শৌয়া গেনরোকু রাকুগো শিনজু সিজন ১+২
Shouwa Genroku Rakugo Shinjuu
[স্পয়লারবিহীন রিভিউ]
ভালো একটা গল্প শুনতে কেই-ই বা পছন্দ করে না? সেই ছোটবেলায় দাদী-নানিদের কাছ থেকে রুপকথার গল্প শোনা থেকে বড় হবার পর মুভি, সিরিজ, অ্যানিমেতে ঝোঁকা- সবই একটা ভালো গল্পের আশায়। এই গল্পের পেছনে ছোটার মাঝে হয়তো চোখেই পরে না মানুষের জীবনেও কতশত গল্প,অণুগল্প লুকিয়ে আছে। এই জিনিসটাই চোখে আঙ্গুল তুলে দেখিয়ে দেয় Shouwa Genroku Rakugo Shinjuu। একজন গল্পকথকের জীবনটা যে তার বলা গল্পগুলোর চেয়ে কোন অংশে কম নয় তাই এনিমটির উপজীব্য বিষয়। আর শৌগেন এই বিষয়টা এতটাই চমৎকার ভাবে ফুটিয়ে তুলেছে তার প্রশংসা না করলেই নয়।
রাকুগো। আক্ষরিক অনুবাদ করলে হয় ‘পড়ন্ত শব্দ’। জাপানের এক ঐতিহ্যবাহী গল্পকথন মাধ্যম। সাধারণত একজন গল্পকথক মঞ্চে বসে দর্শকদের অনবরত গল্প বলে যান। গল্প বলার মাঝে গল্পের চরিত্রগুলোর কথাবার্তাও কথককে অভিনয় করে দেখাতে হয় যা মোটেও সহজ কাজ নয়। রাকুগো মেইজি পিরিয়ড এর মাঝামাঝি শুরু হয়ে পূর্ণ জনপ্রিয়তা লাভ করে শৌয়া পিরিয়ডে। কালের বিবর্তনে অনেকটাই বিলুপ্ত আজ একসময়কার জনপ্রিয় এ বিনোদন মাধ্যম।
শৌগেনের গল্প শুরু হয় সদ্য জেল থেকে ছাড়া পাওয়া ইয়োতারো এবং তার বিখ্যাত রাকুগো শিল্পী ইয়াকুমোর শিষ্য হিসেবে নিযুক্ত হবার মধ্য দিয়ে। ইয়োতারো আর কয়েকজন চরিত্রের সাথে পরিচয় হবার পরপরই গল্প চলে যায় ফ্ল্যাশব্যাকে যেখানে আমরা দেখতে পাই কিভাবে সামান্য এক কিকুহিকু জাপানের অন্যতম সেরা রাকুগো শিল্পী ইয়াকুমোতে পরিণত হয়। এর সাথে পরিচিত হই ইয়াকুমোর জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু মানুষ সুকেরোকো, মিয়োকিচি এবং আরো কিছু চরিত্রের সাথে যারা পরবর্তীতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
প্রথম সিজন প্রায় সবটুকুই ফ্ল্যাশব্যাক। প্রথম সিজন শেষে দ্বিতীয় সিজনে শুরু হয় এনিমের একেবারে শুরুতে দেখা ইয়োতারোর গল্প। মডার্ন জাপান, যেখানে হাত বাড়ালেই টেলিভিশন,রেডিওর মত বিনোদন মাধ্যম সেখানে রাকুগোকে বাঁচিয়ে রাখার মত অসম্ভব দায়িত্ব নিয়ে ইয়োতারোর প্রচেষ্টা । হয়তো ইয়োতারোর তার মাস্টারের মত প্রতিভা নেই, কিন্তু তার যা আছে তা হলো রাকুগোর প্রতি ভালবাসা। এই ভালবাসা আর তার কমেডিক রাকুগো দিয়ে সে চায় দর্শকদের মনে রাকুগোর প্রতি ভালবাসা তৈরী করতে।
এখন আসি এই এনিম কেন দেখবেন। শৌগেন দেখবেন এর গল্পের স্বাচ্ছন্দ্যময়তার জন্য। এত ভালো পেসিং এনিমেতে খুব কমই দেখেছি। খুব দ্রুতও না, আবার ধীরে ধীরে যেয়ে দর্শকদের বোর করে দেওয়ার মতনও না। দুইয়ের মাঝামাঝি এক সুন্দর গতিতে এগিয়ে চলে গল্প, যা দর্শকদের সম্মোহনী শক্তিতে আবদ্ধ করে ফেলতে সক্ষম। এমনো হয়েছে শৌগেন দেখে আমি এতটাই বুঁদ হয়ে গিয়েছি যে বৃষ্টির ঝাপটা খাতাপত্র ভিজিয়ে দিচ্ছে কিন্তু আমি কানে হেডফোন দিয়ে কিকুহিকুর রাকুগো শুনছি।
এরপর আছে এর চরিত্র আর তাদের চরিত্রায়ন। শৌগেনের প্রত্যেকটা চরিত্রই তাদের নিজেদের দিক থেকে অনন্য। কাকে রেখে কার কথা বলব। কিকুহিকু, ছোটবেলা থেকেই যে তার বন্ধু সুকেরোকোর সহজাত রাকুগো প্রতিভা দেখে হীনম্মন্যতায় ভুগত নাকি মিয়োকিচি, ভুল সময়ে ভুল দেহে জন্ম নেওয়া এক নারী যে কিনা কোন তৎকালীন সময়ে কোন পুরুষের সাহায্য ছাড়াই স্বাধীন জীবনযাপন করার স্বপ্ন দেখে। এনিম দেখে এমন চরিত্র পাওয়া কঠিন যাদেরকে ভালো না বেসে পারা যায় না। এতটাই চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে তাদের।
প্রথম সিজন আর দ্বিতীয় সিজন আলাদা আলাদা করে বিচার করলে শৌগেন ভাল একটা এনিমে, কিন্তু যখন দুইটা একত্রে বিচার করা হয় এইটা একটা মাস্টারপিস হয়ে উঠে। প্রথম সিজনের ক্যারেক্টারগুলো দ্বিতীয় সিজনে না থেকেও যে কত বিশাল প্রভাব ফেলে তা না দেখলে বোঝা সম্ভব না। দুই সময়ের, দুই জেনারেশনের কতকগুলো মানুষ রাকুগোর মধ্য দিয়ে যেন এক অবিচ্ছেদ্য সুতোয় বাধা। কিছু মানুষ সুতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবার পরেও যে সুতোয় হঠাৎ টান পড়ে।
সত্যিই এই এনিম নিয়ে বলার জন্য নেগেটিভ কিছু খুঁজে পাচ্ছি না। যদি কিছু বলতেই হয় বলার স্বার্থে বলবো এর দীর্ঘ রাকুগো পারফরমেন্স গুলো। কিছুটা বোরিং হলেও আমার কাছে ওইগুলো অনেক ভাল লেগেছে এবং মনে হয়েছে প্রত্যেক চরিত্রের নিজস্ব রাকুগোর ধরণ দেখানোর জন্য জরুরী ছিল এইই পার্ফরমেন্সগুলো। এনিমটাই যেখানে রাকুগো নিয়ে সেখানে রাকুগো না থাকলে কিভাবে কি!
তবে সবারই যে একই মতামত থাকবে তা আশা করা বোকামি। তাই যদি শো এর মাঝে দীর্ঘ রাকুগো দেখে বোর হয়ে ড্রপ দেবার চিন্তা করেন তবে কি জিনিস মিস করতে যাচ্ছেন না ঘুনাক্ষরেও বুঝবেন না। আমার দেখা কিছু সেরা প্লট টুইস্ট এই এনিমেতেই আছে।
পরিশেষে, ভালো কিছু দেখবেন হা-হুতাশ করছেন কিন্তু খুঁজে পাচ্ছেন না অথবা নতুন কোন এনিম দেখবেন ভাবছেন। এইক্ষেত্রে শৌগেন হাইলি রেকমেন্ডেড। এইরকম এনিম পাঁচ বছরে দুই একটা আসে। না দেখে ফেলে রাখলে অসাধারণ এক অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত হবেন। তাই দেখে ফেলুন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই মাস্টারপিস।

