ থ্রি তে পড়ি, এরকম সময়ে একদিন পাশের বাসায় গিয়ে দেখি সেখানের পিচ্চি ছেলেটা খুব উত্তেজিত হয়ে কি জানি দেখছে আর কিছুক্ষণ পর পর লাফাচ্ছে, চিৎকার করছে (ঠিক ইউরোপিয়ান ফুটবল ফ্যান্ দের মত)। সেখানে কত্তসব কত আকারের আজগুবি প্রাণী! (না ন্যাশনাল জিওগ্রাফি চ্যানেল না)।দেখি কার্টুনের নাম কার্টুন নেটওয়ার্ক! কি আজব! ক্লাস ফোর বাঁ ফাইভে পড়ার সময় ক্যাবল নেটওয়ার্ক আসার পরে জানলাম এটার নাম, পকিমন!… আই অয়ানা বি দা ভেরি বেস্ট! লাইক নো ওয়ান এভার অয়াজ!… ক্লাস ফাইভে বৃত্তি পাইনি বলে ক্যাবল নেটওয়ার্ক আবার সরিয়ে নেয়া হল। আমার চাইনিজ কার্টুন দেখার ক্ষান্ত হল।

ক্লাস সেভেনে আবার ক্যাবল নেটওয়ার্ক নেয়া হল। একদিন বিকেলে কার্টুন নেটওয়ার্কে দেখলাম ড্রাগন বল জি। যখন আসে পাশে কেউ না থাকে, তখন গোকুর সাথে আমিও বিছানার উপরে লাফালাফি করতাম। কা মে হা মে হাআআআআআআ!

ক্লাস এইটে যখন পড়ি, কার্টুন নেটয়ার্ক কেন যেন হটাত অ্যানিমে দেখানো বন্ধ করে দিল।তার বদলে দেয়া হত ইন্ডিয়ান (ফালতু) কার্টুন। অ্যানিম্যাক্স চ্যানেলে কোনো সাবটাইটেল ছাড়া অ্যানিমে দেখে কিছুই বুঝতাম না। পরিসমাপ্তি ঘটল অ্যানিমে দেখার আরেকটি অধ্যায়ের।
আমার স্কুলের বন্ধুরা খালি হিন্দি সিনেমা দেখতো। আমি বলতাম, ভাই তোরা ইংলিশ ভার্সানে পরস, পারলে ইংলিশ ফিল্ম দেখ” কিন্তু কে শোনে কার কথা। তা এরমাঝেও কয়জন ছিল যারা কিনা, ব্লিচ, পকিমন, ফেইরি টেইল নামের কার্টুন নিয়ে কথা বলত। আমি কান পেতে সেসব গল্প শুনে যেতাম। তখন অনেক পকিমন কার্ড জমাতাম।

এন্টার আমার এস এস সি পরীক্ষার পরে ছুটির সময়। মোবাইলে ফ্রি মেগাবাইট নিয়ে ইউটিউবে আবার দেখলাম স্যামুরাই এক্স। আমার বন্ধু তানভির আমাকে ফোন করে বলল, “দোস্ত অ্যানিমে দেখস? জাপানিজ কার্টুন?” আমি বললাম, “হোয়াট এ কোইন্সিডেন্স! আমি একটু আগাই স্যামুরাই এক্স দেখতেছিলাম।” তানভির বলল, “ আমি নারুতো দেখতেছি। জাস্ট অসাম!”… মোবাইলের সেই ছোট স্ক্রিনে নারুতোর প্রথম দুইটি পর্ব দেখার পরে আর দেখা হল না।আমার কাছ থেকে মোবাইল নিয়ে যাওয়া হল।

(স্কিপ দিস প্যারা ইফ ইউ অয়ান্ট টু )তারপর… আমি বিদেশে চলে আসলাম। লন্ডনে আমি একা হয়ে গেলাম। ছোট্ট একটা ঘরে বন্দী হয়ে ভাবতে লাগলাম, ইশ , জাফর ইকবাল আর হুমায়ুন আহমেদ এর বইগুলো নিয়ে আসতাম যদি! পুরো ৬ মাস আমি ঘরে থাকতাম, বাইরে বের হতাম না।বাইরে গেলেই ইংরেজিতে কথা বলতে হয়, আর নার্ভাস ফিল করি।আমার ঘরের একটা বড় জানালা ছিল। সেখানে সারাক্ষন দাঁড়িয়ে থাকতাম। বাংলাদেশে বন্ধুদের সাথে কথা বলতাম মোবাইল ফোনে। আব্বু বলেছেন, বাংলাদেশের বন্ধুদের সাথে শেষ কথা বলে নিতে। কারণ আমার এখানে নতুন জীবন শুরু হয়েছে। তাদের কথা আসতে আসতে ভুলে যেতে হবে।শীতের একদিনে ঘরের বড় জানালাটা বন্ধকরে ইন্টারনেট আর ফেসবুকের জানালা খুলে দিলাম।

নারুতো আমার প্রথম দেখা “অ্যানিমে”। নারুতোর মাঝে খুঁজে পেলাম আমি একাকিত্ত, অদক্ষতা, দুষ্টুমি, অবহেলা, বন্ধুত্ব… অনেক কিছু। একটা ছেলে, বাবা মা নেই, কোনও বন্ধু নেই, কিচ্ছু পারেনা, কিন্তু কিভাবে সে তার অটল আত্মবিশ্বাসে সকল প্রতিবন্ধকতা গুলোকে পেরিয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে, তা দেখে আমি অভিভূত হলাম। একটা অ্যানিমে যে একজন মানুষ কে কিভাবে প্রভাবিত করতে পারে তা নারুতো দেখে শিখেছি।

তা এখানে প্রথম যখন স্কুলে গিয়েছি, সেই একদিন এর কথা। অঙ্ক ক্লাসে গিয়ে দেখি আমার পাশের সিটে একটা মেয়ে ঋষিদেরদের মতন আসন করে বসে আছে। আমি জিজ্ঞেস না করে পারলাম না, বললাম, “ আয়শা, কি করছ?” মেয়েটা বলল, “ আমি সেইজ মোডে যাওয়ার চেষ্টা করছি”…

বৃহস্পতিবার, কম্পিউটার ক্লাসে দেখি একটা ছেলে নারুতো দেখছে। নতুন পর্ব বের হয়েছে এই মাত্র তাই। ইংলিশ ক্লাসের একটা অ্যাসাইন্মেন্টে আমি প্লানেটারি ডিভাস্টেশন কথাটি ব্যাবহার করেছিলাম, পাশে বসে থাকা ছেলেটি সেটা পরে বলে উঠলো, “ ওওওওওও! আমি জানি তুমি এইটা কোথা থেকে পাইসো!”…

এই ছিল আমার অ্যানিমের কাছে আসার গল্প। অ্যানিমের জগতে আমি এখনো নতুন।

nertu

Comments